Breaking News
Home / অন্য রাজ্যের খবর / বিশ্ব বিপ্লবই শোষণ মুক্তির একমাত্র পথ — কমরেড অসিত ভট্টাচার্য

বিশ্ব বিপ্লবই শোষণ মুক্তির একমাত্র পথ — কমরেড অসিত ভট্টাচার্য

ভারত তথা সারা বিশ্বের অবস্থা নির্দেশ করছে বিশ্ব বিপ্লবই শোষণ মুক্তির একমাত্র পথ  গুয়াহাটির সভায় কমরেড অসিত ভট্টাচার্য

 

২৪ এপ্রিল এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট)-এর ৭৪তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী দেশের অন্যান্য রাজ্যের মতো আসামেও যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়। এই উপলক্ষে দলের আসাম রাজ্য কমিটির উদ্যোগে গুয়াহাটির রবীন্দ্রভবনে ২৬ এপ্রিল অনুষ্ঠিত এক সভায় দলের পলিটবুরোর প্রবীণ সদস্য কমরেড অসিত ভট্টাচার্য নিচের বক্তব্য রাখেন। বক্তৃতাটি তিনি অসমিয়া ভাষায় দেন। অনুবাদজনিত যে কোনও ত্রুটির দায়িত্ব আমাদের। – সম্পাদক, গণদাবী

 

আপনারা জানেন, এ যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মার্কসবাদী চিন্তানায়ক কমরেড শিবদাস ঘোষ এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট)-এর প্রতিষ্ঠাতা। মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, স্ট্যালিন, মাও সে তুঙ– এই সকল মহান বিপ্লবী চিন্তাবিদদের মতো জীবনের সমস্ত দিক পরিব্যাপ্ত করে একটা তীব্র বিপ্লবী সংগ্রাম পরিচালনা করে তাঁদের চিন্তা এবং মহান সংগ্রাম সঠিকভাবে উপলব্ধি করে কমরেড শিবদাস ঘোষ মার্কসবাদ-লেনিনবাদের আর একজন মহান উদগাতায় পরিণত হয়েছেন। দলের প্রতিষ্ঠা দিবসে আমরা এই ধারাতেই তাঁকে এবং তাঁর শিক্ষাকে স্মরণ করি। তাঁর শিক্ষাগুলো যতদূর সম্ভব আমরা এই ধরনের জনসভায় চর্চা করি, জাতীয় পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি আমরা পর্যালোচনা করি, মূল্যায়ন করি এবং মহান মার্ক্সবাদী চিন্তানায়ক কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষার ভিত্তিতে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার পথ বের করি।

এইবার প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী যখন পালন করছি, তখন সারা বিশ্বে, আমাদের দেশে এবং আসামেও এক কঠিন পরিস্থিতি বিরাজ করছে। কীভাবে আমরা এই পরিস্থিতির সম্মুখীন হব, সেটা নির্ভর করে কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষার ভিত্তিতে অবিরামভাবে পরিস্থিতির চর্চা করে তার সম্মুখীন হওয়ার শ্রেষ্ঠ উপায় উদ্ভাবনের উপর।

আপনারা জানেন, রাশিয়া এবং ইউক্রেনের মধ্যে একটি যুদ্ধ চলছে। ইউক্রেন আগে রাশিয়ার জার সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় যুগান্তকারী সর্বহারা বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার পর সোভিয়েত ইউনিয়নে এই দেশটি স্বেচ্ছায় যোগদান করেছিল একটা সোসালিস্ট রিপাবলিক হিসাবে। সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত এবং তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে যতগুলো রিপাবলিক ছিল, তার ভেতরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল ইউক্রেন। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতন্ত্র ভেঙে পড়ার পর, রাশিয়ান ফেডারেশনের মতোই ইউক্রেনও একটা পুঁজিবাদী রাষ্ট্র হয়ে দাঁড়াল। এই ক্ষেত্রে মনে রাখার মতো কথা হল, রাশিয়া শুধু পুঁজিবাদী রাষ্ট্রই নয়, একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। এই সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রটি আজ প্রায় দু’মাস হল, প্রচণ্ড আক্রমণ হেনে চলেছে ইউক্রেনের উপর।

