Home / খবর / বিশ্বের ‘বৃহত্তম গণতান্ত্রিক’ রাষ্ট্র ভারতে ধন বৈষম্যের কুৎসিত চেহারা

বিশ্বের ‘বৃহত্তম গণতান্ত্রিক’ রাষ্ট্র ভারতে ধন বৈষম্যের কুৎসিত চেহারা

১৩০ কোটি মানুষ উদয়াস্ত পরিশ্রম করছেন৷ কলে–কারখানায়, মাঠে–ঘাটে, শহরে–গ্রামে তাঁরা ঘাম ঝরিয়ে উৎপাদন করে চলেছেন সম্পদ৷ তবু কেন ভারতের অর্ধেকের বেশি মানুষ দু’বেলা পেট পুরে খেতে পায় না, রোগে ওষুধ জোটে না, পড়ে থাকে অশিক্ষার, কুসংস্কারের অন্ধকারে? তাদের সৃষ্টি করা সম্পদ তা হলে যাচ্ছে কোথায়?

এর উত্তরে মার্কসবাদ– লেনিনবাদ ও শিবদাস ঘোষের চিন্তাধারাকে ভিত্তি করে আমরা দীর্ঘদিন যা বলে আসছি তা আবারও সঠিক প্রমাণিত হল৷ ২১ জানুয়ারি প্রকাশিত অক্সফাম ইন্টারন্যাশনালের সমীক্ষা রিপোর্টে৷ দেখা যাচ্ছে, দেশের মোট সম্পদের ৭৭.৪ শতাংশ জমা হয়েছে মাত্র ১০ শতাংশ মানুষের হাতে৷ তাদের মধ্যে অতি ধনী ১ শতাংশেরই কুক্ষিগত মোট সম্পদের ৫১.৫৩ শতাংশ৷ ১১৯ জন ধনকুবেরের সম্পদ বেড়েছে ৩৯ শতাংশ হারে, আর নিম্নতম আয়ের ১৩ কোটি ৬০ লক্ষ মানুষের রোজগার বেড়েছে মাত্র ৩ শতাংশ৷ এ দেশের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি মুকেশ আম্বানির সম্পদের পরিমাণ ২ লক্ষ ৮০ হাজার কোটি টাকা৷ যা কেন্দ্র এবং সমস্ত রাজ্য সরকারের চিকিৎসা, জনস্বাস্থ্য, শৌচাগার–নিকাশি ব্যবস্থা এবং জলবন্টন খাতে সম্মিলিত বরাদ্দের থেকে বেশি৷ এদিকে আগেই ভারত সরকারের নিজের সমীক্ষাই দেখিয়েছে, দেশের ৭৭ শতাংশ লোকের দিনে ২০ টাকা খরচ করারও সামর্থ্য নেই৷ আর্থিক বৈষম্যের দিক থেকে ভারত সবচেয়ে পিছনের সারির একজন৷ বিশ্বের শেষ ১১ দেশের মধ্যে স্থান হয়েছে বিশ্বের ‘দ্বিতীয়’ বৃহত্তম গণতন্ত্র ভারতের৷

সমীক্ষা দেখিয়েছে, সারা বিশ্বে দেশে দেশে সাম্রাজ্যবাদী–পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় বৈষম্যের স্বরূপ একই৷ বিশ্বে মাত্র ২৬ জন ধনকুবেরের সিন্দুকে যত সম্পদ জমা হয়েছে তা পৃথিবীর ৩৮০ কোটি লোকের কাছে থাকা সম্পদের সমান৷ সারা বিশ্বের ২২০০ ধনকুবেরের সম্পদ প্রতিদিনে বাড়ে ১৭ হাজার ৮০৩ কোটি টাকা৷ গত এক বছরে গড়ে ১২ শতাংশ হারে সম্পদ বেড়েছে তাদের৷ অন্যদিকে দরিদ্র মানুষের আয় কমেছে বছরে ১১ শতাংশ হারে৷ বিশ্বের সবচেয়ে ধনী আমাজন কোম্পানির মালিক জেফ বেজোসের সম্পদের মাত্র ১ শতাংশ ইথিওপিয়ার সাড়ে দশ কোটি মানুষের স্বাস্থ্য খাতে মোট বরাদ্দের সমান৷

গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী সরকারগুলি যে উন্নয়নের ঢাক বাজায়, তাতে উন্নয়ন হয় কাদের, তা এই সমীক্ষাতেই প্রতিষ্ঠিত৷ এই উন্নয়নের খরচ জোগায় কারা? অক্সফাম রিপোর্ট বলছে, সবচেয়ে ধনীরা কর দেয় সবচেয়ে কম৷ কর বাবদ সরকারের ১০০ টাকা আয় হলে ধনীরা প্রত্যক্ষ কর দেয় খুব বেশি হলে ৪ টাকা৷ ৯৬ শতাংশ কর আসে মধ্যবিত্ত এবং দরিদ্রদের ঘাড় ভেঙে পরোক্ষ করের মাধ্যমে৷ সমীক্ষকদের হিসাব, ভারত সহ বিশ্বের বড় বড় কিছু দেশের সরকারগুলি ধনীদের আয়ের উপর মাত্র ০.৫ শতাংশ প্রত্যক্ষ কর বাড়ালেই বিশ্বের ২৬ কোটি ২০ লক্ষ স্কুছুট ছাত্রের নিখরচায় পড়াশোনা এবং ৩ কোটি মানুষের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সারাজীবন চিকিৎসা ওই টাকাতেই হওয়া সম্ভব৷ এই রিপোর্ট দেখিয়েছে, এই বিশ্বে সাড়ে তিন লক্ষ মানুষ কোনওরকম চিকিৎসার সুযোগ নিতে না পেরে প্রতি বছর মারা যায়৷ ধনকুবেররা যে পরিমাণ কর ফাঁকি দিচ্ছে বলে অক্সফাম দেখিয়েছে, টাকায় তার পরিমাণ সাড়ে পাঁচ কোটি–কোটি টাকা, অর্থাৎ ৫ এর পর ১৪টি শূন্য বসালে কিছুটা কাছাকাছি সংখ্যা লেখা যাবে৷ শুধু উন্নয়নশীল দেশগুলি থেকে কর ফাঁকির জন্য বিদেশে পাচার হয় বছরে ১২ লক্ষ ১৫ হাজার কোটি টাকার বেশি৷ বিজেপি গর্ব করে বলতে পারে, বিজয় মালিয়া, নীরব মোদিদের প্রশ্রয় দিয়ে তারা বেশ আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখেছে!

অক্সফাম রিপোর্ট আরও দেখিয়েছে, দেশে দেশে দারিদ্র কমার যে কথা এতদিন বিশ্বব্যাঙ্ক থেকে শুরু করে সমস্ত বুর্জোয়া সরকারগুলি বলছিল, তাও ভাঁওতা৷ ধনকুবেরদের সম্পদ যত বেড়েছে তার সাথে পাল্লা দিয়ে কমেছে দরিদ্র মানুষের স্বাস্থ্য–শিক্ষা–পুষ্টিকর খাদ্যের জন্য ব্যায়ের সামর্থ্য৷ বিশ্বব্যাঙ্ক দেখিয়েছে, তৃতীয় বিশ্বের ৭৭ শতাংশ দরিদ্র পরিবারের আয় যেখানে দৈনিক দুই ডলারের কম (ভারতীয় মুদ্রায় ১ ডলার, ৭১ টাকা প্রায়)৷ সেখানে গড়ে আজকের দিনের ন্যূনতম সুস্থ জীবন যাপনের খরচ সাড়ে ৫ ডলারের বেশি৷ যত দারিদ্র বাড়ছে, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গিয়ে বাজারের সংকট বাড়ছে৷ ততই বাড়ছে মুষ্টিমেয় ধনকুবেরের মুনাফা৷ এমনকী বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদদের চোখেও এই ভয়াবহ বৈষম্য বিপর্যয়কর মনে হচ্ছে৷ তাঁরা মাথা খুঁড়ে মরছেন, কীভাবে পুঁজিবাদকে সংকট থেকে উদ্ধার করা যায়৷ সংকট যে ভয়াবহ খোদ আমেরিকাই আজ দুনিয়ার সবচেয়ে বেশি ঋণগ্রস্ত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে৷ তাদের রাষ্ট্রীয় ঋণ ২১ লক্ষ কোটি ডলারের বেশি৷  তাদের করপোরেট সংস্থাগুলির ঋণ ১০ লক্ষ কোটি ডলার, যা থেকে মুক্ত হওয়ার কোনও পথ পাচ্ছে না তারা (ওয়ার্ল্ড ইকনমিক ফোরাম সম্মেলনের রিপোর্ট ২০১৯)৷

