Breaking News
Home / খবর / বিশ্ব বিপ্লবই শোষণমুক্তির একমাত্র পথ (৩) — কমরেড অসিত ভট্টাচার্য

বিশ্ব বিপ্লবই শোষণমুক্তির একমাত্র পথ (৩) — কমরেড অসিত ভট্টাচার্য

২৪ এপ্রিল এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট)-এর ৭৪তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী দেশের অন্যান্য রাজ্যের মতো আসামেও যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়। এই উপলক্ষে দলের আসাম রাজ্য কমিটির উদ্যোগে গুয়াহাটির রবীন্দ্রভবনে ২৬ এপ্রিল অনুষ্ঠিত এক সভায় দলের পলিটবুরোর প্রবীণ সদস্য কমরেড অসিত ভট্টাচার্য নিচের বক্তব্য রাখেন। বত্তৃতাটি তিনি অসমিয়া ভাষায় দেন। অনুবাদজনিত যে কোনও ত্রুটির দায়িত্ব আমাদের। – সম্পাদক, গণদাবী

 

(৩)

মালিকের মূল স্বার্থকে যদি আঘাত করা হয়, তা হলে মালিক টাকা দেবে না। আর টাকা না দিলে ক্ষমতায় যেতে পারবে না। আগেও নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু এখন আগের থেকে পুঁজিপতি শ্রেণির খেলাটা আরও মারাত্মক হয়েছে। তাই দেখুন, ঊনবিংশ শতাব্দীতে আব্রাহাম লিংকনের সেই ঐতিহাসিক কথা, ‘ডেমোক্রেসি ফর দ্য পিপল, বাই দ্য পিপল, অফ দ্য পিপল’, তার ছিটেফোঁটা আজ আর নেই। আজকের বাস্তবতা হচ্ছে ডেমোক্রেসি ফর দ্য ক্যাপিটালিস্ট, বাই দ্য ক্যাপিটালিস্ট, অফ দ্য ক্যাপিটালিস্ট। সব পুঁজিবাদী দেশেই এখন শাসন চালানোর রূপ হচ্ছে বুর্জোয়া ডিক্টেটরশিপ, বুর্জোয়া একনায়কত্ব।

নির্বাচনে এখন আর গণতন্ত্রের চিহ্ন নেই

অন্য দিকে মানুষের খাদ্য নেই, বস্ত্র নেই, মানুষ নিঃশব্দে অকাল মৃত্যুর বলি হচ্ছে। সামান্য টাকার জন্য মেয়েরা দেহ বিক্রি করছে, গ্রাম থেকে মেয়েরা শহরে যাচ্ছে, বেঁচে থাকার কোনও রাস্তা না পেয়ে। যেমন করে চাকরির জন্য লোকাল ট্রেনে করে মানুষ শহরে যায়, আবার বিকেলে অফিস থেকে ফেরে– এ ঠিক তেমনই। মেয়েরাও শহরে যায়, দেহ বিক্রি করে কিছু উপার্জন করে সেটুকু নিয়ে ফিরে যায়। আমি এটুকু বলতে চাইছি, মানুষ সর্বস্বান্ত হয়ে এই অবস্থার বলি হয়ে মৃত্যুমুখে পড়ছে আর ভোটের সময় তারা নিজেদের ভোট বিক্রি করছে। এটা নৈতিক না অনৈতিক সেটা নিয়ে দ্বিমত হওয়ার প্রশ্নই উঠছে না। খুব বেশি ধরলে ৫ শতাংশ মানুষকে বাদ দিয়ে বাকি ৯৫ শতাংশ মানুষের অসহায়তা কোন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে ভেবে দেখুন। জাল ভোট দেওয়ার বা রিগিং করার প্রবণতা যেভাবে ছড়াচ্ছে, তার ফলে এটাই স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, বিশ্ব পুঁজিবাদ আজ স্বৈরাচারী হয়ে উঠেছে, হিংস্র হয়ে উঠেছে, ন্যূনতম গণতান্ত্রিক আচার-আচরণও আর তাদের থেকে আশা করা যায় না।

