Breaking News
Home / খবর / বিশ্ব বিপ্লবই শোষণমুক্তির একমাত্র পথ (৪) — কমরেড অসিত ভট্টাচার্য

বিশ্ব বিপ্লবই শোষণমুক্তির একমাত্র পথ (৪) — কমরেড অসিত ভট্টাচার্য

২৪ এপ্রিল এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট)-এর ৭৪তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী দেশের অন্যান্য রাজ্যের মতো আসামেও যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়। এই উপলক্ষে দলের আসাম রাজ্য কমিটির উদ্যোগে গুয়াহাটির রবীন্দ্রভবনে ২৬ এপ্রিল অনুষ্ঠিত এক সভায় দলের পলিটবুরোর প্রবীণ সদস্য কমরেড অসিত ভট্টাচার্য নিচের বক্তব্য রাখেন। বত্তৃতাটি তিনি অসমিয়া ভাষায় দেন। অনুবাদজনিত যে কোনও ত্রুটির দায়িত্ব আমাদের। – সম্পাদক, গণদাবী

(৪)

নির্বাচন সম্পর্কে লেনিনীয় দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও সমৃদ্ধ করেছেন শিবদাস ঘোষ

আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পুঁজিপতি শ্রেণির উপরে ধারাবাহিক চাপ সৃষ্টি করে যেতে হবে। ন্যায্য দাবি নিয়ে বাইরে মিটিং-মিছিল, লাগাতার আন্দোলন গড়ে তোলা এবং সংসদ, বিধানসভার ভিতরে যথার্থ বিরোধিতা করা– এই উভমুখী সংগ্রামী কৌশল চালিয়ে যেতে হবে। এই বৈপ্লবিক বিরোধিতার মূল কথা হচ্ছে, বিধানসভা ও সংসদের ভিতর থেকে এই পচা-গলা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার আসল চরিত্র শোষিত জনসাধারণের সামনে তুলে ধরা এবং এর মাধ্যমে সংসদ ও বিধানসভা সম্পর্কে শোষিত জনগণের মধ্যে যে মোহ কাজ করছে, তার থেকে তাদের মুক্ত করা। এই প্রসঙ্গে আমি উল্লেখ করতে চাই,সংসদের ও বিধানসভার ভিতর বর্তমানে যা চলছে, সেটা অত্যন্ত ক্ষতিকারক। বুর্জোয়া-পেটিবুর্জোয়া দলগুলি এই তথাকথিত বিরোধিতার অভিনয় করে শোষিত জনগণকে বিভ্রান্ত করছেন। এই সমস্ত বুর্জোয়া দলের একমাত্র কাজ হচ্ছে শুধু ভোটের স্বার্থে বিরোধিতার ভাব দেখানো। আসলে তারা প্রকৃত বিরোধী নয়, হতেও পারে না। কারণ এই সব দলগুলো সব দিক থেকেই পুঁজিপতি শ্রেণির হাতের মুঠোয়। এদের বিরোধিতা ফাঁপা, উপর উপর। এই বিরোধিতার কোনও সারবত্তা নেই। কিন্তু গভীর ক্ষোভের কথা হচ্ছে, বামপন্থী, কমিউনিস্ট নাম নিয়ে সিপিআই(এম) এবং তাদের সহযোগী দলগুলিও একই রকম ভাবে আচরণ করছে। সরকারে থাকা দলগুলো হোক বা তথাকথিত বিরোধী পক্ষের বুর্জোয়া দলগুলিই হোক– তাদের দৃষ্টিভঙ্গি হল সদাসর্বদা সংসদ, বিধানসভা, নির্বাচন, সংসদীয় গণতন্ত্র– এগুলোর জয়গান গেয়ে যাওয়া। এগুলোকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় চলতে থাকা শোষণ-নির্যাতন সম্পর্কে শোষিত জনগণকে বিভ্রান্ত করে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা যতদিন সম্ভব অটুট রেখে বিপ্লবী আন্দোলনকে মাথা তুলতে না দেওয়া।

