Home / খবর / মনীষীদের নাম আউড়ে ভোট কুড়োতে চায় বিজেপি

মনীষীদের নাম আউড়ে ভোট কুড়োতে চায় বিজেপি

থমকে যাওয়া বিজেপির বিলাসবহুল বাসের ‘রথে’ নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ, দিলীপ ঘোষের সাথে স্থান পেয়েছে রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, সুভাষচন্দ্রের ছবি৷

আচ্ছে দিন, নোট বাতিল, কালো টাকা উদ্ধার, সব কা সাথ সবকা বিকাশ, বছরে দুই কোটি চাকরি সবই ‘জুমলা, নিছকই ভোট প্রচার বলে ধরা পড়ে যাচ্ছে দেখে বিজেপি আঁকড়ে ধরেছে সাম্প্রদায়িকতাকেই৷ কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে বড় মূর্তি, রামনাম থেকে হনুমানের জাত বিচার কোনও ফন্দিতেই বিক্ষুব্ধ মানুষের মন ঠাণ্ডা হচ্ছে না, বরং পাঁচ রাজ্যের ভোটে শোচনীয় পরাজয় দেখে বিজেপি নেতারা আগামী লোকসভা ভোটে বাংলার মন জয়ে তিন মনীষীকে আশ্রয় করে কিছু সহানুভূতি কুড়োতে চান৷ বিজেপির ভোটব্যাঙ্ক তৈরির কর্মসূচিতে তাদের তিন নেতার সাথে রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, সুভাষচন্দ্র কেন? বিজেপি যে ঘৃণার রাজনীতিকে আমদানি করছে সেই উগ্র–হিন্দুত্ববাদ, অন্ধ জাতীয়তাবাদের ভাবনার সাথে রবীন্দ্রনাথ, নেতাজি, এমনকী হিন্দু ধর্মের অন্যতম প্রবক্তা বিবেকানন্দের চিন্তার আদৌ কোনও মিল নেই৷ বরং বিজেপির ‘ভারতীয়ত্ব’ ভারতীয় নবজাগরণের মনীষীদের চিন্তার ঠিক বিপরীত!

বিজেপির রাজনীতি যার আদর্শে চলে সেই আরএসএস বলে, ‘‘হিন্দুস্থানের সমস্ত অহিন্দু মানুষ হিন্দুর ভাষা ও সংস্কৃতি গ্রহণ করবে ও পবিত্র বলে জ্ঞান করবে, হিন্দু জাতির গৌরবগাথা ভিন্ন অন্য কোনও ধারণাকে প্রশ্রয় দেবে না৷…এক কথায় তারা হয় বিদেশি হয়ে থাকবে, না হলে হিন্দু জাতির দেশে তারা থাকবে সম্পূর্ণভাবে হিন্দুদের অধীনস্থ হয়ে, কোনও দাবি ছাড়া, কোনওরকম সুবিধা ছাড়া ও কোনওরকম পক্ষপাতমূলক ব্যবস্থা ছাড়া৷ এমনকি নাগরিক অধিকারও তাদের থাকবে না’’(গোলওয়ালকর, উই অর আওয়ার নেশনহুড ডিফাইন্ড)৷ ‘‘হিন্দু সমাজে মিশে যেতে অস্বীকার করে বিদেশি থেকে গেছে যে মুসলমানরা, তাদের হয় দেশ থেকে বহিষ্কার করতে হবে অথবা পদানত করে রাখতে হবে’’(ওই)৷ আরও বলেছেন, ‘‘আমাদের দেশের হাজার হাজার বছরের ইতিহাস এই কথাই বলে যে, সব কিছু করেছে একমাত্র হিন্দুরা৷ এর অর্থ কেবল হিন্দুরাই এই মাটির সন্তান হিসেবে এখানে বসবাস করেছে’’ (গোলওয়ালকর, চিন্তাচয়ন, ২য় খণ্ড, পৃঃ ১২৩–২৪)৷ তাদের অন্যতম গুরু বিনায়ক দামোদর সাভারকর, যিনি ব্রিটিশের জেল থকে ছাড়া পেতে সারা জীবন তাদের সেবক হয়ে থাকার মুচলেকা দিয়েছিলেন, তিনি বলছেন, একমাত্র হিন্দুদেরই জন্মস্থান এবং আধ্যাত্মিক কেন্দ্র ভারতে অবস্থিত৷ তাই তারাই এ দেশের নাগরিক, ক্রিশ্চান, মুসলিম ইত্যাদি ধর্মাবলম্বীরা নন৷ এদেশে তাদের থাকতে হবে হিন্দুদের পদানত হয়েই৷

