Breaking News
Home / খবর / প্রতিবাদের কণ্ঠরোধ করতে বিজেপি সরকার বেপরোয়া

প্রতিবাদের কণ্ঠরোধ করতে বিজেপি সরকার বেপরোয়া

এখন থেকে কোনও ব্যক্তি কোনও সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী বা সংগঠনের সাথে যুক্ত না থাকলেও তার চিন্তা সন্ত্রাসবাদের পক্ষে যাচ্ছে মনে করলেই তাকে গ্রেপ্তার করে বিনা বিচারে ৬ মাস বা তারও বেশি সময় আটকে রাখতে পারবে কেন্দ্রীয় সরকার৷

শুধু কোনও সংগঠন নয়, যে কোনও ব্যক্তিকে সন্ত্রাসবাদী বলে ঘোষণা করতে পারবে কেন্দ্রীয় সরকার৷ সম্প্রতি লোকসভায় বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইন সংশোধনী বিল (ইউএপিএ) সংখ্যাধিক্যের জোরে কার্যত বিনা আলোচনায় বিজেপি সরকার পাশ করিয়ে নেওয়ার পর বিষয়টি এমনই দাঁড়াচ্ছে৷ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তথা বিজেপি সভাপতি লোকসভায় বলেছেন, ‘নিছক সমাজসেবা করলে পুলিশের কোনও আপত্তি থাকবে না, কিন্তু দরিদ্র মানুষকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে খেপাবে যারা তাদের আমরা সহ্য করব না’ (সূত্র : লাইভ মিন্ট ডট কম, ২৫ জুলাই)৷

এ কথা ঠিক, যে কোনও মানুষই বলবেন, সন্ত্রাসবাদ একটি ভয়াবহ বিপদ৷ সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের ফলে একদিকে সাধারণ মানুষের রক্তপাত এবং জীবনহানি যেমন ঘটে তেমনই পাশাপাশি এই কার্যকলাপকে দেখিয়ে রাষ্ট্রশক্তি সাধারণ মানুষের উপর দমন–পীড়ন নামিয়ে আনার সুযোগ পেয়ে যায়৷ ফলে জনমত স্বাভাবিকভাবেই সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে৷ আর এই অতি স্বাভাবিক জনমতেরই বিকৃত উপস্থাপনা করেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী৷ তিনি যা বলেছেন, তার অর্থ দাঁড়ায় অতি উগ্র বামপন্থার নীতি বা সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করেন না এমন ব্যক্তিও যদি ন্যায্য দাবিতে গড়ে ওঠা কোনও আন্দোলনকে সমর্থন করেন এবং সেই আন্দোলনে যদি রক্ত ঝরার সম্ভাবনা মাত্র থাকে, তাহলেই কেন্দ্রীয় সরকার তাকে সন্ত্রাসবাদী বলে চিহ্ণিত করে দিতে পারে৷ কিন্তু দেশের বেশিরভাগ জায়গায় পরিস্থিতি কি এমনই ভয়াবহ যে কোনও সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের সঙ্গে সংযোগহীন ব্যক্তিকেও সন্ত্রাসবাদী হিসাবে চিহ্ণিত করবার দরকার হয়ে পড়েছে? বাস্তব তা বলছে না৷ এর আগে দেশের মানুষ দেখেছে বিজেপি সরকার কীভাবে এ দেশের যুক্তিবাদী এবং বিজেপির সমালোচক কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিল্পী, নাট্যকার থেকে শুরু করে বুদ্ধিজীবীদের মিথ্যা অভিযোগে জেলে ভরেছে৷

লোকসভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘অস্ত্র না ধরলেও বিদ্বেষ এবং সমাজের আমূল পরিবর্তন করার চিন্তা (radicalism) সন্ত্রাসবাদের জন্ম দেয়’৷ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কি বিদ্বেষের রাজনীতি নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন? বিদ্বেষ ছড়ানোর জন্য সরকারের তরফ থেকে প্রথম কাদের অভিযুক্ত করা উচিত? প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গুজরাট গণহত্যায় নিহত মুসলিমদের তাঁর গাড়ির তলায় পড়ে মরা কুকুরছানার সাথে তুলনা করেছিলেন (রয়টার্স,১২ জুলাই, ২০১৩)৷ ২০১৪ এপ্রিলের নির্বাচনে অমিত শাহ একাধিকবার মুসলিম বিদ্বেষী বক্তব্য রেখেছেন, তার জন্য তাঁর বিরুদ্ধে এফআইআরও হয়েছে (এনডিটিভি, ৭ এপ্রিল ২০১৪)৷ ২০১৯–এর নির্বাচনের আগেও তিনি মুসলিমদের অনুপ্রবেশকারী এবং উইপোকা বলেছেন৷ ক্রিশ্চান এবং মুসলিমদের দেশের বাইরে পাঠানোর হুমকি দিয়েছেন৷ বিজেপির সদ্য নির্বাচিত এমপি প্রজ্ঞা সিং ঠাকুর মালেগাঁও বিস্ফোরণ মামলায় অভিযুক্ত এবং তিনি মুম্বই হামলায় সন্ত্রাসবাদীদের হাতে নিহত পুলিশ অফিসার হেমন্ত কারকারের মৃত্যুকে তাঁরই কৃতিত্ব বলে আনন্দ প্রকাশ করেছেন৷ এই দলেরই নেতা উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মুসলিমদের ‘সবুজ ভাইরাস’ বলে সম্বোধন করেছেন৷ সেই উত্তরপ্রদেশেই বজরঙ্গ দল সহ নানা হিন্দুত্ববাদী সংগঠন একাধিক অস্ত্রপ্রশিক্ষণ শিবির সংগঠিত করে চলেছে (জি নিউজ, ২৫ মে,২০১৬)৷ এই বিদ্বেষ ছড়ানোর কারবারিদের কি কেন্দ্রীয় সরকার সন্ত্রাসবাদী বলেছে?

আইসিস, লস্কর–ই–তৈবার মতো যে সমস্ত সংগঠন ধর্মের নাম করে বিদ্বেষ ছড়ায়, তার সাথে এই সমস্ত হিন্দুত্ববাদের চ্যাম্পিয়ন সাজতে চাওয়া সংগঠন এবং ব্যক্তির কার্যকলাপের কিছু মাত্রাগত ভেদ ছাড়া আর কী পার্থক্য আছে?

অমিত শাহের বক্তব্য অনুযায়ী সমাজ পরিবর্তনের কথা বলা এবং তার স্বপ্ন দেখাও সন্ত্রাসবাদ আজ সারা বিশ্বে নিপীড়িত মানুষ এই স্বপ্ন দেখেন যে শোষণমূলক পুঁজিবাদী সমাজ ভেঙে শোষণহীন সমাজ পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা হবেই৷ এই স্বপ্ন দেখা সন্ত্রাসবাদ দেশে দেশে পুঁজিবাদ নিপাত যাক, সমাজতন্ত্র জিন্দাবাদ এই স্লোগান দিয়ে মানুষ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে রাস্তায় নামছে, পুলিশের সাথে সংঘর্ষে তাদের রক্ত ঝরছে৷ ভারতেও মেহনতি মানুষের মধ্য থেকে এই দাবি উঠছে৷ এর সাথে সন্ত্রাসবাদের কোনও সম্পর্কই নেই৷ ষড়যন্ত্র করে বিপ্লব হয় না৷ এই শিক্ষা দিয়ে গেছেন মার্কস–লেনিন থেকে মাও সে–তুঙয়ের মতো মহান বিপ্লবী নেতারা৷ উগ্র বামপন্থার নামে গরম গরম স্লোগান দিয়ে যারা কোনও কোনও জায়গায় কিছু হঠকারী এবং হিংসাত্মক কার্যকলাপ করে সেই মুষ্টিমেয় কিছু সংগঠনকে দেখিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার সমস্ত বাম–গণতান্ত্রিক আন্দোলনের উপরই আক্রমণের খড়গ নামাতে চাইছে৷ যে মহান নেতা মাও সে–তুঙের নাম জড়িয়ে বামপন্থা–গণতন্ত্রে স্বরকেই ‘সন্ত্রাসবাদী’, ‘মাওবাদী’ বলছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সেই মাও সে–তুঙ নিজে বলেছেন– ‘‘অস্ত্রই নির্ণায়ক শক্তি… এমন তত্ত্ব লড়াই সম্বন্ধে যান্ত্রিক ধারণার ফসল৷ অস্ত্র গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটাই নির্ণায়ক বিষয় নয়৷… কোনও বস্তু নয়,… নির্ণায়ক শক্তি হল জনগণ৷ লড়াইটা শুধু সামরিক আর অর্থনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে নয়, লড়াইটা মানুষের শক্তির এবং নীতি আদর্শের’’ (মাও সে–তুঙ, অন প্রোট্র্যাক্টেড ওয়ার)৷