পুঁজিপতি শ্রেণির এই জঘন্য চক্রান্তের বিপরীতে মহান লেনিনের শিক্ষা হল, একটি দেশের প্রকৃত বিপ্লবী দলের কর্তব্য হল, যতদিন পর্যন্ত একটি পুঁজিবাদী দেশে জঙ্গি গণতান্ত্রিক আন্দোলন লাগাতার পরিচালনা করতে করতে শ্রেণিসংগ্রামের জন্ম দিয়ে তাকে তীব্র থেকে তীব্রতর করার মধ্য দিয়ে বিপ্লবের আঘাতে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে, রাষ্ট্রশক্তিকে উৎখাত করা না যাচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত পার্লামেন্টারি এবং এক্সট্রা পার্লামেন্টারি এই দুই সংগ্রামের একটাকে অপরটির পরিপূরক হিসাবে চালিয়ে যেতে হবে। এর অন্তর্নিহিত অর্থ হচ্ছে, যে কোনও পুঁজিবাদী দেশে শোষণ, নির্যাতন চলছে, তার মূল কারণ যে সেই দেশের পুঁজিপতি শ্রেণির শাসন-শোষণ, সেখানে প্রবর্তিত নির্বাচন ব্যবস্থা, সেই নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকার, কোনও কিছুই যে শ্রমিক শ্রেণিকে, পুঁজিপতি শ্রেণির সর্বাত্মক শোষণ থেকে মুক্ত করতে পারবে না– এই সত্য সেই সব দেশের শ্রমিক শ্রেণি এবং শোষিত জনসাধারণকে গভীরে গিয়ে বোঝাতে হবে।

বিপ্লবী দল সুযোগ পেলে নির্বাচনের মাধ্যমে যদি পার্লামেন্ট বা অ্যাসেম্বলিতে এক বা একাধিক প্রতিনিধি পাঠাতে পারে, তখন নির্বাচিতদের কর্তব্য হবে ছোট-বড় সমস্ত ঘটনাগুলো যতটুকু পারা যায় সেখানে উত্থাপন করে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ন্যক্কারজনকশোষণমূলক চরিত্র জনগণের সামনে তুলে ধরা। পুঁজিবাদী শাসক দলের নেতা-মন্ত্রী এবং আমলাতন্তে্রর অমানবিক অত্যাচারের চরিত্র তুলে ধরার মধ্য দিয়ে এই নেতা-মন্ত্রীদের সম্পর্কে এবং এই বুর্জোয়া সংসদীয় ব্যবস্থা সম্পর্কে জনগণের মধ্যে যে মোহ আছে তা থেকেও তাঁদের মুক্ত করা। এখানে উল্লেখ করতে হবে যে, এই কাজগুলো সম্পূর্ণ করতে হলে সংসদে যত বেশি পারা যায় আলাপ-আলোচনায় অংশগ্রহণ করা ও ঢোকার চেষ্টা করা দরকার এটা দেখাতে যে, কীভাবে বুর্জোয়া শাসকরা পুঁজিবাদের এই ক্ষয়িষ্ণু যুগে বিরোধীদের কথা বলার অধিকার কেড়ে নিয়ে তাদের মর্জিমাফিক স্বেচ্ছাচারী শাসন চালাতে চায়। যেসব সাধারণ মানুষ গণতন্ত্রের এই বুলিতে বিভ্রান্ত হয়, তাদেরও চোখে আঙুল দিয়ে এসব দেখিয়ে দেওয়া দরকার। যদি বিপ্লবী দলের প্রতিনিধিদের সংসদে কথা বলতে না-ও দেয়, তা সত্তে্বও তাদের এর বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে এবং সংসদের বাইরেও এই অধিকার হরণের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এই সব দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে জনগণের শোষণ-নির্যাতনের স্বরূপ, তার মূল কারণ যে পুঁজিবাদ– এগুলো জনগণের বোঝার মতো করে সংসদে, বিতর্ক সভায় বার বার তুলে ধরতে হবে। জনগণের উপর পুঁজিপতি শাসকরা যে পাশবিক অত্যাচার চালাচ্ছে তার বিরুদ্ধে তাদের গর্জে উঠতে হবে।

