Home / খবর / কৃষি-আইন যদি চাষির স্বার্থে, তবে কর্পোরেটরা উল্লসিত কেন!

কৃষি-আইন যদি চাষির স্বার্থে, তবে কর্পোরেটরা উল্লসিত কেন!

 

রঘুনাথপুর

কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের নয়া কৃষি আইনের প্রতিবাদে কৃষকরা প্রবল ঠাণ্ডার মধ্যে প্রায় এক মাস ধরে অভূতপূর্ব দৃঢ়তায় নজিরবিহীন আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের দাবি, অবিলম্বে কৃষি আইনের সম্পূর্ণ প্রত্যাহার। তাঁরা অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছেন কৃষকের জীবনে সর্বনাশ আনবে এই আইন। অন্য দিকে প্রধানমন্ত্রী এই আইনের সমর্থনে বলেছেন, কৃষিক্ষেত্রের আধুনিকীকরণ এবং উন্নয়নই এই আইনের উদ্দেশ্য। কিন্তু কৃষিক্ষেত্রের উন্নয়ন মানেই কি কৃষকের উন্নয়ন? প্রধানমন্ত্রী কৃষিতে যে উন্নয়নের কথা বলছেন, তাতে কৃষকরা আতঙ্কিত এবং বড় বড় পুঁজিপতিরা আনন্দিত হচ্ছে কেন? এই আইন তা হলে কাদের উন্নয়নের লক্ষে্য আনল সরকার? এই প্রশ্নটির স্পষ্ট উত্তর প্রধানমন্ত্রী থেকে কৃষিমন্ত্রী সকলেই এড়িয়ে যাচ্ছেন।

আইনে উৎফুল্ল আম্বানি-আদানিরা

কৃষকরা বলছেন, এই আইন শুধু আম্বানি আদানিদের মতো খাদ্যপণ্যের একচেটিয়া ব্যবসায়ীদের জীবনেই উন্নয়ন নিয়ে আসবে। এই কথা কি শুধু কৃষকরাই বলছেন? না। এ দেশের শিল্পপতি-পুঁজিপতিরাও সে কথা বলছেন। তাঁদের সংগঠনগুলি এই আইনের জন্য উচ্ছসিত প্রশংসায় ভরিয়ে দিচ্ছে সরকারকে। যেমন বণিকসভা সিআইআই-এর কথাই ধরা যাক। শিল্পপতিদের এই সংগঠনের সদস্য বিভিন্ন সংস্থার মুখ্য আধিকারিকরা (সিইও) এক যৌথ বিবৃতিতে এই আইনকে সমর্থন করেছেন। আদানি গোষ্ঠী বিজ্ঞাপন দিয়ে কৃষি আইনের গুণাগুণ ব্যাখ্যায় তৎপর হয়েছে। অবশ্য এঁরা তো কখনও বলেন না যে, এই আইন সরকার তাঁদের স্বার্থ রক্ষার জন্যই নিয়ে এসেছে। বরং সরকারের মন্ত্রীদের মতো এঁরাও সব সময় বলেন, এর ফলে দেশের কৃষকদেরই মঙ্গল হবে। যেমন তাঁরা বলেছেন, এই আইনের ফলে দেশে কৃষি বাজারের পরিধি বাড়বে এবং কৃষকদের আয় বৃদ্ধির সুযোগ বাড়বে। এরই পাশাপাশি কৃষিক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়বে এবং উন্নত মানের আধুনিক কৃষি পরিকাঠামো তৈরি হবে।

