Breaking News
Home / খবর / জয়নগরের সংগ্রামী ঐতিহ্য ইতিহাসে লেখা থাকবে — প্রভাস ঘোষ

জয়নগরের সংগ্রামী ঐতিহ্য ইতিহাসে লেখা থাকবে — প্রভাস ঘোষ

৩১ আগস্ট জয়নগরের সভায় সাধারণ সম্পাদক কমরেড প্রভাস ঘোষ অনলাইনে নিম্নলিখিত বক্তব্য রাখেন।

আজকের এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত না থেকে আমাকে দূর থেকে এভাবে বলতে হচ্ছে, এটা আমার কাছে খুব দুঃখজনক। আমি প্রথমে আজকের অনুষ্ঠানের সভাপতি– সে যুগে যাঁরা সর্বহারার মহান নেতা কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষা বুকে নিয়ে বীরত্বপূর্ণ কৃষক সংগ্রাম সংগঠিত করেছিলেন তার শেষ জীবিত প্রতিনিধি– কমরেড রবীন মণ্ডলকে বিপ্লবী অভিনন্দন জানাচ্ছি। যাঁরা সর্বহারার মহান নেতা কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষায় অনুপ্রাণিত হয়ে বিপ্লবী সংগ্রামে গৌরবময় শহিদের মৃত্যু বরণ করেছেন এবং যে সব বীর যোদ্ধা বার্ধক্যের কারণে বা রোগাক্রান্ত হয়ে প্রয়াত হয়েছেন, তাঁদের সকলকে আমি লাল সেলাম জানাচ্ছি।

যে উপলক্ষে আজকের অনুষ্ঠান, এই পুস্তকের রচনা, প্রকাশনা অনুষ্ঠান, কারও কারও কাছে, হয়ত মনে হবে সামান্য ও সীমিত। কিন্তু ইতিহাসের বিচারে, সময়ের গতিধারায় এর তাৎপর্য অসামান্য, গুরুত্ব অপরিসীম। পুস্তকটির আয়তন হয়তো ক্ষুদ্র, কিন্তু এর মধ্যে বর্ণিত হয়েছে এক ঐতিহাসিক সংগ্রামের একেবারে পূর্ণ না হলেও নানা ঘটনা, কাহিনি, যার ঐতিহাসিক তাৎপর্য বিরাট। আমি জানি কোনও সংবাদমাধ্যমে এই সংবাদ প্রচারিত হবে না।

এই দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা জেলা, এই জয়নগর শহর বা এখানকার বিভিন্ন গ্রামীণ এলাকাগুলোর প্রতি আমাদের দল এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট) বিশেষভাবে ঋণী। ইতিহাসে এক একটা স্থান থাকে, এক একটা দিন থাকে সাধারণভাবে যেগুলো গুরুত্বপূর্ণ না হলেও বিশেষ কারণে সেগুলো অসাধারণ গুরুত্ব পায়। পূর্বতন যুগে ধর্মপ্রচারকরা যে সব স্থানে তাঁদের প্রথম সাধনা করেছিলেন, পরবর্তীকালে যে স্থান থেকে নবজাগরণের মশাল প্রজ্জ্বলিত হয়েছিল, তারও পরে ফরাসি বিপ্লব যেখান থেকে সূচনা হয়েছিল, পরবর্তীকালে প্যারি কমিউন যেদিন শুরু হয়েছিল, মহান মার্কস-এঙ্গেলস যেখানে বসে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের চিন্তার সাধনা করেছিলেন, যেদিন কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল, মহান লেনিন যে স্থানে কনভেনশন করে বলশেভিক পার্টি গঠন করেছিলেন, যে স্থানে বসে বিপ্লবের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যে দিন বিপ্লব শুরু করেছিলেন, যে দিন বিপ্লবের সাফল্য এসেছিল, মহান স্ট্যালিন লেনিনের মতবাদের পাশে থেকে বিপ্লব ও সমাজতন্ত্রকে রক্ষা করার যে শপথ নিয়েছিলেন, যে দিন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রাম শুরু করেছিলেন, ফ্যাসিস্ট বাহিনীকে পরাস্ত করেছিলেন, চিন বিপ্লবের রূপকার মহান মাও সে তুঙ যে দিন পার্টি গঠন করেছিলেন, লং রুট মার্চের জয়যাত্রা শুরু করেছিলেন, আমাদের দেশে নবজাগরণ, যাঁরা উন্মেষ ঘটিয়েছিলেন রামমোহন-বিদ্যাসাগর, তাঁরা যে স্থানে যে দিন শুরু করেছিলেন, বিপ্লবী স্বাধীনতা সংগ্রামীরা যেখানে বসে প্রথম বৈঠক করেছিলেন, ফাঁসির মঞ্চে গৌরবময় মৃত্যুবরণ করেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, দেশবন্ধু, নেতাজি, ভগৎ সিংদের স্মৃতিবিজড়িত এইরকম বহু বিশেষ দিন ও স্থান আছে, যা ইতিহাসে অতুলনীয় ঐতিহ্য বহন করছে।

