Home / খবর / মানব মুক্তির পথিকৃৎ মহান মার্কসের প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধার্ঘ্য

মানব মুক্তির পথিকৃৎ মহান মার্কসের প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধার্ঘ্য

১৪ মার্চ মহান মার্কসের প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে মানবমুক্তির পথনির্দেশিকা হিসাবে মার্কসের নিজের এবং ফ্রেডরিক এঙ্গেলস, লেনিন, স্ট্যালিন, মাও সে তুঙ এবং শিবদাস ঘোষের কিছু উদ্ধৃতি প্রকাশ করা হল৷ আশা করি, সমাজ মুক্তির সংগ্রামে নিয়োজিত সৈনিকদের সংগ্রাম গড়ে তুলতে এই বক্তব্যগুলি সহায়ক ভূমিকা পালন করবে৷

কার্ল মার্কস

১) ‘প্রতিটি যুগে শাসক শ্রেণির চিন্তা ভাবনা মানুষের ভাবনা ধারণাকে নিয়ন্ত্রণ করে৷ অর্থাৎ যে শ্রেণি সমাজে প্রাধান্য বিস্তারকারী বস্তুগত শক্তির ভূমিকা পালন করে, সেই শ্রেণিই একই সাথে সমাজের ভাবগত শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে৷’

২) ‘দার্শনিকরা নানা ভাবে শুধু জগৎকে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছেন, আসল কাজ হল তাকে পরিবর্তন করা৷’

৩) ‘শ্রমিক শ্রেণির মুক্তি সংগ্রামের অর্থ শ্রেণির জন্য সুযোগ সুবিধা ও একচেটিয়া কর্তৃত্ব অর্জন করা নয়৷ সম অধিকার ও সম কর্তব্য প্রতিষ্ঠা করা ও সমস্ত শ্রেণি শোষণের অবসান ঘটানো৷

৪) ‘ব্যক্তি সম্পত্তিকে বিলোপের মধ্য দিয়ে সাম্যবাদ মানবতাবাদের সাথে নিজের যোগসূত্র স্থাপন করে৷’

৫) ‘নতুন আমি যা করেছি তা হল প্রমাণ করা–

ক) উৎপাদনের বিকাশের বিশেষ ঐতিহাসিক পর্যায়ের সাথেই যুক্ত হয়ে আছে সমস্ত শ্রেণির অস্তিত্ব৷

খ) শ্রেণি সংগ্রামের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হল সর্বহারা একনায়কত্ব৷

গ) এই একনায়কত্বই হল একমাত্র সমস্ত শ্রেণির অবলুপ্তি ও শ্রেণিহীন সমাজ গঠনের উত্তরণকালীন পর্যায়৷’

৬) ‘ধর্ম যে দুঃখ যন্ত্রণার কথা বলে তা বাস্তব দুঃখ যন্ত্রণারই প্রকাশ এবং তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ৷ ধর্ম হল নিপীড়িত মানবাত্মার দীর্ঘশ্বাস, হৃদয়হীন দুনিয়ার হৃদয়, অনুভূতিহীন পরিস্থিতির অনুভূতি৷ ধর্ম হল জনগণের জন্য আফিম৷’

৭) ‘জগতের যথার্থ ঐক্য হল তার বস্তুময়তার মধ্যে৷ দর্শন ও প্রকৃতি বিজ্ঞানের সুদীর্ঘ ও কষ্টকঠিন বিকাশ তা প্রমাণ করেছে৷

৮) ‘কিন্তু যদি প্রশ্ন তোলা হয়, তাহলে চিন্তা ও চেতনা কী, কোথা থেকে তা আসে, তাহলে বোঝা যাবে তা মানুষের মস্তিষ্কের সৃষ্টি এবং মানুষ নিজে প্রকৃতির সৃষ্টি৷’

৯) ‘গতি হল বস্তুর অস্তিত্বের রীতি (mode)৷ বস্তুজগতের কোথাও গতি ছাড়া বস্তু বা বস্তু ছাড়া গতি পাওয়া যাবে না৷’

১০) ‘আমার দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতি হেগেলের পদ্ধতি থেকে শুধু পৃথকই নয়, তার ঠিক বিপরীত৷ চিন্তা পদ্ধতিকে হেগেল ভাব বলে নামকরণ করেছেন৷ তারপর সেই ভাবকে তিনি স্বাধীন বিষয়ে পরিণত করেছেন, পরিণত করেছেন বাস্তব দুনিয়ার স্রষ্টায়৷ এর বিপরীতে, আমার কাছে, ভাব মানব মনে প্রতিফলিত ও চিন্তায় রূপান্তরিত বস্তুজগৎ ছাড়া আর কিছু নয়৷’

১১) ‘মানুষের চেতনা তার সত্ত্বাকে নির্ধারণ করে না, বরং এর বিপরীতে তাদের সামাজিক সত্ত্বা তাদের চেতনাকে নির্ধারণ করে৷’

১২) ‘সামাজিক উৎপাদন করতে গিয়ে মানুষ নির্দিষ্ট সম্পর্কে আবদ্ধ হয়৷ এই নির্দিষ্ট সম্পর্ক অবশ্যপ্রয়োজনীয় ও মানুষের ইচ্ছা নিরপেক্ষ৷ বস্তুগত উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের সুনির্দিষ্ট স্তরের সাথে এই উৎপাদন সম্পর্ক সঙ্গতিপূর্ণভাবে গড়ে ওঠে৷’

