Home / খবর / মহান মে দিবসে লেনিনের আহ্বান

মহান মে দিবসে লেনিনের আহ্বান

(১৯০৪ সালে মে দিবস উদযাপন উপলক্ষে কমরেড লেনিনের লেখা প্রচারপত্র)

সংগ্রামী শ্রমজীবী বন্ধুগণ,

মহান মে দিবস আসন্ন৷ এই দিনে সারা দুনিয়ার শ্রমজীবী মানুষ তাঁদের শ্রেণিসচেতন অভ্যুত্থান উদযাপন করেন৷ মানুষের উপর মানুষের শোষণ–ত্যাচারের বিরুদ্ধে, ক্ষুধা–দারিদ্র্য–অবমাননা থেকে কোটি কোটি নিপীড়িত মানুষের মুক্তিসংগ্রামের জন্য তাঁরা নিজেদের আরও সংহত করার শপথ নেন৷ এই সংগ্রামে দু’টি জগৎ পরস্পর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে– পুঁজিপতি শ্রেণির জগৎ আর শ্রমিক শ্রেণির জগৎ৷ একটিতে আছে শোষণ আর গোলামি, আরেকটিতে আছে ভ্রাতৃত্ববোধ এবং স্বাধীনতা৷ একদিকে রয়েছে মুষ্টিমেয় ধনকুবের রক্তশোষক৷ তারা কল–কারখানা, যন্ত্রপাতি, জমি, ধনসম্পত্তি ইত্যাদি দখল করে বসে আছে৷ সরকার এবং সেনাবাহিনীকে তারা নিজেদের গোলাম বানিয়েছে৷ এরা হল তাদের লুঠ করা সম্পদের পাহারাদার৷

অন্যদিকে রয়েছে কোটি কোটি অসহায় মানুষ, যাদের দুটো পয়সার জন্য মালিকের কাছে কাজ ভিক্ষে করা ছাড়া উপায় নেই৷ তারাই শ্রম দিয়ে সমস্ত সম্পদ সৃষ্টি করে৷ অথচ সারাজীবন একটু রুটির জন্য তাদের হা–পিত্যেশ করতে হয়৷ হাড়ভাঙা খাটুনির পর গ্রামের প্রান্তে অথবা শহরের বস্তিতে দুর্বিষহ জীবনযাপন করতে হয় তাদের৷

কিন্তু এখন সেই নিপীড়িত মানুষেরা ধনকুবের শোষকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে৷ সারা দুনিয়ার শ্রমজীবী মানুষ শ্রমকে মজুরি–দাসত্ব থেকে মুক্ত করার লড়াইয়ে সামিল হয়েছে৷ তারা লড়ছে অভাব, দারিদ্রের বিরুদ্ধে৷ তারা এমন একটা সমাজব্যবস্থার জন্য লড়ছে যেখানে শ্রমের দ্বারা সৃষ্ট সম্পদ মুষ্টিমেয় ধনকুবেরের পরিবর্তে শ্রমিকদের স্বার্থে ব্যবহৃত হবে৷ কল–কারখানা, যন্ত্রপাতি, জমি, ধনসম্পদকে তারা সাধারণের সম্পত্তিতে পরিণত করতে চাইছে৷ তারা চাইছে ধনী–দরিদ্রের বৈষম্য দূর হোক, শ্রমের ফসল শ্রমজীবীরাই পাক৷ তারা চাইছে মানুষের মননশক্তির সমস্ত অগ্রগতি, সমস্ত সাফল্যকে কাজে লাগিয়ে গোটা সভ্যতা আরও উন্নত হোক, একজনও যেন অবদমিত না থাকে৷

এই মহান সংগ্রাম পরিচালনা করতে গিয়ে সারা বিশ্বেই শ্রমজীবী মানুষকে অপরিসীম আত্মত্যাগ করতে হয়েছে৷ বাঁচার ন্যূনতম অধিকার এবং যথার্থ স্বাধীনতা অর্জনের জন্য রক্তের নদী বওয়াতে হয়েছে তাদের৷ শ্রমিকশ্রেণির হয়ে যারা লড়ছে, তাদের বিরুদ্ধে ভয়ঙ্কর ভাবে খড়গহস্ত হচ্ছে সরকার৷ কিন্তু সমস্ত অত্যাচার সত্ত্বেও বিশ্বজুড়ে শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলন আরও শক্তিশালী এবং তীব্রতর হচ্ছে৷ দেশে দেশে সমাজতান্ত্রিক দলগুলিতে আরও বেশি বেশি মানুষ সংগঠিত হচ্ছে৷ তাদের সমর্থকেরা লাখে লাখে রাস্তায় নামছে৷ পুঁজিবাদী শোষণের দিন শেষ করতে ক্রমাগত তারা এগোচ্ছে৷

