Home / খবর / দেশে বিজ্ঞানসম্মত, যুক্তিবাদী মনন ধ্বংস করতে চায় বিজেপি — কমরেড প্রভাস ঘোষ

দেশে বিজ্ঞানসম্মত, যুক্তিবাদী মনন ধ্বংস করতে চায় বিজেপি — কমরেড প্রভাস ঘোষ

 

৫ আগস্ট  মহান মার্কসবাদী চিন্তানায়ক কমরেড শিবদাস ঘোষ স্মরণ দিবসে কলকাতার নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়ামে দলের সাধারণ সম্পাদক কমরেড প্রভাস ঘোষের ভাষণ প্রকাশ করা হল৷ প্রকাশের আগে তিনি ভাষণটি সম্পাদনা করে দেন৷

কমরেড সভাপতি ও কমরেডস,

একথা উল্লেখ করার প্রয়োজন রাখে না যে, আজকের এই দিনটি আমাদের সকলের জীবনে গভীর ব্যথা–বেদনা, আবেগ ও স্মৃতির সাথে জড়িত৷ আপনারা জানেন, আমাদের কোনও অনুষ্ঠানই নিছক আনুষ্ঠানিক নয়৷ আজকের এই অনুষ্ঠান তো নয়ই৷ কোনও কোনও শোক থাকে সময়ের গতিপথে থিতিয়ে যায়, মিলিয়ে যায়৷ আবার একেকটি শোক থাকে যত দিন যায়, মাস যায়, বছর অতিক্রান্ত হয় এবং ঘটনার ঘাত–প্রতিঘাতে, চেতনার গভীরে ও উপলব্ধিতে এমন আবেদন রেখে যায় যা বারবার বিবেককে, কর্তব্যবোধকে নাড়া দেয়, জাগিয়ে রাখে৷

আজ দল অনেক বড় হয়েছে৷ এই স্মরণ সভা ভারতবর্ষের ২৩টি রাজ্যে অনুষ্ঠিত হচ্ছে৷ দলে এখন অনেক মধ্যবিত্ত, শ্রমিক, কৃষক ঘরের যুবক–যুবতী, ছাত্রছাত্রী যুক্ত হয়েছেন৷ তারা অনেকেই ভালভাবে জানেন না, কী কঠিন ও কঠোর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে মহান মার্কস–এঙ্গেলস–লেনিন-স্ট্যালিন-মাও সে তুং এর সুযোগ্য উত্তরসাধক কমরেড শিবদাস ঘোষ মাত্র ছয় জনকে নিয়ে এই দলটি গড়ে তুলেছিলেন৷ এহ সম্পর্কে পরে কিছু আলোচনা করব৷

পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসি বেদ–বেদান্ত–কোরান–বাইবেল থেকে আসেনি

আজকের এহ সভায় সর্বপ্রথমে আমি সদ্য অনুষ্ঠিত লোকসভা নির্বাচন ও তার ফলাফল নিয়ে মার্কসবাদ–লেনিনবাদ-শিবদাস ঘোষের চিন্তাধারার ভিত্তিতে দলের বিশ্লেষণ আপনাদের কাছে রাখব৷ প্রথমেই আমি আপনাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাহ যে, পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসি হতিহাসে চিরদিন ছিল না, বেদ–বেদান্ত, কোরান, বাহবেলের বাণী থেকে তা আসেনি৷ পার্লামেন্ট, পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসি, ব্যক্তিস্বাধীনতা, ব্যক্তির প্রতিবাদ করার অধিকার, আন্দোলন করার অধিকার, ধর্মীয় প্রভাবমুক্ত মানবতাবাদ, বিজ্ঞানসম্মত যুক্তিবাদ, গণতান্ত্রিক সমাজ, সাম্য–মৈত্রী–স্বাধীনতর বাণী হত্যাদি ঘোষণা নিয়ে গণতান্ত্রিক বিপ্লব একদিন এসেছিল মানব ইতিহাসে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে৷ বণিকি পুঁজির গর্ভজাত শিল্পপুঁজি সেদিন ছিল ক্ষুদ্র শিল্পের স্তরে৷ এহ সদ্যোজাত শিল্পপুঁজির বিকাশের স্বার্থে, ব্যাপক শিল্পায়নের স্বার্থে সেদিন পুঁজিবাদের কৈশোর–যৌবনের স্তরে তার সাথে ধর্মভিত্তিক রাজতন্ত্রের যে সংঘাত সৃষ্টি হয়, সেহ সময়ে প্রগতিশীল বুর্জোয়া শ্রেণির নেতৃত্বে গ্রামীণ ভূমিদাসদের সামন্ততান্ত্রিক শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করার আহ্বান জানিয়ে ধর্মীয় শাসন রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়৷ বাহবেল সহ কোনও ধর্মীয় অনুশাসনে নয়, জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা রচিত সংবিধান দ্বারাহ শাসন পরিচালিত হবে, এটা নির্ধারিত হয়৷ ক্ষুদ্র শিল্পের মধ্যে ছিল অবাধ ও স্বাধীন প্রতিযোগিতা, তাকে ভিত্তি করে মাল্টি ইন্ডাস্ট্রিকে ভিত্তি করে মাল্টি পার্টি  বা বহুদলীয় গণতন্ত্র এসেছিল৷ তার ঘোষণা ছিল বাই দ্য পিপল, অফ দ্য পিপল, ফর দ্য পিপল, সাম্য–মৈত্রী–স্বাধীনত৷ প্রথম যুগে এই ঘোষণা খানিকটা রক্ষা করতে পারলেও পুঁজিবাদের বিকাশের একটা স্তরে এসে যখন ক্ষুদ্র পুঁজি বৃহৎ পুঁজিতে পরিণত হল, বৃহৎ পুঁজি একচেটিয়া পুঁজিতে পরিণত হল, প্রগতির ঝাণ্ডা ফেলে প্রতিক্রিয়াশীল হল, তখন থেকেই সাম্য–মৈত্রী–স্বাধীনতার বাণী পদদলিত হতে শুরু করল৷ গণতন্ত্র ধূলায় লুণ্ঠিত হতে শুরু করল৷ পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসির বুলি আউড়েহ একচেটিয়া পুঁজি ও সাম্রাজ্যবাদী স্তরে উন্নীত পুঁজিবাদী দেশগুলি শুধু নিজ দেশের শ্রমিকদের শোষণহ নয়, অনুন্নত দেশগুলিকেও পদানত করে ঔপনিবেশিক–আধাঔপনি শোষণ–লুণ্ঠন চালাল, স্বাধীনতা আন্দোলনগুলি দমন করার জন্য নৃশংস অত্যাচার করল, দুহ দুহ বার বিশ্বযুদ্ধের আগুন জ্বালাল৷ ১৯১৭ সালে এই একচেটিয়া পুঁজির স্তরে, সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির স্তরে নির্বাচন সম্পর্কে মহান লেনিন বলেছেন, ‘‘বুর্জোয়া পার্লামেন্টারি ব্যবস্থার প্রকৃত চরিত্র হচ্ছে পার্লামেন্টের মাধ্যমে শাসক শ্রেণির হয়ে কোন সদস্যরা জনগণের উপর শোষণ–অত্যাচার চালাবে, এটা ঠিক করা৷’’ আর কমরেড শিবদাস ঘোষ ১৯৬৯ সালে বলেছেন, ‘‘ইলেকশন হচ্ছে একটা বুর্জোয়া পলিটিক্স৷ জনগণের রাজনৈতিক চেতনা না থাকলে শ্রমিকশ্রেণির সংগ্রাম এবং শ্রেণিসংগঠন না থাকলে, গণআন্দোলন না থাকলে, জনগণের সচেতন সংঘশক্তি না থাকলে শিল্পপতিরা, বড় বড় ব্যবসায়ীরা, প্রতিক্রিয়াশীল ব্যক্তিরা বিপুল টাকা ঢেলে এবং সংবাদমাধ্যমের সাহায্যে যে হাওয়া তোলে যে আবহাওয়া তৈরি করে, জনগণ উলুখাগড়ার মতো সেই দিকে ভেসে যায়৷’’ বাস্তবে আমাদের দেশের ইলেকশনের দিকে তাকিয়ে দেখুন৷ এই ইলেকশনে কে জিতবে তা কে ডিসাইড করে? জনগণ করে? নির্বাচনগুলি এখন হচ্ছেও তাহ৷ ফলে বাই দ্য পিপল, অফ দ্য পিপল, ফর দ্য পিপল বলে এখন আর কিছু নেই৷ এখন হচ্ছে বাই দ্য বুর্জোয়াজি, অফ দ্য বুর্জোয়াজি, ফর দ্য বুর্জোয়াজি৷ বুর্জোয়ারাই ঠিক করছে কে জিতবে৷ ফলে নির্বাচনের ফলাফল এখন জনমতের রায় নয়, শোষক শ্রেণির রায়৷ তাদের রায়েই সবকিছু ঠিক হচ্ছে৷ অন্য সব প্রশ্ন যদি বাদও দিহ, একটা বিষয় তো ভাবতে হবে, পার্লামেন্টে দাঁড়াতে হলে ২৫ হাজার টাকা জমা দিতে হয়৷ বিধানসভায় দাঁড়াতে হলে ১০ হাজার টাকা জমা দিতে হয়৷ এদেশের কোনও শ্রমিক–কৃষক–দরিদ্র মানুষ ভাবতে পারে ইলেকশনে দাঁড়ানোর কথা? তারাই তো অধিকাংশ ভোটার৷ তাছাড়া কোটি কোটি গরিব মানুষ যারা উদয়াস্ত পরিশ্রম করে দু’মুঠো অন্ন সংস্থানের জন্য, কাজের জন্য এখানে সেখানে ঘুরে বেড়ায়, যাদের শিক্ষাদীক্ষার সুযোগ নেই, তাদের কাছে রাজনীতি চর্চার সুযোগ কোথায়, যদি সর্বহারা শ্রেণির বিপ্লবী দল তাদের রাজনৈতিকভাবে সচেতন ও সংঘবদ্ধ না করায়, নৈতিক বলে বলীয়ান না করায়৷ ফলে তারা ধরেই নেয় পলিটিক্স চর্চা বড়লোকদের জন্য, গরিবদের জন্য নয়৷ তাই তারা বড় বড় পুঁজিপতি–ব্যবসায়ীদের দেওয়া টাকায় নিজেদের বিবেক বিক্রি করে, সংবাদমাধ্যমের হাওয়ায় উলুখাগড়ার মতো ভেসে যায়৷

নির্বাচন মানে টাকার খেলা

দেশে কোটি কোটি বেকার৷ আজ এই বেকারবাহিনী বসে থাকে কবে ভোট আসবে৷ কোন দল কত বেশি টাকা দেবে, তার হয়ে কাজে নামবে৷ রাজনৈতিক দলগুলি ভোটের সময় বিপুল টাকা দিয়ে, মদ–মাংস খাইয়ে এদের দিয়ে যেকোনও হীন কাজ করিয়ে নেয়৷ আরেকটা জিনিসও খুব দুঃখজনক৷ গরিব মানুষের মধ্যে একটা চিন্তা এসে গিয়েছে –আর তো কিছু পাব না, তবু ভোটের সময় কিছু টাকা তো পাব৷ এই ভাবে মানুষ তার ভোট বিক্রি করে৷ কোটি কোটি টাকা খরচ করে এরা ভোট কেনে৷ পাবলিক আমাদের বলে, আপনারা কী করে ভোটে জিতবেন? অন্যরা টাকা দেয়, আর আপনারা আমাদের থেকেই টাকা এবং ভোট চান৷ আপনারা পাগল৷ আপনাদের পক্ষে ভোটে জেতা সম্ভব নয়৷ আমরা বলি আমরা ওভাবে ভোটে জিততে চাই না৷ কারণ টাকা দিতে হলে টাটা, আম্বানি, আদানিদের কাছে আমাদের দলকে বিক্রি করতে হয়৷ বিজেপি যেমন এদের কাছ থেকে ইলেকটোরাল বন্ডে ২১০ কোটি টাকা পেয়েছে, কংগ্রেস পেয়েছে ৫ কোটি এমনকী সিপিএমও ২কোটি টাকা পেয়েছে৷ এইসব দলকে কর্পোরেট সেক্টর টাকা দিয়ে টিকিয়ে রাখে তাদের প্রয়োজনে৷ এবারের ভোটে কী হয়েছে? গত ভোটের আগে বিজেপি কথা দিয়েছিল জনগণের জন্য ‘আচ্ছে দিন’ আনবে, কালো টাকা উদ্ধার করে প্রত্যেক ভারতবাসীর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা পাঠাবে, বছরে ২ কোটি চাকরি দেবে, কৃষকদের ঋণ মকুব করবে, জিনিসপত্রের দাম কমাবে, দুর্নীতি দমন করবে– ‘না খাউঙ্গা, না খানে দুঙ্গা’৷ কংগ্রেসের দুঃশাসনে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে ভাবল হয়তো বা এরা কিছু করবে৷ কিন্তু এ হল সবই ভোজবাজি, ভাঁওতা  বিজেপি প্রেসিডেন্ট তো অকপটে বলেই বসলেন ‘এসব প্রতিশ্রুতি হচ্ছে জুমলা’৷ জনগণের সঙ্কট ও বিক্ষোভ চরমে উঠল৷ তার সুযোগ নিয়ে কংগ্রেস গুজরাট নির্বাচনে প্রায় জিতে যাচ্ছিল, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড় যেগুলি দীর্ঘদিন বিজেপি’র ঘাঁটি বলে পরিচিত, সেখানে কংগ্রেস জিতে গেল৷ গোরখপুরে পার্লামেন্ট উপনির্বাচনে বিজেপি হারল, এসব দেখে বিরোধী শিবির ধরেই নিয়েছিল যে এবার বিরোধীরা জিতবেই৷ কে ক’টা সিট দখল করবে, কোন সিট নিজেদের হাতে রাখবে– এসব দর কষাকষি শেষপর্যন্ত চালাতে লাগল, অনেকটা কালনেমির লঙ্কাভাগের মতো৷ কেউ কাউকে এক ইঞ্চিও ছাড়বে না৷ বারবার মিটিং করেও জাতীয় বুর্জোয়া দল ও আঞ্চলিক বুর্জোয়া দলগুলি পূর্ণাঙ্গ ঐক্য করতে পারল না, তা ভেস্তে গেল৷ বিরোধীদের মধ্যে কে প্রধানমন্ত্রী হবে এ নিয়ে ৫/৬ জন দাবিদার এসে গেল৷ এদিকে ভোটের আসল নিয়ন্তা বৃহৎ পুঁজিপতি–মাল্টিন্যাশ, বড় বড় ব্যবসায়ীরা দেখল যে এই পাঁচ বছরে বিজেপি যা সার্ভিস দিয়েছে তা কংগ্রেসের গত রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গিয়েছে৷ দ্বিতীয়ত, এখনই সিট নিয়ে, প্রধানমন্ত্রীত্ব নিয়ে এত দ্বন্দ্ব–সংঘাত, অনৈক্য, তারপর কোয়ালিশন সরকার হলে স্থায়ী সরকার হবে না, কোন্দল আরও বাড়বে৷ ফলে তারা ঠিক করল, বিজেপিকে জেতাতে হবে৷ বিজেপিকে জেতানোর জন্য কর্পোরেট সেক্টরের ইলেকশন বন্ডের ৯৫ শতাংশ টাকা দেওয়া হল তাদের৷ ২৭ হাজার কোটি টাকা বিজেপি ইলেকশনে খরচ করেছে৷ এ তো প্রকাশ্য হিসাব, এর বাইরে আরও কত হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেছে৷ কারা এই টাকা দিল? এই সমস্ত টাকা তারাই দিল যাদের জন্য বিজেপি ‘আচ্ছে দিন’ এনেছে৷

এহ বিজেপির রাজত্বের এক চিত্র আপনারা দেখুন৷ ভারতবর্ষে এক শতাংশ ধনী দেশের সম্পদের ৭৩ শতাংশের মালিক৷ গত ২০১৭–১৮ সালে এই এক শতাংশ ধনীর সম্পদ বেড়েছে ২০ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা৷ ফলে বিজেপিকে ওরা আশীর্বাদ তো করবেই শুধু মুকেশ আম্বানির দৈনিক আয় গড়ে ৩০০ কোটি টাকা৷ গত তিন বছরে তার সম্পদ বেড়েছে ৬৬ শতাংশ, গৌতম আদানির সম্পদ বেড়েছে ৬৬ শতাংশ, গৈরিক বসনধারী রামদেবের আয় বেড়েছে ১৭৩ শতাংশ৷ এখন তো সবকিছুরই ব্যবসা করে এই রামদেব৷ এই সময়ে বিজেপি সভাপতির নিজের ব্যবসার আয় বেড়েছে ৩০০ শতাংশ৷ তাঁর ছেলের আয় বেড়েছে ১৬০০ শতাংশ৷ ব্যাঙ্ক থেকে ১ লক্ষ ৫৬ হাজার ৭০২ কোটি টাকা এরা ঋণ নিয়েছে, বিজেপি সরকার সেই ঋণ মকুব করে দিয়েছে৷ ব্যাঙ্কের টাকা মানে পাবলিকের টাকা৷ ট্যাক্স ছাড় বাবদ বৃহৎ শিল্পপতিদের ১৩,০০,০০০ কোটি টাকা উপরি দিয়েছে৷ তারা অবাধে দুর্নীতি চালিয়েছে৷ দেশে–বিদেশে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা সঞ্চয় করেছে৷ কালো টাকা কারা সঞ্চয় করে? ছোট দোকানদার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী না এই বড় বড় ব্যবসায়ীরা? ফলে বিজেপি সরকার একটা কালো টাকাও খুঁজে পায়নি৷ কালো টাকার ব্যবসায়ীদেরও খুঁজে পাচ্ছে না কোথাও৷ কী করে খুঁজে পাবে? তারা তো দোস্ত, নেতা–মন্ত্রীদের আশেপাশেই ঘুরছে৷ তারাই তো ফান্ড জোগাচ্ছে, যেমন একসময় কংগ্রেসকেও দিয়েছে৷

বালাকোটকে ব্যবহার করে হাওয়া তোলা হয়েছে

এবারের ইলেকশনে তো আপনারা দেখেছেন, একে অপরের বিরুদ্ধে কী কাদা ছোড়াছুড়ি করেছে, কী কুৎসিত ভাষায় পরস্পর পরস্পরকে আক্রমণ করেছে, কী কদর্য আক্রমণ করেছে, বাবা–মা তুলে পর্যন্ত গালিগালাজ করেছে৷ বুর্জোয়া রাজনীতিবিদরা নোংরামি, শালীনতার শেষ সীমা অতিক্রম করেছে৷ মন্ত্রীত্বের উদগ্র লালসায় ওরা সব কিছুই করতে পারে৷ এ অবস্থায় কংগ্রেস তুলল বিজেপি সরকারের রাফায়েল যুদ্ধ বিমানের দুর্নীতির প্রসঙ্গ৷ ফ্রান্সের তৎকালীন প্রেসিডেন্টের নিজের স্বীকৃতি ভারতের বিজেপি প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে অনিল আম্বানিকে এই যুদ্ধ বিমানের বরাত পাইয়ে দেওয়া হয়েছে, যার নিজস্ব কোনও বিমান তৈরির কারখানাও ছিল না৷ সংবাদপত্রে ফাঁস হয়ে গেল, প্রতিরক্ষা দপ্তরের আমলাদের লিখিত অভিযোগ যে, এই চুক্তি আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের আমলারা নিয়ম বহির্ভূতভাবে নাক গলিয়েছে৷ এসবের সদুত্তর দিতে না পেরে বিজেপি পাল্টা কংগ্রেসের বোফর্স কেলেঙ্কারির প্রশ্ন তুলল, যে কেলেঙ্কারি আজও ধামাচাপা হয়ে আছে৷ যেমন এখন ইলেকশন শেষ হয়ে গেছে, কংগ্রেস আর রাফায়েল তদন্ত নিয়ে উচ্চবাচ্য করছে না৷ আবার ইলেকশন এলে হয়তো তুলবে৷ দুই দলই দুই দলের কেলেঙ্কারি জানে, প্রয়োজনে তোলে, আবার ধামাচাপা দেয়৷ কখনও শুনেছেন, দুর্নীতির জন্য বড় বড় শিল্পপতি, মন্ত্রী, আমলাদের সাজা হয়েছে? সাজা হয় ছিঁচকে চোরদের৷ এটাই হচ্ছে মোদিজি’র ‘না খাউঙ্গা, না খানে দুঙ্গা’৷ নীরব মোদি, মেহুল চোক্সি, বিজয় মালিয়াদের বিদেশে যেতে কে সাহায্য করেছে– এই প্রশ্নের আজও কোনও সদুত্তর নেই৷ এই অবস্থায় ভোটযুদ্ধের উত্তাপ যখন বাড়ছে, ‘কী হয় কী হয়’ মানুষ ভাবছে, তখন হঠাৎ কাশ্মীরের পুলওয়ামায় জঙ্গি হামলা হল, বেশ কয়েকজন জওয়ান মারা গেল, যদিও এর আগে কাশ্মীরে বহু জঙ্গি হামলা হয়েছে৷ সরকারই বলেছে ২ জন জঙ্গি মারতে ১ জন জওয়ান –এই হারে মারা গেছে৷ পুলওয়ামায় এই দুঃখজনক ঘটনাকে বিজেপি ইলেকশন ইস্যু করে ফেলল৷ পাল্টা পাকিস্তানের বালাকোটে বিমান হানা চালাল৷ দেশব্যাপী প্রচারের ঝড় তুলল, প্রধানমন্ত্রী কত বীর, দেশরক্ষক, পাকিস্তানকে জব্দ করল৷ এর আগে কংগ্রেসও কার্গিল যুদ্ধ, বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্ণে ভারত–পাক যুদ্ধকে ইলেকশনে একইভাবে কাজে লাগিয়েছে৷ ফলে বিজেপি এবার বালাকোটকে ব্রহ্মাস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক হাওয়া তুলল৷