এসবের মাধ্যমেই জনসাধারণ একটা সময়ে গিয়ে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা সম্পর্কে মোহমুক্ত হবে। এর বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে মহান শিক্ষক লেনিনের অতি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার কথা আমি এখানে উল্লেখ করতে চাই। বিপ্লবের আগে লেনিন বলেছিলেন, আমাদের আদর্শগত ভিত্তি এবং সাংগঠনিক শক্তি এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী নয়, শোষিত জনসাধারণ সব দিক থেকে জারতন্ত্র সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন নয়, বহু জায়গায় জারতন্ত্র সম্পর্কে মোহ কাজ করছে। সে কারণে ১৯০৫-এর বিপ্লব সফল হতে পারেনি। এখন আমাদের কর্তব্য হচ্ছে সবদিক থেকে জারতন্ত্রের স্বরূপ উন্মোচিত করা। সঠিকভাবে এই কাজ করার মাধ্যমে জারতন্ত্র উচ্ছেদ করার কাজ এগিয়ে যাবে। রাশিয়াতে সেই সময় সমস্ত জনগণের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত কোনও পার্লামেন্ট ছিল না। খুবই সীমিত ক্ষমতা সম্পন্ন ‘ডুমা’ নামে একটি ডেলিবারেটিভ বডি (যেখানে কেবল কিছু কথাবার্তা হয়, কিন্তু কোনও বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না) ছিল। তার উপর সেখানে শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্বও ছিল খুবই কম। ১৯০৫-এর বিপ্লবের প্রস্তুতি যখন জোর কদমে চলছিল, তখন লেনিন ডুমাতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, অর্থাৎ ‘ডুমা’ বয়কটের আহ্বান দেন। কিন্তু যখন ১৯০৫-এর বিপ্লব সফল হল না, লেনিন সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে জনগণকে বাইরে এক্সট্রা পার্লামেন্টারি স্ট্রাগল (পার্লামেন্টের বাইরে সংগ্রাম) তার সাথে সাথে তীব্র শ্রেণি সংগ্রাম চালিয়ে যেতে যেতে ডুমা এবং ডুমার মতো ডেলিবারেটিভ বডির ভিতর যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এর মধ্য দিয়ে জারতন্ত্র এবং তার সহযোগী রাশিয়ার বুর্জোয়া শ্রেণি এবং বুর্জোয়া দল, পেটিবুর্জোয়া, সোসাল ডেমোক্রেটিক দলগুলোর আসল স্বরূপ উন্মোচিত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, এর জন্য বিপ্লবী প্রতিনিধিদের ডুমা-র ভিতর তর্ক-বিতর্ক আলোচনায় অংশ নিতে হবে। জনগণের ন্যায্য দাবি নিয়ে ডুমার বাইরে যেভাবে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলা হবে, ভিতরেও যাঁরা নির্বাচিত বিপ্লবী প্রতিনিধি থাকবেন, তাঁরাও সেখানে আন্দোলনের ন্যায্যতা তুলে ধরতে তৎপর থাকবেন। পার্লামেন্ট, আ্যসেম্বলিতে বিপ্লবীদের যাওয়ার যৌক্তিকতা এখানেই। এখানে মহান লেনিনের সেই বিখ্যাত উক্তিটি ছিল, ‘আওয়ার ডিসিশন টু বয়কট ডুমা ডিউরিং দ্য গ্রোয়িং টাইড অফ রেভলিউশন অ্যান্ড এগেইন আওয়ার ডিসিশন টু এন্টার ইনটু ডুমা ডিউরিং দ্য রিসিডিং টাইড অফ রেভলিউশন, বোথ আর কারেক্ট’। সেদিন, যখন বিপ্লবের অনুকূল পরিস্থিতি ছিল না, শোষিত জনসাধারণের মধ্যে হতাশা কাজ করছিল, তখন সর্ব দিক থেকে সংগ্রাম করে পরিস্থিতি অনুকূল করার পথনির্দেশ তিনি দিয়েছিলেন। বুর্জোয়া সংসদের ভিতরের অবস্থা সম্পর্কে আমি আরও উল্লেখ করতে চাই যে, শাসক বুর্জোয়া দল এবং তথাকথিত বিরোধী বুর্জোয়া দলগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক হল মাঝে মাঝে তাদের মধ্যে অল্প-স্বল্প বাদানুবাদ হলেও মূলত পুঁজিপতি শ্রেণির গোলাম হওয়ার সুবাদে তারা সবাই হরিহর-আত্মা। ভোটে জেতার জন্য তাদের মধ্যে মাঝে মাঝে অল্প-স্বল্প তর্কবিতর্ক হয়, এই মাত্র। তাদের মধ্যে মিত্রতার ভাবই কাজ করে।

