Breaking News
Home / অন্য রাজ্যের খবর / ‘বামপন্থার পতাকা তোমরাই বহন করছ’

‘বামপন্থার পতাকা তোমরাই বহন করছ’

‘বামপন্থার পতাকা তোমরাই বহন করছ’

ঝাড়খণ্ডের বামমনস্ক মানুষের অভিমত

‘বহুৎ দিনোঁ কে বাদ জামশেদপুর মে লাল ঝান্ডা কা ইতনা বড়া rally  দেখা৷’ ২৬ নভেম্বরেই শোনা গিয়েছিল এমন মতামত৷ সাধারণ মানুষ তো বটেই বামপন্থী মহল এমনকী বহু প্রবীণ মানুষও স্মরণ করেছেন ১৯৫৮ সালে টাটা স্টিলে সর্বাত্মক ধর্মঘটের প্রস্তুতিতে তৎকালীন বামপন্থী দলগুলির বিশাল মিছিলের কথা৷ তারপর থেকে জামশেদপুর কোনও বামপন্থী দলের এতবড় মিছিল দেখেনি৷

জামশেদপুরের বামপন্থী মনোভাবাপন্ন সাধারণ শ্রমিক, হকার, খেটে খাওয়া মানুষ তো বটেই, ঝাড়খণ্ডের বুদ্ধিজীবী মহলও বারবার অনুভব করেছেন, বামপন্থী বলে পরিচিত সিপিআই–সিপিএমের এককালের দাপুটে নেতাদের প্রভাব কমতে কমতে তলানিতে ঠেকেছে৷ পুরনো বামপন্থী বলে কথিত বড় দলগুলির নেতা–কর্মীরা নানা চাওয়া–পাওয়া, প্রলোভনের ফাঁদে পড়ে দক্ষিণপন্থীদের সাথে ভিড়েছেন৷ তাই ২৬ নভেম্বরের ৫০ হাজার ছাপানো সমাবেশ আর সুশৃঙ্খল অথচ প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা বিশাল মিছিল আশার আলো দেখিয়েছে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ, শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র–যুবক এবং বামপন্থী মনোভাবাপন্ন বিরাট সংখ্যক বুদ্ধিজীবীদের৷ ২৬ নভেম্বরের পরেও এই মিছিলের আলোচনা যেন জামশেদপুরবাসী ছেড়ে থাকতে পারছেন না৷

সেদিন মিছিল যখন বেরল, শেষ নভেম্বরের বেলা ১১টায় রোদের তেজটাও কিছু কম নয়৷ শুকনো গরম যেন নিমেষে জল শুষে নিচ্ছে মানুষের দেহ থেকে৷ কিন্তু অক্লান্ত তাঁরা হেঁটেছেন দৃঢ় পায়ে, কণ্ঠে জোর স্লোগান৷ প্রায় ৮ কিলোমিটার পথ হেঁটেছে মূল মিছিল৷ এছাড়াও জামশেদপুরের নানা প্রান্ত থেকেও একই সাথে শত শত মানুষ সারিবদ্ধ মিছিলে মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে স্লোগান দিতে দিতে এসেছেন সমাবেশ স্থলে৷ সেগুলির আকারও নিতান্ত কম নয়৷ সভার মাঠ উপচে মানুষের ঢল বন্ধ করে দিয়েছে পাশের রাস্তা৷ চারপাশের মানুষ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছেন দাবির প্ল্যাকার্ডগুলি৷ বেকারদের চাকরি চাই, চাই চাষির ফসলের উপযুক্ত সহায়ক মূল্যের নিশ্চয়তা৷ মিছিল স্লোগান তুলেছে, পেট্রল–ডিজেল রান্নার গ্যাসের দাম কমাও, ভিটে–মাটি–জমি–জল– অধিকার ও জীবিকার অধিকার কেড়ে নেওয়া চলবে না৷ মানুষ দেখেছেন এ তাঁদের দাবি৷ নারী নির্যাতনের বৃদ্ধিতে আশঙ্কিত মানুষ এই মিছিলে শুনেছেন নারীর নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার দাবি৷ চালু কারখানার ছাঁটাই শ্রমিক, বন্ধ কারখানার বেকার শ্রমিক, অর্ধ–বেকার ক্যাজুয়াল লেবাররা এই মিছিলে খুঁজে পেয়েছেন তাঁদের নিজেদের দাবি৷ তাই যখন মিছিলে রাস্তা আটকেছে বহুক্ষণ, উচ্চবিত্ত মুষ্টিমেয় কিছু লোক গাড়ি হাঁকিয়ে মিছিল ভাঙার চেষ্টা করলেই তাদের বাধা দিয়েছেন নিতান্ত সাধারণ স্থানীয় মানুষ৷ 

