Home / খবর / দেশ জুড়ে ধিক্কৃত বিজেপি গড়বে ‘সোনার বাংলা’!

দেশ জুড়ে ধিক্কৃত বিজেপি গড়বে ‘সোনার বাংলা’!

কালা কৃষি আইন বাতিলের দাবিতে ৩ ডিসেম্বর আসামের নলবাড়িতে প্রতিবাদ সভা

বিজেপি নেতারা জোরের সঙ্গে প্রচার করছেন তাঁদের ক্ষমতায় আনলে ‘সোনার বাংলা’ গড়ে দেবেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ থেকে শুরু করে ছোট বড় সব নেতাই যেন সোনার বাংলা গড়তে কোমর বেঁধেছেন। এ দিকে দেশের মানুষ ভাবছে, কেমন ‘সোনার ভারত’ গড়ল বিজেপি যে দিল্লিতে আজ লক্ষ লক্ষ কৃষক ধরনায় বসে বিজেপিকে ধিক্কার দিচ্ছেন!

বিজেপি সরকার কেন্দ্রে ক্ষমতায় রয়েছে প্রায় সাড়ে ছ’বছর। এর আগেও পাঁচ বছর (১৯৯৮-২০০৪) তারা দেশ শাসন করেছে। এই সময়ে দেশের শ্রমিক-কৃষক-সাধারণ মানুষের জন্য কী করেছে তারা? ১৯৪৭-এর পর থেকে কর্পোরেট মালিকদের স্বার্থে কংগ্রেস সরকার যে ধরনের নীতি নিয়ে চলেছে, যে ভাবে দেশের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের ওপর শোষণ-অত্যাচার চালিয়েছে, বিজেপি সরকার আরও নগ্ন এবং হিংস্র ভাবে সেই কাজই করে যাচ্ছে। অথচ, এরাই নাকি এখন সোনার বাংলা গড়বে! বাংলার এমন উন্নয়ন করবে, যাকে বলে একেবারে সোনা দিয়ে মুড়ে দেবে!

যদিও এ কথা ঠিক, ভারতে এত বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ আছে, এত মানবসম্পদ আছে, এত বিশ্বজনীন জ্ঞানসম্পদ আছে যে শুধু পিচমবঙ্গ কেন, গোটা দেশটাকেই সোনা দিয়ে মুড়ে দেওয়া যায়। অথচ স্বাধীনতার সাত দশকের বেশি সময় ধরে দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষ অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে। অপুষ্টিতে ভুগে লক্ষ লক্ষ শিশু মারা যাচ্ছে। অসংখ্য মানুষের শরীরে পর্যাপ্ত পোশাক নেই, যথার্থ শিক্ষা নেই, রোগ-ব্যাধির ন্যূনতম চিকিৎসা নেই, নারী-শিশুকন্যার নিরাপত্তা নেই। দেশের প্রায় সব সম্পদ দখল করে ভোগ করছে মুষ্টিমেয় মালিক শ্রেণি। দেশসেবার নামে এই মালিক শ্রেণিরই সেবা করে যাচ্ছে কংগ্রেস-বিজেপির মতো দলগুলি। বাইরে থেকে এই দলগুলির নাম আলাদা, পতাকার রঙ আলাদা, আসলে এরা সবাই মালিক শ্রেণিরই ম্যানেজার বা চৌকিদার। ভোটে জিতে যে যখন দায়িত্ব পায় সে এদেরই সেবা করে। এখন কংগ্রেসের জায়গায় মালিকদের সেবার দায় নিয়েছে বিজেপি। স্বাভাবিক ভাবেই এরা সাধারণ মানুষের জন্য কোনও প্রকৃত উন্নয়ন করতে পারে না।

তা যদি সম্ভব হত, তা হলে যে গুজরাটে বিজেপি ২২ বছর টানা সরকারি ক্ষমতায় থাকার পরও গুজরাটের আম জনতার এত দুর্দশা কেন? কেন সেখানে ঘিঞ্জি বস্তির সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে? কেন সেখানকার হাজার হাজার কল-কারখানা বন্ধ?

গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন রাষ্ট্রপতি গুজরাটে এসেছিলেন। সেখানকার পুতিগন্ধময়, জীর্ণ বস্তিগুলি যাতে তিনি দেখতে না পান সেজন্য সেখানকার বিজেপি সরকার উঁচু উঁচু পাঁচিল গেঁথে সেগুলি আড়াল করে দিয়েছিল। কেন এমন কাজ বিজেপিকে করতে হল? কারণ, না করে তার উপায় নেই। দীর্ঘকাল সরকারি ক্ষমতায় থাকলেও সে মালিক শ্রেণির গোলাম হিসাবে তাদেরই উন্নয়ন করেছে, জনজীবনের উন্নয়ন ঘটাতে পারেনি। কিন্তু সেটা তো মার্কিন প্রেসিডেন্টকে দেখানো যায় না!

সিএমআইই (সেন্টার ফর মনিটারিং ইন্ডিয়ান ইকনমি)-র গত মে মাসের সমীক্ষা দেখাচ্ছে, গুজরাটে বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। প্রচুর কল-কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সেখানে এখন লক্ষ লক্ষ বেকার। তাদের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই শিক্ষিত এবং প্রশিক্ষিত।

লকডাউনের সময় গুজরাটের সাধারণ মানুষের দুর্দশা দেখে গুজরাট হাইকোর্ট বলতে বাধ্য হয়েছিল, ‘মানুষের মধ্যে করোনার আতঙ্ককে ছাপিয়ে গেছে অনাহারে মরার আশঙ্কা। সরকারের মানবিক হওয়া উচিত।’ এই হল বিজেপির গুজরাট মডেল। এমন সোনাই কি বাংলায় ফলাবে তারা!

