Breaking News
Home / অন্য রাজ্যের খবর / প্রকৃত বামপন্থী ধারায় শক্তিশালী গণআন্দোলনই উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তিকে পরাস্ত করতে পারে — কমরেড অসিত ভট্টাচার্য

প্রকৃত বামপন্থী ধারায় শক্তিশালী গণআন্দোলনই উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তিকে পরাস্ত করতে পারে — কমরেড অসিত ভট্টাচার্য

আসামের গুয়াহাটিতে কমরেড শিবদাস ঘোষ স্মরণ দিবসে কমরেড অসিত ভট্টাচার্য

৫ আগস্ট আমাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, এ যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মার্কসবাদী চিন্তানায়ক কমরেড শিবদাস ঘোষের স্মরণ দিবস৷ ১৯৭৬ সালে এই দিনটিতেই হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন৷ আজ তাঁর ৪৪ তম প্রয়াণ দিবস৷ প্রতি বছর এই দিনটি আমরা উদযাপন করি একটি বিপ্লবী উদ্দেশ্যবোধ থেকে৷ একটি গভীর রাজনৈতিক তাৎপর্য এর মধ্যে নিহিত আছে৷ এই দিনে আমরা গভীর ভাবে তাঁর চিন্তার চর্চা করি এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পর্যালোচনা করে আমাদের বৈপ্লবিক কর্তব্য নির্ধারণ করি, এগিয়ে যাওয়ার পথ নির্ণয় করি এবং একই সাথে তাঁর চিন্তার ভিত্তিতে পুঁজিবাদ বিরোধী সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব দ্রুত সম্পন্ন করার সংকল্প আরও একবার গ্রহণ করি৷ সেদিক থেকে এই উদযাপন কোনও আনুষ্ঠানিকতা নয়, বৈপ্লবিক তাৎপর্যপূর্ণ একটা রাজনৈতিক ক্রিয়া৷

সর্বাত্মক সংকট জনগণকে আচ্ছন্ন করছে

আজ আমরা যখন ৫ আগস্ট উদযাপন করছি, তখন আমাদের দেশ তথা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে অতীব কঠিন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে৷ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সকল দিক থেকেই এক গভীর সংকট বিশ্বের সকল জনসাধারণকে ঘিরে ধরেছে৷ এই কঠিন পরিস্থিতির মূল দিকটা আমি তুলে ধরার চেষ্টা করব৷ ভারতবর্ষে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এক অসহনীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছে যার ফলে সাধারণ মানুষ বেঁচে থাকার কোনও অবলম্বনই খুঁজে পাচ্ছেন না৷ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সমগ্র দেশে যে সমস্যা মানুষকে পুড়িয়ে মারছে, তা হচ্ছে মানুষের জীবিকা নির্বাহের সমস্যা৷ মানুষ যদি না কোনও উপযুক্ত কাজ খুঁজে পান, তা হলে বেঁচে থাকতে পারেন না৷ এই জন্য মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন জীবিকা নির্বাহের একটা ডপযুক্ত ব্যবস্থা৷ জীবিকা নির্বাহের পথ বলতে কেবল সরকারি বা বেসরকারি চাকরিকেই বোঝায় না৷ অর্থনৈতিক স্থিরতা থাকলে, কায়িক এবং মানসিক এই দুই ধরনের শ্রমের মাধ্যমে মানুষ কোনও না কোনও বস্তু বা সেবা, কিছু না কিছু উৎপাদন করে জীবন ধারণ করতে পারেন৷ সরকারি বা বেসরকারি চাকরি তার মধ্যে একটা ব্যবস্থা মাত্র৷ মুখ্যত মানুষের জীবিকা নির্বাহের পথ সৃষ্টি হয় শিল্পোন্নয়নের দ্বারা৷ জীবনধারণের আরেকটি বড় মাধ্যম হচ্ছে কৃষিকাজ৷ কিন্তু গ্রামাঞ্চলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জনপ্রতি জমির পরিমাণ দ্রুত কমছে এবং তার মধ্য দিয়ে জীবনধারণ আজ আর সম্ভব হচ্ছে না৷ এছাড়াও দেশের সর্বত্র চাষিরা তাদের উৎপাদিত কৃষিজাত দ্রব্যের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না৷ সমস্যা এতটাই মারাত্মক যে উৎপাদন খরচের ডপর একটু বাড়তি আয় দূরে থাকুক, বহু ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও মধ্য চাষিরা উৎপাদনের খরচটাই তুলতে পারছেন না৷ অথচ তাঁদের উৎপাদিত দ্রব্যগুলি যখন শহর অঞ্চলে যাচ্ছে, ব্যবসায়ীরা কৃষকের কাছ থেকে কম দামে কিনে তার থেকে ৭/৮ গুণ বেশি দামে বিক্রি করে মুনাফা লুটছে৷ চাষের জন্য প্রয়োজনীয় পুঁজি তাঁরা পাচ্ছেন না, বাধ্য হয়ে মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিচ্ছেন৷ সেই ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে তাঁদের অনেকেই আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন৷ আমাদের দেশে জনসংখ্যার যে ৭০–৮০ শতাংশ মানুষ একসময় কৃষির ওপর নির্ভরশীল ছিলেন, তাদের একটা বড় অংশ আজ উদ্বৃত্ত৷ গ্রামে তাঁদের কোনও কাজ নেই৷ ফলমূল উৎপাদন, কুটির শিল্প, মৎস্য চাষ, রেশম চাষ ইত্যাদি করে চাষিরা কোনও রকমে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন৷ কিন্তু তা সত্ত্বেও টিকে থাকতে পারছেন না৷ এই অবস্থায় কোনও কিছু পাওয়ার আশায় তাঁদের অনেকেই গ্রাম ছেড়ে শহরের দিকে চলে যাচ্ছেন৷

আপনারা লক্ষ করছেন, একটা সর্বাত্মক সংকট দেশের জনগণকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে৷ সংকটের তীব্রতা এমনই যে, যেখানে দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে পরিবারের একজন কাজ করলেই গোটা পরিবারের ভরণ পোষণ চলত, সেখানে আজ স্বামী–স্ত্রী–পুত্র–কন্যা সবাই মিলে কাজ করেও সংসার চালাতে পারছেন না, বেঁচে থাকতে পারছেন না৷ গ্রাম ছেড়ে মানুষ জীবিকার সন্ধানে শহরের দিকেপাড়ি দিচ্ছেন৷ কিন্তু শহরেও আজ আর কাজ নেই৷ নতুন নতুন কলকারখানা গড়ে ওঠা দূরের কথা, ব্রিটিশ আমলে যেগুলি গড়ে উঠেছিল সেগুলিও আজ পুঁজিবাদের সংকটগ্রস্ত যুগে একটার পর একটা বন্ধ হচ্ছে৷ স্বাধীনতার পর দেশের জনসাধারণের আন্দোলনের চাপে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে যে কয়েকটা শিল্প গড়ে উঠেছিল সেগুলোও হয় বন্ধ  হয়ে গেছে, না হয় জলের দামে পুঁজিপতিদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে৷ ফলে শিল্পোদ্যোগের মাধ্যমেও জীবিকা নির্বাহের কোনও পথ নেই৷ শিল্পোৎপাদনের সূচক ক্রমাগত নিম্নগামী৷ উৎপাদিত বস্তু বাজারে বিক্রি হচ্ছে না, কারণ চাহিদা নেই৷ চাহিদা নেই, কারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা নেই৷ কারণ, পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় উৎপাদন হয় সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যে৷ সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন করতে গিয়ে মালিকরা শ্রমিককে কম মজুরি দিয়ে শোষণ করে, আবার আরও বেশি মুনাফার লোভে শ্রমিক ছছাটাই করে মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সমস্যাকে তীব্রতর করে তোলে৷ ফলে বাজারে জিনিসপত্র কেনার ক্ষমতা শ্রমিকদের থাকে না, চাহিদা কমে যায়৷ আর শ্রমিক ও দুঃস্থ কৃষক নিম্নবিত্তরাই তো জনসংখ্যার ৯৫ ভাগ৷ তাদের আয় শূন্য৷ এই অবস্থায় পুঁজিপতিরা উৎপাদন করতে চায় না৷ আর শিল্পোৎপাদন না হলে কর্মসংস্থান হয় না৷ এই হচ্ছে পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার গোলকধাঁধা৷

