Home / খবর / ‘প্রকৃতির দ্বান্দ্বিকতা’র মুখবন্ধ — ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস

‘প্রকৃতির দ্বান্দ্বিকতা’র মুখবন্ধ — ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস

 

১৮৮৩ সালে বিশ্ব সাম্যবাদী আন্দোলনের মহান শিক্ষক ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস রচনা করেন ‘প্রকৃতির দ্বান্দ্বিকতা’৷ এতে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের আলোকে প্রকৃতিবিজ্ঞানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্বগত সমস্যাগুলির সর্বাঙ্গীণ ব্যাখ্যা দেন তিনি৷ রচনার মুখবন্ধে সমগ্র বিষয়টি চুম্বকে তুলে ধরেছিলেন এঙ্গেলস৷ তাঁর জন্মের দ্বিশতবর্ষ উপলক্ষে মুখবন্ধটি প্রকাশ করা হল৷ এবার প্রথম কিস্তি৷

(১)

একমাত্র আধুনিক প্রকৃতিবিজ্ঞানই সুসংবদ্ধ প্রণালী এবং বিজ্ঞানসম্মত সার্বিক বিকাশের ধারা অর্জন করেছে৷ যে ধারার অবস্থান প্রাচীন প্রাকৃতিক দর্শনের অসাধারণ সব উপলব্ধি এবং আরবদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু পরস্পর বিচ্ছিন্ন নানা আবিষ্কারের সম্পূর্ণ বিপরীতে৷ আরবদের বহু আবিষ্কারই বিফল হয়ে হারিয়ে গিয়েছে৷ আরও কিছু সাম্প্রতিক ঐতিহাসিক ঘটনাবলির মতোই আধুনিক প্রকৃতিবিজ্ঞান গড়ে উঠেছে এক মহাশক্তিশালী যুগে৷ যে যুগে আমরা জার্মানরা জাতীয় বিপর্যয় কাটিয়ে উঠে তার নাম দিয়েছি রিফর্মেশন৷ ফরাসিরা বলে রেনেসাঁস, ইতালিয়ানরা বলে সিনকোয়েসেন্টো৷ যদিও এর কোনও একটি নামেই এর পূর্ণ তাৎপর্য প্রকাশিত হয় না৷

পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষার্ধ হল সেই যুগ, যে যুগে শহুরে বুর্জোয়াদের সমর্থনে পুষ্ট রাজতন্ত্র সামন্তী অভিজাততন্ত্রের নিগড় ভেঙে মূলত জাতীয় চেতনার বনিয়াদের ওপর নতুন ধরনের বড় বড় রাজতান্ত্রিক শাসন কাঠামো তৈরি করে৷ যার গর্ভ থেকে বেরিয়ে এসেছে আধুনিক ইডরোপীয় জাতিগুলি ও আধুনিক বুর্জোয়া সমাজ৷ শহুরে বুর্জোয়ারা এবং অভিজাত বর্গ যখন পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়ছে তখনই জার্মানির কৃষক বিদ্রোহ যেন অভ্রান্ত ভবিষ্যদ্বাণীর মতো দেখিয়ে দিয়েছিল শ্রেণিসংগ্রামের ভবিষ্যৎ৷ এই সংগ্রামে কেবল চাষিরাই নামেনি, তাদের বিদ্রোহ তখন নতুন কিছু নয়৷ কিন্তু তাদের পিছনে পিছনে এসেছে সদ্যোজাত শ্রমিক শ্রেণি, তাদের হাতে রক্তপতাকা, কণ্ঠে সম্পত্তির ওপর যৌথমালিকানার দাবি৷ বাইজানটাইন সাম্রাজ্যের পতনের যেসব পাণ্ডুলিপি রক্ষা পেয়েছে এবং খননকার্যের ফলে রোম সাম্রাজ্যের পুরনো যেসব ভাস্ক্র্য উদ্ধার হয়েছে তাতে বিস্ময়বিহ্বল পশ্চিমী দুনিয়ার সামনে উদ্ভাসিত হয়েছে এক নতুন জগৎ– প্রাচীন গ্রিসের জগৎ৷ তার আলোকচ্ছটায় অন্তর্হিত হয়েছে মধ্যযুগের ভূতপ্রেত৷ ইতালিতে শিল্পের ক্ষেত্রে যে বিকাশ ঘটেছে তা ছিল স্বপ্ণেরও অতীত৷ আপাতভাবে তা যেন প্রাচীন ধ্রুপদী শিল্পের প্রতিফলন, কিন্তু প্রাচীন শিল্প কোনদিনই এই ডচ্চতায় পৌঁছায়নি৷ ইতালি, ফ্রান্স ও জার্মানিতে বিকশিত হল এক নতুন জাতের সাহিত্য, অর্থাৎ প্রথম আধুনিক সাহিত্য৷ এর কিছুদিনের মধ্যেই ইংরেজি ও স্প্যানিশ সাহিত্যে এসেছে ক্ল্যাসিকাল যুগ৷ বিশ্বধারণার পুরনো গণ্ডি ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে৷ এই প্রথম যথার্থ অর্থে বিশ্বকে আবিষ্কার করা গেল৷ স্থাপিত হল বিশ্ববাণিজ্য আর কুটির শিল্প থেকে ম্যানুফ্যাকচারে উত্তরণের ভিত্তি৷ এই উত্তরণ পথ করে দিল আধুনিক বৃহৎ শিল্পের সূচনার৷ মানুষের মননজগতের ওপর গির্জার একাধিপত্য খান খান হয়ে গিয়েছে৷ বেশিরভাগ জার্মান (জার্মান ভাষাগোষ্ঠীর কোনও না কোনও ভাষায় যারা কথা বলে) জনগণ সরাসরি পুরনো খোলস ছেড়ে বেরিয়ে প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্ম গ্রহণ করেছে, আর ল্যাটিন জনগণ (ল্যাটিন ভাষাগোষ্ঠীর কোনও না কোনও ভাষায় যারা কথা বলে) সানন্দে আরবদের কাছ থেকে পাওয়া মুক্তচিন্তার প্রেরণাকে গ্রহণ করেছে৷ তা পুষ্ট হয়েছে নব আবিষ্কৃত গ্রিক দর্শনের দ্বারা৷ যা ক্রমাগত তার শিকড় বিস্তার করে অষ্টাদশ শতকের বস্তুবাদী চিন্তাধারার বিকাশের পথ করে দিয়েছে৷

