Breaking News
Home / খবর / নবজাগরণের পথিকৃৎ বিদ্যাসাগর (৪)

নবজাগরণের পথিকৃৎ বিদ্যাসাগর (৪)

ভারতীয় নবজাগরণের পথিকৃৎ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের দ্বিশত জন্মবার্ষিকী আগতপ্রায়৷ সেই উপলক্ষে এই মহান মানবতাবাদীর জীবন ও সংগ্রাম পাঠকদের কাছে ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হচ্ছে শিক্ষাগ্রহণের জন্য৷

বিদ্যাসাগর চেয়েছিলেন আধুনিক জ্ঞান–বিজ্ঞানের মাধ্যমে এ দেশে যুক্তিবাদী মন গড়ে তুলতে৷ কিন্তু সে যুগে নানা কুসংস্কার, যুক্তিহীন বাছবিচার, জাত–পাতের ভেদাভেদ এগুলো সমাজের মধ্যে প্রবলভাবে ছিল৷ ‘ছোটজাত’ বলে মানুষকে ঘৃণা করা হত, ছুঁয়ে দিলে অপবিত্র মনে করা হত, মেয়েদের উপর ছিল হাজার বিধিনিষেধ৷ ঘরের বাইরে বেরোনোর উপায় ছিল না, লেখাপড়া করার অধিকার তো ছিলই না৷ সমাজের চাপে চোখের জলই ছিল মেয়েদের জীবনের একমাত্র অবলম্বন৷ এসব মনগড়া বাছবিচার নিয়েই সে যুগের সমাজে মানুষের জীবন কাটত৷ জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠলেও শাস্ত্রের নামে এসব কুবিচার, বিধিনিষেধ ও কুপ্রথা চলত বলে এ সবের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস কেউ দেখাত না৷ বহুযুগ ধরে নীরবে সবাই এগুলো মেনে আসছিল৷ কিন্তু শিশুবয়স থেকেই বিদ্যাসাগরের মন ছিল যুক্তিবাদী৷ কলকাতায় এসে ইংরেজি শিক্ষার মাধ্যমে ইউরোপের সাহিত্য ও ইতিহাস অধ্যয়ন করে নবজাগরণের মানবতাবাদী চিন্তার নতুন ভাবধারায় তিনি আকৃষ্ট হন৷ মানবতাবাদী চিন্তায় উদ্বুদ্ধ হয়ে মধ্যযুগীয় ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বিজ্ঞান ও যুক্তির ভিত্তিতে মানুষকে সমস্ত পুরনো বিধি–বিধানের ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছিলেন৷ তাই নারীকে মানুষের মর্যাদা দান করার এবং সমাজ থেকে ধর্মীয় কুসংস্কার দূর করার চেষ্টায় সর্বশক্তিতে তিনি উদ্যোগী হয়েছিলেন৷

যুক্তিবাদী বিদ্যাসাগর বুঝেছিলেন, সমাজ থেকে এসব কুপ্রথা দূর করতে গেলে এ দেশের মানুষকে যুক্তিবাদী করে গড়ে তুলতে হবে৷ শিক্ষার বিস্তার ঘটলে মানুষ যুক্তিবিচার করতে শিখবে, সমাজের কুপ্রথাগুলির ক্ষতিকর দিক ধরতে পারবে এবং তা থেকে মুক্ত হবে– এই আশা নিয়েই নতুন ভাবধারায় তিনি এ দেশে শিক্ষাবিস্তার করতে চেয়েছিলেন৷

১৮৫৩ সালে সরকারি শিক্ষা পরিষদের সঙ্গে বিদ্যাসাগরের বিরোধের একটি পরিবেশ তৈরি হয়৷ বেনারস সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ ডঃ জে আর ব্যালেন্টাইনকে শিক্ষা পরিষদ কলকাতা সংসৃক্ত কলেজের কাজকর্ম পরিদর্শন করে একটি রিপোর্ট দেওয়ার জন্য আহ্বান করেন৷ পরিদর্শনের পর ব্যালেন্টাইন কিছু সুপারিশ করেন৷ তিনি জন স্টুয়ার্ট মিলের ‘লজিক’ তথা তর্কশাস্ত্রের একট সরল সারাংশ নিজে লিখেছিলেন৷ তিনি সেই পুস্তিকাটি এবং বিশপ বার্কলের রচিত দর্শনের বই ‘এনকোয়ারি’ সংস্কৃত কলেজে পাঠ্য করার সুপারিশ করেন৷ বিদ্যাসাগর এর বিরোধিতা করলেন৷