কিন্তু নিজেকে বামপন্থী কমিউনিস্ট বলে দাবি করা সিপিএম ইত্যাদি দলগুলোর অবস্থাও আজকাল সেরকমই। তারা তো বিরোধী ভাব দেখাতে গিয়ে বিরোধীপক্ষে থাকা অন্যান্য বুর্জোয়া শাসক দলের মতোই আচরণ করছে। এই প্রশ্নে বিরোধী বুর্জোয়া দলগুলোর সাথে তাদের বিন্দুমাত্র পার্থক্য নেই। অথচ আজ দরকার মরিয়া হয়ে শাসক দলের চূড়ান্ত জনবিরোধী কাজগুলো তুলে ধরা, তাদের এক্সপোজ করা, তারা যে আসলে জনশত্রু, সেটা প্রতিপন্ন করা। কিন্তু তার কোনও চেষ্টাই এই দলগুলির তরফে নেই। তার পরিবর্তে শাসক বুর্জোয়া দলের সাথে তাদের মিত্রতার ভাবটুকুই প্রকট হয়ে উঠছে। কেবল তাই নয়, তারা যে কোনও প্রকারে জেতার জন্য নানা যুক্তি দেখিয়ে সেই সব বুর্জোয়া দলের সাথে জোট করছে। এই ধরনের আচরণ পরিষ্কার জনগণের প্রতি শত্রুতা করা। এখন আবার সংসদে বিরোধী পক্ষে থাকা দলগুলো আর একটা চূড়ান্ত ভণ্ডামির পথ বেছে নিয়েছে। তারা সরকারের চূড়ান্ত জনবিরোধী কাজ, আইন প্রণয়ন, এগুলোর বিরুদ্ধে জনগণের দাবি পূরণের জন্য সংসদ বা বিধানসভার বাইরে কোনও আন্দোলন করে না। কিন্তু বিধানসভা, সংসদে মাঝে-মধ্যে জনগণের কিছু কিছু জরুরি দাবি তুলে, স্লোগান দিয়ে সংসদ, বিধানসভাকে কাজ করতে দেয় না। কখনও কখনও দিনের পর দিন ওয়াক আউট করে। স্লোগান তুলে বেরিয়ে যায় আর তার মাধ্যমে তারা পুঁজিবাদী শাসক দলের সুবিধাই করে দেয়। কোনও বাধা না পেয়ে শাসক দল জনবিরোধী প্রস্তাব, বিল ইত্যাদি নিয়ে প্রথমে অধ্যাদেশ জারি করে এবং পরে বিরোধীশূন্য সংসদে নিমেষের মধ্যে পাশ করিয়ে নেয়। শুধু ভোটের জন্য এবং পুঁজিপতি শ্রেণিকে সাহায্য করার জন্যই তারা এই আত্মঘাতী পথ অনুসরণ করছে। এর মাধ্যমে পুঁজিপতি শ্রেণির শাসন-শোষণের চরিত্র, তাদের চূড়ান্ত অগণতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদী কার্যকলাপ– এগুলো শোষিত জনগণের সামনে কীভাবে তুলে ধরা হবে? একদিন বা দু’দিনের জন্য এই ধরনের প্রতিবাদের পথ বেছে নেওয়া যায়। কিন্তু দিনের পর দিন পার্লামেন্ট অচল করে রাখলে শাসক দলের মুখোশ খুলে দেওয়ার বিপ্লবী কর্তব্য কীভাবে পালন করা হবে? অন্য দিক থেকে এটা নিঃসন্দেহে শাসক পুঁজিবাদী দলের পক্ষে বিরোধী পক্ষের বদনাম করতে সাহায্য করবে। তারা জনগণকে বলবে, জনগণের ভোটে জিতে বিরোধীপক্ষ দিনের পর দিন পার্লামেন্ট অচল করছে কার জন্য? সর্বোপরি শোষিত জনগণের কাছে বুর্জোয়া ভোট রাজনীতির অন্তঃসারশূন্যতা প্রতিপন্ন হবে কেমন করে?