অগ্রগতির পথে মানবজাতি এতকাল যত বিপ্লব দেখেছে, এ হল তার মধ্যে সবচেয়ে প্রগতিশীল বিপ্লব৷ এই যুগের দাবি হল মহান ব্যক্তিত্বময় মানব, আর এই যুগই গড়েছে সেই মহামানবদের৷ চিন্তায়, আবেগে ও চরিত্রে, সামগ্রিকতায় ও জ্ঞানে এঁরা মহামানব৷ যে মহামানবেরা আধুনিক বুর্জোয়া শাসনের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, তাঁদের আর যাই থাকুক, বুর্জোয়াসুলভ সীমাবদ্ধতাগুলি ছিল না৷ বরং যুগের প্রয়োজন তাঁদের ডদ্বুদ্ধ করেছিল অজানা পথের অসমসাহসী অভিযাত্রীর চারিত্রিক গুণাবলি অর্জন করতে৷ সে যুগের প্রধান জীবন্ত চরিত্রদের মধ্যে এমন কেউ ছিলেন না যাঁর ব্যাপক দেশভ্রমণের অভিজ্ঞতা নেই, চার পাঁচটা ভাষার ওপর যাঁর দখল নেই বা জীবনের একাধিক ক্ষেত্রে যিনি কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেননি৷ লিওনার্দো দা ভিঞ্চি কেবল একজন মহান চিত্রশিল্পীই ছিলেন না, একাধারে তিনি ছিলেন বিরাট গণিতবিদ, যন্ত্রবিদ ও ইঞ্জিনিয়ারও৷ পদার্থবিদ্যা ও শারীরবিজ্ঞানের বহু বিচিত্র শাখা তাঁর কাছে ঋণী৷ আলব্রেখট দ্যুরার ছিলেন চিত্রশিল্পী, খোদাইশিল্পী, স্থপতি ও ভাস্ক্র৷ এছাড়াও দুর্গ–নির্মাণের বিশেষ পদ্ধতি উদ্ভাবনে তিনি নানা পরিকল্পনাকে কাজে লাগান৷ পরবর্তীকালে তার অনেকটাই গ্রহণ করেন মঁতালাঁবের,  আধুনিক জার্মান দুর্গ–নির্মাণ বিজ্ঞানেও তাঁর অবদান আছে৷ মাকিয়াভেলি ছিলেন একাধারে রাজনীতিবিশারদ, ইতিহাসবিদ ও কবি৷ তাছাড়া তিনিই আধুনিককালের প্রথম সমরবিদ্যার গ্রন্থকার৷ লুথার শুধু গির্জার বহু দিনের জমে থাকা জঞ্জালই সাফ করেননি জার্মান ভাষাকেও মার্জিত করেছিলেন৷ আধুনিক জার্মান গদ্য তাঁর হাতেই তৈরি৷ তাঁর রচিত জনগণের বিজয় সঙ্গীত ও তার সুর হয়ে উঠেছিল ষোড়শ শতকের বিপ্লবের মন্ত্র (মারসেইলেজ)৷