রাশিয়ার সর্বহারাও এক নতুন জীবনবোধের দিকে এগোচ্ছে৷ এরাও সেই মহান সংগ্রামে সামিল হচ্ছে৷ সে–সব দিন চলে গেছে যখন এখানকার শ্রমিকেরা মুখ বুজে দাসত্ব করত, শৃঙ্খল ভাঙতে পারত না, এমনকী অন্ধকারময় জীবনে কোনও আশার আলো দেখতে পেত না৷ সমাজতন্ত্র তাদের দেখিয়েছে মুক্তির পথ৷ তারা হাজারে হাজারে এসে ধ্রুবতারা–সম লাল পতাকার তলায় সমবেত হচ্ছে৷ একের পর এক ধর্মঘট প্রমাণ করছে তাদের সংঘবদ্ধতার শক্তি৷ তাদের শেখাচ্ছে কী ভাবে রুখে দাঁড়াতে হয়৷ শ্রমিকেরা হাতে–কলমে প্রমাণ পাচ্ছে যে, তাদের শ্রমের ফল চুরি করেই ধনিকশ্রেণি এবং তাদের সরকারগুলি লাটসাহেবি করে৷ শ্রমিকেরা স্বাধীনতা এবং সমাজতন্ত্রের জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠছে৷ তারা পরিষ্কার বুঝতে পারছে, জারের স্বৈরাচারী শাসন কী ভয়ঙ্কর৷ শ্রমিকদের প্রয়োজন মুক্তির, অথচ জার তাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখছে৷ শ্রমিকদের প্রয়োজন একত্রিত হওয়ার, সংগঠন গড়ে তোলার, পত্র–পত্রিকা প্রকাশ করার৷ অথচ জারের সরকার তাদের এক হতে দিচ্ছে না, জেলে পুরছে, গুলি করছে ‘স্বৈরতন্ত্র নিপাত যাক’ বললেই৷ কিন্তু তা সত্ত্বেও রাশিয়ার সমস্ত রাস্তাঘাটে, শ্রমিক সভায় এই স্লোগানই শোনা যাচ্ছে৷ গত গ্রীষ্মেও দক্ষিণ রাশিয়ার হাজার হাজার শ্রমিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার জন্য লড়াইয়ে নেমেছে৷ শ্রমিক শ্রেণির এই অদম্য শক্তি সরকার এবং শাসকদের চোখের ঘুম কেড়ে নিয়েছে এবং শিল্পাঞ্চলগুলিতে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে৷ জারের সেনাবাহিনীর গুলিতে বহু শ্রমিক শহিদ হয়েছেন৷

কিন্তু শ্রমিক–সংহতিকে পরাস্ত করতে পারে এমন কোনও শক্তি বিশ্বে নেই৷ শাসকশ্রেণি এবং তার সরকার টিকে থাকতে পারে শ্রমিকের শ্রমের ফলেই৷ তাই বিশ্বের কোনও শক্তিই ক্রমাগত শ্রেণিসচেতন হয়ে ওঠা শ্রমিকের ঐক্যকে পরাভূত করতে পারবে না৷ শ্রমিকশ্রেণির প্রত্যেকটি পরাজয় বহু সংগ্রামী যোদ্ধার জন্ম দেয় এবং নতুন উদ্দীপনায় সংগ্রাম গড়ে তোলার জন্য বৃহত্তর জনতাকেও উদ্বুদ্ধ করে৷     

