Breaking News
Home / খবর / নিয়োগ দুর্নীতিঃ ভোটার জনসাধারণের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা

নিয়োগ দুর্নীতিঃ ভোটার জনসাধারণের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা

দুর্নীতিতে অভিযুক্তদের শাস্তির দাবিতে এসইউসিআই(সি)-র ডাকে ২৮ জুলাই রাজ্য জুড়ে ধিক্কার দিবস পালিত হয়। পুরুলিয়ার ধিক্কার মিছিলে উপস্থিত ছিলেন পলিটবুরো সদস্য কমরেড অমিতাভ চ্যাটার্জী, রাজ্য সম্পাদক কমরেড চণ্ডীদাস ভট্টাচার্য সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ

স্কুলে শিক্ষক থেকে গ্রুপ ডি কর্মী পর্যন্ত নিয়োগে একের পর এক দুর্নীতির খবর সামনে আসছে। বিশেষত প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রীর গ্রেপ্তারি এবং টাকার পাহাড় উদ্ধারের চাঞ্চল্যকর ঘটনাবলি মানুষকে হতবাক করে দিয়েছে। এই ব্যাপক দুর্নীতি আসলে জনসাধারণের প্রতি চরম বিশ্বাসঘাতকতা। সেই জনসাধারণ, যারা অনেক আশা নিয়ে দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করে ভোট দিয়ে দু’দফায় জিতিয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসকে। দুর্নীতির দায়ে প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রীর গ্রেপ্তারের পর মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, তাঁর গায়ে কালি লাগানোর চেষ্টা হলে তিনিও পাল্টা আলকাতরা ছুঁড়বেন, তিনি নিজেকে আহত সিংহ বলেছেন। অর্থাৎ সমালোচনার জবাবে অন্যদের দুর্নীতি তুলে ধরাই তাঁর হাতিয়ার। কিন্তু তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা চরম দুর্নীতির অভিযোগ সম্পর্কে নিরপেক্ষ এবং কড়া অবস্থান নিয়ে তা সমূলে উৎপাটিত করার পদক্ষেপের নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি। অথচ এই নিশ্চয়তা দেওয়াই ছিল তাঁর সরকারের প্রতিশ্রুতি।

মেধা তালিকায় জালিয়াতি, অবৈধভাবে নম্বর বাড়ানো, ইন্টারভিউ না দিয়েই মন্ত্রীকন্যার চাকরি– অভিযোগের যেন শেষ নেই। প্যানেলভুক্ত যোগ্য চাকরিপ্রার্থীরা এই অভিযোগগুলির সুরাহা চেয়ে প্রশাসনের দরজায় বারবার কড়া নেড়েছেন। ৫০০ দিনের বেশি একটানা ধরনা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু হাইকোর্ট তদন্তের আদেশ দেওয়ার আগে সরকার ভাব দেখিয়েছে, যেন এ সব তাদের একেবারে অজানা ছিল। যদিও বঞ্চিত চাকরিপ্রার্থীরা দুর্নীতির প্রমাণ জোগাড় করেছেন সরকারের ঘর থেকেই।

স্কুলে শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতার জন্য তৈরি ‘নজরদারি’ কমিটির নজর আসলে কোন দিকে ছিল, তা এখন স্পষ্ট। এতবড় দুর্নীতি অথচ দপ্তরের মন্ত্রী থেকে শুরু করে সরকারের উচ্চস্তরে কেউ কিছুই টেরটি পেলেন না, তা কি সম্ভব? এই পর্যায়ে দুর্নীতি দেখেও তাঁরা চুপ করে থাকলেন কেন? শিক্ষা দপ্তরের প্রতিমন্ত্রীর কন্যার স্কুলে অবৈধ নিয়োগ প্রমাণিত হওয়ার পর সেই মন্ত্রীর কি শাস্তি হয়েছে? টাকা নিয়ে চাকরি দেওয়ার দালালদের নাম সংবাদমাধ্যমে এমনকি হাইকোর্টের সামনেও উঠে এসেছে, তাদের কোনও খোঁজ করেছে পুলিশ?