তিনি দেখালেন ব্যালেন্টাইনের লেখার সারাংশ পড়ার চাইতে মিলের মূল পুস্তক পড়লে ছাত্রদের উপকার বেশি হবে৷ আর বার্কলে ভাববাদী দার্শনিক, তাঁর বইও ছাত্রদের তেমন কাজে লাগবে না৷ তাঁর লেখা পুস্তক  সম্পর্কে বললেন–‘কতকগুলি কারণে সংস্কৃত কলেজে বেদান্ত ও সাংখ্য আমাদের পড়াতেই হচ্ছে৷ … কিন্তু সাংখ্য ও বেদান্ত যে ভ্রান্ত দর্শন, সে সম্বন্ধে এখন আর বিশেষ মতভেদ নেই৷ তবে ভ্রান্ত হলেও এই দুই দর্শনের প্রতি হিন্দুদের গভীর শ্রদ্ধা আছে৷ আমাদের উচিত সংস্কৃত পাঠক্রমে এগুলি পড়ানোর সময়ে, এদের প্রভাব কাটানোর জন্য ইংরেজি পাঠক্রমে খাঁটি দর্শন দিয়ে এগুলির বিরোধিতা করা৷ বিশপ বার্কলের ‘এনকোয়ারি’ পড়লে সেই উদ্দেশ্য সাধিত হবে বলে মনে হয় না, কারণ সাংখ্য ও বেদান্তের মতোই বার্কলেও একই ভ্রান্ত সিদ্ধান্ত করেছেন৷ ইউরোপেও এখন আর বার্কলের দর্শন খাঁটি দর্শন বলে বিবেচিত হয় না, কাজেই তা পড়িয়ে উদ্দেশ্য সাধিত হবে না৷’ তাই নতুন করে এ বই তিনি পাঠ্য করতে চাইলেন না৷ বিদ্যাসাগরের যুক্তি শিক্ষা পরিষদ মেনে নিল, তাঁর উপর অগাধ আস্থা ছিল বলে এ বিষয়ে কোনও বিরোধ হল না৷

ওই সময়ে বাংলার ছোটলাট ছিলেন হ্যালিডে সাহেব৷ তিনি বিদ্যাসাগরের চিন্তা ও আদর্শকে খুবই শ্রদ্ধা করতেন৷ এ দেশে শিক্ষা বিস্তারের জন্য উৎসাহও তাঁর ছিল৷ বিদ্যাসাগর তাঁর সঙ্গে দেখা করে নিজের মনের ইচ্ছা জানিয়ে বললেন–‘সাহেব, আমার ইচ্ছা বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে কিছু বাংলা স্কুল গড়ে তুলব, এ ব্যাপারে আপনার সাহায্য চাই৷’

হ্যালিডে উৎসাহিত হয়ে বললেন–‘আপনি আপনার পরিকল্পনার কথা লিখে আমাকে জমা দিন৷ আমি শিক্ষা কাউন্সিলের সাথে আলোচনা করে আপনার ইচ্ছা পূরণের চেষ্টা করব৷’

পরিকল্পনা বিদ্যাসাগর আগেই তৈরি করে রেখেছিলেন৷ শিক্ষা কাউন্সিলের কাছে তা পেশ করলেন৷ কাউন্সিল তাঁর পরিকল্পনাগুলি গ্রহণ করলেন৷ তাঁকেই পরিদর্শক নিযুক্ত করে জেলায় জেলায় স্কুল স্থাপনের দায়িত্ব দিলেন৷ সেটা ছিল ১৮৫৫ সাল৷ তখন তাঁর বয়স মাত্র ৩৫ বছর৷ চারটি জেলার গ্রামে গ্রামে ঘুরে প্রতি জেলায় ৫টি করে মোট ২০টি মডেল স্কুল তৈরি করলেন৷ গৃহ নির্মাণের জন্য গ্রামের মানুষের কাছ থেকে সাহায্য সংগ্রহ করলেন৷