রাস্তার ধারের এক হোটেল মালিকের কৌতুহলী প্রশ্ন, এত লোক এই দলটার সমর্থক? তাহলে খবরের কাগজ, টিভিতে এদের কথা শোনা যায় না কেন? ভাতের দলা গিলে নিয়ে উত্তর দিয়েছেন সেই হোটেলের ফুটপাতে পাতা টেবিলে বসা এক খদ্দের৷ পরনের বেশই বলে দেয় দরিদ্র চাষি৷ কুড়মালি ভাষায় সরল যুক্তিতে বুঝিয়ে দিলেন, টিভি–কাগজ চালায় বড়লোকেরা, গরিবের সত্যিকারের পার্টির কথা ওরা বলবে কেন? দেখা গেল কান পেতে শুনছেন এক বাইক আরোহী জিনস–টি সার্ট–স্নিকার পরিহিত নব্য যুবক৷

এক মা চলেছেন বছর দশেকের পুত্রের হাত ধরে৷ স্বেচ্ছাসেবকদের একজন এগিয়ে গিয়ে বললেন, ওকে নিয়ে হাঁটতে পারবেন? প্রায় ৭–৮ কিলোমিটার রাস্তা৷ তার উপর এই রোদ ‘হ্যাঁ, হাঁটতে পারবে আমার ছেলে৷ ও দেখুক সব, দলটাকে না চিনলে ও মানুষ হবে না৷’ মলিন শাড়ি পরা গ্রাম্য মায়ের উত্তর শুনে উপচে পড়া চোখের জল আড়াল করতে ব্যস্ত শহরের কলেজছাত্র স্বেচ্ছাসেবক৷ ঝাড়খণ্ডের প্রত্যন্ত এলাকা প্রায় পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গলমহলের বান্দোয়ান ঘেঁষা গ্রাম পটমদা থেকে বাসে করে এসে পৌঁছেছেন একদল৷ গরিব মানুষ, একসময় ওখানে ছিল সিপিআইয়ের সংগঠন, পরে দাপট বেড়েছে ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার৷ তাদের কার্যকলাপে মানুষের সমস্যার সমাধান দূরে থাক, জাত–পাত–ধর্ম–বর্ণের ব্যবধান গেছে বেড়ে৷ তার উপরে বিজেপি এখন হিন্দু– মুসলমান শুধু নয়, তথাকথিত উঁচু–নিচু জাতের বিভেদ বাড়াতে ব্যস্ত৷ সব দেখে মোহভঙ্গ হয়েছে পটমদার মানুষের৷ নিজেরা টাকা তুলে গাড়ি ভাড়া করে এসেছেন৷ তাঁদের আর্জি, ‘আপনারা চলুন আমাদের গ্রামে, সভা করুন৷ অনেকেই তৈরি হয়ে আছে আপনাদের সাথে যোগ দেবে বলে’৷

