Home / খবর / বিদ্যাসাগরের মূর্তি গুঁড়িয়ে বিজেপি বুঝিয়ে দিল তারা অন্ধকারের শক্তি

বিদ্যাসাগরের মূর্তি গুঁড়িয়ে বিজেপি বুঝিয়ে দিল তারা অন্ধকারের শক্তি

কলকাতায় বিজেপি সভাপতি অমিত শাহের নেতৃত্বে রোড শো থেকে উন্মত্ত তাণ্ডবে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা হতে পারে, এ ছিল কল্পনারও অতীত৷ তবে মিছিল যাঁরা দেখেছেন, অংশগ্রহণকারী বাহিনীর মারমুখী মেজাজ ও আচরণ যাঁরা শুরু থেকেই খেয়াল করেছেন, তাঁরা অবশ্যই আশঙ্কায় ছিলেন কী হয় কী হয় ভেবে৷ কিন্তু এই ধ্বংসকাণ্ড কি মত্ত দুষ্কৃতীদের তাৎক্ষণিক কোনও উত্তেজনার ফল? মোটেও তা নয়৷

বিজেপি ধর্ম–বর্ণ–জাত নিয়ে যে রাজনীতির চর্চা করে তার সামনে একটা মজবুত প্রাচীরের মতো দাঁডিয়ে আছে বিদ্যাসাগর তথা নবজাগরণের চিন্তা৷ বাংলায় যদি বিজেপি–রাজনীতির ভিত গাড়তে হয় তবে বিদ্যাসাগরকে আঘাত করা খুবই জরুরি৷ বিজেপির নেতারা ভাল করেই জানেন বাংলার জাতপাত কুসংস্কার বিরোধী চিন্তা, যার সূত্রপাত রামমোহন–বিদ্যাসাগ সংগ্রাম থেকেই, সেটাই তাঁদের বঙ্গবিজয়ের পথে প্রধান বাধা৷ তাঁদের এই ভাবনা স্বাভাবিক ভাবেই দলের সব স্তরে সঞ্চারিত৷ ফলে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভেঙে গুঁডিয়ে দিতে ডাণ্ডাধারী অনুগামীদের হাত এতটুকু কাঁপেনি৷ বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভেঙে বিজেপি প্রমাণ করল, দেশের গৌরবময় ইতিহাসের প্রতি তাদের কোনও শ্রদ্ধাবোধ নেই, দেশের মনীষীদের তারা মানে না৷ যথার্থ দেশপ্রেমের কণামাত্রও তাদের নেই৷ আর এস এস ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিল৷ বিজেপি সেই চিন্তারই সন্তান৷ ত্রিপুরায় ক্ষমতায় এসেই তারা লেনিনের মূর্তি ভেঙেছে, কবি সুকান্তের মূর্তি ভেঙেছে৷ আসামে ভেঙেছে রবীন্দ্রনাথের মূর্তি৷ এ রাজ্যে ক্ষমতা দখলের তাড়নায় ভাঙল বিদ্যাসাগরের মূর্তি৷