স্কুলগুলি পরিচালনা করতে গিয়ে দেখলেন যোগ্য শিক্ষক এবং বাংলা পাঠ্যপুস্তকের খুবই অভাব৷ গ্রামের পণ্ডিতরা সংস্কৃত জানেন কিন্তু মাতৃভাষা বাংলায় দখল নেই৷ বর্তমানের উপযোগী অনেক বিষয়ে তাঁদের জ্ঞান নেই, কুসংস্কার তাঁদের মধ্যে প্রবল৷ যুক্তির চর্চা তাঁরা করেন না৷

এজন্য উপযুক্ত শিক্ষকের অভাব পূরণ করতে কাউন্সিলের অনুমতি নিয়ে তিনি নিজেই সংস্কৃত কলেজে শিক্ষক তৈরির উদ্দেশ্যে একটি ‘নর্মাল স্কুল’ খুললেন৷ বাংলা পাঠ্যপুস্তকের অভাব পূরণের জন্য বাংলা বই লিখতে শুরু করলেন৷ বাংলা বর্ণমালা ও বাংলা ভাষা শিক্ষার জন্য উন্নত বিজ্ঞানসম্মত প্রথা আবিষ্কার করে লিখলেন ‘বর্ণপরিচয়’–এর প্রথম ভাগ ও দ্বিতীয় ভাগ৷ এ ছাড়া ‘কথামালা’, ‘বোধোদয়’, ‘আখ্যানমঞ্জরী’ ইত্যাদি নীতিশিক্ষামূলক কয়েকটি মূল্যবান বই অনুবাদ করলেন৷ বাংলা ভাষা শিক্ষার প্রথম সোপান হিসাবে বর্ণপরিচয়ের মূল্য আজও সকলেই স্বীকার করেন৷

১৮৪৯ থেকে ১৮৬৯–এর মধ্যে তিনি অনেকগুলি শিক্ষামূলক গ্রন্থের অনুবাদ করেন, ব্যাকরণ শেখার বই লেখেন৷ যেমন ‘বাংলার ইতিহাস’, সংস্কৃত শিক্ষার পক্ষে উপযোগী পুস্তক ‘ঋজুপাঠ’, ‘ব্যাকরণ কৌমুদী–র প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ, অনুবাদ গ্রন্থ– ‘শকুন্তলা’, ‘ভ্রান্তিবিলাস’, ‘সীতার বনবাস’ ইত্যাদি৷

এ ছাড়াও বিদ্যাসাগর বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ ও বিধবাবিবাহ বিষয়ক যুক্তি তর্ক সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে প্রবন্ধ লেখেন৷ এই লেখাগুলির মধ্য দিয়ে অনুন্নত বাংলা গদ্যভাষাকে সমৃদ্ধ করে আধুনিক বাংলা গদ্যের জন্ম দেন৷ বিদ্যাসাগর মহাশয়ের আগে বাংলা গদ্যের ভাষা ছিল অত্যন্ত কঠিন ও আড়ষ্ট৷ শুনতেও মধুর লাগত না৷ ছেদ, যতি ইত্যাদি বিরামচিহ্ণের সুষ্ঠু ও সার্থক ব্যবহার করে বাংলা গদ্যকে সুন্দর ও সাবলীলভাবে গড়ে তোলেন৷ এ জন্যই রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন–‘বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্য ভাষার প্রথম যথার্থ শিল্পী ছিলেন৷’