শ্রমবিভাজনের দাসত্ব যে একপেশে গণ্ডিবদ্ধতার জন্ম দেয়, সে যুগের বীররা ছিলেন তার থেকে মুক্ত৷ তাঁদের উত্তরসূরিদের মধ্যে অবশ্য প্রায়শই এ জিনিসটা দেখা যায়৷ কিন্তু তাঁদের নজরকাড়া বৈশিষ্ট্যটি হল, তাঁরা সকলেই সমকালীন সামাজিক আন্দোলনের প্রবাহে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন, বাস্তব সংগ্রামে তাঁরা হাতেকলমে অংশ গ্রহণ করেছেন কেডবা লেখালিখি, আলাপ আলোচনার পথে কেডবা সরাসরি অস্ত্র হাতে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন৷ অনেকে দুভাবেই অংশ নিয়েছেন৷ ফলে তাঁরা যে পরিপূর্ণতা ও শক্তি অর্জন করেছেন তা তাঁদের পূর্ণ মানবে পরিণত করেছে৷ শুধু পুঁথিপড়া পণ্ডিত ছিলেন নেহাতই ব্যতিক্রম, তাঁদের অবস্থান ছিল দ্বিতীয় বা তৃতীয় সারিতে বা সাবধানী উন্নাসিকের দলে, যাঁরা সংগ্রামের আঁচ থেকে সরে থাকতে চেয়েছেন৷

সেই সময়ে সর্বাত্মক বিপ্লবের প্রবাহের মধ্যেই প্রকৃতি বিজ্ঞানেরও বিকাশ ঘটছিল, এবং প্রকৃতি বিজ্ঞানের চরিত্রও ছিল পুরোপুরি বৈপ্লবিক৷ কারণ সংগ্রাম করেই তার টিকে থাকার অধিকার অর্জন করতে হচ্ছিল৷ যে মহান ইতালিয়দের হাতে আধুনিক দর্শনের জন্ম, তারাই জোগান দিয়েছে শহিদদের, যাঁরা বিজ্ঞানের জন্য প্রাণ দিয়েছেন বা গির্জার ইনকুইজিশনের কারাগার বরণ করেছেন৷ এও লক্ষণীয় যে, স্বাধীনভাবে প্রকৃতিবিজ্ঞান চর্চার অপরাধে বিজ্ঞানীদের শাস্তি দেওয়ার ব্যাপারে প্রোটেস্ট্যান্টরা ক্যাথলিকদের ছাড়িয়ে গিয়েছিল৷ সার্ভেটাস যখন রক্তসঞ্চালনতন্ত্র প্রায় আবিষ্কার করার মুখে তখনই কেলভিন তাঁকে পুড়িয়ে মারার ফতোয়া দেন এবং বাস্তবে তাঁকে দু’ঘণ্টা ধরে জীবন্ত দগ্ধে মারা হয়েছিল৷ আর ইনকুইজিশন জিওর্দানো ব্রুনোকে সরাসরি জীবন্ত পুড়িয়ে মেরেছিল৷

লুথার যেভাবে পোপের ফতোয়াকে (বুল) পুঁড়িয়েছিলেন তার পুনরাবৃত্তি ঘটালেন কোপার্নিকাস তাঁর কালজয়ী গবেষণাগ্রন্থটি প্রকাশের মধ্য দিয়ে৷ এই বিপ্লবাত্মক পথেই প্রকৃতিবিজ্ঞান তার স্বাধীনতার ধ্বজা উড়িয়েছিল৷ কিছুটা ভীরুপদে, বলতে গেলে মৃত্যুশয্যায় আশ্রয় নেওয়ার পর কোপার্নিকাস তাঁর গ্রন্থের মাধ্যমে প্রকৃতিবিজ্ঞানের ওপর গির্জার কর্তৃত্বকে আক্রমণ করলেন৷ সেই দিনটিই হল ধর্মতন্ত্রের হাত থেকে প্রকৃতিবিজ্ঞানের মুক্তির দিন৷ যদিও এক্ষেত্রে দাবি ও পাল্টা দাবির লড়াই আজও চলছে এবং অনেকের মনে এ নিয়ে ধোঁয়াশা কাটতে এখনও দেরি আছে৷ তারপর থেকে বিজ্ঞানের বিকাশ বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে চলেছে৷ বলা যায় যত দিন যাচ্ছে ততই তার শুরুর সময়কার তুলনায় শক্তি বাড়ছে বর্গফলের নিয়মে৷ দুনিয়াকে যেন এটাই দেখাতে চাওয়া হচ্ছে যে, জৈববস্তুর সর্বোচ্চ বিকশিত বস্তু মানবমস্তিষ্কের ক্ষেত্রে পরস্পর বিপরীত গতির যে নিয়ম প্রযোজ্য, তা একইভাবে প্রযোজ্য অজৈব বস্তুর ক্ষেত্রেও৷

