Breaking News
Home / খবর / নবজাগরণের পথিকৃৎ বিদ্যাসাগর(২৪) — নারী মনীষায় বিদ্যাসাগরের প্রভাব

নবজাগরণের পথিকৃৎ বিদ্যাসাগর(২৪) — নারী মনীষায় বিদ্যাসাগরের প্রভাব

নবজাগরণের পথিকৃৎ বিদ্যাসাগর

ভারতীয় নবজাগরণের পথিকৃৎ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের দ্বিশত জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এই মহান মানবতাবাদীর জীবন ও সংগ্রাম পাঠকদের কাছে ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হচ্ছে৷

(২৪)

নারী মনীষায় বিদ্যাসাগরের প্রভাব

কলকাতার হেদুয়াতে ১৮৪৯ সালে ‘ফিমেল স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বেথুন সাহেব৷ কিন্তু, এমনকি শিক্ষিত অভিভাবকেরাও তাঁদের পরিবারের মেয়েদের সেই স্কুলে পাঠাতে ভয় পেতেন৷ কিসের ভয়? চরম রক্ষণশীল সমাজপতিদের ভয়৷ সেই আপাদমস্তক কুসংস্কারাচ্ছন্ন তথাকথিত সমাজপতিদের সামাজিক দাপট তখন ছিল প্রবল৷ তাঁরা বলতেন, ‘মেয়েদের লেখাপড়ায় শাস্ত্রের নিষেধ আছে৷ ম্লেচ্ছদের কথা শুনে মেয়েমানুষে যদি লেখাপড়া করে, তবে তারা অকালে বিধবা হবে, সমাজ উচ্ছন্নে যাবে৷’ তাই বেথুন সাহেবের স্কুল চলছিল না৷ তখন নানা দিক ভেবে তিনি বুঝলেন, এই পরিস্থিতি থেকে তাঁকে উদ্ধার করতে পারেন একমাত্র বিদ্যাসাগরই৷ অতএব, স্কুল চালাবার দায়িত্ব নিতে তিনি অনুরোধ করেন বিদ্যাসাগরকে৷

বিদ্যাসাগর সাগ্রহে সেই কঠিন দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন এবং প্রায় এক অসাধ্যসাধনে নিয়োজিত করেন নিজেকে৷ তিনি মেয়েদের বাড়ি–বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের শিক্ষার গুরুত্ব বোঝাতে শুরু করেন৷ বহু বাড়িতে অপদস্থ হন, কিন্তু হাল না ছেড়ে একের পর এক দরজায় ঘুরতে থাকেন৷ নারীশিক্ষার পক্ষে শাস্ত্রের শ্লোক উদ্ধার করে রক্ষণশীলদের মুখ বন্ধ করেন৷ এইভাবে বিদ্যাসাগরের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর ওই স্কুল কার্যত চালু হয়৷ বেথুন সাহেবের মৃত্যুর পর স্কুলটির নাম হয় ‘বেথুন স্কুল’ এবং পরবর্তী কালে স্কুলের সাথে ‘বেথুন কলেজ’৷ একের পর এক মেয়েরা এখানে আসতে শুরু করে৷ এই মেয়েদের মধ্যেই ছিলেন কামিনী রায় (১৮৬৪–১৯৩৩), যিনি পরবর্তীকালে এখানে শিক্ষকতাও করেছেন৷ ১৮৮৯ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘আলো ও ছায়া’র অন্যতম প্রধান কবিতা ‘সুখ’ কবিতায় তিনি লিখেছেন, ‘‘পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি/এ জীবন মন সকলই দাও/তার মত সুখ কোথাও কি আছে/আপনার কথা ভুলিয়া যাও৷’’– এ কি বিদ্যাসাগরের নবজাগ্রত জীবনবোধ প্রকাশেরই প্রচেষ্টা?