গ্রামে গ্রামে স্কুল করতে গিয়ে তাঁর মনে হয় গ্রামাঞ্চলে নারীশিক্ষার প্রচলন দরকার৷ সে সময় নারী শিক্ষার সূচনা হলেও এ দেশের সংস্কারাচ্ছন্ন সমাজ তা মেনে নেয়নি৷ কলকাতায় বেথুন সাহেবের উদ্যোগে বালিকা বিদ্যালয় গড়ে উঠলেও তা তেমনভাবে চালু হয়নি৷ তাই বেথুন সাহেব বিদ্যাসাগরের সাহায্য চেয়েছিলেন৷ বিদ্যাসাগরও চেয়েছিলেন এ দেশে নারী শিক্ষার প্রচলন হোক৷ শুধু কলকাতায় নয়, গ্রামে গ্রামে বালিকা বিদ্যালয় গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন তিনি৷ কিন্তু এ কাজটি ছিল অত্যন্ত কঠিন৷ এ দেশের গোঁড়া হিন্দু সমাজে মেয়েদের লেখাপড়া ছিল শাস্ত্র ও লোকাচার বিরুদ্ধ৷ এ দেশের লোক বিশ্বাস করত মেয়েরা লেখাপড়া শিখলে সংসারের অকল্যাণ হয়, মেয়েরা খারাপ হয়ে যায়৷ তাড়াতাড়ি স্বামীর মৃত্যু হয়, অর্থাৎ মেয়ে বিধবা হয়৷ বিদ্যাসাগর বুঝেছিলেন, সমাজ ও সংসারকে সুন্দর করতে গেলে, সমাজ থেকে কুপ্রথা, কুসংস্কার দূর করতে গেলে নারী শিক্ষার প্রসার দরকার৷ হ্যালিডে সাহেবকে তিনি মনের ইচ্ছা জানালেন৷

হ্যালিডে সাহেব বললেন–‘বেশ তো পণ্ডিত, আপনি স্ত্রীশিক্ষা প্রসারের উদ্যোগ নিন, বালিকা–বিদ্যালয় গড়ে তুলুন, আমি গর্ভনমেন্টের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলব৷’

আশ্বাস পেয়ে বিদ্যাসাগর ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে বর্ধমানের জৌগ্রামে একটি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করলেন৷ সরকারি সাহায্যের সম্ভাবনা উজ্জ্বল দেখে প্রাণান্ত পরিশ্রমে হুগলি, বর্ধমান, নদিয়া, মেদিনীপুর–এই চারটি জেলায় ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করলেন৷ গ্রামাঞ্চলে কুসংস্কার ছিল প্রবল৷ মেয়েদের  স্কুলে পাঠালেই সমাজের মাথারা একঘরে করে দিত৷ অনেকেই মেয়েদের বিয়ে দেওয়া যাবে না এই ভয়ে মেয়েদের স্কুলে পাঠাত না৷ প্রবল বাধার মধ্যে বিদ্যাসাগর নিজে বাড়ি বাড়ি ঘুরে বুঝিয়ে ছাত্রী সংগ্রহ করলেন৷ তাঁর আশা ছিল বালিকা বিদ্যালয়গুলির জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি সাহায্য পাওয়া যাবে৷ কিন্তু সরকারি তহবিলে টাকা নেই এই অজুহাত দেখিয়ে বালিকা বিদ্যালয়গুলির জন্য সাহায্যের আবেদন ব্রিটিশ সরকার অগ্রাহ্য করল৷

ব্রিটিশরা এ দেশে শিক্ষা বিস্তারের জন্য আসেনি, এসেছিল বাণিজ্য করতে৷ নিজেদের শাসন বজায় রাখতে ইংরেজি জানা অল্পসংখ্যক কেরানি তৈরির জন্য তাঁরা এ দেশে কিছুটা শিক্ষার বিস্তার চেয়েছিল, তার বেশি চায়নি৷ ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে ‘সিপাহী বিদ্রোহ’ হয়ে গেলে ব্রিটিশরা ভয় পেয়ে গেল৷ তারা এ দেশে আর শিক্ষা বিস্তার চাইল না৷ বালিকা বিদ্যালয়গুলির জন্য সাহায্যের আবেদন তারা অগ্রাহ্য করলে খুবই বিপদে পড়লেন বিদ্যাসাগর৷ তিনি শিক্ষা বিভাগের কাছে লিখলেন–‘সরকারি সাহায্যের আশ্বাস পেয়েই আমি এতগুলি বালিকা বিদ্যালয় গড়ে তুলেছি৷ স্থানীয় লোকেরা স্কুলগৃহ তৈরি করে দিলে সরকার বাকি খরচ চালাবেন এ আশ্বাস আমাকে দিয়েছিলেন৷ এখন এতগুলি স্কুলের খরচ ও শিক্ষকদের বেতন সরকার না দিলে আমাকেই দিতে হবে, সেটা আমার উপর খুবই অবিচার হবে৷’ কোনও আবেদনেই সরকারি সাহায্য পাওয়া গেল না৷ কোনও কাজ শুরু করে সমস্যার সামনে কখনওই পিছিয়ে আসতেন না বিদ্যাসাগর৷ তিনি তখন স্ত্রী শিক্ষায় উৎসাহী, সম্পন্ন ব্যক্তিদের কাছে গেলেন সাহায্যের আবেদন নিয়ে৷ নিজেই বেশিরভাগ খরচ বহন করে স্কুলগুলিকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করলেন৷

