Home / খবর / ধোঁয়াশা ভরা চমকে ঠাসা কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য বাজেট

ধোঁয়াশা ভরা চমকে ঠাসা কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য বাজেট

করোনা অতিমারি পরিস্থিতি দেশের স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর বেহাল দশা মানুষকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। জনসাধারণ আশা করেছিল স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর ভগ্ন দশা মেরামত করতে এবারের বাজেটে অর্থ বরাদ্দ খানিকটা অন্তত বাড়বে। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী ঘোষণা করলেন, গত বছরের তুলনায় ১৩৭ শতাংশ বাড়িয়ে ২০২১-‘২২ অর্থবর্ষের স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ করা হল ২২ লক্ষ ৩ হাজার ৮৪৬ কোটি টাকা। এই বৃদ্ধি অবশ্যই মানুষের মনে আশার সঞ্চার করেছিল। কারণ করোনা অতিমারি পরিস্থিতিকে কোনও রকমে সামলাতে হলেও অর্থ বরাদ্দ এই রকমই বা এর চেয়েও বেশি পরিমাণে বাড়ানো দরকার। বাজেট দেখে দেশের বড় বড় শিল্পপতিরাও প্রশংসায় পঞ্চমুখ।

কিন্তু বাজেটের নথিপত্র হাতে আসার পর দেখা গেল, অর্থমন্ত্রীর ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবের কোনও মিল নেই। বরং বলা ভাল, তা হিসাবের কারচুপিতে ভর্তি। আমরা যদি বিগত বছরগুলির স্বাস্থ্য বাজেটের দিকে তাকাই, দেখা যাবে :

বছর কোটি টাকা
২০১৯-‘২০ ৬৬,০৪১.৯৫
২০২০-‘২১ ৬৯,২৩৩.৮৮
২০২০-‘২১(সংশোধিত) ৮৫,২৫০.৩৮
২০২১-‘২২ ৭৬,৯০২.০৭

 

প্রকৃত অর্থে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য বাজেটে গত বছরের তুলনায় ৮,৩৪৮ কোটি টাকা কমানো হয়েছে। তা হলে ২২,৩,৮৪৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রশ্ন উঠছে কোত্থেকে? এ কি অর্থমন্ত্রী ভুল করে বলে ফেলেছেন? না। সজ্ঞানে এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই তিনি এই ঘোষণা করেছেন। আসলে এই টাকার মধ্যে আরও কতকগুলি খাতের টাকা ঢুকিয়ে, ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখানো হয়েছে। যেমন, জল ও নিকাশী ব্যবস্থার জন্য প্রতি বছরই আলাদা করে বরাদ্দ ধরা হয়। এ বছরও তার পরিমাণ হল ৬০,০৩০ কোটি টাকা, এছাড়া পঞ্চদশ অর্থ কমিশনের হিসাব অনুযায়ী স্বাস্থ্য, নিকাশী ব্যবস্থা ইত্যাদি বাবদ রাজ্যকে দেয় ৪৯,০০০ কোটি টাকা। এ রকমই বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ অর্থ যা নিয়মমাফিক প্রতি বছর আলাদা আলাদা করে বরাদ্দ করা হয়, সুচতুরভাবে তার সবগুলোকে একত্রিত করে স্বাস্থ্য বাজেট হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে। এবার স্বাস্থ্য খাতে প্রকৃত বরাদ্দ কিন্তু মাত্র ৭১,২৬৯ কোটি টাকা, যা গত বছরের চেয়ে অনেক কম।