কংগ্রেসের রাজনীতি আলাদা কিছু নয়

এছাড়া ইলেকশন কমিশন তো নগ্নভাবে বিজেপির হয়ে কাজ করেছে৷ এখন ভোটেও সবরকম জালিয়াতি হয়৷ খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইলেকশনে জালিয়াতির তদন্ত চলছে৷ ভোটের শেষপর্বে প্রধানমন্ত্রী একেবারে গৈরিক বসন পরে কেদারনাথে ধ্যানমগ্ন হয়ে গেলেন৷ ইতিপূর্বে হিন্দু ভোট টানার জন্য যা করার সব কিছু করেছে৷ যদিও সিপিএম–এর ‘সেকুলার বন্ধু’ কংগ্রেসও কম করেনি, বিজেপি’র সাথে পাল্লা দিয়ে কে আগে কোন মন্দিরে পূজা দেবে, কোথায় কোন দেবতার আশীর্বাদ চাইবে– এই সবই করেছে৷ কিন্তু কেদারনাথ যাওয়া তাদের মাথায় আসেনি৷ সে যাই হোক, আসলে কেদারনাথ বুর্জোয়া শ্রেণিই ঠিক করেছিল এবারও তারা বিজেপিকেই গদিতে বসাবে এবং বসিয়েছেও৷ তাই দেখুন, নরেন্দ্র মোদির শপথ অনুষ্ঠানে কারা হাজির? এইসব বৃহৎ পুঁজিপতিরাই৷ এটা তো তাদেরই বিজয় অনুষ্ঠান৷ মনে রাখবেন, এখন রাজতন্ত্র নেই, কিন্তু রাজা আছে, গণতন্ত্রের মোড়কে বুর্জোয়ারাই রাজত্ব চালায়৷ আর মন্ত্রীসভা হচ্ছে ওদের হুকুমে চলা পলিটিক্যাল ম্যানেজার৷

এদিকে ইলেকশনে ভরাডুবি হয়ে বিরোধী জাতীয় বুর্জোয়া দল কংগ্রেস ও অন্যান্য আঞ্চলিক বুর্জোয়া দলগুলির অবস্থা শোচনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, চরম হতাশায় ভুগছে৷ যদিও বুর্জোয়া শ্রেণি ভবিষ্যতের স্বার্থে এই দলগুলিকে আবার খাড়া করবে, যখন বিজেপি অতীতের কংগ্রেসের মত খুবই আনপপুলার হবে, তখন কংগ্রেসকে ‘ত্রাতা’ হিসাবে জনগণের সামনে এনে হাজির করবে৷ বুর্জোয়া দ্বিদলীয় গণতন্ত্রে এরকম পাল্টাপাল্টি ইউরোপে, মার্কিন দেশে হচ্ছে, এদেশেও হচ্ছে৷ সিপিএম, সিপিআই–এর অবস্থাও চরম সঙ্কটজনক৷ যে অবিভক্ত সিপিআই (যার মধ্যে সিপিএম, সিপিআই, নকশালরা ছিল) ১৯৫২ সালে প্রথম লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের পরে সর্বাধিক সিট পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হয়েছিল, তারা দীর্ঘদিন এমন ‘বামপন্থা’ চর্চা করেছে যে এবার নির্বাচনে সিপিএম নিজস্ব শক্তিতে ১টি ও ডিএমকে’র কাঁধে ভর করে আরও ২টি সিট এবং সিপিআই একইভাবে ১টি সিট পেয়েছে৷ এমনই দুরবস্থা ওদের এই দুইটি দলের নেতৃত্ব ভোটে ফায়দা তোলার জন্য কংগ্রেস ও আঞ্চলিক বুর্জোয়া দলগুলিকে সেকুলার ও গণতান্ত্রিক তকমা লাগিয়ে আপ্রাণ চেষ্টা করেছে কিছু সিট পাওয়ার জন্য৷ অথচ এই কংগ্রেস ধর্মের সাথে আপোস করে স্বাধীনতা আন্দোলন পরিচালনা করেছে, ক্ষমতায় এসে ধর্মান্ধতাকে কাজে লাগিয়েছে, আরএসএস–বিজেপির মত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধিয়েছে, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিহারের ভাগলপুরে, ওড়িশার রাউরকেল্লায়, আসামের নেলীতে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে এবং দিল্লিতে শিখদের বিরুদ্ধে দাঙ্গা৷ এগুলি কি সেকুলারিজমের লক্ষণ? যথার্থ সেকুলারিজম হচ্ছে ধর্মের সাথে রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতির সম্পর্ক থাকবে না৷ ধর্ম ব্যক্তির বিশ্বাসের বিষয় হবে৷ এই ধারণাই ইউরোপে নবজাগরণ ও গণতান্ত্রিক বিপ্লব এনেছিল৷ এদেশে নেতাজি সুভাষচন্দ্র, ভগৎ সিং এবং রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, নজরুল, প্রেমচাঁদ, সুব্রহ্মনিয়াম ভারতী, জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালারা সেকুলারিজমের এই ধারণা প্রচার করেছিলেন৷ কিন্তু সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ভয়ে ভীত ভারতীয় বুর্জোয়ারা এবং তাদের প্রতিনিধি দক্ষিণপন্থী জাতীয় কংগ্রেস নেতৃত্ব যেমন রাজনৈতিকভাবে সশস্ত্র বিপ্লবের বিরোধিতা করেছিল, তেমনি বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদী মনন যাতে দেশে গড়ে না ওঠে তার জন্য সামাজিক–সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ধর্মীয় চিন্তার সাথে আপোস করেছিল৷ যার ফলে সংখ্যালঘু জনগণ ও তথাকথিত নিম্নবর্ণের অধিকাংশ মানুষ জাতীয় কংগ্রেস নেতৃত্বকে উচ্চবর্ণীয় হিন্দু নেতৃত্ব গণ্য করে স্বাধীনতা আন্দোলনের বাইরে ছিল৷ এর সুযোগ নিয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধিয়ে জাতীয় কংগ্রেস, হিন্দু মহাসভা, মুসলিম লিগ, আরএসএস–এর সম্মতিক্রমে দেশভাগ করাল৷

স্বাধীন ভারতে ক্ষমতায় থাকাকালীন কংগ্রেস শুধু জরুরি অবস্থা জারিই নয়, টাডা, মিসা, আফস্পা, ইউএপিএ ইত্যাদি কালাকানুন চালু করেছে৷ গণআন্দোলন দমনে কত শত শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র, যুবককে হত্যা করেছে৷ সেই কংগ্রেসকে সিপিএম, সিপিআই গণতান্ত্রিক আখ্যা দিচ্ছে৷ আর আঞ্চলিক বুর্জোয়া দলগুলি তো নানা প্রাদেশিকতাবাদ ও জাতপাতের রাজনীতি করছে৷ এরা সকলেই ধর্মভিত্তিক রাজনীতির চর্চা করছে৷ ক্ষমতায় থাকাকালীন এরাও কংগ্রেস বিজেপির মতো গণআন্দোলনে দমন–পীড়ন চালিয়েছে৷ এদেরকেও সিপিএম, সিপিআই, সেকুলার ও গণতান্ত্রিক লেবেল লাগিয়ে ঐক্যের চেষ্টা করেছে সিটের লোভে৷ কংগ্রেস সহ এই দলগুলির দরজায় দরজায় গেছে সিপিএম ও সিপিআই নেতারা, একমাত্র ডিএমকে ছাড়া কেউ সাড়া দেয়নি৷

এই প্রসঙ্গে আমরা আরও বলতে চাই বিগত বিজেপি শাসনের বিরুদ্ধে যখন রাজ্যে রাজ্যে কৃষক–শ্রমিক–ছাত্র বিক্ষোভ লড়াই স্বতঃস্ফূর্তভাবে ফেটে পড়েছিল, আমরা চেয়েছিলাম বামপন্থীরা ঐক্যবদ্ধভাবে এই আন্দোলনগুলির নেতৃত্ব দিক৷ তাহলে দেশে শ্রেণিসংগ্রাম ও গণআন্দোলন জোরদার হবে, শক্তিশালী বাম–গণতান্ত্রিক ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে উঠবে৷ কিন্তু তারা সাড়া না দিয়ে কংগ্রেসের সাথে বোঝাপড়ায় মগ্ন রইলেন৷ নেতৃত্বহীন অবস্থায় আন্দোলনগুলি থিতিয়ে গেল৷ অতীতেও সিপিএম–সিপিআই ইন্দিরা কংগ্রেসকে ‘সেকুলার’, ‘গণতান্ত্রিক’ আখ্যা দিয়ে সমর্থন করেছে, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলে কংগ্রেসের সাথে বোঝাপড়া করেছে৷ একই ভাবে ১৯৭৪ সালে জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা দেশব্যাপী গণআন্দোলনে তারা যোগ দেয়নি৷ যার সুযোগ নিয়ে এই আন্দোলনে ঢুকে ফয়দা তুলে আরএসএস–জনসংঘ শক্তি বাড়াল৷ আবার ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে কংগ্রেসী ‘স্বৈরাচার’–এর বিরুদ্ধে জনতা পার্টির (যার মধ্যে আরএসএস–জনসংঘ ছিল) সাথে সিপিএম হাত মেলাল৷ একই যুক্তিতে ১৯৮৯ সালে ভিপি সিং সরকারকে সিপিএম–বিজেপি যুক্তভাবে সমর্থন জানাল৷ কলকাতা ময়দানে জ্যোতি বসু–বাজপেয়ী একত্রে মিটিং করেছিলেন৷ বিজেপি–র সমর্থনে কলকাতা কর্পোরেশন চালিয়েছিল সিপিএম৷ ভোটের স্বার্থে এই ধরনের নিকৃষ্ট সুবিধাবাদের চর্চা তারা বার বার করেছে৷

এস ইউ সি আই (সি) সর্বদা বিপ্লবী লাইনের ভিত্তিতেই নির্বাচনে লড়াই করে

আপনারা জানেন, এই পরিস্থিতিতে আমাদের দল এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট) যথার্থ মার্কসবাদী দল হিসাবে কমরেড শিবদাস ঘোষ নির্ধারিত গাইড লাইনের ভিত্তিতে বহু রাজ্যেই নির্বাচনে লড়েছে, একথা জেনেই যে, আমরা কোনও সিট পাব না৷ টাকার খেলায় ও পোলারাইজেশনের হাওয়ায় ভোটও বিশেষ পাব না৷ কমরেড শিবদাস ঘোষ আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন যে, ‘যতদিন না বিপ্লব হয়, জনতা ইলেকশন চাক বা না চাক, পছন্দ করুক, নাই করুক, ভাল লাগুক, মন্দ লাগুক, জনতাকে টেনে আনা হয়৷ জনতা এসে যায়৷ বিপ্লব মানে হল, যখন জনতা বুঝে ফেলেছে ইলেকশনের প্রয়োজনীয়তা নেই৷ যখন সকলে এই চেতনার ভিত্তিতে সংগঠিত হয়ে গেছে এবং সংগঠিতভাবে ইলেকশন বর্জন করছে৷ নেগেটিভলি বর্জন করছে না, পজিটিভলি তারা আপরাইজিং বা গণভ্যুত্থানের জায়গায় চলে গেছে৷ যখন সে বলে, না ইলেকশন নয়, ক্ষমতা দখল– তখনই একমাত্র ইলেকশন অকার্যকরী হতে পারে৷ না হলে ইলেকশনে জনতা বারবার ফেঁসে যায়৷ আর জনতার সঙ্গে থাকার জন্য বিপ্লবীকেও ইলেকশনে যেতে হয়৷ আর বিপ্লবী উদ্দেশ্যমুখীনতার লক্ষ্য থেকে প্রলেতারিয়েট যখন অনন্যোপায় হয়ে জনতার সঙ্গে থাকার জন্য নির্বাচনী লড়াইতে যায়, তখন সে জনতার বিপ্লবী রাজনৈতিক লাইনের ভিত্তিতে যায়৷ সিট জেতবার জন্য সেও চেষ্টা করে সাধ্যমতো৷ কিন্তু তার উদ্দেশ্যের কেন্দ্রবিন্দুটা কখনওই যেভাবেই হোক সর্বাধিক আসন দখল করা হয় না৷ তার মেইন ফোকাল পয়েন্টটা হয়, জনতাকে একটা মাস রেভলিউশনারি লাইনের ভিত্তিতে ইলেকশনে লড়াই করতে শেখানো এবং সেইটা করতে গিয়ে ম্যাক্সিমাম সিট পাই পাব, যদি না পাই, একটাও না পাই, না পাব৷ … কিন্তু তার সেন্ট্রাল ফোকাল পয়েন্ট কখনও হবে না … যেন তেন প্রকারেণ যে কোনও উপায়ে কতগুলি সিট গ্র্যাব করা৷ … শত্রুকে হারাবার জন্য যা দরকার, তাই কর, এসব যুক্তি যদি তোলো, বিপ্লবী তকমা এঁটে তোলো, তাহলে কিন্তু বুর্জোয়ারা যেভাবে ইলেকশন ফাইট করে, তুমিও আসলে সেই কৌশলটি, সেই কায়দাটি বিপ্লবের নামে চালু করার চেষ্টা করবে৷ এতে কি বিপ্লবী হওয়া যায়? এর দ্বারা কি বিপ্লবের কাজ এগোয়? না, এতে বিপ্লবী হওয়া যায় না এবং এর দ্বারা বিপ্লবী কাজও এগোয় না৷’’ এই শিক্ষার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েই আমাদের দলের কয়েক হাজার কর্মী–সমর্থক নির্বাচনে কাজ করেছে, সারা দেশে লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে আমাদের দলের বৈপ্লবিক বক্তব্য পৌঁছে দিয়েছে৷ আমরা জিতব না ভেবে অনেকেই ভোট দেয়নি, একথা ঠিক৷ কিন্তু আমাদের নৈতিক সমর্থন দিয়েছে, নমিনেশন ফাইলের টাকা থেকে শুরু করে নির্বাচনের যাবতীয় খরচ সাধারণ মানুষই দিয়েছে৷ ঘরে ঘরে রাস্তায় রাস্তায় আমাদের কর্মীরা চাঁদা তুলেছে, জনগণ সাগ্রহে দিয়েছে গরিবের দল গণ্য করে৷

একথা সবাই জানে, কমরেড শিবদাস ঘোষের আদর্শে শিক্ষিত আমাদের দল কোনও দিন শিল্পপতি, বড় বড় ব্যবসায়ীদের কাছে নিজেদের বিক্রি করেনি, টাকার জন্য হাত পাতেনি৷ পার্টির দৈনন্দিন কাজকর্ম চালাবার জন্য, আন্দোলন চালাবার জন্য, কোনও প্রোগ্রাম করার জন্য আমরা সাধারণ মানুষের কাছেই হাত পাতি এবং তারাও ভালবেসে মুক্তহস্তে সাহায্য করেন৷ বরং বহু লোক স্নেহচ্ছলে ঠাট্টা করে বলে, আপনারা পাগল, এজন্যই ভোটে জিতছেন না৷ অন্য দল টাকা দেয়, সুযোগ সুবিধা দেয়, ভোট চায়৷ কাগজে টিভিতে ওদের কত প্রচার৷ আর আপনাদের সংবাদমাধ্যমে নামগন্ধ নেই, আপনারা চাঁদা চান ভোটও চান৷ আজকের দিনে এইরকম নীতি–আদর্শ নিয়ে জেতা যায়? আমাদের কর্মীরা তাদের কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলে, ভোট পাই না পাই, আপনাদের ভালবাসা, সমর্থনই আমাদের সম্বল৷ ভোটের জন্য সংবাদমাধ্যমে প্রচারের জন্য ছুটব না৷ এভাবেই বিপ্লবী দল হিসাবে আমরা এগোচ্ছি এবং এগোব৷ এবার নির্বাচনে আমরা কোন সিট না পেলেও বহু নতুন কর্মী–সমর্থক পেয়েছি, বহু সৎ বামপন্থী মনোভাবসম্পন্ন মানুষকে পেয়েছি৷ এদের মধ্যে শ্রমিক–কৃষক–যুবক-মহিলা-ছাত্র সর্বস্তরের মানুষ আছেন৷ নতুন জায়গায় যোগাযোগ পেয়েছি, আর পেয়েছি অজস্র মানুষের ভালবাসা৷ তারা বারবার বলেছেন, আর সবাই পচে গেছে, আপনারাই একমাত্র ভরসা৷ আপনারা আরও দ্রুত বড় হোন৷ নির্বাচনী লড়াইয়ে এই সাফল্য পেয়ে আমাদের দলের কর্মীরা উদ্দীপিত, অনুপ্রাণিত, তাদের মধ্যে হতাশার লেশমাত্র নেই৷ কারণ তারা মহান লেনিন–স্ট্যালিন–মাও সে তুং–শিবদাস ঘোষের শিক্ষা থেকে জানে রাশিয়া, চিন, ভিয়েতনামে কোথাও ভোটের মাধ্যমে, সিটের জোরে বিপ্লব হয়নি, বিপ্লব হয়েছে বিপ্লবী আদর্শে শিক্ষিত, সুসংগঠিত, উন্নত নৈতিক শক্তিতে বলিয়ান বিপ্লবী জনগণের শক্তিতে৷

