Home / খবর / তৃতীয় রাজ্য সম্মেলনে নেতা–কর্মীদের দায়িত্ব–কর্তব্য স্মরণ করালেন কমরেড সৌমেন বসু

তৃতীয় রাজ্য সম্মেলনে নেতা–কর্মীদের দায়িত্ব–কর্তব্য স্মরণ করালেন কমরেড সৌমেন বসু

২০০৯ সালে জয়নগরে দ্বিতীয় রাজ্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর ২–৩ নভেম্বর ’১৮ কলকাতায় মহাজাতি সদনে অনুষ্ঠিত হল এস ইউ সি আই (সি)–র তৃতীয় রাজ্য সম্মেলন৷ এই ৯ বছরে দলের অগ্রগতি এবং রাজ্য রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরিবর্তন সম্পর্কে একটি মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়েছে রাজ্য সম্পাদক কমরেড সৌমেন বসুর পেশ করা রাজনৈতিক–সাংগঠনি প্রতিবেদনে৷

দলের শক্তিবৃদ্ধি সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ‘‘দ্বিতীয় পার্টি কংগ্রেসের পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত রাজ্যে সংগঠনের বিস্তার ঘটেছে৷ পার্টি সংগঠক, কর্মী–সমর্থক ও দরদির সংখ্যা বেশ কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে৷ রাজ্যের প্রায় সব জেলাতেই সম্ভাবনাপূর্ণ ছেলেমেয়েরা দলের আদর্শ ও রাজনীতির দ্বারা আকৃষ্ট হয়ে কেরিয়ার ছেড়ে কোনও জেলায় কম, কোনও জেলায় ভাল সংখ্যায় দলের সাথে যুক্ত হচ্ছেন৷ বিভিন্ন বামপন্থী দলের কর্মী–সমর্থকরাও দলের কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করছেন৷ এ রাজ্যের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত এমন কোনও এলাকা নেই যেখানে মানুষ আমাদের কাজকর্ম নিয়ে আলাপ আলোচনা করেন না৷ এই সময়ে রাজ্যের বামমনোভাবাপন্ন সাধারণ মানুষ, আমাদের দলকেই গণআন্দোলনের একমাত্র নির্ভরযোগ্য শক্তি হিসাবে গ্রহণ করেছেন৷’’ প্রবীণ নেতাদের মৃত্যু ও অসুস্থতা এবং সিপিএম ঘাতকদের হাতে কিছু নেতা–কর্মীর নিহত হওয়ার ঘটনায় সামান্য হলেও দু–তিনটি অঞ্চলে গণভিত্তি দুর্বল হওয়ার কথা প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে৷

এই সময়ে রাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হল সিপিএম ফ্রন্ট সরকারের পতন এবং তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার গঠন৷ সিপিএম সরকারের পতনের কারণ ব্যাখ্যা করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘‘ক্ষমতায় থাকার সময় পুঁজিবাদের স্বার্থে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহণ, বিদ্যুৎ সহ সর্বক্ষেত্রেই এই সরকারের জনবিরোধী অবাম রাজনীতির অনুসরণ, মদ, জুয়া, অপসংস্কৃতির প্রসার ও চাওয়া–পাওয়ার রাজনীতির মধ্য দিয়ে বাংলার জনসাধারণের প্রতিবাদী তেজ, সাহসকে ধ্বংস করার ব্যাপক অপচেষ্টার পাশাপাশি গণআন্দোলন দমনে পুলিশ ও গুন্ডাবাহিনীর হামলা ও সীমাহীন দুর্নীতির ফলে জনগণ ক্রমশই বিক্ষুব্ধ হতে থাকে৷ আমাদের দলের নেতৃত্বে সে সময়ে তাদের জনবিরোধী প্রতিটি পদক্ষেপের বিরুদ্ধে একের পর এক আন্দোলন গড়ে ওঠে৷ এরই ধারাবাহিকতায় কর–দর–মূল্যবৃদ্ধি বিরুদ্ধে আইন অমান্যে ১৯৯০ সালের ৩১ আগস্ট কমরেড মাধাই হালদার পুলিশের গুলিতে শহিদের মৃত্যুবরণ করেন এবং ৩২ জন কমরেড গুলিবিদ্ধ হন এবং অনেকে পঙ্গু হয়ে যান৷ শুধু তাই নয়, দলের প্রবীণ নেতা রাজ্য কমিটির সদস্য কমরেড আমির আলি হালদার সহ ১৬২ জন নেতা–কর্মীকে সিপিএম ঘাতক বাহিনী পরিকল্পিতভাবে খুন করে৷ রাজ্য জুড়ে আমাদের দলের নেতৃত্বে গণআন্দোলনের ফলে যে বাতাবরণ তৈরি হয়েছিল তারই পরিণতিতে সিঙ্গুর–নন্দীগ্রামের ঐতিহাসিক আন্দোলনের অভ্যুদয় –যা কালক্রমে সিপিএম সরকারের নির্বাচনী পরাজয়ের পথ প্রশস্ত করে৷’’

