Breaking News
Home / খবর / পঞ্চায়েতকে মতলববাজদের আখড়ায় পরিণত হতে দেবেন না

পঞ্চায়েতকে মতলববাজদের আখড়ায় পরিণত হতে দেবেন না

70 Year 33 Issue 6 April, 2018

পঞ্চায়েত নির্বাচন কবে হবে এ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী থেকে রাজ্য নির্বাচন কমিশন প্রচুর ধোঁয়াশা ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার পর হঠাৎ ৩১ মার্চ ঘোষণা করা হল– রাত পোহালেই মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে ভোটে নামতে হবে৷

 নির্বাচন হবে পঞ্চায়েতের ত্রিস্তরে৷ মুখ্যমন্ত্রী থেকে ছোটবড় নানা মন্ত্রী মন্ত্রের মতো আউড়ে চলেছেন, উন্নয়নের কর্মসূচি দেখে নাকি মানুষ তৃণমূল কংগ্রেসকেই সর্বত্র জেতাবেন ভোটের আগেই যেখানে নির্বাচন কমিশন সরকারের তোতাপাখিতে পরিণত, ভোট চলাকালীন রক্তগঙ্গা বইলেও তাদের ঠুঁটো দশা যে কাটবে না তা বোঝাই যায়৷ শাসক দলের ভরসা অনেকটা সেটাই৷ কিন্তু উন্নয়ন? বেশিদিন হয়নি, ২৭ ফেব্রুয়ারি উত্তর ২৪ পরগণার বারাসাতে প্রশাসনিক সভায় মুখ্যমন্ত্রী নিজমুখে পঞ্চায়েত মন্ত্রীকে প্রকাশ্যে বলেছিলেন– ‘আপনি কিন্তু ডাহা ফেল’, সঙ্গে ডেঙ্গু প্রতিরোধের কথা যোগ করলেও সব ক্ষেত্রেই এই ‘ডাহা ফেল’ দফতর যে পাশটুকুও করতে পারেনি তা মুখ্যমন্ত্রীই প্রকারান্তরে বলে দিয়েছেন৷ তার সাথে ডেঙ্গু রোধের ব্যর্থতার ‘ফেল’ মার্কশিটটি তাঁর নিজের হাতে থাকা স্বাস্থ্য দফতরের জন্যও যে সমানভাবে সত্য– সে কথাও চাপা থাকেনি৷

তাহলে কোন উন্নয়নের চ্যাম্পিয়ান তৃণমূল? গ্রামে গ্রামে তাঁরা প্রচার করছেন রাস্তাঘাট খুব ভাল হয়েছে, ১০০ দিনের কাজে টাকা পেয়েছে মানুষ৷ কিন্তু তাঁদের প্রচারের বিশেষ জোর পড়েছে কন্যাশ্রী, সাইকেল বিতরণ, রূপশ্রী, যুবশ্রী ইত্যাদি খয়রাতি প্রকল্পের উপর৷ প্রচার করছে দু’টাকা কিলো চাল দেওয়ার৷ কিন্তু যে সরকার এত উন্নয়নের ফিরিস্তি দিচ্ছে তাদের হাতে খয়রাতিই সম্বল কেন? মানুষের রোজগারের সুযোগ বাড়লে তো খয়রাতির ভরসাতে মানুষকে বাঁচতে হয় না তাহলে সরকারই প্রকারান্তরে স্বীকার করছে যে, পশ্চিমবঙ্গে রোজগারের সুযোগ আদৌ বাড়েনি৷ মুখ্যমন্ত্রীর চপ ভেজে কর্মসংস্থানের ফরমুলা তো এখন প্রায় কিংবদন্তি হয়ে গেছে৷ গ্রামকে গ্রাম উজাড় করে এ রাজ্যের মানুষ পরিযায়ী শ্রমিক হিসাবে ভারতের নানা রাজ্যে এমনকী মধ্যপ্রাচ্যে পর্যন্ত পাড়ি জমাতে বাধ্য হচ্ছেন৷ সেখানে তাঁদের অনেকে বেঘোরে প্রাণ হারাচ্ছেন৷ অন্য রাজ্য থেকে ফিরে আসা পরিযায়ী শ্রমিকদের সরকার কিছু অনুদান দেবে বলেছিল, কিন্তু তা জুটেছে খুব সামান্য কয়েকজন ভাগ্যবানেরই৷ বাকিরা আবার কাজের খোঁজে অনিশ্চিতের পথেই পা বাড়িয়েছেন৷ দু’টাকা কেজি চাল নিতে গেলে রেশন কার্ড লাগবে তো এ রাজ্যের প্রতিটি ব্লকে হাজার হাজার মানুষের রেশন কার্ড নেই৷ বিপিএল তালিকা নিয়ে চলছে চরম স্বজনপোষণ, দলবাজি ও দুর্নীতি৷ তার উপর রেশনে চালের মান যে বহু ক্ষেত্রেই পশুখাদ্যেরও অধম, তা মন্ত্রীরা নিজেরাই বলছেন৷ শুধু রেশনের চালে সংসারের অভাব মেটে না৷ আলু, শাক–সবজি, চিনি, ভোজ্য তেল, ডাল, আটা, ময়দা সমস্ত কিছুর দাম বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে৷ সরকার রেশনে চিনি, তেল, ডাল ইত্যাদি দেওয়া বহুদিন আগে বন্ধ করেছে৷ কেরোসিনের দাম ক্রমাগত বেড়েছে, তার সাথে কমেছে রেশনে দেওয়া কেরোসিনের পরিমাণ৷ রাজ্য সরকার মদের পাইকারি ব্যবসা হাতে নিতে পারে যাতে তার দাম নিয়ন্ত্রণে থাকে কিন্তু আলু, ধান, পাট থেকে শুরু করে বেশিরভাগ কৃষি–ফসল কেনার দায়িত্ব নিয়ে চাষিকে সঠিক দাম পাইয়ে দিতে পারে না প্রতিবছর ফসলের ন্যায্য দাম না পেয়ে চাষিরা আত্মহত্যা করছে, সরকারের কোনও হেলদোল নেই৷ একইভাবে খুচরো বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে সরকারের কোনও মাথাব্যথা আছে কি?