বিদ্যাসাগরের ভাঙা মূর্তিতে মাল্যদান করেন দলের পলিটবুরো সদস্য করমেড সৌমেন বসু।

কিন্তু বিদ্যাসাগরের চিন্তাকে বিজেপি নেতারা তাঁদের পথের কাঁটা মনে করেন কেন? বাস্তবে বিদ্যাসাগরের চিন্তা সব দিক থেকেই বিজেপির চিন্তার বিরোধী৷ বিজেপি রাজনীতিতে মূলধন করেছে ধর্মীয় গোঁড়ামি, অন্ধ  ধর্মবিশ্বাস, মধ্যযুগীয় চিন্তা–সংস্কৃতি আর ধর্ম–ভাষা–বর্ণগত বিদ্বেষকে৷ বিদ্যাসাগরের চিন্তা ছিল এই সমস্ত কিছুরই বিপরীত৷ বিদ্যার সাগর, দয়ার সাগর, বিধবা বিবাহ প্রবর্তক, সমাজ সংস্কারক, শিক্ষা সংস্কারক প্রভৃতি বিদ্যাসাগরের কর্মকাণ্ডের অন্যতম পরিচয় হলেও তাঁর যেটি সর্বপ্রধান পরিচয়, যাকেই সবচেয়ে বেশি ভয় পাচ্ছেন বিজেপি নেতারা, তা হল তাঁর অধ্যাত্মবাদমুক্ত মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি৷ এই পার্থিব মানবতাবাদী চিন্তাই ছিল সেই যুগের সব চেয়ে উন্নত ও প্রগতিশীল চিন্তা৷ এই চিন্তাকেই তিনি তাঁর সমগ্র জীবনে সত্যের সাধনায় হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করেছিলেন৷ তাই বেনারস কলেজের অধ্যক্ষ ব্যালেন্টাইন সাহেব যখন সংস্কৃত কলেজে বিশপ বার্কলের দর্শন সংক্রান্ত পুস্তক ‘এনকোয়ারি’ পড়ানোর সুপারিশ করেন, তখন বিদ্যাসাগর তার তীব্র প্রতিবাদ করে শিক্ষা দপ্তরের অধিকর্তা এফ জি ময়েটকে লিখলেন, ‘‘কতকগুলি কারণে সংস্কৃত কলেজে বেদান্ত ও সাংখ্য আমাদের পড়াতেই হচ্ছে৷ কারণগুলি এখানে বলার প্রয়োজন নেই৷ কিন্তু সাংখ্য ও বেদান্ত যে ভ্রান্ত দর্শন, তা আর বিবাদের বিষয় নয়৷ তবে ভ্রান্ত হলেও এই দুই দর্শনের প্রতি হিন্দুদের গভীর শ্রদ্ধা আছে৷ আমাদের উচিত সংস্কৃত পাঠক্রমে এগুলি পড়ানোর সময়ে, এদের প্রভাব কাটানোর জন্য ইংরেজি পাঠক্রমের খাঁটি দর্শন দিয়ে এগুলির বিরোধিতা করা৷ বিশপ বার্কলের এনকোয়ারি পড়ালে সেই উদ্দেশ্য সাধিত হবে বলে মনে হয় না৷ কারণ সাংখ্য ও বেদান্তের মতোই বার্কলে একই ভ্রান্ত সিদ্ধান্ত করছেন৷ ইয়োরোপেও এখন আর বার্কলের দর্শন খাঁটি দর্শন বলে বিবেচিত হয় না৷ কাজেই তা পড়িয়ে উদ্দেশ্য সাধিত হবে না৷’’

ধর্মীয় চিন্তায় আচ্ছন্ন ও মত্ত সেই যুগে সত্যের সাধনায় কতটা নিষ্ঠাবান থাকলে, কত গভীরে জ্ঞান–বিজ্ঞানের সাধনায় মগ্ন থাকলে একজনের পক্ষে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব এবং কতটা চারিত্রিক বলিষ্ঠতা থাকলে এভাবে এই রকম একটা চিন্তা প্রকাশ্যে ব্যক্ত করা যায়, সেটা উপলব্ধি করাও আজ অনেক কঠিন৷ এইখানেই এ দেশের রেনেসাঁসের চিন্তার পরিমণ্ডলের মধ্যে একটা গুণগত পরিবর্তন আনলেন বিদ্যাসাগর৷ তাঁর চিন্তা ও কর্মজীবনের দার্শনিক ভিত্তি হল সেকুলার মানবতাবাদ৷

ব্যক্তিগত জীবনে বিদ্যাসাগর ধর্মীয় ভাবধারা থেকে মুক্ত যুক্তি, পরীক্ষিত সত্য এবং বিজ্ঞানের উপর ভিত্তি করেই চলতে চেষ্টা করেছেন৷ ইউরোপে রেনেসাঁসের যুগটাই ছিল বস্তুবাদের যুগ৷ বেকন, হবস, লক, স্পিনোজা, লামের্টিয়ারদের বক্তব্য নিয়ে তখন ইউরোপে বস্তুবাদের জোয়ার চলছে৷ বস্তুবাদকে ভিত্তি করে কান্টের অজ্ঞেয়বাদ, ফুয়েরবাখের মানবতাবাদ ইত্যাদি এসেছে৷ এইসব চিন্তার সাথে বিদ্যাসাগরের খুব ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিল৷ বিদ্যাসাগর ঈশ্বর মানতেন না,  পূজা–আর্চায় বিশ্বাস করতেন না, তবুও এ দেশে কিন্তু তাঁর প্রতি সকলেই শ্রদ্ধাশীল ছিলেন৷ বিদ্যাসাগর ভগবান মানতেন না, তা জেনেও রামকৃষ্ণ বিদ্যাসাগরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন৷ বিবেকানন্দ বলেছিলেন, আমার জীবনে দু’জন বড় মানুষ, একজন রামকৃষ্ণ, আর অপরজন বিদ্যাসাগর৷ বিবেকানন্দ একদিন ভগিনী নিবেদিতাকে বলেছিলেন, উত্তর ভারতে আমার বয়সের এমন একজন লোকও নেই যার উপর তাঁর প্রভাব পড়েনি৷ অথচ সে সময় এ দেশে প্রচলিত গভীর বিশ্বাস ছিল ঈশ্বর না মানলে, ভগবান না মানলে চরিত্র হয় না, মানুষ বড় হয় না৷ বিদ্যাসাগরের চরিত্র ও কর্মসাধনা আমাদের দেখায়, ধর্মকে বাদ দিয়েও উন্নত সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে উঠতে পারে এবং সমাজে তার প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন৷ একজন বলিষ্ঠ সেকুলার হিউম্যানিস্ট হিসাবে বিদ্যাসাগর মনে করতেন, ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত বিষয় এবং ধর্মবিশ্বাসীর ব্যক্তিগত বিশ্বাসের উপর আঘাত করা উচিত নয়৷ কিন্তু সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে, সামাজিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে ধর্মভিত্তিক মূল্যবোধের আজ আর কোনও প্রয়োজন নেই৷ আজ বিজ্ঞানভিত্তিক মানবকেন্দ্রিক মূল্যবোধ প্রয়োজন৷ এই নতুন মূল্যবোধ গড়ে তোলার জন্য তিনি ইউরোপের জ্ঞান–বিজ্ঞান ও বস্তুবাদী দর্শনের সঙ্গে ছাত্রদের পরিচিত করতে চেয়েছিলেন৷ তাঁর বক্তব্য ছিল, ছাত্রদের ইংরেজি শেখাও, ‘মিল’–এর (জে এস মিল) লজিক পড়াও৷ সংস্কৃত শিখিয়ে কুব্জ হয়ে যাওয়া এই জাতির মেরুদণ্ড খাড়া করা যাবে না৷ এই জাতির মেরুদণ্ড খাড়া করতে হলে বিশ্বের জ্ঞান–বিজ্ঞানের সঙ্গে তাকে পরিচিত হওয়ার সুযোগ দিতে হবে৷ ইংরেজি শিখলে দেশের যুবকরা তার মাধ্যমে ইতিহাস, লজিক ও আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তাভাবনার সাথে পরিচিত হবে, ইউরোপের বস্তুবাদী দর্শনের সঙ্গে পরিচিত হবে৷ অথচ বিজেপি আবার সংস্কৃত শিক্ষাকে ফিরিয়ে আনছে৷ বিদ্যাসাগর যে বেদান্তকে ভ্রান্ত দর্শন বলেছেন, সেই বেদান্তের চর্চার জন্য বেদান্ত বিশ্ববিদ্যালয় খুলছে৷

বিদ্যাসাগর নারীশিক্ষার প্রসার চেয়েছিলেন যাতে আধুনিক জ্ঞান–বিজ্ঞানের আলোকে নারীর জাগরণ হয়, তারা ধর্মীয় চিন্তামুক্ত হয়, নারীদের মধ্যে আত্মসম্ভ্রম, অধিকার ও স্বাধীনতাবোধ আসে৷ এর জন্য তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন, জেলার পর জেলায় গ্রামে গ্রামে ছুটে বেড়িয়েছেন, একের পর এক স্কুল স্থাপন করেছেন৷ অথচ হিটলারের মতো বিজেপি–আরএসএস নেতাদের বক্তব্য, রান্নাঘরই হল নারীদের যথার্থ স্থান৷ তাঁরা নারী–পুরুষের সমানাধিকারের বিরোধী৷ সতীদাহ, বাল্যবিবাহকে বিজেপি নেতারা মদত দিচ্ছেন৷ কয়েক মাস আগে রাজস্থান বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির এক নেত্রী বাল্যবিবাহ চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট চাইলেন৷ প্রধানমন্ত্রী সহ কোনও নেতাই তার বিরোধিতা করেননি৷