এই যাদের ‘ভারতীয়ত্ব’ সম্বন্ধে ধারণা তারা বিবেকানন্দকে মানতে পারে? ধর্মীয় পুরুষ হয়েও বিবেকানন্দ বলেছেন, ‘‘পূর্বকালে ‘হিন্দু’ শব্দে (সিন্ধু নদের) অপর তীরের অধিবাসীগণকে বুঝাইত৷ তখন ওই শব্দের একটা সার্থকতা ছিল৷ কিন্তু এখন উহা নিরর্থক হইয়া দাঁড়াইয়াছে৷ কারণ সিন্ধু নদের পূর্বদিকে এখন নানা ধর্মাবলম্বী নানা জাতীয় লোক বাস করে৷’’ (বাণী ও রচনা, ৫ম খণ্ড, ২৬৫ পৃষ্ঠা)৷ রবীন্দ্রনাথের কথায়, ‘‘বিধাতা কি তাহাকে এ কথা বলিয়া দিয়াছেন যে, ভারতবর্ষের ইতিহাস হিন্দুর ইতিহাস? হিন্দুর ভারতবর্ষে যখন রাজপুত রাজারা পরস্পর মারামারি কাটাকাটি বীরত্বের আত্মঘাতী অভিমান প্রচার করিতেছিলেন, সেই সময় ভারতবর্ষের সেই বিচ্ছিন্নতার ফাঁক দিয়া মুসলমান এদেশে প্রবেশ করিল, চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িল এবং পুরুষানুক্রমে জন্মিয়া ও মরিয়া এ দেশের মাটিকে আপন করিয়া লইল’’ (সমাজ)৷ তাঁর মতে, ‘‘মুসলমান রাজত্ব ভারতবর্ষেই প্রতিষ্ঠিত ছিল৷ বাহিরে তাহার মূল ছিল না৷ এই জন্য মুসলমান ও হিন্দু সম্প্রদায় পরস্পর জড়িত হইয়াছিল৷ পরস্পরের মধ্যে স্বাভাবিক আদানপ্রদানের সহস্র পথ ছিল৷ এইজন্য মুসলমানের সংশ্রবে আমাদের সঙ্গীত, সাহিত্য, শিল্পকলা, বেশভূষা, আচার–ব্যবহার দুই পক্ষের যোগে নির্মিত হইয়া আসিয়াছিল’’ (ওই)৷