জীবিকা নির্বাহই পুঁজিবাদী দেশে মূল সমস্যা

কেবল ভারতবর্ষেই নয়, সমগ্র বিশ্বেই এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে৷ উন্নত পুঁজিবাদী দেশ বলে পরিচিত আমেরিকা, গ্রেট ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি প্রভৃতি প্রতিটি দেশের বাস্তব চিত্র আজ একই৷ কাজের সন্ধানে মানুষ উন্মাদের মতো ঘুরছে৷ কিন্তু বাচাঁর পথ পাচ্ছে না৷ তাই দিশাহারা মানুষ শুধু আমাদের দেশেই নয়, গোটা বিশ্বে শাসক পুঁজিপতি শ্রেণির শোষণ থেকে উদ্ভূত অর্থনৈতিক সংকট থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য জীবিকার দাবিতে প্রতিদিন রাস্তায় বেরিয়ে আসছে৷ উপযুক্ত নেতৃত্ব নেই, তবুও মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলন করছে৷ তাদের দাবি একটাই, স্লোগান একটাই– বেঁচে থাকার পথ চাই, জীবিকা অর্জনের সংস্থান চাই৷ অপরদিকে এটাও লক্ষণীয়, শোষণ জর্জরিত এই অসহনীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার মূল কারণ কী– জানার আগ্রহও জনমনে ক্রমশ বাড়ছে৷ বলা বাহুল্য, এটার উত্তর মার্কসবাদ থেকেই পেতে হবে৷ মার্কসবাদ দেখিয়েছে, অবিরাম শিল্পোন্নয়ন চলতে থাকলে জনসাধারণের জীবিকা অর্জনের কোনও সমস্যাই থাকে না৷ শিল্পের জন্য প্রয়োজন জমি, শ্রম, পুঁজি এবং প্রযুক্তি৷ মুখ্যত এগুলিই হচ্ছে উৎপাদনের উপায় বা উপাদান৷ আপনারা লক্ষ করছেন, শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় এই চারটি জিনিসই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এবং আমাদের দেশেও প্রচুর পরিমাণে রয়েছে৷ আমাদের দেশে প্রাকৃতিক সম্পদ, খনিজ সম্পদ এক কথায় সমস্ত রকমের কাঁচামাল প্রচুর পরিমাণে আছে৷ উৎপাদন করার জন্য প্রয়োজনীয় বৌদ্ধিক শ্রম, যাকে ইংরেজিতে ইন্টেলেকচুয়াল লেবার বলা হয়, সেটাও যথেষ্ট পরিমাণে আছে৷ দেশের ভিতর তাকে কাজে লাগানোর কোনও সুযোগ না থাকায় এই বৌদ্ধিক শ্রম অন্য দেশে চলে যাচ্ছে৷ পুঁজিপতি শ্রেণির সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্য কাজ করার জন্যই সবকিছু থাকা সত্ত্বেও দেশে আজ শিল্প গড়ে উঠছে না৷ তারই ফলে বেকার সমস্যা ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে৷ প্রতিটি পুঁজিবাদী দেশেই এই বেকার সমস্যা বিস্ফোরক রূপ ধারণ করেছে৷ লক্ষ করুন পুঁজিপতিদের মালিকানাধীন কোনও পত্রপত্রিকায় তার কোনও উল্লেখ নেই৷ এর মধ্যেও মাঝে মধ্যে যেটুকু খবর আসছে তাতে দেখা যাচ্ছে, শুধু আমাদের দেশেই নয় পৃথিবীর সব পুঁজিবাদী দেশেই মূল সমস্যা, জীবন মরণ সমস্যা একটাই– জীবিকা নির্বাহের সমস্যা৷ পৃথিবীতে কোনও দেশেই নতুন কলকারখানা তো গড়ে উঠছেই না, যে কয়েকটি কোনও প্রকারে টিকে ছিল সেগুলিও দ্রুতবন্ধ হয়ে যাচ্ছে৷

জনসাধারণ কাজ করে, উপার্জন করে বেঁচে থাকতে চান৷ এর মধ্যে অন্যায় তো কিছুই নেই৷ কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা আমাদের দেশে কম নয়৷ এরা তো আমাদের বিরাট সম্পদ৷ কলকারখানা খুলে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার সাহায্যে, তাদের শ্রমশক্তি কাজে লাগিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি করে তো দেশের চেহারা পাল্টে দেওয়া যায়৷ কিন্তু পুঁজিবাদী দেশে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় তা হচ্ছে না এবং হবেও না৷ সম্প্রতি একটা কথা চালু হয়েছে– ‘হায়ার অ্যান্ড ফায়ার’, ‘শোয়িং দ্য ডোরস’–  অর্থাৎ যত প্রকারে পারা যায় এবং যত বেশি সংখ্যায় পারা যায় শ্রমিক–কর্মচারীদের্ কর্মচ্যুত করা৷ বেসরকারি ক্ষেত্রে তো কথাই নাই৷ উভয় ক্ষেত্রেই পুঁজিপতিদের সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনের প্রয়োজনে সর্বত্র উন্নত যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হচ্ছে এবং তার মধ্য দিয়ে ব্যাপক হারে শ্রমিক ছছাটাই করা হচ্ছে৷ ১০০ ঘন্টার কাজ যন্ত্র এক ঘন্টায় করে দিচ্ছে৷ এই প্রশ্নে মূল বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে, যন্ত্রের ব্যবহার হবে কি না, হলেও কোথায় কতটুকু হবে৷ এই সব দিকগুলো সম্পর্কে তো সরকারকেই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে৷ যন্ত্রের ব্যবহার করতে গিয়ে আমাদের দেশের মানুষ, গরিব জনসাধারণ যদি না খেয়ে মারা যান তাহলে এই পথে আমরা যাব কেন? এটা তো বিজ্ঞতার পরিচায়ক নয়৷ বিজ্ঞান–প্রযুক্তির উন্নতি ঘটুক কাম্য৷ কিন্তু সে তো মানুষের জন্যই৷ বিভিন্ন ব্যাঙ্ক, আধাসরকারি, সরকারি অফিসগুলোতে যন্ত্রের ব্যবহারের ফলে লাখ লাখ কর্মচারী কাজ হারাচ্ছে৷ অন্য দিকে, যারা আছে তাদেরও স্বেচ্ছায় অবসর নিতে বাধ্য করা হচ্ছে৷ স্কুল–কলেজ, সরকারি হাসপাতাল সর্বত্র একই অবস্থা৷ ভারতীয় রেল বিশ্বের মধ্যে অন্যতম উন্নত বিশাল একটা যোগাযোগ ব্যবস্থা৷ শুরুর দিন থেকেই বহু মানুষ রেলে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে৷ ইতিমধ্যে সেখানেও লক্ষ লক্ষ শ্রমিক–কর্মচারীকে ছাঁটাই করা হয়েছে৷ বাকি যাঁরা রয়েছেন তাঁদের মাথায়ও ছাঁটাইয়ের খডগ ঝুলছে৷ নামে সরকারি কিন্তু রেল বিভাগকে কার্যত পুঁজিপতিদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে৷

মানুষের জীবনে চিকিৎসা ব্যবস্থার গুরুত্ব এবং অপরিহার্যতা ব্যাখ্যা করে বলার প্রয়োজন নেই৷ জীবন এবং চিকিৎসা এক এবং অভিন্ন৷ কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার অব্যবহিত পরে চিকিৎসা ব্যবস্থার যতটুকু উন্নতি হয়েছিল সেটুকুও আজ আর নেই৷ প্রায় সবটুকু আজ ভেঙে পড়েছে৷ কোথাও কোথাও কিছু সংখ্যক সরকারি হাসপাতাল থাকলেও সেগুলোতে উপযুক্ত চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই৷ দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাও পুঁজিপতিদের হাতে চলে গিয়েছে৷ শিক্ষা ব্যবস্থায় যেভাবে বেসরকারিকরণ করা হয়েছে, স্বাধীনতার পূর্বে তা লক্ষ করা যায়নি৷ ব্রিটিশ আমলে খুব বেশি স্কুল–কলেজ ছিল না ঠিক, কিন্তু যে ক’টা ছিল সরকারি ক্ষেত্রেই ছিল৷ কিন্তু স্বাধীনতার পর যত দিন যাচ্ছে ততই গরিব জনসাধারণকে শিক্ষাক্ষেত্র থেকে দূরে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে৷ বেসরকারিকরণ করার ফলে শিক্ষার ব্যয়ভার বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে৷ ফলে যে নগণ্য সংখ্যক গরিব ছাত্রছাত্রী পডাশোনায় এগিয়ে এসেছিল আজ তাও আর আসছে না৷ নানা চক্রান্ত করে এদের শিক্ষার আঙ্গিনা থেকে কার্যত তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে৷ এই তো দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির খুবই সংক্ষিপ্ত একটি প্রতিচ্ছবি৷

শাসক পুঁজিপতি শ্রেণি তাদের মালিকানাধীন প্রচারযন্ত্রকে বিপুল ভাবে কাজে লাগিয়ে এই নির্মম নিষ্ঠুর শোষণকে চাপা দিচ্ছে৷ দিনকে রাত, রাতকে দিন করছে৷ সত্যকে মিথ্যা, মিথ্যাকে সত্য বানাবার চেষ্টা করছে৷ পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শাসক পুঁজিপতিরা এইভাবেই জনসংখ্যার ৯৫ শতাংশ মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে৷ দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৫০ শতাংশই বেকার৷ হয় পূর্ণ বেকার, না হয় প্রায় বেকার অথবা অর্ধ–বেকার৷ দেশের ৫০ শতাংশ মানুষেরই কোনও কাজ নেই এবং এর কোনও প্রতিকার নেই– এটাই যদি চলে তা হলে দেশের জনসাধারণের বেঁচে থাকার সুযোগ কতটুকু থাকল? এই ভয়ঙ্কর অবস্থা কি ভাববার  কথা নয়? আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার ইচ্ছা মানুষের থাকে, ইচ্ছা থাকে নিজে পরিশ্রম করব, উপার্জন করব, উৎপাদন করব, ন্যায্য মজুরি পাব, নিজে বেঁচে থাকব এবং পরিবারের অন্যদেরও বাঁচিয়ে রাখব– সেই ন্যূনতম সুযোগ আজ দেশে কোথায়? সেটাই যদি না থাকে তা হলে মানুষের জীবনে আনন্দের উৎস কী থাকল?

