Breaking News
Home / খবর / মহান দার্শনিক কার্ল মার্কস ও তাঁর মতবাদ (৫)– ভি আই লেনিন

মহান দার্শনিক কার্ল মার্কস ও তাঁর মতবাদ (৫)– ভি আই লেনিন

কন্যা জেনি মার্কসের সাথে কার্ল মার্কস

মানবমুক্তির দর্শন হিসাবে মার্কসবাদকে জানতে ও বুঝতে দলের মধ্যে আদর্শগত চর্চার যে ধারাবাহিক প্রক্রিয়া চলছে তার সহায়ক হিসাবে আমরা কার্ল মার্কসের জীবন ও মার্কসবাদ সম্পর্কিত লেনিনের লেখাটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করছি। এবার পঞ্চম ও শেষ কিস্তি।

(৫)

সমাজতন্ত্র

উপরের আলোচনা থেকে এ কথা স্পষ্ট, পুঁজিবাদী সমাজ থেকে সমাজতান্ত্রিক সমাজে রূপান্তর যে অবশ্যম্ভাবী, এ সিদ্ধান্ত মার্কস করেছেন সম্পূর্ণ ভাবে এবং কেবলমাত্র সাম্প্রতিক সমাজ বিকাশের অর্থনৈতিক নিয়ম থেকেই। শ্রমের যে সামাজিকীকরণ হাজারো রূপের মধ্য দিয়ে ক্রমাগত দ্রুততর গতিতে এগিয়ে চলেছে এবং মার্কসের মৃত্যুর পর গত অর্ধশতাব্দীতে বৃহদাকার উৎপাদন, পুঁজিপতিদের কার্টেল, সিন্ডিকেট ও ট্রাস্টের বৃদ্ধিতে তথা ফিনান্স পুঁজির পরিমাণ ও ক্ষমতার প্রচণ্ড বৃদ্ধির মধ্যে যা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাবে আত্মপ্রকাশ করছে, সেটাই হল সমাজতন্তে্রর অবশ্যম্ভাবী অভ্যুদয়ের প্রধান বস্তুগত ভিত্তি। এ রূপান্তরের বৌদ্ধিক ও নৈতিক চালিকাশক্তি এবং বাস্তব কার্যনির্বাহক হল সর্বহারা শ্রেণি, পুঁজিবাদ নিজেইযাদের শিক্ষিত করে তোলে। বুর্জোয়ার বিরুদ্ধে সর্বহারা শ্রেণির সংগ্রাম নানা ভাবে এবং উত্তরোত্তর আরও সমৃদ্ধ রূপ নিয়ে অপরিহার্যভাবে পরিণত হয় এক রাজনৈতিক সংগ্রামে, সর্বহারা কর্তৃক রাজনৈতিক ক্ষমতা অধিকার করাই যার লক্ষ্য (‘সর্বহারার একনায়কত্ব’)। উৎপাদনের সামাজিকীকরণ উৎপাদনের উপকরণগুলিকে সমাজের সম্পত্তিতে পরিণত না করে, ‘উচ্ছেদকারীদের উচ্ছেদ’ না ঘটিয়ে পারে না। শ্রমের উৎপাদনশীলতার ব্যাপক বৃদ্ধি, শ্রমদিবসের আরও ছোট হওয়া, আদিম ও বিচ্ছিন্ন ক্ষুদ্র উৎপাদনের পড়ে থাকা ধ্বংসাবশেষের জায়গায় যৌথ ও উন্নততর শ্রম–এ সব হল এই পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ ফল। পুঁজিবাদ কৃষি ও শিল্পের বন্ধন চূড়ান্তভাবে ছিন্ন করে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই তার উচ্চতম বিকাশের মধ্য দিয়ে তা ওইসব বন্ধনের নতুন উপাদান তৈরি করে। বিজ্ঞানের সচেতন প্রয়োগ, যৌথ শ্রমের সমাবেশ এবং জনসংখ্যার পুনর্বিন্যাসের ওপর ভিত্তি করে শিল্প ও কৃষির সংযোগ ঘটায় (এইভাবে গ্রামীণ পশ্চাদপদতা, বিচ্ছিন্নতা ও অজ্ঞতা (বার্বারিজম) এবং বড় শহরগুলিতে বিপুল জনসংখ্যার অস্বাভাবিক কেন্দ্রীভবন–এই দুইয়েরই অবসান ঘটায়। পরিবারের নতুন রূপ, নারীদের সামাজিক মর্যাদা ও নবীন প্রজন্মকে মানুষ করার নতুন শর্তাবলি তৈরি করে আধুনিক পুঁজিবাদের উচ্চতর রূপঃ নারী ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের শ্রম এবং পুঁজিবাদ কর্তৃক পিতৃতান্ত্রিক পরিবারের ভাঙন বর্তমান সমাজে অনিবার্যভাবেই অতি ভয়াবহ, সর্বনাশা ও জঘন্য রূপ নেয়। কিন্তু তা হলেও ‘বৃহৎ শিল্প নারী, তরুণ ও বালক-বালিকাদের ওপর তাদের গার্হস্থ্য জীবনের বাইরে সামাজিক ভাবে সংগঠিত