আসলে পক্ষ মাত্র দুটো

এই প্রেক্ষাপটে আমি মহান শিক্ষক কমরেড শিবদাস ঘোষের একটা গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ স্মরণ করাতে চাই। বুর্জোয়া সংসদের এই সর্বশেষ সুবিধাবাদী আচরণ তিনি দেখেননি, কিন্তু তখনই সুবিধাবাদী রাজনীতির আভাস তিনি পেয়েছিলেন। এসব দেখে তিনি বলেছিলেন, এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় দেখতে বহু দল থাকলেও আসলে পক্ষ মাত্র দুটো। একটা হচ্ছে সমস্ত পুঁজিবাদী দল মিলে একটা পুঁজিবাদী পক্ষ, আর তার বিপরীতে প্রকৃত বিরুদ্ধ শক্তি, প্রকৃত বিপ্লবী শক্তি, বিপ্লবী পক্ষ।

আপনারা লক্ষ করবেন, কমরেড শিবদাস ঘোষের এই অভ্রান্ত বিশ্লেষণ কেমন করে প্রতিদিন স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে। কংগ্রেস থেকে বিজেপি, বিজেপি থেকে কংগ্রেস, তৃণমূল থেকে বিজেপি, বিজেপি থেকে তৃণমূল– ঢেউয়ের মতো দলবদলের কথা আজ আর বিস্তারিত বলার দরকার নেই। ভারতবর্ষে বুর্জোয়া দলগুলোর নেতামন্ত্রীদের এই যে দলবদল প্রতি দিন ঘটছে, এগুলোর মাধ্যমে কেন্দ্র এবং বেশিরভাগ রাজ্যে ক্ষমতায় থাকার ফলে বিজেপিই বেশি লাভবান হচ্ছে। পুঁজিপতি শ্রেণির সম্পূর্ণ সহযোগিতা পেয়ে যতই আরএসএস, বিজেপির রাজনৈতিক ক্ষমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, ততই পুঁজিপতি শ্রেণির শোষণের তীব্রতা মারাত্মকভাবে বাড়ছে।

জাতি ধর্ম ভাষা বর্ণ নির্বিশেষে, হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সব অংশের জনসাধারণের উপরেই এই বুর্জোয়া চিন্তার কোপ পড়ছে। এই চূড়ান্ত সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে যাতে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে না ওঠে সেটা সুনিশ্চিত করার জন্য সরকারি ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে তারা দেশের ভিতরে অতি নিপুণভাবে তীব্র মুসলিম বিদ্বেষ ছড়িয়ে দিচ্ছে। নিরাপত্তার অভাবে মুসলিম জনসাধারণ নিদ্রাহীন জীবনযাপন করছেন। এর ফলে কোনও হিন্দুর কি উপকার হচ্ছে? হিন্দু ধর্মের কোনও মহান উদগাতা কি মানুষের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ, হিংসা, হত্যার পথনির্দেশ দিয়েছেন? ভারতের কোনও মনীষী, কোনও মহান স্বাধীনতা সংগ্রামী নেতা হিন্দু-মুসলমান জনগণের মধ্যে হত্যাযজ্ঞ লাগিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন? একজনও মহান ব্যক্তি, একজনও সৎ মানুষ কি এই জঘন্য কাজে উৎসাহ দিয়েছেন বলে দেখা যাবে? পুঁজিপতি শ্রেণি আর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদই অবিভক্ত ভারতে এই জঘন্য সাম্প্রদায়িকতার জন্ম দিয়েছে। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে ব্যর্থ করার জন্য জনগণকে তাদের শোষণের বলি করার জন্য, তারা এ সব মারাত্মক সাম্প্রদায়িক শক্তির জন্ম দিয়েছে এবং অখণ্ড ভারতবর্ষকে খণ্ড খণ্ড করেছে, শ্রমিক শ্রেণির, সাধারণ মানুষের সর্বনাশ করছে।