শুধু তাই নয়, বিশ্ব পুঁজিবাদ আজ ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠেছে। যত শীঘ্র পারা যায় বিপ্লবের আঘাতে এই পুঁজিবাদকে নির্মূল করতে হবে। বর্তমান যুগটা বোঝাতে গিয়ে মহান লেনিন বলেছেন ‘ইট ইজ দ্য এরা অফ ইম্পিরিয়ালিজম অ্যান্ড প্রোলেটারিয়ান রেভলিউশন’ সর্বহারা বিপ্লব ও সাম্রাজ্যবাদের যুগ। তাই সব দেশেই সর্বহারা বিপ্লব অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। এই বিপ্লবের মাধ্যমেই বুর্জোয়া একনায়কত্বের অবসান ঘটিয়ে সর্বহারা শ্রেণির গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে, এটাই মহান লেনিনের শিক্ষা। এই তত্ত্ব এবং পথ অনুসরণ করে রাশিয়ায় বিপ্লব হল, তারপর চিন দেশে বিপ্লব হল। তারপর পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হল। সাম্রাজ্যবাদী এবং পুঁজিবাদীদের চক্রান্তে সেই দেশগুলোতে সমাজতন্ত্র আজ আর নেই। কিন্তু এই কথাটাও সত্য যে সমাজতন্ত্র যতদিন সেখানে ছিল, দেখা গেল সেখানে সকলের মধ্যে ইকুয়ালিটি বা সমতা প্রতিষ্ঠার জন্য একটার পর একটা দৃঢ় ব্যবস্থা হাতে নেওয়া হয়েছে। অল্পদিনের মধ্যে সেখানে বেকার সমস্যার সমাধান হল, মুদ্রাস্ফীতি থাকল না, মূল্যবৃদ্ধি থাকল না, শোষণ-নির্যাতন থাকল না। সুতরাং শোষিত জনসাধারণকে এই সমাজতন্ত্রকেই তাদের অভীষ্ট লক্ষ্য হিসাবে প্রতি মুহূর্তে সামনে রাখতে হবে।

আরও দেখুন, ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে সব দেশেই পুঁজিবাদী দলগুলো ভোটের মোহ প্রতিদিন তীব্র করার চেষ্টা করছে, আমাদের তা থেকে শোষিত জনগণকে মুক্ত করতে হবে। এই পথেই পুঁজিবাদ বিরোধী সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব যত দ্রুত পারা যায় সম্পন্ন করতে হবে। ফলে সব দেশেই, যাদের মধ্যে ভোটের মোহ এখনও আছে, তাদের তা থেকে মুক্ত করতে হবে। মার্কসবাদী বিপ্লবীদের বিভিন্ন দেশে পুঁজিবাদকে উচ্ছেদ করার জন্য, সমস্ত রকম শোষণের অবসান ঘটানোর জন্য সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের দিকে অগ্রসর হতে হবে। প্রতিদিন জোরের সাথে সেই পথে পা ফেলতে হবে। কমরেড শিবদাস ঘোষ এই দিকটি আরও প্রাঞ্জল করে দিয়েছেন। ১৯৪৮ সালে সম্পূর্ণ একাকী একজন ব্যক্তি, নিঃস্ব, কেউ চেনে না, কিন্তু সঠিক পথে পদক্ষেপ করে, তীব্র আপসহীন সংগ্রাম করে এক মহান মার্কসবাদী চিন্তাবিদে পরিণত হলেন। মার্কসবাদের উন্নততর উপলব্ধির জন্ম দিলেন এবং ভারতে প্রকৃত বিপ্লবী দল, কমিউনিস্ট পার্টি হিসাবে এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট) গড়ে তুললেন।

কমরেড শিবদাস ঘোষের অবদান মৌলিক

নিজ নিজ দেশে নির্ভুলভাবে মার্কসবাদী লাইন অনুসরণ করে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব করতে গিয়ে মহান লেনিন এবং মাও সে তুঙ যে ভাবে মার্কসবাদী দর্শনের উপলব্ধির আরও উন্নতি ঘটালেন, ঠিক সেই ভাবেই ভারতের বুকে মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে বিশেষীকৃত করলেন কমরেড শিবদাস ঘোষ। তিনি বললেন, যে সব দেশে মার্কসবাদের সঠিক প্রয়োগের ভিত্তিতে বিপ্লব হবে সেই সব দেশে তার নেতার, চিন্তাবিদের চিন্তার মাধ্যমে মার্কসবাদের জ্ঞানভাণ্ডারে নিশ্চিত রূপে কিছু মৌলিক চেতনা জন্মলাভ করবে, সেই জ্ঞানভাণ্ডারে নতুন চিন্তা সংযোজিত হবে। ভারতবর্ষের সর্বহারা শ্রেণির বিপ্লব কমরেড শিবদাস ঘোষ সম্পন্ন করে যেতে পারেননি। তার আগেই অকালমৃত্যু তাঁকে হরণ করে নেয়। তবুও সর্বশক্তি দিয়ে এই বিপ্লবী আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সংগ্রাম করতে গিয়ে মার্কসবাদের জ্ঞানভাণ্ডারে এমন কতগুলো অবদান তিনি রেখে গেলেন, যেগুলো নিঃসন্দেহে মৌলিক।

