Breaking News
Home / খবর / নবজাগরণের পথিকৃৎ বিদ্যাসাগর (২৮) — সিপাহি বিদ্রোহ ও বিদ্যাসাগর

নবজাগরণের পথিকৃৎ বিদ্যাসাগর (২৮) — সিপাহি বিদ্রোহ ও বিদ্যাসাগর

ভারতীয় নবজাগরণের পথিকৃৎ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের দ্বিশত জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এই মহান মানবতাবাদীর জীবন ও সংগ্রাম পাঠকদের কাছে ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হচ্ছে৷

(২৮)

সিপাহি বিদ্রোহ ও বিদ্যাসাগর

ভারতে দীর্ঘ ব্রিটিশ শাসনে সিপাহি বিদ্রোহ একটি মাইলস্টোন৷ ১৮৫৭ সালের এই বিদ্রোহ ভারতে ব্রিটিশ শাসনকালকে দুটি ভাগে ভাগ করেছে৷ একটি সিপাহি বিদ্রোহ পূর্ববর্তী যুগ, অপরটি বিদ্রোহ পরবর্তী যুগ৷ বিদ্রোহের অবসানের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে শাসনভার সরাসরি চলে যায় ব্রিটিশ সরকারের হাতে৷ শুরু হয় ব্রিটিশ বুর্জোয়াদের পরিচালিত সরকারের শাসন৷ ভারত–শাসন নীতিতে ব্রিটিশ শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ও ব্যাঙ্ক পরিচালকদের প্রভাব ক্রমবর্ধমান হয়ে ওঠে৷ সরকারের শাসন–নীতিতে, দৃষ্টিভঙ্গিতে অনেক পরিবর্তন আসে৷ বিদ্রোহ পরাস্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের সম্রাট–রাজা–নবাব– সামন্তী শাসন ফিরে পাওয়ার সমস্ত চেষ্টার অবসান ঘটে৷ মৃত্যু ঘটে পুরনো ভারতবর্ষের৷ যাত্রা শুরু হয় এক নতুন ভারতের উদ্দেশ্যে৷

১৮৫৭ সালে বিদ্রোহের আগে ভারতে যে সমাজ সংস্কার আন্দোলন গড়ে উঠেছিল ব্রিটিশ সরকার সেগুলিতে কিছুটা হলেও সহায়তা করেছিল৷ সতীদাহ প্রথার মতো বর্বর সামাজিক প্রথার বিরুদ্ধে রাজা রামমোহন রায়ের নেতৃত্বে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল তার পরিণতিতে সরকার সতীদাহ নিষিদ্ধ করে আইন তৈরি করেছিল৷ বিধবা বিবাহের পক্ষে এবং অন্য কতকগুলি প্রথার বিরুদ্ধেও আইন তৈরি করেছিল৷ শাসন কায়েম রাখার প্রয়োজনে হলেও শিক্ষার বিস্তারে কিছুটা ভূমিকা নিয়েছিল৷ সিপাহি যুদ্ধের পর সামাজিক প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে সংগ্রামেই শুধু নয়, প্রগতিশীল কাজের ব্যাপারেও সরকারের ঔদাসীন্য প্রকট হয়ে ওঠে৷

