Breaking News
Home / খবর / ‘বিকলাঙ্গ গণতন্ত্র’

‘বিকলাঙ্গ গণতন্ত্র’

(সুচিন্তিত এই প্রবন্ধটি লিখেছেন সারা বাংলা এন আর সি বিরোধী নাগরিক কমিটির সভাপতি, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ১২৫তম জন্মবার্ষিকী কমিটির সভাপতি এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পূর্বতন অ্যাডভোকেট জেনারেল বিমল চট্টোপাধ্যায়)

প্রায় সাত দশকের তথ্য এবং অভিজ্ঞতা বলে যে পশ্চিমবঙ্গে যখনই কোনও গণতান্ত্রিক প্রশাসনের রদবদলের সম্ভাবনা উঁকিঝুঁকি দেয় তখনই সাধারণ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হিংসা, প্রতিহিংসা, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, খুন-জখম হানাহানি ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করে। সেই ভয়ঙ্করতা শহরের তুলনায় গ্রামে গঞ্জে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভয়ঙ্করতর হয়ে ওঠে এবং শেষপর্যন্ত নির্বাচনোত্তর সময় পর্যন্ত প্রলম্বিত হয়। প্রায় সর্বত্র একটা অশান্তি, আশঙ্কার বাতাবরণ সৃষ্টি হয়। সেই বাতাবরণের গেরোয় আমরা ছাপোষা মানুষ, বিশেষ করে শান্তিকামী নাগরিকগণ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ি। এই সময় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সমাজ জীবনের তলানিতে ঠেকে। কিছুই তখন অস্বাভাবিক নয় বলে বোধ হয়। আমরা ওই আবহাওয়ায় ক্লান্ত অবসন্ন এবং আশঙ্কিত বোধ করি এবং এক দুঃসহ সমাজজীবন যাপন করি। এই দুঃসহ অবস্থা নিঃসন্দেহে সর্বৈব ভাবে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী। প্রজাতান্ত্রিক গণতন্ত্রে নাগরিক শান্তিপূর্ণভাবে, নির্বিঘ্নে এবং স্বাধীনভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে এটাই তো স্বাভাবিক হওয়া উচিত এবং রাষ্টে্রর গণতান্ত্রিক পরিকাঠামো তারই সুষ্ঠু ব্যবস্থা করবে, নাগরিকের সেই প্রত্যাশা কোনওভাবেই বেশি চাওয়া বা বেশি পাওয়া নয়। সেই প্রত্যাশা পূরণের অভিপ্রায়ে আমাদের দেশে সরকারি কর্তৃত্ববিহীন একটি নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছে। যে নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতা সহকারে নির্বাচন পরিচালনা করবে।

১৯৫২ সাল থেকে তারাই দেশের লোকসভা এবং রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে। এই সুদীর্ঘ সময়ে একমাত্র নির্বাচন কমিশনার টি এন শেষনের সময় (১৯৯০-১৯৯৬) ছাড়া কোনও সময়ই নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে, নির্বিঘ্নে এবং স্বাধীনভাবে হয়নি। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েও দুর্ভাগ্যজনক ভাবে কোনও কোনও সময় প্রশ্ন উঠেছে। এই মন্তব্যে বিতর্কের কোনও অবকাশ নেই। প্রায় সব সময় পেশিশক্তির সঙ্গে সমস্ত রকমের অস্ত্রশক্তি ব্যবহৃত হয়েছে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার প্রচেষ্টায়। এই দুই শক্তি আবার রাজনৈতিক দলগুলির দুর্নীতিগ্রস্ত মেধা শক্তির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নির্বাচনকে অগণতান্ত্রিক এবং কলুষিত করার উদ্দেশ্যে। প্রতিপক্ষকে ভীতি প্রদর্শন, বুথজ্যাম থেকে শুরু করে ছাপ্পা ভোট, ভোট বাক্স ডাকাতি পর্যন্ত সমস্ত রকমের দুর্নীতির ব্যবহার এই নির্বাচনগুলিতে হয়েছে। এই অগণতান্ত্রিক অবস্থা থেকে কি আমাদের মুক্তির কোনও উপায় নেই? নিরাশাব্যাঞ্জক অভিব্যক্তি দুর্ভাগ্যজনক হলেও দুঃখজনক ভাবে বাস্তব সত্যি। এই দুঃসহ অবস্থাকে কিছুটা হলেও লঘু করবার চেষ্টা করেছে কতকাংশে শক্ত নির্বাচন কমিশন, কখনও বা তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশের উচ্চ এবং সর্বোচ্চ আদালতগুলির প্রয়াস। কোনও আদালতই স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে কখনওই নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করেনি। কিন্তু কোনও নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কেউ যদি তেমন ভাবে নির্বাচনের দোষত্রুটি নিয়ে আদালতে গেছে তখনই প্রয়োজন মাফিক নির্দেশ দিতে আদালত কুণ্ঠাবোধ করেনি বা পিছুপা হয়নি। আদালত নির্বাচনকে দুর্নীতিমুক্ত, স্বাধীন ও স্বচ্ছ করার ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করেছে আর সেই হস্তক্ষেপকে দেশের মানুষ সাধুবাদ জানিয়েছে। সাধারণ নাগরিকের নির্বাচনে অংশগ্রহণকে সুরক্ষিত করার উদ্দেশ্যে দেশের আদালত তার যথাযোগ্য কর্তব্য পালন করে চলেছে।