উৎপাদন প্রক্রিয়ায় নির্ধারক ভূমিকা অর্পণ করে পরিবার ও নরনারী সম্পর্কের একটা উচ্চতর রূপের নতুন অর্থনৈতিক বনিয়াদ গড়ে তোলে। পরিবারের টিউটনিক-খ্রিস্টান রূপটিকে চরম ও অপরিবর্তনীয় বলে ধরে নেওয়া যতখানি অদ্ভূত, প্রাচীন রোমান, প্রাচীন গ্রিক বা প্রাচ্যের পরিবারের রূপগুলি– একসঙ্গে ধরলে যা ঐতিহাসিক বিকাশের একটি পরম্পরা গঠন করে–তাদের ওপরে ওই একই চরিত্র চাপিয়ে দিলে তা হবে ততখানিই অদ্ভূত। আবার, এ কথা স্পষ্ট যে, উভয় লিঙ্গ ও সমস্ত বয়সের মানুষকে নিয়ে গঠিত যৌথ শ্রমিক গোষ্ঠী, উপযুক্ত পরিস্থিতিতে অবশ্যই মানবিক বিকাশের একটি উৎসে পরিণত হয়, যদিও তা হল স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে বিকশিত, নিষ্ঠুর পুঁজিবাদী বিকাশ যেখানে উৎপাদন প্রক্রিয়ার জন্য শ্রমিকের অস্তিত্ব, শ্রমিকের জন্য উৎপাদন প্রক্রিয়া নয়, যা দুর্নীতি ও দাসত্বের সংক্রামক উৎস’ (‘পুঁজি’, প্রথম খণ্ড, ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদের শেষ)। ফ্যাক্টরি ব্যবস্থায় রয়েছে ‘আগামী দিনের শিক্ষার বীজ, যে শিক্ষা একটা নির্দিষ্ট বয়সের পরে সব ছেলেমেয়ের জন্য উৎপাদন-শ্রমের সঙ্গে বিদ্যাশিক্ষা ও শরীরচর্চার মিলন ঘটাবে, এবং তা করবে সামাজিক উৎপাদন বাড়াবার কেবল একটি পদ্ধতি হিসেবেই নয়, সর্বাঙ্গীণ ভাবে বিকশিত মানুষ গড়ে তোলার একমাত্র পদ্ধতি হিসেবেও (ঐ)। মার্কসের সমাজতন্ত্র জাতি ও রাষ্ট্রের প্রশ্নটিকেও একই ঐতিহাসিক ভিত্তিভূমির ওপর দাঁড় করায় শুধু অতীতকে ব্যাখ্যা করার দিক থেকে নয়, বলিষ্ঠতার সঙ্গে আগামী দিনের ভবিষ্যদ্বাণী করতে এবং তা অর্জন করার বলিষ্ঠ বাস্তব ক্রিয়াকলাপের দিক থেকেও। বুর্জোয়া যুগে সমাজ বিকাশের একটি অবশ্যম্ভাবী ফল ও একটি অবশ্যম্ভাবী রূপ হল জাতি। ‘জাতির অভ্যন্তরে প্রতিষ্ঠিত না হয়ে’, ‘জাতীয়’ না হয়ে (যদিও কথাটা বুর্জোয়ারা যে অর্থে বোঝে, সেই অর্থে নয়) শ্রমিক শ্রেণির পক্ষে শক্তি সঞ্চয় করা, পরিণত হওয়া, গঠিত হওয়া সম্ভব ছিল না। যদিও পুঁজিবাদের বিকাশ জাতীয় গণ্ডি আরও বেশি করে ভাঙতে থাকে, জাতীয় স্বাতন্তে্র্যর অবসান হয় এবং জাতিতে জাতিতে বৈরিতার বদলে দেখা দেয় শ্রেণি-শত্রুতা। সুতরাং, এগিয়ে-থাকা পুঁজিবাদী দেশগুলির ক্ষেত্রে এ কথা সম্পূর্ণ ভাবে সত্য যে, ‘মেহনতিদের কোনও দেশ নেই’ এবং অন্তত সভ্য দেশগুলির শ্রমিকদের ‘ঐক্যবদ্ধ কাজকর্মই’ হল ‘সর্বহারার মুক্তির অন্যতম প্রথম শর্ত’ (‘কমিউনিস্ট ইশতেহার’)। রাষ্ট্র, যা হল সংগঠিত নিপীড়ন-ব্যবস্থা, সমাজ বিকাশের একটা নির্দিষ্ট স্তরে অনিবার্য ভাবে তার উদ্ভব হয় যখন সমাজ আপসহীন চিরবিরোধী শ্রেণিতে ভাগ হয়ে পডে, যখন বাহ্যত সমাজের ঊর্ধ্বে অবস্থিত এবং সমাজ থেকে কিছু পরিমাণে স্বতন্ত্র একটা ‘ক্ষমতা’ ছাড়া তা টিকতে পারে না। শ্রেণি-বিরোধের মধ্য থেকে উদ্ভূত হয়ে রাষ্ট্র হয়ে দাঁড়ায় সবচেয়ে শক্তিশালী ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রভুত্বকারী শ্রেণির রাষ্ট্র, যে শ্রেণি রাষ্ট্রের মাধ্যমে রাজনীতির ক্ষেত্রেও আধিপত্যকারী শ্রেণি হয়ে ওঠে এবং এইভাবে নিপীড়িত শ্রেণির দমন ও শোষণের নতুন হাতিয়ার লাভ করে। যেমন, প্রাচীন