এই যুদ্ধ এখন পুরো দমে চলছে এবং বহু নিরীহ মানুষ, নর-নারী, শিশু ইতিমধ্যে প্রাণ হারিয়েছেন এবং যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার কোনও লক্ষণ নেই। এখন ভ্লাদিমির পুতিন হচ্ছেন সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়ার নেতা। দৃশ্যত রাশিয়া এবং ইউক্রেন এই দুই রাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ হলেও, আসলে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলোর দুটি শিবিরের মধ্যে এই যুদ্ধ চলছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বে যে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলি আছে ইউরোপ এবং আমেরিকায়, তারা পুঁজিবাদী রাষ্ট্র ইউক্রেনকে সহযোগিতা করছে। যদিও তারা যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাবাহিনী এখনও পাঠায়নি, কিন্তু এ ছাড়া সমস্ত ধরনের সহায়তা তারা করছে। এই যুদ্ধের ফলেও অর্থনৈতিক সংকট সারা বিশ্বের জনসাধারণকে ঘিরে ধরেছে। বিশ্বের সমস্ত পুঁজিবাদী দেশে পুঁজিবাদী শোষণে জর্জরিত জনসাধারণের উপর এই যুদ্ধ হচ্ছে আর একটি মরণাঘাত। মানুষের আজ টিকে থাকার মতো অবস্থা নেই। সারা বিশ্বে মানুষের মধ্যে বিভাজন পরিষ্কার। একদিকে হাতে গোনা মুষ্টিমেয় পুঁজিপতি এবং তাদের তাঁবেদার ধনী সম্প্রদায়ের মানুষ, যারা সেই দেশগুলোর জনসংখ্যার ৫ ভাগও নয়। অন্য দিকে ৯৫ ভাগ মানুষ সেই দেশগুলোতে পুঁজিবাদের শোষণ যন্ত্রণায় আর্তনাদ করছে– কী করে বেঁচে থাকব, খাদ্য নেই, বস্ত্র নেই, এমনকি দিনমজুরি করারও সুযোগ নেই। এই হচ্ছে বিশ্বের পুঁজিবাদী দেশগুলোর সাধারণ মানুষের বাস্তব অবস্থা। মাত্র দুটো দেশ উত্তর কোরিয়া এবং কিউবার বাইরে বাকি সমস্ত দেশই পুঁজিবাদের কবলে। সেই দেশগুলোর পুঁজিপতিরা, যারা জনসংখ্যার দুই ভাগও নয়, তারা সেই দেশগুলোতে তাদের শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে– পুলিশ, আমলাতন্ত্র এবং মিলিটারিকে ভরসা করে। সমস্ত পুঁজিবাদী দেশের খেটে খাওয়া জনসাধারণ, শ্রমজীবী, মেহনতি জনসাধারণ, ছাত্র, যুবক, মহিলাদের উপর এই পুঁজিপতি শাসকরা সর্বাত্মক শোষণ চালাচ্ছে।