পুঁজিপতিদের পরিচালিত সংবাদমাধ্যম দেশে দেশে মানুষকে বোঝায়, ভোটে সরকার পাল্টাও সংকট মিটে যাবে৷ সরকার বদলায়– মানুষের সংকট কাটে না৷ এ হচ্ছে পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অমোঘ নিয়ম৷ বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের উদগাতা মহান দার্শনিক কার্ল মার্কস ১৮৬৭ সালে তাঁর ঐতিহাসিক গ্রন্থ ‘পুঁজি’–তে সুনির্দিষ্টভাবে দেখিয়েছিলেন পুঁজিপতিদের মুনাফার একমাত্র উৎস শ্রমিককে লুণ্ঠন৷ আজ পর্যন্ত কোনও বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদ তাকে খণ্ডন করতে পারেননি৷ মার্কস দেখিয়েছিলেন, পুঁজিপতিদের মুনাফার একমাত্র উৎস হল জীবন্ত শ্রম দ্বারা সৃষ্ট মূল্য৷ পুঁজিপতিরা শ্রমিকের শ্রমশক্তি কিনতে তাকে যে মজুরি দেয়, শ্রমিক তার ব্যয়িত শ্রম–ঘন্টার সামান্য একটু অংশেই তার মূল্য উৎপাদন করে ফেলে৷ উৎপাদিত মূল্যের বাকি অংশটা আত্মসাৎ করে পুঁজিপতি৷ এই উদ্বৃত্ত মূল্যই হল মুনাফা৷ মার্কস সেদিন হিসাব করে দেখিয়েছিলেন, মালিকের মুনাফা বাড়ানোর একমাত্র উপায় হল উৎপন্ন মূল্যের থেকে শ্রমিকের প্রাপ্য কমানো৷ তিনি দেখান, শ্রমিক যত মূল্য উৎপাদন করেছে তার সাথে উদ্বৃত্ত মূল্যের অনুপাতই ঠিক করে দেয় মালিক কত মুনাফা করতে পারবে৷ আজকের দুনিয়াতে কী দেখছি আমরা? ১৯৮০–৮১–তে ভারতে সংগঠিত ক্ষেত্রে ১০০ একক মূল্য উৎপাদনে শ্রমিকের মজুরির ভাগ ছিল ২৮.৫ শতাংশ৷ ২০১২–১৩ সালে তা দাঁড়ায় ১১ শতাংশ (আইএলও, এশিয়া প্যাসিফিক ওয়ার্কিং পেপার সিরিজ, ২০১৭)৷ যদিও সরকারি আমলা, মিলিটারি অফিসার থেকে শুরু করে বড় বড় বহুজাতিকের কর্তাদের বেতনও এই গড় হিসাবে ধরা আছে৷ ফলে বাস্তবে সাধারণ শ্রমিকের মজুরির গড় আরও অনেক নিচে৷ সরকার তার সঠিক হিসাব প্রকাশ করে না৷ অসংগঠিত ক্ষেত্রের হিসাব আরও খারাপ৷ এর পরেও বৈষম্যের কারণ খুঁজতে কি বিশ্ব ঢুঁড়তে হবে! মার্কসবাদ এভাবেই পুঁজিবাদী মুনাফার পর্দা ফাঁস করে দিয়েছে৷

