Breaking News
Home / খবর / নির্বাচনের পথে নয়, একমাত্র সমাজবিপ্লবের পথেই শোষণমুক্তি সম্ভব —৫ আগস্টের সভায় কমরেড প্রভাস ঘোষ

নির্বাচনের পথে নয়, একমাত্র সমাজবিপ্লবের পথেই শোষণমুক্তি সম্ভব —৫ আগস্টের সভায় কমরেড প্রভাস ঘোষ

৫ আগস্ট দিনটি আমরা গভীর বেদনামিশ্রিত আবেগ এবং শ্রদ্ধা সহকারে উদযাপন করে যাচ্ছি৷ এরপরেও বছরে বছরে ৫ আগস্ট আসবে, আমরা সেদিন থাকব না৷ আপনারাও অনেকে থাকবেন না৷ এ দেশের মুক্তিকামী জনসাধারণ গভীর শ্রদ্ধার সাথে সর্বহারার মুক্তি আন্দোলনের পথপ্রদর্শক, মহান মার্কসবাদী চিন্তানায়ক কমরেড শিবদাস ঘোষের এই স্মরণ দিবস উদযাপন করবে, তাঁর অমূল্য শিক্ষাগুলোকে স্মরণ করবে এবং সেই শিক্ষার ভিত্তিতে তাদের সামনে যা কর্তব্য সেটা নির্ধারণ করবে৷ গত কয়েক দিন ধরে এবং আজও অবিশ্রান্ত বৃষ্টিজনিত গভীর দুর্যোগের মধ্যে এই মিটিং অনুষ্ঠিত হচ্ছে৷ আপনারা পশ্চিমবাংলার দূরদূরান্তের গ্রাম শহর বিভিন্ন এলাকা থেকে আজকের এই সমাবেশে সামিল হয়েছেন৷ আমি মূলত চেষ্টা করব সমসাময়িক কিছু সমস্যা সম্পর্কে কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষার ভিত্তিতে আমাদের বক্তব্য আপনাদের সামনে আলোচনা করতে৷

আপনারা দেখছেন, ইতিমধ্যেই সারা দেশে নির্বাচনের বাজনা বেজে উঠেছে৷ বড় মাঝারি ছোট দল– বিজেপি, কংগ্রেস, আরজেডি, বিএসপি, এসপি, ডিএমকে, এডিএমকে, জেডিইউ, অকালি দল, শিবসেনা, এ রাজ্যে তৃণমূল– সকলেই ঝাঁপিয়ে পড়েছে এই নির্বাচনে কে ক’টা আসন লাভ করবে তার হিসাব–নিকাশের জন্য৷ সকলেই প্রস্তুতি নিচ্ছে জনগণকে কোন কথা বলে, কীভাবে ঠকিয়ে এই নির্বাচনে তারা বাজিমাত করতে পারে৷ অন্যদিকে শিল্পপতি, বড় বড় ব্যবসায়ী, কালোবাজারি, মুনাফাখোরদের সাথেও গোপনে আলোচনা চালাচ্ছে কার কাছ থেকে কত কোটি টাকা নেবে এই নির্বাচনে ব্যয় করার জন্য৷ ইতিমধ্যেই বিজেপি শিবির ও কংগ্রেস শিবির কে ক’টা আসন কোন রাজ্যে নেবে সেই আলোচনাও শুরু হয়ে গেছে৷ এমনকী এখনই ঘোষণা হয়ে গেছে কোন রাজ্যে কে ক’টা সিট জিতছে– অথচ ভোট এখনও হয়নি, ভোটের গণনার প্রশ্ন তো ওঠেই না এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, তাঁরা ৪২টা আসনেই জিতছেন৷ বিজেপিকে হারাতে পারলে দিল্লির কুর্সিতে কে বসবে তা নিয়েও নানা দাবিদার খাড়া করা হচ্ছে৷ সিপিএম–সিপিআই পশ্চিমবঙ্গে, ত্রিপুরায় রাজত্ব হারিয়েছে৷ কেরালায় কোনও রকমে টিকে আছে৷ তারা কংগ্রেস শিবিরের পিছনে ঘুর ঘুর করছে কোনও রকমে যদি ক’টা সিট জিততে পারে, যদি কংগ্রেস শিবির আগামী নির্বাচনে সরকার গঠন করে তা হলে সাথী হিসাবে অন্তত ক্ষমতার আশেপাশে তারা যাতে একটু স্থান লাভ করতে পারে৷ এই পরিবেশে একমাত্র আমাদের দল মহান মার্কসবাদ–লেনিনবাদ-কমরেড শিবদাস ঘোষের চিন্তাধারাকে হাতিয়ার করে বিপ্লবী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে জনগণের দাবিতে সংগ্রাম চালাচ্ছে৷ এই সংগ্রাম করতে করতে বিপ্লবী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই আমরা নির্বাচনে নামব৷

এই প্রসঙ্গে আমাদের মহান শিক্ষক কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষক মহান লেনিন ১৯১৮ সালে কী বলেছিলেন আপনাদের জানাতে চাই৷ তখনও বুর্জোয়া পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসি আজকের মতো এত কদর্য রূপ নেয়নি৷ এতটা পচন ধরেনি৷ লেনিন বলেছেন ‘‘বুর্জোয়া প্রজাতন্ত্র হচ্ছে পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে আড়াল করার সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ আবরণ এবং এটা একবার প্রতিষ্ঠিত হতে পারলে তখন নির্বাচনের মাধ্যমে কোনও ব্যক্তির বা কোনও প্রতিষ্ঠানের বা কোনও পার্টির পরিবর্তনের দ্বারা এই বুর্জোয়া ব্যবস্থাকে নড়ানো সম্ভব নয়৷ … কয়েক বছর অন্তর শোষক শ্রেণির হয়ে কারা সরকারে বসবে এবং জনগণকে শোষণ–ত্যাচার করবে ইলেকশনের দ্বারা এটাই নির্ধারিত হয়’’৷ মহান লেনিনের ছাত্র কমরেড শিবদাস ঘোষ ১৯৬৭ সালে বলেছেন, ‘‘একটা সরকারের বিরুদ্ধে যখন জনগণ বীতশ্রদ্ধ ও বিক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে তখন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আরেকটা সরকার আসে৷ সাধারণ মানুষ কতকগুলি লোককে অসৎ মনে করে ভাবে সেই লোকগুলিকে সরিয়ে দিয়ে তার জায়গায় অন্য কতকগুলি সৎ লোক এসে বসলেই তাদের মঙ্গল হবে৷ এ ধরনের প্রচার বুর্জোয়া রাজনীতিবিদরা করে থাকে৷ কাজেই আমি শ্রমিক–কৃষক–মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে বলছি, তাঁরা যেন এই ধরনের ভাঁওতায় না ভোলেন৷ কারণ শুধুমাত্র সরকারের পরিবর্তন হলেই সাধারণ মানুষের মৌলিক সমস্যার সমাধান হয় না৷ হতে পারে না৷ ভোটের মারফত হাজার বার সরকার পাল্টে বা আক্ষরিক অর্থে আইনকানুন সংশোধন করার চেষ্টা করার মধ্য দিয়ে জনসাধারণের পুঁজিবাদী রাষ্ট্র ও পুঁজিবাদী শোষণব্যবস্থার থেকে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব৷ এই মুক্তি অর্জনের একমাত্র পথ হচ্ছে জনসাধারণের গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে সঠিক বিপ্লবী কায়দায় পরিচালনার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে জনসাধারণের অমোঘ সংঘশক্তি গড়ে তোলা এবং বিপ্লবী শ্রমিক শ্রেণির দলের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করা৷’’ তিনি আরও বলেছেন, ‘‘ইলেকশন হচ্ছে একটা বুর্জোয়া পলিটিক্স৷ জনগণের রাজনৈতিক চেতনা না থাকলে, শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রাম এবং শ্রেণি সংগঠন না থাকলে, গণআন্দোলন না থাকলে, জনগণের সচেতন সংঘশক্তি না থাকলে, শিল্পপতিরা, বড় বড় ব্যবসায়ীরা, প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিরা বিপুল টাকা ঢেলে এবং সংবাদমাধ্যমের সাহায্যে যে হাওয়া তোলে, যে আবহাওয়া তৈরি করে, জনগণ উলুখাগড়ার মতো সেইদিকে ভেসে যায়৷’’ এই দুইজন মহান নেতার শিক্ষা আপনাদের সামনে উপস্থিত করলাম৷ যাতে মার্কসবাদী বিচারে নির্বাচন সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি কী এটা বোঝা যায়৷

আমাদের দেশে ১৯৫২ সাল থেকে বহুবার পার্লামেন্ট নির্বাচন হয়েছে৷ এবং বেশ কয়েকবার সরকার পরিবর্তন  হয়েছে৷ এরাজ্যেও কংগ্রেস শাসন দীর্ঘদিন ছিল৷ যুক্তফ্রন্ট সরকার, তারপর কংগ্রেস, তারপর সিপিএম, এখন তৃণমূল ক্ষমতায় এসেছে৷ বারবার সরকার পরিবর্তন হয়েছে৷ এরা সবাই ভোটের আগে পরিবর্তনের স্লোগান তুলেছে৷ কিন্তু সরকারের পরিবর্তন হচ্ছে, মন্ত্রীত্বের পরিবর্তন হচ্ছে, একদলের জায়গায় আরেক দল ক্ষমতায় আসছে, তাতে জনজীবনের অবস্থার কি কোনও পরিবর্তন হচ্ছে? আজ থেকে ৮ বছর আগে পূর্বতন রাষ্ট্রপতি বলেছিলেন, ১২১ কোটি মানুষের দেশে ৬২ কোটি হচ্ছে বেকার৷ সংখ্যাটা এখন নিশ্চয় ৭০ কোটিতে পৌঁছেছে৷ এই বেকার সংকটের কী সমাধান ঘটেছে আমাদের দেশে নির্বাচনের মাধ্যমে? ছাঁটাই বন্ধ হয়েছে? জিনিসপত্রের দাম কমেছে?

মুসলিম বিরোধী সেন্টিমেন্ট জাগিয়ে

ভোটে বাজিমাত করার ষড়যন্ত্র এনআরসি

সম্প্রতি বিজেপি আসামে উদ্দেশ্যমূলকভাবে যে এনআরসি–র আগুন জালিয়েছে, ৪০ লক্ষেরও বেশি ভারতবাসীকে বিদেশি তকমা দিয়ে দেশ থেকে বিতাড়নের ষড়যন্ত্র করছে, সেই বিজেপির এক নেতা বলছেন, পশ্চিমবাংলায় ক্ষমতায় এলে তাঁরা এখানেও একই কাজ করবেন৷ অর্থাৎ এখান থেকেও তারা বিতাড়ন করবে৷ আসামে অনুপ্রবেশকারী বলছে বাঙালি হিন্দু, বাঙালি মুসলমানদের, নেপালীদের, আদিবাসীদের– আর পশ্চিমবাংলায় বলছে মুসলমানরা অনুপ্রবেশকারী৷ বলছে, পশ্চিমবাংলায় বেকার সমস্যা হয়েছে এই অনুপ্রবেশকারীদের জন্য৷ আমি প্রশ্ন করতে চাই, সংবাদপত্রে বেরিয়েছে গত বছরে উত্তরপ্রদেশে ৩৬৮টি পিওনের পোস্ট, ক্লাস ফোরের বিদ্যা হলে যে পিওনের পোস্ট পাওয়া যায়, তার জন্য দরখাস্ত করেছে ২৩ লক্ষ যুবক৷ এর মধ্যে গ্র্যাজুয়েট, পোস্ট গ্র্যাজুয়েট, ডক্টরেট, ইঞ্জিনিয়ার পর্যন্ত আছে৷ উত্তরপ্রদেশে কয়জন অনুপ্রবেশকারী ঢুকেছিল? মহারাষ্ট্রে, রাজস্থানে, মধ্যপ্রদেশে, পাঞ্জাবে, গুজরাটে এত বেকার কেন? সারা দেশেই তো কোটি কোটি বেকার৷ কোথায় কত অনুপ্রবেশকারী ঢোকার ফলে বেকার সমস্যা বেড়েছে? এই মিথ্যা কথা বলে পশ্চিমবাংলায় হিন্দু সেন্টিমেন্ট জাগিয়ে পূর্ববাংলা থেকে সেই ’৪৭ সালে ও ’৫০ সালে দাঙ্গার ফলে যারা উদ্বাস্তু হয়ে এখানে আসেন, তাঁদের মধ্যে খানিকটা মুসলিমবিরোধী সেন্টিমেন্ট জাগিয়ে আগামী ভোটে বাজিমাত করার ষড়যন্ত্র হচ্ছে৷ আসামের ষড়যন্ত্রও ঠিক তাই৷ আসামে একটা অসমীয়া উগ্রপন্থী গোষ্ঠী আগে থেকেই এই দাবি তুলেছিল৷ গোটা আসামের অসমীয়া জনগণকে এর জন্য দায়ী করলে ভুল হবে৷ আসামের জনগণের মধ্যে চিন্তাশীল, সৎ, বিবেকবান মানুষ এই জিনিস সমর্থন করেন না৷ আমাদের দলের আসাম রাজ্য সম্পাদক নিজে অসমীয়াভাষী মানুষ৷ আমাদের দলে অনেক অসমীয়া কর্মী আছেন৷ তাঁরা এর বিরুদ্ধে কাজ করছেন, লড়াই করছেন সেই ইন্দিরা গান্ধীর সময় থেকে যখন ‘আসু’ আন্দোলন শুরু করেছিল৷ তখন থেকে একমাত্র আমাদের দলই এই প্রশ্নে ভিন্ন বক্তব্য রেখে আসছে৷ এই আমার বাঁদিকে কমরেড অসিত ভট্টাচার্য বসে আছেন, তিনি তখন আসামের রাজ্য সম্পাদক ছিলেন৷ সর্বদলীয় বৈঠকে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে কথা বলেছিলেন৷ তিনি বলেছিলেন, বিতাড়নের দ্বারা এই সমস্যার সমাধান হবে না৷ আসামের উন্নয়নের জন্য, শিল্পায়নের জন্য, শিক্ষা–ভাষার অগ্রগতি, সংস্কৃতির অগ্রগতির জন্য কয়েকটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দাখিলও করেছিলেন তিনি৷ আমাদের দলই একমাত্র দল যে প্রথম থেকেই এনআরসি–র বিরোধিতা করে এসেছে৷ কংগ্রেসই তো প্রথম এনআরসি করার চুক্তি করেছিল, আজ বিজেপি সেটাই নিজেদের স্বার্থে কার্যকরী করছে৷ আজ যারা ভোটের জন্য এনআরসি–র বিরোধিতা করছে তারাও সেদিন সমর্থন করেছে৷ এবারও আসাম সরকার আলোচনার জন্য অন্য সব দলকে ডেকেছিল, কিন্তু আমাদের দলকে ডাকেনি৷ কংগ্রেস–সিপিআই–সিপিএম সহ সব দল গিয়েছিল৷ সকলেই এনআরসি–কে সমর্থন করে এসেছে৷ এ রাজ্যেও ২০০৫ সালে তৃণমূল অনুপ্রবেশের ধুয়া তুলেছিল৷ তখন সিপিএম সরকারকে মুসলমানরা সমর্থন করত৷ অতএব মুসলিম ভোট পাবে না– এই হিসাব করে তৃণমূল কংগ্রেস বলেছিল পশ্চিমবাংলায় অনুপ্রবেশকারী ঢুকেছে৷ পার্লামেন্টে হইচই করেছিল৷ আজ তারা ইমাম ভাতা, মোয়াজ্জেম ভাতা, ঈদের নমাজের দিন মাথায় হিজাব পরে মুসলিম দরদি সেজে মুসলিম জনগণের একটা অংশকে বিভ্রান্ত করছে ভোটের স্বার্থে৷ এখন তার অন্য সেন্টিমেন্ট, বাঙালি হিন্দু–মুসলিম সেন্টিমেন্ট তোলা দরকার৷ ওখানে বিজেপি অসমীয়া ভোট পাওয়ার জন্য এই কাণ্ড করছে৷ আবার বলছে খসড়া তালিকা সংশোধন করা হবে৷ অর্থাৎ এই কথা বলে বাঙালি মুসলিম ও হিন্দুদের গলায় ছুরি ধরে বলবে, ‘বিজেপিকে ভোট দাও, টাকা দাও, নাম তুলে দেব’৷ সবটাই নির্বাচনের সাথে যুক্ত৷