যুগে রাষ্ট্র ছিল সর্বোপরি ক্রীতদাসদের দমন করার জন্যে দাস-মালিকদের রাষ্ট্র, সামন্ততান্ত্রিক রাষ্ট্র ছিল ভূমিদাস ও ক্রীতদাসদের বশে রাখার জন্যে অভিজাত সম্প্রদায়ের সংস্থা এবং আধুনিক প্রতিনিধিত্বমূলক রাষ্ট্র হচ্ছে পুঁজিপতি শ্রেণি কর্তৃক মজুরি-শ্রমিক শোষণের হাতিয়ার’ (এঙ্গেলসের লেখা ‘পরিবার, ব্যক্তিগত মালিকানা ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি’, যেখানে তিনি নিজের ও মার্কসের দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থিত করেছেন)। এমনকি, যে গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র বুর্জোয়া রাষ্ট্রের সবচেয়ে স্বাধীন ও প্রগতিশীল রূপ সেটিও এই বিষয়টিকে কোনও মতেই পরিহার করতে পারে না, বদলায় শুধু তার চেহারা (সরকার ও স্টক এক্সচেঞ্জের সঙ্গে সম্পর্ক, আমলা ও সংবাদপত্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ দুর্নীতি ইত্যাদি)। শ্রেণির বিলোপ ঘটানোর পথে সমাজতন্ত্র রাষ্ট্রেরও বিলোপ ঘটাবে। ‘অ্যান্টি-ডুরিং’য়ে এঙ্গেলস লিখেছেনঃ ‘প্রথম যে কাজটির মাধ্যমে রাষ্ট্র নিজেকে সামগ্রিক ভাবে সমাজের প্রকৃত প্রতিনিধি হিসাবে দাঁড় করায়–অর্থাৎ সমাজের নামে উৎপাদনের উপকরণগুলির দখল নেওয়া–একই সঙ্গে তা হয়ে দাঁড়ায় রাষ্ট্র হিসাবে তার শেষ স্বাধীন কাজ। সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ ক্রমেই একের পর এক ক্ষেত্রে অনাবশ্যক হয়ে ওঠে ও তার পরে আপনা থেকেই বন্ধ হয়ে যায়। মানুষের শাসনের জায়গায় আসে বস্তুর পরিচালনা এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণের অভিমুখ। রাষ্ট্রের ‘উচ্ছেদ’ হয় না, তা শুকিয়ে মরে যায়’ (এঙ্গেলস, অ্যান্টি ডুরিং, তৃতীয় অধ্যায়, দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ)। ‘যে সমাজ উৎপাদনকে সংগঠিত করবে উৎপাদকদের স্বাধীন ও সমান সহযোগের ভিত্তিতে, তা সমগ্র রাষ্ট্রযন্ত্রকে পাঠিয়ে দেবে তার যোগ্য স্থানেঃ পুরাতত্ত্বের যাদুঘরে, চরকা ও ব্রোঞ্জের কুড়ূলের পাশে’ (এঙ্গেলস, ‘পরিবার, মালিকানা ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি’)।

পরিশেষে, উচ্ছেদকারীদের উচ্ছেদ করার যুগেও যে ক্ষুদ্র চাষিরা থেকেই যাবে, তাদের প্রতি মার্কসের সমাজতন্ত্রের দৃষ্টিভঙ্গির প্রশ্নে এঙ্গেলসের একটি উক্তির উল্লেখ করা প্রয়োজন, যেখানে তিনি মার্কসের মতামত উপস্থিত করেছেনঃ ‘…আমরা যখন রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করব, তখন ছোট কৃষকদের জোর করে উৎখাত (ক্ষতিপূরণ সহ বা বিনা ক্ষতিপূরণে) করার কথা আমরা চিন্তাতেও স্থান দেব না, কিন্তু বড়ো বড়ো ভূস্বামীদের বেলায় সেই পথই আমাদের নিতে হবে। ছোট কৃষকদের ক্ষেত্রে আমাদের কর্তব্য হল, প্রথমত, তাদের ব্যক্তিগত উৎপাদন ও ব্যক্তিগত সম্পত্তিকে সমবায় প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করা, জবরদস্তি করে নয়, উদাহরণ দেখিয়ে এবং এই উদ্দেশ্যে সামাজিক সাহায্যের প্রস্তাব করে। তখন নিশ্চয় ছোট কৃষককে তার ভবিষ্যৎ সুবিধা দেখিয়ে দেওয়ার প্রচুর সুযোগ আমরা পাব, যে সুবিধা এমনকি আজই তার কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠার কথা’ (এঙ্গেলস, ‘পশ্চিমের কৃষি সমস্যা’, ‘দি পিজ্যান্ট কোয়েশ্চেন ইন ফ্রান্স অ্যান্ড জার্মানি’, আলেক্সেয়েভার প্রকাশন, রুশ অনুবাদে ভুলভ্রান্তি আছে। মূল লেখাটি আছে নিউ জেইৎ পত্রিকায়–জার্মান সোসাল ডেমোক্রেটিক পার্টির একটি তত্ত্বগত সাময়িক পত্রিকা)।