সিপিএম সরকারের দীর্ঘ অপশাসনের ধারায় ‘‘সিঙ্গুর–নন্দীগ্রাম আন্দোলনের প্রভাবে বাংলার জনগণ যখন সিপিএমকে ক্ষমতাচ্যূত করতে ঐক্যবদ্ধ, তখন সেই স্রোতে ভর করে ২০১১ সালে এ রাজ্যে ক্ষমতাসীন হয়েছিল তৃণমূল৷ সশস্ত্র পুলিশ ও দলীয় গুন্ডাদের উপর্যুপরি আক্রমণে কৃষকের বহুফসলি জমি জোর করে ছিনিয়ে নেওয়ার বর্বর আক্রমণকে প্রতিরোধ করার তাগিদে আমরা সিঙ্গুর–নন্দীগ্রামে জনগণকে সাথে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন শুরু করি৷ এই দুই আন্দোলনের ক্ষেত্রে আমাদের দলই অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেছিল৷ আন্দোলনের একটা পর্যায়ে এসে আন্দোলনকে রক্ষার স্বার্থেই আমরা তৃণমূলের সাথে জোট গঠন করি এবং রাজ্যে সিপিএম ক্ষমতাচ্যুত হয়৷ সিপিএম ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার সাথে সাথে আমরা তৃণমূলের সাথে জোট ছিন্ন করি৷ কারণ আমাদের জানাই ছিল এই দলও একটা আঞ্চলিক বুর্জোয়াদের দল, তাই এই দল জনগণের কোনও সমস্যার সমাধান করতে পারবে না এবং জনগণকে এই দলের শাসন–ত্যাচারের বিরুদ্ধেও সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে৷ তৃণমূল ক্ষমতাসীন হওয়ার আগেই ২০১০ সালের ২৪ এপ্রিল শহিদ মিনার ময়দানে এক জনসভায় দলের সাধারণ সম্পাদক কমরেড প্রভাস ঘোষ বলেছিলেন, ‘তৃণমূল সরকারে এসে সোনার বাংলা করবে এ যদি কেউ দাবি করেন আমরা বলব তা ভ্রান্ত৷ … তৃণমূলকে সরকারে বসে শাসক শ্রেণির পক্ষেই কাজ করতে হবে৷ আমরা বিপ্লবী পার্টি, এ রাজ্যে কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি, সিপিএম সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করছি৷ তৃণমূল ক্ষমতায় এলেও শ্রমিক–কৃষকের দাবি নিয়েও আমাদের লড়তে হবে৷

তৃণমূল কংগ্রেসের ৭ বছরের শাসন তাঁর এই বিশ্লেষণকে বর্ণে বর্ণে সত্য প্রমাণ করেছে৷ রাজ্যবাসী আজ দেখতে পাচ্ছেন তৃণমূল সরকারের আমলেও দুর্নীতি, স্বজনপোষণ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহণ, বিদ্যুৎ সহ সমস্ত পরিষেবায় ও সংগঠনের সর্বক্ষেত্রেই সিপিএম অনুসৃত নীতিই একইভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে৷’’