এ একটা ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্র৷ হিটলার জার্মানি থেকে ইহুদি বিতাড়ন করেছিল৷ লক্ষ লক্ষ ইহুদিকে হত্যা করেছিল৷ জাতিবিদ্বেষ জাগিয়েছিল৷ বিজেপি এখানে সাম্প্রদায়িকতার আগুন জ্বালাচ্ছে৷ এটা এখানেই থামবে না৷ বিহার ওড়িশায়  আওয়াজ তোলাবে সেখান থেকে বাঙালি হটাও৷ মহারাষ্ট্রেও জিগির তোলাবে মারাঠী ছাড়া কেউ থাকবে না৷ সব রাজ্যেই জিগির তোলাবে অন্য রাজ্যের লোক হটাও৷ এমনিতেই রিজার্ভেশনের কোটা নিয়ে বাধানো বিরোধ চলছে৷ একটা ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গার পরিবেশ হবে, শুধু হিন্দু–মুসলিম নয়, এটাকে ভিত্তি করে উপজাতিগত দাঙ্গা, ভাষাগত দাঙ্গার আগুন গোটা দেশে তারা সৃষ্টি করতে চাইছে৷ বাংলাদেশ থেকে যারা আসছে– হিন্দু আসছে, গরিব মুসলমানও আসে৷ হিন্দু হলে ‘শরণার্থী’, মুসলিম হলে ‘অনুপ্রবেশকারী’– এইসব তকমা লাগাচ্ছে৷ এটাও বিজেপির দুরভিসন্ধিমূলক সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি৷ গরিব মানুষ নানা দেশে যায়৷ আমাদের ভারতের গরিবরাও আরবে যাচ্ছে৷ আমি বলি, বহু ভারতীয় এখন আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, গ্রেট ব্রিটেন, জার্মানি ইত্যাদি বহু দেশে নাগরিক হয়ে আছে৷ ওই সব দেশে যদি আওয়াজ ওঠে, ভারতীয়দের তাড়াও, ভারত সরকার মেনে নেবে? বিজেপি মেনে নেবে? আরবে যে সব ভারতীয় শ্রমিক কাজ করতে গিয়েছিল, সৌদি আরব বলছে, আমাদের দেশের শ্রমিকরা বেকার, অতএব ভারতীয়দের চলে যেতে হবে৷ এতে ভারত সরকার উদ্বেগ প্রকাশ করছে৷ ভারতের টেকনিশিয়ানরা আমেরিকায় কাজ করতে যায়৷ আমেরিকা বলছে, এইচ–ওয়ান বি ভিসা দেব না, ঢুকতে দেব না৷ ভারত প্রতিবাদ করছে৷

গরিব মানুষ এ দেশ থেকে ও দেশে যাবেই৷ মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এটা দেখতে হবে৷ বাংলাদেশে দাঙ্গা হচ্ছে? বাংলাদেশে ক’টা দাঙ্গা হচ্ছে বলুন৷ ক’জন হিন্দু হত্যা হচ্ছে বাংলাদেশে? দাঙ্গা তো হচ্ছে এ দেশে৷ প্রতিদিন দাঙ্গা হচ্ছে৷ গোহত্যার নাম করে মুসলমানদের হত্যা করা হচ্ছে৷

তাই বলছি, এটা একটা ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্র৷ এর একটা উদ্দেশ্য– শ্রমিক, কৃষক, মধ্যবিত্ত, ছাত্র, জনগণ যাতে ঐক্যবদ্ধভাবে সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দাবিতে, শিক্ষার দাবিতে, স্বাস্থ্যের দাবিতে, চাকরির দাবিতে, ছাঁটাই প্রতিরোধে, মূল্যবৃদ্ধি প্রতিরোধে আন্দোলন না করতে পারে৷ জনগণের ঐক্য ভেঙে দাও৷ ভ্রাতৃঘাতী বিদ্বেষের আগুন জ্বালাও৷ আরেকটা হচ্ছে ভোটব্যাঙ্ক তৈরি করা৷ এই হচ্ছে এইসব দলের রাজনীতি৷ আমরা এর বিরুদ্ধে৷ আমরা চাই এই পুঁজিবাদী শোষণের বিরুদ্ধে গোটা ভারতবর্ষের জনগণ জাতি–ধর্ম–বর্ণ নির্বিশেষে শ্রমিক–কৃষক–মধ্যবিত্ত-ছাত্র-যুবক-মহিলা সকলের গণতান্ত্রিক ঐক্য৷

প্রত্যেকবার ভোটের আগে এই দলগুলি যে পরিবর্তনের ধুয়া তোলে, বাস্তবে কি তাই হচ্ছে? যথার্থ পরিবর্তন কাকে বলে? প্রতিদিন জীবনের জ্বালা–যন্ত্রণায় আপনারা ভুগছেন– চাকরি নেই, যাদের চাকরি আছে ছাঁটাইয়ের খড়গ ঝুলছে, যাদের চাকরি জুটছে তারাও অস্থায়ী, যা মজুরি দেয় তাই মানতে হবে৷ এই হচ্ছে অবস্থা৷ গ্রাম থেকে কাতারে কাতারে ছেলেমেয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে৷ ভারতবর্ষের শহরে শহরে ঘুরছে৷ গ্রামীণ পারিবারিক জীবন ভেঙে যাচ্ছে৷ লক্ষ লক্ষ মাইগ্র্যান্ট লেবার কখনও এখানে কখনও সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে, যা হোক দু–চার পয়সা যদি জোটে৷ গোটা দেশের এরকম একটা অবস্থা৷ পৃথিবীর ১১৯টি ক্ষুধার্ত দেশের তালিকায় ভারতবর্ষ তলার দিক থেকে ১০০ নম্বরে আছে৷ এখানে প্রতিদিন অনাহারে ২৩ কোটি লোক থাকে, যা বিশ্বে সব থেকে বেশি৷ এটা হচ্ছে আন্তর্জাতিক সংস্থার সমীক্ষা৷ আমাদের দেশে শতকরা ৭৭ জন লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে আছে৷ এখানে প্রতিদিন অনাহারে মারা যায় ৭ হাজার লোক৷ প্রতি ঘন্টায় আত্মহত্যা করে ৫ জন কৃষক৷ প্রতিদিন ১২০ জন শ্রমিক আত্মহত্যা করে৷ ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরো বলছে ’১৪ থেকে ’১৬– এই দুই বছরে ৩৫ হাজার ৩০২ জন আত্মহত্যা করেছে৷ শিক্ষা স্বাস্থ্য পরিষেবা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে৷ কালো টাকা পাহাড় পরিমাণে বাড়ছে৷ দুর্নীতিতে দেশ ছেয়ে গিয়েছে৷ বিজেপি সরকারের রাফাল বিমান কেনার দুর্নীতি কংগ্রেসের রাজীব গান্ধীর বফর্স কেনার দুর্নীতিকেও ছাপিয়ে গেছে৷ কংগ্রেস এটাকেই ভোটে হাতিয়ার করছে৷ প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘না খাউঙ্গা, না খানে দুঙ্গা’! এখন তো দেখা যাচ্ছে, তিনি খেয়ে বসে আছেন৷ কংগ্রেস দেখাচ্ছে কে বেশি খেয়েছে, বফর্স না রাফাল! এই হচ্ছে দেশের উন্নয়ন! উন্নয়ন কি হয়নি? উন্নয়ন হয়েছে৷ ভারতবর্ষে গত এক বছরে ১ শতাংশ ধনকুবেরের সম্পদ বেড়েছে ২০.৯ লক্ষ কোটি টাকা, যা দেশের ২০১৭–’১৮ অর্থবর্ষের মোট বাজেটের সমান৷ ডিজেল–পেট্রলের দাম বাড়িয়ে এক বছরে পাবলিকের রক্ত চুষে ১০ লক্ষ কোটি টাকা সরকার আয় করেছে৷ঋণের দায়ে প্রতি বছর হাজার হাজার কৃষক শ্রমিক আত্মহত্যা করছে৷ অন্যদিকে পুঁজিপতিদের কয়েক লক্ষ কোটি টাকার ঋণ মকুব করেছে এই সরকার, লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করতে দিয়েছে৷

নির্বাচন মানে টাকার খেলা

আমাদের প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু মুকেশ আম্বানির ইউনিভার্সিটির নাম ঘোষণা হয়েছে দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইউনিভার্সিটি হিসাবে৷ অথচ এখনও জায়গা ঠিক হয়নি, বিল্ডিংও হয়নি, ক্লাস হওয়া তো দূরের কথা৷ তাকেই কেন্দ্রীয় সরকার ঘোষণা করেছে ‘উৎকর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়’৷ বিশ্বে এইরকম আজব ঘটনা কেউ দেখেনি৷ এই নিয়ে হইচই পড়ে গেছে৷ এই মুকেশ আম্বানির গত বছরে লাভ বেড়েছে ৬৬ শতাংশ৷ গৌতম আদানিরও আয় বেড়েছে ৬৬ শতাংশ৷ আর একজন গেরুয়া পরা ‘সর্বস্বত্যাগী’ সন্ন্যাসী শিল্পপতি হলেন বাবা রামদেব, তাঁর আয় বেড়েছে ১৭৩ শতাংশ৷ বিজেপির সভাপতি অমিত শাহর আয় বেড়েছে ৩০০ শতাংশ৷ অমিত শাহর ছেলের আয় বেড়েছে ১৬ হাজার শতাংশ৷ তা হলে কার উন্নয়ন হয়েছে? হয়েছে এ দেশের শিল্পপতিদের, পুঁজিপতিদের, যারা শাসক দলকে নির্বাচনে টাকা জোগায়৷ গতবার বিজেপিকে দিয়েছে৷ আবার একদল শিল্পপতি যারা বিজেপির শাসনে সুবিধা পায়নি, তারা কংগ্রেসকে টাকা জোগাবে৷ নির্বাচন মানেই তো এখন টাকার খেলা কোথায় ‘বাই দ্য পিপল, ফর দ্য পিপল, অফ দ্য পিপল’? এটা আজ শুধু পাঠ্যপুস্তকেই আছে৷ সকলেই জানে ভোটের ফল কে ঠিক করে৷ মানি পাওয়ার, মাসল পাওয়ার, মিডিয়া পাওয়ার, অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ পাওয়ার৷ শিল্পপতি, ব্যবসায়ীদের টাকা আর ক্রিমিনাল বাহিনী, খবরের কাগজ টিভির প্রচার এবং আমলারা– এরা মিলে ঠিক করে কে জিতবে, কে হারবে৷ প্রধান শক্তি হচ্ছে শিল্পপতি, ব্যবসায়ীরা৷ তারা এই ক্রিমিনাল বাহিনীকে কন্ট্রোল করে, টাকা জোগায়, তারাই খবরের কাগজ, টিভিকে চালায়, প্রশাসন যন্ত্র তাদের অঙ্গুলিহেলনে চলে৷ এই তো বুর্জোয়া গণতন্ত্রে ‘ফ্রি ফেয়ার ইলেকশন’ আগামী নির্বাচনেও দেখবেন, কোটি কোটি টাকার খেলা চলবে৷ আগেকার দিনে কংগ্রেস ভোট করতে গ্রামের জমিদার–জোতদারদে হাতে টাকা দিত, তারা মানুষকে ভোটের আগে কিছু চাল–ডাল দিত৷ এখন একেবারে ঘরে ঘরে টাকা পৌঁছে দেয়৷ সাধারণ গরিব ভোটারদের মানসিকতাও এমন করে দেওয়া হয়েছে যে তারা ভাবে, আর তো কিছু পাব না, এই ভোটের সময়ই যা কিছু টাকা পাই তাই যথেষ্ট৷ হাজার হাজার বেকার যুবক, ভোটের সময় তারা প্রচার করার, ডান্ডাবাজি করার, থ্রেট করার, ব্যালট বাক্স ভাঙার চাকরি পায়৷ তারাও হাজার হাজার টাকা রোজগার করে৷ এই দল, ওই দলের ঝান্ডা নিয়ে কাজ করে৷ সারা বছর লুটেপুটে খায় আর ভোটে এই কাজ করে৷ যেহেতু সরকারি দলের ব্যাকিং আছে, পুলিশ টুঁ শব্দও করে না৷ ‘ক্রিমিনালাইজেশন অফ পলিটিক্স’ নয়, বাস্তবে এই পলিটিশিয়ানরাই যুবকদের ক্রিমিনালাইজ করছে৷ এইসব করে ভোট চলে৷ এই তো বৃহত্তম দেশের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক নির্বাচন গত নির্বাচনে আপনারা দেখেছেন, বিজেপি নিয়ে কাগজে–টিভিতে কী হইচই হয়েছে– ভারতবর্ষের ‘আচ্ছে দিন’ আসছে এখন তো সকলেই দেখছেন কী রকম আচ্ছে দিন এসেছে৷ বিজেপি বলেছিল, এক মাসের মধ্যে কালো টাকা উদ্ধার করে প্রত্যেকের অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা করে পৌঁছে দেবে৷ আধ পয়সাও কেউ পায়নি, চার বছর হয়ে গেল৷ পুরোপুরি একটা ধাপ্পাবাজি৷ বলেছিল, এক মাসের মধ্যে জিনিসপত্রের দাম কমিয়ে দেব, সমস্ত দুর্নীতি বন্ধ করব৷ ভারতীয় শিল্পপতি–পুঁজিপতিদের ৭০ লক্ষ কোটি টাকা একমাত্র সুইস ব্যাঙ্কেই আছে৷ প্রতি মাসে সাত হাজার কোটি করে ওখানে কালো টাকা জমছে৷ নীরব মোদি, ললিত মোদি, মেহুল চোক্সি, বিজয় মালিয়া– এইসব ব্যবসায়ীরা কোটি কোটি টাকা লুঠ করে আজ বিদেশে পালিয়ে গেছে৷ এদের সাথে নরেন্দ্র মোদির দহরম মহরম আছে৷ নীরব মোদির সাথে তাঁর ছবি কাগজে বেরিয়েছে৷ মেহুল চোক্সিকে নরেন্দ্র মোদি সাদরে বলেছেন ‘মেহুল ভাই’, কাগজে বেরিয়েছে৷ তার সাফাই গাইতে গিয়ে মোদি বলেছেন, ‘তাতে কী হয়েছে? আমি সৎ এবং ভাল মন নিয়ে এদের সঙ্গে মিশি৷ আমার মনে কোনও দাগ পড়ে না৷’ তারপর অজুহাত দিয়েছেন, গান্ধীজিও তো বিড়লার সাথে মিশতেন৷ গান্ধীও গুজরাট থেকে এসেছেন৷ তিনিও গুজরাট থেকে এসেছেন৷ ফলে তিনি নব্য গান্ধী সেজেছেন৷ এত কিছুর পরেও তাঁর মনে কোনও দাগ কাটে না, কারণ তিনি হচ্ছেন কাশীর এমপি৷ কাশীধামের বিশুদ্ধ গঙ্গাজল দিয়ে তাঁর মন ধোয়া তুলসী পাতা ফলে তাঁর গায়ে দুর্নীতির কোনও দাগ নেই তিনি সব রকম পাঁকে ডুবতে পারেন, কিন্তু মন একেবারে পরিষ্কার, সাদা থাকে, এমন সৎ, চরিত্রবান এইসব বুজরুকি দেশের মানুষকে বোঝাচ্ছেন৷ কারণ মনে করেন, সবাই বোকা, টাকা আর প্রচারের জোরে দিনকে রাত করা যায়৷