ইতিমধ্যেই হাতে মজুত তথ্যগুলিকে সুসংবদ্ধ করা ও আয়ত্ত করা প্রকৃতিবিজ্ঞানের প্রথম পর্যায়ের প্রধান কাজ হয়ে দেখা দেয়৷ অধিকাংশ ক্ষেত্রে শুরু করতে হয়েছে একেবারে গোড়া থেকে৷ প্রাচীনযুগ থেকে উত্তরাধিকার হিসাবে পাওয়া গিয়েছিল ইডক্লিড ও টলেমির সৌরজগৎ৷ আরবরা দিয়েছিল দশমিক গণনাপদ্ধতি, বীজগণিতের সূচনা, সংখ্যালিখনের আধুনিক পদ্ধতি ও অ্যালকেমির বিকশিত রূপ৷ এক্ষেত্রে খ্রিস্টিয় মধ্যযুগের অবদান শূন্য৷ এই পরিস্থিতিতে, পৃথিবী ও অন্যান্য জ্যোতিষ্কের গতির পিছনের নিয়মাবলি অর্থাৎ প্রকৃতিবিজ্ঞানের প্রাথমিক এই  বিষয়টাই সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ স্থান গ্রহণ করে৷ এর সাথে, এর প্রয়োজনকে ভিত্তি করে, এর সহায়ক হিসাবে গাণিতিক পদ্ধতি আবিষ্কার করা ও তাকে আরও নিখুঁত করা হয়৷ জ্ঞান জগতে এ এক বিরাট অর্জন৷ নিডটন ও লিনিয়াসের হাতে বিজ্ঞানের এই শাখাগুলি আরও নিখুঁত হওয়ার মধ্য দিয়ে এই পর্যায়ের সমাপ্তি সূচিত হয়৷ অত্যন্ত জরুরি গাণিতিক পদ্ধতির বুনিয়াদি বৈশিষ্ট্যগুলি গড়ে ওঠে এই পর্যায়ে৷ দেকার্তের হাতে তৈরি হয় অ্যানালিটিক্যাল জিওমেড্রি, নেপিয়ার আনেন লগারিদম, লিবনিৎজ বা নিডটন সৃষ্টি করেন ডিফারেন্সিয়াল ও ইন্টিগ্রাল ক্যালকুলাস৷ কঠিন বস্তুর গতিসংক্রান্ত নিয়মগুলি আগেই পাকাপোক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল৷ অবশেষে সৌরজগতের জ্যোতির্বিজ্ঞানের ওপর হাত পড়ে৷ গ্রহগুলির গতির নিয়ম আবিষ্কার করেন কেপলার৷ সকল বস্তুর গতির সাধারণ নিয়মের ভিত্তিতে তাকে সূত্রবদ্ধ করেন নিডটন৷ কিন্তু প্রকৃতিবিজ্ঞানের অপরাপর শাখাগুলি প্রাথমিক স্তরের পূর্ণতা অর্জন থেকেও বহুদূরে ছিল৷ এই পর্যায়ের শেষদিকে তরল ও গ্যাসীয় পদার্থের গতিবিজ্ঞান নিয়ে কিছুটা চর্চা হয়৷ প্রকৃত অর্থে যাকে পদার্থবিদ্যা বলা যায় তা তখনও তার সূচনা পর্বের থেকে বেশি এগোতে পারেনি৷ ব্যতিক্রম শুধু আলোকবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞানের ব্যবহারিক প্রয়োজনেই তার এই অসাধারণ অগ্রগতি ঘটেছিল৷ বস্তুর দহনের ফ্লজিস্টিক তত্ত্বের মধ্য দিয়ে রসায়ন বিজ্ঞান তখন সবেমাত্র অ্যালকেমির হাত থেকে মুক্ত হয়েছে৷ ভূবিজ্ঞান তখনও তার ভ্রূণাবস্থা কাটিয়ে নিছক খনিজবিদ্যার বেশি এগোয়নি৷ জীবাশ্মচর্চার (প্যালিয়েন্টোলজি) জন্মই হয়নি৷ ডদ্ভিদবিজ্ঞান ও প্রাণীবিজ্ঞানের ক্ষেত্রেই শুধু নয়, শারীরবিদ্যা ও অ্যানাটমি সম্বন্ধেও বিপুল প্রাথমিক তথ্যসংগ্রহ ও তা খুঁটিয়ে বোঝার চেষ্টাই ছিল জীববিজ্ঞানের অবশ্যকরণীয় প্রাথমিক কাজ৷ প্রাণের নানা রূপ, ভৌগোলিক ও জলবায়ু অনুসারে প্রাণীদের বিন্যাস, ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে তাদের জীবনধারণের নানা বৈচিত্র্যের অনুসন্ধান বা সেগুলির তুলনামূলক আলোচনার কোনও কথাই তখনও ওঠেনি৷ লিনিয়াসের হাতে ডদ্ভিদবিজ্ঞান ও প্রাণীবিজ্ঞান মোটামুটি একটা রূপ পেয়েছিল৷