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথাকে খুঁটিয়ে বিচার করলে বোঝা যায়, মানুষের ন্যায্য দাবি নিয়ে গড়ে ওঠা সরকারের বিরুদ্ধে শক্তিশালী আন্দোলনকেই তাঁরা সন্ত্রাসবাদী কাজ বলে চালাতে চাইছেন৷ কারণ পুঁজিবাদী শাসন মানুষের ন্যূনতম প্রয়োজনগুলিও মেটাতে পারছে না৷ যত দিন যাচ্ছে মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে৷ এই ক্ষোভ উপযুক্ত নেতৃত্ব পেলে যে কোনও সময় বিরাট গণাআন্দোলনের আকারে ফেটে পড়তে পারে৷ এই আশঙ্কা তাড়া করে বেড়াচ্ছে শাসক শ্রেণিকে৷

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সহ বিজেপি নেতাদের কথায় মনে হয়, যেন কড়া আইনের অভাবেই তাঁরা পুলওয়ামা বা পাঠানকোট হামলা রুখতে পারেননি ইউএপিএ আইন প্রথম থেকেই যথেষ্ট কড়া৷ তাহলে এই হামলাগুলি রোখা গেল না কেন? মিলিটারির হাতে যথেচ্ছ ক্ষমতার আইন আফস্পা তো দীর্ঘদিন ধরে কাশ্মীরে চালু আছে, তাতে কাশ্মীরি যুবকদের মধ্যে ভারত সরকারের প্রতি আস্থা ফেরানো গেছে?

ন্যায় বিচারের নীতি বলে– আদালতে সুনিশ্চিতভাবে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কোনও অভিযুক্তকেই অপরাধী বলা যায় না৷ এই নীতি শাসককে নিশ্চিত করতে বলে, একজন নিরপরাধও যেন শাস্তি না পায়৷ তাই রাষ্ট্রের পক্ষে অভিযোগকারীর উপরই দায় বর্তায় অভিযোগ প্রমাণ করার৷ কিন্তু ইউএপিএ আইন অনুসারে নিজেকে নিরপরাধ প্রমাণ করার দায় অভিযুক্তেরই৷ ফলে পুলিশ, সিবিআই, এনআইএ ইত্যাদি সংস্থা কাউকে একবার ইউএপিএতে অভিযুক্ত করে দিলেই সাধারণ মানুষের কোনও উপায় থাকে না এর থেকে রেহাই পাওয়ার৷ ফলে ইউএপিএ আইন ন্যায় বিচারের পরিপন্থী৷ এই আইনে ২০১৬ সালের শেষ পর্যন্ত সিবিআই, এনআইএ, পুলিশ ইত্যাদি সংস্থার দায়ের করা ৩৫৪৮টি মামলার মধ্যে গত তিন বছরে শাস্তি হয়েছে ৩১টি ক্ষেত্রে, ১১১টি মামলায় অভিযুক্তরা নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছে, আর বাকি সব মামলা ঝুলে আছে (বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮)৷ ফলে বিচারের অপেক্ষায় জেলে পচছে কয়েক হাজার মানুষ যাঁদের অনেকেই হয়ত নিরপরাধ বলে প্রমাণিত হবেন৷ বোম্বে হাইকোর্টের বর্ষীয়ান আইনজীবী মিহির দেশাইয়ের মতে, ইউএপিএ মানুষের জীবন তছনছ করে দেয় (ওই)৷ ১৯৬৭ সাল থেকে পরপর এমন ধরনের আইন এসেছে৷ এসেছে টাডা, পোটার মতো কালা আইন৷ ২০০৪–এ এসেছে ইউএপিএ আইনের এই দানবীয় রূপ৷ এই দিয়ে কাশ্মীর, মণিপুর, আসাম, কোথাও রক্তপাত কমেছে কি? মুম্বই হামলা, পাঠানকোট হামলা, উরির হামলা প্রতিরোধ করতে ব্যর্থই হয়েছে একের পর এক সরকার৷ অথচ লালগড় আন্দোলনে ইউএপিএ চেপেছে ‘মাওবাদ’কে কোনও দিন সমর্থন না করা সাধারণ মানুষের উপরেও৷ এই আইন লাগু হয়েছে মহারাষ্ট্রের দলিতদের স্বার্থ নিয়ে গড়ে ওঠা ভীমা কোরেগাঁও আন্দোলনের নেতাদের উপর৷ কিন্তু বিজেপি–আরএসএস ঘনিষ্ঠ বেদ প্রতাপ বৈদিক পাকিস্তানে গিয়ে নিশ্চিন্তে হাফিজ সঈদের সাথে বৈঠক করে আসেন, সরকার নীরবই থাকে(এনডিটিভি, ১৫ জুলাই ২০১৪)৷