বিজেপির শক্তি বৃদ্ধির কারণ

এই বিপ্লবের প্রস্তুতি হিসাবে চাই পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক শ্রমিকশ্রেণির সংগ্রাম ও গণআন্দোলন৷ পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসি হয়ে দাঁড়িয়েছে পার্লামেন্টারি ফ্যাসিস্ট অটোক্রেসি৷ যদিও পার্লামেন্টের ঠাট–বাট সবই আছে৷ ১৯৪৮ সালেই কমরেড শিবদাস ঘোষ হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্যাসিস্ট জার্মানি–ইটালি পরাস্ত হলেও বিশ্বের উন্নত–অনুন্নত সব দেশেই নানারূপে ফ্যাসিবাদ বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ বলেছিলেন, ফ্যাসিবাদ যথার্থ মানুষ গড়ে ওঠার প্রক্রিয়াকে ধ্বংস করে দেয়৷ অন্ধতা, গোঁড়ামি, যুক্তিহীনতা, উগ্র জাতীয়তাবাদ, ঐতিহ্যবাদ এগুলিকে ফ্যাসিবাদ গড়ে তুলছে৷ কংগ্রেসই এ দেশে ফ্যাসিবাদের ভিত্তি স্থাপন করেছে৷ আজ বিজেপি ক্ষমতাসীন হয়ে ফ্যাসিবাদকে আরও শক্তিশালী করছে৷ আপনাদের বুঝতে হবে বিজেপি এভাবে শক্তি বাড়াতে পারল কী করে? পুঁজিপতিশ্রেণির সর্বাত্মক মদত তো আছেই, যেমন আগে কংগ্রেসও পেয়েছে৷ এছাড়াও প্রধানত আরও তিনটি কারণ কাজ করেছে বিজেপির এই শক্তিবৃদ্ধির ক্ষেত্রে৷ প্রথমত বিপ্লব ভীত জাতীয় কংগ্রেস স্বাধীনতা আন্দোলনের যুগেই সামাজিক–সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পথ গ্রহণ না করে ধর্মীয় চিন্তা, ঐতিহ্যবাদ, বর্ণভেদ, প্রাদেশিকতা, আঞ্চলিকতাবাদ ইত্যাদির সাথে আপস করেছিল৷ যার ফলে সমাজে বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা, গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা, যথার্থ সেকুলারিজম গড়ে উঠতে পারেনি৷ ঐক্যবদ্ধ সিপিআই–ও এসবের বিরুদ্ধে কোনও কার্যকরী আন্দোলন করেনি৷ ফলে দেশের মাটিতে ধর্মীয় সেন্টিমেন্ট, বিশেষত হিন্দু ধর্মীয় সেন্টিমেন্ট ধর্মগত–বর্ণগত– বিদ্বেষ থেকেই গিয়েছিল৷ স্বাধীনতা আন্দোলন চলাকালীন এক ধরনের রাজনৈতিক ঐক্য থাকায় এগুলি ততটা সামনে আসতে পারেনি৷ কিন্তু পরবর্তীকালে ঐ হিন্দু সেন্টিমেন্ট ও ঐতিহ্যবাদকে কাজে লাগিয়ে আরএসএস এবং প্রথমে জনসংঘ ও পরে বিজেপি মাথা তুলে দাঁড়াল৷ দ্বিতীয়ত, শক্তিশালী বামপন্থী ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অনুপস্থিতি তাদের সুযোগ করে দিল৷ বড় বামপন্থী দল সিপিআই, সিপিএম নেতৃত্ব এইসব মধ্যযুগীয় প্রাচীন, সামন্ততান্ত্রিক ধ্যানধারণার বিরুদ্ধে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও ধর্মীয় প্রভাবমুক্ত মানবতাবাদের ভিত্তিতে কোনও সামাজিক–সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলেনি শুধু তাই নয়, ঐক্যবদ্ধ সিপিআই এমনকি হিন্দু মহাসভা ও মুসলিম লিগের সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে হিন্দু ও মুসলমান আলাদা জাতি এই বিচিত্র তত্ত্ব খাড়া করে দেশভাগও সমর্থন করেছিল৷ এসবই আরএসএস–এর শক্তিবৃদ্ধিতে কাজ করেছে৷ এটা আপনারা মনে রাখবেন৷ তৃতীয়ত আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ কারণও আপনাদের লক্ষ্য রাখতে হবে– সেটা হচ্ছে যতদিন মহান স্ট্যালিন ও মাও সে তুং–এর নেতৃত্বে বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদ–পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা দাঁড়িয়েছিল, ততদিন তার অনুপ্রেরণায় উপনিবেশ–আধা উপনিবেশগুলিতে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন, দেশে দেশে শ্রমিক আন্দোলন, গণতান্ত্রিক ও গণআন্দোলন জোর কদমে এগোচ্ছিল৷ যুদ্ধবিরোধী প্রবল শান্তি আন্দোলনও মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল৷ এই পরিস্থিতিতে সাম্রাজ্যবাদ–পুঁজিবাদের প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্র থাকা সত্ত্বেও সমগ্র দুনিয়ায় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, বৈজ্ঞানিক যুক্তিধারা, প্রগতিশীল মানসিকতার প্রাধান্য ছিল৷ কিন্তু সাম্রাজ্যবাদীদের ষড়যন্ত্রে ও আভ্যন্তরীণ পুঁজিবাদী প্রতিবিপ্লবের ফলে সমাজতন্ত্র ধ্বংস হওয়ায় সমগ্র বিশ্বে আজ ধর্মীয় মৌলবাদ, উগ্র জাতীয়তাবাদ, বর্ণবিদ্বেষ, মধ্যযুগীয় প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তাভাবনা, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিবর্জিত অন্ধ মানসিকতা ইত্যাদি প্রতিক্রিয়াশীলতার স্রোত বইছে৷ এই পরিস্থিতিও আরএসএস–বিজেপির উত্থানে সাহায্য করছে৷ এই প্রসঙ্গে বিশ্ববরেণ্য মনীষী রঁম্যা রঁল্যার একটি সতর্কবাণী আপনাদের পড়ে শোনাচ্ছি৷ তিনি ১৯৩২ সালেই বলেছেন, ‘‘আজ পৃথিবীতে সোভিয়েত গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে এক ভয়াবহ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি সমাবেশ গড়িয়া উঠিতেছে৷ … যদি ইহা ধ্বংস হইয়া যায় তবে শুধু সর্বহারারাই ক্রীতদাসে পরিণত হইবে না, সামাজিক বা ব্যক্তিগত সর্বপ্রকারের স্বাধীনতারই সমাপ্তি ঘটিবে৷ বিশ্বকে বহু যুগ পিছনে ফেলিয়া দিবে৷ … কয়েক শতাব্দীর মতো সেখানে অন্ধকার গভীর হইয়া নামিয়া আসিবে৷’’(১) বাস্তবে যে এটা ঘটেছে আজকের বিশ্বের দিকে তাকালেই বুঝতে পারবেন৷

বিজ্ঞানসম্মত, যুক্তিবাদী মনন ধ্বংস করতে চায় বিজেপি

আজ যারা প্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে বা আর্থিক ও অন্যান্য সুযোগসুবিধার লোভে আরএসএস–বিজেপির ঝাণ্ডা বহন করছেন, তারা কি জানেন আরএসএস–বিজেপি এই দেশের নবজাগরণের মনীষীদের আদর্শ ও ভূমিকাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করছে? এদেশের নবজাগরণের উষালগ্নে রামমোহন রায় বলেছেন, ‘‘সংস্কৃত শিক্ষাপদ্ধতি দেশকে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যপ্রণোদিত৷ এই দেশে ইতিমধ্যেই দু’হাজার বছর ধরে এই শিক্ষা চলে এসেছে৷ ব্রিটিশ সরকার হিন্দু পণ্ডিতদের দিয়ে পুনরায় তাই চালু করছে৷ যার ফলে মিথ্যা অহঙ্কার জন্মাবে৷ অন্তঃসারশূন্য চিন্তা, যেটা স্পেকুলেটিভ মানুষেরা করছেন, সেটাই বাড়বে৷ বেদান্ত শিক্ষার দ্বারা যুবকরা উন্নত নাগরিক হতে পারবে না৷ বেদান্ত যা শেখায় সেটা হচ্ছে, এই পরিদৃশ্যমান জগতে কোনও কিছুরই অস্তিত্ব নেই৷ উন্নততর ও উদার শিক্ষার জন্য প্রয়োজন অঙ্কশাস্ত্র, প্রাকৃতিক দর্শন, কেমিষ্ট্রি, অ্যানাটমি, অন্যান্য কার্যকরী বিজ্ঞান শিক্ষা৷’’(২) তাঁরই পদাঙ্ক অনুসরণ করে নবজাগরণের রক্তিম সূর্যোদয়ের মুহূর্তে বিদ্যাসাগর আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে বললেন, ‘‘সাংখ্য ও বেদান্ত যে ভ্রান্ত দর্শন তা আর বিতর্কের বিষয় নয়৷ … ইউরোপ থেকে এমন দর্শন পড়ানো উচিত যে দর্শন পড়লে আমাদের যুবকরা বুঝবে যে বেদান্ত এবং সাংখ্য ভ্রান্ত দর্শন৷ … ভারতীয় পণ্ডিতদের গোঁড়ামি আরব খলিফার চেয়ে কম নয়৷ তাঁদের বিশ্বাস যে ঋষিদের মস্তিষ্ক থেকে শাস্ত্রগুলি বেরিয়েছে, তাঁরা সর্বজ্ঞ, অতএব তাঁদের শাস্ত্র অভ্রান্ত৷ … যেখানেই আধুনিক ইউরোপের জ্ঞানের আলো পৌঁছেছে সেখানে ততটুকু এদেশীয় শাস্ত্রীয় বিদ্যার প্রভাব কমছে৷ এই শিক্ষার প্রভাব বাড়াতে হবে৷ … পড়াতে হবে ভূগোল, জ্যামিতি, সাহিত্য, প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, প্রাকৃতিক দর্শন, মডার্ণ ফিলজফি, সায়েন্স, পলিটিক্যাল ইকনমি৷ … এমন শিক্ষক চাই যারা বাংলা ভাষা জানে, ইংরেজি ভাষা জানে আর ধর্মীয় কুসংস্কারমুক্ত৷’’(৩) একথা অনেকেই জানে না, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ভগবানে বিশ্বাস করতেন না৷ দীক্ষা নেননি৷ কোনও মন্দির দর্শন করেননি৷ তাঁর রচিত পাঠ্যপুস্তকে ভগবান বা অলৌকিক তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা নেই৷ যার জন্য ইংরেজ সরকার নিযুক্ত তদন্তকারী বিশপ মার্ডক তাঁকে ‘র্যাঙ্ক মেটেরিয়ালিস্ট’ (‘চরম বস্তুবাদী’) বলে অভিযুক্ত করেছিলেন৷ অথচ এই বিদ্যাসাগরকেই শ্রদ্ধা জানাতে রামকৃষ্ণ তাঁর বাড়ি গিয়েছিলেন৷ বিবেকানন্দ বলেছিলেন, রামকৃষ্ণ ও বিদ্যাসাগর তাঁর আদর্শ৷ সমসাময়িক মহারাষ্ট্রের জ্যোতিবারাও ফুলেও পাশ্চাত্তের বৈজ্ঞানিক শিক্ষার পক্ষে ছিলেন৷ দেখা যাচ্ছে ব্রিটিশ সরকার যেখানে সংস্কৃত ও ধর্মীয় ভাববাদী দর্শন শিক্ষার উপর গুরুত্ব দিচ্ছে, সেখানে তার বিরোধিতা করছেন রামমোহন, বিদ্যাসাগর, ফুলে৷ বিদ্যাসাগরের অনুগামী বিপ্লবী  মানবতাবাদী সাহিত্যিক শরৎচন্দ্রও বলিষ্ঠ কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘‘… কোনও ধর্মগ্রন্থই অভ্রান্ত হতে পারে না৷ বেদও ধর্মগ্রন্থ৷ সুতরাং এতেও মিথ্যার অভাব নেই৷’’ ‘‘সমস্ত ধর্মই মিথ্যা, আদিম দিনের কুসংস্কার৷ বিশ্বমানবতার এতবড় শত্রু আর নেই৷’’(৪) বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদী শিক্ষার গুরুত্ব ও শাস্ত্রীয় গোঁড়ামিমুক্ত মানসিকতা গড়ে উঠুক– নবজাগরণের এই আহ্বান রবীন্দ্রনাথ, প্রেমচন্দ, সুব্রহ্মনম ভারতী, জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা, নজরুল সকলের সাহিত্যসৃষ্টিতেই ছিল৷ আরএসএস–বিজেপি কিন্তু এসবের বিরুদ্ধতা করে৷ তারা ইংরেজির গুরুত্ব কমিয়ে সংস্কৃত শিক্ষার গুরুত্ব বাড়িয়ে হিন্দু ধর্মশাস্ত্রভিত্তিক শিক্ষা প্রচলনের দিকেই দেশকে নিয়ে যাচ্ছে৷ ইউরোপীয় ও এদেশের প্রথিতযশা বৈজ্ঞানিকদের সকল আবিষ্কারকে নস্যাৎ করে দিয়ে ‘সবই বেদে আছে’, প্রাচীনকালের ঋষিরাই সব আবিষ্কার করে গেছেন, এই অসত্য সকলকে বিশ্বাস করাতে চাইছে৷ স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত গণেশের মাথায় প্লাষ্টিক সার্জারি হতে শুরু করে ওদের মোসায়েব কিছু পণ্ডিত নানা হাস্যকর উদ্ভট কাহিনী প্রচার করছে৷ অবশ্য এখনও ঘোষণা করেনি সম্প্রতি নিক্ষিপ্ত চন্দ্রযান কোন বৈদিক শাস্ত্রের মন্ত্র অনুযায়ী নির্মিত হয়েছে অথচ একদিন এই ভূখণ্ডে ধর্মশাস্ত্রের জোরে নয়, তার বিরুদ্ধতা করেই যথার্থই বিজ্ঞান সাধনা হয়েছিল৷ বিশেষত বৌদ্ধধর্মের প্রভাবের যুগে তো বেশ কিছু অগ্রগতি ঘটেছিল, সেটা পরবর্তীকালে বেদান্তের প্রভাবে রূদ্ধ হয়ে পড়ে৷ আধুনিক ভারতীয় বিজ্ঞানের অন্যতম পুরোধা আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় নিজে এই অভিযোগ করে গেছেন৷ ইউরোপে বিজ্ঞানসাধনায় ব্রতী ব্রুনো, গ্যালিলিও থেকে অনেকেই ধর্মীয় বিচারে নৃশংস ভাবে অত্যাচারিত এবং এমনকি প্রাণ হারিয়েছেন৷ যার প্রতিবাদে বিবেকানন্দ বলেছিলেন, ‘‘ব্রহ্মাণ্ড সম্পর্কে আধুনিক জ্যোতির্বিদ ও বৈজ্ঞানিকদের মতবাদ কী, তা আমরা জানি৷ আর ইহাও জানি যে, উহা প্রাচীন ধর্মতত্ত্ববিদদের কীরূপ ক্ষতি করিয়াছে৷ যেমন এক একটি নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার হইতেছে অমনি যেন তাঁহাদের গৃহে একটি করিয়া বোমা পড়িতেছে, আর সেই জন্যই তাহারা সকল যুগেই এই সকল বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান বন্ধ করিয়া দেওয়ার চেষ্টা করিয়াছেন৷’’(৫) হিন্দু ধর্মের অন্যতম প্রবক্তা বিবেকানন্দের এই বক্তব্য অনুযায়ী আরএসএস–বিজেপির এই ভূমিকার বিচার করলে কী দাঁড়ায়? পার্থক্য হচ্ছে, বিবেকানন্দের বিচার অনুযায়ী আধুনিক বিজ্ঞান ব্রহ্মাণ্ড সম্পর্কে নতুন নতুন আবিষ্কার করছে, তাতে প্রাচীন ধর্মতত্ত্ববিদরা আতঙ্কিত হয়ে বিজ্ঞানসাধনার গতিরোধ করার চেষ্টা করেছে৷ আর বর্তমান হিন্দুত্ববাদীরা দাবি করছে, আধুনিক বিজ্ঞানের কোনও নতুন আবিষ্কার নেই, সব আবিষ্কারই প্রাচীন হিন্দু ঋষিরা করে গেছেন৷ এটা কি তারা না বুঝে করছেন? নিশ্চয়ই তা নয়৷ তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে, আধুনিক বিজ্ঞানের গুরুত্ব অস্বীকার করে বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদী মন গড়ে ওঠার প্রক্রিয়াকে ধ্বংস করে প্রাচীন ধর্মীয় ঐতিহ্যবাদের দিকে দেশের মননকে বিপথগামী করা, যাতে ফ্যাসিবাদী অন্ধ বিশ্বাস গড়ে তোলা যায়৷ আরেকটা হচ্ছে, হিন্দু ধর্মীয় মৌলবাদ জাগিয়ে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের আগুন জ্বালিয়ে হানাহানি বাধিয়ে জনগণের ঐক্য বিনষ্ট করা, যেমন ব্রিটিশরা একদিন করেছিল, আর হিন্দু ভোটব্যাঙ্ক তৈরি করা৷ অন্য দিকে চরম দুর্দশাগ্রস্ত জনগণ যাতে পুঁজিবাদ ও সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ না হয়, তার জন্য তাদের দুঃখ–কষ্ট, বেকারিত্বের জ্বালা, অনাহারে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু সব কিছুর কারণ তাদের পূর্বজন্মের পাপের ফল, সবই বিধাতার বিধান, অদৃষ্টের লিখন, খোদা কি মর্জি, নসিব কা খেল, এজন্মে হাসিমুখে দুঃখকষ্ট সয়ে গেলে পরজন্মে ভগবান মুখ তুলে চাইবেন– এইসব ধর্মীয় প্রবচনে সাধারণ মানুষকে আচ্ছন্ন ও অন্ধ রাখা৷ কোনও সৎ ধর্মবিশ্বাস থেকে নয়, অত্যন্ত দুরভিসন্ধিমূলক ষড়যন্ত্র থেকেই আরএসএস–বিজেপি এইসব করছে৷ জনগণকে ভেবে দেখতে হবে তাঁরা কি ভারতীয় নবজাগরণের মনীষীদের মহান আদর্শ ও সংগ্রামকে অগ্রাহ্য করে এবং আধুনিক বিজ্ঞানকে বর্জন করে আরএসএস–বিজেপির এই ষড়যন্ত্রকে সমর্থন করবেন? এর দ্বারা দেশ কি আরও অধঃপতনে যাবে না? মানবতার চরম শত্রু ফ্যাসিবাদ আরও শক্তিশালী হবে না?