বিদ্যাসাগর সংস্কৃত কলেজে অধ্যক্ষের দায়িত্ব নেওয়ার পর (২২ জানুয়ারি, ১৮৫১) সেখানকার শিক্ষাপদ্ধতি, সিলেবাস প্রভৃতির আমূল পরিবর্তন ঘটান৷ তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রমে সংস্কৃত কলেজ আধুনিক বাংলা শিক্ষার একটি প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে৷ সরকারও ইংরেজি শিক্ষার পাশাপাশি বাংলা স্কুল স্থাপনের উদ্যোগ নেয়৷ প্রথমে প্রতিটি জেলায় একটি করে মডেল স্কুল স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার৷ বিদ্যাসাগরের স্কুল পরিচালনা এবং শিক্ষার বিভিন্ন বিষয়ে প্রভূত অভিজ্ঞতা বিবেচনা করে তাঁকে ইনস্পেক্টর হিসাবে নিয়োগ করা হয়৷ একই সঙ্গে তিনি বিস্তৃত গ্রাম বাংলায় আধুনিক শিক্ষাকে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে ব্রিটিশের সহায়তাকে পুরোপুরি কাজে লাগান৷ সংসৃক্ত কলেজের অধ্যক্ষ পদে নিযুক্ত হওয়ার পর থেকে দু’দশক ধরে শিক্ষাবিস্তার, স্ত্রী শিক্ষা প্রচলন, বিধবাবিবাহ আন্দোলন, বহুবিবাহ রোধ, তত্ত্ববোধিনী ও সোমপ্রকাশ পত্রিকার মাধ্যমে জ্ঞানচর্চা ও সাংবাদিকতার পৃষ্ঠপোষকতা, গ্রন্থ রচনা প্রভৃতি নানা রকম সামাজিক কাজে নিযুক্ত থাকেন৷

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনকর্তা হিসাবে লর্ড ডালহৌসি যখন একদিকে দেশীয় রাজ্যগুলিকে ছলে–বলে–কৌশলে গ্রাস করছেন– যা ভারতে ব্রিটিশের সামগ্রিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পথকে সুগম করেছিল– অন্য দিকে তখনই এ দেশে ব্রিটিশ পুঁজির স্বার্থে রেলপথ, টেলিগ্রাফ ও ডাক চলাচলের মারফত আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ও নতুন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠছে৷

১৮৫৪ সালে ছোটলাট ফ্রেডরিক জে হ্যালিডে বিদ্যাসাগরের সহায়তায় শিক্ষার প্রসারে উদ্যোগী হন৷ ১৮৫৬ সালে কলকাতার নিকটবর্তী চারটি জেলায় বিদ্যাসাগর পাঁচটি করে মডেল স্কুল স্থাপন করেন৷ এই সব স্কুলগুলির জন্য উপযুক্ত শিক্ষকের অভাব পূরণের জন্য বিদ্যাসাগরের সংসৃক্ত কলেজেই একটি শিক্ষক–শিক্ষণ বিদ্যালয় তথা নর্মাল স্কুল স্থাপন করে৷ সেটিরও দায়িত্ব ছিল বিদ্যাসাগরের উপর৷

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাহেবদের মধ্যে যাঁরা তুলনামূলক ভাবে উদার প্রকৃতির, যাঁদের চিন্তাধারায় পাশ্চাত্য নবজাগরণের প্রভাব রয়েছে, যাঁদের সাহায্য নিলে সমাজসংস্কার ও শিক্ষাবিস্তারের কাজ ত্বরান্বিত হবে, বিদ্যাসাগর অকুণ্ঠচিত্তে তাঁদের সাহায্য নিয়েছেন৷ যদিও তিনি এই সব কাজে সাহেবদের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকেননি৷ অর্জিত জ্ঞান, চারিত্র্য–গৌরব এবং অসামান্য কর্মক্ষমতাই ছিল বিদ্যাসাগরের ঐশ্বর্য, যার দ্বারা তিনি সমাজে এবং সাহেবদের মধ্যে তথা প্রশাসনিক মহলে মর্যাদা ও প্রতিষ্ঠা অর্জন করেছিলেন৷ বিদ্যাসাগরের চরিত্রের অসামান্য দৃঢ়তা, যুক্তিবাদী সংস্কারমুক্ত সেকুলার চিন্তাধারা এবং অফুরন্ত কর্মশক্তি– এক কথায়, যেসব গুণাবলির জন্য মাইকেল মধুসূদন বিদ্যাসাগরের মধ্যে ইউরোপীয় চরিত্রবৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করেছিলেন– সেগুলির জন্যই সাহেব মহলে তাঁর বিরাট সম্মান এবং প্রতিপত্তি গড়ে উঠেছিল৷ এই প্রতিপত্তিকেই তিনি সমাজসংস্কার ও শিক্ষার প্রসারের কাজে লাগিয়ে ছিলেন৷