কলকাতার ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া মোাড়

এরা সকলেই শাসকদলের স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা-কর্মী। হাইকোর্ট নিযুক্ত বাগ কমিটির রিপোর্টে দুর্নীতির অভিযোগ সুনির্দিষ্টভাবে বলার পর দেখা গেল তদন্তের ভার কার হাতে থাকবে, সরকারের একমাত্র মাথাব্যথা সেটাই। প্রবল শীতে, গ্রীষ্মের প্রখর রোদে, বৃষ্টিতে চাকরিপ্রার্থীরা দিনের পর দিন অবস্থান করেছেন, কোনও মন্ত্রী ডেকে তাঁদের কথা শুনেছেন? একটা স্মারকলিপি দিতে গেলেও, তাঁদের তা নেওয়ার সময় হয়নি। সরকারের বিরোধী বলে যে দলগুলিকে এইসব বৃহৎ সংবাদমাধ্যম ব্যাপক প্রচার দিয়ে তুলে ধরে, তারা মূলত ব্যস্ত কেলেঙ্কারির কিছু মুখরোচক সংবাদ নিয়েই। বঞ্চিত চাকরিপ্রার্থীদের এই যন্ত্রণা তাঁদের কাছে একটা সুযোগ মাত্র। তাই মাঝে মাঝে কিছু চমকদার বাণী, গরম গরম কিছু বিবৃতি ছাড়া বিজেপি, কংগ্রেস, সিপিএম এই দলগুলির কেউই দুর্নীতির অবসান চেয়ে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে লাগাতার দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলন গড়ে তুলতে আগ্রহী নয়।

বামপন্থী বলে পরিচিত সিপিএমও গণআন্দোলন গড়ে তোলার পরিবর্তে ইডি, সিবিআইয়ের মতো সংস্থাগুলির মহিমা কীর্তনে বেশি উৎসাহী। অথচ কোনও রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকারের তদন্তকারী সংস্থা কি দুর্নীতির বিরুদ্ধে সত্যিই কোনও রক্ষাকবচ? কোনও ক্ষমতাসীন দল কি তদন্তকারী এজেন্সিগুলির নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে চায়? যে দল যখন ক্ষমতায় থাকে পুলিশ, সিবিআই, ইডি, এনআইএ ইত্যাদি তাদের কথায় ওঠে বসে। পরিস্থিতি দেখে সুপ্রিমকোর্টই একসময় সিবিআইকে ‘খাঁচার তোতা’ বলেছে। বুর্জোয়া ব্যবস্থার নিজস্ব ধর্মেই এখনকার সংসদীয় দলগুলির নেতারা নানা সময় ছোটবড় দুর্নীতির সাথে জড়িয়ে থাকেনই। এই দুর্নীতিকে পুঁজি করে শাসকদল নিজের দলের এবং বিরোধীদলগুলির নেতাদের চাপে রাখতে এই সব সংস্থাকে কাজে লাগায়়। আগে কংগ্রেস ঠিক একই কায়দায় এই সব এজেন্সিকে ব্যবহার করেছে, বর্তমান বিজেপি সরকার তাকে লাগামছাড়া জায়গায় নিয়ে গেছে। ইডির রাজনৈতিক ব্যবহারের অন্যতম প্রমাণ সংসদে দেওয়া নরেন্দ্র মোদি সরকারের তথ্য। দেখা যাচ্ছে, তাদের আমলে ইডির দায়ের করা মামলার মাত্র ০.৫ শতাংশের ফয়সালা হয়েছে। টাকা উদ্ধার হোক আর বিরোধী নেতাদের জিজ্ঞাসাবাদের খবরই হোক কিছুদিন হইচইয়ের পর বাদে তা পিছনে চলে যায়। আর এর মধ্যে অভিযুক্তরা শাসকদলের শরণ নিলে মামলা পুরো ঠাণ্ডাঘরে চলে যায়। আসলে দুর্নীতির উৎপাটন নয়, এর একমাত্র লক্ষ্য ভোটে ফয়দা তোলা। পশ্চিমবঙ্গেও দেখা গেছে সারদা কেলেঙ্কারি, নারদ কেলেঙ্কারি ইত্যাদি নিয়ে প্রচার যত হয়েছে, তদন্ত তার সামান্য ভগ্নাংশও এগায়নি।