সর্বহারার শ্রেণিসংগ্রামের রণকৌশল

বিপ্লবী কার্যকলাপের ব্যবহারিক দিকটির গুরুত্ব বুঝতে না পারা এবং তার বাস্তব পরিস্থিতি নির্ধারণ করতে না পারাই যে পূর্বতন বস্তুবাদের একটি প্রধান ত্রুটি সেটা ১৮৪৪-১৮৪৫ সালেই মার্কসের কাছে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠায় তিনি তাঁর তাত্ত্বিক কাজকর্মের সঙ্গে সঙ্গে সর্বহারার শ্রেণিসংগ্রামের রণকৌশলগত সমস্যাগুলির প্রতিও সারা জীবন অখণ্ড মনোযোগ দিয়ে এসেছেন। এ বিষয়ে বিপুল উপাদান মার্কসের সমস্ত লেখাতেই পাওয়া যাবে, বিশেষ করে পাওয়া যাবে ১৯১৩ সালে চার খণ্ডে প্রকাশিত এঙ্গেলসের সঙ্গে তাঁর পত্রাবলিতে। এই সব উপাদান সংগ্রহ ও সুবিন্যস্ত করা, সেগুলি খুঁটিয়ে দেখা ও বিশ্লেষণের কাজটি বহু বাকি। এ ক্ষেত্রে তাই শুধু সবচেয়ে সাধারণ ও সংক্ষিপ্ত মন্তব্যেই সীমাবদ্ধ থেকে কেবল এইটুকুর ওপর জোর দিতে চাই যে, বস্তুবাদের মধ্যে এই দিকটা না থাকলে মার্কস তাকে ন্যায্যতই গণ্য করতেন আধখেঁচড়া, একপেশে ও নিষ্প্রাণ বলে। সর্বহারা শ্রেণির রণকৌশলের মূল কর্তব্য মার্কস নির্ণয় করেছিলেন তাঁর বস্তুবাদী-দ্বান্দ্বিক বিশ্ববীক্ষার সবকটি মৌলিক নীতির সঙ্গে পূর্ণ সঙ্গতি রেখে। কোনও নির্দিষ্ট সমাজের অগ্রণী শ্রেণির সঠিক রণকৌশল নির্ধারণের ভিত্তি হল, ব্যতিক্রমহীনভাবে সেই সমাজের সকল শ্রেণির পারস্পরিক সম্পর্কের সামগ্রিক যোগফলকে খুঁটিয়ে বিচার করা, পাশাপাশি সেই সমাজের বিকাশের বাস্তব পর্যায় এবং তার সঙ্গে অন্যান্য সমাজের পারস্পরিক সম্পর্কের বিচার। তাতে সমস্ত শ্রেণি ও সকল দেশকে দেখতে হয় স্থিতিশীল ভাবে নয়, গতিশীল ভাবে, অর্থাৎ গতিহীন অবস্থায় নয়, গতির মধ্যে (বিদ্যমান প্রত্যেকটি শ্রেণির অর্থনৈতিক অবস্থার দ্বারা যার নিয়মকানুন নির্ধারিত হয়)। আবার গতিকেও দেখা হয় শুধু অতীতের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, ভবিষ্যতের দৃষ্টিকোণ থেকেও, সেই সঙ্গে তাকে বুঝতে হবে দ্বান্দ্বিকভাবে, যাঁরা শুধু ধীর পরিবর্তনটুকুই দেখেন সেই ‘বিবর্তনবাদীদের’ স্থূল ধারণা অনুসারে নয়। এঙ্গেলসকে এক চিঠিতে মার্কস লিখেছিলেন, ‘বৃহৎ ঐতিহাসিক বিকাশের ক্ষেত্রে বিশ বছর হয়ে দাঁড়ায় এক একটি দিনের সমান, যদিও পরে এমন দিনও আসতে পারে যখন তার এক-একটি দিনেই এঁটে যায় বিশ বছর’ (‘পত্রাবলি’, খণ্ড ৩, ১৮৬৩ সালে ৯ এপ্রিল এঙ্গেলসকে লেখা মার্কসের চিঠি)। বিকাশের প্রত্যেকটি পর্যায়ে, প্রত্যেকটি মুহূর্তে সর্বহারার রণকৌশলের উচিত মানবেতিহাসের এই অবশ্যম্ভাবী এবং বাস্তব দ্বান্দ্বিকতাকে বিবেচনায় রাখা। এই রণকৌশলকে এগিয়ে যেতে হবে একদিকে, রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা বা শম্বুকগতিতে চলা তথাকথিত ‘শান্তিপূর্ণ’ বিকাশের যুগকে ব্যবহার করে অগ্রসর শ্রেণির চেতনা, শক্তি ও সংগ্রামী ক্ষমতাকে