দেশের বিচারব্যবস্থা যখনই কোনও প্রাক নির্বাচনী সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে অবতীর্ণ হয়েছে তখনই আদালত বলেছে যে একবার নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা হয়ে গেলে বিচারবিভাগের উচিত নয় তার মধ্যে হস্তক্ষেপ করা। এর স্বপক্ষে একটিই যুক্তি কাজ করে যে নির্বাচন সুষ্ঠু এবং স্বাধীনভাবে ঘটানোর দায়িত্বে থাকা নির্বাচন কমিশনের কাজে হস্তক্ষেপ করা সঙ্গত নয় কোনও বিচারালয়ের, যেহেতু তেমন হস্তক্ষেপ অনধিকার হস্তক্ষেপই হবে। আইনসঙ্গত ভাবে সৃষ্ট সুষ্ঠু নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীনভাবে নির্বাচন সংগঠিত করার সুযোগ দেওয়া বিধেয়। এই যুক্তি অবশ্য মনে হয় সম্পূর্ণ নিখুঁত যুক্তি নয়। তেমন প্রয়োজন কালে আদালত যথাযোগ্য নির্দেশ দিতেই পারে নির্বাচন সুসংগঠিত করার প্রয়োজনে অবস্থার চাহিদা অনুসারে। এমনকি নির্বাচন কমিশনকেও তেমন নির্দেশ দেওয়া যেতে পারে ক্ষেত্রবিশেষে। সমস্ত প্রচেষ্টার একটিইমাত্র মহৎ অভিপ্রায় এবং উদ্দেশ্য, সেটা হচ্ছে ত্রুটিবিহীন এবং শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন ঘটানো। কেন না সেটাই গণতান্ত্রিক প্রজাতন্তে্র সর্বোপরি জনস্বার্থ।

সম্প্রতি ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন নিয়ে একটি জনস্বার্থ মামলায় রাজ্যের উচ্চ আদালত হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থেকেছে। অবশ্য নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে একটি অপ্রয়োজনীয় মুচলেকা আদায় করেছে এই মর্মে যে নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু এবং স্বাধীন নির্বাচন ঘটানোর জন্য সব রকমের প্রচেষ্টা চালাবে। এই মুচলেকা অর্থহীন, কেন না নির্বিঘ্নে এবং শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন পরিচালনা করা নির্বাচন কমিশনের আইনানুগ কর্তব্য এবং দায়িত্ব। মাননীয় আদালত তার অভিমত ব্যক্ত করেছে অত্যন্ত সংযতভাবে, কোনও অতিশয়োক্তি নেই এবং প্রায় আইনানুগ ভাবেই। ওই জনস্বার্থ মামলার আবেদনকারীর হতাশ হওয়ার আপাত কোনও কারণ ধরা পড়ে না। শুধু একটিই প্রশ্ন এরপর থেকে যায় এবং সেটা হচ্ছে এই যে– এটা কি ঠিক যে নির্বাচন কমিশনেরই কি একক দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন সংগঠিত করার?

সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন পরিচালনা করা নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক এবং একমাত্র দায়িত্ব হলেও হতে পারে, কিন্তু এটা তার একক দায়িত্ব হতে পারে না। প্রয়োজন বোধে আদালত নির্বাচন কমিশনকে কখনও কখনও সাহায্য এবং সহযোগিতাও করেছে। নির্বাচন কমিশন অবশ্যই একটি নিরপেক্ষ অ-সরকারি প্রতিষ্ঠান কিন্তু তাকে রাজ্য সরকার এবং কেন্দ্রীয় সরকারের উপর নির্ভর করতে হয়। সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন সংগঠিত করার জন্য তার সেই নির্ভরতা অনেক সময়ই উদ্বেগের কারণ ঘটায়। আর সেই উদ্বেগ আরও বৃদ্ধি পায় যখন রাজনৈতিক দল গঠিত কেন্দ্রীয় সরকার এবং ভিন্ন রাজনৈতিক দলগঠিত রাজ্য সরকারের সদ্ভাবের অভাব থাকে। ইতিমধ্যেই একটি রাজনৈতিক দল গত ১৬ মার্চের এক জনসভায় নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