বিপত্তি শুরু হল সিপাহি বিদ্রোহের পর ব্রিটিশের ভারতনীতিতে আমূল পরিবর্তন ঘটে যাওয়ায়৷ সিপাহি বিদ্রোহের আগে পর্যন্ত ব্রিটিশ পণ্যের বাজার তৈরির স্বার্থেই খুব ধীরগতিতে হলেও সরকার ভারতীয় সমাজের আধুনিকীকরণের কিছু কিছু পদক্ষেপ নিয়ে চলছিল৷ শিশুহত্যা, সতীদাহ নিবারণ, টিকার প্রচলন, বিধবা বিবাহ আইন চালু করা, নারী শিক্ষা প্রচলন কলেজ শিক্ষায় ভূতত্ব, জোতির্বিজ্ঞানের শিক্ষাগুলির প্রচার, ডাক্তারি শিক্ষায় শবদেহ ব্যবচ্ছেদ প্রভৃতি বিষয়গুলি সমাজকে অজ্ঞতা, অন্ধতা, পশ্চাৎপদতা প্রভৃতির থেকে মুক্ত হতে অনেকখানি সাহায্য করেছিল৷ বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ সরকারের ধারণা হয়, এই আধুনিক শিক্ষাগুলিকেই হিন্দু ও মুসলমান ধর্মের বিরুদ্ধে আক্রমণ বলে সিপাহি ও জনসাধারণকে খেপিয়ে তোলা হয়৷

ব্রিটিশের এই ধারণা একেবারেই সঠিক ছিল না৷ কারণ সামাজিক সংস্কারের পক্ষে যে আন্দোলন তা সম্পূর্ণভাবে ভারতীয় সমাজেই শুরু হয়৷ সতীদাহ, বাল্যবিবাহ, বিধবাবিবাহ বা বহুবিবাহের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার কাজ রামমোহন, বিদ্যাসাগরের মতো ভারতীয়রাই করেছিলেন এবং তার পক্ষে দেশীয় মানুষের সমর্থন জোগাড় করেছিলেন৷

এরপর থেকে ব্রিটিশ যে কোনও রকমের প্রগতিবাদী কাজে উৎসাহ দেখায়নি৷ তার আঘাত সরাসরি এসে পড়ে বিদ্যাসাগরের সংস্কারমূলক ও শিক্ষাপ্রসারের কাজের উপর৷ বিধবা বিবাহ আইন পাশের পর বিদ্যাসাগর বহু বিবাহের মারাত্মক কুফল থেকে সমাজকে মুক্ত করতে আন্দোলন গড়ে তোলেন৷ কিন্তু এই কাজে তিনি আর ব্রিটিশের সহায়তা পাননি৷ ব্রিটিশ এই সংক্রান্ত আইন পাশ করাতে রাজি হয়নি৷ শিক্ষাবিস্তারের ক্ষেত্রে বিদ্যাসাগরের আদর্শ ও লক্ষ্যের সঙ্গে ব্রিটিশ প্রশাসন ও আমলাতন্ত্রের বারবার বিরোধ বেধেছে৷ বিদ্যাসাগরের লক্ষ্য ছিল শিক্ষার বিস্তার ঘটিয়ে আধুনিক মানুষ তৈরি করা৷ ব্রিটিশ এ দেশে সরকারি প্রশাসনে সহায়তার জন্য কিছু কেরানি তৈরি করতে চেয়েছিল৷ স্বাভাবিক ভাবেই ব্রিটিশ প্রশাসন এবং শিক্ষাবিভাগের সাথে তার পদে পদে বিরোধ ঘটতে থাকে৷ শিক্ষার প্রসার বিশেষত স্ত্রী–শিক্ষার প্রসারে বিদ্যাসাগর সেই সময় যে বিরাট উদ্যোগ নিয়েছিলেন সে ক্ষেত্রেও ব্রিটিশ মনোভাব প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়৷ এতদিন পর্যন্ত বিদ্যাসাগর শিক্ষার প্রসারে যেভাবে ব্রিটিশের সহায়তা পেয়েছিলেন তাতে তাঁর ধারণা হয়েছিল বালিকা বিদ্যালয় স্থাপনেও সেই একই রকম সহায়তা পাবেন৷ এ ব্যাপারে এমনকি তিনি তৎকালীন ছোটলাট হ্যালিডের সমর্থন পেলেও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এ কাজে সহায়তা করতে অক্ষমতা প্রকাশ করে৷ নভেম্বর ১৮৫৭ থেকে মে ১৮৫৮, এই কয়েক মাসের মধ্যে বিদ্যাসাগর দক্ষিণবঙ্গে চারটি জেলায় ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন৷ কিন্তু বেঁকে বসে কর্তৃপক্ষ৷ জানিয়ে দেয়, সরকার এই খাতে আর কোনও টাকা খরচ করবে না৷ এই অবস্থায় বিদ্যাসাগর সরকারের মুখাপেক্ষী না থেকে স্কুলগুলি পরিচালনার জন্য একটি নারীশিক্ষা–প্রতিষ্ঠান খোলেন৷ এই ভাবে পরিচিত ব্যক্তিদের থেকে আর্থিক সাহায্য নিয়ে তিনি বিদ্যালয়গুলিকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেন৷