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধিতা করেছিল হিন্দুত্ববাদীরা

আরেকটি বিষয়ও দেশের জনগণের কাছে পুনরায় আমরা বিবেচনার জন্য উত্থাপন করতে চাই৷ তাঁরা কি জানেন শত শত শহিদের রক্তে রঞ্জিত ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকে এই আরএসএস ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ আখ্যা দিয়ে সম্পূর্ণ বিরোধিতা করেছে৷ এই কারণে আরএসএস কোনও পর্যায়েই স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দেয়নি৷ কারণ আরএসএস–এর গুরু গোলওয়ালকর বলেছেন, ‘‘ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদ এবং সার্বজনীন বিপদের তত্ত্ব থেকে আমাদের জাতিত্বের ধারণা তৈরি হয়েছে৷ এর ফলে আমাদের প্রকৃত হিন্দু জাতিতত্ত্বের সদর্থক অনুপ্রেরণা থেকে আমরা বঞ্চিত হয়েছি৷ …ব্রিটিশ বিরোধিতার সঙ্গে দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদকে সমার্থক করে দেখা হয়েছে৷ আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম, তার নেতৃবৃন্দ এবং সাধারণ মানুষের ওপরে এই প্রতিক্রিয়াশীল মতের প্রভাব সর্বনাশা হয়েছে৷ …তারাই একমাত্র জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেমিক, যারা তাদের অন্তরে হিন্দু জাতির গৌরব পোষণ করে এবং সেই লক্ষ্য পূরণে কাজ করে৷ বাকি যারা দেশপ্রেম জাহির করে হিন্দুজাতির স্বার্থহানি করছে তারা বিশ্বাসঘাতক ও দেশের শত্রু৷’’(৬) একবার ভেবে দেখুন এই বক্তব্য কী ভয়ঙ্কর যেহেতু হিন্দু জাতীয় চিন্তা দ্বারা স্বাধীনতা আন্দোলন পরিচালিত হয়নি, সমগ্র স্বাধীনতা আন্দোলন এবং তার নেতৃবৃন্দ দেশবন্ধু, লালা লাজপত, তিলক থেকে শুরু করে নেতাজি, ক্ষুদিরাম, ভগৎ সিং, শুকদেব, রাজগুরু, চন্দ্রশেখর আজাদ, সূর্য সেন, প্রীতিলতারা এমনকি গান্ধীজি, নেহেরু সকলেই আরএসএস–এর বিচারে বাস্তবে ‘প্রতিক্রিয়াশীল’, ‘বিশ্বাসঘাতক’ ও ‘দেশের শত্রু’৷ বিজেপির জনক আরএসএস–এর এই বক্তব্য কি দেশের জনগণ মেনে নেবেন? গৌরবময় স্বাধীনতা আন্দোলন, বরেণ্য স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ ও মহান শহিদদের অবমাননা করবেন? অথচ সরকারি ক্ষমতা কুক্ষিগত করে ও সংবাদ মাধ্যমের প্রচারের জোরে আজ আরএসএস নেতৃবৃন্দ নিজেদের দেশপ্রেমিক, স্বাধীনতার রক্ষক বলে জাহির করছেন৷ এ কথা আজ ক’জন জানে ব্রিটিশ ভারতে সিন্ধু, উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও অবিভক্ত বাংলায় মুসলিম লিগ ও হিন্দু মহাসভা মৈত্রিবদ্ধ হয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করেছিল৷ অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন ফজলুল হক এবং উপমুখ্যমন্ত্রী ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী৷ এই ঘটনাগুলি কেউ যদি পারেন ভুল প্রমাণ করুন৷ আমরা কিন্তু তথ্য দিয়ে প্রমাণ করতে পারি৷ গোলওয়ালকর এমনও বলেছেন, ‘‘হিন্দুস্থানের সমস্ত অহিন্দু মানুষ হিন্দু ভাষা এবং সংস্কৃতি গ্রহণ করবে৷ হিন্দু ধর্মকে শ্রদ্ধা করবে ও পবিত্র বলে জ্ঞান করবে৷ হিন্দু জাতির গৌরব গাথা ভিন্ন অন্য কোনও ধারণাকে প্রশ্রয় দেবে না৷ … না হলে সম্পূর্ণভাবে এই দেশে হিন্দু জাতির অধীনস্ত হয়ে কোনও দাবি ছাড়া, কোনও সুবিধা ছাড়া, কোনও রকম পক্ষপাতমূলক ব্যবহার ছাড়া, এমনকি নাগরিকত্বের অধিকার ছাড়া তাদের এ দেশে থাকতে হবে৷’’(৭) কী ভয়ঙ্কর সাম্প্রদায়িক উক্তি আজ সরাসরি এই কথা মুখে না বললেও আরএসএস–বিজেপি নেতা ও কর্মীদের নানা মন্তব্যে ও ক্রিয়াকলাপে এই মনোভাবই প্রকাশ পাচ্ছে৷ এই মনোভাবের তীব্র বিরোধিতা করে নেতাজি সুভাষচন্দ্র ১৯৪০ সালে এক সভায় বলেছিলেন, ‘‘…ধর্মের সুযোগ নিয়া ধর্মকে কলুষিত করিয়া হিন্দু মহাসভা রাজনীতির ক্ষেত্রে দেখা দিয়াছে৷ হিন্দু মাত্রেরই তাহার নিন্দা করা কর্তব্য৷’’(৮) আরেকটি বক্তৃতায় তিনি বলছেন, ‘‘… হিন্দুরা ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায় বলিয়া হিন্দুরাজের ধ্বনি শোনা যায়৷ এগুলি সর্বৈব অলস চিন্তা৷’’(৯) তিনি আরও বলেছেন, ‘‘একশ্রেণির স্বার্থান্বেষী লোক ক্ষুদ্র ব্যক্তিগত স্বার্থলোভে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে (হিন্দু ও মুসলিম) কলহ ও মনোমালিন্য সৃষ্টি করিয়া বেড়াইতেছে– স্বাধীনতা সংগ্রামে এই শ্রেণির লোককেও শত্রু গণ্য করা প্রয়োজন৷’’(১০) নেতাজি ধর্মবর্জিত রাজনীতি অর্থাৎ যথার্থ সেকুলার দৃষ্টিভঙ্গির আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, ‘‘ধর্মকে সম্পূর্ণরূপে রাজনীতি হইতে বাদ দেওয়া উচিত৷ … ব্যক্তি হিসাবে মানুষ যে ধর্ম পছন্দ করে, তা অনুসরণ করার পূর্ণ স্বাধীনতা থাকিবে৷ কিন্তু ধর্ম কিংবা অতীন্দ্রিয় বিষয়ের দ্বারা রাজনীতি পরিচালিত হওয়া উচিত নহে৷ ইহা পরিচালিত হওয়া উচিত শুধু অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও বৈজ্ঞানিক বিচারবুদ্ধির দ্বারা৷’’(১১) রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘‘যে দেশ প্রধানত ধর্মের মিলেই মানুষকে মেলায়, অন্য কোনও বাঁধনে তাকে বাঁধতে পারে না, সে দেশ হতভাগ্য৷ সে ধর্ম স্বয়ং ধর্মকে দিয়ে যে বিভেদ সৃষ্টি করে সেটি সকলের চেয়ে সর্বনেশে বিভেদ৷’’(১২) শরৎচন্দ্র বলেছিলেন, ‘‘কেবল মহামানবতার আদর্শ গ্রহণ কর, তাকে ভারতের আদর্শ, এশিয়ার আদর্শ, হিন্দুর আদর্শ– এদিক দিয়ে কিছুতেই বিচার করব না, কারণ সেই তো ক্ষুদ্র মনের সঙ্কীর্ণ হীন আদর্শ, কোনমতেই সর্বজনীন মুক্ত আদর্শ নয়৷’’(১৩) তারপর দুঃখ করে আরও বলেছেন, ‘‘যাদের হওয়া উচিত ছিল সন্ন্যাসী, তারা হলেন পলিটিশিয়ান, তাই ভারত পলিটিক্সে এতবড় দুর্গত৷’’(১৪) যে ২১ বছরের যুবককে একদিন দেশবাসী সশ্রদ্ধচিত্তে ‘শহিদ–ঈ–আজম’ বলে ভূষিত করেছিল, সেই ভগৎ সিং ফাঁসির মঞ্চে আত্মাহুতি দেওয়ার পূর্বে লিখেছিলেন তাঁর অমূল্য রচনা ‘কেন আমি নাস্তিক’, যাতে দেশবাসী বিশেষত ছাত্রযুবকরা এই চিন্তায় অনুপ্রাণিত হয়৷ আজ কি দেশের জনগণ, পশ্চিমবঙ্গের জনগণ সুভাষচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, ভগৎ সিং সহ সেই যুগের আরও বড় মানুষদের এইসব মহান শিক্ষাকে বিসর্জন দিয়ে আরএসএস–বিজেপির ঝাণ্ডার তলায় সামিল হবে? 

যাঁরা সৎভাবে হিন্দুধর্মে বিশ্বাসী তাঁদের বিবেকানন্দের কয়েকটি উক্তি শোনাতে চাই৷ তিনি বলেছিলেন, ‘‘কোনও ধর্মই কখনও মানুষের উপর অত্যাচার করেনি, কোনও ধর্মই ডাইনি অপবাদে নারীকে পুড়িয়ে মারেনি, … তবে মানুষকে এইসব কাজে উত্তেজিত করল কীসে? রাজনীতিই মানুষকে এই এইসব অন্যায় কাজে প্ররোচিত করেছে, ধর্ম নয়৷’’(১৫) শিকাগোতে বক্তৃতায় তিনি আরও বলছেন, ‘‘সাম্প্রদায়িকতা, গোঁড়ামি ও এগুলোর ভয়ঙ্কর ফল ধর্মের উন্মত্ততা৷ … এরা পৃথিবীকে করেছে হিংসায় পূর্ণ৷ বারবার একেই ভিজিয়েছে মানুষের রক্তে৷’’(১৬) বিবেকানন্দের এই বক্তব্যের আলোকে একবার আরএসএস–বিজেপির বক্তব্য ও ক্রিয়াকলাপ বিচার করে দেখুন৷ তারা কি সত্যিই হিন্দুধর্ম অনুসরণ করছে? বিবেকানন্দ আরও বলেছেন, ‘‘আমরা মানবজাতিকে সেই স্থানেই নিয়ে যেতে চাই যেখানে বেদও নেই, বাইবেলও নেই, কোরানও নেই, অথচ সে কাজ করতে হবে বেদ–বাইবেল ও কোরানকে সমন্বয় করেই৷ … আমরা শুধু সব ধর্মকে সহ্যই করি না, সব ধর্মকে আমরা সত্য বলে বিশ্বাস করি৷ … আমার যদি একটা সন্তান থাকত, তাকে মনঃসংযোগের অভ্যাস এবং সেই সঙ্গে এক পংক্তির প্রার্থনা ছাড়া আর কোনও প্রকার ধর্মের কথা আমি শেখাতাম না৷ তারপর সে বড় হয়ে খ্রিস্ট, বুদ্ধ বা মহম্মদ যাকে ইচ্ছা উপাসনা করতে পারে৷ … সুতরাং এটা খুব স্বাভাবিক যে একই সঙ্গে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে এবং নির্বিরোধে আমার ছেলে বৌদ্ধ, আমার স্ত্রী খ্রীষ্টান এবং আমি মুসলমান হতে পারি৷’’(১৭) এই বিবেকানন্দকে আরএসএস–বিজেপি নেতৃবৃন্দ হিন্দু বলে স্বীকার করবেন, না বিধর্মী আখ্যা দেবেন? বিবেকানন্দের গুরু রামকৃষ্ণ তো মসজিদে নামাজ পর্যন্ত পড়েছিলেন৷ গীর্জায় প্রার্থনাও করেছেন এবং খুব সহজ ভাষায় বলেছেন, ‘‘যাকে কৃষ্ণ বলছ, তাকেই শিব, তাকেই আদ্যাশক্তি বলা হয়, তাকেই যীশু, তাকেই আল্লা বলা হয়৷ … বস্তু এক, নাম আলাদা৷ … একটা পুকুরে অনেকগুলি ঘাট আছে৷ হিন্দুরা একঘাট থেকে জল নিচ্ছে কলসি ভরে, বলছে জল৷ মুসলমানেরা আর এক ঘাটে জল নিচ্ছে চামড়ার ঢোলে, বলছে পানি৷ খ্রিস্টানরা আর এক ঘাটে জল নিচ্ছে, তারা ওয়াটার বলছে৷’’(১৮) অর্থাৎ ভগবান, গড, আল্লা একই৷ এই রামকৃষ্ণকে আরএসএস–বিজেপি নেতৃবৃন্দ কী বলবেন? বলবেন, তিনি হিন্দুধর্ম বিরোধী কথা ও আচরণ করেছেন?

তারা রামচন্দ্রের জন্মস্থান দাবি করে, তালিবানরা যেমন আফগানিস্তানে বৌদ্ধধর্মের প্রাচীন মূর্তি ধ্বংস করেছে, তেমনি অযোধ্যায় ঐতিহাসিক সৌধ বাবরি মসজিদ ধূলিসাৎ করেছে৷ এই প্রসঙ্গে পুনরায় বলতে চাই, চৈতন্য, রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ– যাঁরা হিন্দুধর্মের প্রবক্তা বলে খ্যাত এবং হিন্দুদের কাছে পূজিত, তারা কোনদিন এই দাবি তোলেননি কেন? তাঁরা কি কাপুরুষ ছিলেন? কথিত আছে বাল্মীকি রাম জন্মের বহু পূর্বে রামায়ণ রচনা করেছিলেন, বাবরি মসজিদ থাকাকালীন তুলসীদাস রামায়ণ লিখেছিলেন৷ এই দুই রামায়ণের কোথাও তো এ কথার উল্লেখ নেই যে রামের জন্মস্থানে বাবরি মসজিদ নির্মিত হয়েছে এবার এ প্রসঙ্গে বিবেকানন্দের বক্তব্য শুনুন৷ তিনি বলছেন, ‘‘রামায়ণের কথাই ধরুন– অলঙঘনীয় প্রামাণ্য গ্রন্থরূপে উহাকে মানিতে হইলেই যে, রামের ন্যায় কেহ কখনও যথার্থ ছিলেন, স্বীকার করিতে হইবে , তাহা নহে৷ … কোনও পুরাণে বর্ণিত দার্শনিক সত্য কত দূর প্রামাণ্য তাহার বিচার করিতে হইলে ঐ পুরাণে বর্ণিত ব্যক্তিগণ বাস্তবিকই ছিলেন অথবা তাঁহারা কাল্পনিক চরিত্রমাত্র– এ বিচারের কিছুমাত্র আবশ্যকতা নেই৷’’(১৯) এতে পরিষ্কার বিবেকানন্দ রামের বাস্তব অস্তিত্বের স্বীকৃতি দেননি, খুঁজতেও নিষেধ করেছিলেন, শুধু রামায়ণ থেকে শিক্ষা নিতে বলেছেন৷ আজও যারা সততার সাথে হিন্দুধর্মে বিশ্বাসী তারা কি মনে করতে পারেন, আরএসএস–বিজেপি যথার্থই হিন্দুধর্মের পথে চলছে, রামকৃষ্ণ–বিবেকানন্দ নির্ধারিত শিক্ষা অনুসরণ করছে? নাকি তারা হীন রাজনৈতিক স্বার্থে হিন্দু ধর্মকে ব্যবহার করছে৷ একই কথা এদেশের ও বিদেশের মুসলিম মৌলবাদীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য৷ তারা হজরত মহম্মদের শিক্ষা অনুসরণ করছে না, ক্ষমতা লিপ্সা ও হীন রাজনৈতিক স্বার্থে ইসলাম ধর্মকে ব্যবহার করছে৷