নৈতিকতা, মনুষ্যত্ব ধ্বংস করছে পুঁজিবাদ

অন্য দিকে এই তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের অনিবার্য পরিণামে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র সামাজিক–সাংস্কৃতিক সংকট৷ পুঁজিপতিদের শোষণের ফলে মানুষ মরছে, কিন্তু যাঁরা বেঁচে আছেন তাঁরা কি মনুষ্যত্ব নিয়ে বেঁচে আছেন? পত্র–পত্রিকা, রেডিও, টেলিভিশন খুলুন, দেখবেন কেবল হত্যা, খুন আর মারামারি৷ আমাদের প্রিয় নেতা এ যুগের অন্যতম মার্কসবাদী চিন্তানায়ক কমরেড শিবদাস ঘোষ বহু আগেই দেখিয়েছিলেন, বেঁচে থাকার কোনও সঠিক পথ না পেয়ে পুঁজিপতি শ্রেণিরই চক্রান্তে একাংশ মানুষ, ছাত্র–যুবকরা সমাজবিরোধীতে পরিণত হচ্ছে, অনৈতিক জীবনধারণের দিকে ঝুঁকছে৷ আপনারা দেখছেন আজ মানুষ মানুষকে মারছে৷ ভারতবর্ষে মানুষ হত্যা করা একটা জীবিকা হয়ে দাঁড়িয়েছে অবস্থাটা আজ কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে৷ এটা ভাবতে পারা যায়? সবচেয়ে মারাত্মক কথা হচ্ছে পুঁজিপতি শ্রেণি এবং তাদের তাঁবেদার দলগুলিই মানুষকে এই পথে নিয়ে যাচ্ছে৷ আপনারা ভেবে দেখুন আমাদের দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামীরা, স্বাধীনতাকামী জনসাধারণ কি ঘুণাক্ষরেও চিন্তা করেছিলেন স্বাধীন ভারতবর্ষে মানুষ মানুষকে  মারবে, পিতা সন্তানকে হত্যা করবে বা সন্তান পিতা–মাতাকে, স্বামী স্ত্রীকে হত্যা করবে কিংবা স্ত্রী স্বামীকে হত্যা করবে অথচ স্বাধীনতার ৭৩ বছরে এমনই একটি দেশ, এমনই এক সমাজ সৃষ্টি করেছে পুঁজিপতিরা৷

পুঁজিপতিদের শাসন শোষণের পরিণামেই তো এটা হচ্ছে এবং প্রতিদিন অবস্থার অবনতিও ঘটছে৷ আপনারা নিশ্চয়ই দেখছেন, আজ কোনও পরিবারে সুখ নেই, স্বস্তি নেই, শান্তি নেই৷ পরিবার বলতে আজ আর কিছুই নেই, সব ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছে৷ পিতার সাথে পুত্রের সম্পর্ক, স্বামীর সাথে স্ত্রীর সম্পর্ক সবই টাকার সম্পর্ক৷ আর কেবল টাকার ভূমিকাই নয়, মানুষকে আজ ইতর প্রাণীর থেকেও অধঃপতিত স্তরে নামিয়ে আনা হয়েছে৷ ইতর প্রাণী ধর্ষণ করে না৷ কিন্তু মানুষ আজ কী করছে৷ নারী ধর্ষণ, নারী পাচার, শিশু ধর্ষণ প্রতিদিন কী তীব্র আকার ধারণ করছে৷ অবস্থা এমন দাডিয়েছে যে, যখন তখন, যেখানে সেখানে বর্বর ধর্ষণের আশঙ্কা নিয়ে মহিলাদের ঘর থেকে বেরোতে হচ্ছে৷

প্রশ্ন হচ্ছে এসব কি এমনি এমনিই ঘটছে, এই বর্বর কার্যকলাপের কোনও কার্যকারণ নেই? মানুষের যে খাওয়ার নেই, পরার নেই, শিক্ষা নেই, চিকিৎসা নেই এইগুলির কি কোনও কারণ নেই? বিজ্ঞান কার্যকারণবাদের কথা বলেছে৷ বলেছে, ঘটনা ঘটলে তার কারণ থাকবেই, আর কারণ থাকলে ঘটনা ঘটবেই৷ বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ বলছে কারণ একটাই– পুঁজিবাদ এবং পুঁজিবাদী নির্মম শোষণ৷ পুঁজিবাদ আজকে মানুষকে কেবল অর্থনৈতিক ভাবে শোষণ করেই মারছে না, ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য পুঁজিপতি শ্রেণি এবং তাদের তাঁবেদার সরকারগুলি মানুষের নীতি–নৈতিকতাবোধ, মনুষ্যত্ববোধ সবকিছু প্রতিদিন ধবংস করে চলেছে৷ কমরেড শিবদাস ঘোষ বলেছিলেন, একটা জাতি খেতে না পেলেও মাথা তুলে দাডাঁতে পারে যদি তার নৈতিক বল অটুট থাকে৷ পুঁজিপতি শ্রেণি ঠিক এই জায়গাতেই প্রচণ্ড আঘাত হানছে, নৈতিক মেরুদণ্ডকে একেবারে ভেঙে দিচ্ছে সেই কারণেই৷ পুঁজিপতি শ্রেণি ঠিকই বুঝতে পারছে, যে তীব্র শোষণ তারা চালাচ্ছে এর ফলে যে শ্বাসরোধকারী পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে, মানুষ তার প্রতিকার চাইবেই৷ ফলে চক্রান্তটা হচ্ছে পুঁজিপতি শ্রেণির শাসন–শোষণের বিরুদ্ধে বিপ্লবী সংগঠন যাতে গড়ে উঠতে না পারে, প্রতিবাদ প্রতিরোধ যাতে মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে তার ব্যবস্থা করা৷ এই জঘন্য মতলব থেকেই নৈতিকতার উপর এই আক্রমণ৷

গরিব মানুষের ভোটে দাঁড়ানোর অধিকারও কেড়ে নেওয়া হচ্ছে

রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও চলছে পুঁজিপতি শ্রেণির আক্রমণ৷ দেশে গণতন্ত্রের নামে যা চলছে তা পুঁজিপতি শ্রেণির জবরদস্তি, আড়াল থেকে পুঁজিপতি শ্রেণির নির্ভেজাল একনায়কত্ব৷ গণতন্ত্রের কোনও ভাল দিক আজ আর অবশিষ্ট নেই৷ একদিন গণতন্ত্রের ধ্যান–ধারণা এসেছিল পাশ্চাত্যে রাজতন্ত্র–সামন্তত বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে৷ তখন পুঁজিপতিরাই স্লোগান দিয়েছিলরাজার শাসন নয়, স্বৈরতান্ত্রিক শাসন নয়, জনগণই জনগণকে শাসন করবে৷ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনগণ তাদের শাসক  নির্বাচিত করবে৷ নির্বাচনে প্রত্যেক নাগরিকের সমান ভোটাধিকার থাকবে, সমান অধিকার থাকবে৷ জনসাধারণের ভোটে সরকার গঠিত হবে, ৫ বছর অন্তর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে৷ কোনও একটি সরকার জনস্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করলে জনসাধারণ ভোটের মাধ্যমে তাদের ক্ষমতাচ্যুত করবে এবং অন্য একটি দলের প্রার্থীদের ভোট দিয়ে নতুন সরকার গঠন করবে৷ ভোটের অধিকার, পছন্দের অধিকার এসব ছিল বুর্জোয়া গণতন্ত্রের শ্রেষ্ঠ দিক৷ কিন্তু সেই গণতন্ত্র আজ কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে, গণতন্ত্রের ছিটেফোঁটাও কি আজ অবশিষ্ট আছে? গণতন্ত্রের নামে নির্বাচনের চরিত্র আজ কী দাঁড়িয়েছে? নির্বাচনকে একটা প্রহসনে পর্যবসিত করে দেওয়া হয়েছে৷ প্রতিটি নির্বাচনে পুঁজিপতি শ্রেণির দলগুলি কী পরিমাণ টাকা খরচ করছে, তা আজ সকলেই জানে৷ জনগণের ভোট কিনতে গিয়ে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় কোনও প্রার্থী যদি ১–২ কোটি টাকা খরচ করে তা হলে নির্বাচিত হওয়ার পর জনসাধারণের টাকা আত্মসাৎ করে ৮–১০ কোটি টাকা বানাতে তার এক বছর সময়ও লাগে না৷ গণতন্ত্রের নামে নির্বাচন এখন শুধুমাত্র প্রতারণা৷ নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারিত হয় জাতপাত, ধর্ম–বর্ণের মধ্য দিয়ে, মারাত্মক বিভাজনবাদ, ভ্রাতৃঘাতী সংঘর্ষ এবং ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে, আর এর চূড়ান্ত পর্যায়ে, পুঁজিপতি শ্রেণির অঢেল টাকা এবং প্রচারের বন্যা বইয়ে৷

শোষিত জনসাধারণের বিচারবুদ্ধি ভোঁতা করে দেওয়ার জন্য শাসক পুঁজিপতি শ্রেণি ‘ভারতবর্ষ বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ’ বলে দিনরাত প্রচার করছে আর এই ‘বৃহত্তম গণতন্ত্রে’র দেশে বেশির ভাগ মানুষ আজ না খেয়ে মরছে৷ আজকের এই গণতন্ত্রে জনগণের হাতে কোনও ক্ষমতাই নেই, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক  সমস্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত পুঁজিপতি শ্রেণির হাতে৷ এই গণতন্ত্র তা হলে কার গণতন্ত্র, কোন জনগণের গণতন্ত্র? আজ গণতান্ত্রিক বলে অভিহিত এই সমাজে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, পুঁজিপতি শ্রেণির পৃষ্ঠপোষকতায় তাদেরই তাঁবেদার দলগুলো জনগণের ভোট কিনে নিয়ে সরকার বানিয়ে মন্ত্রী হয়ে জনসাধারণকে  আরও তীব্রভাবে শোষণ করে চলেছে৷ প্রতিদিন জনসাধারণের সাথে মিথ্যাচার করছে, প্রতারণা করছে৷ অন্য দিকে জনসাধারণের অর্জিত সমস্ত মৌলিক অধিকার, প্রতিবাদ–প্রতিরোধের্ অধিকার, মিটিং–মিছিলের অধিকার, শ্রমিকের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার, গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তোলার অধিকার,এই সরকারগুলি আজ একটা একটা করে কেড়ে নিচ্ছে৷

