Breaking News
Home / অন্য রাজ্যের খবর / নিষিদ্ধ কীটনাশক ছড়াতে গিয়ে বিদর্ভে কৃষক মৃত্যু আসলে গণহত্যা

নিষিদ্ধ কীটনাশক ছড়াতে গিয়ে বিদর্ভে কৃষক মৃত্যু আসলে গণহত্যা

 

এ বছর মহারাষ্ট্রের বিদর্ভে দীপাবলির আলো জ্বলেনি৷

সেখানকার মানুষের মনে আনন্দ নেই, রয়েছে শোকের ছায়া৷ কারণ গত জুলাই থেকে অক্টোবর– চার মাসে এই অঞ্চলে ৫০ জনের মতো চাষি এবং কৃষিশ্রমিক ফসলে কীটনাশক প্রয়োগ করতে গিয়ে নিজেরাই বিষাক্রান্ত হয়ে পড়েন৷ শেষপর্যন্ত তাঁদের মৃত্যু হয়েছে৷ এর মধ্যে ইয়তমালে মারা গেছেন ২৩ জন, নাগপুরে ৮ জন, চাঁদপুরে ৩ জন এবং বুলধানায় ২ জন৷

বিদর্ভ এলাকায় প্রতিবছর শত শত চাষির আত্মহত্যার খবর দেশের মানুষ জানেন৷ মূলত ঋণের জালে জড়িয়ে পড়াই এই আত্মহত্যার প্রধান কারণ৷ কিন্তু এই ৫০ জন চাষির মৃত্যুর সাথে ঋণের কোনও সম্পর্ক ছিল না৷ তাঁরা আত্মহত্যার পথেও যাননি, তাঁরা বাঁচতেই চেয়েছিলেন৷ বাঁচার জন্যই রক্ত–ঘাম–শ্রম দিয়ে ফসল বুনে ছিলেন৷ কীট–পতঙ্গের আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষা করতে বহুজাতিক কোম্পানির দোকান থেকে কীটনাশক কিনে এনেছিলেন৷  কিন্তু সেই কীটনাশক যে ছিল নিষিদ্ধ, তা চাষিদের জানানো হয়নি৷ সেই নিষিদ্ধ কীটনাশক প্রয়োগ করতে গিয়েই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তাঁরা৷

তা হলে এই মৃত্যুর দায় কার?

এই মৃত্যু নিয়ে মহারাষ্ট্রে কৃষকদের মধ্যে প্রবল বিক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে৷ প্রবল জনবিক্ষোভ লক্ষ করে মহারাষ্ট্র সরকার একটি তদন্ত কমিশন গঠন করতে বাধ্য হয়েছে৷ কমিটির প্রধান কিশোর তিওয়ারি এ বিষয়ে অনুসন্ধান করে বলেছেন, ‘এই কৃষক মৃত্যু আসলে গণহত্যা’৷ তিনি এও বলেছেন, ‘এ জন্য দায়ী রাষ্ট্র এবং বহুজাতিক কোম্পানি’৷

কীভাবে?