বিজেপি সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘‘৩৪ বছরের শাসক সিপিএম এবং বর্তমান তৃণমূল কংগ্রেসের ওপর চূড়ান্ত আস্থাহীনতার সুযোগে বিজেপির মতো সাম্প্রদায়িক দল রাজ্যে একটু একটু করে জায়গা দখল করার চেষ্টা চালাচ্ছে৷ একদিকে হিন্দু ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টির চেষ্টা, সাম্প্রদায়িক চিন্তার বিষবাষ্পে মানুষের হৃদয়–মনকে বিষাক্ত করা, দেশের গৌরবময় স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রতি তাদের তৎকালীন বিশ্বাসঘাতকতা এখন ঢেকে রেখে ছদ্ম দেশপ্রেমের স্লোগান তোলা, বিজ্ঞান বিরোধী নানা চিন্তার জাবর কাটা, অন্য দিকে কেন্দ্রীয় সরকারি ক্ষমতা ও কর্পোরেট মালিকদের বিপুল টাকা কাজে লাগিয়ে বিজেপি এ রাজ্যে সংগঠন বিস্তারের চেষ্টা করছে৷ সিপিএম নেতৃত্ব নির্বাচনসর্বস্ব মানসিকতায় একদিকে একচেটিয়া পঁজিপতিদের নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত দ্বিতীয় দল কংগ্রেসের সঙ্গে প্রকাশ্য নির্বাচনী জোট করছে, আবার তৃণমূল কংগ্রেসকে হারাতে এমনকী বিজেপিকে গোপনে ভোট দিয়ে জিতিয়ে দিচ্ছে৷ তাদের সুবিধাবাদী, নীতিহীন নির্বাচনসর্বস্ব রাজনীতির দরুণ বিজেপির মতো একটা উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের এই অগ্রগতি বিপ্লবী আন্দোলনের পক্ষে খুবই উদ্বেগজনক ঘটনা৷’’

এস ইউ সি আই (সি)–র করণীয় সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘‘এই রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আমাদের সংগঠনকে দুই ধরনের কর্তব্য একই সঙ্গে সম্পাদন করতে হচ্ছে৷ সিপিএম–এর অবামপন্থী, নির্বাচন সর্বস্ব সুবিধাবাদী রাজনীতি দেখে যাঁরা বামপন্থা থেকে মুখ ঘোরাচ্ছেন তাদের বোঝাতে হচ্ছে যথার্থ অর্থে ওরা বামপন্থী রাজনীতির চর্চা করেনি৷ বামপন্থী রাজনীতির সত্যকার রূপ কী, তার মতাদর্শগত শ্রেষ্ঠত্ব কোথায়, বামপন্থী রাজনীতি কী ধরনের নৈতিকতা ও সংস্কৃতিগত মান প্রতিফলনের দাবি করে, জনগণের সমস্যা নিয়ে লড়াই আন্দোলন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি কী – তা ব্যাপক প্রচার করা এবং জনগণকে এই আদর্শে উদ্বুদ্ধ করে শ্রেণি ও গণসংগ্রাম গড়ে তোলা বর্তমান সময়ে আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য৷ এক্ষেত্রে ত্রুটি বিচ্যুতির সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আমরা খানিকটা সাফল্য অর্জন করতে পেরেছি৷ … বামপন্থার এই প্রবল দুর্দিনে এই সাফল্য খুবই উল্লেখযোগ্য এতে কোনও সন্দেহ নেই৷’’