এই যে লোকসভার নির্বাচন হয়ে গেল, তাতেও তো পরিষ্কার দেখা গেল টাকা–পয়সা, মিথ্যাচার, ধূর্তামি, ভণ্ডামি, প্রতারণা, জঘন্য ধরনের সাম্প্রদায়িকতা উস্কে দেওয়া– অতীতের সমস্ত রেকর্ড ছাপিয়ে গিয়েছে৷ এই নির্বাচনে জেতার জন্য বিজেপি কী পরিমাণ টাকা খরচ করেছে তার সবটা প্রকাশ্যে না এলেও কিছু কিছু খবর পত্র–পত্রিকায় এসেছে৷ শুধু বিজেপি নয়, কংগ্রেস ইত্যাদি সমস্ত বুর্জোয়া দল এমনকি বামপন্থী বলে যারা এখনও নিজেদের পরিচয় দেয় তারা সকলেই কর্পোরেট হাউস বা একচেটিয়া পুঁজিপতিদের কাছ থেকে অভাবনীয় পরিমাণ টাকা পেয়েছে এবং ভোট কেনার জন্যই এই টাকা খরচ হয়েছে৷ পুঁজিপতিরা যে এই অঢেল টাকা ঢালছে তা আসছে কোথা থেকে? আপনারা জানেন, গরিব মানুষকে শোষণ করেই পুঁজিপতিরা প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ টাকার মালিক হয়৷ এই তহবিল থেকেই তারা তাদের হয়ে যে দলগুলি নির্বাচন লড়ছে তাদেরকেই যথেচ্ছ টাকা দিচ্ছে৷ আপনারা দেখছেন, পুঁজিপতিরা মানুষের ভোটাধিকার, বিবেক সব কিছু কিনে নিতে এই টাকা খরচ করছে৷ ঘটনা থেকে এই সত্য বেরিয়ে আসছে যে, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে জনসাধারণের যে একটি মাত্র অধিকার অবশিষ্ট ছিল– জনগণের সার্বজনীন ভোটাধিকার, পুঁজিপতিরা আজ সেটাও ছিনিয়ে নিচ্ছে৷ এটা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার, পুঁজিপতিদের গোলামরাই আজ নির্বাচনে জিতছে৷ এই অবস্থায় গরিব মানুষের প্রকৃত কোনও প্রতিনিধিই আজ আর নির্বাচনে জিততে পারছে না৷ নির্বাচনের নামে এমন ব্যবস্থাই সৃষ্টি করা হয়েছে৷ শুধু তাই নয়, চক্রান্ত আরও গভীর৷ আজ এমন একটি অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে যে, গরিব মানুষের দল বা প্রতিনিধিকে আটকাতে জাত–পাত, টাকা–পয়সা কোনও কিছুই যদি কাজ না করে তা হলে এই কারণ, সেই কারণ দেখিয়ে, নানা অজুহাত সৃষ্টি করে গরিব মানুষের দলের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অধিকারটাই ওরা কেড়ে নিতে চাইছে৷ এই পরিস্থিতিতে সরকার গঠন দূরে থাকুক লোকসভায়, বিধানসভায় গরিব মানুষের কোনও প্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার কোনও সম্ভাবনা আজ আর থাকছে না৷ এইসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, এই তথাকথিত নির্বাচনে এখন আর গণতন্ত্রের কিছুই থাকছে না৷ এই মৌলিক কারণেই এই বুর্জোয়া নির্বাচনের সাথে জনস্বার্থের কোনও সম্পর্ক নেই৷ বিগত ৭০ বছরে কেন্দ্রে রাজ্যে যত নির্বাচন হয়েছে, যত সরকার পরিবর্তন হয়েছে, ধারা কিন্তু একটাই৷ ধনীরা আরও ধনী হয়েছে এবং দেশের মোট জনসংখ্যার ৯০–৯৫ ভাগ গরিব আরও গরিব হয়েছেন৷

নামধারী বামপন্থী দলগুলি পুঁজিপতি শ্রেণির সঙ্গে বোঝাপড়া করে চলছে

পুঁজিবাদের এই শোষণ–ত্যাচারের ফলে দেশে সমস্ত দিক থেকে যে নারকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটে জরুরি প্রয়োজন হচ্ছে দেশে প্রকৃত বামপন্থী আন্দোলনকে শক্তিশালী করা, প্রকৃত বামপন্থী ভাবধারার ভিত্তিতে জনজীবনের সমস্যাগুলিকে নিয়ে লাগাতার শক্তিশালী গণআন্দোলন গড়ে তোলা৷ কিন্তু বাস্তব ঘটনা হচ্ছে, এই সঠিক পথে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য আজ আমাদের দল ছাড়া অন্য কোনও বামপন্থী দল নেই৷ সিপিএম, সিপিআই সহ তথাকথিত অন্যান্য বামপন্থী দলগুলি বহুদিন আগেই এই পথ ছেড়ে বুর্জোয়া দলগুলির মতোই কেবলমাত্র ভোটের রাজনীতিই করছে৷ শুধু তাই নয় পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা এবং ত্রিপুরায় বুর্জোয়াদের পৃষ্ঠপোষকতায় ক্ষমতায় বসে এরা বুর্জোয়া কায়দায় অন্যান্য পুঁজিবাদী দলগুলির মতো যেভাবে শাসন চালিয়েছে, যে ভাবে দমন–পীড়ন চালিয়েছে, জনগণের ন্যায়সঙ্গত গণতান্ত্রিক আন্দোলন পাশবিক শক্তি প্রয়োগ করে ধ্বংস করেছে, যেভাবে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকারগুলিকে পর্যন্ত পদদলিত করেছে, তার ফলে ওই সব রাজ্যে জনমত প্রচণ্ড ভাবে তাদের বিরুদ্ধে গিয়েছে৷ শুধু তাই নয়, মার্কসবাদ, লেনিনবাদ, সমাজতন্ত্র, সাম্যবাদের আদর্শ এবং আবেদন বিশেষ করে এইসব রাজ্যের জনগণকে যে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করত, তাদের এইসব মার্কসবাদ বিরোধী কার্যকলাপের ফলে, সাময়িকভাবে হলেও তা বহুলাংশে হারিয়েছে৷

আপনারা অবহিত আছেন ১৯৭৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সচেতন জনগণ সেখানকার চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়াশীল দক্ষিণপন্থী জাতীয় কংগ্রেসকে প্রায় নির্মূল করে তথাকথিত বামপন্থীদের ক্ষমতায় বসিয়েছিলেন৷ আপনারা জানেন দীর্ঘ ৩৪ বছর তারা ক্ষমতায় আসীন ছিল৷ এই ৩৪ বছর সিপিএম সরকার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক দিক থেকে জনগণকে টুঁটি টিপে মারার চেষ্টা করেছে৷ তাদের চূড়ান্ত দমনমূলক কার্যকলাপ, চূড়ান্ত দুর্নীতি, অন্যায় শাসন, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের উপর পাশবিক আক্রমণ– এইসব দেখে জনগণ কংগ্রেস প্রমুখ পুঁজিপতি শ্রেণির বিশ্বস্ত দলগুলির শাসন–শোষণের সঙ্গে এদের কোনও পার্থক্যই খুঁজে পাননি৷ এই অবস্থা জনগণ আর সহ্য করতে না পেরে সিঙ্গুর–নন্দীগ্রাম আন্দোলনকে ভিত্তি করে তাদের ক্ষমতাচ্যুত করলেন এবং সেই সুযোগে দক্ষিণপন্থী কংগ্রেসেরই একটি দলছুট অংশ তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় বসল৷ দৃশ্যতই সিপিএমের ‘বামপন্থা’ একটি প্রবল শক্তিশালী দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক শক্তিরই জন্ম দিল৷ এরই পথ বেয়ে পুঁজিবাদী তৃণমূলের চূড়ান্ত জনবিরোধী অপশাসনের সুযোগ নিয়ে এবং এটা শুনে আপনারা স্তম্ভিত হয়ে যাবেন, সিপিএমেরও সহযোগিতা পেয়ে পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে তৃণমূল থেকে আরও মারাত্মক দক্ষিণপন্থী শক্তি বিজেপি লোকসভার বিগত নির্বাচনে ৪২–এর মধ্যে ১৮টি আসনে জয়লাভ করেছে৷ আপনারা দেখেছেন ২০১৮–র ত্রিপুরা বিধানসভা নির্বাচনে একই জিনিস হয়েছে৷ সিপিএমের একটানা ২৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে সিপিএমের লোকজনকে টেনে নিয়ে আরএসএস–বিজেপি সেখানে ক্ষমতায় বসেছে৷ কেরলে বুর্জোয়া–পেটি বুর্জোয়া সাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়াশীল দলগুলিকে নিয়ে কংগ্রেস পরিচালিত ফ্রন্ট এবং সিপিএম নেতৃত্বে ঠিক একই ধরনের বুর্জোয়া–পেটিবুর্জোয়া এবং আঞ্চলিক সাম্প্রদায়িক দলগুলোকে নিয়ে আরেকটি ফ্রন্ট প্রায় পালা করে ক্ষমতায় বসে এবং এই দুই ফ্রন্টের মধ্যেই নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা আবদ্ধ থাকে এবং যেই জিতুক সম্পূর্ণ বুর্জোয়া কায়দায় সরকার পরিচালিত হয়৷ আপনারা নিশ্চয়ই মানবেন, পুঁজিবাদকে মেনে নিয়ে তাদের সঙ্গে কোনও ভাবে সংঘাতে না গিয়ে, তাদের স্বার্থে সরকার পরিচালনার মধ্যে বামপন্থার ছিটেফোঁটাও নেই৷ কারণ এটাই দক্ষিণপন্থা, এটাই বুর্জোয়া সোস্যাল ডেমোক্রেটিক রাজনীতি৷ অন্য দিকে বামপন্থা এবং বামপন্থী রাজনীতির মর্মবস্তু নিহিত রয়েছে শোষিত জনসাধারণের স্বার্থে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রাম পরিচালনার মধ্যে৷ দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সত্য হচ্ছে, দক্ষিণপন্থা আরও মারাত্মক দক্ষিণপন্থার জন্ম দেবে, সে কখনও বামপন্থার জন্ম দিতে পারে না৷ অপরদিকে প্রকৃত বামপন্থা আরও উন্নততর বামপন্থার জন্ম দেবে৷ সে কখনও দক্ষিণপন্থার জন্ম দিতে পারে না৷ এই ধারায় সর্বহারা শ্রেণির বিপ্লবী দল বিপ্লবী আন্দোলনের দিকেই শোষিত জনসাধারণকে পরিচালনা করবে৷ অন্যান্য দিক থেকে সিপিএম–সিপিআই এর সঠিক চরিত্র বিশ্লেষণের পদ্ধতি ও উপায় থাকলেও, এদিক থেকে বিচার করলেও এই সত্যই ফুটে উঠছে–  জেনে হোক, না জেনে হোক এরা দক্ষিণপন্থার রাজনীতিই করছেন, পুঁজিপতিদের পক্ষ অবলম্বন করেই রাজনীতি করছেন৷