বিবেকানন্দ বলছেন, ‘‘মুসলমানদের ভারতাধিকার দরিদ্র পদদলিতদের উদ্ধারের কারণ হইয়াছিল৷ দারিদ্র্য ও অবহেলার জন্যই আমাদের এক পঞ্চমাংশ লোক মুসলমান হইয়া গিয়াছে’’ (বাণী ও রচনা– পঞ্চম খণ্ড, পৃঃ ১৪৭)৷ ‘‘…একথা বলা মূর্খতা যে তরবারির সাহায্যে তাহাদিগকে ধর্মান্তর গ্রহণে বাধ্য করা হইয়াছিল৷…বস্তুত জমিদার ও পুরোহিতবর্গের হস্ত হইতে নিষ্কৃতি লাভের জন্যই উহারা ধর্মান্তর গ্রহণ করিয়াছিল’’ (ওই,সপ্তম খণ্ড, পৃঃ ২২)৷ বিবেকানন্দের ধর্মবোধ আর বিজেপির হিন্দুত্ব কি এক? বিবেকানন্দ বলছেন, ‘‘তোমরা জিজ্ঞাসা করিতে পার মহম্মদের ধর্মে আবার ভাল কী থাকিতে পারে?… মুসলমান ধর্মে যথেষ্ট ভাল জিনিস আছে৷ মহম্মদ সাম্যবাদের আচার্য, তিনি মানবজাতির ভ্রাতৃভাব–সকল মুসলমানের ভ্রাতৃভাবের প্রচারক, ঈশ্বর প্রেরিত পুরুষ’’ (বাণী ও রচনা অষ্টম খন্ড, পৃঃ ১৯৪)৷ হিন্দু–মুসলমানে বৈরিতা ও হানাহানির বিপরীতে উদার ধর্মপ্রচারক বিবেকানন্দের আশা ছিল ‘‘মাতৃভূমির পক্ষে হিন্দু ও ইসলাম ধর্মরূপ এই দুই মহান মতের সমন্বয়’’ ঘটবে (ওই, পৃঃ১৯৫)৷ এতেই আশার আলো দেখেছিলেন তিনি৷ এই বিবেকানন্দকে মানলে বিজেপিকে মানা চলে কি?

রবীন্দ্রনাথের ভাবনা বলে, এদেশে পাশাপাশি বাস করা হিন্দু–মুসলমানের স্বার্থ এক৷ ‘‘ক্ষুধা মুসলমানকেও কাতর করে, প্রতিবেশী হিন্দুকেও রেহাই দেয় না৷ ক্ষুন্নিবারণ দু’সম্প্রদায়ই সমানে উপভোগ করে৷ এই ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্যই আমরা একসঙ্গে কাজ করতে পারি’’ (বিজলী পত্রিকার সম্পাদককে সাক্ষাৎকার)৷ নেতাজি সুভাচন্দ্র বসু বলছেন, ‘‘হিন্দু মুসলমানের স্বার্থ পরস্পরের পরিপন্থী, এ কথা যাঁরা বলেন, তাঁহারা খাঁটি কথা বলেন না৷…খাদ্যাভাব, বেকারিত্ব, জাতীয় শিল্পের অবক্ষয়, মৃত্যুর হার বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যহীনতা, শিক্ষার অভাব এগুলিই মূল সমস্যা৷…এই সকল বিষয়ে হিন্দু মুসলমানের স্বার্থ অভিন্ন’’(সুভাষ রচনাবলি, চতুর্থ খণ্ড)৷ তিনি আরও বলছেন, ‘‘হিন্দুরা ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায় বলিয়া ‘হিন্দুরাজ’–এর ধ্বনি শোনা যায়৷ এগুলি সর্বৈব অলস চিন্তা৷ দারিদ্র্যপীড়িত শ্রমজীবী জনসাধারণের, কৃষক শ্রমিকের স্বরাজ সর্বাধিক প্রয়োজন’’(ওই)৷ বিজেপির নীতি ঠিক এর বিপরীত৷ তারা হিন্দু ধর্মাবলম্বী সাধারণ মানুষের দুর্দশার কারণ হিসাবে মুসলমানদের দায়ী করে৷ নির্বিচারে এদেশের প্রকৃত নাগরিকদের শুধু ধর্মের কারণে বিদেশি–অনুপ্রবেশকা তকমায় দাগিয়ে দিয়ে হানাহানির পরিবেশ সৃষ্টিতে উদ্যত৷