তিনি ১৮৫৮–র ২৮ সেপ্ঢেম্বর শিক্ষা বিভাগের ডিরেক্টরের কাছে সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষের পদ থেকে তাঁর পদত্যাগপত্র পেশ করেন৷ পদত্যাগের কারণ হিসাবে এই পত্রে তিনি স্বাস্থ্যের অবনতির কথা বললেও তাতে আরও লিখেছিলেন, ‘‘ভবিষ্যতে এই প্রতিষ্ঠানের উন্নতির কোনও আশা নেই৷ … তা ছাড়া কর্তব্যনিষ্ঠ কোনও আদর্শ কর্মী সরকারি বিভাগীয় কর্মচারীদের কাছ থেকে যে সহানুভূতি পাওয়া একান্ত বাঞ্ছনীয় মনে করেন, আমি অনুভব করছি, আমার পক্ষে আর তা পাওয়া সম্ভব হবে না৷’’

বলা বাহুল্য, এই সহানুভুতি না পাওয়ার কারণ ব্যক্তিগত ছিল না৷ ব্রিটিশ সরকার শিক্ষাসংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গিই পুরোপুরি বদলে ফেলেছিল৷ শিক্ষার মান অপেক্ষা ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য–শাসনের সহায়ক হিসাবে কিছু ডিগ্রিধারী বাড়ানোই তাদের প্রয়োজন হিসাবে দেখা দিয়েছিল৷ এর ফলে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় দেশে ডিগ্রিধারীর সংখ্যা বাড়তে থাকে৷ বিদ্যাসাগর নিছক ডিগ্রির শিক্ষা চাননি৷ তাই সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা থেকে তিনি নিজেকে সরিয়ে নেন৷ ডিগ্রি–ভিত্তিক এই শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে বিদ্যাসাগর অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে বলেছিলেন, ‘‘আমাদের যে–সব ছেলে আছে, তাদের কাছ থেকে আমরা মাহিনা নিই, পাঙ্খা ফি নিই, একজামিনেশন ফি নিই, নিয়ে কলের দোর খুলি,– দেখাইয়া দিই এইখানে মাষ্টার আছে, এইখানে পণ্ডিত আছে, এইখানে বই আছে, এইখানে বেঞ্চি আছে, এইখানে চেয়ার আছে, এইখানে কালি কলম দোয়াত পেন্সিল সিলেট সবই আছে৷ বলিয়া তাহাদের কলের ভেতর ফেলিয়া দিয়া চাবি ঘুরাইয়া দিই৷ কিছুকাল পরে কলে তৈয়ারী হইয়া তাহারা কেহ সেকেন ক্লাস দিয়া, কেহ এন্ট্রেন্স হইয়া, কেহ এল এ হইয়া, কেহ বি এ হইয়া, কেহ বা এম এ হইয়া বেরোয়৷ কিন্তু সবাই লেখে I has একই পাকের তৈরি কিনা৷’’