আপনারা অনেকেই জানেন, ১৯২০ সালে অবিভক্ত সিপিআই গড়ে উঠেছিল৷ জন্মের পর এরা আজকের মতো গণআন্দোলন বর্জিত বুর্জোয়া পরিষদীয় রাজনীতির চর্চা করেনি৷ সংস্কারপন্থী ভাবে হলেও শ্রমিক, কৃষক, নিম্ন মধ্যবিত্তদের স্বার্থ রক্ষার জন্য কিছু কিছু আন্দোলন করেছে৷ সেদিনকার এইসব আন্দোলনমুখী কার্যকলাপের ফলে তাদের নেতা–কর্মীরা লাঠি–গুলি, কারাবাসের মুখে পড়েছেন৷ এই সবই সত্য৷ এগুলোকে যথাযথ ভাবে স্বীকার করে নিয়েও প্রিয় নেতা এবং মহান শিক্ষক কমরেড শিবদাস ঘোষ ১৯৪৫ সালে জেল থেকে বেরিয়ে এসেই দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছিলেন, মার্কসবাদসম্মত, বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিকে কঠোর ভাবে অনুসরণ করে একটি প্রকৃত সর্বহারার বিপ্লবী দল, একটি প্রকৃত কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে ওঠে৷ সিপিআই দল সেই ভাবে গড়ে উঠেনি৷ মধ্যবিত্ত, পেটিবুর্জোয়া সুলভ মনন মানসিকতা, ব্যক্তিগত স্বার্থ, ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও সম্পত্তিবোধ, ব্যক্তিগত মানসিকতা থেকে উদ্ভূত পরিবার সংক্রান্ত ধারণা, সর্বোপরি বুর্জোয়া ব্যক্তিবাদ– এগুলো থেকে মুক্ত হয়ে ডি ক্লাসড হয়ে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার সংগ্রাম তারা শুরু করতে পারেনি৷ কমরেড শিবদাস ঘোষ বললেন, বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার আরেকটি লেনিনীয় পূর্বশর্ত– সঠিক বিপ্লবী তত্ত্ব– দি কারেক্ট স্ট্র্যাটেজিকাল লাইন– রাষ্ট্রের সঠিক চরিত্র নির্ধারণ– এই ক্ষেত্রে তারা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হলেন৷ ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ভারতীয় রাষ্ট্র যে পুঁজিপতি শ্রেণির রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হল তা ধরতে তারা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হলেন৷ আপনারা ভাববার চেষ্টা করুন, সেদিনকার ওই অবস্থায় দেশে এবং বিদেশে যখন উচ্চকণ্ঠে তাদের গুণগান হচ্ছে, সেই অবস্থাতেও কমরেড শিবদাস ঘোষ দৃঢ়তার সাথে এই বিশ্লেষণ তুলে ধরেছিলেন৷ তিনি আরও বলেছিলেন, এই অবস্থায় বসে থাকার উপায় নেই, কালবিলম্ব না করে মার্কসবাদ–লেনিনব ভিত্তিতে সঠিক শ্রমিক শ্রেণির বিপ্লবী দল, প্রকৃত কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার সংগ্রাম শুরু করতে হবে৷ বলা বাহুল্য তখন তিনি নিতান্তই একা৷ কিন্তু এটা তাঁর পথ আটকাতে পারেনি৷ আপনারা জানেন, সেই পথেই এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট)–এর উদ্ভব৷ অবিভক্ত সিপিআই ছাড়া মার্কসবাদের নামে অবশ্য কয়েকটি দল সেই সময় দেশে ছিল৷ মার্কসবাদী পণ্ডিত ও বিদ্বান বলে পরিচিত কিছু ব্যক্তিও সেই সময় দেশে ছিলেন৷ এম এন রায়, যিনি লেনিনের সহযোগী হিসাবেও কাজ করেছিলেন, তিনিও ছিলেন৷ কিন্তু তাঁদের কেউই অবিভক্ত সিপিআই এবং সেই সময়ের মার্কসবাদী আন্দোলনের ত্রুটি–বিচ্যুতি সম্পর্কে এই বিজ্ঞানসম্মত বিশ্লেষণ তুলে ধরতে পারেননি৷ এস ইউ সি আই (সি)–র জন্ম এবং বহু বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট ধরা পড়ছে কী ধরনের গভীর প্রজ্ঞা, জ্ঞান এবং দূরদৃষ্টির অধিকারী হয়েছিলেন কমরেড শিবদাস ঘোষ৷ তাঁর শিক্ষার আলোকেই প্রতিদিন সাধারণ শোষিত জনসাধারণকে সংগ্রামে সংগঠিত করে আমরা দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছি৷

আজ তো ওদের সংগ্রামবিমুখ মানসিকতা, পুঁজিবাদী দলগুলির সাথে মিলেমিশে থাকা, পুঁজিপতি শ্রেণির ওদের প্রতি বোঝাপড়ার মনোভাব শুধু আমাদের কাছে নয়, সাধারণ মানুষের কাছেও স্পষ্ট হয়ে উঠছে, তাদের কাছেও ধরা পড়ছে৷ এই ঘটনায় তাদের ক্ষোভ এতটাই যে বহু মানুষ আমাদের প্রতি সমর্থন এবং সহমর্মিতা জানিয়েও ক্ষুব্ধ মন নিয়ে আমাদের কর্মীদের কাছ থেকে জানতে চান, আমরা সিপিআই(এম)–এর সঙ্গে আছি কি না৷ ওদের নির্বাচনী ফলাফল যদি সঠিক ভাবে বিশ্লেষণ করা যায় তা হলেও এই সত্যটাই উঠে আসবে– ওরা দ্রুত জনগণের সমর্থন হারাচ্ছে৷ আরএসএস–বিজেপির দক্ষিণপন্থী ফ্যাসিবাদ যখন প্রচণ্ডভাবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে এবং তাকে মোকাবিলা করার জন্য যখন বামগণতান্ত্রিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করার ঐতিহাসিক প্রয়োজন দেখা দিয়েছে, সেই সময় আমাদের কাছে ওদের এই নিদারুণ অবস্থা, নিশ্চয়ই সুখকর নয়৷ কিন্তু আমরা কিংবা জনগণ কষ্ট পেলে ওদের কী এসে যায় পুঁজিবাদের সঙ্গে ওদের বোঝাপড়া এদিক ওদিক হবার নয়৷