ভোট যেন দুর্নীতির উৎসব

এখন ভোটকে একটা দুর্নীতির উৎসব বলা যায়৷ ১৯৬৭, ’৬৯ সালে যা হত, এখন তার থেকে শত সহস্র গুণ বেশি দুর্নীতি ভোটে হয়৷ পাড়ায় পাড়ায় যান– এক দল যুবক দিন গুনছে আবার কবে ভোট আসছে৷ এবার কত টাকা তারা কামাবে এই হিসাব কষছে৷ এই যুবকদের চরিত্র মনুষ্যত্ব নৈতিকতাকে ওরা ধ্বংস করেছে, এ–ও আরেকটা আক্রমণ৷ ওদের আত্মসম্ভ্রমবোধ নষ্ট করেছে, টাকার কেনা গোলাম বানিয়েছে৷ সাধারণ মানুষের মধ্যেও একটা অত্যন্ত উদ্বেগজনক জিনিস আমরা লক্ষ করছি৷ টাকা দিচ্ছে, ভোট দেব৷ কিছু টাকা তো দিচ্ছে৷ যে বেশি টাকা দেবে, তাকে বেশি ভোট দেব৷ এই যে এরা টাকা দিচ্ছে, তা কার টাকা? তাদের পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া টাকা? এই টাকা কোথা থেকে তারা দিচ্ছে? মানুষ একবারও ভাবে না এই টাকা হচ্ছে ব্যবসায়ীদের টাকা, পুঁজিপতিদের টাকা৷ যে পুঁজিপতিরা দু’বেলা শোষণ করে, জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে, শ্রমিক ছাঁটাই করে, শ্রমিকের রক্ত নিংড়ে, কৃষকের রক্ত নিংড়ে শোষণ করে কোটি কোটি টাকা আয় করছে৷ তারাই আবার এই দলগুলিকে টাকা দেয় নির্বাচনে জেতার জন্য৷ এটা তাদের ইনভেস্টমেন্ট৷ ব্যবসায় ইনভেস্টমেন্টের মতো ভোটে ইনভেস্টমেন্ট৷ এর পরিবর্তে তারা রিটার্ন পাবে৷ আরও টাকা লুটবে৷ জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে, নানা দুর্নীতির পথে শ্রমিক–কৃষক–জনগণকে ঠকিয়ে আরও টাকা কামাবে৷ যারা সরকারি গদিতে বসবে, তারা এদের গোলাম হয়ে কাজ করবে৷ অবশ্য তারাও সরকারি টাকা, যেটা পাবলিকেরই টাকা, সেখান থেকে লুটবে৷ কমরেড ঘোষ বলেছেন, রাজনৈতিক চেতনা না থাকার ফলেই জনগণ এই ফাঁদে পড়ে যায়৷ অভাবী ক্ষুধার্ত মানুষকে তারা এভাবে ভোটের সময় ভিক্ষা দিয়ে পরে সুদে–আসলে আদায় করে৷ মানুষ নিজের পায়ে নিজে কুড়ুল মারে৷ তৃণমূল শাসনে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামের দিকে যান, গৃহনির্মাণে কী ব্যাপক দুর্নীতি হচ্ছে৷ ধরুন একটা ঘরের জন্য বরাদ্দ এক লক্ষ ষাট হাজার টাকা৷ এক লক্ষ টাকা বাড়ির মালিককে দিয়ে ষাট হাজার টাকা পকেটে পুরে নেয়৷ যার প্রাপ্য টাকা সরকারি দলের এজেন্টরা মেরে দিচ্ছে, সেও মনে করছে ওদের তো দিতে হবে৷ স্কুলের মাস্টারি বা যে কোনও চাকরি পেতে হলে ৭–৮ লক্ষ টাকা এমনকী ১০–১৫ লক্ষ টাকা দক্ষিণা দিতে হয়, অনেকে আগাম আদায়ও করে৷ গরিব মানুষ জমি–জমা বিক্রি করে ধার–দেনা করে টাকা দিচ্ছে একটা চাকরির জন্য৷ ১০০ দিনের কাজেও নানা কারচুপি চলছে৷ ৫০–৬০ দিন কাজ করিয়ে ১০০ দিনের কাজ দেখিয়ে মজুরির টাকায় ম্যানেজাররা ভাগ বসায়৷ অভাব গ্রামের গরিবদেরও দুর্নীতিগ্রস্ত করছে৷ কলেজে ভর্তিতে পর্যন্ত তোলাবাজি চলছে সিপিএমের আমল থেকে৷ সিন্ডিকেটের রাজত্ব চলছে৷ প্রত্যেক দোকানদারকে, ব্যবসারদারকে তোলা দিতে হয়৷ ফুটপাতের হকারদেরও তোলা দিতে হয়৷ সরকারি দলকে তোলা দিতে হবে৷ সিপিএম আমলে শুরু হয়েছে, ‘পরিবর্তন’ ও ‘দুর্নীতি দমনের’ আওয়াজ তুলে তৃণমূলও তা চালিয়ে যাচ্ছে৷ এটাই অলিখিত নিয়ম৷ মুখ্যমন্ত্রী কন্যাশ্রী বিতরণ করছেন, ছাত্রীদের সাইকেল বিতরণ করছেন৷ খুব প্রচার চলছে, অথচ পশ্চিমবঙ্গ নারী পাচারে ভারতবর্ষে প্রথম স্থানে, নারী ধর্ষণে দ্বিতীয় স্থানে আছে৷ কারা পাচার করছে তা কি সরকার জানে না? সব হাঁড়ির খবর রাখে, কোন বাড়ির কে কাকে ভোট দেবে, কাকে টাকা দিতে হবে, কাকে থ্রেট করতে হবে– এ সব জানে, আর কারা লাখ লাখ মেয়ে পাচার করছে তার খোঁজ রাখে না? কারণ যারা পাচার করে তারা সিপিএম আমলে তাদের তহবিলে টাকা দিত, এখন তৃণমূলের আমলে তৃণমূলের তহবিলে টাকা দেয়৷ শিশুপাচার হচ্ছে, পাচারকারীরা টাকা দিচ্ছে৷ মদের নেশায় যুবকদের বুঁদ করে আজ্ঞাবহ করার জন্য আর রাজকোষ বৃদ্ধির জন্য সিপিএম এক হাজার মদের দোকান খুলেছিল, আর তৃণমূল আরও এক হাজার বাড়াচ্ছে৷ এটাও ওদের একটা জনকল্যাণ কর্মসূচি সিপিএমের পথেই পুলিশ–প্রশাসন থেকে শুরু করে শিক্ষায়তন পরিচালনা সর্বত্রই দলতন্ত্র কায়েম করেছে৷ যুবশ্রী, ক্লাবশ্রী ইত্যাদি নানা শ্রী বিতরণ করছে ভোটে নিজেদের শ্রীবৃদ্ধির জন্য৷ ‘সংখ্যালঘু দরদি’ সরকার সংখ্যালঘুদের জন্য কী করেছে? একমাত্র কিছু ভড়ং ছাড়া? সিপিএমও তাই করেছিল৷ আজও সংখ্যালঘুরা তুলনায় সবচেয়ে গরিব ও অশিক্ষিত৷ সাচার কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী যেখানে এ রাজ্যে ৩০ শতাংশ মানুষ সংখ্যালঘু সেখানে সরকারি চাকরিতে মাত্র ৬ শতাংশ সংখ্যালঘু৷ তার বিশেষ বৃদ্ধি এখনও হয়নি৷ বিজেপি চায় তৃণমূল সংখ্যালঘুদের প্রতি দরদ দেখাক, তা দেখিয়ে বিজেপির দিকে হিন্দু ভোট টানা যাবে৷ আর তৃণমূল চায় বিজেপি সংখ্যালঘু বিরোধী আওয়াজ তুলুক তাহলে তাদের ভোট তৃণমূল পুরোপুরি পাবে৷ গণতান্ত্রিক নির্বাচনের নামে এইসব ভণ্ডামি চলছে৷ ভোটে বারবার মার খেয়ে জনগণ প্রচারের হাওয়া দেখে ভাবে, এ বার একে পাল্টাই, ওকে আনি৷ এই যে কেন্দ্রে একবার কংগ্রেসকে ঠেকাতে হলে বিজেপিকে চাই, আবার এখন বিজেপিকে ঠেকাতে কংগ্রেসকে চাই, এ রাজ্যে কংগ্রেসকে ঠেকাতে হলে সিপিএমকে চাই, সিপিএমকে ঠেকাতে তৃণমূলকে চাই, আবার এখন একদল বলছে তৃণমূলকে ঠেকাতে হলে বিজেপিকে চাই৷ এই সব চিন্তা সর্বনাশা৷ এভাবে জনগণ বারবার ঠেকাচ্ছে, কিন্তু একবারও কি ভেবে দেখছে এভাবে বারবার ঠেকাতে গিয়ে নিজেরা কোথায় গিয়ে ঠেকছে শেষ পর্যন্ত নিজেদের পিঠ ঠেকাবার জন্য দেওয়ালও থাকবে না৷ রাজনীতি না বুঝলে, দল না চিনলে সংবাদ মাধ্যমের প্রচারের হাওয়ায় ভেসে বারবার এভাবেই ঠকতে হবে৷

কংগ্রেস কি সেক্যুলার ও গণতান্ত্রিক?

এই বাংলা একদিন ভারতবর্ষে বামপন্থার কেন্দ্রভূমি ছিল৷ কলকাতা শহর ব্রিটিশদের চোখের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল৷ নেহরু কলকাতাকে ‘দুঃস্বপ্নের নগরী’ বলতেন৷ ১৯৫২ সালের নির্বাচনে কলকাতায় ৩/৪টি বাদ দিয়ে সমস্ত সিটে বামপন্থী হিসাবে জিতেছিল সিপিআই৷ এই ছিল বাংলার ঐতিহ্য৷ একদিকে মহান স্ট্যালিন, মহান মাও সে তুং–কে ভিত্তি করে সমাজতন্ত্রের জয়যাত্রা বিশ্বব্যাপী চলছিল, আরেক দিকে বাংলায় ক্ষুদিরাম থেকে শুরু করে সুভাষচন্দ্র বসু পর্যন্ত স্বাধীনতা আন্দোলনের বিপ্লববাদী ধারা বা বামপন্থার ঐতিহ্য ছিল৷ এই দুইয়ের গৌরবকে প্রথমে সিপিআই পরবর্তীকালে সিপিএম আত্মসাৎ করে নিজেদের শক্তিবৃদ্ধি করেছিল৷ সেই সিপিআই ও পরে সিপিএম ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত গণআন্দোলনে ছিল৷ যদিও তারা কোনও দিনই মার্কসবাদী ছিল না৷ কিন্তু ১৯৬৭ সালে সরকারে বসার পর থেকে তাদের ভোল পাল্টাতে থাকে৷ গণআন্দোলনের পথ ছেড়ে নির্বাচনসর্বস্ব রাজনীতির দিকে, বুর্জোয়া শ্রেণিকে সন্তুষ্ট করে গদি লাভের দিকে ঝুঁকতে থাকে৷ সেই সিপিএমের ৩৪ বছরের রাজত্ব আপনারা দেখেছেন৷ কীভাবে ব্যারাকপুরে শ্রমিকদের হত্যা করেছে৷  খিদিরপুর বন্দরে শ্রমিকদের হত্যা করেছে, নদীয়ার কৃষকদের হত্যা করেছে,  নন্দীগ্রামে গণহত্যা, গণধর্ষণ করেছে, সিঙ্গুরে কীভাবে অত্যাচার চালিয়েছে৷ সবই সরকারি ক্ষমতায় থাকার স্বার্থে পুঁজিপতিশ্রেণিকে সন্তুষ্ট করার জন্য৷ সেই সিপিএম–সিপিআই আজ কংগ্রেসের গায়ে ‘সেক্যুলার’ আর ‘ডেমোক্রেটিক’ তকমা লাগিয়ে ঐক্য করার দিকে যাচ্ছে৷ কংগ্রেস কি সেক্যুলার? সেক্যুলার হিউম্যানিজম, সেক্যুলারিজম কথার বাংলা অর্থ হচ্ছে পার্থিব মানবতাবাদ৷ এই পার্থিব মানবতাবাদ ইতিহাসে এসেছিল ইউরোপের নবজাগরণের যুগে৷ তখন শাসন ব্যবস্থা ছিল ধর্মভিত্তিক রাজতন্ত্র৷ ধর্মের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে ধর্মীয় চিন্তার বিরুদ্ধে, ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল সেই যুগের নবজাগ্রত বুর্জোয়া শ্রেণি এবং ভূমিদাসরা শিল্পবিপ্লবের প্রয়োজনে৷ সেইসময় এসেছিল ধর্মীয় প্রভাবমুক্ত মানবতাবাদ৷ মানুষের পরিচয় ধর্ম দিয়ে নয়, জাত–বর্ণ দিয়ে নয়, নারী পুরুষ এই দিয়ে নয়৷ মানুষের পরিচয় মনুষ্যত্ব দিয়ে৷ এ দেশে কংগ্রেস কোনও দিন এর চর্চা করেনি৷ কংগ্রেস ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের চর্চা করেছে৷ এটা সেক্যুলারিজম নয়৷ এই সম্পর্কে পরে আরও বলব৷ আর এখন তো রাহুল গান্ধী আর নরেন্দ্র মোদি ভোটের আগে দৌড় দিচ্ছে কে আগে কোন মন্দিরে ধরনা দেবে৷ কংগ্রেস এমনই সেক্যুলার বিজেপি যেমন বারবার দাঙ্গার আগুন জ্বালাচ্ছে, কংগ্রেসও তো এই ক্ষেত্রে পিছিয়ে ছিল না৷ রাউরকেল্লায়,  ভাগলপুরে,  নেলিতে,  দিল্লিতে তারাই তো দাঙ্গা বাধিয়েছিল৷ যে কংগ্রেস ইমারজেন্সি জারি করেছে, টাডা, মিসা, ডিস্টার্ব এরিয়া অ্যাক্ট, আফস্পা চালু করেছে, তাকেই ওরা গণতান্ত্রিক বানাচ্ছে৷

