Home / খবর / নির্বাচনী বন্ড :  পুঁজিপতি ও ভোটবাজদের গোপন আঁতাত

নির্বাচনী বন্ড :  পুঁজিপতি ও ভোটবাজদের গোপন আঁতাত

পুঁজিপতিদের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলির গোপন লেনদেনের ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করতে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার ২০১৭ সালে চালু করেছে ‘নির্বাচনী বন্ড’ প্রকল্প৷ এ এমন এক ব্যবস্থা যাতে নিজেদের পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রেখে পুঁজিমালিকরা পছন্দের রাজনৈতিক দলগুলির পিছনে বিপুল টাকা ঢেলে তাদের দিয়ে নিজেদের স্বার্থ পূরণ করিয়ে নিতে পারে৷ সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টে এ সংক্রান্ত একটি মামলায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে শোরগোল উঠেছে৷

কী এই নির্বাচনী বন্ড? এ হল এক বিশেষ ধরনের বন্ড যা কিনে কেউ নিজের পছন্দের রাজনৈতিক দলকে দিতে পারে৷ দল সেই বন্ড ভাঙিয়ে টাকা সংগ্রহ করে৷ এই বন্ডে টাকার কোনও ঊর্ধ্বসীমা নেই৷ অর্থাৎ যে কোনও পরিমাণ টাকার বন্ড কেনা যায় এবং কেনার সময় ক্রেতার নাম ঠিকানা ব্যাঙ্ককে জানাতে হয় না৷

পছন্দের এই প্রকল্প কার্যকর করতে নরেন্দ্র মোদির সরকার কয়েকটি আইন সংশোধন করেছে৷ ২০১৭ সালে নির্বাচনী বন্ড প্রকল্প চালু হওয়ার আগে কোম্পানি আইন অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলিকে অনুদান দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ ছিল৷ এই প্রকল্পে নরেন্দ্র মোদিরা সেইসব বিধিনিষেধ তুলে দিয়ে অনুদানের পরিমাণ সীমাহীন করে দিয়েছেন৷ এই বিপুল অর্থ কে দিচ্ছে, তার সমস্তটাই দেশের মানুষের সামনে গোপন রাখার বন্দোবস্তও করে  ফেলেছে বিজেপি৷ এমনকী বন্ডক্রেতা সংস্থাগুলোকেও এই দানের কোনও রকম হিসাব রাখতে হয় না৷ অর্থাৎ আয়কর কর্তৃপক্ষ যাতে দানকারী সংস্থাগুলিকে এ ব্যাপারে কোনও প্রশ্ন করতে না পারে, সরকার তারও ব্যবস্থা করে দিয়েছে৷ এখানেই শেষ নয়, ‘বৈদেশিক অনুদান নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১০’ সংশোধন করা হয়েছে৷  সংশোধিত আইন অনুযায়ী এখন ভারতে রেজিস্ট্রিকৃত বিদেশি কোম্পানিগুলি রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে যত খুশি টাকা দিতে পারে৷

এই নির্বাচনী বন্ড চালুর পিছনে বিজেপির উদ্দেশ্যে কী? তা হল, সরকারে থাকার সুবাদে দেশি–বিদেশি পুঁজিমালিকদের এদেশের সম্পদ লুটে নেওয়ার অবাধ সুযোগ করে দেওয়ার বিনিময়ে তাদের কাছ থেকে মোটা টাকা ঘুষ নেওয়া৷ বন্ড চালু করে কারা তাদের পিছনে পুঁজি ঢালছে সে ব্যাপারে জনসাধারণকে বিজেপি নেতারা অন্ধকারে রাখতে চাইছেন৷ এইভাবেই ন্যায়–ন্যায়ের তোয়াক্কা না করে পুঁজিপতিদের সীমাহীন লুট চালানোর ব্যবস্থা করে দিয়ে দেশের ‘উন্নয়ন’ ঘটাচ্ছেন বিজেপি নেতারা৷ এটাই সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার আজকের আসল চেহারা একটি সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে, গত ২০১৭–’১৮ সালে দেশের প্রথম সারির পাঁচটি রাজনৈতিক দলের এক বছরের মোট আয়ের চার গুণ বেশি অর্থ একা বিজেপি সংগ্রহ করেছে এমন লোকদের কাছ থেকে যাদের পরিচয় গোপন রয়েছে৷ ওই বছরে বিজেপি মোট যত আর্থিক সাহায্য সংগ্রহ করেছে, তার ৫৩ শতাংশেরই উৎস গোপন রেখেছে তারা৷ ২০১৭–’১৮ সালে নির্বাচনী বন্ড থেকে বিজেপি পেয়েছে ২১০ কোটি টাকা, যেখানে অন্য বড় দলগুলি মিলে পেয়েছে ৫ কোটি টাকা৷

নির্বাচনী বন্ড প্রকল্প আসলে দেশের শাসক পুঁজিপতি শ্রেণি ও তাদের স্বার্থ পূরণ করে চলা ভোটবাজ বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলির পারস্পরিক বোঝাপড়ার জঘন্য ফলশ্রুতি৷ বিশ্বের এই ‘বৃহত্তম গণতন্ত্রে’র ভোট নামক সবচেয়ে বড় উৎসবটিতে টাকাপয়সার হরির লুঠ কী পরিমাণে চলে, সকলেই তা জানেন৷ নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ এক ফুঁয়ে উড়িয়ে সাদা, কালো নানা রঙের টাকা দেদার খরচ করে থাকেন এ দেশের ভোটবাজ রাজনৈতিক দলগুলোর ভোটপ্রার্থীরা৷ এই টাকা জোগায় মূলত কর্পোরেট পুঁজির মালিকরা৷ এই বন্ড ব্যবস্থা এই ক্ষেত্রে তাদের খুবই সহায়ক৷ এই গোপন ব্যবস্থার দ্বারা পুঁজিপতিরা তাদের পছন্দমতো রাজনৈতিক দলকে ‘পলিটিকাল ম্যানেজার’ হিসাবে সরকারি গদিতে বসিয়ে, আর্থিক থেকে শুরু করে সমস্ত বিষয়েই নিজেদের স্বার্থ পূরণকারী নীতি চালু করিয়ে নেয়৷ নির্বাচনে পুঁজিপতিদের দেওয়া এই টাকাই দলগুলি দেদার খরচ করে চলেছে তাদের প্রচারে, জনগণকে বিলোতে এবং আরও নানা প্রকারে৷ নির্বাচনী বন্ড প্রকল্প এই  লেনদেনের খেলাকে আরও ব্যাপক আকার দেওয়ার ষড়যন্ত্র৷

(গণদাবী : ৭১ বর্ষ ৩৬ সংখ্যা)