বুর্জোয়া প্রচারযন্ত্রের চেষ্টা সত্ত্বেও মানুষ আন্দোলনে ফেটে পড়ছে

ভারতের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক সাংস্কৃতিক অবস্থা খুবই মারাত্মক হয়ে উঠেছে। সংকট কোন জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছে? বেকার সমস্যা কোন স্তরে গেছে? মুদ্রাস্ফীতির অবস্থা কী? পুঁজিপতি শ্রেণির তাঁবেদারদের দুর্নীতি কোন পর্যায়ে গিয়েছে? প্রতিটি ক্ষেত্রে অভাবনীয় অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। মানুষ নিঃশব্দে মরছে। ওষুধ নেই, খাদ্য নেই। এ ছবি কোনও পত্রিকাতে আসে? কোনও টেলিভিশন চ্যানেলে ধরা পড়ে? আমার তো এরকম মনে হয় যে, টেলিভিশনের রং-বেরং-এর দৃশ্য দেখতে থাকলে একজন খেতে না পাওয়া মানুষও ভুলে যাবে যে, সে না খেয়ে আছে। বুর্জোয়া প্রচারযন্তে্রর বিষ ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা এই রকমই। পত্র-পত্রিকা, রেডিও, টেলিভিশনের সাথে যুক্ত হয়েছে সোসাল মিডিয়া, স্মার্ট ফোন। এগুলো তো পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থরক্ষা করতে গিয়ে প্রতিদিন মানুষের বিক্ষোভ আন্দোলনকে একেবারে গোড়া থেকেই মারার চেষ্টা করছে। কিন্তু তবুও এটাও সত্য যে পুঁজিপতি শ্রেণির বশংবদ রাজনৈতিক দলগুলোর এই ধরনের ন্যক্কারজনক কার্যকলাপ সত্ত্বেও শোষিত জনগণের বিক্ষোভ আন্দোলনকে তারা সমূলে দমন করতে পারেনি। আজ হত্যাকাণ্ড, কাল নারী নির্যাতন, এই সব অত্যাচারের বিরুদ্ধে শোষিত জনসাধারণ জায়গায় জায়গায় প্রতিবাদ করছে, বিক্ষোভ করছে, প্রতিবাদ-প্রতিরোধ আন্দোলন সংগঠিত করছে।