গান্ধীজি ও বিড়লার সম্পর্ক

এখন গান্ধীজির সাথে বিড়লার সম্পর্ক নিয়ে কথা উঠেছে৷ সেই প্রসঙ্গে কিছু বলতে চাই৷ এ কথা ঠিক, বিড়লার সাথে, শিল্পপতিদের সাথে গান্ধীজির সম্পর্ক ছিল৷ কিন্তু গান্ধীজি এখনকার নেতাদের মতো অসৎ, সুবিধাবাদী ছিলেন না৷ কমরেড শিবদাস ঘোষ বলেছিলেন, তিনি সৎ ছিলেন৷ কিন্তু তাঁর চিন্তা ছিল ভ্রান্ত৷ সমাজ যে শ্রেণিবিভক্ত, বুর্জোয়া এবং শ্রমিক এই দুই শ্রেণিতে বিভক্ত, সমাজে যে কোনও ব্যক্তির চিন্তা এমনকী তাঁর অজ্ঞাতসারে হলেও যে একটা বিশেষ শ্রেণির চিন্তা– গান্ধীজি এ সত্য অস্বীকার করেছিলেন৷ গান্ধীজি সত্যানুসন্ধানের হাতিয়ার হিসাবে বিজ্ঞানকে গ্রহণ করেননি৷ ধর্মীয় চিন্তাকে গ্রহণ করেছিলেন৷ এটাই বিড়লারা চেয়েছিল৷ বিড়লাদেরও প্রয়োজন ছিল দেশে ধর্মীয় চিন্তা থাকুক৷ ধর্মান্ধতা থাকুক৷ বিড়লারা চেয়েছিল, ইংরেজরা চলে যাক, তার পরিবর্তে বিড়লা, টাটা এইসব ভারতীয় শিল্পপতিদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিরা দেশের শাসন ক্ষমতায় বসুক, যাতে তারা নিজেদের শোষণের সাম্রাজ্য পাকাপোক্ত করতে পারে৷ যেটা এখন তারা করেছে৷ গান্ধীজিকে সামনে রেখে তারা এই লক্ষ্য পূরণ করার ষড়যন্ত্র করেছিল৷ আর গান্ধীজি মনে করতেন আমি সৎ, আমি ধার্মিক৷ গান্ধীজি নিজে এমন পর্যন্ত বলেছিলেন, ‘আমি যা বলছি সেটা ভগবানের বাণী৷ মাঝরাতে আমি ভগবানের কণ্ঠস্বর শুনতে পাই৷ এবং সেটাই আমি লিখি৷ যদি গোটা বিশ্ব আমার বিরুদ্ধে বলে, তাহলেও আমি বলব আমি যা বলছি তা ভগবানের বাণী৷’ আর এই গান্ধীজিই বলেছেন, ‘ভগবান মালিক–শ্রমিক সৃষ্টি করেছে৷ উভয়ের সম্পর্ক হবে বন্ধুত্বের সম্পর্ক৷ আমি মালিকদের হৃদয় পরিবর্তন করব যাতে মালিকরা তাদের এই হতভাগ্য শ্রমিকদের জন্য দয়া প্রদর্শন করে৷ মালিকরা তাদের ন্যায়সঙ্গত, যুক্তিসঙ্গত প্রয়োজনটুকু নিয়ে বাকিটা ট্রাস্টি হিসাবে রাখবে জনগণের জন্য৷’ এই ভ্রান্ত চিন্তার দ্বারা গান্ধীজি পরিচালিত হয়েছিলেন৷ যেজন্য শরৎচন্দ্র বলেছিলেন, ‘গান্ধীজিকে ঘিরে রয়েছে বণিকরা৷ তাঁর আসল ভয় বিপ্লবকে, সমাজতন্ত্রকে৷’ শরৎচন্দ্র এ কথাও বলেছিলেন, ‘যাঁদের হওয়ার কথা ছিল সন্ন্যাসী, তাঁরা হলেন দেশের নেতা৷ এইজন্যই ভারতবর্ষের পলিটিক্সের এত দুর্গতি৷ সুভাষচন্দ্র বলেছিলেন, ‘শিল্পপতি, জমিদার, জোতদার এরা দেশপ্রেমিকতা দাবি করছে৷ কারণ তারা দাবি করছে তারা গান্ধীবাদী৷’ এই গান্ধীজি সেইযুগে ধর্মীয় চিন্তাকে সামনে রেখে স্বাধীনতা আন্দোলনে হাজির হয়েছিলেন৷ বুর্জোয়া শ্রেণি চেয়েছিল ধর্মান্ধতা থাকুক, যুক্তি, বিজ্ঞানধর্মী চিন্তা, তর্ক করা, প্রশ্ন করার মানসিকতা যেন না থাকে৷ কেন আমি গরিব, কেন আমি বেকার, কেন আমি ছাঁটাই হচ্ছি– এ সবের উত্তর হিসাবে অদৃষ্ট দায়ী, পূর্বজন্মের কপাল দায়ী, ভগবানের বিধান, বিধির বিধান দায়ী– এই চিন্তা থাকলে পুঁজিবাদের আর কোনও ভয় নেই৷ এইজন্যই তাদের ধর্মীয় চিন্তা দরকার৷ অথচ অনেকেই জানে না নবজাগরণের পথপ্রদর্শক রাজা রামমোহন রায় বলেছিলেন, ‘সংস্কৃত শিক্ষা নয়, বেদান্ত শিক্ষা নয়, সংস্কৃত শিক্ষা ভারতবর্ষকে ২০০০ বছর অন্ধকারের দিকে নিয়ে গেছে৷ বেদান্ত বলে, বিশ্বে বাস্তব জগত বলে কিছু নেই৷ এর থেকে আধুনিক যুবকরা কিছু পাবে না৷ ফলে চাই ইউরোপ থেকে বৈজ্ঞানিক চিন্তা, চাই যুক্তি, চাই অঙ্কশাস্ত্র, চাই পাশ্চাত্য দর্শন৷’ এরই পথ বেয়ে আসেন বিদ্যাসাগর, যাঁর পায়ের তলায় সে যুগের সকলেই মাথা নিচু করেছিলেন, তিনি সমস্ত ধর্মীয় শাস্ত্র পড়ে ‘পণ্ডিত’ উপাধি পেয়েছিলেন৷ ২২ বছর বয়সে ইংরেজি শেখেন, তারপর পাশ্চাত্য জ্ঞানবিজ্ঞানের সংস্পর্শে আসেন৷ তিনি বললেন, বেদান্ত সাংখ্য মিথ্যা, ভ্রান্ত৷ এর মধ্যে কোনও সত্য নেই৷ ফলে ইউরোপ থেকে এমন দর্শন পড়ানো হোক যাতে আমাদের দেশের ছেলেরা বুঝতে পারে বেদান্ত সাংখ্য মিথ্যা৷ তিনি বলেছেন, যেখানে যেখানে ইউরোপের জ্ঞানের আলো পৌঁছাচ্ছে সেখানে ভারতীয় ধর্মীয় শাস্ত্রের প্রভাব কমছে৷ ফলে এর প্রচার চাই, প্রসার চাই৷ বিদ্যাসাগর ভগবান মানতেন না৷ ঈশ্বর মানতেন না৷ কোনও দিন পূজা করেননি৷ বিদ্যাসাগরের বাড়ি এসেছিলেন রামকৃষ্ণ, শ্রদ্ধা জানানোর জন্য৷ রামকৃষ্ণ জানতেন বিদ্যাসাগর ভগবান,পূজা বিশ্বাস করেন না৷ অনুরোধ করেছিলেন দক্ষিণেশ্বরের কালীবাড়ি যেতে৷ বিদ্যাসাগর যাননি৷ এই হচ্ছে বিদ্যাসাগরের চরিত্র৷ নবজাগরণের চরিত্র৷ রবীন্দ্রনাথ ঈশ্বরবিশ্বাসী হয়েও বলেছিলেন, যে দেশে ধর্মের মিলনে মানুষকে মেলানোর চেষ্টা হয় সে দেশের সর্বনাশ হয়৷ শরৎচন্দ্র বলেছিলেন, ‘সমস্ত ধর্মই মিথ্যা৷ আদিম যুগের কুসংস্কার৷ বিশ্বমানবতার এতবড় শত্রু আর নাই৷’ বলেছেন, ‘বেদ মানুষের সৃষ্টি৷ তাতেও মিথ্যার অভাব নেই৷’ আরও বলেছেন, ‘ভারতবর্ষে জন্মেছি বলেই ভারতীয় ঐতিহ্য বহন করতে হবে? গেলই বা বিশেষত্ব হারিয়ে৷ ভারতীয় বলে চেনা যাবে না এই তো ভয়? বিশ্বের মানবজাতির একজন বলে তো চেনা যাবে৷ তার গৌরবই বা কম কী?’ বলেছেন, আদর্শের কথা যখন বলবে তখন হিন্দুর আদর্শ, ভারতীয় আদর্শ, এশিয়ার আদর্শ এইসব নয়, বিশ্বমানবতার আদর্শের কথা বল৷ এই ছিল নবজাগরণের পার্থিব মানবতাবাদের কন্ঠস্বর৷ সুভাষচন্দ্র বলেছিলেন, ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস৷ রাজনীতির সঙ্গে ধর্মের কোনও সম্পর্ক থাকবে না৷ রাজনীতি পরিচালিত হবে বৈজ্ঞানিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক যুক্তি দ্বারা৷ নজরুলের বক্তব্যও তাই৷ আরও অনেকে সেইসময় এইসব বক্তব্য রেখেছিলেন৷ গান্ধীজিকে সামনে রেখে সেদিন জাতীয় বুর্জোয়ারা এই সেক্যুলার মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে স্বাধীনতা আন্দোলনে গ্রহণ করতে দেয়নি৷ তার ফলে ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার দূর করা যায়নি৷ সমাজ বিপ্লব ঘটেনি৷ এরই পরিণতিতে দেশে আজও প্রাদেশিকতা, জাতিভেদ, বর্ণভেদ, ভাষাগত আঞ্চলিকতার বিরোধ, ধর্মীয় ভেদাভেদের বিদ্বেষের আগুন জ্বলছে, নারীমুক্তিও ঘটেনি৷

বিবেকানন্দ না আর এস এস–প্রকৃত হিন্দু কে?

এরই সুযোগ নিয়ে আরএসএস–বিজেপি মাথা তুলেছে৷ তারা ভারতীয় হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্যের ধ্বনি তুলছে৷ রামমোহন বিদ্যাসাগরের ঐতিহাসিক বক্তব্যের বিপরীতে সংস্কৃত শিক্ষা, বেদ–বেদান্ত শিক্ষার কর্মসূচি এনেছে বিজ্ঞানভিত্তিক যুক্তিবাদী মননকে ধ্বংস করার জন্য, যেটা ফ্যাসিবাদের কর্মসূচি৷

বিজেপি, আর এস এস কি হিন্দু ধর্মকে অনুসরণ করছে? বিবেকানন্দ হিন্দুধর্মের শেষ সৎ প্রতিনিধি৷ বিবেকানন্দের চিন্তার সাথে আমাদের পার্থক্য আছে৷ আমি সেটা এখানে আলোচনা করছি না৷ বিবেকানন্দ বলেছিলেন, আমরা সব ধর্মকে সম্মান করি৷ আমি চাই হিন্দু ইসলাম খ্রিস্টান সব ধর্ম মিলে এক ধর্ম হোক৷ এই বিবেকানন্দ বলেছিলেন, আমার একটা ছেলে থাকলে তাকে এক পংক্তির মন্ত্র শেখাতাম, বড় হয়ে সে ঠিক করত সে বুদ্ধ না যিশু না মহম্মদের শিষ্য হবে৷ তারপর বলছেন, এটা খুবই স্বাভাবিক এবং নির্বিরোধে আমার ছেলে খ্রিস্টান, আমার স্ত্রী বৌদ্ধ এবং আমি নিজে মুসলমান হতে পারি৷ এই বিবেকানন্দের সাথে নাগপুরের আরএসএসের কোনও মিল আছে? এই বিবেকানন্দ বলেছিলেন, আমি কৃষ্ণকে যেমন সম্মান করি, হজরত মহম্মদকেও তেমন সম্মান করি৷ রামকৃষ্ণ মসজিদে নামাজ পড়েছিলেন, গির্জায় প্রার্থনা করেছিলেন৷ তিনি বলেছিলেন, আমরা বলি জল, ওরা বলে পানি আর খ্রিস্টানরা বলে ওয়াটার৷ এই তো হিন্দু মুসলমান আর খ্রিস্টান ধর্মের পার্থক্য৷

এর আগেও আমরা বলেছিলাম, চৈতন্য রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ কি কাপুরুষ ছিলেন? ওঁরা তো জানতেন বাবরি মসজিদ আছে৷ তাঁরা কি বাবরি মসজিদ ভাঙার স্লোগান তুলেছিলেন? বিজেপি স্রেফ ভোটের জন্য একটা ঐতিহাসিক স্থাপত্যকে ধ্বংস করল৷ যেমন করে তালিবানরা বামিয়ানে বুদ্ধের মূর্তি ধ্বংস করেছে৷ যদি চৈতন্য–রামকৃষ্ণ হিন্দু হন তা হলে আরএসএস–বিজেপি নেতারা কেউ হিন্দু নয়৷ বাল্মিকী রামায়ণে কি আছে– রামের জন্মভূমি ধ্বংস করে বাবরি মসজিদ তৈরি হয়েছিল? কৃত্তিবাসী রামায়ণে আছে? তুলসীদাসের রামায়ণে আছে? পশ্চিমবাংলার মানুষকে এ কথা ভাবতে হবে৷

সুভাষচন্দ্র ও গোলওয়ালকর

সুভাষচন্দ্র বলেছেন, ‘‘… হিন্দুরা ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠ বলিয়া ‘হিন্দুরাজ’–এর ধ্বনি শোনা যায়৷ এগুলি সর্বৈব অলস চিন্তা৷ … এক শ্রেণির স্বার্থান্বেষী লোক ক্ষুদ্র ব্যক্তিগত স্বার্থলোভে (হিন্দু–মুসলিম) উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে কলহ ও মনোমালিন্য সৃষ্ট করিয়া বেড়াইতেছে– স্বাধীনতা সংগ্রামে এ শ্রেণির লোককেও শত্রু গণ্য করা প্রয়োজন’’ (রচনাবলি, ২য় খণ্ড)৷ তিনি ১৯৪০ সালে ঝাড়গ্রামে আরও বলেছেন, ‘‘…সন্ন্যাসী ও সন্ন্যাসিনীদের ত্রিশূল হাতে হিন্দু মহাসভা ভোট ভিক্ষায় পাঠাইয়াছে৷ …  ধর্মের সুযোগ নিয়া ধর্মকে কলুষিত করিয়া হিন্দু মহাসভা রাজনীতির ক্ষেত্রে দেখা দিয়াছে’’ (১৪ মে, আনন্দবাজার পত্রিকা)৷ আর বিজেপির পথপ্রদর্শক গুরু গোলওয়ালকর ফ্যাসিস্ট হিটলারের ইহুদি বিতাড়ন ও নির্যাতনের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেছিলেন, ‘‘হিন্দুস্থানের সমস্ত অ–হিন্দু মানুষ হয় হিন্দু ভাষা ও সংস্কৃতি গ্রহণ করবে, হিন্দু ধর্মকে শ্রদ্ধা করবে ও পবিত্র বলে জ্ঞান করবে, হিন্দু জাতির গৌরব–গাথা ভিন্ন অন্য কোনও ধারণাকে প্রশ্রয় দেবে না৷ … না হলে সম্পূর্ণ ভাবে হিন্দু জাতির এই দেশে তারা থাকবে অধীনস্থ হয়ে, কোনও দাবি–সুবিধা ছাড়া৷ এমনকি নাগরিক অধিকারও তাদের থাকবে না৷ (উই অর আওয়ার নেশনহুড ডিফাইন্ড)৷ এ দেশের সাধারণ মানুষকে, পশ্চিমবঙ্গের জনগণ ও যুব সম্প্রদায়কে ঠিক করতে হবে কে সঠিক, সুভাষচন্দ্র না গোলওয়ালকর? তাঁরা কাকে মানবেন? বিজেপি এত  মুসলিম বিদ্বেষের আগুন ছড়াচ্ছে, দাঙ্গা বাধাচ্ছে, সংখ্যালঘু ও দলিত হত্যা করাচ্ছে সেটা আরএসএসের এই শিক্ষা অনুযায়ী৷ হিন্দু রাজত্ব মানে সেখানে শুধু মুসলিমরাই নয়, দলিতরাও উচ্চবর্ণের অধীন হয়ে থাকবে৷ আপনারা কি জানেন, বিজেপির গার্জিয়ান আরএসএস ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের সম্পূর্ণ বিরোধী ছিল এবং স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ ও ‘বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যা দিয়েছিল৷ এটা যে আমাদের বানানো অভিযোগ নয় তা তাদের গুরু গোলওয়ালকরের কথা শুনেই বুঝুন৷ তিনি বলেছেন, ‘‘ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদ এবং সর্বজনীন বিপদের তত্ত্ব থেকে আমাদের জাতিত্বের ধারণা তৈরি হয়েছে৷ এর ফলে আমাদের প্রকৃত হিন্দুজাতিত্বের সদর্থক অনুপ্রেরণা থেকে আমরা বঞ্চিত হয়েছি৷ … ব্রিটিশ বিরোধিতার সঙ্গে দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদকে সমার্থক করে দেখা হয়েছে৷ আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম, তার নেতৃবৃন্দ এবং সাধারণ মানুষের ওপরে এই প্রতিক্রিয়াশীল মতের প্রভাব সর্বনাশা হয়েছে৷ … তারাই একমাত্র জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেমিক, যারা তাদের অন্তরে হিন্দু জাতির গৌরব পোষণ করে এবং সেই লক্ষ্য পূরণে কাজ করে৷ বাকি যারা দেশপ্রেম জাহির করে হিন্দুজাতির স্বার্থহানি করছে তারা বিশ্বাসঘাতক ও দেশের শত্রু’’ (ওই)৷ গোলওয়ালকরের এই বিচারে দেশবন্ধু, লালা লাজপত, তিলক, বিপিন পাল এবং অন্য দিকে সুভাষচন্দ্র, ভগৎ সিং, ক্ষুদিরাম, চন্দ্রশেখর আজাদ, সূর্য সেন, বিনয়–বাদল–দীনেশ, আসফাকুল্লা খান, প্রীতিলতা ও অন্যেরা সকলেই ‘প্রতিক্রিয়াশীল’, ‘বিশ্বাসঘাতক’ ও ‘দেশের শত্রু’ ছিলেন৷ কারণ তাঁরা কেউই হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য লড়েননি, ঐক্যবদ্ধ ভারতকেই স্বাধীন করার জন্য লড়েছিলেন৷ আরএসএসের এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য কি এ দেশের মানুষ, বাংলার জনগণ ও যুব সম্প্রদায় মেনে নিয়ে আর এস এস এবং বিজেপির ঝান্ডা বহন করবে?