এটা উদ্বেগের বিষয় যে অবিভক্ত বাংলায় ও পরবর্তীকালে পশ্চিমবঙ্গে আরএসএস, হিন্দু মহাসভা, এবং ডঃ শ্যামাপ্রসাদের মতো ব্যক্তিত্ব স্থান করতে পারেনি, আজ পশ্চিমবঙ্গেই তৃণমূলবিরোধী মানসিকতাকে হাতিয়ার করে বিজেপি মাথা তুলছে৷ আপনাদের ভাবতে হবে, তখন ওরা পারেনি, আর আজ পারছে কী করে? এটা বুঝতে হলে অতীতের বিস্মৃতপ্রায় এক অধ্যায়কে স্মরণ করাতে হবে যার সাথে পরিচিত কিছু মুষ্টিমেয় অশীতিপর বৃদ্ধ এখনও বেঁচে আছেন, বাকিরা মৃত এবং পরবর্তী জেনারেশন কিছুই জানে না৷ বাঙালির কোনও বিশেষ বৈশিষ্ট্যের জন্য নয়, যেহেতু ব্রিটিশ শাসনের প্রথম যুগে কলকাতা রাজধানী ছিল এবং এখানেই প্রথম ইংরেজি শিক্ষার মাধ্যমে পশ্চিমের সভ্যতার আলো পৌঁছে ছিল৷ তার ফলে এখানে প্রথম আধুনিক জ্ঞান–বিজ্ঞান–সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছিল, ভারতীয় নবজাগরণ ও বিপ্লববাদের সূচনা হয়েছিল৷ যা দেখে মুগ্ধচিত্তে গোখলে বলেছিলেন, ‘হোয়াট বেঙ্গল থিঙ্কস টুডে, ইন্ডিয়া থিঙ্কস টুমরো’৷ এখানেই সশস্ত্র বিপ্লববাদ ও নেতাজিকে কেন্দ্র করে বামপন্থার ঘাঁটি গড়ে উঠেছিল৷ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে স্ট্যালিনের নেতৃত্বে ফ্যাসিবাদের পরাজয়, সমাজতন্ত্রের বিপুল অগ্রগতি, চীনে কমিউনিস্ট বিপ্লবের সাফল্যে এই দেশে বিশেষত পশ্চিমবাংলায় মার্কসবাদ–কমিউনিজ্ প্রতি শিক্ষিত মহলে আকর্ষণ গড়ে ওঠে৷ তার ফলেই এখানকার জনগণ বিশেষত শিক্ষিত সমাজ–ছাত্র–যুব সম্প্রদায় চরম প্রতিক্রিয়াশীল আরএসএস ও পরবর্তীকালে জনসংঘের ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক মানসিকতাকে গ্রহণ করেনি৷ আপনাদের স্মরণে রাখা দরকার,  জনগণের এই বামপন্থী মানসিকতাকে কাজে লাগিয়েই পশ্চিমবঙ্গে প্রথমে সিপিআই ও পরে সিপিএম শক্তিশালী বামপন্থী দল হিসাবে দাঁড়িয়েছিল৷ ১৯৫২ সালে প্রথম নির্বাচনেই কলকাতার বেশিরভাগ লোকসভা ও বিধানসভার আসনে সিপিআই জয়লাভ করেছিল৷ ১৯৫২ সালে ট্রামভাড়া বৃদ্ধিবিরোধী আন্দোলন, ১৯৫৪ সালে শিক্ষক আন্দোলন, ১৯৫৩ সালে বঙ্গ–বিহার সংযুক্তি বিরোধী আন্দোলন, ১৯৫৯ সালে খাদ্য আন্দোলন, পুনরায় ১৯৬৬ সালে খাদ্য আন্দোলন সংগ্রামী বামপন্থী ধারায় পরিচালিত হয়েছিল৷ সিপিএম ও সিপিআই যথার্থ মার্কসবাদী দল না হলেও এইসময়ে সংগ্রামী বামপন্থার চর্চা করত৷ আমাদের দল আজকের তুলনায় সেদিন ছোট হওয়া সত্ত্বেও এই যুক্ত আন্দোলনগুলিতে আমাদের দলের বিপ্লবী লাইন ও ওদের সংস্কারবাদী ভোটমুখী লাইনের দ্বন্দ্ব ছিল৷ এই সময়ে কংগ্রেস সরকারের দমনপীড়নে এই আন্দোলনগুলিতে বহু ছাত্রযুবক শহিদ হন, আহত হন, শত শত কারারুদ্ধ হন৷ সেইসময়েই আতঙ্কিত ভারতীয় পুঁজিবাদ ও কংগ্রেস নেতা পণ্ডিত জহরলাল নেহেরু কলকাতাকে ‘দুঃস্বপ্নের নগরী’ ‘মিছিল নগরী’ আখ্যা দিয়েছিলেন৷ যেমন একইভাবে অতীতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ঐক্যবদ্ধ বাংলাকে, কলকাতাকে ভয়ের চোখে দেখত৷ এই সংগ্রামী বামপন্থী আন্দোলনগুলিকে হাতিয়ার করেই প্রথমে ঐক্যবদ্ধ সিপিআই ও পরে সিপিএম প্রভাব বাড়ায়৷ কিন্তু তারা নেতা–কর্মী–সমর্থক ও জনগণের মধ্যে মার্কসবাদের আদর্শগত চর্চা তো দূরের কথা, বামপন্থী রাজনীতি ও সংস্কৃতির চর্চাও করেনি, ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা, জাতপাত, প্রাদেশিকতার বিরুদ্ধে কোনও সামাজিক–সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলেনি৷ ফলে মার্কসবাদ ও বামপন্থার প্রতি অন্ধ আবেগ ও স্লোগানসর্বস্বতার ভিত্তিতে বামপন্থী মানসিকতা গড়ে উঠেছিল এবং দলের অধিকাংশ নেতা–কর্মী–সমর্থক ও প্রভাবিত জনগণের মধ্যে হিন্দু মুসলিম সেন্টিমেন্ট সুপ্তভাবে ছিল, নানা ধর্মীয় ও অন্যান্য কুসংস্কারের প্রভাবও ছিল৷ এইসব সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ বামপন্থার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল৷ শক্তিশালী গণআন্দোলনগুলির প্রভাবে এবং প্রবল কংগ্রেসবিরোধী মানসিকতা থেকে ১৯৬৭ সালে বিধানসভা ভোটে কংগ্রেস পরাস্ত হয়েছিল এবং আমাদের দল এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট) সহ সিপিএম, সিপিআই, অন্যান্য বামপন্থী দল ও বাংলা কংগ্রেস সহ আরও কিছু দল নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠিত হয়৷ একথা আজ অনেকেই জানে না যে সেইসময়ে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠনের প্রাক্কালে কর্মসূচি রচনায় আমাদের দলের সাথে সিপিএম সহ অন্যান্য দলের গুরুতর মতপার্থক্য দেখা দেয়৷ লেনিনের সময় মার্কসবাদীদের সরকার গঠনের সুযোগ আসেনি, ফলে তিনি একটি বুর্জোয়া রাষ্ট্রে মার্কসবাদীরা পার্লামেন্টে বিরোধী দল হিসাবে কী ভূমিকা পালন করবে, সেই সম্পর্কে গাইডলাইন দিয়েছিলেন৷ ফলে পশ্চিমবঙ্গে মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী সরকার পরিচালনায় কমরেড শিবদাস ঘোষ একটি ঐতিহাসিক গাইডলাইন উপস্থিত করেছিলেন৷ আমাদের দলের প্রস্তাব ছিল, যুক্তফ্রন্ট সরকার শ্রমিক–গরিব কৃষকের শ্রেণিসংগ্রামকে এবং গণআন্দোলনকে উৎসাহিত করবে এবং ন্যায়সঙ্গত গণআন্দোলনে পূর্বের সরকারগুলির মতো পুলিশি আক্রমণ করবে না৷ এই প্রস্তাব কিছুতেই সিপিএম সহ অন্য দলগুলি মানতে চাইছিল না৷ তখন আমাদের দল বলে, এই প্রস্তাব না মানলে আমরা সরকারে যোগ দেব না, বাইরে থেকে সমর্থন করব৷ তখন সিপিএম কর্মী সহ জনগণের যে সংগ্রামী মানসিকতা ছিল তাতে আমাদের সরকারে যোগদান না করার কারণ জানাজানি হলে তারা প্রশ্নবিদ্ধ হবেন, এই কারণে সিপিএম নেতৃবৃন্দ ও অন্যান্যরা শেষপর্যন্ত আমাদের প্রস্তাব মেনে নিলেন এই ভরসায় যে এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট) ছোট দল, ফলে বিশেষ কিছু করতে পারবে না৷ কিন্তু আমাদের দলের তৎকালীন কেন্দ্রীয় কমিটির বিশিষ্ট নেতা কমরেড সুবোধ ব্যানার্জী যুক্তফ্রন্ট সরকারের শ্রমমন্ত্রী হয়ে প্রকাশ্যে ঘোষণা করলেন যে, যুক্তফ্রন্ট সরকারের নীতি হল ন্যায়সঙ্গত গণআন্দোলনে পুলিশি আক্রমণ হবে না৷ এতে উদ্দীপিত হয়ে সমগ্র পশ্চিমবঙ্গে শ্রমিক–কৃষক ও অন্যান্য জনগণের সংগ্রাম ও গণআন্দোলনের জোয়ার শুরু হল৷ দিকে দিকে স্লোগান উঠল, যুক্তফ্রন্ট সরকার সংগ্রামের হাতিয়ার৷ পুঁজিপতিরা ও প্রতিক্রিয়াশীলরা আতঙ্কিত হল৷ অন্য রাজ্যেও এর প্রভাব পড়ছিল৷ এই পুঁজিপতিদের পরামর্শেই ১৯৬৯ সালে দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠনের সময় পূর্বতন সরকারের জনপ্রিয় মন্ত্রী কমরেড সুবোধ ব্যানার্জীকে শ্রমদপ্তর থেকে সরিয়ে সিপিএম সহ অন্যরা পূর্তদপ্তর দিল৷ অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমাদের দল ঘোষিত নীতি কার্যকরী করার স্বার্থে এই মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করে৷ এই প্রসঙ্গে আপনাদের স্মরণ করাতে চাই, ১৯৭৭ সালে সরকার গঠনের প্রাক্কালে সিপিএম নেতা জ্যোতি বসু তাঁর দ্বিতীয় বেতার ভাষণে বলেছিলেন, ‘তাঁদের পরিচালিত সরকারে কোনও অশান্তি অরাজকতা হবে না, কারণ এই সরকারে এস ইউ সি–কে বাদ দেওয়া হয়েছে’৷ এই বক্তব্যের দ্বারা শিল্পপতি ও প্রতিক্রিয়াশীলদের আশ্বস্ত করা হল৷ কারণ ওদের দৃষ্টিতে আন্দোলন, লড়াই হচ্ছে অশান্তি, অরাজকতা৷ সে যাই হোক, প্রথম ও দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকার চলাকালীন বৃহৎ দল হিসাবে সিপিএম আগে যতটুকু বামপন্থী রাজনীতির চর্চা করত ও গণআন্দোলনে ভূমিকা নিত, সেই পথ পরিত্যাগ করে একদিকে পুঁজিপতিদের আস্থা অর্জন ও অন্যদিকে পুলিশ–প্রশাসনকে ব্যবহার করে যুক্তফ্রন্টের শরিক দলগুলির উপর হামলা চালিয়ে তাদের প্রভাবাধীন এলাকা দখল, আন্দোলনের পরিবর্তে সুযোগসুবিধা পাইয়ে দেওয়ার সুবিধাবাদী রাজনীতি চালু করে জনসমর্থন সৃষ্টি ও বেকার যুবকদের দলে টানা, বৃহৎ দলের আধিপত্যবাদ, অন্য দলের কণ্ঠরোধ, নানা দুর্নীতির প্রশ্রয়দান এসব করতে থাকে এবং এভাবে প্রভাববৃদ্ধি করে যুক্তফ্রন্ট সরকারের পরিবর্তে শ্রেণিভিত্তিক ফ্রন্টের স্লোগান তুলে নিজস্ব দলীয় সরকার কায়েম করার অপচেষ্টা চালায়৷ এইসময় সিপিএম নেতৃত্ব একদিকে যেমন অন্যান্য বামপন্থী দলগুলির উপর হামলা চালাচ্ছিল, অন্যদিকে নকশাল আন্দোলনের কর্মীদের উপরও আক্রমণ চালায়৷ এইভাবে পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থী আন্দোলনে খুনোখুনির রাজনীতি চলতে থাকে৷ যে পশ্চিমবঙ্গের জনগণ কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বামপন্থার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল, তাদের মধ্যে বামপন্থী রাজনীতি সম্পর্কে ব্যাপক হতাশা ও আস্থাহীনতা গড়ে উঠতে থাকে৷ বামপন্থার মর্যাদা নষ্ট হতে থাকে৷ এইসময়েই অর্থাৎ ১৯৬৮ সালে কমরেড শিবদাস ঘোষ যে ওয়ার্নিং দিয়েছিলেন, তা আজকের দিনে আপনাদের স্মরণ করানো খুবই প্রাসঙ্গিক৷ তিনি বলেছিলেন, ‘‘… এই পরিস্থিতিতে জনসংঘের মতো ধর্মীয় রাষ্ট্রীয়বাদীরা ওঁত পেতে বসে আছে৷ তারা সুযোগের অপেক্ষা করছে৷ বামপন্থী আন্দোলনের প্রতি মানুষের যে আকর্ষণ আজও রয়েছে তা নষ্ট হয়ে গেলেই তারা আত্মপ্রকাশ করবে৷ এ কথাটা ক্ষমতাসীন সিপিএম নেতারা বুঝছেন না৷ … এইভাবে কমিউনিজমের সুনামকে নষ্ট করে দিয়ে তাকে কালিমালিপ্ত করছেন৷’’ আজকের দিনে এই ওয়ার্নিংয়ের তাৎপর্য কত গভীর আশা করি আপনারা সকলেই এবং সিপিএমের সৎ কর্মী ও সমর্থকেরা বুঝবেন৷

পরবর্তীকালে ১৯৭২ সালে ব্যাপক রিগিংএর মাধ্যমে কংগ্রেসের সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের নেতৃত্বে যে সরকার গঠন হয়, সেই সরকার ক্ষমতায় বসেই আমাদের দল এবং সিপিএম ও নকশালদের উপর ব্যাপক হামলা চালায়, অনেকে খুন হয়৷ অতি দ্রুত এই সরকার আনপপুলার হয়৷ ইতিমধ্যে সমগ্র দেশে ও পশ্চিমবাংলায় কংগ্রেস খুবই আনপপুলার হয় এবং পশ্চিমবঙ্গের জনগণ পুনরায় বামপন্থার দিকে ঝুঁকে যায় এবং বড় দল হিসাবে সিপিএম সেই সুবিধা পায়৷ ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে সিপিএম–এর ফ্রন্ট জনতা পার্টির সমর্থনে বিপুল ভোটে পশ্চিমবঙ্গে সরকারি ক্ষমতা দখল করে এবং একটানা ৩৪ বছর শাসন করে৷ এই শাসনকালে পুলিশ–প্রশাসনকে সম্পূর্ণ দলের কুক্ষিগত করে প্রোটেকশন দিয়ে অ্যান্টিসোশালদের সন্ত্রাস সৃষ্টির কাজে লাগায়৷ স্কুলের দারোয়ান থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর নিয়োগ পর্যন্ত সমস্তপদে নিয়োগ, সরকারি দপ্তরে প্রোমোশন, ট্রান্সফার সবকিছুই দলীয় স্বার্থে ও দলের নির্দেশে চালায়৷ কোনও আদর্শ নীতি দিয়ে নয়, প্রোমোটারি, কন্ট্র্যাক্টরি, সিন্ডিকেট, তোলাবাজি, কাটমানি নেওয়ার সুযোগ ইত্যাদি দিয়ে দলে দলে যুবকদের দলভুক্ত করায়৷ ভোটে বারবার ব্যাপক রিগিং ও সন্ত্রাস সৃষ্টি করে প্রায় সব পঞ্চায়েত–মিউনিসিপ্যা দখল নেয়, এগুলি ব্যাপক দুর্নীতি ও দলবাজির আখড়াতে পরিণত হয়৷ শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালনার সর্বস্তরে দলীয় কর্তৃত্ব স্থাপন করে৷ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচনে দলীয় ছাত্র সংগঠন এসএফআই বিরোধীদের ওপর হামলা চালিয়ে, বিরোধীদের কনটেস্ট করতে না দিয়ে একতরফা সব ইউনিয়নই দখল করে নেয়৷ সর্বত্রই হামলা, সন্ত্রাস, গায়ের জোর, উৎখাত করে দেওয়া, খুনজখম– এসবই চলতে থাকে দলীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য৷ অন্য দিকে বৃহৎ পুঁজিপতি–বড় ব্যবসাদার, জোতদারদের স্বার্থে শ্রমিক আন্দোলন, কৃষক আন্দোলন দমনে গুলি চালিয়ে শ্রমিক–কৃষক হত্যা করে৷ আমাদের দল প্রাইমারিতে ইংরেজি শিক্ষার পুনঃপ্রবর্তন সহ পাশ–ফেল চালু, বর্ধিত ভাড়া প্রত্যাহার সহ শ্রমিক–কৃষকের ও মধ্যবিত্ত জনগণের নানা দাবিতে বহু আন্দোলন গড়ে তোলে৷ সিপিএম নৃশংসভাবে লাঠিগুলি চালায়, আমাদের দলের ১৭১ জন নেতাকর্মীকে খুন করায়৷ মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে ৫১ জন নেতাকর্মীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড করায়৷ সিঙ্গুর–নন্দীগ্রাম আন্দোলন দমনে ভয়াবহ অত্যাচার চালায়৷ নন্দীগ্রামে পুলিশ ও অ্যান্টিসোশালদের দিয়ে নৃশংসভাবে গণধর্ষণ ও গণহত্যা করায়৷ হীন দলীয় স্বার্থে এইসব কার্যকলাপ করে তারা মহান কমিউনিজম ও বামপন্থাকে জনমানসে কলঙ্কিত করে৷ পশ্চিমবঙ্গের জনগণ সিপিএমের প্রতি ক্ষিপ্ত হয়৷ এরই সুযোগ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেসের অভ্যন্তরে ক্ষমতার দ্বন্দ্বের পরিণতিতে বেরিয়ে আসা তৃণমূল মাথা তোলে এবং বুর্জোয়াশ্রেণি ও সংবাদমাধ্যম সিপিএমের বিকল্প হিসাবে তৃণমূলের পক্ষে ব্যাপক প্রচার চালায়৷ সিপিএমের অপশাসনে ক্ষিপ্ত মানুষ পরিবর্তন চাইছিল৷ আর পরিবর্তনের আওয়াজ তুলে তৃণমূল বিপুল ভোটে জয়যুক্ত হল৷

কিন্তু তৃণমূল শাসনে কী পরিবর্তন এল? নিছক সিপিএম দলের পরিবর্তে তৃণমূল দলের সরকার– এছাড়া আর কোনও পরিবর্তন হয়েছে কি? সিপিএম শাসনকালে যেসব অপকর্ম ঘটেছিল– পুলিশ প্রশাসন থেকে সর্বত্র দলীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা, ভোটে সর্বত্র রিগিং–সন্ত্রাস–জবর্ কনটেস্ট করতে না দেওয়া, অ্যান্টিসোশালদের ব্যবহার, তোলাবাজি, সিন্ডিকেট রাজত্ব, কাটমানি নেওয়া, ঘুষ নেওয়া, সর্বস্তরে দুর্নীতি, বিরোধীদের ওপর আক্রমণ, গণআন্দোলন দমন ইত্যাদি সবই এই আমলেও ঘটছে সিপিএম রাজত্বের কার্বন কপি হিসাবে৷ পার্থক্য হচ্ছে, সিপিএম দলের বাঁধন ছিল, ফলে সবই ঘটত গুছিয়ে, বিভিন্ন স্তরের নেতাদের নিয়ন্ত্রণে, কিছুটা সূক্ষ্মভাবে৷ আর তৃণমূল শাসনে ঘটছে এলোমেলো, খোলামেলা, নগ্নভাবে, বিশৃঙ্খলভাবে৷ কারণ এখানে সবাই রাজা৷ এই তৃণমূল শাসন পর্বেই সারদা কেলেঙ্কারি, রোজভ্যালি কেলেঙ্কারি, যাতে লক্ষ লক্ষ মানুষ সর্বস্বান্ত হয়েছে৷ যদিও এর সূচনা সিপিএম শাসনকালেই ঘটেছে৷ এইসব কেলেঙ্কারিতে ও নারদা কাণ্ডে বেশ কিছু তৃণমূল নেতার নাম যুক্ত হয়ে গেছে৷ এছাড়া সরকারি আয় বাড়াবার অজুহাতে সিপিএম সরকারের সময়ের দ্বিগুণ মদের দোকান চালু করেছে৷ পথেঘাটে, মদ্যপদের অত্যাচার আরও বাড়ছে৷ যে সরকার কন্যাশ্রী বিতরণ করছে, সেই সরকার এ রাজ্য যে নারীধর্ষণ নারী পাচারের ঘাঁটি হয়ে গেছে এ নিয়ে কোনও উচ্চবাচ্য করছে না৷ সম্প্রতি লোকসভা ভোটে অপ্রত্যাশিত ধাক্কা খেয়ে তৃণমূল নেতৃত্ব হঠাৎ যেন ঘুম থেকে উঠে জানলেন ব্যাপক কাটমানির কারবার চালাচ্ছে তৃণমূলের লোকজন৷ এর বিরুদ্ধে হুঙ্কার দিলেন৷ কিন্তু এতে কাজ হবে কি? আবার এই সরকার কিছু কি নতুন কাজ করেনি? অবশ্যই করেছে৷ যেমন ভোটব্যাঙ্ক তৈরির স্বার্থে কন্যাশ্রী, যুবশ্রী, সাইকেল দান, শত শত ক্লাব পুজো কমিটিকে, নানা নাট্য, যাত্রা সংস্থাকে কয়েক কোটি টাকা অনুদান, ঘটা করে পূজা–অনুষ্ঠান, মন্দির সংস্কার, অন্য দিকে ইমাম ও মোয়াজ্জেম ভাতা চালু, হিজাব পরে নামাজে যোগদান ইত্যাদি চলছে৷ এরপর শ্মশানের পুরোহিতদের ভাতাও চালু করেছে৷ বাইরের থেকে প্রচুর টাকা দিয়ে এক্সপার্ট পরামর্শদাতা আনা হয়েছে যাতে যেভাবেই হোক আগামী নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া যায়৷ অনেকটা তার পরামর্শেই তৃণমূল দল ও সরকার চলছে৷ ‘দিদিকে বলো’ বলে একটা হেল্প লাইনও চালু হয়েছে৷ কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হবে কি না, তা ভবিষ্যতই বলবে৷

তৃণমূলের শাসনের এই দুর্নীতি, অত্যাচার, জুলুমে ক্ষিপ্ত হয়ে তৃণমূলকে শিক্ষা দেবে এই মন নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বেশ কিছু মানুষ আরএসএস–বিজেপির খাতায় নাম লেখাচ্ছে৷ এর মধ্যে তৃণমূল–কংগ্রেস–সিপিএমের ছোট–বড়–মাঝারি কিছু স্থানীয়, জেলা ও রাজ্যস্তরের নেতাও আছে৷ অন্যান্য রাজ্যের মতো এ রাজ্যের বিজেপি অঢেল টাকা চাকরি ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধার প্রলোভন দিয়ে বেকার যুবকদের দলে ভিড় করাচ্ছে৷ হাওয়া বুঝে সিবিআই–ইডির তালিকাভূক্ত দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত তৃণমূলের একদল নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং তৃণমূল আশ্রিত দুষৃক্তীদের একাংশ এখন বিজেপিতে যোগ দিয়েছে৷ অনেকে যোগ দেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে আছে৷ এসবের মধ্য দিয়ে আরএসএস–বিজেপির কলেবরের শ্রীবৃদ্ধি হচ্ছে৷ নেতারাও খুব উল্লসিত৷ তারা আরও উল্লসিত বিগত লোকসভা নির্বাচনে অভাবিত ভোট পেয়ে৷ পরবর্তী বিধানসভা ভোটে পশ্চিমবঙ্গ জয়ের জন্য নানা মহড়া দিচ্ছে৷