তেমনই ভারতের বুকে প্রথম যথার্থ সর্বহারা শ্রেণির দল মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে হাতিয়ার করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৪৮ সালের ২৪ এপ্রিল এই জয়নগর শহরেই। সে অর্থে জয়নগর শহর ইতিহাসে স্থায়ী একটা স্থান অধিকার করে থাকবে। সেই সময় কমরেড শিবদাস ঘোষ বলেছিলেন, আমি যখন বুঝলাম, এ দেশের স্বাধীনতা আন্দোলন ব্যর্থ হতে চলেছে, সাম্রাজ্যবাদের পরিবর্তে পুঁজিবাদী শোষণ কায়েম হতে চলেছে কারণ দেশে একটা প্রকৃত কমিউনিস্ট বিপ্লবী দল নেই, তখন আমি সিদ্ধান্ত নিই যে, সেই বিপ্লবী দল গঠন করতে হবে। বলেছেন, তখন আমার সাথে ছিল মুষ্টিমেয় কয়েকজন সঙ্গী। অন্য বামপন্থী দলগুলি সকলে হেসেছে, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করেছে; বলেছে, তুমি পারবে না। তোমার লোক নেই, অর্থ নেই, প্রচার নেই। বলেছেন, সেই সময় দিনের পর দিন আমি না খেয়ে থেকেছি। মাথা গোঁজার স্থান ছিল না। কিন্তু আমি বলেছি, বিপ্লবের প্রয়োজনে যা সত্য বলে বুঝেছি আমি তা পরিত্যাগ করতে পারব না। আমি লড়তে লড়তে মরব, মরতে মরতে লড়ব, আমি হয়ত গাছতলাতেই মরব, হয়ত আমার মৃত্যুর খবরও কেউ রাখবে না। কিন্তু আমার লড়াইয়ে সত্য থাকলে ইতিহাস তার মূল্য দেবে।

সেই সময় ১৯৪৫, ৪৬, ৪৭ সালে তাঁর সঙ্গী হয়েছিলেন এই জয়নগর শহরের শহিদ কানাইলাল ভট্টাচার্যের বিপ্লবী সংগ্রামের ঐতিহ্যবাহী আর একজন বিপ্লবী যোদ্ধা কমরেড শচীন ব্যানার্জী। কমরেড শচীন ব্যানার্জী এবং তারও আগে কমরেড নীহার মুখার্জী সেদিন কমরেড শিবদাস ঘোষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। কমরেড শচীন ব্যানার্জী কমরেড শিবদাস ঘোষকে ডেকে এনে স্থান করে দিয়েছিলেন এই জয়নগর শহরে। তার আগে তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনের যুগে এখানে বিপ্লবী সাধনায় ক্লাব করেছেন, বেশ কিছু যুবককে একত্রিত করেছেন। কমরেড শিবদাস ঘোষকে শিক্ষক হিসাবে তাদের সামনে উপস্থিত করেছিলেন। এই শহরেই ১৯৪৮ সালের ২৪ এপ্রিল ভারতে সর্বহারা বিপ্লবের পতাকা প্রথম উত্তোলিত হয়। এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট) পার্টি প্রতিষ্ঠিত হয় এই শহরেরই রূপ অরূপ হলে। ওই হলে আমিও মিটিং করেছি। বহুবার দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার জয়নগরে, কুলতলিতে গেছি যখনই এই হলের পাশ দিয়ে গেছি, আমি এই হলের দিকে তাকিয়ে স্মরণ করেছি সে দিনের কথা। আমি জানি আমাদের যে সব কমরেড অন্য প্রদেশ থেকে, অন্য জেলা থেকে আসেন, বিদেশ থেকেও আসেন তাঁরাও কিন্তু এই শহরটিকে দেখতে চান, এই হলটি দেখতে চান। গভীর আবেগে, শ্রদ্ধায় অভিভূত হন। একটি ঐতিহাসিক স্থান হিসাবে এই হল ইতিহাসে থাকবে।

সেদিন যে কমরেড শিবদাস ঘোষ বলেছিলেন, আমি দরকার হলে না খেয়ে মরব, অনাহারে মরব, আমার মৃত্যুর খবরও হয়ত কেউ রাখবে না, কিন্তু আমার বিপ্লবী সাধনায় সত্য থাকলে একদিন ইতিহাস তার মূল্য দেবে। আমরা জানি ইতিহাস তার মূল্য দিয়েছে। কোনও খবরের কাগজ শিবদাস ঘোষের বার্তা বহন করেনি। অর্থের জোরে নয়, এমএলএ এমপি-র জোরে নয় মন্ত্রীত্ব কিংবা সরকারের জোরে নয়, এই দল এগিয়েছে যথার্থ বিপ্লবী আদর্শের শক্তিতে, সত্য সাধনার শক্তিতে। সত্যের শক্তি অমোঘ, অপ্রতিরোধ্য, ইতিহাসে বারবার তা প্রমাণিত। আজ ভারতবর্ষের ২৮টি রাজ্যে হাজার হাজার কর্মী, লক্ষ লক্ষ সমর্থক কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষাকে বুকে বহন করছে এবং গণআন্দোলন সংগঠিত করছে। আর সেদিন যে দলগুলি ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করেছিল, তারা আজ কোথায়! আরসিপিআই দলের অস্তিত্বই নেই, ফরওয়ার্ড ব্লক, আরএসপি বিলুপ্তির পথে। ৩৪ বছর পশ্চিমবঙ্গের সরকারি ক্ষমতার অধিপতি একদা ক্ষমতা মদমত্ত সিপিএমও একদিকে বুর্জোয়া দল কংগ্রেসের কাঁধে হাত রেখে, অন্য দিকে সদ্য আবিষ্কৃত এক ‘সেকুলার’ বন্ধু পিরজাদার কাঁধে হাত দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে, দলে প্রাণ সঞ্চারের জন্য যুবকদের খুঁজে বেড়াচ্ছে। ইতিহাসের নিয়মেই নীতি-আদর্শ বর্জিত গদিসর্বস্ব এই দলগুলির আজ এই দশা!