পশ্চিমবঙ্গের ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে প্রধানত দুটি রাজনৈতিক দল যুযুধান, যাদের একটি কেন্দ্রীয় সরকার গঠন করেছে এবং অপরটি গঠন করেছে রাজ্য সরকার। এই নাটকে পারস্পরিক স্বার্থ বিরোধী দুই রাজনৈতিক দলের উপস্থিতি অবশ্যই যথেষ্ট শঙ্কার কারণ সৃষ্টি করেছে। এই ধরনের দুই স্বার্থ বিরোধী শিবির যে এই প্রথম যুযুধান তা নাও হতে পারে কিন্তু দুই মারমুখী স্বার্থ বিরোধী রাজনৈতিক দলের আবির্ভাব সম্ভবত এই প্রথম একটি অভূতপুর্ব বিপর্যয় আনার অবস্থা সৃষ্টি করেছে। এক দল যদি বলে ‘খেলা হবে’, অপর দল তারও থেকে উচ্চস্বরে বলে ‘খেলা হবে’। কেউ কেউ বলেন যে সেই খেলা নির্বাচনের আগে যেমন হবে, তেমনই হবে নির্বাচনের দিনগুলোতে এবং নির্বাচনের অব্যবহিত পরে। কে কত ভয়ঙ্কর খেলা খেলতে পারে তার প্রতিযোগিতা চলার সম্ভাবনা সাধারণ নাগরিককে ভীত এবং সন্ত্রস্ত করেছে। সেই খেলার কুশীলব কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলির সমর্থক। কিন্তু কোনও রাজনৈতিক দলের সমস্ত সমর্থকই সেই খেলায় অংশগ্রহণ করে না। কেবলমাত্র তার উগ্র সমর্থকই সেই খেলায় অংশগ্রহণ করে দলের কাছে বাহবা পেতে চায়। সেই উগ্র সমর্থকেরা কেউ কেউ প্রত্যক্ষভাবে, আবার কেউ কেউ পরোক্ষভাবে সেই ভয়াবহ খেলায় অংশগ্রহণ করে। রাজনৈতিক দলগুলির সমর্থক অবশ্যই পরিবর্তনশীল। যারা গতকাল এক দলের সমর্থক ছিল তারাই আজ অপর এক বিরোধী দলের সমর্থক আর তারাই আবার কোনও তৃতীয় দলের সমর্থক পরশু।

খেলায় অংশ নেওয়ার মতো সমর্থকদের কেবল মাত্র রঙ বদলায়। তারা উগ্র সমর্থক এই আর কী! তাদের কার কতখানি উগ্রতা তার বিচার অর্থহীন। নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদেরও কেবলমাত্র রঙ বদলায়। গণতান্ত্রিক আদর্শ বলে কারুর কিছু থাকে না। সমর্থকেরা আদর্শে অনুগত নয়, তারা তাদের নেতা বা নেত্রীর অনুগত। না হলে রাতারাতি কী করে সব পাল্টে যায়। তারা বেশিরভাগই ‘দলবদলুর’ দলে পড়ে। কোন দলে গেলে কত মুনাফা বা ফায়দা হবে সেই পরিমাণই নির্ধারণ করে কে কোন দলে কখন থাকবে বা কখন যাবে। এই মুনাফা বা ফায়দার বিচার যেমন নেতা-নেত্রীর থাকে ঠিক তেমনই থাকে তাদের অনুগত সমর্থকদের। হিংসাত্মক ঘটনায় কোনও রাজনৈতিক দলের প্রত্যক্ষ মদত থাকে বলে বিশ্বাস করতে মন চায় না। নির্বাচনী অপকর্মে কিন্তু তাদের প্রত্যক্ষ মদত থাকলেও থাকতে পারে। সবার উদ্দেশ্য তো একটিই, নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রশাসনের ক্ষমতায় আসা। নির্বাচনে জয়ী হয়ে দেশ সেবা করার পরিবর্তে আত্মসেবা দুর্ভগ্যজনকভাবে শিরোধার্য। নির্বাচন কতটা পঙ্কিল বা স্বচ্ছ হবে তা নির্ভর করে রাজনৈতিক দলগুলির ইচ্ছে-অনিচ্ছার উপর। তারা কীভাবে তাদের উগ্র সমর্থকদের পরিচালিত করবে তারই উপর। তাই নির্বাচনে তাদের ভূমিকার গুরুত্বের কথা অনস্বীকার্য। সেই ভূমিকা সদর্থক হবে না কদর্থক হবে তা মোটামুটি আমাদের অজানা। সেই ভূমিকাকে সদর্থক করার পক্ষে আদালতের যে একটি ভূমিকা থাকলেও থাকতে পারে এটা অনেকেরই পক্ষে অনুধাবনযোগ্য নয়।