মার্কস দেখিয়েছেন, শ্রমিকের উৎপাদশীলতা যত বাড়ে, যত যন্ত্র আসে– তত কমে শ্রমিকের প্রাপ্যের অনুপাত৷ কর্মসংস্থানও কমে৷ একদিকে পণ্যের উৎপাদন খরচ কমে, একই সাথে বাড়ে উদ্বৃত্ত মূল্যের হার৷ তাঁর প্রজ্ঞাদীপ্ত সিদ্ধান্ত ছিল, পুঁজির বিনিয়োগ বাড়লেই যে বাড়তি শ্রমিক কাজ পাবে তার কোনও মানে নেই৷ অথচ একদল বামপন্থী বলে পরিচিত তাত্ত্বিকও আজকের দিনে দাঁড়িয়ে করপোরেট মালিকদের শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগেই কর্মসংস্থান হবে বলে শ্রমিকদের মিথ্যা বোঝায়৷ মার্কস দেখালেন, পুঁজি সৃষ্টি হয় শ্রমের ফসলেই৷ পুঁজিবাদী সমাজে শ্রমিক উৎপাদন করে, তার উৎপাদনটা হয় সামাজিক৷ কিন্তু শ্রমের উপকরণ, শ্রমের ফলে উৎপন্ন দ্রব্যের মালিকানা থাকে পুঁজিপতির হাতে৷ মার্কসের ভাষায়, ‘‘একদিকে একদল ক্রেতা যারা যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ও জীবনধারণের উপকরণাদি, যার মধ্যেও একমাত্র অনাবাদী জমি ছাড়া বাকি সব কিছু হল শ্রমোৎপন্ন দ্রব্য, এ সমস্ত কিছুরই মালিক, এবং অন্যদিকে আর একদল বিক্রেতা, যাদের শ্রমশক্তি, খাটবার দু’খানা হাত ও মাথা ছাড়া বেচবার মতো আর কিছুই নেই– এমন আশ্চর্য ঘটনা ঘটে কী করে?… অর্থতাত্ত্বিকরা বলেন ‘পূর্ববর্তী বা আদি সঞ্চয়’, কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে যাকে বলা উচিত ‘আদি লুণ্ঠন’৷’’ (কার্ল মার্কস, মজুরি–দাম– মুনাফা) মার্কসই দেখালেন মেহনতি মানুষের হাত থেকে শ্রমের উপকরণকে কেড়ে নিয়েছে যে ঐতিহাসিক লুণ্ঠন প্রক্রিয়া, তা জন্ম দিয়েছে চূড়ান্ত সামাজিক বৈষম্যের৷ পুঁজিবাদকে টিকিয়ে রেখে কোনও টোটকাতেই যে সংকট কাটতে পারে না, তা দেখিয়ে গেছেন মার্কসই৷ কারণ পুঁজির চরিত্রই যে শোষণ৷ পুঁজি কী? মার্কসের ভাষায় পুঁজি হল– ‘‘মৃত শ্রম, যা বেঁচে থাকে কেবলমাত্র রক্তচোষা পিশাচের মতো জীবন্ত শ্রমকে শোষণ করেই৷ যত বেশি বেশি দিন সে বাঁচে, তত বেশি শ্রমকে সে শোষণ করে চলে৷’’ (পুঁজি, প্রথম খণ্ড)৷ তাই মার্কসবাদকে হাতিয়ার করে পুঁজিবাদ উচ্ছেদের নতুন লড়াই গড়ে তোলা ছাড়া এই ভয়াবহ বৈষম্যকে দূর করার কোনও উপায় নেই৷

মার্কস দেখিয়েছেন, যন্ত্রসভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে যে বিপুল উৎপাদিকা শক্তি বাড়ে তা পুঁজিবাদী বাজারে ডেকে আনে সংকট৷ শোষণের শিকার সমাজের অধিকাংশ মেহনতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ক্রমাগত তলানিতে নেমে যায়৷ বেকারি বাড়ে৷ বাজারে উপচে পড়ে উৎপাদিত পণ্যের রাশি৷ ফলে উৎপাদনও সংকুচিত হয়৷ দারিদ্র বাড়ে৷ একবার সংকট, আবার কিছুদিনের জন্য একটু সংকট মুক্তির আশার পরেই আসে আবার সংকট৷ যত যন্ত্র আসে, টেকনোলজি আসে, তত সুলভে বিক্রি হয় শ্রমিকের শ্রমশক্তি৷ তত বাড়ে তার মানুষের জীবনের সংকট৷ যা আবার ডেকে আনে বাজার সংকট৷ আসে ছাঁটাই এর ধাক্কা৷ এই চক্র থেকে পুঁজিবাদী অর্থনীতির মুক্তি নেই৷ যন্ত্র ও মানুষ কোনওটারই উৎপাদন করার পূর্ণ ক্ষমতা পুঁজিবাদ কাজে লাগাতে পারে না৷

মার্কসের সুযোগ্য ছাত্র লেনিন দেখিয়েছিলেন, পুঁজিবাদের অবাধ প্রতিযোগিতার যুগ শেষ হয়ে গেছে বহুদিন আগেই৷ আর আজকের দুনিয়াতে একচেটিয়া তথা সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির মূল লক্ষ এখন সুদের ব্যবসা, শেয়ার বাজারের ফাটকার কারবারই পুঁজির গন্তব্য৷ আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে বিশ্বের প্রথম সর্বহারা বিপ্লবের রূপকার মহান নেতা লেনিন দেখিয়েছিলেন, ‘‘পুঁজিবাদের বিকাশ আজ এমন একটা স্তরে পৌঁছেছে যখন… প্রধান মুনাফাটা যাচ্ছে ফিনান্স কারচুপির ‘প্রতিভাবান’দের হাতে৷ এইসব কারচুপি ও ঠগবাজির ভিত্তিতে রয়েছে উৎপাদনের সামাজিকীকরণ৷ কিন্তু এই সামাজিকীকরণ করতে মানবজাতি যে বিপুল অগ্রগতি ঘটিয়েছে তা কাজে লাগছে…ফাটকাবাজদের’’(লেনিন, সাম্রাজ্যবাদ–পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায়)৷ তার সাথে যুক্ত হয়েছে অস্ত্র উৎপাদনের প্রতিযোগিতা৷ এটাই আজ একমাত্র বাজার যেখানে একচেটিয়া মালিকরা কিছুটা লাভের মুখ দেখছে৷ তাই যুদ্ধ শুধু আজকের সাম্রাজ্যবাদ–পুঁজিবাদের জন্য ব্যবসা বাড়ানোর হাতিয়ার নয়৷ যুদ্ধই তার প্রধান ব্যবসা৷