এই জেলার কুলতলি, মথুরাপুর, জয়নগর এই সব নদী সংলগ্ন এলাকাগুলিতে সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই জমিদারদের শোষণ অত্যাচার চলত। পরে কংগ্রেসি শাসনে এরাই জোতদার হয়। গরিব কৃষক, ভাগচাষি খেতমজুরদের উপরে এরা নিপীড়ন চালাত, অত্যাচার চালাত। থানা পুলিশ পাইক বরকন্দাজ নিয়ে এদের শোষণ-অত্যাচার চলত। এখানকার গরিব মানুষ ভাবত এটা ভাগ্যের বিধান, পূর্বজন্মের কর্মফল, এ খোদার মর্জি, এ ছাড়া আর কোনও গতি নেই। এ কর্মফল ভোগ করতে হবে। তারা পড়ে পড়ে মার খেত, অত্যাচার ভোগ করত। কত অসহায় নারী আর্তনাদ করত। সেই সময়ে কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষাকে বহন করে কমরেড শচীন ব্যানার্জী, কমরেড সুবোধ ব্যানার্জী এবং তারপর আরও– কমরেড ইয়াকুব পৈলান, কমরেড রবীন মণ্ডল যিনি এখানে বসে আছেন, কমরেড রেণুপদ হালদার, কিছুদিন পরে কমরেড আমিরালি হালদার এবং নলিনী প্রামাণিক, কমরেড আমিনউদ্দিন আখন্দ– এই রকম আরও অনেকে, যাঁরা গ্রামে গ্রামে গিয়ে গরিব মানুষকে কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষায় অনুপ্রাণিত করেছিলেন, ঘুম ভাঙিয়েছিলেন। এরই ফলে গড়ে উঠেছিল একটা মরণপণ সংগ্রাম, দুর্জয় সংগ্রাম। এই গরিবরা দৃঢ় আত্মবিশ্বাসে, বলিষ্ঠভাবে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল। ভারতবর্ষের ইতিহাসে মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে ভিত্তি করে কমরেড শিবদাস ঘোষের চিন্তার ভিত্তিতে প্রথম কৃষক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। কৃষক আন্দোলন এর আগে হয়েছে, ব্রিটিশ আমলে হয়েছে, অন্য রাজ্যেও হয়েছে। কিন্তু যথার্থ মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে প্রয়োগ করে কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষার ভিত্তিতে যথার্থ কৃষক আন্দোলনের সূচনা, গণআন্দোলনের সূচনা ভারতের ইতিহাসে প্রথম এখানেই সংগঠিত হয়েছিল। সেই অর্থেও এখানকার মাহাত্ম্য অত্যন্ত গৌরবজনক।

১৯৫১ সালে আমার ছাত্রজীবনে প্রথম আমি এই জেলায় গিয়েছিলাম। রবীন মণ্ডলরা তখন নেতা, আমি সাধারণ কর্মী। আমি দেখেছি শুধু পুরুষরা নয় মহিলারাও আন্দোলনকে জয়যুক্ত করার জন্য, তাঁকে এবং অন্য নেতাদের পুলিশি অত্যাচার থেকে রক্ষা করার জন্য পুলিশের সাথে লড়াই করেছে। তারা মার খেয়ে, অত্যাচার ভোগ করে, কারারুদ্ধ হয়ে, প্রাণ দিয়ে, বুকের রক্ত ঢেলে দাবি আদায় করেছিল, নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিল। এইভাবে এইখানে প্রথম গড়ে উঠেছিল এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট)-এর এক শক্তিশালী ঘাঁটি। ভারতের বিপ্লবী আন্দোলনের ঘাঁটি। এই অর্থে তার একটা ঐতিহাসিক ঐতিহ্য আছে।