এই যে আজ ভারতবর্ষের অবস্থা, যন্ত্রণায় মানুষ আর্তনাদ করছে, বেঁচে থাকার কোনও উপায় নেই। তীব্র মূল্যবৃদ্ধি, কল-কারখানা বন্ধ, তার মধ্যে যেগুলো এখনও টিকে আছে সেইগুলোতেও পুঁজিপতিদের শোষণ তীব্রতর করার জন্য আইনি-বেআইনি সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এই সমস্ত ঘটনা আমাদের দেশে আমরা প্রত্যক্ষ করছি। পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী দেশ আমেরিকা পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশ হিসাবে এতদিন বিখ্যাত ছিল। সেই আমেরিকাও আজ তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত। বেকার সমস্যা সেখানেও মারাত্মক হারে বেড়েছে, আমেরিকার শোষিত মানুষ অসহায় হয়ে পড়েছে। এক সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে শ্রমিকরা, দক্ষ-অদক্ষ শ্রমিকরা গিয়ে কাজ় পেয়েছিল, কিন্তু আজ সেই সবচেয়ে ধনী, পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী দেশ আমেরিকাতে জনসাধারণের কোনও কাজ নেই। গ্রেট ব্রিটেনও পৃথিবীর দুই তৃতীয়াংশ দেশে তাদের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল, আমাদের দেশেও তারা উপনিবেশ স্থাপন করেছিল। সেই দেশে আজ এরকম অবস্থা হয়েছে যে, সেটা প্রায় চিন্তা করা যায় না। যে দেশ পৃথিবীর দুই-তৃতীয়াংশ দেশে উপনিবেশ স্থাপন করেছিল, আমাদেরও দুশো বছর শোষণ করেছিল এবং যে দেশ পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ধনী দেশ হিসাবে বিবেচিত হয়েছিল, সেই দেশেও আজ মানুষের বেঁচে থাকা খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে। চাকরি-বাকরির মারাত্মক সংকট, বেশিরভাগ মানুষের জীবনযাত্রার মান দ্রুত নিম্নগামী হচ্ছে। প্রতিটি দেশে খুব বেশি হলে ৫ শতাংশ ধনী পুঁজিপতি। আর তার বিপরীতে ৯৫ শতাংশ শোষিত মানুষ যারা শ্রমশক্তি বিক্রি করে জীবন নির্বাহ করেন তাদের কোনও প্রকারে জীবন ধারণেরও কোনও নিশ্চয়তা নেই। তাদের সকলের জীবনে অভাব এবং দারিদ্র দ্রুত বেড়ে চলেছে। জাপান, জার্মানি, ফ্রান্স, সমস্ত পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী দেশের একই অবস্থা। বর্তমানে জি-৭ বলতে যে সব সাম্রাজ্যবাদী দেশকে বোঝায় সেই সবক’টি দেশ আজ গভীর অর্থনৈতিক সঙ্কটে কাঁপছে।

এই অবস্থায় এই সব দেশের মানুষও প্রতিকার চেয়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসছে, মিটিং-মিছিল করছে। এমনকি এই যে রাশিয়া, যেখানে মহান স্ট্যালিনের বিরুদ্ধে কুৎসার বন্যা বইয়ে সেখানকার প্রতিবিপ্লবীরা ৭৪ বছর পর সমাজতন্তে্রর পতন ঘটিয়েছিল, যে চক্রান্ত সেদিন রাশিয়ার জনগণ বুঝতে পারেননি, সেই রাশিয়ার আজ কী অবস্থা দেখুন! মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য তারা আরও অনেক কথা বলেছিল। এমনকি সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক পুনর্গঠনের মহান নেতা, লেনিনের ভাবশিষ্য, মহান স্ট্যালিনের নাম তারা মুছে ফেলতে চেয়েছিল। তারা বলেছিল তারা সমাজতন্তে্রর পুনর্নিমাণ করবে। তারা জীবনযাপনের মান বহু উপরে নিয়ে যাবে। এই ধরনের অনেক আশ্বাস তারা সেদিন সোভিয়েত রাশিয়ার জনগণকে দিয়েছিল। এই প্রক্রিয়াতে ১৯৯১ সালে হল প্রতিবিপ্লব। ইতিমধ্যে ৩০ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এই ৩০ বছরে মানুষ বুঝতে পেরেছে, তারা কী হারিয়েছে। আজ মানুষ সেখানে রাজপথে বেরিয়ে এসেছে।

সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নে ইউক্রেন, বেলারুশ ইত্যাদি বিভিন্ন দেশ অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা আমি আগেই উল্লেখ করেছি। এই বিশাল সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নে তখন অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এই সবের অনায়াস প্রাপ্তি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গ্যারান্টি করেছিল। দারিদ্র দূর হয়েছিল। এটা কোনও অতিরঞ্জিত কথা নয়। ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে, কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। সেই সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার ৩০-৩২ বছরের মধ্যে আজ তার অন্তর্ভুক্ত প্রতিটি দেশ নরককুণ্ডে পরিণত হয়েছে। দেখা দিয়েছে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের তীব্র সংকট। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদির জন্য জনগণকে কোনও চিন্তা করতে হয়নি, খাদ্যদ্রব্য পর্যন্ত বিনামূল্যে দেওয়ার বাস্তব অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছিল। এই ধরনের একটি মহান রাষ্ট্র সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন, বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের কাছে এক অপূর্ব আকর্ষণীয় দেশে পরিণত হয়েছিল এবং তাকে সামনে রেখে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শোষিত জনসাধারণ তেমন ধরনের দেশ গড়ে তোলার সংগ্রাম শুরু করেছিল। সেই পথে বহু দেশে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে উঠেছিল। সাম্রাজ্যবাদী দালালরা, তাদের সহযোগী আধুনিক শোধনবাদী পুঁজিপতিরা চক্রান্ত করে সেই সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে দিল– সমাজতন্ত্রে পর্যাপ্ত পরিমাণ পার্থিব সমৃদ্ধি গড়ে উঠলেও তার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে চেতনার মান প্রতিনিয়ত যেভাবে উপরের দিকে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন ছিল, সেভাবে কাজটা না হওয়ার সুযোগ নিয়ে।

পুঁজিবাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার ৩০-৩২ বছরের মধ্যেই সেই দেশের মানুষ শাসকপুঁজিপতিদের নির্মম শোষণে টিকে থাকতে না পেরে রাস্তায় বেরিয়ে এসেছেন। পুঁজিবাদ এই অবস্থাতেই নিয়ে গেছে পূর্বতন সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোকে। আবার এটাও লক্ষ করার মতো যে, ইউক্রেনের উপর সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়ার এই অন্যায় আক্রমণ, তার বিরুদ্ধে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যেভাবে মানুষ তীব্র প্রতিবাদে মুখর হয়েছেন– বর্তমান রাশিয়ার জনসাধারণও সেই একই ভাবে ব্যাপক সংখ্যায় এই সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। যুদ্ধ মানুষ চায় না, এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিদিন রাশিয়ায় মিটিং-মিছিল হচ্ছে। গরবাচেভ, ইয়েলৎসিন আর তাদের তাঁবেদার সাম্রাজ্যবাদী দালালরা মহান স্ট্যালিনকে কালিমালিপ্ত করেছিল, কুৎসা রটিয়েছিল এবং মানুষকে বিভ্রান্ত করেছিল– সেদিন মানুষ বুঝতে পারেননি। কিন্তু আজ মানুষ আবার রাশিয়াতে স্ট্যালিনের ছবি নিয়ে মিছিল করছেন।

সর্বহারার মহান নেতা কমরেড শিবদাস ঘোষ আমাদের বারবার স্মরণ করিয়েছেন, সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে মেটেরিয়াল ডেভেলমেন্টের (পার্থিব উন্নতি) সাথে সাথে আদর্শগত, চিন্তাগত মান যদি দ্রুততার সাথে অবিরাম আরও উন্নত স্তরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা না হয়, তা হলে জনগণের চিন্তা-চেতনার আপেক্ষিক নিম্ন মানের জন্য পুঁজ়িপতি শ্রেণির চক্রান্তে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা ক্রমশ দুর্বল হতে থাকবে এবং তারই পরিণতিতে প্রতিবিপ্লব সংঘটিত হওয়ার মারাত্মক বিপদ দেখা দেবে। আজ এটা অনস্বীকার্য যে, তাঁর নির্দেশিত পথ অনুসরণ করতে না পারার পরিণামেই শেষপর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়ন সহ অন্যান্য বহু সমাজতান্ত্রিক দেশে সমাজতন্ত্র ভেঙে পড়েছে। ফলে এখন সারা বিশ্ব পুঁজিবাদের হাতের মুঠোর মধ্যে। কিন্তু তবুও পুঁজিপতিদের চোখে ঘুম নেই। তারা আতঙ্কিত, কারণ এই সবগুলো দেশেই জনগণের বিক্ষোভ প্রতিনিয়ত বারুদের মতো ফেটে পড়ছে। মিটিং-মিছিল অবিরাম চলছে, শ্রমিক-কৃষক ছাত্র-যুবক-মহিলারা দেশে দেশে প্রতিবাদ ধ্বনিত করছে।

এই অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে অনৈতিকতা মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। সব পুঁজিবাদী দেশেই পুঁজিপতি শ্রেণি বিপ্লবের ভয়ে ভীত হয়ে জনগণের নৈতিক মেরুদণ্ড, নৈতিকতা ধ্বংস করার পথ নিয়েছে। পরিবারভিত্তিক মানুষের যে অবস্থান ছিল, সেটা ভেঙে পড়েছে। পিতা নিজের সন্তানকে মারছে, আবার সন্তান পিতা-মাতাকে হত্যা করছে। স্বামী স্ত্রীকে হত্যা করছে, স্ত্রী স্বামীকে হত্যা করছে। আপনারা খবরের কাগজে পড়েন হত্যা এবং ধর্ষণের বীভৎস বিবরণ। খেতে না পেয়ে মানুষ মানুষকে ঠকাচ্ছে, সম্পত্তির জন্যে ভাই-ভাইকে হত্যা করছে। আর দেখানো হচ্ছে এগুলো যেন কিছু না, অতি স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হল, এর মূল কোথায়?