এ সময় শিক্ষাবিভাগের বিশেষ অধিকর্তা গর্ডন ইয়ং সাহেবের সঙ্গে বিদ্যাসাগরের পদে পদে মতবিরোধ দেখা দেয়৷ ইয়ং সাহেব সংস্কৃত কলেজের ছাত্রদের বেতন বাড়াতে চাইলে বিদ্যাসাগর বাধা দিলেন৷ তিনি দেখলেন সরকারি পদে থেকে আর শিক্ষাপ্রসারের কাজ করার সম্ভাবনা কম৷ ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে বাধ্য হয়ে তিনি সরকারি পদে ইস্তফা দিলেন, তখন তাঁর মোট বেতন ছিল ৫০০ টাকা৷ তখনকার দিনে ৫০০ টাকার মূল্য আজকের ৫০ হাজারেরও বেশি৷ হ্যালিডে সাহেব ডেকে পাঠালেন তাঁকে৷ বললেন– ‘পণ্ডিত, আপনি ইস্তফা ফিরিয়ে নিন৷’

বিদ্যাসাগর বললেন–‘না সাহেব, যে কাজ স্বাধীনভাবে করতে পারব না, নিজের আদর্শ যে কাজে রক্ষা করতে পারব না, শুধু টাকার জন্য সে কাজ করতে আমি রাজি নই৷’

হ্যালিডে সাহেব বললেন–‘আমি জানি, আপনি সব দানধ্যান করেন, বহ গরিব ছাত্রদের পড়াশোনার খরচ দেন, নিজের জন্য কিছুই রাখেন না৷ চাকরি ছেড়ে দিলে আপনার চলবে কী করে?’

বিদ্যাসাগর বললেন–‘সাহেব, ভাববেন না, এখন দু’বেলা খাই, তখন না হয় একবেলা খাব৷ তাও না জোটে  একদিন অন্তর খাব, কিন্তু যে কাজে সম্ভ্রম নেই, স্বাধীনতা নেই, সে কাজ আমি করতে চাই না’

বন্ধুরা বললেন–‘বিদ্যাসাগর তুমি ভাল কাজ করলে না৷ আজকালকার যুগে ৫০০ টাকার চাকরি পাওয়া সোজা নয়৷ এখন তোমার চলবে কী করে?’

বিদ্যাসাগর একটু হেসে উত্তর দিলেন–‘আমার কাছে আত্মসম্মানই বড়, টাকা বড় নয়৷’ বললেন, তা ছাড়া আমি যখন সংস্কৃত কলেজের সেক্রেটারির পদ পরিত্যাগ করেছিলাম, তখন আমার কী ছিল? এখন তবু তো আমার প্রণীত ও প্রকাশিত পুস্তকের কতক আয় আছে৷’

চাকরি ছেড়ে দিয়ে বিদ্যাসাগর স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পেলেন৷ জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নিজেকে দেশে শিক্ষাপ্রসারের কাজে নিযুক্ত রাখবেন, এই অঙ্গীকার নিয়ে পদত্যাপত্র লিখেছিলেন৷

পদত্যাগের পর বালিকা বিদ্যালয়গুলি বাঁচিয়ে রাখার জন্য নিজের চেষ্টায় একটি নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভাণ্ডার খুললেন৷ তাঁর আহ্বানে বেশ কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তি নিয়মিত চাঁদা দিতে লাগলেন৷ এ ভাবেই বালিকা বিদ্যালয়গুলিকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করলেন তিনি৷ নিজেও খরচ বহন করতে লাগলেন৷

(চলবে)

(গণদাবী : ৭২ বর্ষ ১ সংখ্যা)