এখানে সংক্ষিপ্তভাবে পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি উল্লেখ করতে চাই। স্বাধীনতা আন্দোলনের যুগে কলকাতাকে বলা হত সিটি অফ রেভলিউশন। সেই সময়, এমনকি স্বাধীনতার পরেও পশ্চিমবঙ্গ ছিল বামপন্থী আন্দোলনের পীঠস্থান। যদিও আজ এই নামধারী বামপন্থীরা যে কোনও প্রকারে দেশের বিভিন্ন স্থানে বুর্জোয়া ব্যবস্থায় সরকারি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া আর টিকে থাকার জন্যে পুঁজিপতি শ্রেণির নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব মেনে নিয়ে গণ-আন্দোলনের পথ বর্জন করে বাস্তবে দক্ষিণপন্থী হয়ে উঠেছে। অন্য দিকে আমাদের সাংগঠনিক ক্ষমতা এই বিরুদ্ধ পরিবেশে বাড়লেও সমস্ত জনগণকে এখনও নেতৃত্ব দেওয়ার অবস্থা আমাদের নেই। তবুও আমি লক্ষ করছি, কোনও দল এগিয়ে এসে অন্যায় অত্যাচারের প্রতিবাদ না করলেও সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় বেরিয়ে আসছে, বেঁচে থাকার দাবি পূরণের জন্য বলিষ্ঠ আন্দোলন করছে, আত্মত্যাগ করছে, জেলে যাচ্ছে, পুলিশের মারধর সহ্য করছে। এটা শুধু পশ্চিমবঙ্গ বা আমাদের দেশে নয়, বেশ কয়েকটি দেশে গণঅভ্যূত্থানের মতো ঘটনা ঘটেছে। সম্প্রতি শ্রীলঙ্কাতে কী চলছে? হাজার হাজার মানুষ রাস্তায়–খাদ্য নেই, পরিধানের কাপড় নেই, অসহায় হয়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসছে এবং সরকার গুলি করে মারছে। তবুও মানুষ ঘরে ফিরে যেতে চাইছে না। যাবে কেমন করে? কী আছে সেখানে? মানুষ আজ যথার্থই সর্বহারা।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষ বেঁচে থাকার পথ খুঁজে না পেয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিক্ষোভ আন্দোলনে সামিল হচ্ছে। অভিজ্ঞতার আলোকে কিছু পরিমাণ হলেও মানুষের চোখ খুলছে। কম-বেশি পরিমাণে সমস্ত পুঁজিবাদী দেশেই পুঁজিপতি শ্রেণির নির্মম শাসন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। ব্রিটেন ও আমেরিকাতে একই জিনিস হচ্ছে। সারা পুঁজিবাদী দুনিয়ায় প্রতিবাদী মানুষের মিটিং-মিছিল হচ্ছে।

ইউরোপের দেশগুলোতেও একই অবস্থা। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন সৃষ্টি কেন হল? ইউরোপের দেশগুলি ঐক্যবদ্ধ হলে দুঃখ কষ্ট দূর হয়ে যাবে, অর্থনৈতিক উন্নতি হবে– এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে গঠিত হওয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের আজকের অবস্থা কী? সেখানেও ভাঙন দেখা দিয়েছে। জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করার জন্য পুঁজিবাদী, সাম্রাজ্যবাদী শাসকরা বলেছিল যে, আমরা সবাই ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্ম দিচ্ছি, সেখানে তোমাদের কোনও অভাব-অভিযোগ থাকবে না, সবারই সমৃদ্ধি হবে। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যে তার সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব দেখা দিল। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা গ্রেট ব্রিটেন তো বেরিয়েই গেল। কেন? তীব্র অর্থনৈতিক সংকট কমার পরিবর্তে বহু গুণে বেড়ে যাওয়ায় সেখানকার জনসাধারণ তাদের সরকারকে বাধ্য করল তা থেকে বেরিয়ে আসতে। একইভাবে আরও কিছু সদস্য দেশ ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা চিন্তা করছে। তীব্র সমস্যার সামনে পড়ে সেইসব দেশের জনসাধারণও এই দাবি তুলছেন। আপনারা লক্ষ করবেন, বুর্জোয়া শাসকদের বিভিন্ন প্রকারের অসদাচর়ণ, শুধু মিথ্যে আশ্বাস, এটা করে দেবো, সেটা করে দেবো, আমাদের ভোট দাও, আমরা সরকারে গেলে তোমাদের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, এই কথাগুলো শুনে শুনে শোষিত জনগণ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। এই কথাগুলো মানুষ বিশ্বাস করছে না। এটা ঠিক যে মানুষ ধীরে ধীরে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বুঝতে পারছে, ভোট রাজনীতিতে কিছু হবে না। কিছু যদি হয় আন্দোলন করেই হবে। এই ধারণা ও চিন্তার ভিত্তিতে মানুষ রাস্তায় বেরিয়ে আসছেন। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, মানুষের এই আন্দোলনগুলোর সামনে আমাদের দলের বাইরে আর কোনও বিশ্বস্ত নেতৃত্ব নেই। মানুষ বেরিয়ে আসছে, কিন্তু সঠিক রাজনৈতিক আদর্শে পরিচালিত নেতৃত্ব বাদ দিয়ে আন্দোলন সঠিকভাবে পরিচালিত হবে কেমন করে? বিজ্ঞানসম্মত প্রক্রিয়ায় কেমন করে পরিচালিত হবে আন্দোলন? এই জন্যই কমরেড শিবদাস ঘোষ বলেছেন, গণআন্দোলন অতি অবশ্যই পরিচালিত হতে হবে সঠিক বিপ্লবী দলের নেতৃত্বে। শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র, যুবক, মহিলাদের আন্দোলনের বন্যার জন্ম দিতে হবে। কিন্তু সেটা যদি শুধু স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন হয়, সেখানে যদি বিপ্লবী বিশ্বস্ত সংগ্রামী নেতৃত্ব না থাকে, তা হলে বুর্জোয়ারা হয় মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করবে, আর না হলে লাঠি-গুলি দিয়ে আন্দোলন স্তব্ধ করে দেবে। সংগ্রামী জনসাধারণকে মাথা তুলে দাঁড়াতে দেবে না। সুতরাং বারবার কমরেড শিবদাস ঘোষ সংগ্রামী জনগণকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন, এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় ভোটের মাধ্যমে সরকার বদলে কোনও কিছু হবে না। কেবলমাত্র ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করার মাধ্যমেই ন্যায্য স্বার্থ পূরণ হতে পারে এবং এই আন্দোলনগুলো বিপ্লবী দলের নেতৃত্বে গড়ে তুলতে হবে। নেতৃত্ব ঠিক থাকলে কিছু কিছু দাবি আদায় হবে। প্রথমবার হয়তো আটটা দাবি থাকলে তার তিনটে আদায় হবে। একটা দাবি আদায়ের পর আর একটা আন্দোলন হবে, কিন্তু ভোটের মাধ্যমে নয় বা অন্য কোনও পথেও নয়, জ্যোতিষীর দ্বারাও নয়, যাগ-যজ্ঞ, আজানের দ্বারাও নয়। জ্বলন্ত দাবিগুলোর ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য, ন্যায্য দাবিপূরণের জন্য বিপ্লবী দলের নেতৃত্বে আন্দোলন পরিচালিত হতেই হবে।