‘‘বর্তমান আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পরিস্থিতি এবং অপরাপর বামপন্থী নামধারী দলগুলির কার্যকলাপের ফলে পশ্চিমবাংলায় যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তাতে আমরা উপযুক্ত ভূমিকা পালন করতে পারলে অদূর ভবিষ্যতে কার্যকরী বামপন্থী আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আমরা বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসাবে এ রাজ্যে আত্মপ্রকাশ করতে পারি৷ এই অনুকূল পরিস্থিতিতে প্রয়োজন হল নতুন নতুন এলাকায় সংগঠন বিস্তারের জন্য নেতা–কর্মীদের প্রশিক্ষিত ও উন্নত চরিত্রে বলীয়ান করা৷’’

কংগ্রেসের সঙ্গে সিপিএমের জোট গঠনের প্রয়াসের তীব্র সমালোচনা করে বলা হয়েছে, ‘‘সিপিএম প্রমুখ বামপন্থীদলগুলো মাঝে মাঝে আন্দোলনের ভান করছে, কিন্তু তারা তাদের নির্বাচনসর্বস্ব রাজনীতির স্বার্থে যথার্থ গণআন্দোলন গড়ে তোলার রাস্তা বহুদিন আগেই পরিত্যাগ করেছে৷ এখন তারা একচেটিয়া পুঁজিপতি শ্রেণির বিশ্বস্ত দল কংগ্রেসকে সেকুলার ও গণতান্ত্রিক বলে প্রচার করছে এবং তার সাথে নির্বাচনী জোট করে সংসদে নিজেদের অস্তিত্ব টিঁকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে৷ দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এ রাজ্যের জনমানসে যে সংগ্রামী বামপন্থী মানসিকতা, প্রগতিশীল চিন্তাভাবনা, রুচি–সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, সিপিএম তার সবকিছুর মূলে কুঠারাঘাত করেছে৷ রাজনীতিকে ওরা আন্দোলন বিমুখ অর্থনীতিবাদ ও সুবিধাবাদের কানাগলিতে ঠেলে দিয়েছে, কমিউনিজমের আদর্শকে কালিমালিপ্ত করেছে, জনগণকে বামপন্থা, সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ সম্পর্কে বীতস্পৃহ করে তুলেছে এবং আন্দোলন সম্পর্কেও আস্থাহীনতা বাড়িয়ে দিয়েছে৷ বামপন্থী আন্দোলন সম্পর্কে হতাশাগ্রস্ত মানুষজনকে বিজেপি প্রভাবিত করতে পারছে, এমনকী সিপিএম–এর বহু কর্মী–নেতাকেও তাদের দলে টানতে পারছে৷ এই পরিস্থিতিতে প্রয়োজন আমাদের দলকে আরও দ্রুত শক্তিশালী করা, তার বিস্তার ঘটানো যাতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে ওঠা আন্দোলনগুলোকে সঠিক দিশা দেওয়া যায়, আবার জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার উপযোগী গণকমিটির মাধ্যমে ধারাবাহিক আন্দোলন গড়ে তোলা যায়৷’’

‘‘যেহেতু অধঃপতিত পুঁজিবাদের জন্মচিহ্ণ নিয়েই কর্মীরা দলে যোগ দেন এবং পুঁজিবাদের দূষিত পরিবেশ আমাদের সকলকে ঘিরে আছে, যা প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে প্রত্যেকের ওপর প্রভাব ফেলছে, ক্ষতিকারক আক্রমণ করছে, মুমূর্ষু পুঁজিবাদ–সৃষ্ট নিকৃষ্ট ও উগ্র আত্মস্বার্থসর্বস্ব ব্যক্তিবাদ কমিউনিস্ট চরিত্র গড়ে ওঠার পথে চরম বাধা সৃষ্টি করছে, এমনকী এক সময়ের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা উন্নত চরিত্রের প্রাণসত্ত্বাকেও ধ্বংস করে দিচ্ছে৷ তাই কমরেড শিবদাস ঘোষের চিন্তার আলোকে উন্নত কমিউনিস্ট হওয়ার আকাঙক্ষায় সংগ্রামরত প্রত্যেক নেতা ও কর্মীকে যৌনতা সহ জীবনের সর্বদিককে ব্যাপ্ত করে নিরন্তর পুঁজিবাদের প্রচ্ছন্ন ও প্রকাশ্য আক্রমণ সম্পর্কে সদা–সতর্ক থাকা ও সংগ্রাম পরিচালনা করা বর্তমান দিনে অবশ্যপ্রয়োজনীয় কর্তব্য৷ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক সংগ্রামকে তীব্র ও গভীরভাবে পরিচালনা করার মাধ্যমে দলীয় সংগঠনের উঁচু থেকে নিচু তলা পর্যন্ত আরও প্রাণবন্ত করা বর্তমান মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরি৷’’