কোচবিহার

নতুন আইন কার্যকর হলে কৃষি বাজারের পরিধি বাড়বে এ কথা সত্যি। এ কথাও সত্যি যে বিনিয়োগ বাড়বে এবং উন্নত মানের আধুনিক কৃষি পরিকাঠামো তৈরি হবে। কিন্তু এই বিনিয়োগ করবে কে? কৃষক? দেশের ৮৬ শতাংশ কৃষক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক। তারা নিশ্চয় এই বিনিয়োগ করবে না। তবে কি সরকার বিনিয়োগ করবে? একেবারেই না। বরং ঠিক উল্টোটা। সরকার কৃষিতে এতদিন যতটুকু খরচ করত, এই আইন চালু করার মধ্য দিয়ে সেটুকুও এখন বন্ধ করে দেবে। তা হলে আর রইল দেশের একচেটিয়া পুঁজিপতিরা। তারাই কৃষিতে বিনিয়োগ করবে। আধুনিক কৃষি পরিকাঠামোও তারাই তৈরি করবে। কারণ অতি ব্যয়বহুল এই পরিকাঠামো কোনও কৃষকের পক্ষে তৈরি করা সম্ভব নয়। এই পরিকাঠামোর মানে কী? মানে বিরাট আয়তনের গোডাউন এবং হিমঘর, খাদ্য-পরীক্ষাকেন্দ্র, ঝাড়াই-বাছাইয়ের যান্ত্রিক ব্যবস্থা, গুণমান নির্ণয়, প্যাকিংয়ের সুবিধা, স্টিম তৈরি এবং ঠাণ্ডা করার ব্যবস্থা, ফল প্রভৃতি পাকানোর ব্যবস্থা এবং নানা ধরনের প্রক্রিয়াকরণের ব্যবস্থা। বুঝতে অসুবিধা হয় না, যদি সরকার না করে তবে এ সব করা একমাত্র বড় বড় পুঁজিপতিদের পক্ষেই সম্ভব। অবশ্য সরকার কৃষকদের জন্য এই সব ব্যবস্থা গড়ে না তুললেও আম্বানি-আদানিদের সহায়তার জন্য দরাজ হাতে এগিয়ে এসেছে। এগ্রি ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফান্ড গঠন করে তাতে ১ লক্ষ কোটি টাকা বরাদ্দ ঘোষণা করেছে সরকার, যা এই সব পুঁজিপতিদের ভরতুকি এবং নামমাত্র সুদে ঋণ হিসাবে তুলে দেওয়া হবে। অর্থাৎ কৃষি পরিকাঠামো যা গড়ে উঠবে তাতে কৃষকের থেকে ফসল কম দামে কিনে নিয়ে ইচ্ছামতো মজুত করা এবং প্রক্রিয়াকরণ করার কাজে লাগাবে দেশের একচেটিয়া পুঁজিপতিরা। কৃষক তার কোনও সুবিধা পাবে না। কৃষকদের দীর্ঘ দিনের যে দাবি– সার, বীজ, কৃষি উপকরণ, সেচের জল, বিদ্যুৎ বা ডিজেল এই সমস্ত কিছু সস্তায় দিক সরকার। কৃষি মজুরদের মজুরির কিছুটা দায় সরকার নিক। তা হলেই কৃষি লাভজনক হবে। এ ছাড়াও কৃষকদের দাবি চাষে উৎপন্ন ফসল সরাসরি সরকারকেই কিনতে হবে। কিন্তু সরকার এ জন্য কোনও বরাদ্দ করল না। স্বাভাবিক ভাবেই কৃষিক্ষেত্রের এই সংস্কারে একচেটিয়া মালিকরা উল্লসিত হয়ে একে যুগান্তকারী বলছে।

কর্পোরেটরা পুঁজি খাটায় কৃষকদের প্রতি দরদ থেকে নয়

সরকারের অনুগ্রহভাজন অর্থনীতিবিদ, বিশেষজ্ঞ নামধারীরা প্রচার করছেন, কর্পোরেটরা বাজারে ঢুকলেই কৃষক ও ভোক্তার সর্বনাশ হয়ে যাবে, এ যুক্তি নাকি ঠিক নয়। দেশে পণ্যের বাজারগুলো কর্পোরেটরা চালালেও তাতে নাকি সাধারণ মানুষের বড় ক্ষতির প্রমাণ নেই। এই সব ঠাণ্ডাঘরের বিশেষজ্ঞরা বাস্তবে সাধারণ মানুষের জীবন সম্পর্কে পুরোপুরিই অজ্ঞ। না হলে কর্পোরেটদের হাতে সাধারণ মানুষের সর্বনাশটা তাঁদের চোখ এড়াত না। যে সব পণ্যের বাজার কর্পোরেটদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে তার একটা কোনও ক্ষেত্র কেউ বলতে পারবে যা সাধারণ মানুষের আয়ত্তের বাইরে চলে যায়নি? এ ক্ষেত্রে কেউ কেউ টেলিকমিউনিকেশনের উদাহরণ টানেন। রিলায়েন্সের জিও যে বাজার দখলের জন্যই এক সময়ে ফোনের খরচ কমিয়েছিল, এ কথা যিনি না বোঝেন তিনি কেমন বিশেষজ্ঞ, তা বুঝতে কারও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

মেদিনীপুর

কৃষিপণ্যের প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের পরিকাঠামোর উন্নতি, কৃষিতে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বাজারের পরিধি বাড়লে কৃষকদের লাভ কী? এই উন্নত পরিকাঠামোর সুযোগ যেমন কৃষিপণ্যের ব্যবসায়ী পুঁজিপতিরা নেবে তেমনই উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারও তারাই করবে, কৃষকরা নয়। খুব বেশি হলে এই সব বড় ব্যবসায়ীদের সাথে কৃষকদের চুক্তি চাষে তা ব্যবহার হবে, যে ফসলের মালিক কৃষক হবে না, হবে চুক্তি করা ব্যবসায়ী। তাই সিআইআই-এর পূর্বাঞ্চলীয় শাখার এগ্রিকালচার অ্যান্ড ফুড প্রসেসিং সাবকমিটির চেয়ারম্যান তথা আইএফবি অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজের এমডি ও ভাইস-চেয়ারম্যান এ কে ব্যানার্জী এই আইনকে প্রগতিশীল এবং দেশে কৃষি বাজারের বিকাশে সহায়ক বলে প্রশংসা করে বলেছেন, ‘আত্মনির্ভর ভারত অভিযান প্যাকেজের আওতায় কৃষি সংস্কারের পদক্ষেপগুলি ঘোষিত হয়েছিল। কৃষিক্ষেত্রের দীর্ঘমেয়াদি উন্নতির জন্যই কৃষি আইন সংসদে পাশ হয়েছে।’ অর্থাৎ সরকার নতুন কৃষি আইন নিয়ে কৃষকদের কিংবা তাদের সংগঠনগুলির সাথে কোনও আলোচনা না করলেও এই সব বণিকসভাগুলির সাথে আলোচনা করার পরেই তা এনেছে। এর পরেও কি বুঝতে অসুবিধা হয় যে, এই আইন সব দিক থেকেই কর্পোরেট মালিকদের স্বার্থবাহী, কৃষকদের নয়?