গুজরাট জুড়ে ক্ষুধার্ত মানুষের আত্মহত্যা বাড়ছে। খিদের জ্বালায় এক মা তার দুই মেয়ে-সহ আত্মঘাতী হয়েছে, এমন দৃশ্যও দেখছে গুজরাট। যদিও, সরকারের পেটোয়া পুলিশ যথারীতি বলেছে, সাংসারিক অশান্তিই কারণ। যেন দারিদ্র কোনও অশান্তির কারণ নয়!

গত বছর ডিসেম্বর মাসে গুজরাটের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার করুণ দশার একটি নমুনা সামনে এসেছিল। সরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে শয়ে শয়ে শিশুর মৃত্যু ঘটেছিল। তার মধ্যে শুধু রাজকোট সিভিল হাসপাতালেই ১১১ জন এবং আহমেদাবাদ সিভিক হাসপাতালে ৮৫ জন মারা গিয়েছিল।

প্রতি বছর শয়ে শয়ে চাষি ও খেতমজুর আত্মহত্যা করে গুজরাটে। এ বছর বিজেপির এক মন্ত্রী বিধানসভায় স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে, গুজরাটের শুধুমাত্র দুটি জেলাতেই দুশোর বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে (খেড়ায় ১১১ ও আনন্দে ৯১ জন)। যদিও, সরকার বলেছে, ‘এটা তেমন কোনও বড় ব্যাপার নয়।’

এ তো গেল বিজেপির মডেল গুজরাটের দু-একটা মাত্র নমুনা। মধ্যপ্রদেশে প্রায় ১৫ বছর ধরে সরকার চালাচ্ছে বিজেপি। সেখানকার জনজীবনের অবস্থা কী?

২০১৭ সালের জুন মাসে ফসলের ন্যায্য দামটুকুর দাবি জানিয়েছিল কৃষকরা। বিজেপি সরকারের পুলিস মন্দসৌরে কৃষকদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়। ছ’জন কৃষক মারা যান। সিএমআইই-এর গত মে মাসের সমীক্ষা দেখাচ্ছে, গুজরাটের মতো মধ্যপ্রদেশেও বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। রাজ্যে বাড়ছে অনাহারে মৃত্যুও।

গত এপ্রিল মাসে এই রাজ্যের টিকমগড়ে এক দম্পতি আত্মঘাতী হয়েছেন। দারিদ্রের কারণে তাঁরা তাঁদের সামান্য জমিটুকুও বন্ধক রাখতে বাধ্য হয়েছিলেন। লকডাউনে ৬ জনের ওই পরিবারের খাওয়া জুটছিল না। কিছুদিন প্রতিবেশীদের থেকে ধার করে বাচ্চাদের একটু খেতে দিচ্ছিলেন। পরে সেটাও সম্ভব হয়নি। দিশেহারা হয়ে স্বামী-স্ত্রী আত্মহত্যার পথে যেতে বাধ্য হন। গত বছর অক্টোবরে বারওয়ানিতে আট বছরের একটি ছেলে না খেতে পেয়ে মারা যায়। এ সবই বিজেপির ‘সু-শাসনের’ পরিণতি।

ত্রিপুরায় বিজেপি ক্ষমতায় এসেই মহান লেনিনের মূর্তি ভেঙে তাণ্ডবলীলা শুরু করে। পঞ্চায়েত নির্বাচনে বিরোধীদের দাঁড়াতেই দেয়নি। ৯০ শতাংশের বেশি আসন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দখল করে। এই তাদের গণতন্ত্র! আজ ত্রিপুরার জনজীবন বেকারি, মূল্যবৃদ্ধির আক্রমণে বিপন্ন। শিক্ষক পদপ্রার্থীরা রাস্তায় অবস্থান করছে। আর বিজেপির শিক্ষামন্ত্রী বলছে, ‘শিক্ষকতার চেয়ে শুয়োর পালন করা ভাল’। সোনায় বাঁধানো শাসনই বটে!

বিজেপি-শাসিত আর একটি রাজ্য উপ্রদেশ। বিজেপি এই রাজ্যটাকে ইতিমধ্যে ‘গণতন্ত্রের কবরখানা’ বানিয়ে তুলেছে। জনগণ সরকারি বীভৎসার নির্মম শিকার। অশিক্ষা দারিদ্র অনাহার শিশুমৃত্যু চাষিমৃত্যু তো ছিলই, তার সাথে যুক্ত হয়েছে জাতপাত-ধর্ম-বর্ণের নামে গরিব মানুষের ওপর অত্যাচার। নারীনিগ্রহে এ রাজ্য দেশে সবার ওপরে। সম্প্রতি হাথরসের মর্মান্তিক ঘটনায় শুভবুদ্ধিসম্পন্ন প্রত্যেকের গা শিউরে উঠেছে। যেভাবে দরিদ্র ঘরের একটি মেয়েকে শারীরিক অত্যাচার করে তার পর খুন করা হল, যেভাবে বিজেপি সরকারের পুলিস মেয়েটির মৃতদেহ জ্বালিয়ে দিল তার তুলনা হতে পারে একমাত্র নৃশংস হিটলারের রাজত্ব।

এগুলি রাজ্যে রাজ্যে বিজেপির সোনার শাসনের খণ্ডচিত্র। পশ্চিমবঙ্গে যদি ছলে-বলে কৌশলে ক্ষমতা দখল করতে পারে, তারা এর বাইরে আর কী করবে?

(গণদাবী-৭৩ বর্ষ ১৫ সংখ্যা_১ জানুয়ারি, ২০২১)