শুধু ভোটে হারালেই বিজেপির সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে পরাস্ত করা যাবে না

আজ পুঁজিপতি শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে শোষিত, নিপীড়িত গরিব হিন্দু-মুসলমান জনসাধারণের ক্ষোভ ফেটে পড়ার উপক্রম হয়েছে, আর সেটা বানচাল করার জন্য পুঁজিপতি শ্রেণিরই অতি বিশ্বস্ত দল আরএসএস-বিজেপি নিকৃষ্ট মুসলিম বিদ্বেষের জন্ম দিচ্ছে। নিশ্চিতভাবে এর ফলে তারা হিন্দু মুসলমানের শোষিত জনগণের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামকেই ধ্বংস করার চেষ্টা করছে। যে কোনও মূল্যেই এই সর্বনাশা সাম্প্রদায়িক শক্তিকে পরাস্ত করতে হবে। শক্তিশালী আদর্শগত, ভাবগত আন্দোলন চালিয়ে জনগণের মন থেকে আরএসএস, বিজেপির চূড়ান্ত ক্ষতিকারক প্রভাব নির্মূল করতে হবে। শুধু ভোটে হারালেই আরএসএস, বিজেপি নির্মূল হয়ে যাবে না। এটা ভুললে চলবে না, এই উপমহাদেশে মুসলিম মৌলবাদী শক্তিগুলোর যে চূড়ান্ত ক্ষতিকারক কার্যকলাপ চলছে, তার বিরুদ্ধে হিন্দু জনসাধারণের মনে ন্যায্য ক্ষোভ আছে। অসৎ উদ্দেশ্য থেকে এই ক্ষোভকে ব্যবহার করেই মারাত্মক ধরনের প্রচার চালিয়ে ভারতের মাটিতে নিরীহ খেটে-খাওয়া নির্যাতিত-শোষিত মুসলিম জনসাধারণের বিরুদ্ধে বিজেপি-আরএসএস তীব্র ঘৃণার জন্ম দিয়েছে। একে যদি নির্মূল করতে হয়, তা হলে সুবিধাবাদী, বুর্জোয়া ভোটের রাজনীতি চর্চা করে কোনওপ্রকারে একবার বিজেপিকে হারাতে পারলেই হবে না। অবশ্যকর্তব্য হবে হিন্দু-মুসলমান, জাতি-ধর্ম-ভাষা নির্বিশেষে সমস্ত শোষিত মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে পুঁজিবাদী শোষণ থেকে জন্ম নেওয়া যে জ্বলন্ত সমস্যাগুলো তাদের টুঁটি টিপে মারছে, তার বিরুদ্ধে লাগাতার শক্তিশালী গণআন্দোলন গড়ে তোলা এবং আপসহীন মানসিকতা নিয়ে ন্যায্য দাবিগুলি আদায় করার জন্য নির্ভীক মানসিকতায় এগিয়ে যাওয়া, উন্নত নীতি-নৈতিকতা এবং উচ্চ মূল্যবোধের আধারে এই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন পরিচালিত করা। এই আন্দোলন যে উন্নত সংস্কৃতির জন্ম দেবে, সেটাই হবে আরএসএস-বিজেপির নরঘাতী সাম্প্রদায়িকতাকে প্রতিহত করার একমাত্র সঠিক আদর্শ, অতি শক্তিশালী হাতিয়ার।