রাশিয়া বর্তমানে যে সব ঘটনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তাতে মেহনতি জনতার এই জাগরণ আরও ব্যাপক ও দ্রুততর হবে৷ সমস্ত অংশের সর্বহারা মানুষকে ঐক্যবদ্ধ ও দৃঢ়তর সংগ্রামের জন্য তাদের প্রস্তুত করতে আমাদের অবশ্যই অত্যন্ত সজাগ থাকতে হবে৷ এই যুদ্ধ সর্বহারা শ্রেণির সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া অংশকেও রাজনৈতিক ঘটনাবলি ও সমস্যাগুলির প্রতি আগ্রহী করে তুলেছে৷ স্বৈরতান্ত্রিক আইন, পুলিশ ও বিচারব্যবস্থার নিষ্ঠুর যোগসাজশ যা রাশিয়ার উপর শাসন কায়েম করে রেখেছে, তা যে পচে গলে গেছে, এই যুদ্ধ তা স্পষ্ট ও পরিষ্কার ভাবে দেখিয়ে দিচ্ছে৷ আমাদের দেশের মানুষ অভাব ও অনাহারে মরছে, তা সত্ত্বেও তাদের টেনে–হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে হাজার হাজার মাইল দূরে বিদেশের মাটিতে এক ধ্বংসাত্মক ও কাণ্ডজ্ঞানহীন যুদ্ধের ময়দানে৷ আমাদের দেশের মানুষ রাজনৈতিক দাসত্বে পদদলিত হচ্ছে, তা সত্ত্বেও তাদের যুদ্ধের মধ্যে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে অন্য দেশের মানুষকে দাসত্বে বেঁধে ফেলার জন্য৷ আমাদের দেশের মানুষ দেশের মাটিতে রাজনৈতিক বিধানের পরিবর্তন চাইছে, অথচ পৃথিবীর অন্য প্রান্তের বন্দুকের আওয়াজের দিকে তাদের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে৷ কিন্তু দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ এবং তরুণ মানবসম্পদের নির্মম লুটপাট করতে গিয়ে, তাদের প্রশান্ত সাগরের তীরে মরতে পাঠিয়ে জার সরকার জুয়ার দান প্রায় হারতে বসেছে৷ প্রতিটি যুদ্ধই জনসাধারণের উপর চাপ সৃষ্টি করে, আর সংস্কৃতিসম্পন্ন ও স্বাধীন জাপানের বিরুদ্ধে এই কঠিন লড়াই তো রাশিয়ার মানুষের উপর ভয়ানক চাপ সৃষ্টিকারী৷ এই চাপ এমন একটা সময়ে তৈরি হয়েছে যখন জেগে ওঠা সর্বহারার আঘাতের ধাক্কায় পুলিশি স্বেচ্ছাচারের কাঠামো ইতিমধ্যেই টলমল করতে শুরু করেছে৷ যুদ্ধ এই সরকারের সমস্ত দুর্বলতাগুলিকে নগ্ন করে দিচ্ছে, যুদ্ধ সমস্ত ছদ্মবেশকে টেনে ছিঁড়ে দিচ্ছে, ব্যবস্থার ভেতরকার পচে যাওয়া সমস্ত ক্ষতগুলির মুখ খুলে দিচ্ছে এই যুদ্ধ, এই যুদ্ধ জারের স্বৈরাচারী শাসনের টিকে থাকার অযৌক্তিকতাকে সকলের সামনে স্পষ্ট করে দিচ্ছে এবং প্রত্যেকের সামনে তুলে ধরছে জীর্ণ রাশিয়ার মৃত্যু–যন্ত্রণা– যে রাশিয়ায় মানুষের ভোটাধিকার নেই, যে রাশিয়ায় মানুষকে দমিয়ে রাখার জন্য অজ্ঞ বানানো হয়েছে, যে রাশিয়া আজও নিপীড়ক সরকারের কাছে দাসত্বের বন্ধনে বাঁধা৷

এই জীর্ণ রাশিয়া মরতে বসেছে৷ তার জায়গা নিতে তৈরি হচ্ছে এক নতুন রাশিয়া৷ জারের স্বৈরাচারকে রক্ষা করে চলত যেসব অপশক্তি, সেগুলি আজ তলিয়ে যাচ্ছে৷ শুধু শ্রেণি সচেতন সংগঠিত সর্বহারাই তাদের প্রতি মৃত্যু–আঘাত হানতে পারে৷ শুধু শ্রেণি সচেতন সংগঠিত সর্বহারাই পারে জনগণের জন্য প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জন করতে৷ জনগণকে প্রতারিত করে, অধিকার কেড়ে নিয়ে তাদের পুঁজিপতি শ্রেণির হাতের পুতুলে পরিণত করার যে কোনও অপচেষ্টাকে প্রতিরোধ করতে পারে একমাত্র শ্রেণি সচেতন সংগঠিত সর্বহারা৷

কমরেডস, আসুন দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে আসন্ন চূড়ান্ত লড়াইয়ের প্রস্তুতি গড়ে তুলি৷ সমস্ত অংশের … সর্বহারা দৃঢ়তর ঐক্যে আবদ্ধ হন৷ তাদের কথা ছড়িয়ে পড়ুক দূর দূরান্তে মাঠে প্রান্তরে৷ শ্রমিকদের দাবি আদায়ের আন্দোলনগুলি বলিষ্ঠতর হোক৷ মে দিবসের এই উদযাপন আরও হাজার হাজার নতুন যোদ্ধাকে আমাদের আদর্শে উদ্বুদ্ধ করুক এবং সমস্ত মানুষের স্বাধীনতা ও পুঁজির জোয়ালে আটকে থাকা মেহনতি জনতার মুক্তি অর্জনের মহান সংগ্রামে আমাদের শক্তিবৃদ্ধি ঘটাক৷

আট ঘন্টার শ্রমদিবস দীর্ঘজীবী হোক৷

(গণদাবী : ৭১ বর্ষ ৩৯ সংখ্যা)