অন্য দিকে রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও বুর্জোয়ারা সশস্ত্র বিপ্লবের বিরোধিতা করেছে গান্ধীজিকে সামনে রেখে৷ সেদিন এ দেশের মানুষ ক্ষুদিরাম, ভগৎ সিং, সুভাষচন্দ্রের বিপ্লববাদকে বুঝতে পারেনি, বিচার করতে পারেনি, ধরতে পারেনি কেন ভগৎ সিং, ক্ষুদিরামকে গান্ধীবাদীরা শ্রদ্ধা করেনি, কেন গান্ধীবাদীরা সুভাষচন্দ্রকে কংগ্রেসের সভাপতি পদ ত্যাগ করতে বাধ্য করেছিল এবং শেষ পর্যন্ত কংগ্রেস থেকে বিতাড়ন করেছিল, এই সব বিষয় এ দেশের মানুষ জানত না৷ কারণ সাম্রাজ্যবাদ–পুঁজিবাদ পরিচালিত খবরের কাগজ এইসব খবর দেয়নি৷ কেন গান্ধীজি বলেছিলেন, সশস্ত্র বিপ্লবের পথে আমি স্বাধীনতা চাই না৷ কার স্বার্থে এই বক্তব্য? এই কণ্ঠস্বর বিড়লা–টাটার কণ্ঠস্বর৷ বিপ্লব হলে শ্রমিক–কৃষকের অভ্যুত্থান ঘটবে৷ পুঁজিপতিরা ক্ষমতায় আসতে পারবে না৷ ফলে বিপ্লব নয়, অহিংসা, ইংরেজের সাথে আপস, দর কষাকষি হোক, আরেকদিকে ধর্মীয় চিন্তা, অধ্যাত্মবাদ গাইড করবে৷ এই ছিল গান্ধীবাদী স্বদেশি আন্দোলন৷ এর সুযোগ নিয়ে  ইংরেজরা মুসলিম মাতব্বরদের বোঝালো, গান্ধীজি তো একজন হিন্দু সন্ন্যাসী৷ এখানে মুসলিমদের ভবিষ্যৎ কী? এইভাবে পাকিস্তানের দাবি তোলালো৷

দেশভাগের পটভূমি

আপনাদের সামনে আমি দেশভাগের ব্যাকগ্রাউন্ড বলতে চাই৷ তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মহান স্ট্যালিনের নেতৃত্বে লালফৌজের কাছে হিটলার পরাজয়ের মুখে৷ পূর্ব ইউরোপ মুক্ত হতে চলেছে৷ লালফৌজ জাপানের সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল৷ এইরকম জোয়ার চলছে৷ এখানে ’৪২–এর আগস্টে সশস্ত্র অভ্যুত্থান ঘটেছিল৷ সুভাষচন্দ্রের আজাদ হিন্দ বাহিনীর লড়াই চলছে৷ সে খবর এদেশে এসে গিয়েছে৷ গোটা দেশে সশস্ত্র লড়াইয়ের আবেগ প্রবলভাবে মাথা তুলেছে৷ গান্ধীবাদীরা তখন কোণঠাসা৷ ১৯৪৫ সালে বোম্বাইয়ে নৌসেনারা বিদ্রোহ করল৷ ভারতবর্ষে সশস্ত্র অভ্যুত্থান হওয়ার মতো অবস্থা৷ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় পুঁজিবাদের প্রবল আতঙ্ক, দেশে বিপ্লব হয়ে যেতে পারে৷ সেই সময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ষড়যন্ত্র করে ১৯৪৬ সালে হিন্দু–মুসলিম দাঙ্গা বাধালো এবং নেহেরু প্যাটেল গান্ধীজিকে চাপ দিয়ে দেশভাগ মানালো৷ গান্ধীজি দেশভাগ চাননি৷ যে গান্ধীজি আগাগোড়া সুভাষচন্দ্রের বিরোধিতা করেছিলেন, শেষজীবনে দুঃখ করে তিনি বলেছেন, সুভাষচন্দ্র থাকলে দেশভাগ হত না৷ একটা দেশ তিনভাগ হয়ে গেল৷ আগেই বলেছি, গান্ধীজির চিন্তা ভ্রান্ত ছিল, তিনি সৎ মানুষ ছিলেন৷ বুর্জোয়া দৃষ্টিভঙ্গি, বুর্জোয়া শ্রেণির স্বার্থ অজ্ঞাতসারে তাঁর মনকে প্রভাবিত করেছিল৷ তাতে দেশের অনেক ক্ষতি হয়েছে, এতে কোনও সন্দেহ নেই৷ কিন্তু যে কথা আমি বলতে চাই, এটা ঘটতে পারল কেন? আগাগোড়া স্বাধীনতা আন্দোলনে সিপিআইয়ের (যার অংশ সিপিএম) ভূমিকা ছিল কলঙ্কজনক৷ তারা সুভাষচন্দ্রের বিরোধিতা করে গান্ধীজিকে সমর্থন করেছিল৷ ’৪২–এর আগস্ট অভ্যুত্থানের বিরোধিতা করে ব্রিটিশকে সমর্থন করেছিল, সুভাষচন্দ্রকে জাপানের দালাল ঘোষণা করেছিল৷ দেশভাগকে শুধু মুসলিম লিগ, হিন্দু মহাসভা, কংগ্রেসই নয়, সিপিআইও সমর্থন করেছিল৷ এগুলি কি নেহাতই ভুল ছিল? ভারতের জাতীয় পুঁজিবাদ যেখানে একচেটিয়া পুঁজির জন্ম দিয়ে, মাল্টিন্যাশনালের জন্ম দিয়ে সাম্রাজ্যবাদী স্তরে উপনীত হয়েছে, বিদেশে পুঁজি রপ্তানি করছে, দক্ষিণ এশিয়ায় আধিপত্য বিস্তার করছে, সেখানে আজও সিপিআই ও সিপিএম সাম্রাজ্যবাদ–সামন্ততন্ত্র বিরোধী জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের তত্ত্ব আওড়ে কর্মীদের বিভ্রান্ত করছে৷ এটাও কি নেহাতই ভুল? এগুলি সবই তো তাদের অমার্কসবাদী সোস্যাল ডেমোক্রেটিক চরিত্রের বৈশিষ্ট্য৷ এই রাজনীতিই আজ তাদের নামাতে নামাতে এখানে এনে ফেলেছে, যাতে যে কোনও বুর্জোয়া দলের হাত ধরে তাদের দাঁড়াতে হয়৷

স্বাধীনতা আন্দোলনে আম্বানি–আদানি এদের তো কোনও নামই ছিল না৷ টাটা–বিড়লা পরিবারের কে প্রাণ দিয়েছিল? কে জেলে গিয়েছিল? প্রাণ দিয়েছিল সাধারণ ঘরের ছেলেমেয়েরা৷ শত শত ছেলেমেয়ে জেলে গিয়েছে, গুলিতে প্রাণ দিয়েছে, কেরিয়ার ছেড়েছে৷ তা সত্ত্বেও দেশের এই পরিণতি হল কেন? এই স্বাধীনতাই কি ক্ষুদিরাম চেয়েছিলেন? ভগৎ সিং চেয়েছিলেন? প্রীতিলতা–সূর্য সেন–আসফাকউল্লা খান–চন্দ্রশেখর আজাদরা চেয়েছিলেন? বাঘা যতীন চেয়েছিল? এইরকম স্বাধীন দেশ চেয়েছিলেন? এই পরিণতি হল কেন? তার একটা কারণ, জাতীয় আন্দোলনের বুর্জোয়া নেতারাও চেয়েছিলেন মানুষ অজ্ঞ থাকুক৷ অন্ধ থাকুক, মূর্খ থাকুক৷ আমাদেরকে মানুক৷ আর সাধারণ মানুষের মধ্যেও এর প্রভাব ছিল৷ নেতারা যা হোক ঠিক করুক৷ আমরা আদার ব্যাপারী হয়ে জাহাজের খবর নিয়ে কী করব?

জনগণ বারবার ঠকছে কেন?

এই যে অন্ধ থাকা, অজ্ঞ থাকা আর কাগজের দিকে, টিভির দিকে তাকিয়ে দল ঠিক করা, এতেই সর্বনাশ হচ্ছে৷ জনগণ বলে, নেতারা ঠকায়৷ ধরুন আমরাও ঠকাবো৷ কিন্তু আমরা চাইলেও ঠকাতে পারব কেন? জনগণ ঠকছে কেন? ঠকছে এইজন্য যে, তারা মাথা খাটাবে না, বিচার করবে না৷ যে যায় লঙ্কায়, সেই হয় রাবণ– এই প্রবচন মিথ্যা৷ রাম–সীতা–লক্ষণ, হনুমান কেউই রাবণ হয়নি৷ সীতার সর্বনাশ হল রাবণকে চিনতে পারেনি বলে৷ রাবণ এসেছিল সন্ন্যাসী সেজে৷ এখনকার নেতারাও দেশসেবক সেজে আসে৷ তা হলে, দল চিনতে হবে, রাজনীতি বুঝতে হবে৷ এখন দেখবেন, এইসব দলের নেতারা বিরাট বিরাট সমাবেশ করবে৷ ছবি বেরোবে, চোখের জল ফেলবে৷ দেশের জন্য তাদের ঘুম হচ্ছে না৷ এতদিন ধরে তারা দেশসেবা করেছে৷ দেশসেবা করে করে আপনাদের একেবারে স্বর্গের দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে৷ এবার পুরোপুরি স্বর্গে পৌঁছে দেবে৷ এইসব ভড়ং আপনাদের বুঝতে হবে৷ এইজন্য কমরেড শিবদাস ঘোষ বারবার বলেছেন, জনগণের রাজনৈতিক চেতনা চাই৷ শ্রেণি দৃষ্টিভঙ্গি চাই৷ ‘জনগণ’, ‘দেশ’ এইসব কথার কোনও মানে নেই৷ দেশ বিভক্ত– ধনী–গরিব, মালিক–শ্রমিক, শোষক–শোষিতে বিভক্ত৷ রাজনীতি এবং দলও তাই৷ হয় মালিকের দল, না হলে শ্রমিকের দল৷ হয় শোষকের দল, না হয় শোষিত জনগণের দল৷ হয় ধনীর দল, না হয় গরিবের দল৷ হয় ভোট সর্বস্ব–গদি সর্বস্ব দল না হয় গণআন্দোলন ও শ্রেণি সংগ্রামী বিপ্লবী দল৷ দেশের স্বার্থ, জনগণের স্বার্থ– এসব লোকভোলানো মিথ্যা কথা৷ তুমি পুঁজিবাদের পক্ষে না শ্রমিকের পক্ষে? তুমি শোষকের পক্ষে না শোষিতের পক্ষে? এইভাবেই বিচার করতে হবে৷ এই হচ্ছে মার্কসবাদের শিক্ষা৷ এই দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে বিচার করতে হবে৷

আজ ভারতবর্ষের, গোটা বিশ্বের অত্যন্ত দুর্দিন (প্রবল বৃষ্টির জন্য কমরেড প্রভাস ঘোষ এইসময় ভাষণ চালিয়ে যাবেন কি না জানতে চান, উপস্থিত শ্রোতারা সবাই হ্যাঁ বলেন)৷ সোভিয়েত, চিনের সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়ের পর একটা প্রচার এ দেশের বুদ্ধিভ্রষ্ট বুদ্ধিজীবী বা মতলববাজরা করছেন যে, ব্যক্তিগত মালিকানাভিত্তিক পুঁজিবাদই একমাত্র পথ৷ সমাজতান্ত্রিক মালিকানার দ্বারা সমস্যার সমাধান হয় না, এ কথা প্রমাণ হয়ে গেছে৷ মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য এরকম একটা প্রচার করা হচ্ছে৷ আমি এখানে বলতে চাই, যে কোনও সমাজের জন্ম আছে, বিকাশ আছে, ক্ষয় আছে আবার তার পরিবর্তনও আছে৷ ইতিহাসের দিকে তাকান৷ সুদূর অতীতে আদিম সমাজ, যেখানে ব্যক্তিগত মালিকানা, সম্পত্তি কিছু ছিল না৷ সেই সমাজটাই পাল্টে এল দাস–দাসপ্রভু, দাসপ্রথা৷ কয়েক হাজার বছর ছিল৷ এই সমাজ পাল্টে এল রাজা–প্রজা সম্পর্ক, সামন্তপ্রভু–ভূমিদাস সম্পর্ক৷ কয়েক হাজার বছর ছিল৷ এর পরে এল বুর্জোয়া প্রজাতন্ত্র– ব্যক্তিগত মালিকানার যুগ৷ ইউরোপে প্রথম তার সূচনা৷ ভূমিদাসদের সংগঠিত করে সে যুগের সদ্য জন্ম নেওয়া যে বুর্জোয়া শ্রেণি, তার কৈশোর–যৌবনে এই ব্যক্তিগত মালিকানা ছিল প্রগতিশীল৷ কারণ এই ব্যক্তিগত মালিকানাকে ভিত্তি করেই শিল্পবিপ্লব এসেছিল৷ ব্যক্তিগত মালিকানাকে ভিত্তি করেই কুটির শিল্পের পরিবর্তে বড় বড় শিল্প উৎপাদন গড়ে ওঠা, পণ্য উৎপাদন বৃদ্ধি– এসব এসেছিল সমাজ বিকাশের প্রয়োজনে৷ আগে ভূমিদাসরা জমিদারের হুকুম ছাড়া বেরোতে পারত না, তাদের স্বাধীন শ্রমিকে পরিণত করা, ব্যক্তির স্বাধীনতা, চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা, আন্দোলনের স্বাধীনতা– এইসব এসেছিল৷ এই শিল্পবিপ্লবকে ভিত্তি করেই ধর্মকে ফাইট করতে হয়েছিল৷ কারণ ধর্মকে ফাইট না করলে, তৎকালীন অন্ধবিশ্বাস– রাজা ভগবানের প্রতিনিধি, এই ধারণা থেকে মুক্ত করতে না পারলে রাজতন্ত্রকে উচ্ছেদ করা যাবে না৷ এই প্রয়োজনে এল বৈজ্ঞানিক চিন্তা, যুক্তিবাদী মনন৷ এই সময় উঠেছিল সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতার স্লোগান৷ কিছুটা অগ্রগতির পর আবার পরবর্তীকালে ইতিহাসের নিয়মে সেই ব্যক্তিগত মালিকানাই অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সংকট ডেকে আনল৷ প্রশ্ন উঠল, সমাজে সম্পদ সৃষ্টি করছে কারা? বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদ রিকার্ডো দেখালেন, সম্পদের স্রষ্টা মানুষের শ্রম৷ মার্কস বললেন, শ্রম যদি সম্পদের স্রষ্টা হয় তবে শ্রমিক সেই সম্পদের মালিক হবে না কেন? শ্রমজীবী মানুষ কেন দারিদ্রে নিমজ্জিত থাকবে? পুঁজিপতির পুঁজি কোথা থেকে এল? পুঁজিরও স্রষ্টা হচ্ছে শ্রমিক, পুঁজিপতি নয়৷ টাকা এসেছে সম্পদ বা পণ্যের বিনিময়ের মাধ্যম হিসাবে৷ এছাড়া টাকার অন্য কোনও মূল্য নেই৷ মার্কস অঙ্ক কষে দেখালেন, পুঁজিপতিরা যে লাভ করে, যাকে সারপ্লাস ভ্যালু বলা হয় তা আসছে আনপেড সারপ্লাস লেবার থেকে৷ পুঁজিপতিরা শ্রমিককে যে পরিমাণ শ্রমের মূল্য হিসাবে মজুরি দেয় তার থেকে বেশি সময় খাটায়৷ যে সময়ের মজুরি দিচ্ছে তার থেকে অতিরিক্ত সময় খাটিয়ে সেই অংশটায় যে মূল্য সৃষ্টি হচ্ছে, তা লাভ হিসাবে আত্মসাৎ করে মালিক৷ মার্কসের এই তত্ত্বকে আজও কোনও বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদ চ্যালেঞ্জ করতে পারেনি৷

ব্যক্তিমালিকানার পুঁজিবাদই সাম্রাজ্যবাদের জন্ম দিয়েছে

পুঁজিবাদ অগ্রগতির পথেই ক্ষুদ্রপুঁজি থেকে বৃহৎপুঁজির, বৃহৎপুঁজি থেকে একচেটিয়া পুঁজির জন্ম দিল৷ ছোট, মাঝারি পুঁজিকে গ্রাস করেই হয় একচেটিয়া পুঁজি৷ লেনিন বললেন, একচেটিয়া পুঁজিবাদের যুগ হল পুঁজিবাদের ক্ষয়ের যুগ, জরাগ্রস্ত পুঁজিবাদের যুগ৷ আজকের বিশ্বের দিকে তাকিয়ে দেখুন, পুঁজিবাদের একচেটিয়া মালিকানায় গোটা বিশ্বের অবস্থা কী? অক্সফ্যাম ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্ট বলছে, ১ শতাংশ ধনী বিশ্বের ৮২ শতাংশ সম্পদের মালিক৷ গোটা বিশ্বে এখন লোকসংখ্যা যদি হয় সাড়ে ছ’শো কোটি তবে তিনশো কোটি লোকের দৈনিক রোজগার ১৬৫ টাকা, আর একশো কোটি লোকের দৈনিক আয় ৮২ টাকা৷ সাড়ে ছশো কোটি লোকের মধ্যে চারশো কোটি লোকের এই অবস্থা৷ এই নিয়ে পুঁজিবাদী বাজার৷ এদের ক্রয়ক্ষমতা কোথায় ফলে বাজার সংকুচিত হবেই, আর সংকুচিত বাজারের দখল নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী–পুজিপতিদের মধ্যে কাড়াকাড়ি–মারামারি চলবেই৷ এই বাজার সংকটে মার খেয়ে ছোট–মাঝারি এমনকী অপেক্ষাকৃত বড় শিল্পপতিও ধ্বংস হচ্ছে৷ বিভিন্ন পুঁজিবাদী শিল্প অপরকে কিনে নিচ্ছে, অন্যের সাথে মার্জার ঘটাচ্ছে৷ একদিনের জাতীয় পুঁজিবাদ জাতীয় গণ্ডি ত্যাগ করে বহুজাতিকে পরিণত হয়েছে, দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে অন্য দেশ লোটার জন্য ছুটছে৷ এদের কাছে মুনাফার স্বার্থ ছাড়া ‘জাতীয়’ বা ‘দেশের স্বার্থ’ বলে কিছু নেই৷

