Breaking News
Home / খবর / নবজাগরণের পথিকৃৎ বিদ্যাসাগর — (২) কর্মজীবন

নবজাগরণের পথিকৃৎ বিদ্যাসাগর — (২) কর্মজীবন

(ভারতীয় নবজাগরণ আন্দোলনের পথিকৃৎ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের দ্বিশত জন্মবার্ষিকী আগতপ্রায়৷ সেই উপলক্ষে এই মহান মানবতাবাদীর জীবন ও সংগ্রাম পাঠকদের কাছে ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হচ্ছে  শিক্ষাগ্রহণের জন্য৷)

(২)

কর্মজীবনে বিদ্যাসাগর

সংস্কৃত কলেজের পাঠ শেষ করার পর বিদ্যাসাগর বীরসিংহে গেলেন৷ ওই সময় মধুসূদন তর্কালঙ্কারের মৃত্যু হওয়ায় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের প্রধান পণ্ডিতের পদ খালি হয়৷ অনেকেই এ পদ পাওয়ার জন্য দরখাস্ত করেন৷ মার্শাল সাহেব ছিলেন ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সেক্রেটারি৷ তিনি বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জ্ঞান ও পাণ্ডিত্য সম্পর্কে অত্যন্ত শ্রদ্ধাবান ছিলেন৷ মার্শাল সাহেবের একান্ত ইচ্ছা ওই পদে বিদ্যাসাগর মহাশয়কে নিয়োগ করা৷ তিনি তাঁকে ওই পদে যোগ দেওয়ার জন্য আহ্বান করলেন৷ পিতা ঠাকুরদাস এ খবর পেয়ে গ্রাম থেকে পুত্রকে কলকাতায় নিয়ে এলেন৷ ১৮৪১ সালের ২৯ ডিসেম্বর থেকে বিদ্যাসাগর হলেন ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের প্রধান পণ্ডিত, যখন তাঁর বয়স মাত্র ২১ বছর৷ পঞ্চাশ টাকা বেতন৷

বিলেত থেকে যে সব সাহেবরা এ দেশে চাকরি করতে আসত তাদের ফোর্ট উইলিয়ম কলেজে বাংলা, হিন্দি, উর্দু ও ফারসি পড়তে হত৷ পরীক্ষায় পাশ করতে পারলে তারা কাজে যোগ দিতে পারত৷ পাশ করতে না পারলে তাদের বিলেতে ফিরে যেতে হত৷ এদের মাসে মাসে যে পরীক্ষা দিতে হত তার খাতা দেখতে হত বিদ্যাসাগর মহাশয়কে৷ হিন্দি পরীক্ষার খাতাও তাঁকে দেখতে হত, আবার অধ্যাপনার প্রয়োজনে ইংরেজদের সঙ্গে তাঁকে যোগাযোগ করতে হত৷ বিদ্যাসাগর হিন্দি ও ইংরেজি ভাল জানতেন না৷ তাই ছাত্রদের ভাল করে পড়ানোর জন্য তিনি হিন্দি, ইংরেজি ও অঙ্ক শিখতে শুরু করলেন৷ একজন হিন্দুস্তানী পণ্ডিতের কাছে ২–৩ মাসে হিন্দি তিনি সহজেই শিখে নিলেন৷ ইংরেজি শেখা তুলনায় কষ্টকর৷ কিন্তু তাঁর ছিল অসাধারণ অধ্যবসায় ও মনোবল৷ ডাক্তার দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ডাক্তার নীলমাধব মুখোপাধ্যায়, হিন্দু কলেজের ছাত্র রাজনারায়ণ গুপ্ত প্রমুখের কাছে তিনি ইংরেজি শিখতে যেতেন৷ শেকসপিয়র পড়বার জন্য শোভাবাজার রাজবাড়িতে আনন্দকৃষ্ণ বসুর কাছে যেতেন৷ এখানে তাঁর অক্ষয়কুমার দত্তের সাথে পরিচয় হয়৷ অক্ষয়কুমার ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার’ সম্পাদক ছিলেন৷ সম্পাদনার কাজ করতে গিয়ে তিনি কিছু প্রবন্ধের অনুবাদ করতেন, রাজা রাধাকান্ত দেব বাহাদুরের অনুরোধে সেগুলি পড়ে বিদ্যাসাগর মহাশয় সংশোধন করে দিতেন৷ অক্ষয়বাবু সেই সুন্দর সংশোধন দেখে অত্যন্ত আনন্দিত হতেন৷ যদিও দু’জনের কেউ কাউকে চিনতেন না৷ পরে তাঁদের পরিচয় হয়৷ অক্ষয়কুমারের অনুরোধে এবং পাঠ্যপুস্তকের অভাব পূরণ করার জন্য বিদ্যাসাগর মহাশয় নিজেই অনুবাদের কাজে হাত দেন৷ তিনি ‘মহাভারত’ অনুবাদ শুরু করেন, এটি তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল৷ কিন্তু তিনি এই অনুবাদ সম্পূর্ণ করেননি৷ পরে ‘হুতোম প্যাঁচার নক্সা’র লেখক কালীপ্রসন্ন সিংহ তাঁর সম্মতি নিয়ে সম্পূর্ণ মহাভারত অনুবাদ করেন৷