এই ছলচাতুরির কি কোনও প্রয়োজন ছিল? মানুষকে কি তারা এতটাই বোকা ভাবেন যে, এসব তারা ধরতে পারবে না! পাশাপাশি মোদি সরকার আত্মনির্ভর স্বাস্থ্য ভারত যোজনা নামক একটি প্রকল্প ঘোষণা করেছে, যেখানে ৬৪,১৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এই টাকা আগামী ৬ বছর ধরে খরচ করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ বছরে ১০,৬৯৬ কোটি টাকা খরচ হবে। বাজেটে চমক দেওয়ার ঝোঁকে এই সম্পূর্ণ ৬৪,১৮০ কোটি টাকাই এবারের বাজেটে ঘোষণা হয়েছে। এই বরাদ্দকৃত অর্থ খরচ করা হবে প্রধানত গ্রামের ১৭,৭৮৮টি এবং শহরের ১১,০২৪টি সুস্বাস্থ্যকেন্দ্রের পরিকাঠামো এবং জনস্বাস্থে্যর কিছু ল্যাবরেটরি তৈরি করার জন্য। এই সুস্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলি কী? আসলে এগুলি থেকে উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মতোই পরিষেবা পাওয়া যাবে। কোনও ডাক্তার থাকবেন না সেখানে। করোনা পরিস্থিতির সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ইতিমধ্যেই বিজেপি সরকার চিকিৎসকদের গণতান্ত্রিক বডি এমসিআই-কে ভেঙে দিয়ে তৈরি করেছে স্বৈরতান্ত্রিক বডি ন্যাশনাল মেডিকেল কমিশন। যার সুপারিশ অনুযায়ী মধ্যবর্তী স্তরের স্বাস্থ্য পরিষেবা দাতাদের মাত্র ৬ মাসের ট্রেনিং দিয়ে এই সুস্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলিতে কার্যত ডাক্তারের কাজ করানো হবে। কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী ভবিষ্যতে ডাক্তারির লাইসেন্সও দেওয়া হতে পারে। জনগণের পকেটের টাকা স্বাস্থ্যের অত্যাবশ্যকীয় ঘাটতিপূরণের কাজে না লাগিয়ে এভাবে চটকদার নতুন প্রকল্প চালু করে মানুষের মন ভোলানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

মূল স্বাস্থ্য বাজেটে করোনা টিকাকরণের জন্য ৩,৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। যে টাকা দিয়ে প্রয়োজনীয় কোনও স্বাস্থ্য পরিকাঠামো তৈরি করা হবে না, যা মূলত ভ্যাক্সিন কোম্পানিগুলির বাজেটেই যাবে। তাই তো ভ্যাক্সিন কোম্পানিগুলির মুনাফা সুনিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় সরকার তড়িঘড়ি ট্রায়াল শেষ হওয়ার আগেই, মানুষের জীবনের ঝুঁকি আছে জেনেও– টিকাকরণের কাজ যুদ্ধকালীন তৎপরতায় শুরু করে দিয়েছে। যদিও টিকাকরণ দ্বারা হার্ড ইমিউনিটি তৈরি করতে না পারলে প্যানডেমিক নিয়ন্ত্রণে তার বিশেষ কিছু কার্যকরী ভূমিকা থাকে না। এমনই মত ডাক্তারদের। তাছাড়া ভ্যাক্সিনের কার্যকারিতা বলা হচ্ছে যেখানে মাত্র ৬০ শতাংশ এবং তা-ও মাত্র ৬ মাসের জন্য। যেখানে সারা দেশের সব মানুষকেই এক সাথে খুব কম সময়ের মধ্যে টিকাকারণ করতে পারলে তবেই হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হতে পারে। স্বাস্থ্যব্যবস্থার বর্তমান পর্যায়ে যা বাস্তবে অসম্ভব। করোনা মোকাবিলায় যে পরিকাঠামো দরকার, যে ধরণের গবেষণা কেন্দ্র দরকার, যে প্রশিক্ষিত লোকবল দরকার, তার কোনও কিছুই কিন্তু এই বাজেটে বলা হল না। বলা হল না স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর বিরাট ঘাটতি মেটানোর কোনও রকম পরিকল্পনাও। যে স্তরের স্বাস্থ্য পরিকাঠামো দিয়ে কিউবা, ভিয়েতনামের মতো দেশ করোনা নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হয়েছে, সেরকম পরিকাঠামো, পরিকল্পনা, ইত্যাদির ছোঁয়াও বাজেটে দেখতে পাওয়া গেল না। বাজেটে রইল শুধু ধোঁয়াশা ভরা চমক।