এই বাজার অর্থনীতির সংকট কী? খবরের কাগজ পড়লে দেখবেন, সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়ের পর আমেরিকা বলল, এক মেরু বিশ্ব, আমেরিকাই দুনিয়ার সর্বোচ্চ কর্তৃত্বে আছে৷  এরপর আমেরিকা গ্লোবালাইজেশন নিয়ে এল অন্যান্য দেশের শুল্কের প্রাচীর, বাণিজ্যের প্রাচীর ভেঙে সেই দেশগুলির বাজার গ্রাস করার জন্য৷ আজ সেই আমেরিকাই বলছে, গ্লোবালাইজেশনের ফলে আমার বাজার অন্যেরা গ্রাস করে নিচ্ছে৷ এখন বলছে, গ্লোবালাইজেশন চাই না, আমেরিকা ফর আমেরিকানস৷ আমেরিকান ছেলেদের চাকরি নেই, লক্ষ লক্ষ আমেরিকান বেকার৷ সমাজতন্ত্র ধ্বংস করে পুঁজিবাদী–সাম্রাজ্যবাদী চীন আজ প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ অন্যদিকে সাম্রাজ্যবাদী ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, জাপান, রাশিয়ার সাথে বাজারের দ্বন্দ্ব তো আছেই৷ এই ক’বছর আগে আমেরিকা জুড়ে বিরাট আন্দোলন হল৷ সাত মাস ধরে লক্ষ লক্ষ যুবক–যুবতী অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট মুভমেন্ট করল৷ ওয়াল স্ট্রিট হচ্ছে মার্কিন পুঁজিপতিদের আখড়া৷ স্লোগান তুলল, ডাউন উইথ ক্যাপিটালিজম–ইম্পিরিয়ালিজম৷ গ্লোবালাইজেশন ধ্বংস হোক৷ মার্কিন পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের চোখের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল৷ ফলে আমেরিকা এখন বলছে, আমার দেশে অন্য দেশের পণ্য আমদানি আমি আটকাব৷ আমার দেশে শিল্প মরছে, বেকারি বাড়ছে, ছাঁটাই বাড়ছে৷ মেক্সিকোর বর্ডার আটকে দিয়ে শরণার্থীদের অমানবিক ভাবে বন্দি করে রাখছে৷ যাতে মেক্সিকোর গরিব মানুষ ঢুকতে না পারে – আমেরিকায় তারা ঢুকছে কাজের জন্য৷

ব্যক্তি মালিকানাধীন পুঁজিবাদই তো এই সংকট সৃষ্টি করেছে৷ বাজার অর্থনীতিই তো বাজার সংকট সৃষ্টি করেছে৷ ব্যক্তি মালিকানাধীন পুঁজিবাদই তো সাম্রাজ্যবাদের জন্ম দিয়েছে৷ ভারতকে লুণ্ঠন করেছে কে? সাম্রাজ্যবাদ৷ এশিয়া–আফ্রিকাকে লুন্ঠন করেছে কে? সাম্রাজ্যবাদ৷ সেই সাম্রাজ্যবাদ এসেছে কোথা থেকে? ব্যক্তিগত মালিকানাধীন পুঁজিবাদ থেকেই তো সমাজতন্ত্র কি কোনও দেশ দখল করেছে? লুন্ঠন করেছে? প্রথম বিশ্বযুদ্ধ কে বাধিয়েছিল? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগুন কে জ্বালিয়েছিল?  ইটালিতে, জার্মানিতে ফ্যাসিবাদের জন্ম দিয়েছিল কে? ব্যক্তিগত মালিকানাধীন পুঁজিবাদ৷ সমাজতন্ত্রের সাথে এই পুঁজিবাদের তুলনা চলে?

আজ যে বিশ্বে কোটি কোটি বেকার, কোটি কোটি ছাঁটাই শ্রমিক– কে সৃষ্টি করল? ব্যক্তিগত মালিকানাধীন পুঁজিবাদ নয়? ইরাককে, লিবিয়াকে ধ্বংস করল কে? আফগানিস্তানকে ধ্বংস করল কে? সিরিয়াতে যুদ্ধের আগুন জ্বালালো কে? ব্যক্তিগত মালিকানাধীন সাম্রাজ্যবাদ–পুঁজিবাদ নয়? এসব কে অস্বীকার করতে পারে!

কোথায় আজ সাম্য–মৈত্রী–স্বাধীনতা– যে স্লোগান তারা একদিন তুলেছিল? একদল ফুটপাতে থাকে, আর একদল আকাশচুম্বী প্রাসাদে বাস করে– সাম্য চলে? চটকলের শ্রমিক আর মালিকের সাম্য চলে? টাটার মালিক আর শ্রমিকে সাম্য চলে– যেখানে এমন দুস্তর অর্থনৈতিক বৈষম্য? কোথায় মৈত্রী? দেশে দেশে যুদ্ধবিগ্রহ, জাতিতে জাতিতে যুদ্ধ, বর্ণবিদ্বেষের আগুন তো পুঁজিবাদই জ্বালাচ্ছে৷ গোটা বিশ্বে উগ্র জাতীয়তাবাদ, জাতিবিদ্বেষ, বর্ণবিদ্বেষ, ধর্মবিদ্বেষ– এই হচ্ছে তোমাদের মৈত্রী স্বাধীনতা কোথায়? স্বাধীনতা হচ্ছে, পুঁজিপতিদের অবাধ শোষণ–লুন্ঠনের স্বাধীনতা৷ আর শ্রমিক শ্রেণি, গরিব মানুষ প্রতিবাদ করলে, তাকে লাঠি–গুলি চালিয়ে দমন করার স্বাধীনতা৷ এই হচ্ছে ব্যক্তিগত মালিকানাধীন পুঁজিবাদসৃষ্ট সাম্য–মৈত্রী–স্বাধীনতার আজকের পরিণতি৷

মনুষ্যত্বের সংকট সর্বব্যাপী

গোটা বিশ্বের দিকে তাকিয়ে দেখুন, সর্বত্র মনুষ্যত্বের সংকট৷ আমেরিকায় এর আগে এক প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে লাম্পট্যের অভিযোগ ছিল৷ এখনকার প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধেও একাধিক লাম্পট্যের অভিযোগ৷ এই হচ্ছে একচেটিয়া পুঁজির সর্বোচ্চ রাষ্ট্রের নায়কের চরিত্র৷ আমেরিকায় ব্যাপক নারীধর্ষণ চলে৷ তারপর দেখুন, হঠাৎ হঠাৎ স্কুলে ঢুকে গুলি চালিয়ে দিচ্ছে, রাস্তায় গুলি চালিয়ে মানুষ হত্যা করছে৷ এইসব বন্দুকবাজ যুবকরা মানসিক ভাবে অসুস্থ৷ কিন্তু বন্দুকের লাইসেন্স অবাধ৷ কেন? কারণ, বন্দুক ব্যবসায়ীরা ভোটে ট্রাম্পকে টাকা দিয়েছে৷

বিশ্বের উষ্ণায়ন হচ্ছে৷ ফসিল ফুয়েল থেকে, পেট্রোলিয়াম জ্বালানি থেকে হচ্ছে৷ বিজ্ঞানীরা বারবার ওয়ার্নিং দিচ্ছে– ওজোন লেয়ার ধ্বংস হচ্ছে, উত্তাপ বাড়ছে, মেরু অঞ্চলের বরফ গলে গিয়ে সমুদ্রে জল বাড়ছে৷ এমন ভাবে জল বাড়ছে, বঙ্গোপসাগর সহ বিভিন্ন সমুদ্র এগিয়ে আসছে একটু একটু করে স্থলভূমিকে গ্রাস করে৷ একচেটিয়া পুঁজিবাদী মালিকানার ফল এটা৷ কিন্তু আমেরিকা এতে কর্ণপাত করছে না৷ কারণ পেট্রোলিয়াম ব্যবসায়ীরাও ট্রাম্পকে ভোটে টাকা দিয়েছে৷ সব দেশেই তাই৷ এ দেশেও তাই৷ পুঁজিপতি–ব্যবসায়ীদের স্বার্থ দেখে এইসব দলগুলো আর টাকা নেয়৷ নিজেরাও টাকা কামায়৷ এ দেশে এমপি, এমএলএ প্রত্যেকের কোটি কোটি টাকা ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স– এ দেশে, বিদেশে তো আছেই৷ এরাই জনগণের সেবক!

আর একটা ভয়ঙ্কর আক্রমণ নামিয়ে আনছে পুঁজিবাদ৷ যে পুঁজিবাদ এক সময় মানবতাবাদের আহ্বান নিয়ে এসেছিল সে আজ মনুষ্যত্বকে ধ্বংস করে ফ্যাসিবাদের জন্ম দিচ্ছে৷ মানুষের সভ্যতার সৃষ্টি হয়েছিল বর্বর যুগ অতিক্রম করে যখন সমাজে ন্যায়নীতিবোধ, বিবেক, মূল্যবোধ এসেছিল৷ এই নিয়ে মনুষ্যত্ব, বিবেক দংশন– আমি এই কাজ করতে পারি না, আমি এটা ভাবতে পারি না, এটা অমানুষের কাজ৷ আমি তো হাজার হোক মানুষ৷ আমি না খেয়ে মরতে পারি তবু অমানুষের মতো আচরণ করতে পারি না৷ এ সব বোধগুলি একদিন ছিল, আজ সেগুলি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে৷

এই যে ব্যাপক নারীধর্ষণ হচ্ছে, হত্যা হচ্ছে, কেন হচ্ছে? এমনি এমনি হচ্ছে? শাসক শ্রেণি যুবকদের বিপথে ঠেলে দিয়েছে৷ তা হলে মনুষ্যত্ব মাথা তুলে দাঁড়াবে না৷ প্রতিবাদ, প্রতিরোধ হবে না৷ তাই মদ খাও, নোংরামি কর, ফুর্তি কর৷ এইসব ছেলেরাই তো মেয়েদের দেখলে টিটকিরি দেয়, হাত ধরে টানে, অন্ধকারে টেনে নিয়ে যায়৷ ছ’মাসের বাচ্চা মেয়েকে পর্যন্ত ধর্ষণ করছে৷ পশু জগতেও এ জিনিস পাবেন না৷ বিবেক মনুষ্যত্ব থাকলে এই সব জিনিস হয়? খালি টাকা কামাও– ছিনতাই করে হোক, তোলা তুলে হোক, সিন্ডিকেট করে হোক, গলা টিপে মেরে হোক৷ এমনকী বাবা–মা’র গলা টিপে মেরে সম্পত্তি দখল করে নিচ্ছে সন্তান৷ বাবা–মাকে রাস্তায় ফেলে দিচ্ছে৷ মাতৃত্ব–পিতৃত্ব ধূলায় লুন্ঠিত৷ স্বামী–স্ত্রীর জীবন সন্দেহ–বিশ্বাসে বিষাক্ত৷ দাম্পত্য জীবনে শান্তি নেই৷ মনুষ্যত্ব থাকলে বিবেক থাকলে তো শান্তি থাকবে৷ প্রেম–প্রীতি–ভালবাস সব নষ্ট করে দিয়েছে৷ মনুষ্যদেহী মনুষ্যত্ববোধহীন এদের কে সৃষ্টি করেছে? ব্যক্তিমালিকানাধীন এই পুঁজিবাদই সৃষ্টি করেছে৷ গোটা বিশ্বেই আজ এই সংকট৷ শেক্সপিয়ারের সেই ইউরোপ নেই, মিল্টনের ইউরোপ নেই, বার্কলের ইউরোপ নেই, বেকন স্পিনোজা লক হবস কান্ট ফুয়েরবাক এঁদের ইউরোপ নেই৷ এমনকি রমাঁ রলাঁ আইনস্টাইন বার্নার্ড শ রাসেলদের সেই ইউরোপও নেই৷ আমাদের দেশেও রামমোহন থেকে শুরু করে বিদ্যাসাগর–বিবেকানন্দ-রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্র-নজরুল-সুভাষচন্দ্র-চিত্তরঞ্জন দাশ– এই সব নাম তো মুছে গেছে৷ চর্চার মধ্যেই নেই৷ একমাত্র আমরা গুরুত্ব দিয়ে এঁদের চর্চা করে যাচ্ছি৷ গত ২৯ জুলাই মহান বিদ্যাসাগরের মৃত্যুদিবস চলে গেল, আগামী ১১ আগস্ট ক্ষুদিরামের ফাঁসির দিন আসছে৷ আমরা উদযাপন করছি৷ এঁদের নিয়ে এইসব দলের কোনও মাথাব্যথা আছে? বিজেপির সাথে তৃণমূল প্রতিযোগিতায় নেমেছে রামনবমী, হনুমান জয়ন্তী নিয়ে৷ সব ভোটের দিকে তাকিয়ে৷ সিপিএম–ও এইসব মনীষীদের নিয়ে কোনও চর্চাই করে না৷

বরেণ্য মনীষীরা সোভিয়েত সমাজতন্ত্রকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন

অন্য দিকে দেখুন, ব্যক্তিগত মালিকানাধীন পুঁজিবাদকে উচ্ছেদ করে সামাজিক মালিকানাধীন যে সমাজতন্ত্র ভূমিষ্ঠ হয়েছিল রাশিয়ার মতো একটি অনুন্নত দেশে, সেই সমাজতন্ত্রই ঘোষণা করেছিল বেকার বলে কিছু থাকবে না, ছাঁটাই বলে কিছু থাকবে না৷ সেখানে ৭০ বছর ধরে বেকার ছিল না, ছাঁটাই ছিল না৷ সেই সমাজতান্ত্রিক দেশে ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষার সুযোগ, প্রত্যেকের বিনা পয়সায় চিকিৎসার সুযোগ চালু হয়েছিল৷ গ্রামে শহরে অসংখ্য হাসপাতাল–ডাক্তার–নার্স, স্কুল–কলেজ–শিক্ষক ছিল৷ বিনা পয়সায় বিদ্যুৎ দিত, জল দিত, জ্বালানি দিত, অল্প পয়সায় বাড়ি ও খাদ্য দিত সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া৷ আট ঘন্টার জায়গায় সাত ঘন্টা, তারপর ছয় ঘন্টার কাজের দিকে যাচ্ছিল৷ তারপর ঘোষণা করছিল পাঁচ ঘন্টার দিকে যাবে৷ বাকি সময় শ্রমিক–কৃষক–সাধারণ মানুষ লেখাপড়া করবে, গানবাজনা করবে, নাটক করবে, সিনেমা দেখবে৷ অসংখ্য লাইব্রেরি, নাট্যশালা, সিনেমা হল করে দিয়েছিল শহরে–গ্রামে৷ বছরে ১৫ দিন শ্রমিকদের সবেতন ছুটি ছিল৷ ছুটিতে সমুদ্রের তীরে, পাহাড়ের কোলে স্বাস্থ্যনিবাসে থাকত তারা৷ সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া নারী–পুরুষ বৈষম্য দূর করেছিল৷ নারী এবং পুরুষ শ্রমিকদের সমান বেতন ছিল৷ মেয়েরা সন্তান হলে দু’বছর সবেতন ছুটি পেতেন৷ তারপর কাজে এলে সন্তানদের ক্রেশে রাখার ব্যবস্থা ছিল৷ সরকার খাদ্য দিত শিশুদের, পোশাক দিত৷ ভিক্ষাবৃত্তি, নারীদেহ বিক্রি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল৷ সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া সমস্ত ছাত্র–যুবকদের বিনা পয়সায় খেলার ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করেছিল৷ যার জন্য অলিম্পিকে শীর্ষ স্থানে পৌঁছে গিয়েছিল৷ সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার ডাক্তার–শিক্ষক–অধ্যাপক-সাহিত্যিক-শিল্পী-বৈজ্ঞানিক সকলের জীবন–জীবিকার সমস্ত দায়িত্ব নিয়েছিল সরকার৷