মুখ্যমন্ত্রী ডায়মন্ড হারবারে প্রশাসনিক সভায় কয়েকদিন আগে বলেছেন, দক্ষিণ চব্বিশ পরগণায় পানীয় জলের আকাল মেটাতে নতুন করে ডিপ টিউবওয়েল খোঁড়া হবে৷ তাঁদের বহুল প্রচারিত ‘জল ধরো–জল ভরো’ প্রকল্পে এত বছর ধরে তাহলে কী কাজ হল? আর্সেনিকমুক্ত জল সরবরাহের প্রকল্পগুলি সব মুখ থুবড়ে পড়েছে কেন? সরকার কি জানে না, দক্ষিণ চব্বিশ পরগণায় আরও টিউবওয়েল মানেই আরও বেশি আর্সেনিক আরও বেশি মানুষের বিষপানে মৃত্যু নিশ্চিত করা? উত্তর অবশ্য মুখ্যমন্ত্রীর কথাতেই আছে– তিনি বলেছেন ‘কাটমানির কারবার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে’ নিজের দলীয় নেতাদের কৃতকর্মের কী সরল স্বীকৃতি এই কারবারের জোরেই যে ছোট–বড় পঞ্চায়েত নেতারা তৃণমূলে ভিড়ে আছেন, সে খোঁজ মুখ্যমন্ত্রী নিশ্চয়ই রাখেন পশ্চিম মেদিনীপুরেও বলে এসেছেন রাস্তা তৈরিতে, কেলেঘাই–কপালেশ্বরী নদী প্রকল্পে কাটমানির কারবার চলছে৷ আর সেই কারবারের জোরে রাজ্য জুড়েই রাস্তা তৈরির কয়েক মাসের মধ্যেই তার দাঁত বেরিয়ে পড়ে৷ বছরের পর বছর ধরে বন্যার সমস্যা মেটে না৷ একটু বেশি বৃষ্টিতেই জোড়াতালি দিয়ে তৈরি নদী বাঁধ ভেঙে সর্বস্বান্ত হতে হয় হাজার হাজার মানুষকে৷ সরকারি দলের নেতাদের মদত ছাড়া এই কারবার চলতে পারে কি?

কন্যাশ্রী প্রকল্পে টাকা দিয়ে মেয়েদের নাকি সাহায্য করছেন কিন্তু সেই মেয়েরা কি নিরাপদে পথে চলাফেরা করতে পারে? ছাত্রী থেকে সাধারণ মহিলা অসংখ্য নারী আজ এ রাজ্যে ধর্ষণ–নির্যাতনের শিকার৷ রাজ্য সরকার আর্থিক বছরের শেষে হিসাব দিয়েছে তাদের সবচেয়ে বেশি আয় হয়েছে মদ বেচে৷ পাড়ায় পাড়ায় বয়ে যাওয়া সেই মদের ফোয়ারার শিকার ছাত্র–যুবকরা নেশার খপ্পরে পড়ে পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে৷ অন্যদিকে মদ্যপদের উন্মত্ত লালসার শিকার হচ্ছেন মেয়েরা৷ কন্যাদের ‘শ্রী’ বলুন, সম্মান বলুন, রক্ষা করবে কে? পুলিশ তো অভিযোগটুকু নিতেই নির্যাতিতাদের হয়রানি করে চলেছে৷

