Home / খবর / ভীমা-কোরেগাঁও মামলার পিছনে কি ষড়যন্ত্র?

ভীমা-কোরেগাঁও মামলার পিছনে কি ষড়যন্ত্র?

সরকারের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুললেই ‘দেশদ্রোহী’ বলে অভিযুক্ত করে দেওয়া বিজেপি সরকারের দস্তুর হয়ে উঠেছে। সেই সরকার নিজেই আজ দেশের বিশিষ্ট নাগরিকদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র পাকানোর ভয়ঙ্কর অভিযোগের মুখে। ভীমা-কোরেগাঁও মামলায় অন্যতম অভিযুক্ত সমাজকর্মী রোনা উইলসনকে যে সব ‘তথ্যপ্রমাণ’-এর ভিত্তিতে জেলে ভরেছে মহারাষ্ট্রের পূর্বতন বিজেপি সরকারের পুলিশ, সেগুলি বাইরে থেকে ম্যালওয়ারের মাধ্যমে তাঁর ল্যাপটপে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছে প্রথম সারির মার্কিন সংবাদপত্র ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’। ফলে এই মামলায় জামিন-অযোগ্য ধারায় দিনের পর দিন বন্দি রাখা হয়েছে যে সমস্ত সমাজকর্মীদের, তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগের পুরোটাই বিজেপি সরকারের সাজানো ষড়যন্ত্র কি না– এ নিয়ে মারাত্মক প্রশ্ন উঠে গেছে।

দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের রিপোর্ট থেকে জানা গেছে, রোনা উইলসনের আইনজীবীর অনুরোধে আমেরিকার ‘আর্সেনাল কনসালটিং’ নামে একটি ডিজিটাল ফরেনসিক সংস্থা তাঁর ল্যাপটপে পাওয়া নথি পরীক্ষা করে। সংস্থাটি জানায়, রোনার ল্যাপটপে অন্তত দশটি ভুয়ো চিঠি ম্যালওয়ারের মাধ্যমে ঢোকানো হয়েছিল এবং ঘটনা হল, সেই চিঠিগুলিকেই তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রাথমিক প্রমাণ হিসাবে তুলে ধরে তার ভিত্তিতে চার্জশিট দিয়েছিল বিজেপি সরকারের পুলিশ।

বছর দুয়েক আগে গোটা দেশে আলোড়ন তুলেছিল ভীমা-কোরেগাঁও মামলা। ২০১৮-র ১ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রের ভীমা-কোরেগাঁওয়ের দলিত সমাবেশকে কেন্দ্র করে হাঙ্গামায় মৃত্যু হয় এক জনের, আহত হন বেশ কয়েকজন। ঠিক তার আগের দিন ‘এলগার পরিষদ’-এর সভায় ভাষণ দিয়েছিলেন এমন কয়েকজন, যাঁরা দলিত ও জনজাতিভুক্ত মানুষের অধিকার রক্ষার আন্দোলনে পরিচিত মুখ। এঁদের ‘উত্তেজক’ ভাষণই এই হিংসার জন্য দায়ী এই অভিযোগ তুলে ২০১৮-র জুনে গ্রেপ্তার করা হয় রোনা সহ বেশ কয়েকজন সাংবাদিক, অধ্যাপক ও সমাজকর্মীকে। ওই বছরের নভেম্বরে ৫ হাজার পাতার চার্জশিট পেশ করে পুণে পুলিশ। অভিযোগ করে, এঁরা প্রধানমন্ত্রীকে হত্যা সহ রাষ্ট্রবিরোধী নানা ষড়যন্তে্রর সঙ্গে যুক্ত। পরে ২০১৯-এর ফেব্রুয়ারি মাসে পুণে পুলিশ চার্জশিটের একটি সংযোজনী তৈরি করে। সেখানে প্রবীণ বামপন্থী কবি, অসুস্থ ভারভারা রাও সহ বেশ কয়েকজন সমাজকর্মীর নাম এই মামলায় যুক্ত করে তারা। পরে জামিন অযোগ্য ধারায় গ্রেপ্তার করে ৮২ বছরের মিশনারি স্ট্যান স্বামীকে। ২০২০ সালে মহারাষ্ট্রে বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি পরাজিত হলে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার ভীমা-কোরেগাঁও মামলার ভার তুলে দেয় এনআইএ-র হাতে।