আদর্শগতভাবে, রাজনৈতিকভাবে, আর্থিক নীতির দিক থেকে সম্পূর্ণ দেউলিয়া বিজেপির একমাত্র কর্মসূচি দাঁড়িয়েছে রামমন্দির নিয়ে জিগির তোলা৷ রামকে ঐতিহাসিক চরিত্র হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা৷ অথচ বিবেকানন্দ বলছেন, ধর্মের পৌরাণিক ভাগ তৈরি ‘‘অল্পবিস্তর কাল্পনিক জীবনী এবং অলৌকিক বিষয়সংক্রান্ত উপাখ্যান ও গল্পসমূহ’’ নিয়ে৷ অর্থাৎ একজন ধর্মীয় পুরুষ হয়েও তিনি পৌরাণিক কাহিনীকে ঐতিহাসিক সত্য বলে মনে করেন না (রচনাবলি, ১ম খণ্ড, পৃঃ৭৬)৷ তাই তিনি বলছেন, ‘‘রামায়ণের কথাই ধরুন– অলঙঘনীয় প্রামাণ্য গ্রন্থরূপে উহাকে মানিতে হইলেই যে রামের ন্যায় কেহ কখনও যথার্থ ছিলেন, স্বীকার করিতে হইবে, তাহা নহে’’(রচনাবলি, ৯ম খণ্ড,পৃঃ২৯৭)৷ বিজেপি কিন্তু রামের জন্মস্থান পর্যন্ত নিখুঁতভাবে খুঁজে বার করে ফেলেছে বিবেকানন্দ যদি আজ থাকতেন, বিজেপির এই ভোটের হিন্দুত্বকে দেখলে কী বলতেন তিনি?

আজাদ হিন্দ সরকারের ৭৫ বর্ষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী নেতাজির মতো টুপি পরে নিজেকে তাঁর ভক্ত প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন৷ কিন্তু সেই আজাদ হিন্দ বাহিনী নিয়ে তাঁর সংগঠন আরএসএসের ভূমিকা কী? বিপ্লবী ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী ‘জেলে ত্রিশ বছর ও পাক–ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম’ গ্রন্থে লিখেছেন, আজাদ হিন্দ বাহিনী যখন লড়ছে, সেই সময় তিনি আরএসএস প্রধান কেশবরাম হেডগেওয়ারের কাছে গিয়ে অনুরোধ করেছিলেন নেতাজির নেতৃত্বে ভারতে ব্রিটিশ বিরোধী অভ্যুত্থানের কাজে যেন সংঘ সাহায্য করে৷ কিন্তু হেডগেওয়ার তা করতে অস্বীকার করেন৷ কেন? আরএসএসের দৃষ্টিভঙ্গিতেই তার কারণ নিহিত আছে৷ তাদের নেতা গোলওয়ালকর বলছেন, ‘‘ব্রিটিশ বিরোধিতাকে ভাবা হচ্ছে দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের সমার্থক৷ এই প্রতিক্রিয়াশীল দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের সমগ্র স্বাধীনতা আন্দোলন, তার নেতৃবর্গ ও সাধারণ মানুষের উপর বিনাশকারী প্রভাব ফেলেছিল’’(চিন্তাচয়ন, ১ম খণ্ড, পৃ : ১২৫)৷ অর্থাৎ আর এস এস–এর কাছে ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন ছিল একটি ‘প্রতিক্রিয়াশীল আন্দোলন’৷ অসহযোগ আন্দোলনে যখন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, সুভাষচন্দ্র বসু থেকে শুরু করে হাজার হাজার দেশপ্রেমিক মানুষ গ্রেপ্তার হচ্ছেন, পুলিশের অত্যাচার সহ্য করছেন তখন আরএসএস নেতা হেডগেওয়ার বলছেন, ‘‘মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের ফলে দেশে উৎসাহ (জাতীয়তাবাদের জন্য) ক্রমে শীতল হয়ে যাচ্ছিল এবং এই আন্দোলন সৃষ্ট অশুভ শক্তিগুলি সমাজজীবনে বিপজ্জনকভাবে মাথা চাড়া দিচ্ছিল৷…অসহযোগের দুগ্ধ পান করে বেড়ে ওঠা যবন–সর্প তার বিষাক্ত নিঃশ্বাস নিয়ে দেশে দাঙ্গার প্ররোচনা দিচ্ছিল’’(ভিশিকার–১৯৭৯, পৃঃ ৭)৷ অর্থাৎ আরএসএসের মতে নেতাজি–দেশবন্ধুরাও ‘অশুভ শক্তির’ প্রতিভূ! বিনায়ক দামোদর সাভারকর ১৯৪১ সালে ভাগলপুরে হিন্দু মহাসভার ২৩তম অধিবেশনে বলেন, ‘‘ভারতের প্রতিরক্ষার কথা বলতে গেলে, ভারত সরকারের  সমস্ত যুদ্ধপ্রস্তুতিকে হিন্দুদের অবশ্যই দ্বিধাহীন চিত্তে সমর্থন করতে হবে৷…হিন্দুদের বৃহৎ সংখ্যায় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীতে যোগ দিতে হবে’’ (সাভারকর সমগ্র, খণ্ড–৬, মহারাষ্ট্র প্রান্তিক হিন্দু সভা, পুণা, ১৯৬৩, পৃ : ৪৬০)৷ প্রসঙ্গত তখন নেতাজি আজাদ হিন্দ বাহিনীকে নিয়ে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে জীবন–মরণ সংগ্রামে লিপ্ত৷ সেই সময় আরএসএস তাদের মুখপত্র অর্গানাইজারে কার্টুন এঁকেছিল রাবণের অন্যতম মুখ হলেন নেতাজি৷ আর আরএসএস তাঁকে তির মেরে হত্যা করছে৷ এদের উত্তরসূরী বলে গর্বিত বিজেপি এখন নেতাজির ছবি ব্যবহার করে ভোট চাইবে, তা মানতে হবে?