বিদ্যাসাগরের প্রয়াণ (২৯ জুলাই ১৮৯১)–এর পর ৮ আগস্টের দুপুরে বেথুন কলেজে একটি স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়৷ সেদিনের সেই ‘স্বর্গীয় বিদ্যাসাগরের স্মরণার্থ মহিলা সভা’য় ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে প্রায় ৩০০ মহিলা উপস্থিত হয়েছিলেন৷ সেখানে উপস্থিত ছিলেন ওই কলেজের ছাত্রী–শিক্ষিকা–অভিভাবকেরা৷ উপস্থিত ছিলেন চন্দ্রমুখী বসু, কাদম্বিনী গাঙ্গুলি, অবলা বসু প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব (এঁরা প্রত্যেকেই বেথুন কলেজের কৃতী ছাত্রী ছিলেন এবং পরবর্তীকালে নারীশিক্ষা প্রসারে ও অন্যান্য সামাজিক কাজে ভূমিকা পালন করেছিলেন)৷ সেই সভার কার্যক্রম পরিচালনা করেন কবি কামিনী রায়৷

সেদিনের স্মরণসভায় আবেগমথিত কণ্ঠে কবি কামিনী রায় বলেছিলেন, ‘‘তাঁহার (বিদ্যাসাগরের) গুণের কথা আমাদের দেশে আবালবৃদ্ধবণিতা সকলেই অবগত আছেন৷ উপস্থিত মহিলাগণের মধ্যে অনেকে হয়ত সাক্ষাতভাবে তাঁহার সহিত পরিচিত ছিলেন৷ তাঁহার ঋষিতুল্য চরিত্র, অলোকসামান্য মনীষা, গভীর শাস্ত্রজ্ঞান, তাঁহার অশ্রুতপূর্ব পরদুঃখকাতরতা, তাঁহার আশ্চর্য দানশীলতা, তাঁহার স্থির প্রতিজ্ঞা এবং তাঁহার নির্ভীকতা– আর কত গুণের কথা বলিব? একাধারে এত গুণের সমবায় বর্তমান সময়ে আর দেখা যায় না৷ তাঁহার বিয়োগে বঙ্গ সমাজ– সমগ্র ভারতবর্ষ এক প্রকারে নয়– বহু প্রকারে ক্ষতিগ্রস্ত৷ সমগ্র দেশ তাঁহার নিকট ঋণী৷ কিন্তু স্ত্রীশিক্ষা প্রচারে সাহায্য করিয়া, বাল্যবিধবাদের পুনঃসংস্কারবিধি প্রণয়ন করিয়া, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ প্রভৃতি কদাচারের বিরুদ্ধে আজীবন সংগ্রাম করিয়া তিনি ভারতবাসীকে অপরিশোধ্য ঋণে আবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন৷ তাঁহার মৃত্যুতে আমরা সর্ব্বপ্রধান হিতাকাঙক্ষী ও হিতকর হৃদয়বান সুহূদের স্নেহ হইতে বঞ্চিত হইয়াছি৷ চিরদিন অন্তরে ও বাহিরে তাঁহার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা আমাদের একান্ত কর্তব্য৷’’…

‘‘যদি শুদ্ধ ন্যায় ও সত্যের অনুরোধে সহস্র প্রতিকূল ঘটনার মধ্যে অটলভাবে দণ্ডায়মান থাকাতে বীরত্ব থাকে, যদি স্বীয় ব্রত প্রতিপালনের জন্য প্রাণ পর্যন্ত বিসর্জ্জনে উন্মুখ থাকাতে বীরত্ব থাকে, তবে তিনি প্রকৃত অর্থে বীর ছিলেন৷ তাঁহার অভাব আজ ভাষাতে প্রকাশ করা কঠিন৷ … তাঁহার দেহ ভস্মীভূত হইয়াছে৷ কিন্তু আমরা তাঁহাকে হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত রাখিয়া চিরদিন পূজা করিব৷’’ অন্তরের অন্তস্তল থেকে অবারিত শ্রদ্ধা ও অকৃত্রিম কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে কবি কামিনী রায় শ্রোতাদের উদ্দেশে আবেদন জানিয়েছিলেন, ‘‘…যেন তাঁহারা নিজ নিজ গৃহে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের সদ–গুণাবলী সর্ব্বদা সন্তানদিগের নিকট মুখে মুখে বিবৃত করেন এবং সন্তানদিগের চরিত্র তাঁহার চরিত্রের অনুরূপ করিয়া তুলিতে চেষ্টা করেন৷ তাহা হইলে রত্নগর্ভা বিদ্যাসাগরের মাতার ন্যায় আপনারাও ধন্য হইবেন এবং বিদ্যাসাগর মহাশয় পরলোকগত হইয়াও স্বদেশীয়দিগের চরিত্রের মধ্যে জীবিত থাকিয়া চিরদিন ভারতের কল্যাণ সাধন করিবেন৷’’

