Breaking News
Home / খবর / দেশ পোড়ানোর কারিগর বিজেপি গড়বে ‘সোনার বাংলা’?

দেশ পোড়ানোর কারিগর বিজেপি গড়বে ‘সোনার বাংলা’?

 

ফাইল চিত্র

রবীন্দ্রনাথ গেয়েছিলেন, ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি’৷ সেই বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করার ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে প্রতিবাদে সামিল হয়েছিলেন তিনি৷ ঐক্যের বার্তা দিতে রাখীবন্ধন উৎসব পালন করেছিলেন৷ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র ছিল এই বাংলা৷ সেই বাংলাকে ভাগ করে স্বাধীনতা সংগ্রাম ধ্বংস করাই ছিল ব্রিটিশ সরকারের উদ্দেশ্য৷ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রবল স্রোত ব্যর্থ করে দিয়েছিল ব্রিটিশের এই চক্রান্ত৷

বাংলার দুর্ভাগ্য, স্বাধীনতা প্রাপ্তির লগ্নে এই ‘সোনার বাংলা’–কে ভাগ করার জন্য বড়লাট লর্ড মাউন্টব্যাটেনের কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন এই বাংলারই এক সন্তান৷ তিনি ভারতীয় জনতা পার্টির আদর্শগত গুরু শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী৷ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী, দীনদয়াল উপাধ্যায়, গুরু গোলওয়ালকর প্রমুখ আরএসএস তাত্ত্বিকরা ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামকে স্বাধীনতা সংগ্রাম বলে মনে করতেন না৷ তাঁরা স্বাধীনতা আন্দোলনের রক্তঝরা গৌরবোজ্জ্বল দিনগুলিতে ব্রিটিশের সহযোগিতাই করে গেছেন৷ সেই কারণে, এই বাংলায় আরএসএসের ঠাঁই হয়নি, বিজেপি বহু চেষ্টা করেও জায়গা করতে পারেনি৷ বাংলার মনীষা তাদের বিশ্বাসঘাতকতাকে ক্ষমা করেনি৷

সেই বাংলাকে ‘সোনার বাংলা’ করার খোয়াব দেখাচ্ছেন বর্তমান বিজেপি নেতৃত্ব৷ করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের কারণে প্রকাশ্য জনসভা এখন বন্ধ৷ এই প্রেক্ষাপটে ৯ জুন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তথা বিজেপির অন্যতম শীর্ষ নেতা অমিত শাহ তাঁর অনলাইন তথা ভার্চুয়াল দলীয় সভায় বঙ্গবাসীর কাছে আহ্বান জানালেন, ‘‘আপনারা কমিউনিস্ট, তৃণমূলকে সুযোগ দিয়েছিলেন৷ এবার একবার বিজেপিকে সুযোগ দিন৷ মোদিজির নেতৃত্বে সোনার বাংলা গড়বে বিজেপি’’ (আনন্দবাজার পত্রিকা, ১০–৬–’২০)৷

এমন সময়ে তথা দুঃসময়ে অমিত শাহ বঙ্গবাসীর কাছে ভোটের আহ্বান জানালেন যখন ক্রমবর্ধমান করোনা সংক্রমণে মানুষের জীবন ভয়ঙ্কর ভাবে বিপর্যস্ত৷ অন্য দিকে প্রবল ঘূর্ণিঝড় আমফানে বিধ্বস্ত বাংলার এক বিশাল অংশের জনজীবন৷ এই দুর্যোগ বিধ্বস্ত মানুষগুলির পাশে সাহায্যের হাত নিয়ে দাঁড়ানোই যখন ছিল সবচেয়ে বড় প্রয়োজন, দরকার ছিল পর্যাপ্ত ত্রাণ–প্যাকেজ, তখন নরেন্দ্র মোদী–মিত শাহরা রাজ্যের মানুষকে শোনালেন ভোটের কথা, আর গড়িমসি করতে থাকলেন পর্যাপ্ত ত্রাণের বরাদ্দে৷ এটা কি বাংলার প্রতি তাঁদের দরদের প্রমাণ? তাঁরা যে সোনার বাংলা গড়তে চান, তার নমুনা?