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে দেশ বিভাগের বিরোধিতা করে দেশের নেতাদের কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছিলেন যাতে দেশ বিভাগ হতে না পারে৷ কিন্তু তাঁর কথা অন্য নেতারাও যেমন কানে তোলেননি, তেমনই আরএসএস সহ হিন্দুত্ববাদীরা মুসলিম লিগের সাথে গলা মিলিয়ে এই দাবিকে উৎসাহই দিয়েছে৷ মুসলিম লিগ দেশভাগের দাবি তুলেছিল ১৯৪০ সালের মার্চ মাসে৷ কিন্তু তার ঢের আগে ১৯২৩ সালেই হিন্দু মহাসভার নেতা বি ডি সাভারকার ‘হিন্দুত্ব’ নামক গ্রন্থে ভারতবর্ষে হিন্দু এবং মুসলিম দুটি পৃথক জাতির তত্ত্ব আনেন৷ যা দেশভাগের তত্ত্বের জন্মদাতা৷ ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার তাই বলেছেন, ‘‘সাম্প্রদায়িক পথে ভারত বিভাগের ধারণাটির উদ্ভাবনের জন্য বিপুল পরিমাণে দায়ী হল হিন্দু মহাসভা’’৷ তিনি আরও বলেছেন, ‘‘মুসলিম লিগ সাভারকারের ওই বক্তব্যকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে হৃদয়ঙ্গম করেছিল’’৷ বিজেপির পূর্বসূরী হিন্দু মহাসভা মুসলিম লিগের সাথে কোয়ালিশন মন্ত্রীসভা করেছিল সিন্ধু প্রদেশে এবং বাংলায়৷ বলেছিল এ হল ‘যুক্তিসঙ্গত আপস’, অথচ নেতাজি বিরোধিতায় তারা ছিল আপসহীন সরকারি মসনদের মধু ভোগ করার লোভ কি ধর্মকেও ভুলিয়ে দেয়