১৮৯১ সালে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সম্পর্কে কবি কামিনী রায়ের এই উপলব্ধি এক ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার স্বরূপ৷ তৎকালীন ‘বামাবোধিনী’ পত্রিকা তাঁর বক্তব্য প্রকাশ করেছিল, ভাদ্র ১২৯৮ সংখ্যায়৷ বিদ্যাসাগর তাঁর জীবতকালেই বিখ্যাত হয়ে উঠলেও, তাঁর অবদান–মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কবি কামিনী রায়ের হৃদয়–উৎসারিত বক্তব্য বাংলার অগণিত মানুষকে আলোড়িত করেছিল, বিদ্যাসাগর চরিত্র–চর্চার ভিত্তিভূমি তৈরি করেছিল৷

শিক্ষাপ্রসার ও অন্যান্য সামাজিক আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন কামিনী রায়৷ ছাত্রীদের উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন সেসব কাজে৷ পাশাপাশি তাঁর কাব্যসাধনাও ছিল বিদ্যাসাগরের মহাজীবন অনুসারী৷ দেশাচারের অপশাসন উপেক্ষা করে, এমনকি প্রাণ বাজি রেখেও, অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজকে আলোকিত কর– এই কর্তব্য পালনের যে অমূল্য শিক্ষা বিদ্যাসাগর নিজের জীবন দিয়ে স্থাপন করেছেন, তা পালনের ক্ষেত্রে সমাজে শৈথিল্য দেখা যায়৷ ‘সত্য’ জেনেও, ‘কর্তব্য’ জেনেও অনেকে সমাজপ্রগতির কাজে এগিয়ে আসেন না৷ লোকজনের এই মানসিকতা একসময় বিদ্যাসাগরকে ব্যথিত করেছিল৷ সেই ব্যথা কাব্যে রূপ দিয়েছিলেন কামিনী রায়৷ ‘চাহিবে না ফিরে’ কবিতায় তিনি লিখেছেন, ‘‘পথে দেখে ঘৃণাভরে/কত কেহ গেল সরে/উপহাস করি কেহ যায় পায়ে ঠেলে৷/কেহ বা নিকটে আসি/বরষি সাত্ব্ন্না রাশি/বঞ্চিতেরে ব্যথা দিয়ে যায় শেষে ফেলে৷’’ তিনি দেখেছেন নারী কী সাংঘাতিকভাবে অবদমিত এবং সেই নিপীড়ন দেখে শিক্ষিত মেয়েরাও নির্বিকার৷ গভীর পরিতাপের সাথে তিনি লিখেছেন, ‘‘ভারতে রমণী হারায় মান/শুনিয়া নিশ্চিন্ত রয়েছিস সবে/তোদের সতীত্ব শুধু কি ভান?/রমণীর তরে কাঁদে না রমণী/লাজে অপমানে জ্বলে না হিয়া/রমণী শকতি অসুরদলনি/তোরা নিরমিত কি ধাতু দিয়া?’’ ‘পাছে লোকে কিছু বলে’ কবিতায় কামিনী রায় লিখেছেন, ‘‘করিতে পারি না কাজ/সদা ভয় সদা লাজ/সংশয়ে সঙ্কল্প সদা টলে/পাছে লোকে কিছু বলে৷/ …মহৎ উদ্দেশ্য যবে/একসাথে মিলি সবে/পারি না মিলিতে সেই দলে/পাছে লোকে কিছু বলে৷’’ বিদ্যাসাগর যেন ছিলেন তাঁর জীবনের ধ্রুবতারা৷ তাঁর ‘লক্ষ্যতারা’ কবিতার দুটি পঙক্তি যেন বিদ্যাসাগরের প্রতি তাঁর বিনম্র প্রণাম, ‘‘বিশাল গগনমাঝে এক জ্যোতির্ময়ী তারা/তাহারেই লক্ষ্য করি চলিয়াছি অবিরাম৷’’ ‘বিদ্যাসাগর স্মৃতি’ কবিতায় তিনি লিখেছেন, ‘‘ঘন আঁধারের মত বঙ্গদেশ/ছেয়েছে গভীর শোক,/করি উদযাপন জীবনের ব্রত,/এথাকার রবি আজি অস্তগত/কোথায় উদিছে নূতন দিনেশ/উজলিতে নবলোক৷/সেই দানশীল বিধাতার দান/জ্ঞান পুণ্য তেজোময়,/কাঙাল ভারতে দিয়াছিলা বিধি/কি তপস্যা ফলে সে অমূল্য নিধি?’’