কাপুরুষতা নয়, ভয়-ভীতি নয়, কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষার ভিত্তিতে বীরের মতো কী ভাবে মৃত্যুবরণ করতে হয়, গুলির মুখে দাঁড়িয়ে, অত্যাচারের মুখে দাঁড়িয়ে, রক্ত ঢেলে কী ভাবে লড়াই করতে হয়, শহিদের মৃত্যু বরণ করতে হয় তারও দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে এই জেলাই প্রথম। আজ সারা ভারতে নানা রাজ্যে আমাদের কর্মীরা লড়ছে, রক্ত দিচ্ছে এবং শহিদের মৃত্যুবরণ করছে। কিন্তু প্রথম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে এই জেলাই।

এই জেলা থেকেই প্রথম কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে কমরেড সুবোধ ব্যানার্জী বিধানসভায় নির্বাচিত হন। বিধানসভায় নির্বাচিত হয়ে তিনি দেখান, লেনিনের শিক্ষা অনুযায়ী কী ভাবে বিধানসভা থেকেও বুর্জোয়া পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসির আসল চরিত্র দেখিয়ে বিপ্লবের স্বার্থে বাইরের বিপ্লবী আন্দোলন, গণআন্দোলনকে সংগঠিত করতে হয়। দেখিয়েছিলেন নির্বাচন নয়, শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার একমাত্র পথ বিপ্লব। পরবর্তীকালে এখান থেকেই কমরেড সুবোধ ব্যানার্জী ছাড়াও কমরেড রবীন মণ্ডল, কমরেড রেণুপদ হালদার, প্রবোধ পুরকাইত নির্বাচিত হয়েছিলেন। কমরেড সুবোধ ব্যানার্জীর নেতৃত্বে তাঁরা একই ভূমিকা পালন করেছিলেন। এই জেলারই প্রতিনিধি হিসাবে কমরেড সুবোধ ব্যানার্জী ১৯৬৭ ও ১৯৬৯-এ যুক্তফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রী হয়ে কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষায় দেখিয়েছিলেন মন্ত্রিত্বে থেকেও কীভাবে বিপ্লবের স্বার্থে কাজ করতে হয়। সিপিএম সেই যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রিসভায় ছিল, তারা কংগ্রেসি কায়দায় সরকার চালাতে চেয়েছিল। যখন প্রশ্ন উঠেছিল, এই সরকার আইন শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য শ্রমিক আন্দোলন, কৃষক আন্দোলন, গণআন্দোলন পুলিশ দিয়ে দমন করবে কি না– কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষার ভিত্তিতে কমরেড সুবোধ ব্যানার্জী দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, আমরা কমিউনিস্ট হিসাবে, বিপ্লবী হিসাবে এই কাজ করতে পারি না। আমরা গণআন্দোলনে, কৃষক-শ্রমিক আন্দোলনে পুলিশি হস্তক্ষেপ করতে দিতে পারি না। লেনিনের সময় এই প্রশ্ন আসেনি যে, কমিউনিস্টরা একটা সরকারে যাবে। লেনিন পার্লামেন্টারি ইলেকশনে যেতে বলেছিলেন, যতক্ষণ জনগণ ভোট সম্পর্কে মোহমুক্ত না হচ্ছে ততক্ষণ মোহমুক্ত করার জন্য নির্বাচনে যেতে হবে, আবার বাইরে শ্রেণিসংগ্রাম চালাতে হবে। কিন্তু সরকার গঠন করার পরিস্থিতি এলে, সেই সরকারকে কীভাবে বিপ্লবের স্বার্থে, গণআন্দোলনের স্বার্থে, শ্রেণিসংগ্রামের স্বার্থে ব্যবহার করতে হয় সেটা লেনিনের শিক্ষায় ছিল না। কারণ এভাবে সরকার চালাবার সুযোগ আসেনি। এই শিক্ষা প্রথম উপস্থিত করেছেন কমরেড শিবদাস ঘোষ। এটাও একটা ইতিহাস। সেই ভূমিকা কার্যকর করেছিলেন কমরেড সুবোধ ব্যানার্জী। পশ্চিমবঙ্গে প্রবল শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনের, গণআন্দোলনের জোয়ার সৃষ্টি হয়। তার ঢেউ ভারতের অন্য রাজ্যেও পৌঁছায়। ভীত-সন্ত্রস্ত পুঁজিপতিরা-সাম্রাজ্যবাদীরা, যুক্তফ্রন্টের অন্যান্য শরিক দল, সিপিএম, সিপিআই তখন বাংলা কংগ্রেসের উপর চাপ দেয় শ্রমমন্ত্রীর পদ থেকে এইইউসিআই (সি)-র প্রতিনিধি সুবোধ ব্যানার্জীকে অপসারণের জন্য। এটাই তারা কার্যকর করে ১৯৬৯ সালে তাঁকে শ্রমদপ্তরের পরিবর্তে পূর্তদপ্তরের দায়িত্ব দিয়ে। তা সত্ত্বেও আমাদের দল সরকারে থেকে গেল মন্ত্রীত্বের মোহে নয়, সরকারে থেকে গণআন্দোলনে পুলিশি আক্রমণ মুক্ত রাখার ঘোষিত নীতিকে রক্ষা করার জন্য, কার্যকরী রাখার জন্য।