দেশের বেশিরভাগ রাজ্যে এখন বিজেপির শাসন৷ সেই রাজ্যগুলি কি বিজেপির শাসনে সব সোনার হয়ে উঠেছে? মানুষের আর্থিক সংকটের সুরাহা হয়েছে? বেকাররা দলে দলে সেই সব ‘রামরাজ্যে’ চাকরি পাচ্ছে? বিনা পয়সায় সকলের চিকিৎসা মিলছে? ভয় শূন্য চিত্ত আর উচ্চ শির নিয়ে নানা ধর্ম–বর্ণের মানুষ নিশ্চিন্তে শান্তিতে বসবাস করতে পারছে? অতি বড় বিজেপি ভক্তরাও বলতে পারবেন না বিজেপি শাসনে এইসব সংকটের সুরাহা হয়েছে৷ বরং বিজেপি সরকার রাজ্যে রাজ্যে করোনা সংকটের আবহে মালিক শ্রেণিকে দিয়েছে যথেচ্ছ শ্রমিক শোষণের, শ্রমিক ছাঁটাইয়ের অবাধ অধিকার৷ মালিকরা ইচ্ছামতো শ্রমিক–কর্মচারীদের্ মাইনে ছেঁটে ফেলছে৷ দেশের মানুষের ৯৫ ভাগের বেশিই তো গরিব, নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের সেই অংশকে আরও বেশি করে মালিকি শোষণ–বঞ্চনার মধ্যে ঠেলে দিয়ে কী করে জনজীবনে আর্থিক সমৃদ্ধি আনবেন মোদী–মিত শাহরা? বাংলার মানুষের বুঝতে অসুবিধা হবে না, এটা নিছক একটা ভোটের চাল, গদি দখলের নোংরা ছল৷

ভুললে চলবে না, বিজেপি বাংলায় ক্ষমতা দখলের খোয়াব দেখতে পারছে সিপিএম, তৃণমূলের ভোট রাজনীতির জন্য৷ যে ১৮টি আসনে গত লোকসভা নির্বাচনে এ রাজ্যে বিজেপি জিতেছে, সেখানে তাদের সহায়ক হিসাবে কাজ করেছে সিপিএম নেতাদের ‘আগে রাম পরে বাম’ নীতি৷ ওই নির্বাচনে সিপিএম জোট যত শতাংশ ভোট হারায়, বিজেপির ভোট বাড়ে ঠিক তত শতাংশ৷ সিপিএম নেতাদের বিজেপিতে যোগ দেওয়ার হিড়িক এখনও অব্যাহত৷ কিন্তু সিপিএম নেতাদের এই ভ্রান্ত রাজনীতির খেসারত, যাঁরা আজ সত্যিই বামপন্থী আন্দোলন গড়ে তুলতে চান তাঁদেরই দিতে হবে৷ অন্যদিকে তৃণমূলের সস্তা চমকের রাজনীতি, স্তরে স্তরে ব্যাপক দুর্নীতি, দলবাজি এ রাজ্যে বিজেপিকে হিন্দু সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করার বাড়তি সুযোগ দিয়েছে৷

দেশের অন্যান্য অংশের মতো বাংলার মানুষও বহু বার প্রতারণার শিকার হয়েছে৷ কংগ্রেসের দীর্ঘ অপশাসনের পর সিপিএম, সিপিএমের অপশাসনের পর তৃণমূল সরকার– দলের নাম যাই হোক, মালিকের স্বার্থে একই রকম জনবিরোধী শাসন অব্যাহত থেকেছে৷ আজ আবার মালিকদের অত্যন্ত বিশ্বস্ত আর একটি দল বিজেপি সোনার বাংলা গড়ার মায়াজাল ছড়াতে নেমেছে৷ কিন্তু মানুষকে গভীর ভাবে ভেবে দেখতে হবে, মালিকদের স্বার্থবাহী একটি দলের সরকার বদলে তাদেরই স্বার্থবাহী আর একটি দলকে সরকারে বসিয়ে শোষিত নিপীড়িত জনগণের জীবনের দুরবস্থার পরিবর্তন কি আদৌ সম্ভব হবে, নাকি বাস্তবে তা হবে, তপ্ত কড়াই থেকে লাফিয়ে জ্বলন্ত উনুনে পড়ার সামিল৷