১৩) ‘এই সব উৎপাদন সম্পর্কের সমষ্টি সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামো, তার বাস্তব ভিত্তি তৈরি করে৷ এর উপরই গড়ে ওঠে আইনি ও রাজনৈতিক উপরিকাঠামো৷ এবং এই উপরিকাঠামো নির্দিষ্ট সামাজিক চেতনার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হয়৷’

১৪) ‘উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের গতিপথে এই সব সম্পর্ক (উৎপাদন সম্পর্ক) তার বিকাশের গতিপথ রুদ্ধ করে৷ তারপরই শুরু হয় সমাজবিপ্লবের যুগ৷’

১৫) ‘অর্থনৈতিক ভিত্তির পরিবর্তনের সাথে সাথে সমগ্র সুবিশাল উপরিকাঠামো কমবেশি রূপান্তরিত হয়৷’

১৬) ‘আজ পর্যন্ত অস্তিত্বশীল সমস্ত সমাজের ইতিহাস হল শ্রেণি সংগ্রামের ইতিহাস (শুধু আদিম গোষ্ঠীবদ্ধ সমাজ বাদ দিয়ে)৷’

ফ্রেডরিক এঙ্গেলস

১)  ‘‘মার্কস যে কাজ সম্পন্ন করেছেন, আমি সেটা পারতাম না৷ আমাদের সকলের তুলনায় মার্কস অনেক উঁচুতে দাঁড়িয়েছিলেন, অনেক দূর দেখেছেন, অতিদ্রুত বিশাল ব্যাপ্তিময় ধারণা নিতে পেরেছেন৷ মার্কস ছিলেন অসাধারণ প্রতিভাধর মনীষী(genius), আমরা বড়জোর সাধারণ মাপের প্রতিভার(talent) অধিকারী৷ আজ তত্ত্ব যে আকারে দেখা যাচ্ছে, মার্কসকে বাদ দিয়ে সেটা সম্ভব ছিল না৷ সুতরাং যথার্থভাবেহ এহ তত্ত্বের সাথে তাঁর নাম যুক্ত হয়েছে৷’’

ভি আই লেনিন

১) ‘‘মার্কসীয় মতবাদ অসীম ক্ষমতাসম্পন্ন, কারণ তা সত্য৷ এ মতবাদ সুসম্পূর্ণ ও সুসমঞ্জস এর কাছ থেকে যে সামগ্রিক বিশ্বদৃষ্টি লাভ করা যায় সেটা কোনও রকম অলৌকিক ভ্রান্ত অন্ধবিশ্বাস, প্রতিক্রিয়াশীল মনোভাব অথবা বুর্জোয়া অত্যাচারের সাথে কোনও রূপ আপস করে না৷ উনবিংশ শতকের জার্মান দর্শন, হংরেজি অর্থশাস্ত্র এবং ফরাসি সমাজবাদ রূপে মানবজাতির যা শ্রেষ্ঠ তার ন্যায়সঙ্গত উত্তরাধিকারী হল মার্কসবাদ৷’’

জোসেফ স্ট্যালিন

১) ‘‘মার্কসবাদ শুধুমাত্র সমাজতন্ত্রের তত্ত্ব নয়, এ একটা সুসংহত বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি, একটা দার্শনিক প্রণালী যা থেকে মার্কসের সর্বহারা সমাজতন্ত্র যুক্তিসংগতভাবেহ এসে যায়৷ এহ দার্শনিক প্রণালীকেহ দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ বলা হয়৷’’

মাও সে তুং

১) ‘‘মার্কসবাদের শিক্ষা হল যে কোনও সমস্যার বিষয়ে ধারণা গড়ে তুলতে হলে আমাদের বাস্তব অবস্থা থেকে শুরু করা উচিত, ভাবস্বরূপ বর্ণনা থেকে নয়… এহ ঘটনা বিশ্লেষণ থেকে আমাদের নীতি, কর্মপন্থা ও পদক্ষেপ নির্ধারণ করা উচিত৷’’

শিবদাস ঘোষ

১)  ‘‘আমরা জানি, মার্কসবাদ–লেনিনবাদ হচ্ছে একমাত্র বিপ্লবী তত্ত্ব, যা আজকের যুগে সবচেয়ে বৈজ্ঞানিক ও সর্বশ্রেষ্ঠ মতবাদ বা ভাবাদর্শ এবং যা বর্তমান পুঁজিবাদী সমাজের পঙ্গুতা থেকে মানুষকে মুক্ত করে একটা নতুন শোষণহীন শ্রেণিহীন উন্নততর সমাজব্যবস্থার জন্ম দিতে সক্ষম৷’’

২) ‘‘মার্কসবাদ একটা মহান বিপ্লবী আদর্শ৷ ফলে এহ মহত্তম বিপ্লবী আর্দশেরও মর্মবস্তু এবং প্রাণসত্তা নিহিত রয়েছে তার সাংস্কৃতিক মান এবং নৈতিক মানের মধ্যে৷’’

(গণদাবী : ৭১ বর্ষ ৩১ সংখ্যা)