Breaking News
Home / খবর / ভোটার যাচাইয়ে নতুন প্রক্রিয়া মানুষকে হয়রান করার ফরমান

ভোটার যাচাইয়ে নতুন প্রক্রিয়া মানুষকে হয়রান করার ফরমান

সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন ভোটারের তথ্য যাচাইকরণ প্রক্রিয়া শুরু করার কথা ঘোষণা করেছে, যা ১ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়ে ১৫ অক্টোবর ২০১৯ পর্যন্ত চলবে৷ এতে ভোটার তালিকায় দেওয়া তথ্যগুলি নির্ভুল আছে কি না তা ভোটাররা যাচাই করে নিতে পারবেন৷ নির্ভুল ভোটার তালিকা তৈরি করা নাকি এর উদ্দেশ্য৷

এতদিন নির্ভুল তালিকা তৈরির জন্য একটি পদ্ধতি ছিল৷ নির্দিষ্ট একটি সময়ে নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী বুথ লেভেল অফিসার (বিএলও) ৩/৪ সপ্তাহ একটি নির্দিষ্ট স্থানে ভোটার তালিকা নিয়ে বসতেন, ভোটাররা পরিবারের কারওর নতুন নাম তোলাতে বা ভোটার তালিকায় থাকা নামগুলিতে কোনও ভুলত্রুটি থাকলে তা সংশোধন করতে নির্দিষ্ট ফর্মে তার উল্লেখ করে ভোটার তালিকা নির্ভুল করতে সাহায্য করতেন৷ কিন্তু এবার এই যাচাই প্রক্রিয়ায় ঘোষণা অনুযায়ী ভোটারকেই কম্পিডটার বা অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন থেকে কাজটি করতে হবে৷ এর ফলে এই রাজ্যের সাধারণ ভোটাররা বিশেষ করে গরিব মানুষ এক চরম হয়রানির মধ্যে পড়েছেন৷

প্রথমত, এই কাজটি নির্বাচন কমিশন এমন সময়ে আরম্ভ করেছে, যখন আসামে এনআরসি তালিকা প্রকাশ করে ১৯ লক্ষ ৬ হাজারেরও বেশি মানুষকে রাষ্ট্রহীন করে দেওয়ার পর বিজেপি পশ্চিমবঙ্গেও এনআরসি করে দু’কোটি মানুষকে রাষ্ট্রহীন করার হুমকি দিচ্ছে৷

দ্বিতীয়ত, সরকার বা তাদের সমর্থকরা বলতে পারেন যে, এখন তো হাতে হাতে মোবাইল ফোন আছে৷ তাহলে অসুবিধা কোথায়? কিন্তু এ দেশের বহু গরিব মানুষের হাতে মোবাইল ফোন এলেও লগ–ইন করা, ক্যাপচা দেওয়া, নতুন রেজিষ্ট্রেশন করা, ওটিপি দেখে পাসওয়ার্ড বসানো, সফ্ট কপি আপলোড করা ইত্যাদি তাঁরা করতে পারবেন না৷ ফলে তাঁদের সমস্ত কাগজপত্র নিয়ে রুটি–রুজির কাজের সময় নষ্ট করে দৌড়তে হবে কমপিডটার সেন্টারে৷ সেখানে দিতে হবে টাকা৷ একার নয়, পরিবারের প্রত্যেক ভোটারের জন্য৷

তৃতীয়ত, কম্পিউটার বা মোবাইল ফোন থেকে যদি সব বিবরণ ঠিক আছে দেখা যায়, তাহলে সেখানেই যাচাইয়ের কাজটি শেষ হওয়ার কথা৷ কিন্তু না৷ নির্বাচন কমিশন নিজে আগে যাচাই করে যে সব তথ্যের ভিত্তিতে ভোটার তালিকায় নাম তুলেছিল, তা নির্বাচন কমিশনই বিশ্বাসযোগ্য মনে করছে না৷ তাই আরেকবার প্রমাণপত্র হিসাবে ভোটারকে পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, আধার কার্ড, রেশন কার্ড, ব্যাঙ্কের পাশবই, প্যানকার্ড, সাম্প্রতিক জল/টেলিফোন বিল/বিদ্যুৎ/গ্যাস এর বিল(ঠিকানা সহ)/সরকারি বা আধা–সরকারি পরিচয়পত্র/নির্বাচন কমিশন দ্বারা অনুমোদিত অন্যান্য নথির যে কোনও একটি আপলোড করতে হবে৷ কী দরকার আছে এর?

চতুর্থত, সব বিবরণ ঠিক না থাকলে আবার আরেক ঝামেলা৷ চেকবক্সে ত্রুটি সংশোধন করে, তার সাপোর্টিং ডকুমেন্ট আপলোড করতে হবে৷ তা আবার ২ এমবি–র কম সাইজের হতে হবে৷ তার পর আসবে ত্রুটি সংশোধনের ৮নং ফর্ম৷ সেখানে সর্বোচ্চ তিনটি ফিল্ড সংশোধন করা যাবে৷ অর্থাৎ নাম, বাবার নাম, লিঙ্গ, বয়স, ছবি ইত্যাদিতে যদি মোট চারটি ভুল থাকে তাহলে আপনি মাত্র তিনটিতে সংশোধন করতে পারবেন৷ তাহলে এত কাণ্ডের পর সম্পূর্ণ নির্ভুল তালিকা হল কোথায়?