মার্কিন ফরেনসিক সংস্থাটির তদন্তে প্রকাশ, এই মামলারই অন্যতম অভিযুক্ত ভারভারা রাওয়ের ই-মেল অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে সেখান থেকে একের পর এক ই-মেল পাঠানো হয় উইলসনের কাছে। অনুরোধ আসতে থাকে সেগুলো খুলে দেখার। উইলসন একটি ই-মেলের লিঙ্ক খুলতেই ম্যালওয়ার ঢুকে পড়ে তাঁর ল্যাপটপে এবং তার মাধ্যমে হ্যাকাররা অনায়াসে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে তাঁর ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টগুলি। এই পথেই উইলসনের ল্যাপটপে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় এমন সব জাল চিঠিপত্র যেখানে রাষ্ট্রবিরোধী ও সরকার ফেলে দেওয়ার চক্রান্তের অংশীদার হিসাবে দেখানো রয়েছে উইলসনকে।

আর্সেনাল কনসালটিং-এর ফরেনসিক পরীক্ষার রিপোর্ট যদি সত্য হয়, তা হলে তো এ কথা অস্বীকার করার কোনও উপায়ই থাকে না যে, বিজেপি সরকারের শাসনে দেশের মানুষ আজ চরম বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে। এমনিতেই বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলিতে সরকারি দল ও নেতা-মন্ত্রীদের ফ্যাসিস্টসুলভ কার্যকলাপ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন বিঘ্নিত করছে। যে খোলামেলা উদারনৈতিক পরিবেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশের প্রধান বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত, দিনে দিনে তা নষ্ট হয়ে যেতে বসেছে। কে কী খাবে, কী পোশাক পরবে, কোন ধর্মের মানুষের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কে যাবে– সমস্ত বিষয়ে বিজেপি সরকারের নেতা-কর্মীরা নিদান জারি করছেন। সরকারের অপকীর্তির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুললেই ‘দেশবিরোধী’ তকমা লাগিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে সরকারি ভাবে। ঘটছে শারীরিক নির্যাতন, খুন, মিথ্যে মামলায় জেলে ভরার মতো ঘটনা। এর ওপর যদি আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে ষড়যন্তে্রর জাল এভাবে পোক্ত করা হয়, তা হলে নাগরিকদের ন্যূনতম সুরক্ষা বলে তো কিছু থাকে না! ইতিমধ্যেই জম্মু-কাশ্মীর পুলিশ সমাজমাধ্যমের পোস্টগুলির ওপর নজরদারি চালাতে কর্মী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর সরকারের ভয়ঙ্কর হস্তক্ষেপ বলে সরব হয়েছেন দেশের সচেতন মহল। পাঁচ বছর অন্তর সাধারণ মানুষের কঠোর পরিশ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে সরকার নির্বাচন করে। মানুষ নিজের জীবন ও সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব অর্পণ করে সরকারের ওপর। সেই ‘রক্ষক’ সরকারই যদি এভাবে ‘ভক্ষক’-এর রূপ ধরে, তা হলে দেশটাকে কি আর ‘গণতান্ত্রিক’ বলা যায়?

বিজেপি সরকারকে হয় অবিলম্বে জবাব দিতে হবে এ ধরনের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে সামিল হওয়ার অধিকার তাদের কে দিয়েছে। নয়তো তাদের প্রমাণ করতে হবে, আর্সেনাল কনসালটিং-এর তদন্ত রিপোর্ট সঠিক নয়। অবিলম্বে এ বিষয়ে দেশের মানুষের সমস্ত সন্দেহ যদি কেন্দ্রের বিজেপি সরকার নিরসন করতে না পারে, তা হলে সরকারি ক্ষমতায় বসে থাকার অধিকার তাদের দিতে পারে না দেশের মানুষ।