কমরেড সুবোধ ব্যানার্জী পূর্তদপ্তরের মন্ত্রী হিসাবে স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপ্লবীদের স্বীকৃতি দিতে প্রথম শহিদ ক্ষুদিরামের মূর্তি স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এই মূর্তি হাইকোর্টের সামনে সগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বিপ্লবীদের প্রেরণা হিসাবে। এই মূর্তি গড়ে তুলেছিলেন কমরেড শিবদাস ঘোষেরই আর একজন ছাত্র শিল্পী কমরেড তাপস দত্ত। এইভাবে বিপ্লবীদের মূর্তি স্থাপনের একটা আন্দোলনের সূচনা হয় সেই সময়ে। এই ভূমিকাগুলোও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তীকালে বারবার নির্বাচিত হয়ে কমরেড দেবপ্রসাদ সরকারও একই বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করেছিলেন। নির্বাচিত হয়ে কমরেড তরুণ নস্করও এই ভূমিকা পালন করেছিলেন।

এই দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা থেকেই ১৯৬৭ সালে আমাদের দলের কমরেড চিত্ত রায় লোকসভায় নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং শিবদাস ঘোষের শিক্ষা অনুযায়ী ভূমিকা পালন করেছিলেন। আবার ২০০৯ সালে কমরেড তরুণ মণ্ডল নির্বাচিত হয়ে একজন বিপ্লবী পার্লামেন্টে কী ভূমিকা পালন করেন, তার একটা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন এ দেশে। এইগুলি ইতিহাস।

জয়নগর, কুলতলি, মথুরাপুর, মন্দিরবাজার, পাথরপ্রতিমা, ক্যানিং এই সমস্ত জায়গায় আমি নিজে ১৯৫১ সালের পর বহু গ্রামে ঘুরেছি, অঞ্চলে অঞ্চলে ঘুরেছি। যাঁরা শহিদ হয়েছেন, যাঁরা প্রয়াত হয়েছেন, এঁদের অধিকাংশই আমার সাথে খুব ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত ছিলেন। তাঁদের মৃত্যুজনিত বেদনা আমি আজও বুকে বহন করি। আমি তাঁদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছি। আমি বহু সংগ্রামী মহিলাকে পেয়েছি। কৃষক নারী-যোদ্ধাকে পেয়েছি, বহু যুবককে পেয়েছি। সেই সময় এখানে স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটির ডিগ্রিধারী মানুষ বেশি ছিল না। কিন্তু তখনকার মানুষ ছিল অত্যন্ত সৎ, ন্যায়নিষ্ঠ। তারা প্রশ্ন করেনি এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট)-এর কটা এমএলএ আছে। সরকারে আছে কি না। পঞ্চায়েত আছে কি না। থানা পুলিশ পক্ষে আছে কি না। কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষা, সত্যের আবেদন, বিপ্লবের আবেদন, এই আবেদনে সাড়া দিয়েই তাঁরা মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিলেন এবং সংগ্রাম করেছিলেন। এই সংগ্রামে কত শত গরিব মানুষ বারবার কারারুদ্ধ হয়েছেন, নির্যাতিত-আক্রান্ত হয়েছেন, কত রক্ত ঝরেছে গ্রামে গ্রামে। বেশ কিছু বীর যোদ্ধাকে কংগ্রেস খুন করেছে, সর্বাধিক খুন করেছে সিপিএম সরকারে থাকাকালীন, তৃণমূলও খুন-সন্ত্রাস শুরু করেছে ভারতের বিপ্লবী আন্দোলনের এই ঘাঁটিকে উৎখাত করার জন্য, বিপ্লবী দল এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট)-কে এখান থেকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য। কিন্তু প্রমাণ হয়েছে ভোটে সন্ত্রাস সৃষ্টি করে, প্রলোভন দেখিয়ে, টাকা দিয়ে, জবরদস্তি করে এই দলকে ভোটে হারানো যায়, কিন্তু গরিব মানুষের মন থেকে মোছা যায় না। তাই আজও যখন পূর্বতন নেতারা প্রয়াত, বহু বীর যোদ্ধা নিহত, আরও বেশ কিছু কারারুদ্ধ, ভোটেও পরাজিত– তা সত্ত্বেও এস ইউ সি আই (সি)-র প্রভাব গ্রামে গ্রামে,ঘরে ঘরে, মানুষের মনে। এটা কেউই মুছতে পারেনি। আজও তাঁদের বিবেকের একান্ত আকুতি দল আরও শক্তিশালী হোক, পুনরায় তাঁদের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিক।