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিন্দু মহাসভার নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী বলেছিলেন, ‘‘এখন যুদ্ধকালীন অবস্থায় জাতীয় গভর্নমেন্ট এমনভাবে গঠিত হবে যাতে মিত্রপক্ষের সঙ্গে নিবিড় সহযোগিতায় যুদ্ধ করা সম্ভব হয়’’ (রাষ্ট্র সংগ্রামের  এক অধ্যায়, শ্যামাপ্রসাদ, পৃঃ ১১৬)৷ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী ’৪২–এর ভারত ছাড়ো আন্দোলনেরও বিরোধিতা করেছিলেন৷ তিনি বলেছিলেন, ‘‘আমি মনে করি না, গত তিন মাসের মধ্যে যেসব অর্থহীন উচ্ছৃঙ্খলতা ও নাশকতামূলক কাজ করা হয়েছে, তার দ্বারা আমাদের দেশের স্বাধীনতা লাভের সহায়তা হবে’’ (ওই, পৃঃ ৬১)৷ কীভাবে এই আন্দোলন দমন করা যায় তার একটা তালিকাও তিনি ব্রিটিশ সরকারের কাছে পেশ করেছেন৷ অন্যদিকে সুভাষচন্দ্র বসু তখন এই আন্দোলনের মধ্যেই ব্রিটিশ বিরোধী অভ্যুত্থানের বীজ দেখে বিদেশ থেকেই তাকে স্বাগত জানাচ্ছেন৷

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে যখন আজাদ হিন্দ ফৌজ বীরত্বের সাথে লড়াই করছিল, সেই সময় শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদকে সহায়তা করার জন্য আগ বাড়িয়ে বললেন, ‘‘বঙ্গদেশকে রক্ষা করিবার জন্য একটা গৃহ–বাহিনী গঠনের অধিকার আমাদের দেওয়া হউক’’ (রমেশচন্দ্র মজুমদার লিখিত ‘বাংলাদেশের ইতিহাস’ গ্রন্থে উল্লিখিত শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর পত্র থেকে উদ্ধৃত)৷ অর্থাৎ হিন্দু মহাসভার সমর্থন নেতাজিকে নয়, ব্রিটিশকে৷ এখন বিজেপি নেতাজির ছবির পাশে শ্যামাপ্রসাদের ছবি দিচ্ছে৷ দেশের মানুষ তা মেনে নিতে পারে?

এই হিন্দু মহাসভা ধর্মীয় গোঁড়ামির জিগির তুলে ভোট চাইছে দেখে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু বলেছিলেন –‘‘সন্ন্যাসী আর সন্ন্যাসীনীদের ত্রিশুল হাতে হিন্দু মহাসভা ভোট ভিক্ষায় পাঠিয়েছেন৷ ত্রিশুল আর গেরুয়া বসন দেখলে হিন্দু মাত্রেই শির নত করে৷ ধর্মের সুযোগ নিয়ে, ধর্মকে কলুষিত করে হিন্দু মহাসভা রাজনীতি ক্ষেত্রে দেখা দিয়েছে৷ হিন্দু মাত্রেরই তার নিন্দা করা কর্তব্য’’(১২ মে ১৯৪০, ঝাড়গ্রামে প্রদত্ত ভাষণ, আনন্দবাজার ১৪ মে, ১৯৪০)৷ ভোটের স্বার্থে দাঙ্গার মুখ নরেন্দ্র মোদি অমিত শাহদের সাথে রবীন্দ্রনাথ–বিবেকানন্দ-নেতাজি সুভাষচন্দ্রের ছবি একযোগে ব্যবহার করে বিজেপি যে অশুভ চেষ্টা করছে তাকে প্রতিহত করাও আজ কর্তব্য৷

(গণদাবী : ৭১ বর্ষ ২১ সংখ্যা)