আরএসএস–বিজেপির বাড়বাড়ন্তের পিছনে কংগ্রেসের ভূমিকা আছে

ওদের এই সর্বনাশা রাজনীতির আরও কয়েকটি মারাত্মক পরিণাম সম্পর্কেও আমি আপনাদের অবহিত করতে চাই৷ আপনার দেখছেন, সিপিএম আজ গণআন্দোলনের পথ পরিহার করে ক্ষমতার লোভে পরিষদীয় রাজনীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়ে আছে৷ দুই–একটা আসন জেতার জন্য পুঁজিপতি শ্রেণির বিশ্বস্ত দল কংগ্রেসকে ধর্মনিরপেক্ষ সাজিয়ে কংগ্রেসের সাথে নির্বাচনী আঁতাঁত গড়ে তুলছে– এটাই হচ্ছে ওদের ঘোষিত সাধারণ লাইন৷ সকলেই জানেন কংগ্রেস পুঁজিপতি শ্রেণির অতি বিশ্বস্ত একটা দল৷ আজ সে ক্ষমতায় না থাকতে পারে, কিন্তু এই দলটি ৫৩/৫৪ বছর ক্ষমতায় থেকে পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে ভারতবর্ষের পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে শক্তিশালী ও সংহত করার কাজই করেছে৷ ভোটের স্বার্থে সেই কংগ্রেসকে এখন সিপিএম ধর্মনিরপেক্ষ সাজিয়েছে৷ ধর্মনিরপেক্ষতার উদ্ভবের তো একটা ইতিহাস আছে৷ বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের দিনে পুঁজিবাদের বিকাশের যুগে যখন গণতান্ত্রিক ভাবধারার বিকাশ ঘটছিল, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটছিল, সেই সময়ই ধর্মনিরপেক্ষতার ধ্যানধারণার জন্ম হয়েছে৷ রাজতন্ত্রের যুগে রাষ্ট্রের ওপর চার্চ তথা ধর্মের প্রাধান্য ছিল৷ রাজনৈতিক ব্যবস্থা, রাষ্ট্রব্যবস্থা ছিল চার্চ বা ধর্মের অধীন৷ তার বিরুদ্ধে মানুষ দীর্ঘদিন সংগ্রাম করেছে৷ এই পথে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এই ধারণার জন্ম হয়েছে যে ধর্ম হচ্ছে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয়৷ তার সাথে রাষ্ট্র, রাষ্ট্রব্যবস্থা, রাষ্ট্র পরিচালনা, সরকার পরিচালনার কোনও সম্পর্ক থাকবে না৷ আরও উন্নত স্তরে এই ধারণারও জন্ম হয়েছিল যে ধর্মনিরপেক্ষতার যথার্থ অর্থ হচ্ছে নন রেকগনিশন অফ এনি সুপারন্যাচারাল এনটিটি (যে কোনও অতিপ্রাকৃত সত্তার অস্তিত্ব অস্বীকার করা)৷ এটা ঐতিহাসিক ঘটনা যে,  সামন্ততন্ত্র–রাজত দিনে ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণার উদ্ভব হয়নি, তাকে উচ্ছেদ করার সংগ্রামের পথেই এই ধারণা গড়ে উঠেছে৷ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিকাশের পথেই ধর্মনিরপেক্ষতার জন্ম হয়েছে৷ সেদিন তার প্রয়োজন ছিল ঐতিহাসিক৷ সেদিন বিকাশমান পুঁজিবাদ একদিকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্ম দিচ্ছে, অপরদিকে সামন্ততান্ত্রিক ভেদাভেদ, সর্বপ্রকার পৃথকতাবাদ, বিভাজনবাদ, ধর্মীয় উন্মাদনা– এগুলির বিরুদ্ধে তীব্র ভাবে লড়াই করেছে৷ কিন্তু আজ তো পুঁজিবাদের চূড়ান্ত ক্ষয়িষ্ণু যুগ৷ আজ তো বিপ্লবের ভয়ে ভীত পুঁজিবাদ ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য তারই সকল সৃষ্টিকে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে৷ তারই সৃষ্ট সকল গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে কবর দিচ্ছে ও যত প্রকারে পারা যায় জনগণকে জাত–পাত–ভাষা–ধর্ম নামে বিভক্ত করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে৷ উন্নত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের উপর দাঁড়িয়ে আছে ধর্মনিরপেক্ষতার যে উচ্চ আদর্শ, তাকেও তারা প্রকাশ্যেই পায়ে মাড়িয়ে যাচ্ছে৷ এই অবস্থায় পুঁজিবাদের এই ক্ষয়িষ্ণু যুগে কোনও একটি পুঁজিপতি শ্রেণির দলকে আমরা ধর্মনিরপেক্ষ বলি কীভাবে? মহান লেনিন বারবার স্মরণ করিয়েছেন, গণতন্ত্রের ধারণা সুপ্রা ক্লাস (শ্রেণি ঊর্ধ্ব) নয়, নিশ্চিত রূপে এটারও শ্রেণি চরিত্র রয়েছে৷ একদিকে বুর্জোয়া গণতন্ত্র অপরদিকে জনসংখ্যার ৯৫ ভাগ শোষিত জনসাধারণের গণতন্ত্র– সর্বহারা গণতন্ত্র৷ এই অর্থেই পুঁজিবাদের চূড়ান্ত ক্ষয়িষ্ণু এই যুগে পুঁজিপতি শ্রেণি এবং তাদের দল ও সরকারগুলির মধ্যে প্রকৃত গণতন্ত্র এবং প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষতা– এর কোনওটাই আজ আর নেই৷ বিপ্লবের ভয়ে ভীত পুঁজিবাদ আজ দৈত্য হয়ে উঠছে৷ নিজের সৃষ্টি নিজেই ধ্বংস করে দিচ্ছে৷ তাই পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শুধুমাত্র সরকার বিরোধী বলেই কোনও একটি পুঁজিবাদী দল ধর্মনিরপেক্ষতার ধারক–বাহক হতে পারে না৷ কিন্তু কী দুর্ভাগ্য দেখুন, মার্কসবাদের নাম নিয়ে চলা সিপিএম চূড়ান্ত অসত্য  এবং অ–মার্কসীয় তত্ত্ব আওড়াচ্ছে এবং শোষিত জনসাধারণের মনে পুঁজিপতি শ্রেণির অতি বিশ্বস্ত দল কংগ্রেস সম্পর্কে মারাত্মক মোহের জন্ম দিচ্ছে৷

কংগ্রেসের ৫৩/৫৪ বছরের শাসনকালেও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর জঘন্য আক্রমণ এবং নির্বিচারে হত্যার খবর কে না জানে৷ আরএসএস–বিজেপির মতো জঘন্য সাম্প্রদায়িক শক্তি যে আজকের অবস্থানে এসেছে তাতে কংগ্রেসের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না৷ নিঃসন্দেহে বিজেপি পুঁজিপতি শ্রেণিরই আরেকটি অতি বিশ্বস্ত দল৷ কিন্তু স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়ে এরা হালে পানি পায়নি৷ স্বাধীনতার পরও প্রথম দিকে স্বাধীনতা আন্দোলনের রেশ কিছুটা থাকায় আরএসএস তেমন পাত্তা পায়নি৷ যে সাভারকরকে আজকেবীর হিসাবে তুলে ধরা হচ্ছে, স্বাধীনতা আন্দোলনের দিনে জনমনে তিনি কোনও জায়গাই করতে পারেননি৷ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সাথে যোগসাজশ করে দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকে কেবল তুচ্ছ–তাচ্ছিল্য করাই নয়, সাম্রাজ্যবাদের পক্ষ নিয়ে স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরুদ্ধে কাজ করেছেন তিনি৷ এমনকি ব্রিটিশ শাসন কায়েম রাখতে চেয়েছেন তিনি৷ স্বাধীনতার পর সেই আরএসএস, হিন্দু মহাসভা, জনসংঘ এবং বিজেপিকে প্রশ্রয় দিয়েছে কংগ্রেস৷ ক্ষমতাসীন কংগ্রেস সরকারের দিক থেকে কোনও বাধার সম্মুখীন না হয়ে এরা দিনের পর দিন মুসলিমদের বিরুদ্ধে জেহাদ করেছে, তীব্র মুসলিম বিদ্বেষ প্রচার করেছে, বিভিন্ন জায়গায় মুসলিম জনসাধারণের ওপর আক্রমণ করেছে, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগিয়েছে, নিরপরাধ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করেছে৷ কিন্তু কাউকে কংগ্রেস সরকার শাস্তি দিয়েছে এরকম তো দেখা যায়নি৷ মেহনতি জনগণের ঐক্যবদ্ধ শক্তিশালী বামগণতান্ত্রিক আন্দোলনের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে কংগ্রেস সরকার এবং শাসক পুঁজিপতি শ্রেণির পৃষ্ঠপোষকতায় আরএসএস–বিজেপি আজকের এই অবস্থায় এসেছে৷ কংগ্রেস, বিজেপি দুটোই পুঁজিপতি শ্রেণির দল৷ পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থরক্ষায় এদের মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই৷