একই ভাবে আমরা পাই কবি মানকুমারী বসু–কে (১৮৬৪–১৯৪৩)৷ তিনি শ্মশানে বিদ্যাসাগরের মৃতদেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন৷ বাড়ি ফিরে শোকসন্তপ্ত হৃদয়ে লেখেন, ‘‘আজি বেলা ৭ টার সময় নিমতলার ঘাটে গঙ্গাস্নান করিতে গিয়া যে হৃদয়–বিদারক দৃশ্য দেখিলাম, তাহা ভাষায় বলিতে পারি না৷ দেখিলাম মানবজগতের এক প্রদীপ্ত সূর্য্য খসিয়া পড়িয়াছে, ভারতবাসীর প্রধান অহঙ্কার শেষ হইয়াছে, বঙ্গভূমির উচ্চ গৌরব হারাইয়াছে দেখিলাম সেই অগতির গতি, অসহায়ের সহায়, অনাথের বন্ধু আমাদের বিদ্যাসাগর মহাশয় এ জনমের মত আমাদিগকে ফাঁকি দিয়াছেন আজি আর কাঙালের দাঁড়াইবার আশ্রয় নাই, হতভাগ্যের অশ্রু মুছিবার স্থান নাই, দগ্ধ–হৃদয় জুড়াইবার উপায় নাই৷ …আজি বঙ্গজননী নয়নের মণি, আঁচলের নিধি হারাইয়া ফেলিয়াছেন আজি আমরা সকলেই পিতৃহীন হইয়াছি …বিদ্যাসাগর মহাশয় কাহারও নিজের সম্পত্তি নহে৷ জল, বায়ু, চন্দ্র, সূর্য্যের মত আমাদের বিদ্যাসাগর মহাশয়ও সকলের জিনিস৷ …এক কথায় বলিতে গেলে যাহার হৃদয়ে এতটুকু ব্যথা আছে, যাহার এতটুকু অভাব আছে, বিদ্যাসাগর মহাশয় তাহারই৷ …আমরা সকলেই বিদ্যাসাগর মহাশয়ের নিকটে সহস্র ঋণী৷…’’

‘‘এ চিতার আগুন নিভিবে ও দেহের শেষ চিহ্ণ ফুরাইবে, কিন্তু বিধবা রমণীর বুকের আগুনের মত ভারতের বুকের স্তরে স্তরে এই শোকের আগুন জ্বলিতে থাকিবে৷ আজি যে ময়ূরাসন, যে রাজাসন শূন্য হইল, সেখানে বসিবার রাজা– মহারাজা– সম্রাট বুঝি আর মিলিবে না এ অমূল্য রত্ন, এ দেবদুর্লভ রত্ন হারাইয়া ভারতের– জগতের বলিলেও ক্ষতি হয় না– যে নিদারুণ অভাব হইল, বুঝি সহস্র বৎসরেও সে অভাব পূর্ণ হইবে না…’’

‘‘তা এখন একটী কথা জিজ্ঞাসা করি, বলি আমাদের বিদ্যাসাগর মহাশয় কি মরিবার ছেলে? যিনি কোটী কোটী মৃত্যু পদদলিত করিয়া চলেন, তাঁহার কি মৃত্যু হইতে পারে? না, আমাদের বিদ্যাসাগর মহাশয় মরিতে জানেন না৷ অনেক রকম জানেন– মানুষ কেমন করিয়া দেবতা হয় জানেন, স্বাবলম্বনের বলে গরিবের ছেলে কেমন করিয়া রাজাধিরাজ হইতে পারে তাহা জানেন, মরজগৎকে কেমন করিয়া স্বর্গ করিতে হয় তাহা জানেন, জগতের প্রত্যেক নরনারীকে কেমন করিয়া ‘আপনার জন’ করিতে হয় তাহা জানেন, এই বিশ্ব জগৎ কি করিয়া এক বাঁধনে বাঁধিতে হয় তাহা জানেন, বিদ্যাসাগর মহাশয়ের মত দেবতা হইতে হইলে যাহা কিছু জানিতে হয় সবই জানেন, কেবল মরিতে জানেন না, দেবতার মৃত্যু নাই, আমাদের বিদ্যাসাগর মহাশয় মৃত্যুঞ্জয়৷…’’