আজ বহু সংকটের মধ্য দিয়ে, দুর্যোগের মধ্য দিয়ে আমাদের চলতে হচ্ছে। আপনারা জানেন পুঁজিবাদ বিশ্বব্যাপী চূড়ান্ত সংকটের মুখে। আমাদের দেশে অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক সংকট, নীতি নৈতিকতার সংকট, সামাজিক সংকট ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে। এতবড় সংকট মানবসভ্যতার সামনে ইতিপূর্বে আসেনি। কংগ্রেস শাসন থেকেই শুরু, আজ বিজেপির শাসনে বাড়তে বাড়তে কোটি কোটি বেকার, কোটি কোটি শ্রমিক কর্মহীন। লক্ষ লক্ষ কলকারখানা বন্ধ হচ্ছে। যেগুলো আর খুলবে না। আমাদের দেশে পাবলিকের টাকায় নির্মিত কয়লাখনি, লোহারখনি, ইস্পাত কারখানা, রেল লাইন, রাস্তাঘাট সব বিক্রি করে দিচ্ছে একচেটিয়া পুঁজিপতি ও মাল্টিন্যাশনালদের কাছে। এখন বিজেপি সরকারে আছে। তারা মাল্টিন্যাশনালদের হয়ে, একচেটিয়া পুঁজিপতিদের হয়ে কাজ করছে। এর ফলে একদিকে তাদের কোটি কোটি টাকা মুনাফা বাড়ছে, আর অন্য দিকে মানুষ পথের ভিখারি হচ্ছে। কোটি কোটি গরিব মানুষ রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষা করছে। লক্ষ লক্ষ শিশু জানে না তাদের বাবা মা কে। তারা ভিক্ষা চায়। লক্ষ লক্ষ ফুটপাথবাসী, ঘর নেই– এইরকম একটা অবস্থা। গ্রামে ছেলেরা মেয়েরা দলে দলে ঘুরছে কোথায় কাজ পাবে। যা মজুরি পাবে তাতেই তারা কাজ করতে প্রস্তুত। কিন্তু কাজ কোথায়? কাজ মিলছে না। টাকা রোজগারের জন্য খুন-খারাপি, ডাকাতি-ছিনতাই, চোরাকারবার, নারী পাচার, শিশু পাচার বেড়েই চলেছে। এইরকম একটা অবস্থা। জিনিসপত্রের দাম সাংঘাতিক ভাবে বেড়েই চলেছে। একদিকে আম্বানি-জিন্দাল-আদানি-টাটাদের মুনাফার পাহাড়, ধনদৌলত, সম্পদ বেড়েই চলেছে, অন্য দিকে কোটি কোটি মানুষ দিনকে দিন রিক্ত-নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। এই হচ্ছে পুঁজিবাদী শোষণ যাকে বিপ্লবের মধ্য দিয়ে উচ্ছেদ করার জন্য কমরেড শিবদাস ঘোষ এই প্রকৃত কমিউনিস্ট দল গড়ে তুলেছিলেন।

এই যে করোনা অতিমারি, এই রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য যে উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল, তা সরকার নেয়নি। এই রোগের উৎপত্তি চীনের হুয়ান শহরে। প্রথম থেকেই যদি ওখানকার সাথে যোগাযোগ, যানবাহন বন্ধ করা হত, তা হলে সারা বিশ্বে, আমাদের দেশে এই রোগ ছড়াতে পারত না। এত কোটি কোটি মানুষ আক্রান্ত হত না, কয়েক কোটি মারা যেত না। কিন্তু হুয়ান শহরের সাথে এই দেশের পুঁজিপতিদের, বিশ্বের পুঁজিপতিদের বাণিজ্যিক লেনদেন বন্ধ করা হয়নি। ওদের মুনাফা অর্জনের লালসায় তাই এতবড় সর্বনাশ হয়ে গেল। ওরা মিলিটারি বাজেটে কোটি কোটি টাকা ঢালছে, পুলিশ বাজেটে টাকা ঢালছে। মন্ত্রীরা, এমএলএ, এমপিরা লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি টাকা কামাচ্ছে। কিন্তু হাসপাতাল বাড়াচ্ছে না। প্রয়োজনীয় ডাক্তার নেই, ওষুধপত্র নেই, চিকিৎসার সুযোগ নেই। বিনা চিকিৎসায় হাজারে হাজারে মারা যাচ্ছে। নদীর জলে কত মৃতদেহ ভাসছে। এমনকি সারা বিশ্বের সব রাষ্ট্রের উদ্যোগে বিজ্ঞানী-চিকিৎসাবিদদের সম্মিলিত করে এই মারণব্যাধির মোকাবিলা করার কোনও আয়োজন করেনি। মাল্টিন্যাশনাল ওষুধ কোম্পানিগুলো ঝাঁপিয়ে পড়েছে এই সুযোগে কে কত মুনাফা লুটতে পারে।

পুঁজিবাদ এ দেশে আরও কিছু আক্রমণ শুরু করেছে। চাষিদের খেত-খামার-ফসলের উপর কর্তৃত্ব স্থাপন করছে। এ সব গ্রাস করছে আরও মুনাফা লুটবার জন্য। যার বিরুদ্ধে দিল্লিতে দীর্ঘদিন আন্দোলন চলছে। ফলে এমন দিন আসছে চাষিদের হাতে জমি থাকবে না, ফসলের অধিকার থাকবে না। তা ছাড়াও বড় বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান আসছে, যারা ব্যবসা, হাট-বাজার চালাবে, যাতে ধ্বংস হবে কোটি কোটি গরিব দোকানদার, হকার, হাট-বাজার।