উল্লিখিত জনস্বার্থ মামলায় যেমন কেন্দ্রীয় সরকার তেমনই রাজ্য সরকারকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলিকে। এদের প্রত্যেকের সহযোগিতামূলক সদর্থক ভূমিকা অবশ্যই নির্বাচন কমিশনের কাজকে প্রভূত পরিমাণে সহজ করবে–এই বিশ্বাসেই তাদের মামলায় সংযুক্তি। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে নির্বাচন কমিশনের পক্ষে সপ্তাহের সাতদিন আর চব্বিশ ঘণ্টার প্রতি মুহূর্ত সতর্ক নজর রাখা প্রায় অসম্ভব। রাজনৈতিক দলগুলির কাছ থেকে আদালত সেই জনস্বার্থ মামলায় কোনও মুচলেকা নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। সেই মুচলেকার কতটা বাস্তব মূল্য থাকত সেই নিয়ে অবশ্যই বিতর্ক করা চলে, কিন্তু তাকে উপেক্ষা করা চলে না তাদের যথাযোগ্য ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তাদের নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিলে কমিশনের দায়িত্ব বা কর্তব্যকে কোনওক্রমেই লঘু করা হত না। সেই রকম কোনও নির্দেশ দিলে রাজনৈতিক দলগুলির রাজনৈতিক কর্মপদ্ধতিতে হস্তক্ষেপ করার সামিল হত না। বরং সেটাই সর্বতোভাবে অভিপ্রেত ছিল। সেই জনস্বার্থ মামলায় সেই মর্মে কিছু অন্তর্বতীকালীন নির্দেশ জারি করারও প্রার্থনা ছিল। মহামান্য আদালতের কাছে সেই প্রার্থনাগুলির কোনও তাৎপর্য ধরা পড়ল না। সেটাই মহামান্য আদালতের বাস্তবদর্শিতার অভাব বলে খেদ করা চলে অবশ্যই। আর সেই খেদই আমাদের দুর্ভাগ্য। আমাদের কি তবে সেই ‘বিকলাঙ্গ গণতন্ত্রে’-ই জীবন কাটিয়ে যেতে হবে? আমরা কি নির্বাচনে উন্মুক্ত শান্ত পরিবেশে নির্ভয়ে স্বাধীনভাবে নিজেদের ভোটদানের অধিকার প্রয়োগ করতে পারব না?

গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অবনমন সাধারণ নির্বাচনগুলিতে বিভিন্নভাবে ধরা পড়ে। সেই সমস্ত মূল্যবোধের মধ্যে সেরা মূল্যবোধ হচ্ছে প্রতিপক্ষের অস্তিত্বকে সর্বতোভাবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং তাকে সম্মান জানানো আর এই মূল্যবোধ বিধানসভা বা লোকসভা বা রাজদ্যসভার অভ্যন্তরে যেমন প্রতিফলিত হওয়ার প্রয়োজন ঠিক তেমনই প্রয়োজন তার বাইরেও। কেবলমাত্র নির্বাচনকালেই নয়, পারস্পরিক সুসম্পর্ক এবং সম্মান থাকা দরকার নিরন্তর। দুর্ভাগ্যের বিষয় এই প্রাথমিক এবং আবশ্যকীয় মূল্যবোধ পশ্চিমবঙ্গে তো বটেই, সারা ভারতবর্ষেই প্রায় অবলুপ্ত। রাজনৈতিক দলগুলি এবং তাদের সমর্থকেরা অকথা, কুকথার খেউর চালায় সর্বত্র। প্রতিপক্ষকে নির্বাচনে প্রতিযোগী হওয়ার সুযোগ থেকে সর্বতোভাবে বঞ্চিত করার খেলা চলে। সবকিছুরই উদ্দেশ্য এক। নির্বাচনে যেন তেন প্রকারেণ জয়ী হওয়া। রাজনীতির লোকেরা এও বলেন যে, ‘প্রেমে’, ‘যুদ্ধে’, বা ‘নির্বাচনে’ কিছুই অনভিপ্রেত নয়। সমস্ত পন্থাই, সে সু হোক কী কু হোক, গ্রহণযোগ্য এবং ব্যবহারযোগ্য। এই অগণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চক্কর থেকে উদ্ধার পাওয়া দুষ্কর বলেই বোধ হয়। তাই তো আমাদের দেশে গণতন্ত্র ভীষণভাবে ‘বিকলাঙ্গ’। গণতন্ত্র যাতে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারে তার ব্যবস্থা করা জরুরি।