বামপন্থার দুর্বলতাই বিজেপির শক্তিবৃদ্ধিতে সাহায্য করেছে

বিজেপি যে হঠাৎ এক লাফে এত ভোট ও সিট পেয়ে গেল, সেটা কি এমনি এমনি ঘটেছে? সেটা কি শুধু টাকার জোরে ও কেন্দ্রীয় সরকারি ক্ষমতার বলে পেয়েছে? কম্পিটিশনে কম হলেও তৃণমূলও তো টাকা ঢেলেছে৷ তাহলে এটা সম্ভব হল কী করে? তার উত্তর কমরেড শিবদাস ঘোষের যে হুঁশিয়ারি আগেই উল্লেখ করেছি তার মধ্যেই আছে৷ কংগ্রেসের পর সিপিএমের দীর্ঘ শাসন পশ্চিমবঙ্গের রেনেসাঁসের ঐতিহ্য, স্বদেশি আন্দোলনের বিপ্লববাদের ঐতিহ্য ধ্বংস করেছে, সর্বোপরি কমিউনিজম ও বামপন্থার মর্যাদাকে মসীলিপ্ত করেছে৷ অন্য রাজ্যে যেখানে কংগ্রেসের পরিবর্তে বিজেপিকে ভোট দেয়, বিজেপির পরিবর্তে কংগ্রেসকে ভোট দেয় বা অন্যান্য আঞ্চলিক দলগুলিকে এভাবে পাল্টাপাল্টি করে, কিন্তু এ রাজ্যে সিপিএম আজও এত আনপপুলার হয়ে আছে যে ২০১১ সালে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরও সিপিএম কর্মী–সমর্থকেরা শক্তিতে, সংগঠনের বিস্তারে, ভোটের হিসাবে প্রধান বিরোধী দল থাকা সত্ত্বেও তৃণমূলের বিকল্প হিসাবে আজও পশ্চিমবঙ্গের জনগণ সিপিএমকে গ্রহণ করল না, করল আরএসএস–বিজেপিকে৷ শুধু কি তাই? সিপিএমের ২৮ শতাংশ ভোট ৭ শতাংশে নেমে গেল৷ নিচুতলায় সিপিএমের হিন্দু ও মুসলিম কর্মী–সমর্থক এমনকী স্থানীয় নেতারা অনেকেই পোলারাইজেশনের হাওয়ায় একদল বিজেপিকে, আরেক দল তৃণমূলকে সমর্থন করল৷ এমনকী গ্রামে শহরে পাড়ায় পাড়ায় সাধারণ মানুষই প্রত্যক্ষ করেছে সিপিএমের অনেকেই এই যুক্তিতে বিজেপিকে সমর্থন করছে যে এখন রাম আসুক, পরে বাম আসবে৷ অর্থাৎ এখন তৃণমূলকে হারিয়ে বিজেপিকে জেতাব, পরে বিজেপি যেন সিপিএমকে জায়গা করে দেবে৷ এমন পর্যন্ত ঘটেছে কিছু কিছু কেন্দ্রে সিপিএম দলের পোলিং এজেন্ট পর্যন্ত সিপিএম প্রার্থীকে ভোট দেয়নি৷ এর জন্য নেতারা আত্মসমীক্ষা না করে নিচুতলার কর্মীদের দায়ী করে দায় এড়াতে পারবেন? এর জন্য নেতৃত্ব ও দলের নীতি দায়ী নয়? তারা পশ্চিমবঙ্গে বহু রক্ত ও আত্মদানের বিনিময়ে গড়ে ওঠা বামপন্থার গৌরবকে বড় দল হিসাবে আত্মসাৎ করে দীর্ঘদিন সরকারি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে শ্রেণি সংগ্রাম ও গণআন্দোলন ধ্বংস করেনি? বামপন্থার মর্যাদাকে ধূলিসাৎ করেনি? কর্মীদের বামপন্থী রাজনীতি ও সংস্কৃতিবর্জিত সুবিধাবাদের পঙ্কে নিমজ্জিত করেনি? উন্নত নৈতিকতার চর্চার মানসিকতা ধ্বংস করে সমাজবিরোধীদের আস্কারা দিয়ে যুব সমাজের নৈতিক অধঃপতন ঘটায়নি? আদর্শ–চরিত্র–সংগ্রাম নয়, সরকারি ক্ষমতাই শক্তির উৎস– কর্মী সমর্থকদের মধ্যে এই মানসিকতা গড়ে তোলেনি? আমাদের এই অভিযোগ যদি ভুল হয়, সিপিএম নেতৃত্ব সঠিক উত্তর দিলে আমরা মেনে নেব৷ কোনও বিদ্বেষ থেকে এসব বলছি না৷ বলছি অতি উদ্বেগে, কারণ এই রাজ্যের যে বামপন্থী ধারাকে ব্রিটিশ সরকার ও পরে কংগ্রেস সরকার অনেক গুলি–গোলা চালিয়েও ধ্বংস করতে পারেনি, সিপিএম সরকারি ক্ষমতায় বসে তাই করে গেল৷ তারা যদি বামপন্থী ধারায় সরকার চালাতেন, তাহলে ৩৪ বছর সরকার চালনায় তাদের শক্তি তো আরও বাড়ত– উল্টো হল কী করে? সিপিএমের সৎ কর্মী–সমর্থকেরা আমাদের এই সমালোচনা শান্ত মনে বিচার করে দেখবেন৷ কারণ আপনারা তো একদিন কমিউনিজমের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে এই দলে যোগ দিয়েছিলেন৷ আপনাদের পূর্বে অতীতে এই দলের ঝাণ্ডা হাতে নিয়ে অনেকে শহিদও হয়েছেন, নির্যাতিত–ত্যাচারিত হয়েছেন৷ কিন্তু আজ এই পরিণতি হল কী করে? আপনারা ‘মার্কসবাদ জিন্দাবাদ’ স্লোগান শুনে, দলের লোকবল দেখে যোগ দিয়েছিলেন৷ খুঁটিয়ে দেখেননি দলটির বিচারপদ্ধতি, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, কর্মসূচি, রণনীতি–রণকৌশল, আচার–আচরণ–সংস্কৃতি, নেতাদের জীবনযাত্রা মার্কসবাদ সম্মত কি না৷

রাজ্যে তৃণমূলের বদলে বিজেপি এলে কি সুশাসন দেবে?

পশ্চিমবঙ্গের জনগণের যে অংশ দুর্নীতি বন্ধ, জোরজুলুম–অত্যাচার নিবারণ, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ইত্যাদির জন্য বিজেপিকে ক্ষমতায় আনতে চাইছেন, তারা কি লক্ষ করেছেন বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে ও কেন্দ্রে কীভাবে সরকার চলছে? বিজেপি সরকারে থাকাকালীন কীভাবে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে নীরব মোদি, মেহুল চোকসি ও বিজয় মালিয়ারা বিদেশে পালাতে পারল? চরম দুর্নীতিগ্রস্ত এই নীরব মোদি ও মেহুল চোকসির সাথে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর ছবি ও বৈঠক কেন দেখা গেল? বিজেপি শাসনে বিজেপি সভাপতি ও তার ছেলের এত বিপুল সম্পদ বাড়ল কী করে? মধ্যপ্রদেশে বিজেপি শাসনকালীন ৩০ হাজার কোটি টাকার ব্যাপম কেলেঙ্কারি– যেখানে লক্ষ লক্ষ টাকার বিনিময়ে সরকারি চাকরি, প্রমোশন ও মেডিকেলে ভর্তির দুর্নীতিতে বিজেপি মন্ত্রীরা জড়িত ছিল, সেই কেলেঙ্কারির তদন্ত ধামাচাপা দেওয়ার জন্য ৪৮ জন সাক্ষীকে রহস্যজনক ভাবে খুন করা হয়েছে৷ এই দুর্নীতি ও খুনের আজও তদন্ত হল না কেন? দোষীরা শাস্তি পেল না কেন? বোফর্সের মতো রাফাল বিমান কেলেঙ্কারির তদন্ত চাপা দেওয়া হল কেন?

কেন জম্মুর কাঠুয়ায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বালিকার ৮ জন ধর্ষণকারী ও খুনি অপরাধীদের শাস্তি না দেওয়ার দাবিতে তৎকালীন দুইজন বিজেপি মন্ত্রী চৌধুরী লাল সিং ও চন্দ্রপ্রকাশ গঙ্গা মিছিল করেছিল? ওখানকার আদালত থেকে বিচার বাইরের রাজ্যের আদালতে আনতে হয়েছিল কেন? একইভাবে উত্তরপ্রদেশে উন্নাওতে ২০১৭ সালে ধর্ষিতা নারীর অভিযোগ প্রথমে থানা নিল না, তাঁব বাবা থানায় গিয়ে অভিযোগ জানালে গ্রেপ্তার ও খুন হয়৷ এরপর ২০১৮ সালে মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে ধর্ষিতা আত্মহত্যা করতে গেলে শেষপর্যন্ত ধর্ষককে গ্রেপ্তার করতে বাধ্য হয়৷ কারণ ধর্ষণকারী ক্ষমতাসীন বিজেপির এমএলএ৷ সম্প্রতি রোড অ্যাক্সিডেন্ট করিয়ে ধর্ষিতা ও তার আইনজীবীকে গুরুতর আহত ও তাঁর কাকিমাকে খুন করা হয়৷ সমগ্র দেশে এই নিয়ে প্রতিবাদ হওয়ায় এতদিন বাদে বিজেপি সেই এমএলএ–কে বহিষ্কার করতে বাধ্য হয়েছে৷ ২০১৪ সাল থেকে বিজেপি–র রাজত্বে পিটিয়ে খুন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ ভুয়ো সংঘর্ষে উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, গুজরাটে শতাধিক মারা গেছে৷ উত্তরপ্রদেশ, ঝাড়খণ্ড ও বিহারে সরকার পরিচালিত দুঃস্থ মহিলাদের হোমে ব্যাপক ধর্ষণ, পাচার ও খুনের ঘটনা ধরা পড়েছে৷ ২০০৫ সালে সোহরাবুদ্দিন সেখ ও তাঁর স্ত্রীকে খুন করা হয়৷ এই খুনের সাক্ষী তুলসীরাম প্রজাপতিকে খুন করা হয় ২০০৬ সালে৷ এই খুনে অভিযুক্তদের মধ্যে বিজেপি সভাপতিও ছিলেন৷ তিনি বিচার চলাকালীন বারবার কোর্টে উপস্থিত না হওয়ায় বিচারপতি লোয়া ২০১৪ সালে ১৫ নভেম্বর তাঁকে হাজির হতে নির্দেশ দেন৷ এরপর ১ ডিসেম্বর বিচারপতি লোয়ার রহস্যজনক মৃত্যু হয়৷ তাঁর পরিবার অভিযোগ করে যে এটা খুন এবং ইতিপূর্বে বোম্বে হাইকোর্টের চিফ জাস্টিস বিচারপতি লোয়াকে ঘুষের প্রস্তাব দিয়ে সম্মত করাতে পারেনি৷ এর কোনও তদন্ত হয়নি৷ এই মামলায় সিবিআই সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থিত না করায় ২০১৮ সালে পরবর্তী বিচারপতি এস জে গর্গ অভিযুক্তদের কোনও শাস্তি দিতে না পারায় রায়ে সোহরাবুদ্দিন পরিবারের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন৷ ভারতে এইভাবে বিবেক দংশনে ব্যথিত কোনও বিচারপতির ক্ষমা চাওয়ার ঘটনা ইতিপূর্বে ঘটেনি৷ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন দোষীরা যাতে শাস্তি না পায়, সিবিআই তারই বন্দোবস্ত করেছিল৷ একইভাবে সমঝোতা এক্সপ্রেস দুর্ঘটনার ষড়যন্ত্রে অভিযুক্ত স্বামী অসীমানন্দ সহ সকল অভিযুক্তকে বিচারপতি জগদীপ সিং সাজা দিতে পারেননি, কারণ এনআইএ কোনও সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থিত করেনি৷ ব্যথিত ও বিস্মিত বিচারপতি তাঁর রায়ে বলেন, ‘প্রসিকিউশনের সাক্ষ্যে বেশ কিছু বিচ্ছিন্ন ছিদ্র রয়েছে, যার ফলে সন্ত্রাসবাদী ক্রিয়ার সমাধান করা যায়নি৷’ এই বিজেপি কি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এলে ন্যায় বিচার দেবে?

এই বিজেপির কাছ থেকে পশ্চিমবঙ্গে জনগণের এই অংশ কি দুর্নীতিমুক্ত, গণতান্ত্রিক, অত্যাচার–বিচারমুক্ত শাসন আশা করতে পারেন? ইতিমধ্যেই তো সিবিআই–ইডি খাতায় অভিযুক্ত অনেকেই বিজেপিতে ভিড় জমিয়েছেন, এটা কি বিজেপির দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের শক্তিবৃদ্ধির জন্য? বিধানসভার ভোট তো এখনও অনেক দেরি, ইতিমধ্যেই এলাকায় এলাকায় তৃণমূল–বিজেপির মারামারি–খুনোখুনি চলছে, এর জন্য শুধু কি তৃণমূল দায়ী, বিজেপি নয়? এই বিজেপি কি এই রাজ্যে সুশাসন ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করবে? এ রাজ্যে তো এরই মধ্যে জোর করে ‘জয় শ্রী রাম’ বলতে সংখ্যালঘুদের বাধ্য করা হচ্ছে এবং না বললে অত্যাচার করা শুরু হয়ে গিয়েছে৷ এটা কি প্রকৃতই সৎভাবে ধর্মপ্রচার না গুণ্ডামি? সরকারি ক্ষমতা পেলে এটা আরও বাড়তেই থাকবে৷ এর পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসাবে যদি বাংলাদেশে হিন্দুদের ‘আল্লা হো আকবর’ বলতে বাধ্য করা ও মারধর করা শুরু হয়, তখন তাকে কি গুণ্ডামি বলবেন না ধর্মপ্রচার বলবেন?

যারা আরএসএস–বিজেপির পেছনে ছুটছেন, তারা কি ভেবে দেখেছেন, এই আরএসএস–বিজেপিই রামমোহন–বিদ্যাসাগ নবজাগরণের ঐতিহ্যকে ধ্বংস করে মধ্যযুগীয় ধর্মান্ধ অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ সৃষ্টি করতে চাইছে৷ এটা কি তারা ঘটতে দেবেন?

তারা কি ভেবে দেখেছেন, এই আরএসএস–বিজেপিই তো স্বাধীনতা আন্দোলন ও তার বীর যোদ্ধা ও শহিদ দেশবন্ধু–বিপিন পাল–সুভাষচন্দ্র–ক্ষুদিরাম-সূ্র্য সেন–প্রীতিলতা–বাঘা যতীনদের ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ ও ‘দেশদ্রোহী’ আখ্যা দিয়েছিল এবং তাদের সংগ্রামী ঐতিহ্যকে মুছে দিতে ষড়যন্ত্র করছে ধর্মীয় উগ্রতা জাগিয়ে? এটা ঘটুক তারা কি চান?

তারা কি ভেবে দেখেছেন, চৈতন্য–রামকৃষ্ণ–বিবেকানন্দ যে হিন্দু ধর্ম প্রচার করে গিয়েছেন, আরএসএস–বিজেপি প্রচারিত হিন্দুত্ব তার সম্পূর্ণ বিরোধী৷ যার একমাত্র উদ্দেশ্য ধর্মীয় নয়, রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের স্বার্থ সিদ্ধি করা৷

আরও একটি বিষয় পশ্চিমবঙ্গের জনগণের ভাবা দরকার, তারা প্রথমে কংগ্রেসকে অন্ধের মতো সমর্থন করেছিলেন, তারপর কংগ্রেস শাসনে জর্জরিত হয়ে কংগ্রেসকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য অন্ধভাবে সিপিএমকে জিতিয়েছেন, পরে সিপিএমের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে সিপিএমকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য অন্ধভাবে তৃণমূলকে জিতিয়েছেন, এখন আবার একদল তৃণমূলের দুর্নীতি–জুলুমে ক্ষিপ্ত হয়ে তৃণমূলকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য অন্ধভাবে বিজেপিকে জেতাবার কথা ভাবছেন, এরপর কাকে জেতাবেন? বারবার এই খেলাই কি চলতে থাকবে? এতে সব দিক থেকে অগ্রগতি হচ্ছে, না অধঃপতন দিনকে দিন আরও বাড়ছে? বারবার ওরা কেউ না কেউ স্বর্গরাজ্য বানিয়ে দেওয়ার বুলি আউড়ে ভোটে জিতছে৷ কিন্তু জনগণ কি জিতছে, না হেরে দুর্গতির চরম সীমা অতিক্রম করছে?

মূল শত্রু পুঁজিবাদকে চিনুন

এই সব দলই ভণ্ড, প্রতারক৷ কিন্তু মনে রাখবেন, কোনও সৎ দল যদি খুঁজে পান এবং সেই দলকেও যদি জেতান যত দিন পুঁজিবাদী শোষণ ও শাসন থাকবে, ততদিন বেকারি, ছাঁটাই, মূল্যবৃদ্ধি, অনাহারে–বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু, দুর্নীতি, নারী ও শিশু পাচার, ধর্ষণ ও খুন চলতেই থাকবে, বাড়তেই থাকবে৷ আজ পুঁজিবাদ চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়াশীল, অত্যাচারী৷ তার একমাত্র লক্ষ্য অত্যধিক মুনাফা অর্জন, তারই স্বার্থে চলছে অত্যধিক শ্রমিক শোষণ৷ শোষিত জনগণের ক্রয়ক্ষমতা ক্রমাগত সঙ্কুচিত হচ্ছে, তার ফলে বাজার সঙ্কুচিত হচ্ছে, এর ফলে কলকারখানা বন্ধ হচ্ছে, ছাঁটাই বাড়ছে, সরকারি–বেসরকারি শিল্পে ও দপ্তরে পোস্ট খালি থাকা সত্ত্বেও নিয়োগ বন্ধ হচ্ছে, চুক্তিভিত্তিক কাজ করানো হচ্ছে যেখানে কাজের সময় সর্বাধিক কিন্তু মজুরি খুবই কম৷ মালিক ইচ্ছামতো ছাঁটাই করতে পারে, কারখানা বন্ধ করতে পারে, কিন্তু শ্রমিকের প্রতিবাদ–ধর্মঘট করার অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে৷ সাম্রাজ্যবাদ–পুঁজিবাদ লাভের জন্য, অন্য দেশ লুণ্ঠনের জন্য আক্রমণ করছে, যুদ্ধ বাধাচ্ছে, লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করছে, নিরাশ্রয় করছে, ধ্বংসের তাণ্ডব চালাচ্ছে৷ বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদ–পুঁজিবা বাজার সঙ্কট আজ এতই তীব্র যে সাম্রাজ্যবাদের শিরোমণি যে আমেরিকা কিছুদিন আগে বিশ্বের বাজার গ্রাস করার জন্য গ্লোবালাইজেশন স্কিম চালু করেছিল, আজ কম্পিটিশনে কোণঠাসা হয়ে সে–ই গ্লোবালাইজেশনের বিরুদ্ধে বলছে৷ সাম্রাজ্যবাদী চিনের সাথে ট্রেড ওয়ার বা বাণিজ্যিক যুদ্ধ শুরু করেছে৷ এ–ও এক ধরনের যুদ্ধ যাকে চলতি ভাষায় বলে হাতে মারা নয়, ভাতে মারা৷ এই যুদ্ধে ভারত সহ সব পুঁজিবাদী–সাম্রাজ্যবাদী দেশই জড়িয়ে পড়ছে৷ সমগ্র বিশ্বের পুঁজিবাদী অর্থনীতি রিসেশান বা মন্দার আক্রমণে বিধ্বস্ত৷ ফলে লক্ষ লক্ষ কলকারখানা বন্ধ হবে, আরও বহু কোটি শ্রমিক ছাঁটাই হবে৷

পুঁজিবাদের মুনাফার লোভ এমন প্রবল যে মূল্যবোধ, মানবিকতা, মানবসভ্যতার স্বার্থ– এগুলির কোনও মূল্য নেই তার কাছে৷ তাই দেখুন, বিজ্ঞানীরা বারবার হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন ফসিল অয়েল, কয়লা, পেট্রোল, ডিজেল ইত্যাদি শিল্পে ব্যবহার বৃদ্ধি করায় গ্রিন হাউস গ্যাস বাড়ছে, তাতে গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বিশ্ব উষ্ণায়ন বাড়ছে, মেরু অঞ্চলের বরফের স্তূপ গলে গিয়ে সমুদ্রের জল বাড়ছে, স্থলভাগ বিপন্ন হচ্ছে৷ প্রাকৃতিক পরিবেশও বিপন্ন হচ্ছে৷ আবহাওয়ার ক্ষতিকারক পরিবর্তন হচ্ছে৷ তবুও আমেরিকা সহ কোনও সাম্রাজ্যবাদী–পুঁজিবাদী রাষ্ট্র কর্ণপাত করছে না পুঁজিপতিদের মুনাফার স্বার্থে৷ মানবজাতির যত সর্বনাশই হোক, ওদের লাভের পরিমাণ বাড়াতেই হবে৷ এই পুঁজিবাদ মানবজাতির চরম শত্রু৷

মনে রাখবেন, এই পুঁজিবাদই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শোষণ ও শাসনের পরিবর্তে ভারতবর্ষে শোষণ ও শাসন চালাচ্ছে৷ শুধু তাই নয়, ভারতীয় পুঁজিবাদ একচেটিয়া পুঁজি ও বহুজাতিক পুঁজির জন্ম দিয়ে সাম্রাজ্যবাদী হয়ে এশিয়া, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা, অস্ট্র্রেলিয়া এমনকি খোদ আমেরিকা ও ইউরোপে পুঁজি বিনিয়োগ করে শিল্প চালাচ্ছে, ব্যবসা করছে৷ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ–জাপান– সাথে অর্থনৈতিক ও সামরিক চুক্তি করে ভারত মহাসাগর সহ উপমহাদেশে আধিপত্য বিস্তার করছে৷ দীর্ঘদিন কংগ্রেস এই পুঁজিবাদেরই বিশ্বস্ত সেবক হিসাবে কাজ করেছে, আজ বিজেপি সেই কাজে নিযুক্ত হয়েছে৷ আর দেশে কী অগ্রগতি করেছে? ৬৩ কোটি ভারতীয় কর্মহীন, গত দুই বছরে দুই কোটি শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছে, বিশ্বের ক্ষুধার্ত ১১৯টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১০৩, ৬২ শতাংশ ভারতীয় অত্যন্ত গরিব, ৬৭ কোটি ভারতীয় ১ শতাংশ সম্পদের মালিক, প্রতি দিন ২৩ কোটি মানুষ ক্ষুধার্ত থাকে, প্রতি দিন ৭ হাজার মানুষ অনাহারে–বিনা চিকিৎসায় মারা যায়, প্রতি ঘণ্টায় ৫ জন কৃষক–শ্রমিক আত্মহত্যা করে, বিগত কয়েক বছরে ৩ লক্ষ ৫০ হাজার কৃষক আত্মহত্যা করেছে, শিশুমৃত্যুতে, নারী–শিশু পাচারে, নারী ধর্ষণে ভারত বিশ্বে অগ্রণী৷