কৃষির এই ‘উন্নয়ন’ আসবে কৃষকদের লাশের উপর দিয়ে

আইন পাশ হওয়ার আগে থেকেই দেশের কৃষি বাজারটিকে দখল করার প্রস্তুতি সেরে ফেলেছে আম্বানির ই-কমার্সের ব্যবসা জিও-মার্ট। কোভিড অতিমারির চলার সময়েই রিলায়েন্স কোম্পানি ঘোষণা করে, তারা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম খুচরো ব্যবসা চালানোর কোম্পানি ‘ফিউচার গ্রুপ’ ৩৫০ কোটি ডলারে কিনে নিয়েছে। শুধু তাই নয়, এই অতিমারির সময়েই আমেরিকার দৈত্যাকার কোম্পানি ‘ফেসবুক’-এর সঙ্গে চুক্তি হয়েছে রিলায়েন্সের। রিলায়েন্স জিও প্ল্যাটফর্মে ৫০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে ফেসবুক। রিলায়েন্স-ফেসবুক জানিয়ে দিয়েছে রিটেল ব্যবসায় দেশের প্রতিটি কোণায় কোণায় পৌঁছে যাবে তাদের পণ্য, আর দেশের প্রতিটি কোণা থেকে ফসল তুলে নিয়ে আসবে তারা তাদের গুদামে। স্বাভাবিক ভাবেই এই দুই সংস্থার সম্মিলিত বিপুলাকার পুঁজির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে এমন সাধ্য ভারতের বাজারে আর কারও নেই। একই ভাবে আদানিরা যেমন ইতিমধ্যেই বিশাল বিশাল গুদাম আর হিমঘর বানিয়ে ফেলেছে তেমনই কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণ সংস্থা খুলে বসে আছে। সেই কারণেই সারা দেশের সাধারণ মানুষের দাবি মেনে আইন প্রত্যাহারে নারাজ সরকার। ফলে কৃষির এই তথাকথিত উন্নয়ন যে আসবে দেশের কোটি কোটি কৃষকের মৃতদেহের উপর দিয়ে, তা বুঝতে অসুবিধা নেই। এর ফলে শুধু কৃষকরাই নয়, খুচরো ব্যবসায়ীরাও বিপদে পড়বেন।

সরকার-কর্পোরেটের অশুভ চক্রের বিরুদ্ধে সব স্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে

আম্বানি-আদানি সহ একচেটিয়া পুঁজি গোষ্ঠীর সাথে বিজেপির সখ্যতা এখন প্রকাশ্যেই। তাদের ইচ্ছায় এবং টাকার জোরে বলীয়ান হয়েই যেমন বিজেপি ক্ষমতায় বসেছে, তেমনই সেই ঋণ শোধ করতে একদিকে প্রায় সমস্ত জাতীয় সম্পদই এদের হাতে তুলে দিচ্ছে বিজেপি সরকার। তার জন্য সব রকমের আইনকে তারা বদলে দিচ্ছে। তারই ফল যেমন কৃষি আইনে পরিবর্তন তেমনই শিল্প আইনকেও পুরোপুরি বদলে ফেলা। শিল্পপতি এবং সরকারের এই দুষ্টচক্র ভারতের ইতিহাসে পূর্বেকার সব নজির ছাপিয়ে গেছে। এই কৃষি আইনের সাথে কৃষক স্বার্থের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই শুধু নয়, কৃষকদের স্বার্থকে পুঁজিপতিদের পায়ে বিসর্জন দিয়েই তা আনা হয়েছে। যদিও এই সত্য ধরতে কৃষকদের কোনও অসুবিধা হয়নি। তাই বহু প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও আন্দোলনে কৃষকরা তাঁদের দাবিতে অনড়।

কাটোয়া

সরকার এবং একচেটিয়া পুঁজির এই শক্তিশালী চক্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েই কৃষকদের আন্দোলন। শ্রমিক কর্মচারী খুচরো ব্যবসায়ী সহ সব অংশের সাধারণ মানুষকে এগিয়ে এসে আজ এই আন্দোলনকে শক্তি জোগাতে হবে। তা না হলে পুঁজির সর্বগ্রাসী আক্রমণ থেকে কেউই রেহাই পাবে না।

(ডিজিটাল গণদাবী-৭৩ বর্ষ ১৪ সংখ্যা_২৫ ডিসেম্বর, ২০২০)