‘‘বর্তমান সংকটময় বিশ্ব পরিস্থিতিতে দেশে দেশে প্রকৃত কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে উঠতে ও বিকাশ লাভ করতে পারে কেবলমাত্র মার্কসবাদ–লেনিনবাদ-শিবদাস ঘোষের চিন্তাধারার সঠিক উপলব্ধি ও প্রয়োগের মধ্য দিয়েই৷ ফলে মার্কসবাদের এই উন্নত উপলব্ধিকে অন্য দেশের সর্বহারা শ্রেণির কাছে পৌঁছে দেওয়া, প্রচার করা আমাদের দলের অবশ্য পালনীয় আন্তর্জাতিক দায়িত্ব৷ এই দায়িত্ব পালনে আমাদের আদর্শগত রাজনৈতিক, সাংগঠনিক এবং নৈতিকভাবে আরও উন্নত ও সংহত হতে হবে৷’’

‘‘ব্যক্তিবাদের সকল প্রভাব থেকে মুক্ত করার আপসহীন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সর্বহারা বিপ্লবের উপযুক্ত উন্নত বিপ্লবী চরিত্র সমস্ত নেতা ও কর্মীদের মধ্যে গড়ে তোলার এই সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে দলের উপযুক্ত অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক সংহতি গড়ে তুলতে পার্টির এই তৃতীয় কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হচ্ছে৷’’

পার্টি কংগ্রেসকে সামনে রেখে সংগঠনের যে অভ্যন্তরীণ সংগ্রাম চলেছে তার প্রথম দায়িত্ব রাজ্য স্তর থেকে জেলা, লোকাল ও সেল পর্যন্ত সর্বহারা গণতন্ত্র ও আনুগত্যের ভিত্তিতে যথার্থ বডি ফাংশনিং–এর ক্ষেত্রে যেখানে যতটা ঘাটতি পূরণের সংগ্রাম হয়েছে, তাকে ক্রমান্বয়ে উন্নীত করার সংগ্রাম চালাতে হবে৷ এক্ষেত্রে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে আদর্শগত চর্চাকে৷ সে জন্য রাজনৈতিক ক্লাস ও শিক্ষাশিবির নিয়মিত করার পাশাপাশি প্রত্যেক নেতা ও কর্মীকে ব্যক্তিগতভাবে কমরেড শিবদাস ঘোষের রচনা সহ মার্কসবাদের দিক নির্দেশক আন্তর্জাতিক মহান নেতাদের রচনা ধারাবাহিক ভাবে প্রতিদিন কিছু অংশ পাঠ ও তার সঠিক উপলব্ধি করা একান্ত আবশ্যক৷ যা জানলাম তা আমাকে কী করতে বলে, নিজের কী কী পরিবর্তন করতে বলে তা বোঝা ও সেই সংগ্রামে নিজেকে স্বেচ্ছায় বাধ্য করা–তা খুবই কম হচ্ছে৷ মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও বিচারধারা আয়ত্ত করার যে সংগ্রাম, সর্বহারা সংস্কৃতিকে জীবনে প্রয়োগ করার যে সংগ্রাম সেক্ষেত্রে স্তরে স্তরে আমরা পিছিয়ে আছি৷ দৃষ্টিভঙ্গিতে, বিচারধারায়, অভ্যাসে–আচরণে, জীবনযাত্রায় আমাদের মধ্যে অবক্ষয়ী পুঁজিবাদের প্রভাব প্রবলভাবে বর্তমান৷ নিজেদের মধ্যে এর মারাত্মক প্রভাব চিনতে না পারলে, এর বিরুদ্ধে তীব্র ও বিরামহীন আদর্শগত সংগ্রাম গড়ে এর প্রভাব থেকে নেতা–সংগঠক–কর্মী মুক্ত করতে না পারলে মানবমুক্তির যে স্বপ্ন আমরা দেখি তা সফল হবে না৷