বিজ্ঞানে সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া বিশ্বে শীর্ষ স্থান দখল করেছিল৷ অনেকে নোবেল প্রাইজ পর্যন্ত পেয়েছিলেন৷ সমাজতান্ত্রিক রাশিয়াই প্রথম মহাকাশে মানুষ পাঠিয়েছিল৷ সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ায় চাষি শ্রমিক (বুদ্ধিজীবীরাও শ্রমিক) ছাড়া কেউ ভোট দিতে পারত না, ভোটে দাঁড়াতেও পারত না৷ নির্বাচিত প্রার্থী কাজের রিপোর্ট দিত, সন্তোষজনক না হলে ভোটাররা তাদের ফিরিয়ে নিতে পারত৷ সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ায় আদালতে কোনও ব্যয় কাউকে দিতে হত না৷ আদালতের ব্যয় সরকার বহন করত৷ এসব দেখেই রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘তীর্থস্থান দেখে এসেছি’৷ রবীন্দ্রনাথ কবি অমিয় চক্রবর্তীকে লিখেছেন, ‘মানবের নব যুগের তপোবন সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া৷ আশা এবং আনন্দ খুঁজে পেয়েছি, ইতিহাসে এর আগে কোথাও এমন খুঁজে পাইনি৷’ আর একটা মূল্যবান কথা বলেছিলেন, ‘মানবসভ্যতার বুকের পাঁজর থেকে শক্তিশেলের মতো যে লোভ, তাকে তুলে ফেলার চেষ্টা করছে৷ আশা করি এরা সফল হবে’৷ রবীন্দ্রনাথ মার্কসবাদী ছিলেন না৷ কিন্তু সোভিয়েত সমাজতন্ত্রকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন৷ রমাঁ রলাঁ, আর এক জন বরেণ্য চিন্তাবিদ সে যুগের৷ তিনি বলেছিলেন, সোভিয়েত সমাজতন্ত্র যদি ধ্বংস হয়, সোভিয়েতের শ্রমিক শ্রেণি শুধু ক্রীতদাস হবে না, মানবসভ্যতা কয়েক যুগ অন্ধকারে নেমে যাবে৷ বার্নার্ড শ বলেছেন, গণতন্ত্র আর স্বাধীনতা যদি পেতে চাও সোভিয়েত রাশিয়ায় যাও, যেখানে স্ট্যালিন আছেন৷ সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্কে সুভাষ বোসের উক্তি কী? বলেছিলেন, ‘বিংশ শতাব্দীর অবদান  সোভিয়েত সমাজতন্ত্র, সোভিয়েত শ্রমিক শ্রেণির রাষ্ট্র এবং সর্বহারা সংস্কৃতি’৷ বিপ্লবী বারীন ঘোষকে সুভাষ বোস লিখেছেন, ‘আমাদেরও লক্ষ্য সমাজতন্ত্র, পরে কমিউনিজম’৷ ভগৎ সিং–ও ফাঁসিতে যাওয়ার আগে সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজমকে লক্ষ্য হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন৷ এইসব বরেণ্য মনীষী ও বিপ্লবীরা কী দেখে সমাজতন্ত্রকে এভাবে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন, আজকের ব্যক্তিপুঁজির পূজারি বুদ্ধিজীবীরা কি ভেবে দেখবেন? সোভিয়েত সমাজতন্ত্র দেখে এত দূর উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন সেদিনের বড় মানুষরা৷ কিন্তু হল বিপর্যয়– যা দুঃখজনক৷

আবার এই বিপর্যয় যে ঘটতে পারে তা মার্কস বলে গেছেন, লেনিন–স্ট্যালিন–মাও সে তুং–শিবদাস ঘোষ সকলেই বলেছেন৷ কারণ একটা দেশে বিপ্লব হলেই দেশের সব মানুষ মার্কসবাদী হয়ে যায় না, কমিউনিস্ট হয় না৷ মানুষের মধ্যে পুরনো সমাজের সংস্কার, প্রবৃত্তি, মানসিকতা থেকে যায়৷ যেমন কোন সুদূর অতীতে মাতৃশাসিত সমাজ পাল্টে পুরুষশাসিত সমাজ এসেছে, কিন্তু গণতন্ত্রের স্লোগান, নারীর অধিকার এসব সত্ত্বেও পুরুষতান্ত্রিক কর্তৃত্ব যায়নি৷ আমাদের দেশের কয়েক হাজার বছরের পুরনো বর্ণবিদ্বেষের অবসান আজও হয়নি, সতীদাহ প্রথার আকর্ষণ কমেনি, হিন্দুদের মধ্যে বিধবাবিবাহ সম্মানজনক ভাবে চালু হয়নি৷ এইসব সংস্কার রক্ত–মাংস–মজ্জায় মিশে থাকে৷ কোটি কোটি মানুষ বিপ্লবকে সমর্থন করেছে৷ সমাজতন্ত্রকে সমর্থন করেছে৷ কমিউনিজমের প্রতি আবেগ ছিল৷ আবেগ এক জিনিস, চিন্তা–ভাবনা, রুচিতে সংস্কৃতিতে মার্কসবাদকে গ্রহণ করা ভিন্ন জিনিস৷ এবং এটাই কমরেড শিবদাস ঘোষ ১৯৪৮ সালে বুঝেছিলেন৷ তিনি বলেছিলেন, ব্যক্তিগত মালিকানাভিত্তিক ব্যক্তিবাদ ফরাসি বিপ্লবের যুগে প্রগতিশীল ছিল৷ তখন তা মানুষকে চরিত্র দিয়েছে, ব্যক্তিত্ব দিয়েছে৷ ব্যক্তিগত মালিকানা প্রতিক্রিয়াশীল হওয়ার পর ব্যক্তিবাদও প্রতিক্রিয়াশীল৷ তা ব্যক্তিকে আত্মসর্বস্ব ও সামাজিক দায়দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত করেছে৷ যে জন্য আমাদের পার্টি গঠনের শুরুতে তিনি বলেছিলেন, আমাদের পার্টি–নেতাদের শুধু ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছাড়লে হবে না, চিন্তা–ভাবনা–আচার–আচরণে, স্বামী–স্ত্রী সম্পর্কে, সন্তান সম্পর্কে, জীবনের সমস্ত প্রশ্নে ব্যক্তিবাদের প্রভাব থেকে মুক্ত হতে হবে৷ রাশিয়া, চীনে যখন বিপ্লব হয়, তখনও রাশিয়ায় ব্যক্তিবাদ প্রগতিশীল ছিল৷ চীনে ব্যক্তিবাদ প্রগতিশীল ছিল৷ কারণ রাশিয়ায় পুঁজিবাদ শক্তিশালী হয়নি৷ চীনে সবে পুঁজিবাদের জন্ম হচ্ছে মাত্র৷ ফলে বিপ্লবের স্বার্থ মুখ্য, ব্যক্তির স্বার্থ গৌণ–  চরিত্রের এই মান দিয়ে সেখানে বিপ্লবের কাজ হয়েছে৷ আমাদের স্বদেশি আন্দোলনের সময় যেমন ছিল– সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে৷ এইসব কথায় কাজ দিত৷ এটা দেখিয়েই কমরেড শিবদাস ঘোষ বললেন, যতক্ষণ বিপ্লবের লড়াই হচ্ছে, যতক্ষণ সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির পুনর্গঠন হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত বিপ্লবের স্বার্থ মুখ্য, ব্যক্তির স্বার্থ গৌণ– এটা প্রগতিশীল ভূমিকা পালন করেছে৷ কিন্তু সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা শক্তিশালী হওয়ার পর, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পুঁজিবাদ অনেকটা নির্মূল হওয়ার পরও উপরিকাঠামোতে, সংস্কৃতি জগতে, ভাবের জগতে ব্যক্তিগত মালিকানাবোধ থেকে যায়৷ এই ব্যক্তিগত মালিকানাবোধ সমাজতান্ত্রিক ব্যক্তিবাদের জন্ম দিয়েছে৷ যতক্ষণ মহান স্ট্যালিন বেঁচেছিলেন এই সমাজতান্ত্রিক ব্যক্তিবাদ মাথা তুলতে পারেনি৷ শক্তি সঞ্চয় করছিল৷ স্ট্যালিন মৃত্যুর আগে ১৯৫২ সালে এই বিপদ বুঝেছিলেন, তাঁর শেষ ভাষণে তা বোঝা যায়৷ কিন্তু এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য তিনি বেঁচে ছিলেন না৷ মহান মাও সে–তুং শেষ জীবনে এই বিপদ বুঝে লড়াই করলেন৷ তখন তিনি বৃদ্ধ, অসুস্থ৷ এই অসুস্থ মানুষই স্লোগান তুলেছিলেন– ‘বম্বার্ড দি হেডকোয়ার্টার’৷ এক সময়ে যারা তাঁর সাথী ছিল, লিউ শাও চি, লিন পিয়াও, তেং শিয়াও পিং– এরাই পুঁজিবাদের দিকে এগোচ্ছে৷ মহান সাংস্কৃতিক বিপ্লবের আহ্বান জানালেন পুঁজিবাদী আক্রমণকে রোখবার জন্য৷ কিন্তু পারেননি৷ কারণ মৃত্যু এসে তাঁর প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করল৷ ফলে সমাজতন্ত্রের অভ্যন্তরে পরাজিত পুঁজিবাদ ও বাইরের সাম্রাজ্যবাদ–পুঁজিবাদের ষড়যন্ত্রে সমাজতন্ত্র ধ্বংস হল৷ কিন্তু এটাই শেষ কথা নয়৷

এর থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে৷ এটা তো প্রমাণিত, একমাত্র সমাজতন্ত্রই নতুন মুক্তির আলো দিতে পারে৷ দিয়েছে৷ সমাজতন্ত্রে কেন সংকট এল, তা বুঝে আগামী দিনে পুঁজিবাদবিরোধী বিপ্লব যারা করবে, তারা সতর্ক থেকেই সমাজতন্ত্র গড়ে তুলবে৷ সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদ থাকলে বেকারত্ব বাড়বে, অনাহারে, বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু বাড়বে৷ স্নেহ–মমতা ধ্বংস হবে৷ নারী নির্যাতন নারী ধর্ষণ বাড়বে৷ যুদ্ধ বিগ্রহ বাড়বে৷ জাতিগত বিদ্বেষ বাড়বে৷ এটাই কি চলবে? এর হাত থেকে বাঁচতে হলে একমাত্র পথ মার্কসবাদ–লেনিনবাদ-শিবদাস ঘোষ চিন্তাধারার ভিত্তিতে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব৷ আপনাদের ইতিহাসের পাতা পড়তে বলি৷ ইসলাম ধর্ম, খ্রিস্টান ধর্ম, হিন্দু ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম, জৈন ধর্ম প্রত্যেকটি ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য শত শত বছর লড়াই করতে হয়েছে৷ একদিন–দু’দিনে হয়নি৷ এগুলির যাঁরা প্রবর্তক, তাঁরা দু’জন–পাঁচজন নিয়েই শুরু করেছিলেন৷ এই হচ্ছে ইতিহাস৷  নবজাগরণ থেকে শুরু করে ফরাসি বিপ্লব পর্যন্ত, ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লব পর্যন্ত সাড়ে তিনশো বছর লেগেছে বুর্জোয়া গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে৷ আর দাসপ্রথা, রাজতন্ত্র, পুঁজিবাদ– সবটাই ব্যক্তিমালিকানা, কয়েক হাজার বছরের৷ তাকে উচ্ছেদ করার জন্য সামাজিক মালিকানা– সমাজতান্ত্রিক মালিকানা, তার মেয়াদ মাত্র ৭০ বছর ছিল৷ কতটুকু সময় এর মধ্যেই দেখিয়ে গেছে, নতুন সভ্যতা কাকে বলে, কীভাবে মানবমুক্তি সম্ভব, এটাই বাঁচার একমাত্র রাস্তা৷ ফলে এখানে হতাশ হওয়ার কোনও কারণ নেই৷ হতাশাগ্রস্ত হয়ে কী করবেন? বাঁচবেন এই সংকটের হাত থেকে?

ফলে আপনাদের কাছে আমার আবেদন, কমরেড শিবদাস ঘোষ যে কথা বলেছেন, নির্বাচনের পথে নয়, একমাত্র বিপ্লবই শোষণমূলক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার উচ্ছেদ ঘটাতে পারে৷ তার জন্য প্রস্তুতি চাই৷ আমরা ভোটে নামি, নামতে বাধ্য হই৷ লেনিনের শিক্ষা– যতদিন মানুষ ভোটে যাবে, বিপ্লবীদেরও যেতে হবে, চোখে আঙুল দিয়ে দেখাবার জন্য যে, ভোটে কাজ হয় না৷ আর পার্লামেন্ট অ্যাসেম্বলিতে থাকলে, জিতলে, গরিব মানুষের হয়ে প্রতিবাদ করবে৷ কমরেড শিবদাস ঘোষও এই শিক্ষাই দিয়েছেন৷ আমাদের দলের দিকে তাকিয়ে দেখুন– এই বৃষ্টিতে বসে আছেন আপনারা এতগুলি লোক৷ আপনারা চাঁদা দিয়ে এই মিটিংয়ের প্রস্তুতি নিয়েছেন৷ আপনারাই পয়সা খরচ করে এই মিটিংয়ে এসেছেন৷ এই বৃষ্টিতে ভিজছেন কেন? এই শক্তি কোথা থেকে পেয়েছেন? এই দলের শক্তি কে দিয়েছে? মার্কসবাদ–লেনিনবাদ-শিবদাস ঘোষের চিন্তাধারা৷ এই হচ্ছে শক্তি৷ এই শক্তির ভিত্তিতে গ্রামে গ্রামে চাই গরিব মানুষকে নিয়ে গণকমিটি গঠন৷ আপনারা গণকমিটি গঠন করুন৷ কৃষক–খেতমজুর সংগঠন গড়ে তুলুন৷ শ্রমিক এলাকায় শ্রমিক সংগঠন গড়ে তুলুন, বিপ্লবী আদর্শের ভিত্তিতে, মার্কসবাদ–লেনিনবাদ-শিবদাস ঘোষ চিন্তাধারার ভিত্তিতে৷ ছাত্র–যুব–মহিলা সংগঠন গড়ে তুলুন৷ ট্রেনে বাসে রাস্তায়, যে কোনও জায়গায় অন্যায় দেখবেন, একা দাঁড়িয়ে হলেও প্রতিবাদ করবেন৷ আর সর্বত্র রাজনীতি আলোচনা করুন৷ দলের শ্রেণি চরিত্র বুঝুন ও বোঝান৷ কেউ বলুক না বলুক নানা দাবিতে গণআন্দোলন ও শ্রেণিসংগ্রাম গড়ে তুলুন৷ ঘরে বসে অদৃষ্টকে দায়ী করলে কিছু হবে না৷ নিজেদেরই পায়ে দাঁড়িয়ে শোষিত শ্রেণির স্বার্থ, দৃষ্টিভঙ্গি ও রাজনীতি নিয়ে লড়ুন৷ এমনিতেই তো তিল তিল করে মরছেন, লড়াই করেই মরুন৷ যুবকদের নিয়ে ভলান্টিয়ার বাহিনী গড়ুন, যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়বে, বৃদ্ধ ও নারীদের সম্মান রক্ষার্থে রুখে দাঁড়াবে৷ আবার যুবকদের কাছে নিয়ে যান সেই সুভাষচন্দ্রের চরিত্র, ক্ষুদিরামের চরিত্র, ভগৎ সিংয়ের চরিত্র, প্রীতিলতার চরিত্র, বিদ্যাসাগরের চরিত্র, শরৎচন্দ্র, নজরুল, রবীন্দ্রনাথের আহ্বান৷ আমরা এই জয়ন্তীগুলি করি কেন? কমরেড শিবদাস ঘোষ আমাদের শিক্ষা দিয়ে গেছেন, এঁদের থেকে শিক্ষা না নিলে তোমরা কমিউনিস্ট হতে পারবে না৷ এঁরাই সে যুগের শ্রেষ্ঠ মানুষ৷ এঁদের চরিত্র থেকে শিক্ষা নিয়ে এগোও৷ অগ্রগতির পথে আর এক ধাপ এগোলে তখন উন্নত কমিউনিস্ট চরিত্র পাবে৷ আমরা যৌবনকে জাগাতে চাই৷ মনুষ্যত্বকে জাগাতে চাই৷ যারা লড়বে এই পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে, শোষণের বিরুদ্ধে৷