পৃথিবীর সব দেশে অর্থনৈতিক সংকট তীব্র হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে সব দেশেই আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে সঠিক বিপ্লবী নেতৃত্বে। বিপ্লবী দল নেতৃত্ব দিলে শেষপর্যন্ত এই সব আন্দোলন পুঁজিবাদী রাষ্ট্রযন্ত্রকে ভেঙে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথ উন্মুক্ত করবে। সাথে সাথে এই কথাটা আমি বলতে চাই যে এখনও সমাজের সব জায়গায় প্রধান ধারা কিন্তু আন্দোলন নয়। প্রকৃত বিপ্লবী আন্দোলনের সম্প্রসারণ না ঘটলে সেটা হবে কেমন করে? সুতরাং নির্বাচনের মাধ্যমে যে শোষিত জনসাধারণের মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধান, শোষণ নির্যাতনের অবসান সম্ভব নয়– এই কথাটা বারবার জনসাধারণকে বোঝাতে হবে। এই ক্ষেত্রে আমি উল্লেখ করতে চাই যে, কমরেড শিবদাস ঘোষ বারবার আমাদের হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে, শুধু সমস্যাগুলো বর্ণনার মাধ্যমে নয়, জনসাধারণকে তত্ত্বের মাধ্যমেই বোঝাতে হবে। সমস্যার বর্ণনা শুনে শুনে জনসাধারণের কাছে এই কথাগুলো কিছুটা গা-সওয়া হয়ে গেছে। কিন্তু বিপ্লবীরা নতি স্বীকার করে না। তারা শুধু তাদের সংগ্রাম তীব্রতর করতে পারে। আবার আপনাদের আমি বলব, ঠিক ঠিক ভাবে আপনারা অনুভব করুন, গরিব আরও গরিব হচ্ছে, গরিব মানুষ কিছু না পেয়ে শেষপর্যন্ত আত্মহত্যা করছে। আর আত্মহত্যা যারা আজও করে উঠতে পারেনি, তারা মনে মনে ভাবছে, বেঁচে থেকে লাভ নেই।