আর যা বুঝলাম, তা জনগণের কাছে তাদের বোঝার মতো ভাষায় প্রকাশ করতে পারি কি না, তার সংগ্রামও খুব কম হচ্ছে৷ নেতারাও এটা ভালভাবে দেখছেন না, গড়ে তুলছেন না৷ একেবারেই হচ্ছে না তা নয়, কিন্তু যতটুকু হচ্ছে তা খুবই সামান্য৷ একই সঙ্গে যথাযথভাবে জনগণের সঙ্গে মেশা ও তাদের সমর্থকে পরিণত করা, দলের সঙ্গে যুক্ত করা ও দুঃস্থ শ্রমজীবী পরিবারে বেশি সময় দিয়ে তাদের পারিবারিক বন্ধু হওয়া ও তাদের নিয়ে গণআন্দোলনের পরিবেশ রচনা করা খুবই জরুরি৷ এটা একটা কর্মসূচি নয়৷ নিপীড়িত জনগণ কীভাবে নির্যাতিত হচ্ছেন, তাদের দুঃসহ অবস্থার মধ্যেও কত উন্নত নৈতিকতার পরিচয় দিচ্ছেন, কত তেজ, সাহস, উপস্থিত বুদ্ধি দিয়ে তাঁরা অন্যায়–অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াচ্ছেন– তা থেকে বিপ্লবীকে শিখতে হয়৷ আবার তাঁদের মধ্যে বিভ্রান্তি, আপসমুখী মনোভাব, চাওয়া–পাওয়ার সুবিধাবাদী মানসিকতা, ক্লেদাক্ত সংস্কৃতির কুপ্রভাবে কীভাবে তাঁরা এই অবস্থার মধ্যে বন্দি হয়ে থাকেন, তাঁদের চোখের জল, হাহাকার, আত্মসমর্পণ বিপ্লবীকে আলোড়িত করে, তার বিবেককে জাগিয়ে রাখে৷ তাই প্রত্যেক নেতা ও কর্মীর অবশ্যই দুঃস্থ, অসহায় মানুষের পরিবারে মেশা, তাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হওয়া দরকার৷

সাথে সাথে পাড়ার শিশু–কিশোরদের নৈতিক অধঃপতন থেকে রক্ষা করার প্রয়োজনে তাদের স্বাস্থ্যচর্চা, খেলাধূলা, মনীষীচর্চায় উৎসাহিত করা দরকার৷ এ বিষয়ে সাধারণ সম্পাদক কমরেড প্রভাস ঘোষ যে আহ্বান রেখেছেন তা স্মরণ করিয়ে দিয়ে কমরেড সৌমেন বসু দলের কর্মী–সংগঠকদের উপযুক্ত ভূমিকা পালনে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান৷

এছাড়াও পার্টির মুখপত্র ব্যাপকভাবে জনগণের মধ্যে বিক্রি করা, প্রচার করা, পার্টির জন্য গরিব–মধ্যবিত্ত জনগণের কাছ থেকে ব্যাপক অর্থসংগ্রহ করার অত্যন্ত প্রয়োজনীয় দিকটি তিনি স্মরণ করিয়ে দেন৷

(৭১ বর্ষ ১৪ সংখ্যা ১৬ – ২২ নভেম্বর, ২০১৮)