Home / খবর / ডাক্তার আন্দোলন

ডাক্তার আন্দোলন

২৮ জুন সংখ্যার গণদাবীতে পাঠকের মতামত শীর্ষকে প্রকাশিত ‘তা হলে আন্দোলনই একমাত্র পথ’ সম্পর্কে এই চিঠি৷

শুধু লেখাটির নামকরণের মধ্য দিয়ে যে বার্তাটি আসে তাকে আমি পুরোপুরি সত্য বলে মনে করি৷ লেখাটি জনৈক পাঠকের হলেও যেহেতু গণদাবীতে ছাপানো হয়েছে তাতে ধরে নেওয়া যেতে পারে গণদাবীর সম্পাদকমণ্ডলীরও মতামত এটাই এবং আপনারা জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলনের জয়ে যারপরনাই আনন্দিত৷ এখানে আমি ভেবে দেখতে অনুরোধ করছি আপনারা এই সস্তা জয়ে তৃপ্ত হয়ে একটা ব্যাপক এবং অত্যন্ত প্রয়োজনীয় আন্দোলনকে ভ্রূণাবস্থায় খুন করলেন, অন্তত সেই আন্দোলনকে আরও সংকটময় অবস্থায় পৌঁছে দিলেন৷

আমার বক্তব্যের সমর্থনে কিছু বলার আগে সেদিনের ঘটনাটা একবার মনে করে নেওয়া যাক৷ একজন অসুস্থ লোককে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে৷ ভিজিটিং আওয়ারে তাঁর পরিজনদের সামনে অসুস্থ লোকটির অবস্থার অবনতি হয়৷ একজন ডাক্তার এসে তাঁকে কোনও ইঞ্জেকশন দেন, তার কিছুক্ষণ পর লোকটির মৃত্যু হয়৷ তখন লোকটির পরিজনরা ডাক্তারদের গাফিলতির অভিযোগ আনেন৷ এবার সম্পাদক মহাশয়, আপনি বলুন এই অভিযোগ যদিও তদন্তসাপেক্ষ তবুও অভিযোগ উত্থাপন করা কি অন্যায়? রোগীর পরিজন বলেন, কী ইঞ্জেকশন দিলেন বলতে হবে৷ এটা কি কোনও অনৈতিক অনুরোধ? উত্তেজনা বাড়ে৷ ডাক্তাররা রোগীর মৃতদেহ আটকে রাখেন৷ অর্থাৎ বেআইনি কাজ রোগীর পরিজনরা নয়, ডাক্তাররাই প্রথম করেছিলেন এবং বেআইনি কাজের বিরুদ্ধে যা হয়েছিল সেটাও আইনসিদ্ধ নয়৷

তারপর শুরু হয় আপনাদের সেই তথাকথিত আন্দোলন যাকে আপনারা দু’হাত তুলে সমর্থন করেছেন৷ কেন? গণদাবীতে যাঁরা লেখেন আর গণদাবী যাঁরা পড়েন তাঁরা আর ডাক্তাররা একই শ্রেণির লোক বলে? ডাক্তারদের মারধর করাটাকে আমি কোনও রকমেই সমর্থন করি না৷ কিন্তু রোগীদের প্রতি ডাক্তারদের এই অবহেলাকে আরও বেশি অসমর্থন করি৷ এমন হতে পারে (আমি মোটামুটি নিশ্চিত তাই হয়েছিল) হাসপাতালে ডাক্তারের সংখ্যার অপ্রতুলতার জন্য অথবা/এবং কতর্ব্যরত ডাক্তারদের উপর অসম্ভব চাপ থাকার জন্য ডাক্তাররা আসতে পারেননি, তার সঙ্গে ক্লান্তিও ছিল৷ অর্থাৎ এই হৃদয়হীনতা শুধু এক বা কয়েকজন ডাক্তারের নয় সমগ্র সিস্টেমের৷ আমার প্রস্তাব, আন্দোলনটা তো এর ভিত্তিতে হতে পারত? হাসপাতালে কেন যথেষ্ট সংখ্যায় ডাক্তার–নার্স থাকবে না? কেন কোনও রোগীর পরিজনকে নিজের গাঁটের কড়ি খরচা করে আলাদা করে আয়া রাখতে হবে? কেন ওয়ার্ডে বেড়াল, কুকুর ঘুড়ে বেড়ায়? কেন হাসপাতালে ওষুধ থাকবে না? কেন হাসপাতালে চাকরিরত ডাক্তাররা বাইরে দোকান খুলে বসবেন? কেন এক্স–রে, ই সি জি মেশিন থাকবে না, বা থাকলে খারাপ থাকবে? অর্থাৎ আন্দোলনটা পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থা সংস্কার করার জন্য হতে পারত৷ ডাক্তারদের নিরাপত্তার মতো গুরুত্বহীন সমস্যাটা আপনা আপনি সমাধান হয়ে যেত৷ কিন্তু এই আন্দোলনটা হত অত্যন্ত কঠিন, একেবারে বিসমিল্লায় নাড়া দিতে হত৷ তাই সবাইকার মতো আপনারাও সে পথে না গিয়ে সহজ আর সস্তা পথটা ধরলেন৷ সেক্ষেত্রে বাজারি খবরের কাগজের সঙ্গে আপনাদের আর কী তফাৎ রইল? আপনারা পছন্দ করবেন না জেনেও বলছি প্রকৃত গণতান্ত্রিক আন্দোলনের একটা সম্ভাবনাকে অঙ্কুরেই বিনাশ করে দিলেন৷ নমস্কারান্তে –