নিজে অন্যের কাছে ইংরেজি শিখতেন, আবার হাইকোর্টের অন্যতম অনুবাদক শ্যামাচরণ সরকার, রামরতন মুখোপাধ্যায়, নীলমণি মুখোপাধ্যায়, রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মার্শাল সাহেব প্রমুখ অনেকেই তাঁর কাছে সংস্কৃত ও বাংলা শিখতে আসতেন৷ তাঁর শেখানোর পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত সহজ৷ সহজ উপায়ে সংস্কৃত শিক্ষার জন্য তিনি উপক্রমণিকা লেখেন৷ কলেজে পড়ানোর সাথে সাথে নিজে হিন্দি, ইংরেজি শেখা, সংস্কৃত শেখানো, এর জন্য সহজ উপায়ের বই লেখা– এরকম বহুমুখী কাজ একসঙ্গে তিনি করেছেন৷ এ সময় পিতা ঠাকুরদাস কাজে যাওয়ার পথে দুর্ঘটনায় আহত হন৷ বিদ্যাসাগর পিতাকে বলেন–‘বাবা আপনার তো অনেক বয়স হয়েছে৷ অনেক পরিশ্রম করেছেন আপনি৷ আমি তো এখন মাসে ৫০ টাকা মাইনে পাচ্ছি, স্বচ্ছন্দে সংসার চলবে, আপনি আর কেন পরিশ্রম করবেন? আপনি দেশে গিয়ে থাকুন৷’

প্রথমে চাকরি ছাড়তে রাজি হননি ঠাকুরদাস৷ চাকরি ছাড়ার কথা মনিবকে জানালে তিনি তাঁকে বললেন, ‘ছেলেমানুষের কথায় চাকরি ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়৷ ওই ছেলে যদি উচ্ছৃঙ্খল হয়ে তোমাকে সাহায্য না করে তখন কি আবার চাকরি করতে আসবে?’

ঠাকুরদাস মনিবকে বললেন–‘আমার পুত্র সাক্ষাৎ যুধিষ্ঠিরের মতো ধর্মশীল, আমাকে দেবতার মতো ভক্তিশ্রদ্ধা করে, তার কথা অবহেলা করতে পারব না৷ যদি তাকে অধার্মিক ও দুশ্চরিত্র  জানতাম, তা হলে কখনওই চাকরি ছাড়তাম না৷’ চাকরি ছেড়ে বাড়ি ফিরে গেলেন ঠাকুরদাস৷

পিতাকে বিদ্যাসাগর মাসে মাসে ২০ টাকা পাঠিয়ে দিতেন, নিজের বাসায় ৩০ টাকা খরচের জন্য রাখতেন৷ বাসায় তখন তাঁর দুই ভাই, দু’জন খুড়তুতো ভাই, পিসতুতো–মাসতুতো তিন ভাই৷ এ ছাড়াও দু’চার জন অতিথি প্রায়ই থাকতেন৷ সকলের খরচ তাঁকেই চালাতে হত৷ খুবই কষ্টে চলত তাঁদের৷ নিজেরা ভাগাভাগি করে রান্না করতেন৷ খরচ বাঁচিয়ে দুঃস্থদের সাহায্যও করতেন৷