 

পশ্চিমবঙ্গে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত তৃণমূল কংগ্রেস, কংগ্রেস, এমনকি সিপিএম ও তার শরিক দলের একাধিক নেতা বিজেপির উত্তরীয় গলায় ঝোলানোর পর সিবিআই-ইডি আর তাঁদের দেখতে পায় না, এমন উদাহরণ কম নয়। বিজেপি কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় থাকার সময়েই মধ্যপ্রদেশে বিজেপি সরকারের সরকারি চাকরি এবং মেডিকেলে নিয়োগ সংক্রান্ত ব্যাপম কেলেঙ্কারি ফাঁস হয়েছে। এতে মুখ্যমন্ত্রী সহ একাধিক বিজেপি নেতা অভিযুক্ত। এই কেলেঙ্কারিকে কেন্দ্র করে ৫০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন। কর্ণাটকে ৩৬ হাজার কোটি টাকার খনি কেলেঙ্কারি, ছত্তিশগড়ের প্রায় সমান অঙ্কের রেশন কেলেঙ্কারিতে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী সহ বিজেপি নেতারা অভিযুক্ত। রাজস্থানে বিজেপি আমলে ৪৫ হাজার কোটি টাকার খনি দুর্নীতি, ঢোলপুর প্যালেস দখল সংক্রান্ত দুর্নীতিতে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর নাম জড়িয়েছে। ‘গুজরাট স্টেট পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনে ২০ হাজার কোটি টাকা লুঠের ঘটনায় বিজেপি অভিযুক্ত। গুজরাটে বিজেপির প্রাক্তন এমএলএ শচীন ওঝা নোট বাতিলের সময় মারাত্মক দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখেছিলেন। সে বিষয়ে পদক্ষেপ কী হয়েছে কেউ জানে না। এ ছাড়া ললিত মোদি, মেহুল চোক্সি, নীরব মোদি, বিজয় মালিয়ারা যে হাজার হাজার কোটি টাকা গায়েব করে দেশ ছেড়ে পালাতে পেরেছে, তা কি বিজেপি সরকারের উচ্চমহলের সাহায্য ছাড়া সম্ভব ছিল? কংগ্রেসের নেতারা কয়লা, টেলিকম, সংসদে ঘুষ সহ নানা কেলেঙ্কারিতে বারবার ফেঁসেছেন। এখনও তাঁদের বিরুদ্ধে নানা তদন্ত চলছে। যে সিপিএম দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় যোদ্ধা সাজতে চাইছে, তাদের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ১৮ ডিসেম্বর ২০১১ কৃষ্ণনগরে দলীয় সম্মেলনে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন নিজেদের ব্যাপক দুর্নীতির জন্যই তাঁরা হেরেছেন (হিন্দুস্তান টাইমস ১৯.১২.২০১১)। তিনিই ১৯৯৩ সালে ‘চোরেদের মন্ত্রিসভায় থাকব না’ বলে পদত্যাগ করে আবার কয়েক মাস পরে ফিরে এসেছিলেন। সিপিএম মন্ত্রিসভায় সৎ ব্যক্তি বলে পরিচিত বিনয় চৌধুরী বলেছিলেন, সিপিএম সরকারটি আসলে বাই দ্যা কন্ট্রাক্টর, অফ দ্যা কন্ট্রাক্টর, ফর দ্যা কন্ট্রাক্টর। এ জন্য তাঁকে বহিষ্কৃত হতে হয়েছিল। সিপিএম আমলে বেঙ্গল ল্যাম্প কেলেঙ্কারি, ট্রেজারি কেলেঙ্কারি, মাটি কেলেঙ্কারির মতো বড় দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও কোনও তদন্ত হয়নি। বরং মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর মুখ বাঁচাতে আরএসপি নেতা যতীন চক্রবর্তীকে মন্ত্রিসভা থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল।