সৌম্যেন্দ্র গোস্বামী 

শিবতলা, হুগলি

গণদাবীর বক্তব্য

প্রিয় সৌম্যেন্দ্রবাবু,

আপনার চিঠির জন্য ধন্যবাদ৷ তবে অধ্যাপক প্রদীপ দত্তের চিঠিকেই আমাদের সামগ্রিক অভিমত ধরে নেওয়াটা আপনার ঠিক হয়নি৷ পাঠকের মতামত বিভাগে অনেক চিঠি আসে, আমরা বিরুদ্ধ মত হলেও প্রকাশ করার চেষ্টা করি যদি তাতে নির্দিষ্ট বক্তব্য থাকে৷ যেমন আপনার চিঠি৷ পাঠকের মতামতের ওই চিঠি আমাদের বক্তব্য হলে সেটি ওরকম একদেশদর্শী হত না৷ গণদাবীর ঠিক আগের সংখ্যায় জুনিয়র ডাক্তার আন্দোলন সম্পর্কে ছাত্র সংগঠন ডি এস ও–র বক্তব্য ও বিভিন্ন পর্যায়ে এস ইউ সি আই (সি)–র বিবৃতিগুলি প্রকাশ করা হয়েছিল, যা দেখা বোধহয় আপনার পক্ষে সম্ভব হয়নি৷

আপনি সরকারি হাসপাতালে দুঃস্থ ও গরিব রোগীদের দুরবস্থার কথা বলেছেন যার সাথে আমরা সম্পূর্ণ একমত৷ কিন্তু তার সমাধান তো জুনিয়র ডাক্তারদের ধরে পেটানো নয় কী ভয়ানক পরিবেশে, কী অসহায়তা ও চাপের মধ্যে এই ডাক্তারদের কাজ করতে হয়, তা আপনিও জানেন বলে মনে হয়েছে চিঠি থেকে৷ ফলে হাসপাতালের পরিকাঠামো উন্নয়নের দাবি অত্যন্ত ন্যায়সঙ্গত এবং এবারও তা ছিল৷ এই আন্দোলনে ছাত্র সংগঠন এ আই ডি এস ও–র সদস্যরা থাকলেও মূল নেতৃত্বে ছিল টি এম সি পি৷ কর্মবিরতি শুরু হওয়ার পর বিজেপি, সিপিএমও ঢুকে পড়ে জল ঘুলিয়ে মাছ ধরার চেষ্টা করেছে, নিজ নিজ সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থ অনুযায়ী আন্দোলনকে চালাবার চেষ্টা করেছে, রাজ্য সরকারের সাথে বৈঠকের বিরোধিতা করে তারা চেয়েছে হাসপাতালগুলির অচলাবস্থা যাতে চলতেই থাকে৷ ওই অবস্থায় ডি এস ও কর্মীদের মাথা ঠাণ্ডা রেখে আন্দোলনকে সঠিক খাতে নেওয়ার জন্য দিনরাত পরিশ্রম করতে হয়েছে, বোঝাতে হয়েছে৷ বারবার আক্রান্ত হতে থাকা জুনিয়র ডাক্তাররা নিরাপত্তার দাবিতে আন্দোলন শুরু করলেও ডি এস ও–র প্রচেষ্টাতেই স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর উন্নয়ন সংক্রান্ত দাবিগুলি গৃহীত হয়েছিল৷ এ ছাড়া কর্মবিরতির সময় যাতে এমারজেন্সি খোলা রাখা হয় তার জন্য বারবার চেষ্টা করা হয়৷ উত্তরবঙ্গ সহ বেশকিছু কলেজে এবারও এটা সম্ভব হয়েছিল যেহেতু সেখানে ডি এস ও–র প্রভাব বেশি৷ ফলে সাধারণ মানুষের সংকটের কথা আমরা ভাবিনি, এই অভিযোগ ঠিক নয়৷

আপনি জানেন ও লিখেছেন যে, রোগটা সমগ্র সিস্টেমের৷ জুনিয়র ডাক্তারদের  আন্দোলন কিন্তু সেটাই বলতে চেয়েছিল৷ কতটা পেরেছে সেটা ভিন্ন কথা৷ অন্য কোনও মতলব তাদের ছিল বলে মনে হয়নি৷ আপনি গণদাবীর লেখক –পাঠক–জুনিয়র ডাক্তারদের একই শ্রেণিভুক্ত করে কী বলতে চেয়েছেন, তা স্পষ্ট হল না৷ হয়তো বলতে চেয়েছেন, এরা সকলেই উচ্চ শ্রেণির মানুষ, গরিবের দুঃখ বোঝে না৷ আপনাকে অনুরোধ, এক দিন গণদাবী অফিসে এসে দেখে যান কারা এই কাগজে লেখে৷ আপনিও তো একজন পাঠক, আপনি কি ওই শ্রেণির?

আবার ধন্যবাদ চিঠি পাঠানোর জন্য৷

(গণদাবী : ৭১ বর্ষ ৪৯ সংখ্যা)