সোভিয়েত ইউনিয়ন যে ভেঙে পড়ল আমরা তার পর্যালোচনা করেছি, কমরেড শিবদাস ঘোষের চিন্তার ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করেছি। মহান মার্কস-এঙ্গেলসের শিক্ষার আলোকে মহান লেনিন এবং মহান স্ট্যালিন যে দেশটা সৃষ্টি করে গেলেন, বহু স্বাধীন দেশ স্বেচ্ছায় তার অন্তর্ভুক্ত হল, এইভাবেই অভূতপূর্ব সোভিয়েত রাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন নামে একটি সম্পূর্ণ নতুন অভিনব রাষ্ট্রের জন্ম হল। সেই সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে চমকপ্রদ উন্নতি সারা বিশ্বের জনসাধারণকে অভিভূত করেছিল। সেই দেশের পতন সত্যই মর্মান্তিক, বেদনাদায়ক।

১৯১৭ সালে বিপ্লবের পর ৪-৫ বছর পর্যন্ত মহান লেনিন দেশটি পরিচালনা করেছিলেন। তারপর তাঁর অকালমৃত্যু হয় এবং মহান স্ট্যালিনের নেতৃত্বে আরম্ভ হয় সমাজতন্ত্রের পুনর্নির্মাণ। মনে পড়ে আমাদের ছোটবেলায় আমরা বহু দূর থেকে অনুভব করতাম যে সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ায় কি আশ্চর্যজনক পার্থিব উন্নতি ঘটছে! সমাজতন্ত্র নির্মাণের চমকপ্রদ কার্যকলাপ চলছিল সেই সংবাদও আমরা পেয়েছিলাম এবং খুবই উৎফুল্ল হয়েছিলাম, এই কারণেই যে আমাদেরও এরকমই একটা রাষ্ট্র হবে। সারা বিশ্বে এইভাবেই মহান স্ট্যালিনের নেতৃত্বে পরিচালিত এই মহান উন্নয়নমূলক কার্যকলাপের প্রভাব পড়ছিল, আর একই সাথে সমাজতন্ত্রের প্রতি তীব্র আকর্ষণও বাড়ছিল। কিন্তু আমি যে কথাটা বলতে চাই সেটা হচ্ছে, অন্য কথা বাদ দিলেও সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন যতদিন পর্যন্ত অবস্থান করছিল, ততদিন পর্যন্ত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার দোসররা বিশ্বযুদ্ধ তো নয়ই, এমনকি আঞ্চলিক যুদ্ধও লাগাতে পারেনি।

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তখনও নিজেকে সুপার পাওয়ার ভাবত। সেখানে সদ্য জন্মলাভ করা সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নই তার সঙ্গে পাল্লা দিয়েছিল এবং উন্নয়নের বহু ক্ষেত্রেই সোভিয়েত ইউনিয়ন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে পিছনে ফেলে এগিয়ে গিয়েছিল। অন্য দিকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের যুদ্ধনীতির বিরুদ্ধে বিশ্বে শান্তির পরিবেশ বজায় রেখেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। তার জন্য যুদ্ধবাজ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ সেদিন বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধ লাগাতে পারেনি। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক শিবিরের পতনের পর ইরাক, সিরিয়া, ইরান আাফগানিস্তান প্রভৃতি দেশে যুদ্ধ লাগিয়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করল, উদ্বাস্তু বানাল। সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের অনুপস্থিতিই এর মূল কারণ। যুদ্ধবাজ সাম্রাজ্যবাদীদের হুঁশিয়ারি দিয়ে সেদিন সোভিয়েত ইউনিয়ন বলেছিল, যদি অন্যায়ভাবে যুদ্ধ লাগানো হয় তা হলে তাকে প্রতিরোধ করার ক্ষমতা আমাদের আছে। এটাই ছিল সেদিনের সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকা– যার সাক্ষী ইতিহাস।