একই সাথে লোকসভার পর রাজ্যসভাতেও পাশ হওয়া জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা (এনআইএ) সংক্রান্ত আইনের সংশোধনীতে বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন এনআইএ দেশের যে কোনও রাজ্যে যে কোনও ব্যক্তির বাড়িতে তল্লাশি চালাতে পারবে, তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে এবং তাকে গ্রেপ্তার করতে পারবে৷ তার জন্য সংশ্লিষ্ট রাজ্যকে জানাতে পর্যন্ত হবে না৷ কোনও বিচারবিভাগীয় অনুমোদনও নিতে হবে না৷ আগের মতো এসপি বা ডিএসপি পদমর্যাদার অফিসাররা নয়, এখন থেকে ওই সংস্থার যে কোনও ইনস্পেকটর (পুলিশের ওসির পদমর্যাদার অফিসার) হয়ে উঠবেন যে কোনও ব্যক্তির গায়ে সন্ত্রাসবাদী তকমা লাগিয়ে দেওয়ার অধিকারী৷ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে বলেছেন এনআইএ কোনও পুলিশ থানা নয়, একটা বিশেষ দক্ষ সংস্থা৷ তাই তার কোনও আলাদা অনুমোদনের প্রয়োজনই নেই৷ দক্ষতার প্রশ্নই যদি তুললেন মন্ত্রী মশাই, তাহলে তাঁকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া ভাল, এনআইএ তদন্ত করেছিল সমঝোতা এক্সপ্রেসে বিস্ফোরণ, ভুয়ো সংঘর্ষে সোহরাবুদ্দিন হত্যার ঘটনায়৷ অথচ দোষীরা শাস্তি পেল না কেন? মালেগাঁও বিস্ফোরণে যুক্ত সাধ্বী প্রজ্ঞা ছাড়া পেয়ে গেল কেন? এই মামলায় সরকারি উকিলকে বলতে হল কেন, এনআইএ তাঁকে ধীরে চলার নির্দেশ দিয়েছে হায়দরাবাদের মক্কা মসজিদে বিস্ফোরণ, সমঝোতা এক্সপ্রেসে বিস্ফোরণ মামলায় বিচারককে হতাশা প্রকাশ করে বলতে হয়েছে এনআইএ–র অনিচ্ছায় কিছুই প্রমাণ করা যায়নি৷ ফলে সব বোঝা গেলেও প্রকৃত অপরাধীকে শাস্তি দিতে বিচারব্যবস্থা অপারগ৷ এরপরেও মানতে হবে নরেন্দ্র মোদি–অমিত শাহরা সন্ত্রাসবাদের ক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’  নীতি নিয়েছেন নাকি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং বিরোধীদের গায়ে সন্ত্রাসবাদের তকমা লাগানোই লক্ষ্য?

দেশের নিরাপত্তা মানে কি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নয় খুন–রাহাজানি–ছিনতাই-ডাকাতি-নারী ধর্ষণ–শিশুকন্যা ধর্ষণ বেড়ে চলেছে৷ কোথায় তাদের নিরাপত্তা? আইনের তো অভাব নেই, কী করছে সরকার? বিদেশি শক্তি কিংবা কিছু মুষ্টিমেয় সন্ত্রাসবাদী যদি কিছু করার চেষ্টাও করে, তা রোখার প্রকৃত গ্যারান্টি কি নিছক কিছু কড়া আইন না দেশের জনগণ সেই জনগণকে সরকার কী অবস্থায় রেখেছে? নানা সমস্যায় জর্জরিত মানুষ আর্থিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক দিক থেকে কি নিরাপদে রয়েছেন? একের পর এক গণপিটুনিতে হত্যা করা হচ্ছে না দেশের অগণিত অসহায় নিরপরাধ মানুষকে? জাত–পাত–সম্প্রদায়ে বিভেদ ছড়িয়ে খুন করা হচ্ছে না শত শত মানুষকে? কোনও বিষয়ে সরকারের সাথে দ্বিমত পোষণ করলেই দেগে দেওয়া হচ্ছে না দেশদ্রোহী বলে? জেলে পুরে বিচারের নামে প্রহসন চলছে না? দুর্নীতির বিরুদ্ধে মুখ খুললে এমনকি বিচারপতিকে খুন করা হচ্ছে না? মানুষের নিরাপত্তা কোথায়!