উন্নয়নের নামে ল্যাম্পপোস্ট থেকে স্কুল বিল্ডিং–এ, হাসপাতালের বাড়িতে নীল–সাদা রঙের ঝলক খুলেছে, কিন্তু শিক্ষা, চিকিৎসার হাল কি উন্নত হয়েছে? সরকারি হিসাবে দেখা যাচ্ছে এ রাজ্যের বহু গ্রামীণ বা মফস্বল শহরের স্কুলে দেওয়াল রঙ করতে প্রচুর খরচ হয়েছে অথচ ছাত্রদের বসার মতো যথেষ্ট শ্রেণিকক্ষ নেই৷ হাসপাতালে কোটি টাকা খরচে গেট বসেছে, কিন্তু চিকিৎসক, নার্সের আকালের কথা মুখ্যমন্ত্রীই নিজ মুখে বলেছেন৷ হাসপাতালগুলিতে সরবরাহ করা ওষুধের তালিকাও সরকারি বদান্যতায় একেবারে ছোট হয়ে গেছে৷ নিখরচায় চিকিৎসার ঢাক এতদিন পিটিয়ে এবার পিপিপি মডেলে হাসপাতালের মধ্যেই প্রাইভেট ব্যবসার সুযোগ করে দিচ্ছে সরকার৷

তৃণমূলের বিরুদ্ধে সিপিএম–কংগ্রেস–বিজেপি ভোট চাইছে দুর্নীতি, স্বজন–পোষণ, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলে৷ কিন্তু তৃণমূল সরকারের যে কোনও নীতি, স্বজন পোষণ, সন্ত্রাস– এর মধ্যে কোন বিষয়টিতে এই ‘বিরোধী’রা তৃণমূলের থেকে আলাদা? তৃণমূল এরাজ্যে তো সিপিএমের ছেড়ে যাওয়া জুতোতেই পা গলিয়ে হাঁটছে৷ কংগ্রেস–বিজেপির সমস্ত জনবিরোধী নীতি তৃণমূল হুবহু অনুসরণ করে চলেছে৷ আসলে এদের একের বিরুদ্ধে অপরের লড়াই শুধু ভোট রঙ্গমঞ্চেই৷ বাকি সময় এরা সকলে পুঁজিপতিদের সেবাদাস দল হিসাবে চরিত্রে এক৷ তাই কংগ্রেস–সিপিএম নেতা কর্মীরা অক্লেশে স্বার্থসিদ্ধির জন্য তৃণমূল কিংবা বিজেপিতে ভিড়তে পারছেন৷ আবার বিজেপি–তৃণমূলের এখন ক্ষমতার জোর বেশি বলে তাদের নিজেদের মধ্যেও চলছে সুবিধাবাদী যাতায়াত৷ এদের মধ্যে যে কোনও দলই পঞ্চায়েতে জিতুক, তারা নতুন কী করবে?

ভোটে যে দলই জিতুক গণআন্দোলন ছাড়া যে জনগণের দাবি আদায় হয় না তা সাধারণ মানুষ নিজেদের অভিজ্ঞতাতেই দেখেছেন৷ শিক্ষক্ষেত্রে ইংরেজি ও পাশফেল তুলে দেওয়ার বিরুদ্ধে হোক, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির বিরুদ্ধে হোক কিংবা পঞ্চায়েতের কাছ থেকে ন্যায্য পাওনা আদায়ের ক্ষেত্রেই হোক– বারবার আন্দোলন গড়ে তুলেছে এস ইউ সি আই (সি)৷ যার মধ্য দিয়েই বহু দাবি আদায় হয়েছে৷ পঞ্চায়েতকে মতলববাজ, কাটমানির কারবারিদের আখড়ায় পরিণত করতে না দিতে চাইলে গণআন্দোলনের শক্তিকেই জেতাতে হবে৷ কোনও প্রলোভন, মধুর প্রতিশ্রুতি কিংবা আশু পাওনার লোভে তৃণমূল–বিজেপি–সিপিএম-কংগ্রেসের মদতপুষ্ট মতলববাজদের ফাঁদে পা দিলে আবার সর্বনাশ৷