বিদ্যাসাগরের এই শিক্ষা–বিস্তারের কর্মসূচির একমাত্র লক্ষ্য ছিল, তিনি যে চিন্তায় বিশ্বাস করতেন, অর্থাৎ ধর্মীয় প্রভাবমুক্ত সেকুলার মানবতা৷ তার প্রচার হোক, চর্চা হোক৷ আধুনিক মন জাগুক, শিক্ষিত মন ধর্মীয় কুসংস্কার থেকে মুক্ত হোক৷ বিজেপির প্রতিক্রিয়াশীল, সামন্ততান্ত্রিক ধ্যানধারণায় আচ্ছন্ন রাজনীতি বিদ্যাসাগরের চিন্তার সম্পূর্ণ বিরোধী৷ বিজেপি বিজ্ঞানের চর্চা, যুক্তির চর্চাকে মারতে চায়, ধর্মীয় চিন্তা, কুসংস্কারকে ফিরিয়ে আনতে চায়, যুক্তির পরিবর্তে বিশ্বাসকে বড় করে দেখাতে চায়৷ তাই প্রধানমন্ত্রী সহ সব বিজেপি নেতারা মহাভারতের যুগে ইন্টারনেট ছিল, সীতা টেস্টটিউব বেবি হিসেবে জন্মেছিলেন, গণেশের হাতির মাথা প্লাস্টিক সার্জারির উদাহরণ প্রভৃতি নানা যুক্তিহীন, অবৈজ্ঞানিক হাস্যকর দাবি জোর গলায় প্রচার করে চলেছেন৷ আসলে ফ্যাসিবাদী আদর্শের ধারক বাহক হিসাবে এরা চায় দেশের মানুষের চিন্তা থেকে যুক্তি, বিজ্ঞানভিত্তিক মননকে বিসর্জন দিতে৷ কারণ বৈজ্ঞানিক মনন, বিজ্ঞানের যুক্তির উপর শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সত্যসন্ধানী মানসিকতাকে এরা ভয় পায়৷ এদের লক্ষ্য, দেশের মানুষের চিন্তা– চেতনা–মনন–বিশ্বাসে বিজ্ঞানবিরোধী অন্ধ ধারণা ও কুসংস্কারকে গেঁথে দেওয়া, যাতে হিন্দুত্ববাদের প্রভাব সমৃদ্ধ উগ্র জাত্যভিমান ও মৌলবাদী ভাবনায় তাদের প্রভাবিত করা যায়৷ যুক্তিভিত্তিক ক্রিয়ার বদলে এরা চায় জনসাধারণকে হুকুম পালন করার যন্ত্রে পরিণত করতে৷ এইভাবেই তারা একদিকে তৈরি করতে চায় হিন্দু ভোটব্যাঙ্ক, যা তাদের গদি দখলের সুবিধা করে দেবে, অন্য দিকে এই পথেই দেশে ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে চায়৷

বিদ্যাসাগরের যুগ আলোকপ্রাপ্তির যুগ৷ শুধু এ রাজ্য নয়, দেশজুড়ে সেই আলো সেদিন ছড়িয়ে পড়েছিল৷ আধুনিক সভ্যতা সেই আলোকপ্রাপ্তির ফল৷ বিজেপি অন্ধকারের শক্তি৷ বিদ্যাসাগরের চিন্তা এ রাজ্যে বিজেপির রাজনীতির এগোনোর পথে প্রধান বাধা৷ তাই সেই আলোকপ্রাপ্তিটাকেই সে ধ্বংস করতে চায়৷ বিদ্যাসাগরের উপর আক্রমণ, সেই আলোকপ্রাপ্তির উপর আক্রমণ, নবজাগরণের চিন্তার উপর আক্রমণ৷ কিন্তু দেশের মানুষ বিজেপির এই আক্রমণ কোনও ভাবেই মেনে নেবে না৷ তাই শুধু বাংলা নয়, বিজেপি দুষ্কৃতীদের এই তাণ্ডবে সারা দেশ জুডে প্রবল প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে, সর্বত্র ধিক্কার ধ্বনিত হয়েছে৷ যার ফলে বিজেপি নেতারা পিছু হঠতে বাধ্য হয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন তাঁরা পঞ্চধাতুর মূর্তি গড়ে দেবেন৷ তাঁরা যদি মূর্তি না ভেঙে থাকেন তবে মূর্তি গড়ার কথা প্রধানমন্ত্রী বলছেন কেন?

বিদ্যাসাগরের জন্মের দ্বিশতবর্ষপূর্তি আসন্ন৷ এই উপলক্ষে বিদ্যাসাগরের নীতি–আদর্শ ও জীবনসংগ্রামের ব্যাপক চর্চা ও প্রসারই হবে তাঁর উপর অন্ধকারের শক্তির এই আক্রমণের যোগ্য জবাব৷ আসুন, সেই যোগ্য জবাবই আমরা বিজেপিকে দিই৷

(গণদাবী : ৭১ বর্ষ ৪১ সংখ্যা)