দুনিয়া জোড়া এই যে বৈষম্যের রূপ সামনে এসেছে তার নিরসন করার জন্য নানা অর্থনীতিবিদ নানা দাওয়াই দিচ্ছেন৷ কিন্তু যে ভয়াবহ বাজার সংকটের সামনে আজ পুঁজিবাদী ব্যবস্থা পড়েছে তার থেকে মুক্তির কোনও রাস্তাই এই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রেখে আর খোলা নেই৷ একসময় বিশ্বায়নের সোরগোল তুলে একচেটিয়া পুঁজি মালিকরা ভেবেছিল এর মধ্য দিয়ে কিছুটা হলেও বাজার খোলা পাবে তারা৷ দেশে দেশে শুল্কের বাধা কাটিয়ে অবাধে নানা বাজারে পণ্য বা পরিষেবা নিয়ে ঢুকতে পারলেই মুনাফার আশা ছিল তাদের৷ সামাজিক সুরক্ষা খাতে, জনকল্যাণ খাতে, শিক্ষা–স্বাস্থ্য পানীয় জল ইত্যাদি পরিষেবায় সরকারি খরচ কমিয়ে পুঁজি খাটাতে পারলেই বোধহয় আবার বাজার তৈরি হবে এই ছিল ভাবনা৷ বছর পঁচিশ যেতে না যেতেই আবার চাকা উল্টো দিকে ঘুরছে৷ খোদ আমেরিকা–ব্রিটেন থেকে শুরু করে সমস্ত বড় বড় সাম্রাজ্যবাদীরা নিজের দেশে শুল্কের প্রাচীর তুলতে চাইছে৷ ভয়াবহ বাজার সংকটের সামনে দেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা অন্তত কিছুটা ফিরিয়ে আনার আশায় ভারতের কিছু অর্থনীতিবিদ দাওয়াই দিচ্ছেন, সব গরিবের অ্যাকাউন্টে কিছু করে টাকা ভরে দিক সরকার৷ যাকে বলা হচ্ছে সার্বিক ন্যূনতম আয়৷ বুর্জোয়া অর্থনীতির স্বাভাবিক গতিতে যে আর কোনও মতেই ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে না, এই বুর্জোয়া অর্থনীতির ডাক্তারদের কথাতেই তা প্রমাণিত৷ একদল পণ্ডিত এবং সংবাদপত্রের কলমচি আবার এমনও বলছেন, বৈষম্য থাকুক৷ কারণ তাহলেই নাকি উপর থেকে নিচে উন্নয়ন চুঁইয়ে চুঁইয়ে নামবে কিন্তু বৈষম্যের বহর দেখে ঘাবড়ে গিয়ে তাঁদের প্রেসক্রিপশন বৈষম্যও থাকুক, অর্থনীতির চাকাও গড়াক৷ আর তার জন্য সাধারণ মানুষকে কিছু দান খয়রাতি দিয়ে বাঁচাও৷ যাতে তারা কিছু ভোগ্যপণ্য, শিল্পে উৎপাদিত পণ্য অন্তত কিনতে পারে৷ কিন্তু এই সব কোনও প্রেসক্রিপশনেই যে পুঁজিবাদের রোগ সারবে না, তা আজ নিশ্চিত৷ মার্কস ডাক দিয়েছিলেন শ্রমিক শ্রেণিকে–‘‘ন্যায্য শ্রম–দিবসের জন্য ন্যায্য মজুরি– এই রক্ষণশীল নীতির বদলে তাদের (শ্রমিক শ্রেণির) উচিত পতাকায় এই বিপ্লবী মন্ত্র মুদ্রিত করা– মজুরি প্রথার অবসান চাই’’(কার্ল মার্কস, মজুরি–দাম–মুনাফা)৷ পুঁজিবাদের অবসানের মধ্যেই আছে মানুষে মানুষে সকল প্রকার বৈষম্যের অবসানের চাবিকাঠি৷ এ ছাড়া নিছক চোখের জল আর সহানুভূতির মলম দিয়ে সমাজের এই ঘা সারার নয়৷

(গণদাবী : ৭১ বর্ষ ২৭ সংখ্যা)