বাড়িয়ে তোলার কাজে। অন্যদিকে, এই ব্যবহারের ফলকে পুরোপুরি পরিচালিত করতে হবে এই শ্রেণির আন্দোলনের ‘চূড়ান্ত লক্ষ্যের’ দিকে। সেই মহান দিন– যখন এক একটি দিনেই সাধিত হয় বিশ বছরের লক্ষ্য, তা সাধনের কার্যকরী দক্ষতা অর্জনের জন্য এগিয়ে যেতে হবে অগ্রগামী শ্রেণিকে। এই প্রসঙ্গে মার্কসের দুটি যুক্তি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণঃ এর একটি আছে ‘দর্শনের দারিদ্র্য’ গ্রন্থে, সর্বহারার অর্থনৈতিক সংগ্রাম ও অর্থনৈতিক সংগঠন প্রসঙ্গে, অন্যটি আছে ‘কমিউনিস্ট ইশতেহার’-এ, সর্বহারার রাজনৈতিক কর্তব্য প্রসঙ্গে। প্রথমটিতে বলা হয়েছেঃ ‘বৃহদাকার শিল্পের ফলে একজায়গায় পরস্পর অপরিচিত বহু লোক জড়ো হয়। প্রতিযোগিতার ফলে তাদের পরস্পরের স্বার্থ আলাদা হয়ে যায়। কিন্তু মজুরির হার রক্ষা করা– মালিকের বিরুদ্ধে এই সাধারণ স্বার্থ তাদের ঐক্যবদ্ধ করে তোলে প্রতিরোধ ও সম্মিলনের একই সাধারণ চিন্তায় … প্রথম দিকে বিচ্ছিন্ন ধরনের এই জোট রূপ নেয় গোষ্ঠীতে এবং পুঁজির নিরবচ্ছিন্ন ঐক্যের বিরুদ্ধে তাদের এই সংঘবদ্ধতাকে বাঁচিয়ে রাখা মজুরদের পক্ষে এমনকি তাদের মজুরি রক্ষার চেয়েও বেশি জরুরি হয়ে দাঁড়ায় … এই সংগ্রামের মধ্যে– সত্যপ্রতিষ্ঠার এই গৃহযুদ্ধে– আসন্ন লড়াইয়ের প্রয়োজনীয় উপাদান হল ঐক্যবদ্ধ ও বিকশিত হওয়া। আর এই পর্যায়ে এসে সংঘবদ্ধতা গ্রহণ করে রাজনৈতিক চরিত্র’ (কার্ল মার্কস, ‘দর্শনের দারিদ্র’)। এর মধ্য দিয়ে আমরা পাই আগামী কয়েক দশকের অর্থনৈতিক সংগ্রাম ও ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের কর্মসূচি ও রণকৌশল। ‘আসন্ন লড়াইয়ের উদ্দেশ্যে’ সর্বহারার শক্তিপ্রস্তুতির যে সুদীর্ঘ পর্যায় চলে, তার রণকৌশল ও কর্মসূচিও এখানে পাওয়া যায়। ব্রিটিশ শ্রমিক আন্দোলনের যে অসংখ্য দৃষ্টান্ত মার্কস ও এঙ্গেলস দিয়েছেন সেগুলিকে এর সঙ্গে মিলিয়ে পড়তে হবেঃ কেমন করে শিল্পজনিত ‘সমৃদ্ধি’র ফলে চেষ্টা হয় ‘শ্রমিককে কিনে নেবার’ (এঙ্গেলসের সঙ্গে পত্রাবলি’, খণ্ড ১, ১৮৫১-র ৫ ফেব্রুয়ারি এঙ্গেলসকে লেখা মার্কসের চিঠি), সংগ্রাম থেকে তাদের বিচ্যুত করার, কেমন করে এই সমৃদ্ধির ফলে সাধারণভাবে ‘মজুরেরা মনোবল হারায়’ (খণ্ড ২, ১৮৫৭-র ১৭ ডিসেম্বর মার্কসকে লেখা এঙ্গেলসের চিঠি)। ব্রিটিশ সর্বহারা কেমন করে ‘বুর্জোয়া বনে যায়’– ‘সবার চেয়ে বুর্জোয়া এই জাতিটার’ (ইংরেজদের) ‘ইচ্ছা যেন বুর্জোয়া ব্যবস্থার সাথে একটি বুর্জোয়া অভিজাত শ্রেণি এবং বুর্জোয়া প্রলেতারিয়েতও গড়ে তোলা’ (খণ্ড ২, ১৮৫৮-র ৭ অক্টোবর মার্কসকে লেখা এঙ্গেলসের চিঠি)। কেমন করে ব্রিটিশ সর্বহারার ‘বিপ্লবী উদ্দীপনা’ লোপ পায় (খণ্ড ৩, ১৮৬৩-র ৮ এপ্রিল মার্কসকে লেখা এঙ্গেলসের চিঠি)। ব্রিটিশ শ্রমিকরা ‘এই আপাতদৃষ্ট বুর্জোয়া সংক্রমণ থেকে কী ভাবে নিজেদের মুক্ত করতে পারে’ তার জন্যে কেন অপেক্ষা করতে হবে দীর্ঘ দিন। (খণ্ড ৩, ১৮৬৩-র ৯ এপ্রিল এঙ্গেলসকে লেখা মার্কসের চিঠি)। ব্রিটিশ শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে কেমন করে ‘চার্টিস্টসুলভ তেজের’ অভাব ঘটছে (১৮৬৬; খণ্ড ৩, ১৮৬৬-র ২ এপ্রিল এঙ্গেলসকে মার্কসের চিঠি) (চার্টিজমঃ উনিশ শতকের চতুর্থ ও পঞ্চম দশকে ব্রিটিশ শ্রমিকদের প্রথম বৈপ্লবিক গণআন্দোলন। চার্টিস্টরা পার্লামেন্টের কাছে তাদের আবেদনপত্র ‘জনগণের চার্টার’ পেশ করেছিল এবং লড়েছিল সর্বজনীন ভোটাধিকার, পার্লামেন্টের প্রার্থীদের ভূ-সম্পত্তিগত যোগ্যতার নিয়ম লোপ করা ইত্যাদি দাবিদাওয়া নিয়ে। বহু বছর ধরে চলা এই আন্দোলনে সামিল হয়েছিল লক্ষ লক্ষ শ্রমিক ও কারিগর। সরকার চার্টিস্টদের উপর নিষ্ঠুর প্রতিশোধ নিয়েছিল। আন্দোলন দমন করেছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের পরবর্তী বিকাশে এর বিরাট প্রভাব পড়েছিল)। কী ভাবে ব্রিটিশ শ্রমিক-নেতৃবৃন্দ গড়ে উঠছে ‘র্যাডিকাল বুর্জোয়া ও শ্রমিকের’ মাঝামাঝি একটা ধরন হিসেবে (হোলিওক প্রসঙ্গে, খণ্ড ৪, পৃঃ ২০৯)। কীভাবে সর্বহারার উপর ইংল্যান্ডের একচেটিয়া অধিকারের প্রভাব পড়ছে এবং যতদিন পর্যন্ত এই অধিকার না ভাঙছে, ততদিন পর্যন্ত আর ‘ব্রিটিশ শ্রমিকদের নড়াচড়া করানো যাবে না’ (খণ্ড ৪, ১৮৬৯-এর ১৯ নভেম্বর এবং ১৮৮১-র ১১ আগস্ট মার্কসকে লেখা এঙ্গেলসের চিঠি)। শ্রমিক আন্দোলনের সাধারণ ধারা (ও পরিণতি) প্রসঙ্গে অর্থনৈতিক সংগ্রামের রণকৌশলকে এখানে দেখা হয়েছে একটি চমৎকার বিস্তৃত, সর্বাঙ্গীণ, দ্বান্দ্বিক এবং যথার্থ বিপ্লবী দষ্টিকোণ থেকে।

রাজনৈতিক সংগ্রামের রণকৌশল প্রসঙ্গে ‘কমিউনিস্ট ইশতেহার’ হাজির করেছে মার্কসবাদের মূল নীতিঃ ‘শ্রমিক শ্রেণির আশু লক্ষ্য ও স্বার্থসাধনের জন্যে কমিউনিস্টরা লড়াই করে, কিন্তু বর্তমানের এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তারা ভবিষ্যৎ আন্দোলনকে তুলে ধরে ও তাকে রক্ষা করে।’ সে জন্যই ১৮৪৮ সালে মার্কস সমর্থন জানিয়েছিলেন পোল্যান্ডের ‘কৃষি বিপ্লবের’ পার্টিকে, ‘সেই পার্টি, যা ১৮৪৬ সালে ক্রাকোভে অভ্যুত্থান ঘটায়’ (ক্রাকোভ প্রজাতন্তে্র জাতীয় মুক্তির জন্য গণতান্ত্রিক অভ্যুত্থান হয়। ১৮১৫ থেকে এই প্রজাতন্ত্র অস্ট্রিয়া, প্রুশিয়া ও রাশিয়ার যুক্ত নিয়ন্ত্রণে ছিল। বিদ্রোহীরা একটি জাতীয় সরকার স্থাপন করেছিল। সেই সরকার সমস্ত সামন্ততান্ত্রিক সেবাকর্মের বিলুপ্তি এবং খালাসিপণ ছাড়াই কৃষকদের জমি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ঘোষণা করেছিল বিভিন্ন জাতীয় কর্মশালা স্থাপিত হবে যেখানে মজুরির হার হবে উঁচু, চালু করা হবে সমস্ত নাগরিকের সমান অধিকার। এই অভ্যুত্থানটিও দমন করা হয়েছিল)। জার্মানিতে ১৮৪৮-১৮৪৯ সালে মার্কস চরমপন্থী বিপ্লবী গণতন্ত্রীদের সমর্থন করেছিলেন এবং রণকৌশল সম্পর্কে তখন যা বলেছিলেন তা পরে কখনওপ্রত্যাহার করেননি। তাঁর দৃষ্টিতে জার্মান বুর্জোয়ারা হল এমন লোক, যারা ‘জনগণের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা এবং পুরনো সমাজের রাজমুকুটধারী প্রতিনিধিদের সঙ্গে আপস করার জন্যে একেবারে প্রথম থেকেই ঝুঁকেছে’ (কৃষকসম্প্রদায়ের সঙ্গে মৈত্রীতেই কেবল বুর্জোয়াদের কর্তব্যের সামগ্রিক সাধন সম্ভব হতে পারত)। বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক বিপ্লবের যুগে জার্মান বুর্জোয়াদের শ্রেণিগত অবস্থান সম্পর্কে মার্কস প্রদত্ত সামগ্রিক বিশ্লেষণের সারটুকু এখানে