তিনি সব সময় অন্যের দুঃখমোচনের জন্য নিজে কষ্ট স্বীকার করতে প্রস্তুত ছিলেন৷ এই সময় সংস্কৃত কলেজের ব্যাকরণের প্রথম শ্রেণির অধ্যাপকের পদ শূন্য হয়৷ মার্শাল সাহেব বিদ্যাসাগরকে ওই পদ গ্রহণ করতে অনুরোধ করেন৷ ওই পদের বেতন ৮০ টাকা৷ যে কোনও মানুষের পক্ষে বেশি টাকার চাকরি লোভনীয় সুযোগ, কিন্তু বিদ্যাসাগর ছিলেন অন্য ধরনের মানুষ৷ তাই বেতন বেশি হলেও তিনি ওই পদ গ্রহণে সম্মত হলেন না৷ কারণ তিনি তারানাথ তর্কবাচস্পতিকে কথা দিয়েছিলেন যেভাবেই  হোক তাঁকে একটি চাকরি জোগাড় করে দেবেন৷ তাঁর একটি চাকরি ভীষণ দরকার ছিল৷ তাই সংস্কৃত কলেজের ওই পদে তিনি তারানাথ তর্কবাচস্পতিকে নিয়োগের অনুরোধ করেন৷ তাঁর অনুরোধে মার্শাল সাহেব অবাক হলেন৷ তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন বিদ্যাসাগরকে, তাই রাজি হলেন বিদ্যাসাগরের অনুরোধ রাখতে৷ ওই সময় তারানাথ তর্কবাচস্পতি কালনায় ছিলেন৷ চিঠি পাঠালে তিনি ঠিক সময়ে নাও পেতে পারেন এজন্য বিদ্যাসাগর মহাশয় ২৪/২৫ ক্রোশ (প্রায় ৫০ মাইল) রাস্তা সারা রাত পায়ে হেঁটে তার বাড়িতে গিয়ে পরদিনই তাঁকে সঙ্গে করে এনে সংস্কৃত কলেজের চাকরিতে যুক্ত করিয়ে দেন৷

১৮৪৬ সালের মার্চ মাসে সংস্কৃত কলেজের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি রামমাণিক্য বিদ্যালঙ্কার মহাশয়ের মৃত্যু হয়৷ বাবু রসময় দত্ত তখন সংস্কৃত কলেজের সেক্রেটারি ছিলেন৷ তিনি বিদ্যাসাগর মহাশয়কে ওই পদে নিয়োগ করতে চাইলেন৷ রসময়বাবু  সহ অনেকের অনুরোধে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের কাজ ছেড়ে এপ্রিল মাসে সংস্কৃত কলেজের চাকরিতে যোগ দিলেন বিদ্যাসাগর৷

সংস্কৃত কলেজে যোগ দিয়ে তিনি বেশ কিছু সংস্কার শুরু করেন৷ তাঁর চেষ্টায় কলেজে শৃঙ্খলা এল৷ বিদ্যাসাগর সহকারী সম্পাদক, রসময় দত্ত ছিলেন সম্পাদক৷ শুধু চাকরি করা বিদ্যাসাগরের উদ্দেশ্য ছিল না, উদ্দেশ্য ছিল এ দেশের মানুষের মধ্যে শিক্ষা বিস্তার করা৷ তাই কলেজের উন্নয়ন সম্পর্কে একটি পরিকল্পনা তৈরি করে সেক্রেটারি রসময় দত্তের কাছে পাঠিয়ে দিলেন বিদ্যাসাগর৷ রসময় দত্ত এই পরিকল্পনার সঙ্গে পুরোপুরি একমত হতে পারলেন না৷ বিদ্যাসাগরের অনুরোধ সত্ত্বেও তিনি সম্পূর্ণ পরিকল্পনাটি কাউন্সিলে পাঠালেন না, সামান্য একটু অংশ পাঠালেন৷ খুবই আঘাত পেলেন বিদ্যাসাগর৷ মতপার্থক্য শুরু হল দু’জনের৷ বিদ্যাসাগর বুঝতে পারলেন নিজের পরিকল্পনা মতো কলেজের উন্নতি তিনি করতে পারবেন না৷ তাই ঠিক করলেন যেখানে স্বাধীনভাবে কাজ করা যাবে না সেখানে চাকরি করবেন না৷ ১৮৪৭ সালের এপ্রিল মাসে ইস্তফাপত্র পাঠিয়ে দিলেন৷ তাঁর আয়ের উপরে নির্ভরশীল সকলেই অবাক৷ সংসারে অনেকজন সদস্য, এমন অবস্থায় চাকরি ছেড়ে দিলে কীভাবে চলবে এইরকম অবস্থায় চাকরি ছেড়ে দেওয়ার তেজ যে কারও থাকতে পারে ভাবতেও পারেননি রসময় দত্ত৷ অনুরোধ সত্ত্বেও বিদ্যাসাগর ইস্তফাপত্র প্রত্যাহার না করায় ১৬ জুলাই তা গৃহীত হয়৷

রসময় দত্ত কিছুজনের কাছে বলেছিলেন–চাকরি ছেড়ে দিয়ে বিদ্যাসাগর খাবে কী? কথাটি কানে এলে বিদ্যাসাগর বলেছিলেন,–‘দত্তমশাইকে বোলো, বিদ্যাসাগর আলু পটল বেচে খাবে, মুদির দোকান করে খাবে, কিন্তু যে চাকরিতে সম্মান নেই, সে–চাকরি করবে না৷’       (চলবে)

(গণদাবী : ৭১ বর্ষ ৪৯ সংখ্যা)