আর কয়েকদিন পরে ১৫ আগস্ট সাড়ম্বরে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে স্বাধীনতা দিবস উদযাপিত হবে৷ সকালে তোপধ্বনি, সামরিক কুচকাওয়াজ–পতাকা উত্তোলন–দেশের রঙিন উন্নয়নের ফিরিস্তি সহ নেতামন্ত্রীদের ভাষণ চলবে, সন্ধ্যায় রাষ্ট্রপতিভবনে, রাজভবনে বহু তারকাখচিত হোটেলে চলবে বিশাল ব্যয়বহুল ভোজসভা, আলোকসজ্জিত এই আনন্দ উৎসবে যোগ দেবে নেতামন্ত্রী–শিল্পপতি বড় ব্যবসায়ীরা৷ আর সেই সময়ে দেখা যাবে এক গভীর অন্ধকারের চিত্র৷ দেখা যাবে লক্ষ লক্ষ ফুটপাতবাসী মানবসন্তান ডাস্টবিন থেকে আহার সংগ্রহ করছে৷ এরা জানে না কোথায় তাদের বাবা–মা, কোথায় তাদের ঠিকানা৷ ঘটবে কত শত ক্ষুধার্ত অসহায় মানুষের নীরব অশ্রুবর্ষণ৷ চলবে যে কোনও মজুরিতে যে কোনও কর্মসন্ধানে হন্যে হয়ে ঘোরা লক্ষ লক্ষ মাইগ্রেন্ট লেবারের এখানে সেখানে মরণপণ ছোটাছুটি, সদ্য ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকের আত্মহত্যা, চিকিৎসা–বঞ্চিত মৃত সন্তানকে বুকে নিয়ে কত মায়ের হাহাকার, ঘটবে শত শত দুঃসহ দারিদ্র জর্জরিত বাবা–মায়ের কন্যা সন্তান, শিশু সন্তান বিক্রি৷ দেখা যাবে গঞ্জে–স্টেশনে–রাস্তার মোড়ে দেহবিক্রির বাজারে পরিবারের বেঁচে থাকার সকল সুযোগ বঞ্চিত হাজারে হাজারে অসহায় নারী দাঁড়িয়ে খদ্দেরের খোঁজে৷ আর ঘটবে অসংখ্য ধর্ষিতার আর্তনাদ৷ এই কোটি কোটি ভারতবাসী যারা মনে করে ‘মরণ হলেই বেঁচে যাই, এ যন্ত্রণা আর সহা যায় না’, তাদের কাছে ১৫ আগস্ট অজানা, অচেনা আর পাঁচটা দিনের মতই দুঃখময়৷ যে স্বাধীনতার স্বপ্ন নিয়ে ১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট হাসতে হাসতে ক্ষুদিরাম ফাঁসির মঞ্চে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন এবং তার পরবর্তীতে ভগৎ সিং, সূর্য সেন, প্রীতিলতা, চন্দ্রশেখর আজাদ সহ আরও শত শত যারা শহিদ হয়েছিলেন, তারা কি দুঃস্বপ্নেও স্বাধীন ভারতের এই মর্মান্তিক অসহ চিত্র ভেবেছিলেন?

সোভিয়েত সমাজতন্ত্রই নতুন সভ্যতার সন্ধান দিয়েছিল

তাঁরা কি ভেবেছিলেন পুঁজিপতি শ্রেণি ও শাসক দলগুলির ষড়যন্ত্রে একদিন এদেশের নবজাগরণের মনীষীদের, বীর স্বাধীনতা সংগ্রামীদের, শহিদদের স্মৃতি বিস্মৃত হয়ে এ দেশের ছাত্রযুবকরা জুয়া–সাট্টা–মদ–ড্রাগ-ব্লু ফিল্ম–নোংরা যৌনতার স্রোতে নিমজ্জিত হবে? জ্ঞান–বিজ্ঞান–সাহিত্য অগ্রগতি রুদ্ধ হবে, মনুষ্যত্ব–মানবিক মূল্যবোধ–রুচি–সংস্কৃতি-স্নেহ-প্রেম-প্রীতি-ভালোবাসা সবকিছু অবলুপ্ত হয়ে চূড়ান্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা, স্বার্থপরতা, পারিবারিক জীবন–সামাজিক জীবনকে তছনছ করে দেবে? যে কোনও পথেই হোক টাকা রোজগার করে নোংরা ভোগবিলাসই জীবনের মূলমন্ত্র হয়ে দাঁড়াবে? বিবেকবর্জিত, মনুষ্যত্বহীন, একদল মানবদেহী মত্ত যুবকের কুৎসিত যৌন লালসা পূরণে গ্রামে–শহরে পথেঘাটে, নির্জন ঘরে শত শত শিশুকন্যা থেকে শুরু করে বৃদ্ধা পর্যন্ত ধর্ষিত হবে, খুন হবে? এই অভিযোগে শিক্ষক, জন্মদাতা পিতাও অভিযুক্ত হবে? এ কোন সভ্যতা? এমন বর্বরতা আদিম সমাজে কেন, পশুজগতেও ঘটেনি৷ এরা তো পশুরও অধম শুধু এ দেশেই নয়, সব সাম্রাজ্যবাদী–পুঁজিবাদী দেশেই আজ কম বেশি এসব ঘটছে৷ এই পুঁজিবাদ মানবজীবনে অর্থনীতি–রাজনীতি–সমাজ-জ্ঞানবিজ্ঞানের সাধনা, রুচি–সংস্কৃতি সবকিছু ধ্বংস করছে৷ এই পুঁজিবাদ মানবসভ্যতার চরম শত্রু৷ তাই একে টিকিয়ে রেখে শুধু ৫ বছর বাদে একদিন বোতাম টিপে একবার এই দলকে পরের বার অন্য দলকে ভোটে জিতিয়ে এই দুঃসহ সর্বাত্মক সঙ্কটময় জীবনের অবসান ঘটবে না৷ তাই চাই পুঁজিবাদবিরোধী সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব৷

বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদী–পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় যখন বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছিল তখন মহান মার্কসবাদী চিন্তানায়ক লেনিনের নেতৃত্বে রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব নতুন সভ্যতার সূর্যোদয় ঘটিয়েছিল, যাকে মুগ্ধচিত্তে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন পাশ্চাত্যের মনীষী রমাঁ রলাঁ, বার্নার্ড শ, আইনস্টাইন এবং এ দেশের রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, প্রেমচন্দ, নজরুল, সুব্রহ্মণ্যম ভারতী, জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা, স্বাধীনতা সংগ্রামী সুভাষচন্দ্র, ভগৎ সিং ও আরও অনেকে৷ সমস্ত রকমের শোষণমুক্ত এই সমাজতান্ত্রিক সভ্যতাই রবীন্দ্রনাথের ভাষায় প্রথম সাম্য–মৈত্রী–স্বাধীনতার বাণীকে বাস্তবে রূপায়িত করেছিল৷ রূপায়িত করেছিল যথার্থরূপে বাই দ্য পিপল, অফ দ্য পিপল, ফর দ্য পিপল৷ এই পিপল মানে শ্রমজীবী মানুষ, শোষক শ্রেণি নয়৷ পুঁজিবাদী দেশে সংবিধান রচনা করেছিল মুষ্টিমেয় কয়েকজন বুর্জোয়া আইনবিশারদ, বুদ্ধিজীবী৷ আর সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ায় সংবিধান রচিত হয়েছে কোটি কোটি শ্রমজীবী জনগণের সক্রিয় ও প্রত্যক্ষ মতামতের ভিত্তিতে৷ যেখানে পুঁজিবাদী দেশে মূলত ধনীরাই ভোটে প্রার্থী দাঁড়ায়, সেখানে সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ায় ভোটে প্রার্থী হত অধিকাংশ কেন্দ্রে শ্রমিক–কৃষকরা, মুষ্টিমেয় কেন্দ্রে বুদ্ধিজীবীরা ও সামরিক বাহিনীর প্রতিনিধিরা৷ ভোটারদের কাছে নিয়মিত রিপোর্ট দিতে হত নির্বাচিত প্রার্থীদের৷ তাদের কাজ পছন্দ না হলে যে কোনও সময় ভোটাররা তাদের পাল্টে নতুন প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারত৷ এই অধিকার কোনও পুঁজিবাদী দেশে নেই৷ যেখানে পুঁজিবাদী দেশগুলিতে উৎপাদনের মূল লক্ষ্য হচ্ছে মালিকদের ক্রমাগত সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন, সোভিয়েত সমাজতন্ত্রে উৎপাদনের মূল লক্ষ্য ছিল জনসাধারণের ক্রমবর্ধমান বৈষয়িক ও সাস্কৃতিক চাহিদাপূরণ৷ সেখানে বেকারি, ছাঁটাই বলে কিছু ছিল না, সকলেরই কাজ পাওয়ার অধিকার ছিল৷ উৎপাদনের যা আয় হত, তার একটা অংশ ফ্যাক্টরি কমিটি ট্রেড ইউনিয়নের সাথে আলোচনা করে শ্রমিকদের আর্থিক মজুরি হিসাবে, আরেকটা অংশ সামাজিক মজুরি হিসাবে রাষ্ট্রকে দিত৷ রাষ্ট্র এই আয় থেকে বিনামূল্যে সার্বজনীন শিক্ষা ও চিকিৎসা, ক্রীড়া ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা, সকলের জন্য সমুদ্রের উপকূলে ও পাহাড়ের ধারে স্যানিটোরিয়াম ও স্বাস্থ্য নিবাস, শিশুদের জন্য নার্সারি ও কিন্ডার গার্টেন, বৃদ্ধ ও বিকলাঙ্গদের দেখভাল করা ইত্যাদি করত৷ রাষ্ট্র এই আয় থেকে বিনামূল্যে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, জল পরিবহণের সুযোগ ও পোশাক শ্রমিকদের দিত, তারা অল্প ভাড়ায় বাড়ি ও স্বল্পমূল্যে খাদ্য ও অন্যান্য পোশাক পেত৷ শ্রমিকরা সাপ্তাহিক ছুটি ছাড়াও বছরে ১৫ দিন সবেতন ছুটি পেত স্বাস্থ্যনিবাসে বিশ্রামের জন্য৷ মহিলা শ্রমিকরা বেতন সহ দেড় বছর মাতৃত্বকালীন ছুটি পেত, তারপর রাষ্ট্রের ব্যয়ে ক্রেশে সন্তান রেখে কাজ করতে পারত৷ কাজের সময় প্রথমে দৈনিক ৮ ঘন্টা, পরে ৭ ঘন্টা করা হয়৷ আরও পরে ৬ ঘন্টা থেকে ৫ ঘন্টা করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন মৃত্যুর আগে স্ট্যালিন৷ রাষ্ট্রের ব্যয়ে শহরে–গ্রামে হাজার হাজার লাইব্রেরি–থিয়েটার মঞ্চ–সিনেমা হল করা হয়েছিল শ্রমিক–কৃষকদের বিশ্ব সাহিত্য চর্চা ও সাস্কৃতিক বিনোদনের জন্য৷ শিক্ষক, বিজ্ঞানী, শিল্পী, চিকিৎসক, আইনজীবী ইত্যাদি সকল পেশায় নিযুক্ত ব্যক্তিদের আলাদা রোজগার করতে হত না, রাষ্ট্রই তাদের প্রয়োজনীয় দায়িত্ব পালন করত৷ আদালতে বিচারপ্রার্থীকে কোনও ব্যয় করতে হত না, রাষ্ট্রই সব বহন করত৷ বাকি অর্থ রাষ্ট্র ব্যয় করত বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও নতুন আবিষ্কার, নতুন নতুন ওষুধ আবিষ্কার, শিল্প ও কৃষির উন্নয়নে নতুন প্রযুক্তির আবিষ্কার, প্রশাসনিক কাজকর্ম ও সামরিক বাহিনীর শক্তিবৃদ্ধিতে৷ এখানে উল্লেখ করা দরকার, বিপ্লবের পর রাশিয়াই প্রস্তাব দিয়েছিল সকল রাষ্ট্রই সকল যুদ্ধাস্ত্র ধ্বংস করুক, যাতে যুদ্ধের ভয়াল ধ্বংসমুক্ত পৃথিবী গড়ে সমুদয় অর্থ মানুষের কল্যাণে ব্যয় করতে পারে৷ সাম্রাজ্যবাদী–পুঁজিবাদী দেশগুলি এতে রাজি হয়নি৷ ইউরোপে সর্বাপেক্ষা অনুন্নত দেশ রাশিয়া একদিন মার্কসবাদকে হাতিয়ার করেই বিশ্বে সর্বাপেক্ষা উন্নত দেশে পরিণত হয়েছিল– যেখানে দারিদ্র্য, অনাহারে–বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু, বেকারত্ব, ভিক্ষাবৃত্তি, গণিকাবৃত্তি, এই সবকিছু অবলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল৷ জ্ঞান–বিজ্ঞান–সাহিত্য-সংস্কৃতির ব্যাপক প্রসার ঘটেছিল, ধর্মগত–জাতিগত বিদ্বেষের অবসান ঘটেছিল৷ সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া বিশ্ব অলিম্পিকে শীর্ষস্থান দখল করেছিল৷ বিজ্ঞানে এত অগ্রগতি ঘটেছিল যে সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া বহু নতুন ওষুধ আবিষ্কার করেছিল, প্রথম মহাকাশে মানুষ পাঠিয়েছিল, এবং ১২ জন সোভিয়েত বিজ্ঞানী নোবেল প্রাইজ পেয়েছিলেন৷

এই সমাজতান্ত্রিক রাশিয়াই সকল দেশের স্বাধীনতা আন্দোলন ও মুক্তিসংগ্রামের প্রেরণার কেন্দ্র হয়েছিল, বিশ্বশান্তির অতন্দ্র প্রহরী ছিল৷ স্ট্যালিনের নেতৃত্বে এই সমাজতান্ত্রিক রাশিয়াই দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে ফ্যাসিবাদী শক্তি জার্মানি–ইটালি ও সাম্রাজ্যবাদী আক্রমণের হাত থেকে বিশ্বকে রক্ষায় প্রধান ভূমিকা নিয়েছিল এবং রম্যাঁ রঁল্যা, রবীন্দ্রনাথ সহ বিশ্বের সকল মানবতাবাদীরাই সেক্ষেত্রে সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার উপর একমাত্র ভরসা ব্যক্ত করেছিলেন৷ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগেই সকল রকম শোষণ–অত্যাচার মুক্ত সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার এই নতুন সভ্যতার চরিত্র ও বিপুল অগ্রগতি দেখে ভগৎ সিং ফাঁসির পূর্বে নিজেকে মার্কসবাদী ও কমিউনিস্ট হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন৷ ১৯৩৯ সালে পুরুলিয়ার সম্বর্ধনা সভায় সুভাষচন্দ্র বলেছিলেন, ‘বিশ্বের বর্তমান অবস্থায় অসংখ্য স্রোত ও প্রতিস্রোতকে দুটি প্রধান বিভাগে শ্রেণিবদ্ধ করা যায়৷ অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির বিপরীতে ধাবমান কমিউনিজমের শক্তিগুলি, সেইজন্যই হিটলারবাদের অবসানের অর্থ কমিউনিজমের প্রতিষ্ঠা’৷ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে পরাজয়ের পর ১৯৪৫ সালে নেতাজি সিঙ্গাপুর বেতারকেন্দ্র থেকে ঘোষণা করেছিলেন, ‘‘এখনও জোসেফ স্ট্যালিন বেঁচে আছেন, তাঁর উপরই আগামী দিনে ইউরোপ ও বিশ্বের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে৷’’ গভীর অভিভূত রবীন্দ্রনাথ ১৯৩৯ সালে লিখেছিলেন, ‘‘নানা ত্রুটি সত্ত্বেও মানবের নবযুগের রূপ ওই তপোভূমিতে দেখে আমি আনন্দিত ও আশান্বিত হয়েছিলুম৷ মানুষের ইতিহাসে আর কোথাও আনন্দ ও আশার স্থায়ী কারণ দেখিনি৷ জানি প্রকাণ্ড একটা বিপ্লবের ওপরে রাশিয়া এই নবযুগের প্রতিষ্ঠা করেছে৷ কিন্তু এই বিপ্লব মানুষের সবচেয়ে নিষ্ঠুর ও প্রবল রিপুর বিরুদ্ধে বিপ্লব– এ বিপ্লব অনেক দিনের পাপের প্রায়শ্চিত্তের বিধান৷ … নব্য রাশিয়া মানবসভ্যতার পাঁজর থেকে একটা বড় মৃত্যুশেল তোলবার সাধনা করছে৷ সেটাকে বলে লোভ৷ প্রার্থনা আপনি জাগে যে, তাদের এই উদ্দেশ্য সফল হোক৷’’

এটা অতি দুঃখের যে এত সাফল্য সত্ত্বেও বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদ ও রাশিয়া–চীনের অভ্যন্তরে পরাজিত পুঁজিবাদ অতি সংগোপনে ষড়যন্ত্র চালিয়ে শেষ পর্যন্ত সংশোধনবাদের পথে প্রতিবিপ্লব ঘটিয়ে বিপন্ন মানবজাতির আশাভরসার কেন্দ্র রাশিয়া ও চীনে শ্রমিকশ্রেণি সৃষ্ট সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধ্বংস করেছে, বিশ্বে প্রবল সঙ্কট ও প্রতিক্রিয়ার অন্ধকার ঘনীভূত হয়েছে৷ কিন্তু মানবসভ্যতার ইতিহাস যারা জানে, তাদের হতাশার কোনও কারণ নেই৷ কারণ যে কোনও আদর্শের চূড়ান্ত জয়ের জন্য শত শত বছর জয়–পরাজয়–জয়ের পথে যেতে হয়৷ যে ধর্মকে ঈশ্বরের বাণী বলা হয়, সেই হিন্দু, খ্রিস্টান, ইসলাম ধর্মের ক্ষেত্রেও এটা ঘটেছে৷ বুদ্ধের বাণীকে বৌদ্ধধর্ম বলা হলেও তিনি নিরীশ্বরবাদী ছিলেন৷ এই বৌদ্ধধর্মের প্রভাবে বৈদিক হিন্দুধর্ম পরাস্ত হয়ে কয়েক শত বছর কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল, দেবদেবী পূজা–পশুবলি–ব্রাহ্ম দাপট প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল৷ কিন্তু আবার শঙ্করাচার্য অদ্বৈত বেদান্ত দ্বারা বৌদ্ধ ধর্মকে পরাস্ত করে হিন্দুধর্ম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন৷ রাজতন্ত্র বিরোধী পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ইউরোপে রেনেসাঁস থেকে শুরু করলে জয়–পরাজয়ের পথে চূড়ান্ত জয়লাভের জন্য ৩৫০ বছর লেগেছে৷ এই মানদণ্ডে ৬০/৭০ বছরের সমাজতন্ত্রের বিজয়ের মেয়াদ কতটুকু আর ধর্মীয় আন্দোলন, বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব তো শোষণ উচ্ছেদের লড়াই ছিল না, এক ধরনের শোষণের পরিবর্তে আরেক ধরনের শোষণ অর্থাৎ দাসপ্রথার পরিবর্তে রাজতন্ত্র, রাজতন্ত্রের পরিবর্তে পুঁজিবাদ কায়েম হয়েছিল৷ আর সমাজতন্ত্রকে কয়েক হাজার বছরের শ্রেণিশোষণের বিরুদ্ধে লড়তে হয়েছে৷ এসব কথা এর আগেও বিভিন্ন মিটিংয়ে বলেছি, এই কারণেই বলেছি যে এখনও বহু মানুষ সমাজতন্ত্র নিয়ে হতাশায় ভুগছেন, তাঁরা মনে করেন সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব আর হবে না, বা হলেও টিকবে না৷ এই চিন্তা ইতিহাস ও বিজ্ঞানসম্মত নয়৷ মানবজাতির মুক্তির প্রয়োজনেই শোষিত জনগণ আবার মাথা তুলে দাঁড়াবে৷ বিপ্লবী দল ও বিপ্লবী নেতৃত্ব গড়ে উঠবে, আবার দেশে দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব হবে৷ তা না হলে মানব সভ্যতার ভবিষ্যৎ কী? জনজীবনের এই ভয়াবহ সঙ্কট চলতেই থাকবে, বাড়তেই থাকবে৷

