Breaking News
Home / খবর / তথাকথিত সংরক্ষণে জনগণের মধ্যে বিভেদই বাড়বে

তথাকথিত সংরক্ষণে জনগণের মধ্যে বিভেদই বাড়বে

এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট)–এর সাধারণ সম্পাদক কমরেড প্রভাস ঘোষ ৯ নভেম্বর এক বিবৃতিতে বলেন,

সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্টের এক ডিভিশন বেঞ্চ ৭ নভেম্বর সংবিধানের ১০৩তম সংশোধনীকে গ্রহণযোগ্য বলে মেনে নিয়ে আর্থিকভাবে দুর্বল শ্রেণির জন্য ১০ শতাংশ সংরক্ষণের যে রায় দিয়েছে, তা চরম হতাশাজনক৷ এর মধ্যে আমাদের দেশের কোটি কোটি শোষিত মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শত্রুতার মনোভাব তৈরি করার সম্ভাবনার বীজ মজুত আছে৷

স্মরণ করা দরকার, এক গভীর সামাজিক সাংস্কৃতিক সমস্যাকে সমাধানের কথা বলে এসসি–এসটিদের জন্য শিক্ষা ও চাকরিতে সংরক্ষণের ব্যবস্থা ভারতীয় সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল৷ চরম দুর্দশাগ্রস্ত দলিত, আদিবাসী এবং অন্যান্য পিছিয়ে পড়া অংশের মানুষ শত শত বছর ধরে তথাকথিত উচ্চবর্ণ ও ধনীদের অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে, ব্রিটিশ শাসকদের দ্বারাও তারা একইরকম ভাবে অবহেলিত হয়েছে৷ এই অংশের মানুষ যাতে আর্থিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক পশ্চাদপদতা ও বঞ্চনা থেকে মুক্ত হতে পারে, সমাজের সর্বস্তরে যাতে তাদের প্রতিনিধিত্ব থাকে সে ব্যাপারে তাদের সাহায্য করার কথা বলেই চালু হয়েছিল সংরক্ষণের নীতি৷ সেই সময় বলা হয়েছিল, এই সংরক্ষণ ১০ বছরের জন্য চালু থাকবে এবং তারপর পর্যালোচনা করে দেখা হবে, সীমিত সময়ের এই সংরক্ষণ তার লক্ষ্যপূরণে কতদূর সমর্থ হয়েছে৷

এই লক্ষ্যপূরণের জন্য এই সমস্ত সম্প্রদায়ের উপর ঐতিহাসিকভাবে চাপিয়ে দেওয়া সামাজিক বিভেদ ও বঞ্চনা দূর করতে সরকারের পক্ষ থেকে নিরলস প্রচেষ্টার প্রয়োজন ছিল৷ কিন্তু বাস্তবে স্বাধীন ভারতে একচেটিয়া পুঁজির সেবাদাস সরকারগুলি এই সমস্ত মানুষের অবস্থার উন্নতির জন্য কিছুই করেনি৷ বরং সকলের জন্য শিক্ষা এবং চাকরির ব্যবস্থা করতে ব্যর্থ এই সরকারগুলি শোষিত মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে ও এক অংশের দরিদ্র মানুষকে অপর অংশের দরিদ্র মানুষের বিরুদ্ধে লড়িয়ে দেওয়ার কৌশল হিসাবে এই সংরক্ষণ নীতিকে ব্যবহার করেছে৷ যে উদ্দেশ্যের কথা বলে সংরক্ষণ নীতি চালু হয়েছিল, তা আজও পর্যন্ত অর্জিত হয়নি শুধু নয়, সময়ের সাথে সাথে অন্যান্য অংশের নিপীড়িত জনগণের মতোই এই অংশের পিছিয়ে পড়া, সুযোগ বঞ্চিত মানুষদের, প্রধানত এসসি–এসটি সম্প্রদায়ভুক্তদের পরিস্থিতি ক্রমাগত খারাপ থেকে আরও বেশি খারাপের দিকে গেছে৷

উদারিকরণ ও বেসরকারিকরণের এই যুগে সব বুর্জোয়া সরকারই সমাজকল্যাণমূলক সমস্ত প্রকল্প থেকে হাত গুটিয়ে নিচ্ছে, শিক্ষাকে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের হাতে তুলে দিচ্ছে৷ শিল্পে ছাঁটাই বা ডাউন সাইজিং এখন সরকারি রীতিতেই পর্যবসিত হয়েছে৷

এর ফলে সরকারি শিক্ষা ও সরকারি চাকরির সুযোগ প্রায় শূন্যে এসে ঠেকেছে৷ সমস্ত বুর্জোয়া সরকারগুলি শূন্যপদ বিলোপের নীতি নিয়ে চলার ফলে চাকরির সুযোগ সামগ্রিক ভাবেই ব্যাপক হারে কমছে৷ এই অবস্থায় এই তথাকথিত সংরক্ষণ কার্যত মানুষের সাথে প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়৷ নির্বাচনসর্বস্ব, গদিলোভী বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলির হাতে এটা ভোটব্যাঙ্ক তৈরির একটা হাতিয়ার হিসাবে কাজ করবে এবং মিথ্যা আশার গাজর ঝুলিয়ে এক অংশের সাধারণ মানুষকে অন্যের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলার হীন কাজে তারা এটাকে ব্যবহার করতে পারবে৷

দুঃখের বিষয় হল, ৭৫ বছর ধরে পুঁজিবাদের নির্মম শোষণের ফলে ধনী আরও ধনী হচ্ছে, গরিব আরও গরিব হয়ে চলেছে৷ এটা অত্যন্ত কঠিন সত্য যে, এতদিন সংরক্ষণ থাকা সত্ত্বেও এই বৈষম্য আরও প্রকট হয়েছে এবং সমাজে একদল সুবিধাভোগী তৈরি হয়েছে যারা সংরক্ষণের সুবিধা সবটুকু ভোগ করছে৷ বাস্তব হল, নতুন সংরক্ষণ নীতির ফলেও গরিবদের সামান্য অংশই উপকৃত হবে এবং বেশিরভাগ অংশ দরিদ্রই থেকে যাবে৷

এই পরিস্থিতিতে এটা পরিষ্কার যে, অসংরক্ষিত শ্রেণিগুলির আর্থিকভাবে দুর্বল অংশের মানুষের জন্য এই তথাকথিত সংরক্ষণ ব্যর্থ হতে বাধ্য৷ এটা আসলে একটা বিরাট ভাঁওতা৷ একমাত্র শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে বিভেদ ফেনিয়ে তোলা, সংঘর্ষ বাধানো ছাড়া এই চতুর পদক্ষেপ আর কোনও উদ্দেশ্য সাধন করতে পারে না৷ আমরা দেশের মানুষের কাছে আবেদন জানাচ্ছি, শাসক শ্রেণির এই পদক্ষেপের আসল উদ্দেশ্যকে উপলব্ধি করে শোষিত মানুষের ঐক্য শক্তিশালী করুন এবং চাকরির ন্যায্য দাবিতে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তুলুন৷ মানুষের ন্যায্য দাবি আদায়ে বুর্জোয়া সরকারকে বাধ্য করার এটাই একমাত্র রাস্তা৷