ভয়াবহ সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংকট

অর্থনৈতিক জীবনযাত্রা, এমনকি হিংসা, হত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি, অসহিষ্ণুতা, মূল্যবোধের মৃত্যু সীমাহীন দুর্নীতির প্রাদুর্ভাব দিন দিন প্রবল হয়ে উঠছে। একথা অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই। আজ ঋণ পরিশোধ করার কোনও পথ না পেয়ে সর্বস্বান্ত মানুষ আত্মহত্যা করে বাঁচার পথ বেছে নিচ্ছে। আর দিন দিন এই প্রবণতা বেড়েই চলেছে। আবার কোথাও গোটা পরিবার আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। এইসব ঘটনা প্রতিদিন বাড়ছে। এই সব নিয়ে আমাদের দলের বাইরে আর কোনও দলকে আপনারা চিন্তা করতে দেখেছেন? শুধু তাই নয়, আজ গোটা সমাজজীবন, পারিবারিক জীবন, মানুষের সাথে মানুষের মমতা-স্নেহের সম্পর্ক সবই লোপ পেয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশ সহ সমস্ত পুঁজিবাদী দেশেই এই সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংকট সংঘাতিক আকার ধারণ করেছে। একটার পর একটা মূল্যবোধ ধসে পড়ছে। শোষিত সর্বস্বান্ত জনসাধারণের সামনে বেঁচে থাকার কোনও সুস্থ, ন্যায়সঙ্গত উপায় নেই। পুঁজিবাদী শাসকরা এই অবস্থার সুযোগ নিয়ে গরিব সর্বস্বান্ত মানুষকে অ্যান্টিসোসাল, গুন্ডা, বদমাশ বানাচ্ছে এবং তাদের ব্যবহার করে ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনগুলিকে ধ্বংস করার চেষ্টা করছে।

কী ভয়ানক চক্রান্ত ভেবে দেখুন, যারা মানুষকে শোষণ করে শেষ করে দিচ্ছে, নানা ভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে, সমস্ত মূল্যবোধ কেড়ে নিচ্ছে, তারাই আবার মানুষকে বর্বর হত্যাকারী বানাবার চেষ্টা প্রতি মুহূর্তে করছে। মহান চিন্তাবিদ কমরেড শিবদাস ঘোষ আমাদের প্রশ্ন করেছেন– বলুন, এই অগ্নিগর্ভ অবস্থা আপনার থেকে কী চাইছে? অনুভব করুন মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা জনসাধারণ আপনাদের কাছে কী আবেদন জানাচ্ছেন? এই অবস্থায় আমাদের কর্তব্য ধরিয়ে দিয়ে তিনি বলেছেন– এই অবস্থায় পুঁজিপতি শ্রেণির শোষণের বিরুদ্ধে শোষিত নির্যাতিত ৯৫ শতাংশ মানুষের যে মৌলিক দ্বন্দ্ব কাজ করছে, তাকে ঠিক ঠিক ভাবে উপলব্ধি করে তাদের জঙ্গি গণতান্ত্রিক আন্দোলনগুলোর মধ্য দিয়ে শ্রেণিসংগ্রামের দিকে নিয়ে যেতে হবে। তাকে বানচাল করার জন্য শোষক পুঁজিপতি শ্রেণি যে কৌশলগুলো অবলম্বন করছে, শোষিত জনসাধারণের নৈতিক বল ধ্বংস করার যে চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছে, তাকে প্রতিহত করতে হবে, ব্যর্থ করতে হবে।