মিছিলে হেঁটেছেন ঝাড়খণ্ডের নামকরা সাহিত্যিক ডঃ সুভাষচন্দ্র গুপ্তা৷ এক সময় সিপিআইয়ের সংগঠন প্রগতিশীল লেখক সংঘের রাজ্য সম্পাদক ছিলেন তিনি৷ ডঃ গুপ্তের একটি পা পক্ষাঘাতে অচল৷ হাঁটতে খুবই কষ্ট হয়৷ এসইউসিআই(সি) দলের স্থানীয় নেতৃত্ব তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন, কোনও গাড়ি বা অটোতে সরাসরি সভাস্থলে আসতে৷ কিন্তু বামপন্থার এই তরঙ্গের স্বাদ নিতে চেয়েছেন তিনি প্রত্যক্ষভাবে৷ বেশ কিছুটা হেঁটেছেন মিছিলের সাথে৷ সভা শেষে বলে গেছেন, আমার পুরনো দলের প্রতি মোহভঙ্গ সম্পূর্ণ হল৷ এ দেশে বামপন্থার ঝান্ডা আজ আপনারাই তুলে ধরেছেন সঠিকভাবে৷ সভায় এসেছিলেন, জামশেদপুরের আশপাশের কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয়্ বহু অধ্যাপক৷ এসেছিলেন ঝাড়খণ্ডের বিশিষ্ট কবি অশোক শুভদর্শী৷ এই বিশাল জমায়েত, তার গাম্ভীর্য, শৃঙ্খলা দেখে অভিভূত তিনি৷ বিহারের মুজফফরপুর থেকে এই সমাবেশ দেখতে এসেছিলেন দৈনিক জাগরণ পত্রিকার বর্ষীয়ান সাংবাদিক মহম্মদ আখলাক৷ নেতাদের বক্তব্য এবং এই মহতী সমাবেশ তাঁকে এতটাই নাড়া দিয়েছে যে, ফিরে গিয়ে গভীর আবেগ ঢেলে লিখেছেন এক দীর্ঘ প্রবন্ধ৷ ফেসবুকেও লিখেছেন প্রশংসাসূচক মন্তব্য৷ যা একদিকে বিহারের বুদ্ধিজীবী মহলকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করেছে, অন্য দিকে সে রাজ্যের কায়েমি স্বার্থবাহী ভোটবাজ দলগুলিকে আশঙ্কিত করে তুলেছে৷

এই সমাবেশের আগের দিন জামশেদপুর দেখেছে চরম উচ্ছৃঙ্খলতা৷ রামমন্দির নির্মাণের দাবিতে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সভা ছিল সেদিন৷ মাত্র তিন–চারশো লোকের সেই সভা থেকেই নানা এলাকায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধিয়ে ভাঙচুর–লুঠপাট করে এক অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল তারা৷ ২৬ তারিখ সভা শেষে সন্ধ্যার পর শহরের রেলিংয়ে লাগানো ফ্ল্যাগ–ব্যানার খুলছিলেন দলের স্বেচ্ছাসেবকরা৷ ফল বিক্রেতা এক হকারভাই এগিয়ে এলেন গুটিগুটি পায়ে, বললেন, ‘কাল ছিল ভিএইচপি, আজ আপনারা৷ ওরা নাকি ধার্মিক? ওরা কাল খুব অসভ্যতা করেছে৷ কিন্তু আপনাদের লোকেরা অত্যন্ত ভদ্র৷ তাহলে কি কলিযুগে ধার্মিকরা সব অভদ্র হয়ে গেছে আর আসল ভদ্র কমিউনিস্টরাই’ মানুষটির নাম ঠিকানা জেনে নিয়ে স্বেচ্ছাসেবকরা বলে এসেছেন, আপনি ভাবুন৷ কয়েকদিন পরে এসে আপনার কাছ থেকেই উত্তর শুনব৷ মানগো এলাকার এক মুদি দোকানদার তেওয়ারিজির ভাষায়, ‘যব ভোট আতা হ্যায়, এ লোক রামমন্দির কা মুদ্দা উঠাতা পাবলিক কো ধোঁকা দেনে কে লিয়ে৷’ বললেন, দেশে কি মন্দিরের অভাব আছে যে আর একটা মন্দির না হলে ক্ষতি হয়ে যাবে?

দক্ষিণপন্থী কায়েমি স্বার্থবাজরা বিপদ দেখেছে এই সমাবেশে৷ তাই আগের দিন থেকে ঘাটশিলা, জামশেদপুর সহ বহু জায়গায় লাগানো এস ইউ সি আই (সি)–র ফ্ল্যাগ–ব্যানার খুলে ফেলার জন্য ভাড়াটে লোক নিয়োগ করেছিল আরএসএস–বিজেপি৷ তাদের অনেককে হাতেনাতে ধরে বাধা দিয়েছেন সাধারণ মানুষই৷ টাটা স্টিল কারখানার সর্ববৃহৎ কংগ্রেসি ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট আশঙ্কিত হয়ে বলেছেন, এখনই পাল্টা কিছু করা দরকার, না হলে খেটে খাওয়া মানুষ একদিন সব গিয়ে এস ইউ সি আই (সি)–র লাল ঝান্ডাই ধরবে৷

(গণদাবী : ৭১ বর্ষ ১৭ সংখ্যা)