তুলে দেওয়া গেল, প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, এই বিশ্লেষণ সেই বস্তুবাদের একটি নিদর্শন, যাতে সমাজকে গতির মধ্যে দেখা হয় এবং তা শুধু পশ্চাদমুখী অভিমুখে নয়। বিশ্লেষণগুলি হল– ‘…না আছে নিজের ওপর আস্থা, না আছে জনগণের ওপর বিশ্বাস, ওপরে যারা রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে অসন্তোষ, নিচের তলার সামনে কাঁপুনি, … বিশ্বঝটিকায় ভীত, কোনও দিকেই উদ্যম নেই, আর সব দিকেই অন্যের কৃতিত্ব চুরি… উদ্যোগহীন। … অভিশপ্ত এক বৃদ্ধ যে বইছে একটা নবীন ও বলিষ্ঠ জাতির প্রথম যৌবনোদ্দীপনাকে নিজের জরাগ্রস্ত স্বার্থে চালিত করার শাস্তি…’ (নিউ রাইনসে জাইতুং ১৮৪৮; ‘সাহিত্যিক উত্তরাধিকার’, খণ্ড ৩, কার্ল মার্কসঃ ‘বুর্জোয়া শ্রেণি এবং প্রতিবিপ্লব’, দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ)। কুড়ি বছর পরে এঙ্গেলসকে লেখা চিঠিতে (খণ্ড ৩, পৃঃ ২২৪) মার্কস ঘোষণা করেন, ১৮৪৮ সালের বিপ্লব ব্যর্থ হয়েছিল। কারণ, মুক্তির আশায় সংগ্রামের বদলে বুর্জোয়ারা দাসত্ব সহ শান্তিই বাঞ্ছনীয় মনে করেছিল। ১৮৪৮-১৮৪৯ সালের বিপ্লবী যুগ শেষ হলে মার্কস বিপ্লব নিয়ে খেলা করার যে কোনও প্রচেষ্টার বিরোধিতা করেছিলেন (শাপার ও ভিলিখ এবং তাদের সঙ্গে সংগ্রাম) এবং নতুন যুগে কাজ করতে পারার দক্ষতার উপর জোর দিয়েছিলেন, যা ছিল আপাত ‘শান্তিপূর্ণভাবে’ নতুন বিপ্লবের প্রস্তুতি। যে শক্তিতে সে কাজ চালানোর কথা মার্কস ভেবেছিলেন তা দেখা যাবে ঘোরতর প্রতিক্রিয়ার কালে, ১৮৫৬ সালে জার্মানির অবস্থা সম্পর্কে তাঁর এই মূল্যায়নে– ‘জার্মানিতে কৃষক সমরের দ্বিতীয় সংস্করণের মতো কোনও কিছু দিয়ে সর্বহারা বিপ্লবকে সাহায্য করতে পারার সম্ভাবনার ওপরেই সব কিছু নির্ভর করবে’ (‘এঙ্গেলসের সঙ্গে পত্রাবলি’, খণ্ড ২, ১৮৫৬-র ১৬ এপ্রিল এঙ্গেলসকে লেখা মার্কসের চিঠি)। জার্মানিতে গণতান্ত্রিক (বুর্জোয়া) বিপ্লব সমাধা না হওয়া পর্যন্ত মার্কস সমাজতান্ত্রিক সর্বহারার রণকৌশলের প্রতি তাঁর সমস্ত মনোযোগ নিবিষ্ট করেছিলেন কৃষক-সম্প্রদায়ের গণতান্ত্রিক উদ্যম বিকাশের জন্য। তাঁর মতে লাসাল ‘প্রুশীয়ার স্বার্থে শ্রমিক আন্দোলনের প্রতি কার্যক্ষেত্রে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন (খণ্ড ৩, ১৮৬৫-র ২৭ জানুয়ারি মার্কসকে লেখা এঙ্গেলসের চিঠি), জমিদার ও প্রুশীয় জাতীয়তাবাদের প্রতি লাসালের প্রশ্রয়ই এর কারণ। সংবাদপত্রে একটি যুক্ত বিবৃতি দেওয়া প্রসঙ্গে এঙ্গেলস মার্কসের সঙ্গে মতবিনিময় করতে গিয়ে ১৮৬৫ সালে লিখেছিলেনঃ ‘কৃষিনির্ভর দেশে, সামন্ত অভিজাতদের ‘চাবুকের তলায়’ গ্রাম্য মজুরদের পিতৃতান্ত্রিক ‘শোষণের’ কথা ভুলে গিয়ে শিল্প শ্রমিকদের নামে শুধু, বুর্জোয়াদেরই আক্রমণ করাটা অতি নীচ কাজ’ (খণ্ড ৩, ১৮৬৫-র ৫ ফেব্রুয়ারি মার্কসকে এঙ্গেলসের চিঠি)। ১৮৬৪-১৮৭০ সালে যখন জার্মানিতে শেষ হয়ে আসছিল বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক বিপ্লব সমাধার যুগ, ওপর থেকে যে-কোনও পন্থায় বিপ্লবটা সম্পূর্ণ করার জন্যে প্রুশীয়ার ও অস্ট্রিয়ার শোষক শ্রেণিগুলির সংগ্রামের যুগ, তখন মার্কস শুধু যে বিসর্মাকের