আজকের সংকটগ্রস্ত বুর্জোয়া ব্যবস্থা এতটাই পচাগলা যে, তার সেবা করার দায়িত্ব নিয়ে যারাই চলবে, তারাই এর কুৎসিত সংক্রমণের শিকার হতে বাধ্য। এখন বুর্জোয়া প্রচারবিদরা একটা তত্ত্ব খাড়া করে ফেলেছেন– সহনীয় পরিমাণ দুর্নীতি। সমাজে দুর্নীতি পুরোপুরি দূর হোক এ তারা চায় না। অন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত এই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রেখে তা সম্ভবও নয়। দুর্নীতির মধ্য দিয়ে বেশিরভাগ সময় লাভবান হয় বৃহৎ পুঁজিপতি গোষ্ঠীগুলি। শাসকদলগুলি তাদের সেবার জন্য দুর্নীতির পাঁকে নামতে পিছপা হয় না। ভোটের সময় বিরোধীরা এই নিয়ে গলা ফাটায়। কিন্তু মসনদে বসলেই সব ভুলে যায়। এ কারণেই ভোটে এক দলের বদলে অন্য দলের সরকার বসালেই দুর্নীতি দূর হবে না। অভিজ্ঞতা বলছে, একটার পর একটা ভোট যাচ্ছে, যে দলের সরকারই আসুক না কেন তারা আগেরটার চেয়ে বেশি দুর্নীতিতে জড়াচ্ছে। এর পরে আবারও যে সরকার আসবে তারও দশা একই হবে। বুর্জোয়া সংবাদমাধ্যম যাদের একে অপরের বিকল্প হিসাবে তুলে ধরে সেই বিজেপি, কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, সিপিএম ইত্যাদি দলগুলি এবং তাদের নানা জোট, ভোটে এদেরই তো কাউকে গদিতে বসাতে চায় পুঁজিপতি শ্রেণি। মুখে যাই বলুক, গদিতে টিকে থাকার জন্য এরা যে সব কাজ করে তাতে কি এদের নীতি আদর্শের কোনও পার্থক্য বোঝা যায়?

সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষা তা হলে কীভাবে সম্ভব? এ কাজ সম্ভব একমাত্র হতে পারে, সাধারণ মানুষের স্বার্থে তাদের জীবনের জ্বলন্ত দাবিগুলি নিয়ে লাগাতার আন্দোলন গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে। এ জন্য গড়ে তোলা দরকার গণআন্দোলনের হাতিয়ার হিসাবে গণকমিটি। যে গণকমিটি জনজীবনের জ্বলন্ত দাবিগুলি নিয়ে আন্দোলন গড়ে তুলবে একই সাথে সরকারের দুর্নীতি, লুঠ, প্রতারণার বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। এসএসসি নিয়োগে এই দুর্নীতির জন্য আদৌ কোনও শাস্তি হবে কিনা তা সময়ই বলবে। প্যানেলভুক্ত বঞ্চিত প্রার্থীরা অনেক কষ্ট সয়ে আন্দোলন করে চলেছেন। তাঁদের ন্যায্য দাবি আজ পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের গণআন্দোলনের অন্যতম দাবি। তাই সস্তা ভোট রাজনীতির পরিবর্তে প্রয়োজন সর্বস্তরে গণকমিটি গড়ে তুলে সকল বেকারের চাকরি, মানুষের জ্বলন্ত সমস্যার সমাধানের দাবিতে চলা আন্দোলনের সাথে এই আন্দোলনকেও যুক্ত করা। জনস্বার্থ রক্ষায় এভাবেই জনগণকে এগিয়ে আসতে হবে।