অন্য প্রশ্ন বাদ দিলেও জনসাধারণের মনে, চিন্তাশীল মানুষের মনে বারবার যে প্রশ্নটা এসেছে– তা হল, সোভিয়েত ইউনিয়নের সবদিক থেকে যে উন্নতি হয়েছিল, মার্কসবাদের অন্যতম উদগাতা মহান স্ট্যালিনের নেতৃত্বে সোভিয়েত ইউনিয়নে যে অভূতপূর্ব পার্থিব উন্নতি ঘটেছিল, যে যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছিল, যে উন্নয়ন সারা বিশ্বের জনগণকে অভিভূত করেছিল, তাকে চাপা দিয়ে এই চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়াশীল প্রতিবিপ্লব ঘটল কী ভাবে? এত সুযোগ-সুবিধা থাকার পরও প্রতিবিপ্লবীরা সেখানে মাথা তুলল কেমন করে? এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কিন্তু এটার উপর আলোচনা করা যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ। আজকের সভায় সেটা সম্ভবপর হবে না। সংক্ষেপে আমি উল্লেখ করতে চাই যে, সমস্যার বিপদ সম্পর্কে কমরেড শিবদাস ঘোষ ১৯৫৬ সালে বিশ্বের সংগ্রামী জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিংশতিতম কংগ্রেস যা স্ট্যালিনের মৃত্যুর পর ১৯৫৬ সালে অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সেখানে শোধনবাদী প্রতিবিপ্লবী ত্রুশ্চেভরা মহান স্ট্যালিনের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন কুৎসা ছড়াতে শুরু করল। বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনের নেতা আমাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক কমরেড শিবদাস ঘোষ, একমাত্র তিনিই সেদিন সঙ্গে সঙ্গে বলেছিলেন, ত্রুশ্চেভের নেতৃত্বে বিংশতিতম কংগ্রেসে যে সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হল, জলজ্যান্ত মিথ্যা কথা বলে স্ট্যালিনের বিরুদ্ধে কুৎসা অভিযান শুরু করল, এই সব শেষপর্যন্ত লেনিনবাদের উপরেই আক্রমণ হানবে। তিনি আরও বলেছিলেন, অতি দ্রুত তাদের পরাস্ত করতে না পারলে, তারা প্রতিবিপ্লব আসন্ন করে তুলবে। এই বিষয়টা সোভিয়েত ইউনিয়নের মানুষ সেদিন ধরতে পারেননি, সমাজতান্ত্রিক চেতনার মান আকাঙ্খিত ধরনের উন্নত পর্যায়ে পৌঁছতে না পারার জন্য। কমরেড শিবদাস ঘোষ দেখালেন, সমাজতন্ত্রের নামে সমাজতন্ত্র-বিরোধী শক্তি আধুনিক শোধনবাদী ত্রুশ্চেভরা ক্ষমতায় এল এই অজ্ঞতার সুযোগ নিয়েই এবং এই ঘটনাটা সেভিয়েত ইউনিয়নের জনসাধারণ ধরতে পারল না। অপরাধী এই দুর্বৃত্তরা এবং পরে তাদের অনুগামীরা ক্ষমতায় এল। বছরের পর বছর বিনা বাধায় তারা আধুনিক শোধনবাদ চর্চার মাধ্যমে প্রতিবিপ্লব আসন্ন করে তুলল এবং শেষপর্যন্ত সমাজতন্ত্রের পতন ঘটাল।