পঞ্চমত, পরিবারের প্রত্যেকের ভোটার তালিকা এক এক করে যাচাই করতে হবে একই প্রক্রিয়ায় এবং তা এক দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া৷

ষষ্ঠত, যারা পরিবারে একসাথে থাকেন, তাদের নাম একত্রিত করার কথা বলা হয়েছে৷ প্রশ্ন হল, তাদের নাম একত্রিত করার দরকার কি? আজ যারা একত্রিত, কাল তো তারা আলাদা হয়ে যেতে পারেন নির্বাচন কমিশনের পারিবারিক বিষয়ে ঢোকার দরকার কি? এই বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত উদ্দেশ্য সম্পর্কে সন্দেহ জাগিয়ে তুলছে৷ এ কি শুধু নির্ভুল নির্বাচক তালিকা প্রস্তুত করা না কি আরও কিছু?

সপ্তমত, অনেকেই এই ঝঞ্ঝাট এড়াতে ভোটার তালিকা যাচাই নাও করতে পারেন৷ তাদের কী হবে? তারা কি ডাডটফুল ভোটার বলে গণ্য হবেন?

আসামে কয়েক বছর আগে নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকায় ডাডটফুল ভোটার বা ডি–ভোটার তৈরি করেছিল৷ তাদের ভোট দেওয়ার অধিকার কেড়ে নিয়েছিল নির্বাচন কমিশন৷ তাদের শুনানির জন্য ডেকে, যারা নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র দিতে পারেননি, তাদের কয়েক হাজারকে ডিটেনশন ক্যাম্পে আটক রেখেছে সরকার৷ তার পর এসেছে এনআরসি৷ এবার তৈরি হচ্ছে আরও বড় আকারের বহু সংখ্যক ডিটেনশন ক্যাম্প, যা মানুষের মধ্যে নানা রকম আশঙ্কা তৈরি করছে৷

সরকার আবার এর মধ্যেই ন্যাশনাল পপুলেশন রেজিষ্ট্রার তৈরি করার প্রস্তুতি নিচ্ছে৷ সাম্প্রতিককালে বিজেপি নেতাদের এ রাজ্যে দু’কোটি মানুষকে বিদেশি বলে চিহ্ণিত করার ঘোষণা, কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের নাগরিক পঞ্জি নিয়ে আস্ফালন, রাষ্ট্রহীনদের ‘ডইপোকার মতো টিপে মারা’র হুমকি বহু মানুষের মধ্যে এক অদ্ভুত ধরনের আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে৷ তারই প্রকাশ আমরা দেখতে পাচ্ছি ভোটার তালিকা যাচাই বা ডিজিটাল রেশনকার্ডের ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে৷ এতদিন বিজেপি এনআরসি এবং বিদেশি বিতাড়ন প্রশ্নে মুসলিমদের দিকে আঙুল তুললেও আসামের এনআরসি তালিকা অন্য সত্যকেই সামনে এনেছে৷ আসামের এনআরসি তালিকায় দেখা যাচ্ছে শুধু হিন্দু ও মুসলিম ধর্মাবলম্বী বাঙলাভাষী মানুষই নয়, যাঁদের কোনওদিনই বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশের প্রশ্নই নেই, জনজাতির সেইসব মানুষকেও বিদেশি বলে দেগে দেওয়া হয়েছে৷ যেমন, বোড়ো ২০ হাজার, রাভা ৮ হাজার, হাজং ৮ হাজার, মিচিং ৭ হাজার, কার্বি ৯ হাজার, অহোম ৩ হাজার, গারো ২.৫ হাজার, সোনোয়াল ১১ শ, ডিমাছা ১১শ, মটক ১.৫ হাজার, গরিয়া–মরিয়া–দেশি ৩৫ হাজার, কোচ–রাজবংশী ৫৮ হাজার, গোর্খা ৮৫ হাজার৷ এছাড়া নাগা, মণিপুরি, মার, কুকি, থাদৌ, বাইফে প্রভৃতি জনজাতিরও অনেকের এনআরসি–তে নাম নেই৷ নাম না থাকা পূর্ববঙ্গীয় মুসলিম ৪.৮৬ লক্ষ হলেও সবচেয়ে বৃহৎ সংখ্যা হল হিন্দু বাঙালি, যার সংখ্যা প্রায় ৭ লক্ষ৷ আরও প্রায় ৪ লক্ষ ৭৫ হাজার মানুষ কোন জাতি বা গোষ্ঠীর তা এখনও সম্পূর্ণ পরিষ্কার না হলেও একথা বলা যায় যে, সব মিলিয়ে হিন্দু প্রায় ১৩ লক্ষ৷ ফলে এনআরসি নিয়ে এ রাজ্যে যে আতঙ্ক কিছুদিন আগে মূলত মুসলিম ধর্মাবলম্বী মানুষের মধ্যে লক্ষ করা গিয়েছে, সেই আতঙ্ক এখন সকল ধর্মাবলম্বী মানুষ, বিশেষ করে মতুয়া, মুসলিম, আদিবাসী জনজাতিদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে প্রবলভাবে৷

(গণদাবী : ৭২ বর্ষ ৯ সংখ্যা)