‘‘তাই বলিতেছি, রামা মরিতে জানে, শঙ্করা মরিতে জানে, তাহাদের মত শত সহস্র প্রাণী নিত্যই মরিয়া থাকে, বুঝি কত বিদ্যাবিনোদ, বিদ্যাবাগীশেরাও মরিতে পারেন, কিন্তু আমাদের বিদ্যাসাগর মহাশয় কোনও দিন মরিতে জানেন না৷ …আমাদের বিদ্যাসাগর মহাশয়, যিনি চিরদিন সমভাবে আমাদের সকলের মঙ্গলের জন্যই খাটিয়াছেন, যিনি মৃত্যুর শেষ মুহূর্ত্তেও আমাদের মঙ্গল চিন্তা করিয়াছেন, যিনি অসহনীয় অকৃতজ্ঞতা, পৈশাচিক কৃতঘ্নতা অনায়াসে পদদলিত করিয়াছেন, আমাদের সেই বিদ্যাসাগর মহাশয় আমাদিগকে ছাড়িয়া কখনও যাইতে পারেন না আজি মৃত্যু তাঁহাকে স্পর্শ করিয়া অমর হইয়াছে৷ আমাদের বিদ্যাসাগর মহাশয় মৃত্যুঞ্জয় হইয়া আমাদের নিকটে বিরাজ করিতেছেন৷’’ ‘বামাবোধিনী’ পত্রিকা তাঁর এই লেখাটিও প্রকাশ করেছিল, ভাদ্র ১২৯৮ সংখ্যায়৷

কবি মানকুমারী বসুর এই লেখা পড়লেই বোঝা যায়, রক্ষণশীল সমাজপতিদের প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও সমকালীন মানুষজনের হৃদয়ের সর্বোচ্চ আসনটিতেই ছিল বিদ্যাসাগরের স্থান৷ যারা প্রত্যক্ষভাবে তাঁর সংস্পর্শে আসেনওনি, তারাও কী গভীরভাবে আবেগআপ্লুত ছিলেন এই মানুষটির ব্যক্তিত্বের প্রতি৷ বিদ্যাসাগরও এঁদের লেখাপত্র পড়তেন, খোঁজখবর রাখতেন, মন্তব্য করতেন৷ ১৮৮৯ সালে লেখা কুসুমকুমারী দেবীর ‘স্নেহলতা’ উপন্যাস পড়ে তিনি বলেছিলেন, ‘‘সমাজচরিত্র জানিবার পক্ষে ইহা একখানি সুন্দর গ্রন্থ৷ স্বাধীন রাজ্য হইলে ইহার পঞ্চবিংশতি সংস্ক্রণ হইত বলিলেও অত্যুক্তি হয় না৷’’ মানকুমারী বসু তাঁর কাব্যসাধনার মধ্য দিয়েও বিদ্যাসাগরের মতো চরিত্র নির্মাণের চেষ্টা করেছেন৷ বিদ্যাসাগর সম্পর্কে কবিতায় তিনি লিখেছেন, ‘‘পদধূলি  রাখি শিরে/চল যাই গঙ্গাতীরে/ঘরে ঘরে হবে সেই দেব–অভ্যুদয়/এ যে গো প্রতিষ্ঠা/এ তো বিসর্জন নয়৷/ …খুলিয়া বুকের পাতা/দেখ সঞ্জিবনী গাথা/পড় সে ‘বিরাট পুঁথি’ বীরত্বের স্তব/আজি পিতৃপ্রীতি লাগি/হও সবে সর্বত্যাগী/উঠুক দিগন্ত ভেদি কোটি কণ্ঠ–রব৷’’   (চলবে)

(গণদাবী : ৭২ বর্ষ ২২ সংখ্যা)