চিন দেশেও একই ঘটনা ঘটল। মাও সে তুঙ-এর মৃত্যুর কয়েক বছর আগে কমিউনিস্ট পার্টির ভিতর থেকে লিউ সাও চি, তেন সিয়াও পিং এবং তাদের সাগরেদ নেতারা রাশিয়ার ত্রুশ্চেভের লাইন অনুসরণ করে চিনের সমাজতন্ত্র ধ্বংস করার চেষ্টা চালিয়েছিল– যদিও মহান মাও সে তুঙ তা অতি সহজেই ব্যর্থ করে দিয়েছিলেন। কিন্ত দুর্ভাগ্যবশত মহান মাও সে তুঙ-এর মৃত্যুর পর এই শোধনবাদ চক্রই দল এবং সরকারের ক্ষমতা দখল করে কয়েক বছরের মধ্যেই পুঁজিবাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিল। বিশ্বের কমিউনিস্ট আন্দোলনের এই নিদারুণ ট্র্যাজেডি কমরেড শিবদাস ঘোষের জীবদ্দশাতে হয়নি। কিন্ত ত্রুশ্চেভরা ক্ষমতায় আসার পরই তাদের কার্যকলাপ দেখে, একমাত্র তিনিই নির্ভুল ভাবে বিশ্লেষণ করে দেখালেন, বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনের ভিতরে আধুনিক শোধনবাদ কীভাবে ঢুকতে পারল এবং বলিষ্ঠভাবে বললেন– এখনই যদি তীব্র আদর্শগত সংগ্রাম গড়ে তুলে এদের মূলোচ্ছেদ করতে না পারা যায়, তা হলে প্রতিবিপ্লব আসন্ন হয়ে উঠবে। এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার মূল কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বারবার বলেছেন, বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই মার্কসবাদ-লেনিনবাদের তত্ত্বগত মান যদি ক্রমাগত উপরের দিকে নিয়ে যাওয়া না যায়, তা হলে তুলনামূলকভাবে সেখানে নিম্নমানের সৃষ্টি হয়। এর ফলে, সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে, মারাত্মক ধরনের ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটতে থাকবে এবং জনগণের মধ্যেও ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হতে থাকবে। সমাজতান্ত্রিক চেতনার মান, কমিউনিজমের চেতনার মান এবং উপলব্ধির ক্রমাগত অবনমন ঘটে এবং তার সুযোগ নিয়ে পুঁজিপতিরা সংঘবদ্ধ হয়ে কাউন্টার রেভলিউশন করে। সোভিয়েত ইউনিয়নে ঠিক তা-ই ঘটল। এই ব্যাখ্যা আমরা কমরেড শিবদাস ঘোষের থেকেই প্রথম পেলাম। টোয়েন্টিএথ কংগ্রেসের পরে পরেই তিনি দৃঢ়তার সাথে বললেন– ২০তম কংগ্রেস ওপেনস দ্য ফ্লাড গেট অব মডার্ন রিভিশনিজম।

এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে চাই, ১৯৫৬ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির বিংশতিতম কংগ্রেস যখন মহান বিপ্লবী কমরেড স্ট্যলিনের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে আধুনিক শোধনবাদ প্রতিষ্ঠা করার নিকৃষ্ট পথ নিল– সেই সময় মহান মাও সে তুঙ জীবিত। কিন্ত ত্রুশ্চেভের় এই স্ট্যালিন বিরোধী বিষোদগার এবং আধুনিক শোধনবাদ প্রতিষ্ঠা করার এই পদক্ষেপের সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা কোনও কথা বলেননি। বেশ কিছুদিন পর তাঁরা এর তীব্র বিরোধিতা ব্যক্ত করেছেন। তার কারণ ব্যাখ্যা করে পরবর্তী সময়ে তাঁরা বলেছেন– দু’টো রাষ্ট্রই সমাজতান্ত্রিক হওয়ার কারণে তার বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য তাঁদের অল্প সময় নিতে হয়েছে। আর এটাও ঠিক যে এর বিরুদ্ধে তাঁরা যখন জেহাদ ঘোষণা করেছেন তাঁদের সেই তীব্র বিরুদ্ধাচারণ বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনকে যথেষ্ট পরিমাণে সাহায্য করেছে। কিন্তু কমিউনিস্ট চেতনার মান ক্রমাগত উপরের দিকে নিয়ে যেতে না পারলে সেটা যে নিম্নগামী হয় এবং তার সুযোগ নিয়েই যে আধুনিক শোধনবাদের জন্ম হয় এবং সেটাই শেষপর্যন্ত প্রতিবিপ্লব আসন্ন করে তোলে– এই বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা মহান চিন্তাবিদ কমরেড শিবদাস ঘোষই সর্বপ্রথম বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনের সামনে তুলে ধরলেন। যদিও তা সত্তে্বও প্রতিবিপ্লব প্রতিহত করা গেল না। তার কারণও ভিন্ন। কিন্তু কমরেড শিবদাস ঘোষের এই হুঁশিয়ারি, এই বিশ্লেষণ অক্ষরে অক্ষরে সত্য বলে প্রমাণিত হল।

(আগামী সংখ্যায়)