মহান নেতা কমরেড শিবদাস ঘোষের অনন্য সংগ্রাম

এই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সফল করার উদ্দেশ্য নিয়েই কমরেড শিবদাস ঘোষ ১৯৪৮ সালে একটি যথার্থ মার্কসবাদী বিপ্লবী দল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন৷ এদেশের অসংখ্য ছাত্র–যুবকের মতো তিনিও নবজাগরণের মনীষীদের ও বিপ্লবীদের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তৎকালীন বিপ্লববাদে উদ্বুদ্ধ হন এবং একটি নিম্নমধ্যবিত্ত গরিব পরিবারের বাবা–মায়ের চোখের জলকে পেছনে রেখে স্কুলজীবনেই স্বদেশি আন্দোলনে সম্পূর্ণ আত্মনিয়োগ করেন৷ তিনি অত্যন্ত নির্ভীক, দৃঢ়চিত্তসম্পন্ন ও আদর্শনিষ্ঠ চরিত্রের অধিকারী ছিলেন৷ মানব ইতিহাসের সকল যুগের বড় মানুষদের এবং স্বদেশি আন্দোলনের যুগের সকল মহান যোদ্ধাদের চরিত্র ও জীবনসংগ্রাম থেকে তিনি শিক্ষা নিয়েছিলেন৷ প্রবল জ্ঞানচর্চার আগ্রহে এবং সত্যের সন্ধানে ব্রতী হয়ে তিনি এই যুগের শ্রেষ্ঠ বিপ্লবী মতবাদ মার্কসবাদের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং মার্কসবাদের শিক্ষা অনুযায়ী নিজের বিচারধারা, দৃষ্টিভঙ্গি, নানা বিষয়ে বিশ্লেষণ, জীবনযাত্রা, রুচি–সংস্কৃতি, আচার–আচরণ গড়ে তোলার কঠিন সংগ্রামে সম্পূর্ণ আত্মনিয়োগ করেন৷ ১৯৪২ সালের আগস্ট বিদ্রোহের যোদ্ধা হিসাবে জেলে বন্দি থাকাকালীন তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, ক্ষমতা হস্তান্তরের মধ্যে দিয়ে এ দেশের গৌরবময় স্বাধীনতা আন্দোলনের ট্র্যাজিক পরিণতি ঘটতে চলেছে৷ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন ঐক্যবদ্ধ সিপিআইয়ের নেতারা সৎ ও ত্যাগী হলেও মার্কসবাদের সঠিক উপলব্ধি করতে না পারায় দল গঠনের পদ্ধতিতে, বিপ্লবী নীতি–কৌশল–কর্মধারা নির্ধারণে, এক কথায় ভারতবর্ষের বিশেষ পরিস্থিতি অনুযায়ী মার্কসবাদকে বিশেষভাবে প্রয়োগের ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছেন, যেটা লেনিন রাশিয়ায় ও মাও সে তুং চীনে করতে পেরেছিলেন৷ তাই ঐক্যবদ্ধ সিপিআই প্রথম থেকেই সর্বহারা শ্রেণির দলের পরিবর্তে একটি পেটিবুর্জোয়া পার্টি হিসাবে গড়ে উঠেছিল৷ তাই সমগ্র স্বাধীনতা আন্দোলনে গান্ধীজির নেতৃত্বে বিপ্লববিরোধী বুর্জোয়াদের স্বার্থে আপসমুখী ধারা এবং নেতাজির নেতৃত্বে মধ্যবিত্ত ও সাধারণ মানুষের স্বার্থে বিপ্লবী আপসহীন ধারার তীব্র দ্বন্দ্ব থাকা সত্ত্বেও এই অবিভক্ত সিপিআই ১৯২৫ সালে দেওয়া স্ট্যালিনের গাইডলাইন গ্রহণ না করে নেতাজির নেতৃত্বের পরিবর্তে বার বার গান্ধীজির নেতৃত্বকে সমর্থন করেছে, ১৯৪২ সালের আগস্ট অভ্যুত্থান এবং আইএনএ–র লড়াইয়ের বিরোধিতা করেছে, দেশভাগকে সমর্থন করেছে৷ যার ফলে স্বাধীনতা আন্দোলনে প্রাণ দিয়েছে, অশেষ আত্মত্যাগ করেছে, নির্যাতন সহ্য করেছে, অসংখ্য মধ্যবিত্ত ও সাধারণ ঘরের সন্তান কিন্তু এদেশীয় পুঁজিপতি টাটা–বিড়লা–আম্বানি–আদানি-মিত্তাল-জিন্দালদের কেউ কিছু করেনি, অথচ তারাই ক্ষমতা হস্তগত করছে সর্বহারা শ্রেণির যথার্থ মার্কসবাদী দল না থাকার সুযোগ নিয়ে৷

তাই কমরেড শিবদাস ঘোষ এদেশে একটি যথার্থ মার্কসবাদী দল গঠনের দৃঢ় প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করলেন৷ সেদিন তাঁকে কেউ চিনত না, জানত না৷ পাঁচজন সঙ্গী নিয়ে তিনি যাত্রা শুরু করেছিলেন৷ তাঁরাও ছিলেন সম্পূর্ণ অপরিচিত৷ অর্থ নেই, মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, তাঁর রাত্রি কেটেছে ফুটপাতে, প্ল্যাটফর্মে, পার্কে৷ দিনের পর দিন অনাহারে কাটিয়েছেন৷ সেদিন একটা অফিস ঘরও ছিল না৷ সেদিন শুধু অবিভক্ত সিপিআই নয়, আরএসপি, ফরওয়ার্ড ব্লক, আরসিপিআই –এরাও যথেষ্ট বড় দল ছিল৷ সেই অবস্থায় একটা দল গড়া কত কঠিন ছিল কিন্তু একটা দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়ে তিনি মার্কসবাদ–লেনিনবাদেক হাতিয়ার করে শুরু করেছিলেন৷  অনেকে ব্যঙ্গবিদ্রুপ করেছে৷ বলেছে, চামচিকেও পাখি আর এস ইউ সি–ও পার্টি৷ বলেছে– এটা পার্টি নয়, এটা একটা ক্লাব৷ সেই সময় মহান স্ট্যালিন, মাও সে তুং, সিপিআই–কে সমর্থন করছেন৷ কমরেড শিবদাস ঘোষকে ব্যঙ্গ করে এহ দলগুলো বলত, আপনি কি স্ট্যালিন–মাও সে–তুং–এর থেকেও বড়? তিনি তার উত্তরে বলেছেন, স্ট্যালিন–মাও সে–তুং আমার শিক্ষক৷ কিন্তু আপনারা তাঁদের শিক্ষানুযায়ী এদেশে দল গড়ে তোলেননি৷ আমি তাঁদের শিক্ষাকে যথার্থভাবে গ্রহণ করেছি এবং তা প্রয়োগ করে দল গড়ে তুলছি৷ তাঁরা ভারতবর্ষের পরিস্থিতি জানেন না বলেই ভুলভাবে আপনাদের সমর্থন করেছেন৷ এটাই সঠিক পথ৷

চতুর্দিকে দুর্লঙঘ প্রতিকূলতা, চরম বিরুদ্ধতা, সবকিছুর মধ্যে দিয়েই তিনি এগিয়েছেন একটা বিরাট স্বপ্ন নিয়ে, দুর্জয় সঙ্কল্প নিয়ে সমস্ত প্রতিরোধকে চূর্ণবিচূর্ণ করে৷ এই পরিস্থিতি আজ আপনারা কল্পনাও করতে পারবেন না৷ একদল তাঁর যুক্তিকে সমর্থন করেও বলেছিলেন, ‘এত বড় দেশ, কত বড় বড় দল, অনেক নামজাদা নেতা, আপনার নাম নেই, লোকবল নেই, অর্থ নেই, প্রচার নেই, ফলে আপনি কিছুই করতে পারবেন না৷ আপনার কেরিয়ার নষ্ট হবে৷’ তিনি বলেছেন, আমি লড়তে লড়তে মরব, মরতে মরতে লড়ব৷ কিন্তু যা সত্য বলে বুঝেছি তা নিয়ে লড়াই করে যাব৷ মিথ্যার কাছে মাথা নিচু করে বিবেক বিক্রি করতে পারব না৷  এইভাবেই এই দলটা গড়ে উঠেছে৷ আমি, কমরেড মানিক মুখার্জী আমরা কয়েকজন আজও বেঁচে আছি যাঁরা কিছুটা সেই কঠিন কঠোর সংগ্রাম প্রত্যক্ষ করেছি৷ তাঁর পলিটিক্যাল ক্লাসে আমরা ২০/২৫ জন উপস্থিত হতাম, হাজরা পার্কে ১৫০–২০০ জন শ্রোতা, তিনি বক্তা, তাতেই আমরা ভাবতাম মিটিং সাকসেসফুল৷ আমার কী পরিচয়? আমাদের যতটা যোগ্যতা, ক্ষমতা, গুণ আপনারা দেখেন যার জন্য ভালবাসেন, কিছু শ্রদ্ধা হয়তো করেন, এসবই তাঁর কাছ থেকে পাওয়া৷ আমরা তাঁর শিক্ষায় লালিত, অনুপ্রাণিত৷ ফলে ৫ আগস্ট এই দিনটি আমাদের চোখের জলের সাথে যুক্ত৷ আমি তাঁর মৃত্যুর সময়েও উপস্থিত ছিলাম৷ শেষ সময়ে তিনি শুধু আমাদের দিকে তাকাচ্ছিলেন৷ শেষ বিদায়ের ক্ষণে এই আশা নিয়ে (এখানে কমরেড প্রভাস ঘোষের গলা কান্নায় রুদ্ধ হয়ে আসে, কিছুক্ষণ থেমে তিনি আবার বলতে শুরু করেন) নির্বাক চাহনি, কিন্তু ব্যক্ত হয়েছিল আশা যে আমরা এই ঝাণ্ডা বহন করব৷ আজও আমরা লড়ে যাচ্ছি, চেষ্টা করে যাচ্ছি৷ আমাদের দল এগিয়ে চলেছে৷

ভারতবর্ষে আজ আমাদের কয়েক হাজার কর্মী৷ কয়েক লক্ষ সমর্থক৷ আমরা ২৩টি রাজ্যে কাজ করছি৷ আমাদের শক্তির উৎস কী? আমাদের শক্তির উৎস একমাত্র মহান মার্কসবাদ–লেনিনবাদ-শিবদাস ঘোষের চিন্তাধারা৷ তিনি আমাদের শিক্ষা দিয়ে গিয়েছেন মানুষকে জয় করবে বিপ্লবী আদর্শ দিয়ে, যুক্তি দিয়ে, সত্য দিয়ে৷ আর জয় করবে ভালবাসা দিয়ে, ভদ্রতা দিয়ে, উন্নত রুচিসংস্কৃতি দিয়ে৷ যেখানেই অন্যায় অত্যাচার শোষণ দেখবে তার বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়াবে, লড়াই করবে৷ এই পার্টি ভোটের নয়, এই পার্টি গদি দখলের রাজনীতি করে না৷ এই পার্টি শ্রেণিসংগ্রামের, গণআন্দোলনের, লড়াইয়ের৷ এই শিক্ষাই তিনি আমাদের দিয়ে গিয়েছেন৷ এই শিক্ষার ভিত্তিতেই আমরা এগোচ্ছি৷ একথাও আমি আপনাদের বলতে পারি, সমাজতন্ত্রের বিপর্যয় ঘটেছে, এটা অত্যন্ত বেদনাদায়ক ঘটনা৷ বিশ্বের বহু শক্তিশালী কমিউনিস্ট পার্টি যাদের সংগ্রামের বহু ঐতিহ্য ছিল, কিন্তু অন্ধের মতো রাশিয়া চীনকে অনুসরণ করত, সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়ের পর তারা অনেকেই বিভ্রান্ত, খণ্ডবিখণ্ড, দুর্বল হয়ে গেছে৷ কিন্তু কমরেড শিবদাস ঘোষ কোনও দিন মার্কস–এঙ্গেলস–লেনিন-স্ট্যালিন-মাও সে তুং–কে অন্ধভাবে অনুসরণ করেননি৷ তাঁদের শিক্ষা অনুধাবন করেছেন, বিচার করেছেন মার্কসবাদী বিজ্ঞানকে প্রয়োগ করে দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের ভিত্তিতে৷ ফলে তিনি ছাত্র হিসাবে স্ট্যালিনকে, মাও সে তুং–কে শ্রদ্ধাও করেছেন আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষককে শ্রদ্ধা জানিয়েই তাঁদের কিছু ভুলত্রুটি নিয়েও আলোচনা করেছেন৷

ফলে মার্কসবাদ–লেনিনবাদকে সঠিকভাবে প্রয়োগের ভিত্তিতে এই পার্টিটি গড়ে ওঠার ফলে বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনে যেখানে অন্যান্য দল চূড়ান্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আমাদের দল কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি৷ আমরা ব্যথা পেয়েছি, আঘাত পেয়েছি কিন্তু হতাশ হইনি৷ কমরেড শিবদাস ঘোষ এই বিপর্যয়ের জন্য আমাদের প্রস্তুত করে রেখেছিলেন৷ এইক্ষেত্রে আমরা একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছি কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষাকে হাতিয়ার করে – একথা আমি গর্বের সাথে দাবি করতে পারি৷

আমরা গর্বের সাথে দাবি করতে পারি, আন্তর্জাতিক ও জাতীয় এই ভয়ঙ্কর প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তাঁর প্রদর্শিত পথে আমরা মার্কসবাদ–লেনিনবাদ, সর্বহারা আন্তর্জাতিকতাবাদের মহান পতাকাকে বহন করে চলেছি৷ আমরা জানি দুটি পথ আছে৷ হয় পুঁজিবাদ–সাম্রাজ্যবাদ-লেনিনবাদ ফ্যাসিবাদকে টিকিয়ে রাখা, যার অনিবার্য পরিণতি জীবনের সর্বাত্মক সঙ্কটকে বাড়তে দিয়ে মানবজীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তোলা৷ আর না হয় চাই পুঁজিবাদকে উচ্ছেদ করে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব, মানবসভ্যতাকে রক্ষা করা, এগিয়ে নিয়ে যাওয়া৷

মনে রাখতে হবে, সমাজ শ্রেণিবিভক্ত ধনী–গরিবে, মালিক–শ্রমিকে, শোষক–শোষিতে৷ রাজনীতিও শ্রেণিবিভক্ত৷ দলের নাম, ঝাণ্ডার নাম, স্লোগানে যাই পার্থক্য থাকুক, এইসব সরকারি দলই পুঁজিবাদের স্বার্থে, শোষণ রক্ষার স্বার্থে কাজ করছে আর একমাত্র আমাদের দলই পুঁজিবাদবিরোধী বিপ্লবী রাজনীতির ঝাণ্ডা বহন করছে৷

জনগণকে রাজনীতি বুঝতে হবে৷ প্রতিটি দলের শ্রেণিচরিত্র বুঝতে হবে, খবরের কাগজ–টিভির প্রচারের হাওয়ায় ভেসে, নেতাদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতিতে বিভ্রান্ত হয়ে, ধর্ম–জাত–বর্ণবিদ্বেষের ষড়যন্ত্রে বিভক্ত হয়ে বা টাকার লোভে কখনও এই দল কখনও ওই দলকে গদিতে বসিয়ে বারবার ঠকতে হয়েছে৷ এটাই কি জনগণ চলতে দেবেন? তাই কষ্টকর হলেও রাজনীতি বুঝুন, শহরে গ্রামে পাড়ায় পাড়ায়, কলে–কারখানায়, বস্তিতে, নানা প্রতিষ্ঠানে, নিজেরাই পাবলিক কমিটি গড়ে তুলুন, রাজনীতি চর্চা করুন, সংঘবদ্ধভাবে যে কোনও অন্যায় অত্যাচার প্রতিরোধ করুন, যে কোনও সমস্যা সমাধানে এইসব নেতাদের কাছে ভিক্ষা চাওয়া নয়, ইজ্জত নিয়ে মাথা তুলে বলিষ্ঠভাবে দাবি আদায়ের জন্য লড়াই করুন৷ ‘সব দলই সমান, সব নেতারাই ঠকায়’– এইসব বলে হা–হুতাশ করে কোনও লাভ হবে না৷ কেন বারবার ঠকছেন, তার কারণ খুঁজুন৷ দলের রাজনীতি ও শ্রেণিচরিত্র বুঝুন৷ আর এটা সঠিকভাবে বোঝার জন্য চাই সঠিক রাজনৈতিক জ্ঞান, যেটা একমাত্র দিতে পারে মার্কসবাদ–লেনিনবাদ-শিবদাস ঘোষের চিন্তাধারা৷ আর চাই উন্নত চরিত্র, নৈতিক বল, মনুষ্যত্ব৷ তার জন্য প্রথমে নবজাগরণের মনীষীদের থেকে, স্বদেশি আন্দোলনের বিপ্লবী–শহিদদের সংগ্রামী চরিত্র থেকে শিক্ষা নিতে হবে, তারপর আরেক ধাপ এগিয়ে সর্বহারা উন্নত সংস্কৃতি অর্জন করতে হবে৷ এভাবেই লড়াই করতে করতে কদমে কদমে এগিয়ে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রস্তুতি নিতে হবে৷ একমাত্র বিপ্লবী দল এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট)–কে শক্তিশালী করতে হবে৷ ভেবে দেখুন, বড় দল, শত্রু শ্রেণির প্রতিনিধি, ক্ষতি করছে, সর্বনাশ করছে– তার পেছনে ছুটবেন, না তুলনায় ছোট দল আপনার স্বার্থে, গরিবের স্বার্থে লড়ছে, বিপ্লবী আদর্শ–নীতি–চরিত্র নিয়ে চলছে, ভোটের লোভে–গদির লোভে নিজেকে বিক্রি করেনি, তাকে শক্তিশালী করবেন? এই প্রশ্নের সমাধানের উপরই নির্ভর করছে দেশের ভবিষ্যৎ৷ এই কথা বলেই আমি এখানে শেষ করছি৷

ইনকিলাব জিন্দাবাদ

এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট) জিন্দাবাদ

সর্বহারার মহান নেতা কমরেড শিবদাস ঘোষ লাল সেলাম

সূত্র :

(১) শিল্পীর নবজন্ম : রম্যাঁ রল্যাঁ

(২) লেটার টু লর্ড আমহার্স্ট– রামমোহন রায় রচনাবলি

(৩) বিদ্যাসাগর রচনা সংগ্রহ

(৪) শরৎ রচনাবলি

(৫), (১৫), (১৭) ও (১৯) বাণী ও রচনা– বিবেকানন্দ

(৬) বাঞ্চ অফ থটস : এম এস গোলওয়ালকর

(৭) উই অর আওয়ার নেশনহুড ডিফাইন্ড : এম এস গোলওয়ালকর

(৮) আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৪ মে, ১৯৪০

(৯) সুভাষ রচনাবলি, ৪থ খণ্ড

(১০) ওই, ২য় খণ্ড

(১১) ওই, ৫ম খণ্ড

(১২) কালান্তর, হিন্দু–মুসলিম

(১৩) ও (১৪) অজ্ঞাত রচনা–সমাপ্ত প্রবন্ধ, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

(১৬) শিকাগো বক্তৃতা

(গণদাবী : ৭২ বর্ষ ৪ সংখ্যা)