চাই সর্বহারা শ্রেণিচেতনা ও মূল্যবোধ

 এই অবস্থায় বিশ্বের সব বিপ্লবী দলকে সর্বহারা বিপ্লবী চেতনায়, মূল্যবোধ নতুন করে জাগিয়ে তুলতে হবে। এখন দেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতির সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্পর্কে আবার আমি দু-একটা কথা বলতে চাই। সেটা হল, কংগ্রেস যে বুর্জোয়া শ্রেণির একটা অতি বিশ্বস্ত দল, আমরা ছাড়াও দেশের চিন্তাশীল অনেক লোক এই সম্পর্কে সচেতন। ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার সময় থেকে ওই শতকের শেষ পর্যন্ত গোটা দেশে কংগ্রেস শাসনের সময় নির্মম শোষণ, দুর্নীতি, ভ্রষ্টাচার, অনাচার-অত্যাচারের বলি হয়ে মানুষ ক্রমশ অভিজ্ঞতার নিরিখে বুঝল যে কংগ্রেসের দ্বারা আর হবে না। আর এই সুযোগেই পুঁজিপতি শ্রেণি তাদের দ্বিতীয় দল, আরএসএস-এর রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপিকে সামনে নিয়ে এল এবং ভোটে জিতিয়ে তাকে ক্ষমতায় বসিয়ে দিল। উল্লেখ্য, সিপিআই, সিপিআই(এম) নিজেদের বামপন্থী বলে দাবি করলেও বামপন্থার যে মর্মবস্তু– জাতি, ধর্ম, ভাষা, বর্ণ, নির্বিশেষে সমস্ত খেটে খাওয়া শ্রমজীবী জনসাধারণকে ঐক্যবদ্ধ করে শোষণ-নির্যাতনের বিরুদ্ধে লাগাতার শক্তিশালী গণআন্দোলন গড়ে তোলার যে আদর্শ, পুঁজিপতি শ্রেণির সঙ্গে সমঝোতা গড়ে তুলতে গিয়ে তা পরিত্যাগ করল। আর এইভাবেই এই অবস্থার সুযোগ নিয়ে বুর্জোয়া শ্রেণি আরএসএস-বিজেপি চক্রকে ক্ষমতায় আনার পথ সুগম করে দিল। টাকা-পয়সা এবং প্রচার যন্তে্রর ঢল নামিয়ে পুঁজিপতি শ্রেণি তাদের সাহায্য করল। ১৯৯৮ সালে কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পর থেকে একটার পর একটা রাজ্যে তারা ক্ষমতায় বসতে থাকল। তখন থেকে আজ অবধি অবস্থা একই রকম। যে বাকি ক’টা অ-বিজেপি রাজ্য এখনও কোনও প্রকারে টিকে আছে, সেই সরকারগুলো বিজেপির হাতে পরাজিত হওয়ার ভয়ে আতঙ্কিত।

এখন প্রশ্ন হল, এই অভাবনীয় ঘটনা ঘটল কেমন করে? চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়াশীল দক্ষিণপন্থী শক্তির এই উত্থানের মূল কারণ যথার্থ সংগ্রামী বামপন্থী ভাবধারায় জাতি-ধর্ম-ভাষা-বর্ণ নির্বিশেষে সমস্ত শোষিত জনসাধারণকে ঐক্যবদ্ধ করে তাদের ন্যায্য এবং জরুরি দাবিগুলো পূরণের দাবিতে লাগাতার শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তুলতে সিপিআই, সিপিআই(এম)-এর মতো বামপন্থী বলে দাবিদার দলগুলো এগিয়ে এল না। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিল পুঁজিপতি শ্রেণি, আরএসএস, বিজেপি। বামপন্থী বলে দাবি করা সিপিআই(এম) এবং তাদের সহযোগী দলগুলো ভোটের মাধ্যমে এবং পুঁজিপতি শ্রেণির সহায়তা নিয়ে পুঁজিপতি শ্রেণির দলগুলোর মতোই ক্ষমতায় যাওয়ার রাস্তা পরিষ্কার করতে মুখেমাঝে-মধ্যে আন্দোলনের কথা বলে। কিন্তু আসলে তারা গণআন্দোলনের পথ পরিহার করেছে।

এইখানে আপনাদের আমি স্মরণ করাতে চাই যে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ভিতর থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মহান লেনিনের শিক্ষার ভিত্তিতে কমরেড শিবদাস ঘোষ বলেছেন, নির্বাচন না থাকা অবস্থায় বিপ্লবী পার্টির নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ঢেউ তৈরি হওয়ার পথে যখন নির্বাচন আসবে, তখন বিপ্লবী দল এবং তার মিত্র দলগুলি মিলে এই নির্বাচনের সামনে একটা সাধারণ কর্মসূচির ভিত্তিতে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। আর জোটবদ্ধ হয়ে যদি তারা পার্লামেন্টের ভিতরে এক বা একাধিক প্রতিনিধি পাঠাতে পারে তাহলে বাইরে যে দাবিগুলি নিয়ে আন্দোলন করবে, বিধানসভা, সংসদের ভিতরে বিপ্লবী বিধায়করা-সাংসদরা বলিষ্ঠভাবে জনসাধারণের সেই দাবিগুলো মেনে নেওয়ার জন্য সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করবে। এইভাবে কয়েকটা সিটে যদি জেতা যায়, তা হলে বিধানসভা এবং সংসদের ভিতর এবং বাইরে এইভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়াই হবে বিপ্লব না হওয়া পর্যন্ত বিপ্লবী আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পথ, এটাই হচ্ছে মূল কথা। এটাই হচ্ছে সঠিক রণনীতি।