আর একটা ভয়ঙ্কর আক্রমণ অন্তত দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার মানুষকে বুঝতে হবে, জানতে হবে। আগামী ৫০-৬০-৭০ বছরের মধ্যে আপনারা যেখানে মিটিং করছেন সে স্থলটা থাকবে এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই। কারণ বিশ্ব-উষ্ণায়ন ঘটছে। কয়লা, পেট্রল, ডিজেল এইসব ব্যাপক ব্যবহার করার ফলে যে গ্রিন হাউস গ্যাস তৈরি হচ্ছে তার ফলে অি’জেন নষ্ট হচ্ছে, ওজোন স্তর নষ্ট হচ্ছে। ফলে পৃথিবীর উত্তাপ বাড়ছে প্রচণ্ডভাবে। উত্তাপ বাড়ার ফলে মেরু অঞ্চলের বরফ গলে সমুদ্রের জল বাড়ছে। হিমালয়ের গ্লেসিয়ার গলে যাচ্ছে। একসময় হয়ত এই গঙ্গা নদী, পদ্মা নদী বা অন্য নদীও থাকবে না। এই যে বারবার সাইক্লোন হচ্ছে, ঝড় হচ্ছে, প্লাবন আসছে– এই কারণেই হচ্ছে। এরপর খরা বাড়বে, মরুভূমি হবে, সমুদ্র যে এগোচ্ছে একদিন এইসব গ্রাস করবে। এরও কারণ পুঁজিবাদ।

পুঁজিবাদ সমস্ত দিক থেকে আক্রমণ করছে। মানুষের বিবেক, ন্যায়নীতিবোধ এইগুলিকেও ধ্বংস করছে। ঘরে ঘরে অশান্তি, ঝঞ্ঝাট। প্রেম প্রীতি ভালবাসা বলে কিছু নেই। বৃদ্ধ বাবা মাকে পথে ফেলে দিচ্ছে সন্তান। অর্থের লোভ, লালসা এইসব জিনিস জাগিয়ে দিচ্ছে। মদ খাও গাঁজা খাও, নেশা করো, মেয়েদের দেহ নিয়ে ফুর্তি করো। নারী ধর্ষণ, গণধর্ষণ, শিশুকে ধর্ষণ, বৃদ্ধা নারীকে ধর্ষণ, এমনকি বাপ হয়ে কন্যাকে ধর্ষণ, এগুলি প্রতিদিনই খবরের কাগজে সংবাদ। এ জিনিস পশু জগতেও ঘটে না। খবরের কাগজে যা আসে না তা আরও ভয়ঙ্কর। মানুষকে পুরোপুরি অমানুষ বানিয়ে দিচ্ছে, চরিত্র নষ্ট করে দিচ্ছে, এরা কেউ রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, শরৎচন্দ্র, নজরুল, ভগৎ সিং, ক্ষুদিরামদের ঐতিহ্য বহন করে না। এঁদের স্মরণ করে না। ফিল্মস্টারদের কদর্য কাহিনি, ক্রিকেট প্লেয়ারদের আদর্শ হিসাবে তুলে ধরছে। এইভাবেই ছাত্র-যুবকদের মনুষ্যত্ব-বিবেক ধ্বংস করছে। এটা একটা গভীর ষড়যন্ত্র। যাতে মানুষ বলে কেউ না থাকে, প্রতিবাদ না করতে পারে। আন্দোলন করতে না পারে, লড়াই না করতে পারে। এইরকম একটা পরিবেশ সৃষ্টি করছে। ফলে গোটা জাতি, গোটা মানবজাতি আজ ভয়ঙ্কর সঙ্কটের সামনে পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী আক্রমণে। এর বিরুদ্ধে একমাত্র মুক্তির পথ মার্কসবাদ লেনিনবাদ, শিবদাস ঘোষের চিন্তাধারা। যাকে হাতিয়ার করে আমাদের পার্টি এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট) লড়ছে, ভারতের বহু জায়গায় আন্দোলন করছে। দিল্লির কৃষক আন্দোলনেও আমরা একটা বিরাট ভূমিকা নিয়ে চলেছি। আমাদের কর্মীরা সেখানে কাজ করছে। রাজ্যে রাজ্যে আন্দোলনে কাজ করছে।

এই দক্ষিণ চব্বিশ পরগণায় কংগ্রেস আমাদের কর্মীদের খুন করেছে। সিপিএমও আমাদের কর্মীদের খুন করেছে। তৃণমূলও খুন করেছে সর্বশেষ। এদের লক্ষ্য, বিপ্লবী দলকে খতম করো। লড়াইয়ের শক্তিকে খতম করো। যেভাবেই হোক এমএলএ-এমপি করার পিছনে আমরা ছুটি না। একবার সিপিএম, আরেক বার তৃণমূল আমাদের এই এমএলএ-মন্ত্রীত্বের অফার দিয়েছিল, নীতি-আদর্শ বিসর্জন দিয়ে আমরা রাজি হইনি। কারণ কমরেড শিবদাস ঘোষ এই দল গড়েছেন শোষিত গরিব মানুষের শোষণমুক্তির জন্য, লড়াই-আন্দোলনের জন্য, পুঁজিবাদ বিরোধী বিপ্লবের জন্য, যে-কোনও উপায়ে এমএলএ-এমপি-মন্ত্রীত্বের গদি পাওয়ার জন্য নয়।