কিন্তু এই পর্যায়ের যেটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য তা হল, একটা অদ্ভুত সার্বিক ধারণাকে কেন্দ্রে রেখেই সব ধরনের সম্প্রসারণ ঘটেছিল৷ সেই সার্বিক ধারণা হল, প্রকৃতির একান্ত অপরিবর্তনীয়তার ধারণা৷ এই ধারণা ধরে নেয়, যা একবার কোনও ভাবে প্রকৃতিতে এসেছে তা পরিবর্তনহীন ভাবে চিরকাল ধরেই আছে ও থাকবে৷ গ্রহ ও ডপগ্রহগুলি একবার রহস্যময় ‘ফার্স্ট ইম্পালস’ দ্বারা (বাইরে থেকে প্রদত্ত প্রাথমিক বল) গতি পেয়ে গেলে চিরদিন, যতদিন প্রলয় না হয় ততদিন, নির্দিষ্ট উপবৃত্তাকার কক্ষপথে ঘুরতেই থাকবে৷ নক্ষত্রগুলি বিশ্বব্যাপী মহাকর্ষের টানাটানিতে একে অপরকে যেখানে ধরে রেখেছে সেই নিজ নিজ অবস্থানে চিরকাল স্থির ও নিশ্চল হয়েই থাকবে৷ কোনও রকম পরিবর্তন ছাড়া পৃথিবী চিরকাল, বলতে পারেন, সৃষ্টির প্রথম দিন থেকে, একই রকম আছে৷ বর্তমানে যে পাঁচটি মহাদেশ আমরা দেখি, তাও চিরকালই আছে৷ মানুষের হাতে যেটুকু রদবদল ঘটেছে, তা বাদ দিলে পাহাড়–পর্বত, নদী–ডপত্যকা, জলবায়ু, গাছপালা, পশুপক্ষী সবই বরাবর একরকমই চলে আসছে৷ প্রাণী ও উদ্ভিদের প্রজাতি, সৃষ্টির পর থেকে চিরকালই আছে একভাবে৷ পূর্বসূরিরা সর্বদা হুবহু একই রকম ডত্তরসূরি রেখেছে৷ কোথাও কোথাও একাধিক প্রজাতির সংমিশ্রণে সঙ্কর ঘটায় যে নতুন প্রজাতির ডদ্ভব ঘটা সম্ভব – এটা মেনে নেওয়াই লিনিয়াসের পক্ষে ছিল বড় ব্যাপার৷ সময়ের সাথে সাথে মানুষের ইতিহাসের যে অগ্রগতি ঘটে তার বিপরীতে প্রকৃতির ক্ষেত্রে ইতিহাসে অগ্রগতি নয়, কেবল অনুভূমিক বিস্তারকেই স্বীকার করা হয়েছিল৷ প্রকৃতিতে পরিবর্তনের পথে যে উল্লম্ব অগ্রগতি  ঘটে, তা ডড়িয়ে দেওয়া হয়৷ যাত্রার শুরুতে যে প্রকৃতিবিজ্ঞান ছিল বৈপ্লবিক, সহসা প্রকৃতি সম্পর্কে তা রক্ষণশীল ধারণার মুখোমুখি হয়৷ যে ধারণার মূল কথা হল, যা যেরকম ছিল আজও তাই আছে, বিশ্বের অবসান পর্যন্ত চিরকাল সব একই রকম থাকবে৷     (চলবে)

(গণদাবী : ৭২ বর্ষ ২১ সংখ্যা)