এই চরিত্রসম্পন্ন ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন পরিচালনা করার মাধ্যমে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের জনসাধারণ অতি সহজেই সকল প্রকার সাম্প্রদায়িক চিন্তার ঊর্ধ্বে উঠতে সক্ষম হবেন। শুধু তাই নয়, বাইরে এই শক্তিশালী গণআন্দোলন চালিয়ে যেতে যেতে যখনই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, তখনও এই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করা সমস্ত দল এবং শক্তি ঐক্যবদ্ধ হয়ে নির্বাচনেও লড়বে এবং এই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের শক্তিই নির্বাচনে বিজেপির পরাজয় সুনিশ্চিত করবে।

এখানে আমি উল্লেখ করতে চাই, তীব্র সাম্প্রদায়িক আরএসএস-বিজেপিকে শক্তিহীন করার এই পথ আমাদের হাতে থাকলেও এটাকে বাস্তবায়িত করার ক্ষেত্রে মারাত্মক ধরনের প্রতিবন্ধকতাও কাজ করছে। বিজেপিবিরোধী নানা নামের যে বুর্জোয়া দলগুলো রয়েছে, তাদের ভোট রাজনীতির বাইরে কোনও ভাবেই আনা যায় না। অন্য দিকে নিজেদের বামপন্থী বলে পরিচয় দেওয়া সিপিআই, সিপিএম ইত্যাদি দলের অবস্থা একই। তারা ঐক্যবদ্ধ গণআন্দোলন গড়ে তুলতে মোটেই আগ্রহী নয়। দেশের গণতন্ত্রপ্রিয় জনগণ, যারা বিজেপির সাম্প্রদায়িকতার তীব্র বিরোধী, তাদের সেই বিরোধিতাকে ভোটে কাজে লাগাতে বিজেপিকে পরাস্ত করার স্লোগান তুলে কংগ্রেস ইত্যাদি বুর্জোয়া দলের সাথে মিত্রতা গড়ে তোলার জন্য তারা খুবই ব্যগ্র হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে কোনও বাধা না পেয়ে বিজেপি তীব্র মুসলিম বিদ্বেষ সৃষ্টি করছে।

কংগ্রেস প্রভৃতি তথাকথিত বিরোধী বুর্জোয়া দলগুলো সংখ্যালঘু জনগণের জীবন-জীবিকা এবং তাদের ধর্ম বিশ্বাসের উপরে এই ফ্যাসিবাদী আক্রমণ চুপচাপ দেখে চলেছে, প্রতিরোধ করার কোনও নামই নেই। তাদের তথাকথিত নরম হিন্দুত্ব বিজেপিরই সুবিধা করে দিচ্ছে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে আরএসএস-বিজেপি এই অবস্থার সুযোগ নিয়ে বিজেপি বিরোধী দলগুলোকে আরও বিভক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে।

এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট) কমরেড শিবদাস ঘোষের চিন্তায় বলীয়ান একটি প্রকৃত মার্ক্সবাদী দল। মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ-শিবদাস ঘোষের চিন্তাধারার বাইরে জনগণের হাতে শোষণ মুক্তির লড়াইয়ে অন্য কোনও হাতিয়ার নেই, অন্য কোনও আদর্শ নেই। কংগ্রেস, বিজেপি ইত্যাদি বুর্জোয়া দলগুলো শোষিত জনগণের শত্রু। আবার এ কথাও সত্য যে, সিপিএমের মতো তথাকথিত বামপন্থী দলগুলোও আজ গণআন্দোলনের ঝান্ডা পরিত্যাগ করে দক্ষিণপন্থী রাজনীতিকেই সাহায্য করছে। আর এটাও দেখা যাচ্ছে যে, শাসক-বুর্জোয়া শ্রেণিও তাদের এই ‘বামপন্থা’-কে ক্রমাগত উৎসাহ দিচ্ছে। বামপন্থার নামে শাসন চালিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ৩৪ বছর তারা পুঁজিবাদের সেবা করেছে। এটা জনগণের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা ছাড়া কিছু নয়। দ্বিতীয়ত, মনে রাখতে হবে, হিন্দু উগ্রতার বিরুদ্ধে মুসলিম উগ্রতা দিয়ে কোনও লাভ হবে না বরং ক্ষতি করবে। সাম্প্রদায়িকতার প্রকৃত প্রতিষেধক হচ্ছে কমিউনিজমের ভাবধারা। সুতরাং হিন্দু-মুসলমান, জাতি ধর্ম-ভাষা-বর্ণ নির্বিশেষে সমস্ত খেটে খাওয়া মানুষকে কমিউনিজমের পতাকা তলে একত্রিত হতে হবে। বিপ্লবের পতাকার নিচে সকল মেহনতি জনসাধারণকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়াই করে সাম্প্রদায়িকতাকে, সকল সাম্প্রদায়িক ষড়যন্ত্রকে ব্যর্থ করতে হবে।

সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে সংগ্রাম, আর পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে বিপ্লবী সংগ্রাম– এই দুটি মিলিয়ে এলাকায় এলাকায় সাম্প্রদায়িক শক্তিকে প্রতিহত করতে হবে। এই উদ্যোগ আপনারা গ্রহণ করুন। আমি দৃঢ়তার সাথে বলতে চাই, হতাশ হওয়ার কোনও কারণ নেই, ভারতবর্ষে জনসংখার ৯০ শতাংশ গরিব মানুষ, খেটে-খাওয়া সাধারণ মানুষ। তারা শ্রমজীবী। তারা ঐক্যবদ্ধ হলে বিজেপি, আরএসএস-কে হটে যেতেই হবে। আমি বিভিন্ন সভায় কথাটা বলেছি যে, স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় বাংলায় মুখ্যত বামপন্থী ভাবধারায় যখন স্বাধীনতা আন্দোলন চলেছিল নেতাজির নেতৃত্বে, তখন হিন্দু মহাসভার সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীকে জায়গা দেয়নি পশ্চিমবঙ্গের মানুষ। মা’র্বাদ-লেনিনবাদ-শিবদাস ঘোষ চিন্তাধারার ভিত্তিতে এই ধরনের বলিষ্ঠ বামপন্থী আন্দোলনের প্রবাহ তৈরি করতে হবে।

পুঁজিবাদবিরোধী বিপ্লবের লক্ষ্য সামনে রেখে অবিরাম কাজ করে যেতে হবে। মিলিট্যান্ট (জঙ্গি) গণআন্দোলন, শ্রেণিসংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে। এই কাজ করতে গিয়ে আমরা প্রতিদিন কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষার ভিত্তিতে বিপ্লবী শিক্ষায় শিক্ষিত হব। মনে রাখতে হবে, অন্যায় ব্যবস্থা চিরদিন থাকে না। দেখুন, পশ্চিমবঙ্গে ৩৪ বছর সিপিএমের শাসন মানুষ উচ্ছেদ করেছে। ভারতবর্ষে কংগ্রেসের ৫১ বছর ধরে স্বৈরতান্ত্রিক শাসনেরও পতন ঘটিয়েছে মানুষ। এভাবে বিজেপিকেও যেতে হবে। অন্যায়ের উপর কেউই বেশিদিন টিকে থাকতে পারে না। সংখ্যালঘু মানুষের উপর বিজেপির এই আক্রমণ, মুসলিম বিদ্বেষ– এসবের অবসান ঘটাবে বাম ভাবধারায় সংগ্রামী জনগণই।

এ সংগ্রামে পথপ্রদর্শক আদর্শ হবে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ। তার ভিত্তিতেই গড়ে উঠবে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন। উগ্র সাম্প্রদায়িকতার প্রতিষেধক পাল্টা উগ্র সাম্প্রদায়িকতা নয়। সাম্প্রদায়িকতাকে নির্মূল করার একটাই উপায়– বামপন্থী ভাবধারার ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ শক্তিশালী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পুনরুজ্জীবন ঘটানো। সমস্ত গোষ্ঠীর মানুষকে নিয়ে গণতান্ত্রিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা ও সংগ্রাম পরিচালনার মধ্য দিয়েই মারাত্মকভাবে মাথাচাড়া দেওয়া সাম্প্রদায়িকতার বিপদ মোকাবিলা করা সম্ভব। (শেষ)