কমরেড ঘোষের শিক্ষা অনুযায়ী আমরা চাই উন্নত চরিত্র নৈতিক বল। আমাদের কাছে ৫০টা ১০০টা এমএলএ এমপি-র চেয়েও একজন ক্ষুদিরাম, একজন কানাইলাল ভট্টাচার্য, একজন বাঘাযতীন, একজন প্রীতিলতা, একজন আসফাকউল্লা খান অনেক মূল্যবান সম্পদ। এইভাবেই আমরা দলের কর্মীদের কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষায় গড়ে তুলছি। এটাই আমাদের শক্তি। যে সিপিএম ক্ষমতায় মদমত্ত হয়ে আমাদের উপর এত আক্রমণ করল, এত কর্মীকে খুন করল, আজ সে সিপিএম কোথায়? সরকার নেই মানে তার কিছুই নেই। আমরা কিন্তু সরকারের শক্তির জোরে দাঁড়াইনি। এম এলএ, এমপি-র শক্তির জোরে দাঁড়াইনি। আমরা দাঁড়িয়েছি আদর্শের শক্তির জোরে, উন্নত নৈতিক বল ও শক্তির জোরে। তাই আমাদের দল ভাঙছে না। বরং আমাদের দল এগিয়ে চলেছে।

আমার বেশি সময় নেওয়ার প্রশ্ন আজ নেই। আমি বলছি যাঁরা আছেন, এঁরাও অনেক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে এসেছেন। যাঁরা বীর শহিদ হিসাবে মৃত্যুবরণ করেছেন, যাঁরা প্রয়াত হয়েছেন তাঁদের বংশধররা জীবিত। তাঁদের পাড়া প্রতিবেশীদের বংশধররাও জীবিত। এখন যে জনগণ জীবিত তাঁদের আমি বলব, তাঁদের পূর্বপুরুষরা যে মহৎ দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গিয়েছেন, টাকার লোভে নয়, মন্ত্রিত্বের লোভে নয়, এমএলএ, এমপির আকর্ষণে নয়, বিপ্লবী আদর্শে আকৃষ্ট হয়ে শোষিত মানুষের স্বার্থে সংগ্রামের আহ্বানে সামিল হয়েছিলেন। তেমনই আজও লোভ-লালসা, পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতি, যেগুলি দিয়ে সিপিএম পশ্চিমবঙ্গের সংগ্রামী ঐতিহ্যকে নষ্ট করেছে, বামপন্থাকে কলঙ্কিত করেছে, যে পথে এখন তৃণমূল এবং অন্যদলগুলো শাসন করছে, তাকে ঘৃণায় বর্জন করুন। বিবেক-মনুষ্যত্ব বিক্রি করে পাওয়া– সেটা কি যথার্থ পাওয়া? সেটা হারানো। ইতিহাসে যাঁদের বড় মানুষ মনে করেন, শ্রদ্ধা করেন, তাঁরা কী শিক্ষা দিয়ে গেছেন, কী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, সেটা স্মরণ করুন।

বিজেপি গোটা দেশে হিন্দু মুসলিম বিভেদ আনছে, জাতপাত, উপজাতিগত বিভেদ আনছে জনগণের ঐক্যকে ধ্বংস করার জন্য। আমাদের দলে কে হিন্দু-মুসলিম, কে উচ্চবর্ণ-নিম্নবর্ণ, ট্রাইবাল-ননট্রাইবাল এ রকম কোনও পরিচয় নেই। সকলেই শোষিত মানুষ, অত্যাচারিত মানুষ– এইটাই পরিচয়। আমরা মনে করি, সমাজ দুইভাগে বিভক্ত। একটা শোষক শ্রেণি আর একটা শোষিত। একটা পুঁজিপতি শ্রেণি আর একটা শোষিত শ্রমিক শ্রেণি। শোষিত মানুষের এই ঐক্যটাকে আমরা গড়ে তুলতে চাই।

আমার শেষ কথা, যারা এখনও জীবিত আছেন, সেই অতীতের সংগ্রামী যোদ্ধাদের বংশধর বা তাঁদের প্রতিবেশীদের বংশধর হিসাবে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে তাঁরাও বীরের মতো দাঁড়ান। বিপ্লবী ঝান্ডাকে বহন করুন। এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট)কে শক্তিশালী করুন এবং গণআন্দোলন সংগঠিত করুন। গণআন্দোলন, শ্রেণিসংগ্রাম এবং সেই পথে পুঁজিবাদ বিরোধী বিপ্লব সফল করা ছাড়া বাঁচার কোনও দ্বিতীয় পথ নেই। এটাই হচ্ছে আজকের সমাজের দাবি। এই কথা বলেই আমি উপস্থিত সকলকে আমার বিপ্লবী অভিনন্দন জানিয়ে শেষ করছি।