সঙ্গে দহরম-মহরমকারী লাসালেরই নিন্দা করেন তা নয়, লিবনেখটের ত্রুটিও সংশোধন করে দেন–যিনি ‘অস্ট্রীয় গৌরববাদ’ (অস্ট্রিয়ফিলিসিজম) ও গোষ্ঠীগত বিশেষত্বের গৌরবের (পার্টিকুলারিজম) সমর্থনে ঝুঁকেছিলেন। মার্কস দাবি করলেন এমন বিপ্লবী রণকৌশল–যা বিসমার্ক ও অস্ট্রোফিল উভয়ের সঙ্গে সংগ্রামে হবে সমান নির্মম, যা ‘বিজয়ীদের’–প্রুশীয় জমিদারদের তোয়াজ করবে না। বরং প্রুশীয় সামরিক জয়লাভের ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতি সত্ত্বেও তাদের বিরুদ্ধেই অবিলম্বে নতুন করে বিপ্লবী সংগ্রাম শুরু করবে (‘এঙ্গেলসের সঙ্গে পত্রাবলি’, খণ্ড ৩, ১৮৬৩-র ১১ জুন ও ২৪ নভেম্বর, ১৮৬৪-র ৪ সেপ্টেম্বর, ১৮৬৫-র ২৭ জানুয়ারি, ১৮৬৭-র ২২ অক্টোবর ও ৬ ডিসেম্বর মার্কসকে লেখা এঙ্গেলসের চিঠি এবং ১৮৬৩-র ১২ জুন, ১৮৬৪-র ১০ ডিসেম্বর, ১৮৬৫-র ৩ ফেব্রুয়ারি ও ১৮৬৭-র ১৭ ডিসেম্বর এঙ্গেলসকে লেখা মার্কসের চিঠি)। আন্তর্জাতিকের ১৮৭০ সালের ৯ সেপ্টেম্বরের বিখ্যাত অভিভাষণে অকাল অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে মার্কস ফ্রান্সের সর্বহারাদের হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। তা সত্তে্বও যখন অভ্যুত্থান ঘটে গেল (১৮৭১) তখন মার্কস সোৎসাহে ‘স্বর্গ জয়ী অভিযাত্রী’ জনগণের বিপ্লবী উদ্যোগকে অভিনন্দিত করেছিলেন (কুগেলমানের কাছে মার্কসের চিঠি, ১৮৭১-এর ১২ এপ্রিল)। মার্কসের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে, অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রের মতো এই ক্ষেত্রেও, অধিকৃত অবস্থান ছেড়ে দেওয়া কিংবা, বিনা যুদ্ধে আত্মসমর্পণের চেয়ে বরং বিপ্লবী সংগ্রামের পরাজয় সর্বহারা শ্রেণির় সংগ্রামের সাধারণ গতি ও পরিণতির পক্ষে ছিল কম ক্ষতিকর। এরকম আত্মসমর্পণে সর্বহারাদের মনোবল ভেঙে যেত, সংগ্রামী শক্তি হ্রাস পেত। রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা ও বুর্জোয়া আইনের প্রাধান্যের যুগে সংগ্রামের আইনসঙ্গত উপায়গুলি প্রয়োগের মূল্য মার্কস পুরোপুরি অনুভব করেছিলেন এবং ১৮৭৭ ও ১৮৭৮ সালে সমাজতন্ত্র-বিরোধী আইন (সমাজতন্ত্র বিরোধী জরুরি আইনে জার্মানিতে ১৮৭৮-‘৯০ পর্যন্ত সোসাল ডেমোক্রেটিক পার্টির সমস্ত কিছু নিষিদ্ধ করা হয়েছিল) পাশ হয়ে যাওয়ার পর তিনি মস্ট-এর ‘বিপ্লবী বুলির’ তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। কিন্তু সমাজতন্ত্র-বিরোধী আইনের জবাবে যখন স্বীকৃত সোসাল ডেমোক্রেটিক পার্টির পক্ষ থেকে সঙ্গে সঙ্গে স্থির প্রতিজ্ঞায়, দৃঢ়তা ও বৈপ্লবিক মানসিকতার সাথে আইন ভঙ্গকারী সংগ্রাম গ্রহণের মতো তৎপরতা দেখা গেল না, তখন এই পার্টিতে যে সুবিধাবাদ সাময়িকভাবে মাথা তুলেছিল তাকেও মার্কস যে ভাবে আক্রমণ করেছিলেন সেটা কম তীব্র ছিল না (‘এঙ্গেলসের সঙ্গে পত্রাবলি’, খণ্ড ৪, ১৮৭৭-এর ২৩ জুলাই, ১ আগস্ট ও ১৮৭৯-র ১০ সেপ্টেম্বর এঙ্গেলসকে মার্কসের চিঠি এবং ১৮৭৯-র ২০ আগস্ট ও ৯ সেপ্টেম্বর মার্কসকে লেখা এঙ্গেলসের চিঠি। জরগের কাছে লেখা চিঠিগুলিও দ্রষ্টব্য)।

লিখিতঃ জুলাই – নভেম্বর, ১৯১৪ (শেষ)

গণদাবী ৭৪ বর্ষ ২৪ সংখ্যা ২৮ জানুয়ারি ২০২২