কয়েকদিন আগে কর্ণাটকের রাজনৈতিক ঘটনাও নিশ্চয় আপনাদের চোখে পড়েছে৷ কংগ্রেস এমএলএ–রা ব্যাপক সংখ্যায় বিজেপিতে যোগ দিয়ে কংগ্রেস ও জনতা (এস) সরকারের পতন ঘটিয়েছে এবং বিজেপিকে ক্ষমতায় বসিয়েছে৷ এই কংগ্রেস থেকে বিজেপি এবং বিজেপি থেকে কংগ্রেসে যাওয়া আদৌ নতুন কোনও ঘটনা নয়৷ এটা হরবখতই হচ্ছে৷ এই যদি বাস্তব অবস্থা হয় তা হলে আরএসএস–বিজেপির বিরুদ্ধে কংগ্রেসের আদর্শগত সংগ্রাম কোথায়? আজকে সমগ্র দেশে সাম্প্রদায়িকতার যে বিষবাষ্প আরএসএস–বিজেপি সৃষ্টি করেছে তার বিরুদ্ধে কংগ্রেসের তীব্র বিরোধিতা এবং সংগ্রাম কোথায়? হিন্দু ধর্ম, হিন্দুত্বের কথা বলে আরএসএস–বিজেপি কী ধরনের জঘন্য সাম্প্রদায়িকতা ছডিয়ে দিচ্ছে, আপনারা দেখতে পাচ্ছেন৷ হিন্দু ধর্মের ব্যাখ্যা দিয়েছেন রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, শংকরাচার্য, চৈতন্য, শংকরদেব এবং প্রাচীন দিনের আরওনেক বিখ্যাত ধর্মপ্রচারক৷ তাঁদের শিক্ষায় তো মুসলিম বিদ্বেষ বা অন্য ধর্মকে হেয় জ্ঞান করার কথা কোথাও নেই৷ এঁরা তো সব ধর্ম সমান, যত মত তত পথের কথার উপরই জোর দিয়েছেন৷ এই দিকগুলি নিয়ে আমাদের পার্টির পক্ষ থেকে দীর্ঘ আলোচনা এবং আদর্শগত সংগ্রাম পরিচালিত হচ্ছে৷ এসবের মধ্য দিয়ে এই সত্যই তুলে ধরার চেষ্টা হচ্ছে যে আরএসএস–বিজেপির কথা এবং কাজের মধ্যে চূড়ান্ত মুসলিম বিদ্বেষ কাজ করছে– ফ্যাসিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হচ্ছে৷ হিন্দু ধর্মের মহত্ত্বের কোনও দিকই ফুটে উঠছে না৷ ভারতে বসবাসকারী ১৫/১৬ কোটি মুসলিম জনগণ কী খাবেন কী পরবেন থেকে শুরু করে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে যদি স্টিম রোলার চালানো হয়, যদি তাদের প্রকাশ্যে হিন্দু হয়ে যাওয়ার বিধান দেওয়া হয় তা হলে কেবল যে তাদের মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয় তাই নয়, এই পথে তো তাদের দাস বানানোই হয়৷ এটা তো ফ্যাসিবাদ, এটা তো হিটলারের নাৎসিবাদ এই কাজটা যদি বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর করা হয় তা হলে আরএসএস–বিজেপি নেতারা কী বলবেন? আমরা মনে করি এইসব দিকগুলি নিয়ে, এই সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিয়ে দেশের সর্বস্তরের জনসাধারণের মধ্যে বিশদ আলাপ আলোচনা, মত বিনিময় খুবই জরুরি৷ দেশের জনসাধারণের প্রতি আমাদের আবেদন, আপনারা রুখে দাঁড়ান, পরিস্থিতি সামলান, চূড়ান্ত ধ্বংস থেকে দেশকে বাঁচান৷ একই সাথে এই কথাটাও আপনাদের বুঝতে অনুরোধ করব, পুঁজিপতি শ্রেণিই আজ ধর্মকে তাদের স্বার্থে ব্যবহার করছে৷ আজ ধর্ম তাদের একটা বড় আশ্রয়স্থল৷ মুখ্যত তাদের স্বার্থেই সারা দেশে এই নারকীয় পরিবেশের সৃষ্টি করেছে আরএসএস–বিজেপি৷ তীব্র মুসলিম বিদ্বেষ, মুসলিম মানুষ দেখলেই ঘৃণা– এমনই একটি অবস্থা সারা দেশে জন্ম দেওয়ার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চলছে৷ এই বিদ্বেষে দেশের আকাশ বাতাস বিষিয়ে উঠছে৷ মুসলিম বিদ্বেষকে আরও গভীরে নিয়ে যাওয়ার জন্য দেশের ইতিহাসও বিকৃত করা হচ্ছে৷ রাজতন্ত্র, সামন্ততন্ত্রের দিনে বাইরে থেকে যে মুসলিম রাজারা ভারতবর্ষ আক্রমণ করতে এসেছিল, সেটা ছিল সেই সময়কার সামন্ততন্ত্র–রাজত বৈশিষ্ট্য৷ এই ঘটনাগুলিকে এইভাবে ব্যাখ্যা না করে এরা এই ঘটনাগুলোকে মুসলিম বিদ্বেষ গড়ে তুলতে কাজে লাগাচ্ছে৷ গ্রামে গ্রামে দিন–রাত এরা অবিরাম মুসলিম বিদ্বেষ প্রচার করছে৷ উপযুক্ত সত্য প্রচারের অভাবে সাধারণ মানুষের মধ্যে আরএসএস–বিজেপির চিন্তা ভাবনার প্রভাব পড়ছে৷ ফলে আরএসএস–বিজেপি শুধুমাত্র একটা রাজনৈতিক শক্তিই নয়, এটা হচ্ছে একই সঙ্গে অতি প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদী একটা ভাবধারা৷

প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িকতা রোখার একমাত্র হাতিয়ার মার্কসবাদ

তা হলে এই প্রতিক্রিয়াশীল ভাবধারাকে মোকাবিলা করার পথ কী? কেবলমাত্র ভোটের মাধ্যমে একটা প্রতিক্রিয়াশীল ভাবধারাকে মোকাবিলা করা যায় না৷ ভোটে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গায় বিজেপির বিরুদ্ধে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল জোটবদ্ধ হয়েছে, তার ফলে নির্বাচনে বিজেপি কখনও কখনও হেরেছে৷ কিন্তু তার দ্বারা আরএসএস–বিজেপির সাম্প্রদায়িকতা কতটা কমেছে, কতটা দূর করা সম্ভব হয়েছে? কোনও প্রতিকূলতার সম্মুখীন না হয়ে এরা তো দিন দিন আরও মারাত্মক রূপ ধারণ করছে৷ ফলে কংগ্রেসকে কিংবা এই ধরনের আরও কিছু বুর্জোয়া দলকে ধর্মনিরপেক্ষ আখ্যা দিয়ে ভোটের আগে কোনও প্রকারে জোটবদ্ধ করে একসঙ্গে নির্বাচনে লড়ে আরএসএস–বিজেপির চিন্তা–ভাবনাকে কতটা নির্মূল করা যাবে, এটা দেশের চিন্তাশীল মানুষকে গভীর ভাবে ভেবে দেখতে হবে৷ এই তত্ত্ব যে সম্পূর্ণ ভ্রান্ত আমরা বারে বারে তা নির্ভুল ভাবে দেখিয়ে আসছি৷ এই ভ্রান্ত পথে গিয়ে সিপিএমের নেতারা কেবল নিজের দলের সর্বনাশ করেননি, তাঁরা বামপন্থারও সর্বনাশ ডেকে এনেছেন৷ আমরা বার বার বলছি আরএসএস–বিজেপির এই প্রতিক্রিয়াশীল ভাবধারাকে রুখতে হলে, জনসাধারণের মধ্যে আরও একটি উন্নত ভাবধারা, উন্নত একটি আদর্শের জন্ম দিয়েই তা সম্ভব৷ অন্য কোনও সহজ, সরল, শর্টকাটের মধ্য দিয়ে তা সম্ভব নয়৷

আজকের দিনে সেই ভাবধারা হচ্ছে মার্কসবাদী ভাবধারা, মার্কসবাদ৷ এই ভাবধারার ভিত্তিতে জাতি ধর্ম ভাষা বর্ণ নির্বিশেষে সকল শোষিত জনসাধারণকে ঐক্যবদ্ধ করে– ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’– ১৮৪৮ সালে কার্ল মার্কসের সেই আহ্বানের ভিত্তিতে তাদের সামনে শোষণমুক্তির চূড়ান্ত লক্ষ্যকে তুলে ধরতে হবে৷ তাদের ন্যায়সঙ্গত প্রাপ্যগুলি পূরণের দাবিতে, উন্নত নীতি নৈতিকতা ও সংস্কৃতির আধারে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে শক্তিশালী গণআন্দোলন পরিচালনা করতে হবে৷ মহান শিক্ষক সর্বহারার মহান নেতা কমরেড শিবদাস ঘোষ বার বার আমাদের স্মরণ করিয়েছেন, সকল শোষিত জনসাধারণের বাঁচার এই আন্দোলনগুলো গড়ে তুলতে এবং পরিচালনা করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত শ্রেণিচেতনার চর্চা করতে হবে এবং এর মধ্য দিয়ে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় বুর্জোয়া দলগুলির চিন্তাভাবনার প্রভাব থেকে শোষিত জনসাধারণকে মুক্ত করতে হবে৷ তিনি বলেছেন, এর দ্বিতীয় কোনও পথ নেই৷ এই কারণেই তিনি বলেছেন, বিপ্লবী আন্দোলনের দিক থেকে বিচার করলে বর্তমান সময়টা হচ্ছে ফেজ অফ ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট অর্থাৎ গণআন্দোলনের পর্যায়৷ এই পর্যায়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বিপ্লবী দলের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করাই বিপ্লবী কর্তব্য৷

আপনারা নিশ্চয়ই লক্ষ করেছেন, শুধু হিন্দুত্বের নামে সাম্প্রদায়িকতা নয়, একই সাথে ক্ষমতায় বসে বিজেপি মেহনতি জনসাধারণকে প্রভাবিত করার জন্য এটা সেটা পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতিও করছে৷ এই কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলন সেই ব্যাপকতা নিয়ে না থাকার ফলে জনমনে এদের সম্পর্কে বেশ কিছুটা মোহও সৃষ্টি হয়েছে৷ এই অবস্থায় আরএসএস–বিজেপিকে শুধু ভোটের মাধ্যমে হারানোও সহজ কাজ হবে না৷ বিশেষ করে এই কারণে যে তার পিছনে বুর্জোয়া শ্রেণির সর্বাত্মক সমর্থন কাজ করছে এবং তাদের হাতেই রয়েছে টাকা পয়সা, আইন কানুন এক কথায় গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং সর্বোপরি একটি অতি শক্তিশালী প্রচার যন্ত্র৷ এইসব কারণেই আমরা বলছি, আজকের এই অবস্থায় সঠিক রণনীতি হচ্ছে, জনজীবনের জ্বলন্ত সমস্যাগুলি প্রতিকারের দাবিতে শোষিত জনগণের ঐক্যবদ্ধ লাগাতার আন্দোলন গড়ে তোলা এবং একই সাথে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে আরএসএস–বিজেপির পুঁজিবাদী চরিত্র এবং তাদের সর্বনাশা সাম্প্রদায়িক চরিত্র ও কার্যকলাপ সম্পর্কে বিরামহীন ভাবে জনগণকে সচেতন করা৷ তাদের শ্রেণিসচেতন করা৷ সংগ্রামের অতি গুরুত্বপূর্ণ এই দুই অভিমুখকে সামনে রেখেই এই ঐতিহাসিক সংগ্রামকে পরিচালনা করতে হবে৷ আপনারা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছেন জনগণের অন্যান্য জরুরি দাবি আদায়ের ক্ষেত্রেও যেমন, এই অতি সংকটজনক পরিস্থিতিতেও আমরা ছাড়া সকল রাজনৈতিক দলগুলি শুধু ভোটের মাধ্যমে আরএসএস–বিজেপিকে পরাস্ত করার কথা বলে আসল লড়াই থেকে পালাচ্ছে৷