সিপাহি বিদ্রোহের সময় বিদ্যাসাগর সংস্কৃত কলেজ সিপাহিদের ছাউনির জন্য খুলে দিয়েছিলেন, কেউ কেউ এমন অভিযোগ তোলেন৷ এই অভিযোগের কোনও সত্যতা নেই৷ সংসৃক্ত কলেজ ছিল সরকারের অধীন৷ তা দেওয়া না দেওয়া বিদ্যাসাগরের ইচ্ছাধীন ছিল না৷ বরং এর ফলে কলেজে পড়াশোনার অসুবিধা হবে– এ কথা চিন্তা করে তিনি যে কলেজ বন্ধ করতে চাননি তা কর্তৃপক্ষের সাথে তাঁর চিঠি বিনিময়েই (১১ আগস্ট, ১৮৫৭) স্পষ্ট৷ তার উত্তরে বাংলা গভর্নমেন্টের সেক্রেটারি তাঁকে লেখেন, (১৭ আগস্ট ১৮৫৭), ‘‘আপনার ১১ তারিখের চিঠির উত্তরে আমি ভারত সরকারের সামরিক বিভাগের সেক্রেটারির একখানি চিঠির কপি আপনাকে পাঠাচ্ছি৷ সেই চিঠিতে আপনি দেখতে পাবেন, হিন্দু ও মাদ্রাসা কলেজের অট্টালিকা দুটি সৈন্যদের বাসের জন্য গভর্নমেন্ট সাময়িক ভাবে দখল করবেন মনস্থ করেছেন৷ … আপনাকে তাই অনুরোধ করছি যে আপনি আর বিলম্ব না করে এখনই গ্যারিসন কমান্ডারের হাতে আপনার বিদ্যালয় গৃহ ছেড়ে দেবার বন্দোবস্ত করবেন৷’’ বুঝতে অসুবিধা হয় না, সরকারি হুকুম সত্ত্বেও বিদ্যাসাগর কলেজ ছাড়তে দেরি করছিলেন৷

সেই সময় আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত বহু মানুষই নানা কারণে সিপাহি বিদ্রোহকে সমর্থন করতে পারেননি৷ সে যুগের শিক্ষিত মানুষেরা দেখেছিলেন, বিদ্রোহের নেতৃত্বে বহু জমিদার আছে, রাজা–বাদশা আছে, তারা সিপাহি বিদ্রোহের পৃষ্ঠপোষকতা করছে৷ এসব রাজা–বাদশা হারানো রাজ্য ফিরে পেতে ধর্মীয় উন্মাদনা জাগিয়ে তুলছে৷ বন্দুকের টোটায় গরু ও শুয়োরের চর্বি দিয়ে হিন্দু–মুসলমানের জাত মারছে বলে ধর্মীয় সংস্কারকে কাজে লাগিয়েছে৷ শোষক–উৎপীড়ক দেশীয় রাজা–বাদশাদের প্রতি বিদ্যাসাগরেরও বিশেষ সমর্থন ছিল না৷ তাই ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক রাজা–বাদশাদের বিরোধিতায় তিনি বিচলিত হননি৷ তিনি বিশেষভাবে ভেবেছেন এ দেশে তমসাচ্ছন্ন সামাজিক অবস্থার কথা৷ শিক্ষাপ্রসার ও সমাজসংস্কারের মধ্য দিয়ে মানুষকে সামন্তী কূপমণ্ডুকতা ও অন্ধতা থেকে মুক্ত করে আধুনিক মানুষে পরিণত করার পথই তিনি খুঁজেছেন৷ পরবর্তী কালে ‘বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব’–এর শুরুর দিকেই প্রসঙ্গক্রমে সিপাহি বিদ্রোহকে বিদ্যাসাগর ‘রাজবিদ্রোহ’ বলেই আখ্যায়িত করেছেন এবং ব্রিটিশ শাসকরা যে শঙ্কিত হয়ে সেই রাজবিদ্রোহ ‘নিবারণ’ অর্থাৎ দমন করেছিল সে কথাও তিনি স্পষ্টভাবে লিখেছেন৷ (চলবে)

(গণদাবী : ৭২ বর্ষ ২ সংখ্যা)