যে কীটনাশক ছড়াতে গিয়ে সেই চাষিদের মৃত্যু হয়েছে সেগুলি অর্গ্যানো ফসফরাস কীটনাশক, যা অত্যন্ত বিষাক্ত৷ এগুলি নিষিদ্ধ কীটনাশক৷ এগুলি ব্যবহার করতে গেলে অত্যন্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে হয়৷ তিওয়ারি প্রশ্ন তুলেছেন, নিষিদ্ধ কীটনাশকগুলির উৎপাদন কী করে হল? এগুলি তৈরির সময় কেন ইউনাইটেড নেশনস গাইড লাইন মানা হয়নি? বিক্রির সময় কেন সতর্কতামূলক ব্যবস্থা চাষিদের নিতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি? এক্ষেত্রে সরকার কী ভূমিকা পালন করেছে? সুইজারল্যান্ড, জার্মানি এবং আমেরিকার যে সমস্ত মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি ভারতে সার–বীজ–কীটনাশকে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে তাদের উপর সরকার কি নজরদারি রেখেছে? তারা নিষিদ্ধ কীটনাশক বিক্রি করে দেশের চাষি–মজুরকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেবে, আর সরকার তা তাকিয়ে দেখবে– এটা চলতে পারে কি? তারা বহুসময় নিম্নমানের বীজ চাষিদের বিক্রি করে থাকে যার অর্ধেকই অনেক সময় অঙ্কুরিত হয় না – এইসব নিয়ন্ত্রণে সরকার কেন ব্যবস্থা নেবে না? তারা সার–বীজ–কীটনাশকে ইচ্ছামতো দাম বাড়িয়ে চাষিদের লুঠবে, সরকার কেন নীরব দর্শকের ভূমিকায় থাকবে?

বহুজাতিক কোম্পানিগুলি সুপার প্রফিট করতে নিম্নমানের প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে এবং নিষিদ্ধ  কেমিক্যাল দিয়ে যে কীটনাশক তৈরি করেছে তাতেই প্রাণ গেল এই চাষি–মজুরদের৷ সরকারও এই সমস্ত কোম্পানিকে জায়গা দিয়ে তাদের উপর কোনও নিয়ন্ত্রণ কায়েম না করে তাদের যা খুশি করার লাইসেন্স দিয়েছে৷ ফলে যথার্থই অভিযোগ উঠেছে এই মৃত্যুর জন্য ভারত সরকার এবং সাম্রাজ্যবাদী বহুজাতিক পুঁজি সম্পূর্ণরূপে দায়ী৷

এ হেন বহুজাতিক কোম্পানিকে চুক্তি চাষের নামে বর্তমানে অনেকেই কৃষি ক্ষেত্রে ঢোকানোর পক্ষে সওয়াল করে থাকেন৷ কৃষক এবং ক্রেতার মাঝে ক্রিয়াশীল শক্তিশালী ফড়ে–চক্র নিয়ন্ত্রণের জন্য তাঁরা এরূপ বলে থাকেন৷ এই চক্র একদিকে ফসল কেনার সময় চাষিদের ন্যায্য দাম না দিয়ে অত্যন্ত কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য করে, অন্যদিকে অত্যন্ত চড়া দামে কৃষি পণ্য বিক্রি করে সাধারণ ক্রেতাদের শোষণ করে৷ এই ফড়েরাজ বন্ধ করার পথ কি  কৃষিতে চুক্তি চাষ প্রবর্তন? বৃহৎ পুঁজি চাষিদের ন্যায্য দাম দেবে তার কি কোনও গ্যারান্টি আছে? উৎপাদন ব্যবস্থা বা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের লক্ষ্য যদি হয় অতি মুনাফা, তা হলে সেই ব্যবস্থায় সর্বক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়বেই এবং অতি মুনাফা করতে অতি শোষণ চলবেই৷ ফড়ে–চক্রের শোষণের পরিবর্তে চাষিরা মাল্টিন্যাশনাল পুঁজির শোষণের শিকার হবেন৷

চাষের প্রয়োজনীয় উপকরণের বাজার আজ সম্পূর্ণরূপে বহুজাতিক পুঁজির কব্জায়৷ তারা অতি মুনাফা করতে চাষিকে যেমন খুশি শোষণ করছে৷ এর বিরুদ্ধে প্রথমেই দরকার চাষির সচেতনতা৷ দরকার তার ভিত্তিতে প্রতিবাদের সংগঠন৷ কৃষিতে সরকারি উদ্যোগ বাড়াতে হবে, বহুজাতিক পুঁজির প্রভাব খর্ব করতে হবে৷ না হলে বিদর্ভের মতো পরিস্থিতি তৈরি হবে দেশের অন্য প্রান্তেও৷