কংগ্রেসও আজ এসবের জোরালো বিরোধিতা করতে পারছে না৷ কারণ, ২০০৯ সালে মুম্বই হামলার অজুহাতে মনমোহন সিংহ সরকারের আমলে এনআইএ গঠিত হয়েছিল৷ ১৯৬৭ সালে ইন্দিরা গান্ধীর আমলেই ইউএপিএ–র মতো কালা কানুন চালু হয়েছিল৷ সমস্ত রকম গণতান্ত্রিক চিন্তা–চেতনার গলা টিপে ধরতেই সেগুলি বেশি কাজে লেগেছে৷ ফলে তারাও ধোয়া তুলসীপাতা নয়৷ বস্তুত আজ ব্যক্তি স্বাধীনতাকে এভাবেই দুপায়ে মাড়িয়ে যাচ্ছে সারা দুনিয়ার পুঁজিবাদী সরকারগুলি৷ ভারতও তার ব্যতিক্রম নয়৷ যে সন্ত্রাসবাদকে লালনপালন করছে সাম্রাজ্যবাদী দুনিয়ার শিরোমণি আমেরিকা–ব্রিটেন, তাদের নানা এজেন্টের হাত ধরেই সন্ত্রাসবাদীরা অস্ত্র পায়৷ ভারতেও দেখা গেছে সেই কংগ্রেসের আমল থেকেই সন্ত্রাসবাদীদের হাতে অস্ত্র কিংবা অর্থ সরবরাহ সরকার কোনও দিন বন্ধ করতে পারেনি, হয়ত বা চায়নি৷ বিজেপি আমলেও অটল বিহারি বাজপেয়ীর পাঁচ বছরে মাসুদ আজাহারদের যেমন রোখা যায়নি, নরেন্দ্র মোদির বীরত্বের আস্ফালনেও সন্ত্রাসবাদ আদৌ আটকায়নি৷ অস্ত্রশস্ত্র কিংবা টাকা অথবা অন্যান্য সাহায্য তারা ঠিকই পেয়েছে৷ অথচ দেশের সাধারণ মানুষর উপর এই অজুহাতে নানা দমনমূলক ব্যবস্থা নেমে এসেছে৷ খর্ব হয়েছে একের পর এক গণতান্ত্রিক অধিকার৷ আফস্পার নামে গোটা কাশ্মীরের জনগণকেই সরকার সন্দেহভাজন বানিয়ে ছেড়েছে৷ মণিপুরের মায়েরা নগ্ন হয়ে নিজের দেশের মিলিটারির বিরুদ্ধেই মিছিল করতে বাধ্য হয়েছেন৷

অশিক্ষায় জর্জরিত ছাত্র, বেকারিতে দুর্দশাগ্রস্ত যুবক, ফসলের দাম না পাওয়া চাষি, ছাঁটাই হওয়া শ্রমিক– শিক্ষা–কাজের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুললেই শাসকরা বছরের পর বছর বলেছে এসব সমস্যার সামনে সন্ত্রাসবাদই বাধা৷ যত দিন যাচ্ছে, মালিক শ্রেণির সংকট যত বাড়ছে তত চলছে গণতন্ত্র হরণের প্রচেষ্টা৷ যাতে সন্ত্রাসবাদকে দেখিয়ে মানুষের ন্যায্য আন্দোলনকেও দমিয়ে রাখা যায়৷ তাই নরেন্দ্র মোদি সরকারের ব্যক্তির অধিকার হরণের এত ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা৷ এমনকী যাতে কেউ এই বিলগুলির মৌখিক বিরোধিতাও না করতে পারে, সেজন্য বিজেপি সভাপতি হুঁশিয়ারি দিয়েই রেখেছেন, যারা বিরোধিতা করবে তারাই সন্ত্রাসবাদের সমর্থক বলে গণ্য হবে৷ গণতন্ত্রের টুঁটি টিপে মারার এই সর্বনাশা আইন রুখতে সর্বস্তরের গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষকেই আজ এগিয়ে আসতে হবে৷

(গণদাবী : ৭২ বর্ষ ১ সংখ্যা)