আর শিশুদের রক্ষা করুন৷ আমি কমরেডদেরও বলেছি, আপনাদেরও বলছি৷ ক্লাস ফোর ফাইভ সিক্সের ছেলেমেয়েরা মদ খাচ্ছে, ভাবতে পারেন আপনাদের ছোট বয়সে এ সব ছিল? টিভিতে মোবাইলে নোংরা ব্লু–ফিল্ম দেখে৷ নোংরা যৌনতার শিকার হচ্ছে বাচ্চাগুলো৷ আমি আমাদের কর্মীদের বলেছি, বার বার তাদের বিবেকের কাছে আবেদন জানিয়েছি, আপনারা যারা আছেন, আপনাদেরও বলব, রবিবার ছুটির দিন সকালবেলা এক ঘন্টা সময় নষ্ট করুন৷ পাড়ার বাচ্চাদের নিয়ে খেলাধুলা করান, প্যারেড করান, ওদের বিদ্যাসাগরকে চেনান, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্রকে চেনান৷ সুভাষ বোসকে চেনান৷ ভগৎ সিং, ক্ষুদিরামকে চেনান৷ বড় মানুষদের চেনান৷ ওদের মধ্যে বিবেক জাগান, মনুষ্যত্ব জাগান৷ এই সভ্যতা বিপন্ন৷ সাম্রাজ্যবাদ–পুঁজিবাদ গোটা মানবজাতিকে ধ্বংস করছে৷ আমরা ইতিহাসে পড়েছিলাম, একটা যুগ ছিল, যখন মানুষে মানুষ খেত– ক্যানিবালিজম বলত৷ এই পুঁজিবাদ প্রত্যক্ষভাবে মানুষ খাচ্ছে না, কিন্তু মানুষকে হত্যা করছে৷ অনাহারে মারছে, বিনা চিকিৎসায় মারছে৷ আত্মহত্যার দিকে ঠেলছে৷ আর এই পুঁজিবাদ মনুষ্যত্বকে মারছে৷ মডার্ন ক্যাপিটালিজম মডার্ন ক্যানিবালিজমে পরিণত হয়েছে৷ এই এক ধরনের নরঘাতক মানব সভ্যতার ধ্বংসকারী৷ এর বিরুদ্ধে আপনারা মাথা তুলে দাঁড়ান৷

এই উদ্দেশ্য নিয়েই মহান নেতা কমরেড শিবদাস ঘোষ এই দল গড়ে তুলেছেন কঠিন কঠোর সংগ্রাম চালিয়ে৷ আমাদের বলেছেন, মানুষকে জয় করবে যুক্তি দিয়ে, বুদ্ধি দিয়ে, ভালবাসা দিয়ে, শালীনতা দিয়ে৷ গায়ের জোর নয়, দাপট নয়৷ এই গায়ের জোর, দাপট, কণ্ঠরোধ, টাকা দিয়ে পার্টি করানো, সুযোগ সুবিধা দিয়ে পার্টি করানো– আমাদের দলে এলে চাকরি পাবে, লাইসেন্স পাবে, পারমিট পাবে, প্রোমোশন পাবে, ভাল জায়গায় ট্রান্সফার পাবে, তোলাবাজি করতে পারবে, সিন্ডিকেটবাজি করতে পারবে– এই করে সিপিএম তেত্রিশ বছর শাসন করেছে৷ বামপন্থার মর্যাদা নষ্ট করল৷ যার সুযোগ নিয়ে আজ বিজেপি ঢুকছে, আরএসএস ঢুকছে৷ ১৯৬৯ সালে কমরেড শিবদাস ঘোষ এই ওয়ার্নিংই দিয়েছিলেন৷ এরকম প্রজ্ঞা তাঁর ছিল– বলেছিলেন, তখন নাম ছিল জনসংঘ, আজ বিজেপি– বলেছিলেন, জনসংঘ ওৎ পেতে আছে৷ তোমরা বামপন্থাকে কলঙ্কিত করছ৷ এর সুযোগ নিয়ে আরএসএস, জনসংঘ ঢুকবে৷ ঘটলোও তাই৷ অন্যদিকে তৃণমূলবিরোধী মানসিকতা গড়ে উঠছে৷ কাগজ একসময় হাওয়া তুলেছিল– তৃণমূলকে চাই৷ পাগলের মতো ছুটেছিল সকলে৷ এখন তৃণমূলকে ঠেকাতে হলে সিপিএম নয়, বিজেপি চাই– এই ধ্বনি একদল তুলছে৷ অতীতে এই বাংলায় শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর মতো মানুষ জায়গা করতে পারেননি৷ তখন ছিল সুভাষ বোসদের বিপ্লববাদের জোয়ার৷ আর আজ কী দুরবস্থা!

সিপিএম সিপিআই কখনও যথার্থ মার্কসবাদের চর্চা করেনি

আমরা সিপিএম–সিপিআই নেতাদের বলেছিলাম, আপনারা ভোটের হিসাব করছেন৷ অথচ আজ একচেটিয়া পুঁজি বনাম একচেটিয়া পুঁজির দ্বন্দ্ব চলছে৷ ওদেরও তো বাজার নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছে– সর্বভারতীয় পুঁজি আঞ্চলিক পুঁজির দ্বন্দ্ব চলছে৷ বিভিন্ন সর্বভারতীয় বুর্জোয়া দলের মধ্যে এবং সর্বভারতীয় পুঁজিপতি শ্রেণির দল ও আঞ্চলিক পুঁজিবাদী দলের দ্বন্দ্ব চলছে৷ এই যে বুর্জোয়াদের ঐক্য নেই, প্রবল দ্বন্দ্ব চলছে– এই হচ্ছে একটা সুযোগ, শ্রমিক–কৃষক, ছাত্র–যুবদের আন্দোলনগুলিকে শক্তিশালী করার৷ এই পথে আসুন৷ সিপিএমের কাছে আমাদের এই আহ্বান ছিল৷ তাঁরা এই আন্দোলনে এলেন না৷ তাঁরা বামপন্থাকে কলঙ্কিত করে প্রথমে তৃণমূলকে জায়গা করে দিলেন, এখন তো শুনছি, তাঁদের দলের রাজ্য সম্পাদক বলছেন, তাঁদের দলের একদল তৃণমূলে যাচ্ছে বিজেপি বিরোধিতার জন্য, আর এক দল তৃণমূল বিরোধিতার জন্য বিজেপিতে যাচ্ছে এমন মার্কসবাদ শিখিয়েছেন, এমন বামপন্থা শিখিয়েছেন, দলের লোক চলে যাচ্ছে তৃণমূলে আর বিজেপিতে! ৩৪ বছর শাসন করে এমন শক্তি সঞ্চয় করেছেন! কী রকম পার্টি! কোনও আদর্শের চর্চা আছে? কোনও সংগ্রাম আছে? কোনও নীতি আছে? এ সংকট হল কেন? অনুসন্ধান করুন৷ করলে সেই কমরেড শিবদাসের কথায় আসতে হবে৷ এই দলগুলি যথার্থ মার্কসবাদের চর্চা করেনি৷ মার্কসবাদের নামে ভ্রান্ত চিন্তা নিয়ে চলেছে৷ ১৯৭৭–এ সরকার করল৷ কার সাথে হাত মিলিয়ে? জনতা পার্টির সাথে৷ যে জনতা পার্টির সাথে জনসংঘ ছিল, আরএসএস ছিল৷ সিপিএম তার সাথে ঐক্য করেছে৷ ’৭৭ সালে মোরারজি দেশাই যখন প্রধানমন্ত্রী, বিজেপির শক্তিবৃদ্ধিতে ওরা সাহায্য করেনি? ভিপি সিং যখন প্রধানমন্ত্রী তখন তাঁকে সমর্থন করছে বিজেপি এবং সিপিএম হাতে হাত মিলিয়ে৷ এই কলকাতা ময়দানে অটলবিহারী বাজপেয়ী এবং জ্যোতি বসু একসঙ্গে মিটিং করে গেছেন৷ বিজেপির সমর্থন নিয়ে সিপিএম কলকাতা কর্পোরেশন চালিয়েছে৷ এইভাবে বিজেপির শক্তিবৃদ্ধিতে সাহায্য করেনি? কোনও দিন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তারা লড়াই করেছে? তাদের কর্মীদের মন তৈরি করেছে? এক সময় তো রিফিউজি এলাকায় তাঁরা খুব ভোট পেতেন, সেই এলাকায় আজ আরএসএস ঢুকছে কী করে? কারণ তাদের সাম্প্রদায়িতা মুক্ত করেননি৷

আমি আবারও বলছি, পশ্চিমবাংলা, অবিভক্ত বাংলা ভারতের গৌরব ছিল৷ নবজাগরণের এখানে সূচনা৷ স্বদেশি আন্দোলনে বিপ্লববাদের এখানেই সূচনা৷ গোটা ভারতবর্ষ অবিভক্ত বাংলার দিকে তাকিয়ে থাকত৷ তারই খণ্ডিত অংশ এই পশ্চিমবাংলা৷ এই অবিভক্ত বাংলার ঐতিহ্য নিয়েই বাংলাদেশে, যে বাংলাদেশ মুসলিম প্রধান, তারা মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের সাথে লড়াই করে স্বাধীন বাংলা কায়েম করেছে৷ সেই গৌরবের অধিকারী তারা৷ ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের, হিন্দুরাষ্ট্রের যারা স্লোগান তোলে, তাদের সুভাষচন্দ্রের ভাষায় দেশের শত্রু গণ্য করা দরকার৷ তাদের বলা দরকার, নেপাল তো হিন্দুরাষ্ট্র, নেপালকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করুন৷ এই দাবি তুললে নেপালিরা তাড়া করবে৷ আরবে সৌদি আরব, জর্ডন, ইরাক, ইরান সব তো মুসলিম রাষ্ট্র৷ এক দেশ হচ্ছে? ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র হয়? ওরা গো–মাতার জিগির তুলে গো–হত্যা বন্ধ করাচ্ছে, নিরীহ গরিব মানুষকে গো–হত্যাকারীর তকমা লাগিয়ে খুন করছে৷ আমাদের কথা বাদ দিলাম৷ এই সম্পর্কে বিবেকানন্দের কথা শুনুন৷ ‘স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা’ নবম খণ্ডে পাবেন৷ তিনি বেলুড় মঠে শিষ্যদের নিয়ে বসেছিলেন৷ তখন গো–রক্ষার জন্য তাঁর কাছে চাঁদা চাইতে এসেছিল কয়েকজন৷ তিনি তাদের প্রশ্ন করেছিলেন, মধ্যপ্রদেশে কয়েক লক্ষ মানুষ দুর্ভিক্ষে মারা যাচ্ছে, তাদের জন্য কী করছ? ওরা উত্তর দিল, এই মানুষগুলো নিজেদের পাপে মারা যাচ্ছে, ফলে ওদের জন্য করার কিছু নেই৷ বিবেকানন্দ ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন, গরুও তাহলে পাপে মারা যাচ্ছে৷ ‘‘প্রচারক (একটু অপ্রতিভ হইয়া) : হ্যাঁ, আপনি যাহা বলিয়াছেন তাহা সত্য, কিন্তু শাস্ত্র যে বলে– গোরু আমাদের মাতা৷ বিবেকানন্দ (হাসিতে হাসিতে) হ্যাঁ, গোরু আমাদের যে মা, বিলক্ষণ বুঝেছি৷ তা না হলে এমন সব কৃতী সন্তান আর কে প্রসব করবে?’’ তারপর বিবেকানন্দ শিষ্যদের গভীর দুঃখে ক্ষোভে বললেন, ‘‘তোদের হিন্দু ধর্মের কর্মবাদ কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে দেখলি? মানুষ হয়ে মানুষের জন্যে যাদের প্রাণ না কাঁদে, তারা কি আবার মানুষ?’’ এই বিবেকানন্দের কী শাস্তি বিধান করবেন আরএসএস, বিজেপি নেতৃবৃন্দ!

ফলে গোটা দেশে ভয়ঙ্কর একটা পরিস্থিতি৷ আমরা সিপিএম–সিপিআইকে আজকের এই মিটিং থেকেও আবেদন জানাচ্ছি, নির্বাচনসর্বস্ব রাজনীতি আজ আপনাদের এই জায়গায় এনেছে৷ ১৯৫২ সালে, ’৬০ সালে, ’৬৬ সালে আপনাদের মানুষ সম্মান করত, শ্রদ্ধা করত৷ আপনাদের কর্মীদের একটা স্ট্যান্ডার্ড ছিল৷ আজ সেই মান কোথায় চলে গেছে সিপিএমকে বলছি, আপনারা তো আমাদের দলের ১৬১ জন নেতা–কর্মীকে হত্যা করেছেন৷ আজও আমাদের দল দাঁড়িয়ে আছে৷ তৃণমূলের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে আমাদের দলের দুটি কর্মীর চোখ চলে গেছে৷ এই সেদিনও রাজভবনের সামনে আমাদের কর্মীদের কীভাবে মারল৷ আমাদের একটাও এমএলএ–এমপি নেই৷ আমাদের দল কি দুর্বল হচ্ছে? এ–ও আপনাদের জানাই, এই পঞ্চায়েত নির্বাচনে আমরা জিতেছি দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার মৈপীঠে৷ আমাদের বিরুদ্ধে সিপিএম–তৃণমূল ঐক্য হয়ে গেল৷ নদীয়ার বারুইপাড়ায় আমাদের বিরুদ্ধে সিপিএম–তৃণমূল ঐক্য হল৷ আমরা সিপিএম নেতৃত্বকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছি, এটা কী হচ্ছে? ওরা উত্তর দেয়নি৷ এমনকী গ্রামের একটা সিটে আমরা জিততে পারি, এই আশঙ্কায় আমাদের বিরুদ্ধে তৃণমূল–সিপিএম–বিজেপি ঐক্য হয়ে গেল বিভিন্ন জেলায়৷ এই সদ্য হুগলির হেস্টিংস জুটমিলে কো–পারেটিভে নির্বাচন হল৷ সেখানে সিপিএম–তৃণমূল–বিজেপি ঐক্য হল আমাদের বিরুদ্ধে৷ এই হচ্ছে শ্রেণি–ঐক্য৷ বুর্জোয়া শ্রেণির স্বার্থে এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট) সকলের চোখে দুশমন৷ এ দলের এমএলএ–এমপি নেই, খবরের কাগজের প্রচার নেই৷ এই বৃষ্টিভেজা মাঠ৷ কত দূর থেকে কষ্ট করে এসেছেন৷ বৃষ্টির মধ্যে হাজার হাজার মানুষ শুনছেন৷ বাচ্চা কোলে নিয়ে মায়েরা শুনছেন৷ কালকের কাগজে রেডিও টিভিতে বিশেষ কিছু পাবেন না৷ পেলেও কোনও কোণে হয়ত একটু পেতে পারেন৷ কিন্তু এভাবে আমাদের আটকাতে পারছে? কোনও বিপ্লবী দলকে আটকাতে পারে? ভারতের ২২টি রাজ্যে আজ স্মরণদিবস উদযাপিত হচ্ছে৷ বহু সৎ যুবক ছাত্রছাত্রী শ্রমিক কৃষক মহিলা মধ্যবিত্ত আমরা পাচ্ছি৷ কীসের জোরে? মহান মার্কসবাদ–লেনিনবাদ-শিবদাস ঘোষের চিন্তার জোরে৷ আমাদের দল এগোবে৷ এই বাংলাকে আবার জাগাতে হবে৷ এ দেশের যৌবনকে জাগাতে হবে৷ গোটা ভারতবর্ষকে সর্বনাশের দিকে নিয়ে যাচ্ছে এই দলগুলো৷ পুঁজিবাদ–ফ্যাসিবাদ একদিকে, আর এক দিকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পথ৷ যে কথা বলেছি, হয় জীবন, না হয় মৃত্যু৷ এর মাঝখানে আর কিছু নেই৷ পুঁজিবাদ থাকলে মৃত্যু অনিবার্য৷ ধ্বংস অনিবার্য৷ বাঁচাতে পারে একমাত্র সমাজতন্ত্র– সে দেবে শোষণমুক্ত নতুন সমাজ, নতুন জীবন যৌবন৷ পুঁজিবাদ বিরোধী সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সফল করার শপথই আমাদের নিতে হবে৷ এ কথা বলেই আমি আজ শেষ করছি৷

ইনকিলাব জিন্দাবাদ

মহান মার্কসবাদী চিন্তানায়ক

কমরেড শিবদাস ঘোষ জিন্দাবাদ

এসইউসিআই(কমিউনিস্ট) জিন্দাবাদ

সর্বহারার আন্তর্জাতিকতাবাদ জিন্দাবাদ

(৭১ বর্ষ ৩ সংখ্যা ১৭ আগস্ট, ২০১৮)