অন্যান্য ক্ষেত্রেও যেমন এটা স্পষ্ট হয়ে উঠছে তেমনি আরএসএস–বিজেপিকে রোখার প্রশ্নেও স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, এইসব পুঁজিবাদী দলগুলির মধ্যে আপাত পার্থক্য যাই থাকুক না কেন আসলে তারা সকলে মিলে একটি পক্ষ হিসাবে কাজ করছে এবং তার বিপরীতে আমরা একক ভাবে একটা পক্ষ হিসাবে কাজ করছি৷ সম্পূর্ণ সচেতন বিপ্লবী দল হিসাবে, ভারতের বিপ্লবী আন্দোলনের নেতৃত্বকারী দল হিসাবে পুঁজিপতি শ্রেণির সর্বাত্মক পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত এই অতি উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তিকে প্রতিহত করার আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার ঐতিহাসিক দায়িত্ব আমাদের উপরেই বর্তেছে৷ এবং প্রতিদিনের ক্লাস ও মাস স্ট্রাগল (শ্রেণিসংগ্রাম ও গণসংগ্রাম) গড়ে তোলার ও পরিচালনা করার যে দায়িত্ব আমাদের পালন করতে হয় তারই অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে এই আন্দোলনকে গণ্য করতে হবে৷ এই সঠিক লাইনে এই ঐতিহাসিক সংগ্রাম এখনই দেশের সর্বত্র আমাদের জোরদার করতে হবে৷ ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা যাই থাকুক, জনগণকে পাশে পেলে আন্দোলন এগিয়ে যাবে৷ আপাতদৃষ্টিতে আমাদের সীমাবদ্ধ শক্তি সামর্থ্যের প্রেক্ষিতে আমাদেরই নেতৃত্বে সারা দেশে একটি শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তোলার সম্ভাবনা কতটা বাস্তব, এ নিয়ে জনগণের মনে, এমনকি আমাদের কর্মী–সমর্থকদের মনেও প্রশ্ণ জাগতে পারে৷ আমার বক্তব্য, অন্য যে কোনও ঐতিহাসিক প্রয়োজন পূরণের প্রশ্নেও তো সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে দায়িত্ব গ্রহণ, কারণ এটাই প্রথম পদক্ষেপ৷ এর তো কোনও বিকল্প নেই৷ আপাতদৃষ্টিতে যতই অসম্ভব মনে হোক, দেশে দেশে মার্কসবাদের ভিত্তিতে বিপ্লব সংগঠিত করা এবং এরই অপরিহার্য প্রয়োজনে বিপ্লবী দল গড়ে তোলার কাজ শুরু করার ক্ষেত্রে তো একই দৃষ্টিভঙ্গি শক্তি কোথায়– এই বলে কাজ শুরু করার ক্ষেত্রে কালবিলম্ব করা চলে না৷ সঠিক লাইনে চলার পথেই তো শক্তি সঞ্চিত হয়৷ পৃথিবীতে বিপ্লবী আন্দোলন গড়ে তোলার ইতিহাসও বলছে সঠিক লাইনের ভিত্তিতে যে দেশেই এই কাজ শুরু হয়েছে সেখানেই বিপ্লবী দল গড়ে তোলার কাজ দ্রুত এগিয়ে গিয়েছে৷

আজ তাঁকে স্মরণ করার এই ঐতিহাসিক দিনে আবার আমি স্মরণ করাব– আমাদের দল গড়ে ওঠার ইতিহাসও একই কথা প্রমাণ করে৷ হাতে গোনা যে কয়েকজন কর্মী নিয়ে সর্বহারার মহান নেতা কমরেড শিবদাস ঘোষ দল গড়ার কাজ শুরু করেছিলেন, সঠিক বিপ্লবী দল গড়ে তোলার যে অপরিহার্য পদ্ধতি তিনি উদ্ভাবন করেছিলেন, যে অভ্রান্ত স্ট্র্যাটেজিকাল লাইন  তিনি তুলে ধরেছিলেন তা সম্পূর্ণরূপে মেনে নিয়েও সংগ্রাম শুরু করার মুহূর্তে দু–একজন অতি নিষ্ঠাবান সদস্য– শক্তির সীমাবদ্ধতার দিকটি দেখিয়ে তাঁকে প্রশ্ণ করেছিলেন, এখনই এই কাজটি হাতে নেওয়া কতটা সমীচীন৷ কমরেড শিবদাস ঘোষ তার উত্তর দিতে গিয়ে বলেছিলেন, প্রথমেই ঠিক হওয়া দরকার শক্তি আমাদের যত কমই হোক, আমরা কি গোলামি করতে পারি, সত্য বুঝেও আমরা কি চোখবুজে থাকতে পারি? আজ এটা ইতিহাস, সত্যকে অবলম্বন করে সঠিক লাইনের ভিত্তিতে সর্বহারার মহান নেতা কমরেড শিবদাস ঘোষের এই সংগ্রাম কত দ্রুত এগিয়ে গিয়েছিল৷ সঠিক তত্ত্ব এবং সঠিক পদ্ধতি নির্ধারণের অপরিহার্যতার কথা কমরেড শিবদাস ঘোষ বারবার স্মরণ করিয়েছেন৷ আপনারা জেনেছেন, প্রতিনিয়ত এই বিপ্লবী তত্ত্বের উন্নততর উপলব্ধি ঘটিয়ে এবং পদ্ধতিকে প্রতিনিয়ত সঠিক ভাবে অনুসরণ করে ১৯৪৮ থেকে ১৯৭৬ এই ২৮ বছরের মধ্যে শূন্য থেকে শুরু করে সিপিআই–সিপিএমের কমিউনিজমের তকমাকে চুরমার করে দলকে তিনি কোন জায়গায় এগিয়ে নিয়ে গেছেন তাঁর মৃত্যুর পর এই ৪৩ বছরে এই দল তাঁর মতো অতি উচ্চ এক মহান নেতার অনুপস্থিতি সত্ত্বেও ভারতের প্রতিটি রাজ্যে একটি বিপ্লবী দল হিসাবে জনগণের কাছ থেকে স্বীকৃতি পাচ্ছে৷ এবং তা সম্ভব হয়েছে প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর চিন্তার সঠিকতা প্রতিপন্ন করেই৷ এই প্রসঙ্গে আরও একজন সর্বহারার মহান নেতা মাও সে–তুঙের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার কথাও স্মরণ করাতে চাই৷ চীনের কমিউনিস্ট পার্টির দশম কংগ্রেসে তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন, যদি একটি বিপ্লবী দলের বেস পলিটিক্যাল লাইন অর্থাৎ মূল তত্ত্বগত বিশ্লেষণ, দলের প্রধান রণকৌশল ঠিক থাকে তা হলে একটি ছোট দলও অনিবার্য ভাবে যথাসময়ে বড় দলে পরিণত হবে৷ অপরদিকে যদি বড় একটি বিপ্লবী দলের বেস পলিটিক্যাল লাইন ভ্রান্ত হয়, তা হলে সেই দল আর বড় থাকবে না, দ্রুত তার পতন ঘটবে, তার হাতে রাষ্ট্রশক্তি থাকলেও তার অধঃপতন অনিবার্য হয়ে উঠবে৷

একই সঙ্গে আমি এই কথাটাও স্মরণ করাব যে, আজ আমরা কিন্তু একেবারে শৈশব অবস্থায় নেই৷ সারা দেশে কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষার ভিত্তিতে উন্নত নীতি–নৈতিকতার আধারে লাগাতার গণআন্দোলন পরিচালনা করে সাংগঠনিক ভাবে বেশ কিছুটা শক্তি আমরা সঞ্চয় করেছি৷ আরএসএস–বিজেপি সহ প্রতিপক্ষ অন্যান্য পুঁজিপতি দলগুলিও আমাদের শক্তিবৃদ্ধি টের পাচ্ছে এবং আমাদের শক্তিবৃদ্ধি আটকে দেওয়ার জন্য তারা সর্বত্র ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে৷ ভবিষ্যতে এরা আমাদের বিরুদ্ধে আরও জোরালো আক্রমণ হানবে, এ নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই৷ এদের আক্রমণ প্রতিহত করার একটিই পথ, লাগাতার গণআন্দোলন পরিচালনা করে জনগণের মনে আমাদের স্থান ক্রমাগত সুদৃঢ় করা৷ আরএসএস–বিজেপির এই অতি উগ্র সাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়াশীল ফ্যাসিবাদী উত্থানকে আমাদের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ শক্তিশালী সংগ্রাম গড়ে তুলে প্রতিহত করার অপরিহার্যতাকে উপরোক্ত মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করেই উপলব্ধি করতে হবে৷ যত দ্রুত সম্ভব ভারতের পুঁজিপতি শ্রেণিকে উচ্ছেদ করে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করার ঐতিহাসিক কর্তব্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবেই এই ঐতিহাসিক দায়িত্ব আমাদের গ্রহণ করতে হবে৷ সর্বহারার মহান নেতা এ যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মার্কসবাদী চিন্তানায়ক কমরেড শিবদাস ঘোষের ৪৩তম স্মরণ বার্ষিকীতে এটাই হোক আমাদের বিশেষ সংকল্প৷ দেশের আপামর জনসাধারণের প্রতি আমাদের আবেদন, আরএসএস–বিজেপির উত্থানকে প্রতিহত করার এই ঐতিহাসিক সময়ে আপনারাও আত্মত্যাগের সংকল্প নিয়ে এগিয়ে আসুন৷ স্মরণ দিবসের এই সভায় উপস্থিত থাকার জন্য সকলকে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়ে আমার বক্তব্য এখানেই শেষ করছি৷

(গণদাবী : ৭২ বর্ষ ৭ সংখ্যা)