Home / অন্য রাজ্যের খবর / কাশ্মীর আবার খবরে, কারণ অর্থনীতি আজ কবরে

কাশ্মীর আবার খবরে, কারণ অর্থনীতি আজ কবরে

বিশিষ্ট কৃষি পরিকল্পনাবিদ কল্যাণ গোস্বামীর এই লেখাটি পাঠকদের কাছ থেকে হোয়াটস্যাপ এবং ই–মেল মারফত আমাদের কাছে আসে৷ কাশ্মীরের বর্তমান পরিস্থিতি বুঝতে এটি সাহায্য করতে পারে মনে করে তার একাংশ প্রকাশ করা হল৷

প্রথমেই বলে রাখি, আমি নিরপেক্ষতা অবলম্বন করে সবার সামনে আজ ইতিহাস এবং সত্যটাকে তুলে ধরছি৷ দয়া করে আমায় দেশদ্রোহী বা বেইমানের তকমা দেবেন না৷ আমি আপনার মতোই একজন শিক্ষিত ভারতীয় নাগরিক এবং প্রাণ দিয়ে দেশকে ভালবাসি৷ তবে মূর্খ হয়ে থেকে বা ভয়ের কারণে মুখ বুঁজে থেকে বিবেকের দংশনে ভুগতে চাই না৷ তাই এই নিবন্ধ …

বহুচর্চিত ৩৭০ ধারার মাধ্যমে অনেকেই কাশ্মীরকে জানেন৷ যে ধারা বিলোপ ড : শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর মুখ্য স্বপ্ণ ছিল৷ পরবর্তীকালে ৬–৭ দশক ধরে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ (আরএসএস) রাত দিন ৩৭০ ধারা বিলোপের কথা বলে এসেছে৷ কম বয়সে ছাত্রাবস্থায় স্বল্প জ্ঞানে মনে হত, হয়ত ৩৭০–ই এই দেশের দুর্দশার মূল কারণ৷ বাকি কোনও সমস্যাই ততটা গূঢ় নয়৷ আজ বেশ ভালই বুঝি ৩৭০ হচ্ছে কেবল মাত্র একটি পাশার গুটি আর কিচ্ছু নয়!

…৩৭০ ধারা বহুবার সংশোধনের পরে এমন একটা জায়গায় দাঁড়িয়েছে যেটাকে কপর্দকশূন্য সাবেকি জমিদার গিন্নির গহনার বাক্সের সাথে তুলনা করা যায়৷ যার মধ্যে একটা সময় অনেক মূল্যবান জিনিস ছিল, কিন্তু এখন সব বেরিয়ে গিয়ে শুধু খালি বাক্সটা পড়ে আছে৷ সেটা নিয়েই রাজনীতির পসরা খুলে বসেছে সরকার৷ আর মাদারির ডমরুর তালে অন্ধভক্তি নিয়ে সাথে নেচে চলেছি আমরা ভক্তবৃন্দ৷ কাশ্মীর সমস্যা আর ৩৭০ ধারা নিয়ে বিস্তারিত আলাপ করব৷ তার আগে কিছু জিজ্ঞাসা–

… উগ্রবাদী ছেড়ে দিন গত ৫ বছরে কাশ্মীরে বেশির ভাগ বাচ্চা ছেলে মেয়েরাও নিজেদের হাতে পাথর তুলে নিয়েছে৷ কাশ্মীর ভ্যালিতে কাজকর্ম ব্যবসা সব ডুবে গেছে৷ ভ্যালিতে ৭ লক্ষ সৈন্য মোতায়েন করতে হয়েছে৷ ১০ জন সাধারণ কাশ্মীরি মানুষের পিছনে এক জন্য সৈন্য৷ তাও কিন্তু পরিস্থিতি আয়ত্বের বাইরে৷ কেন এমন হল?…

আমি ২০১০–’১৩ পর্যন্ত, কাশ্মীরের কৃষি কমিটির মেম্বার ছিলাম৷ আমার কাশ্মীরে যাওয়াটা ছিল ডেইলি প্যাসেঞ্জারি করবার মত ব্যাপার৷ আমি তো রাত বিরেতেও শ্রীনগরে ঘুরে বেড়িয়েছি৷ কোথাও তো সে সময় অশান্তি বা গাদা খানেক মিলিটারি ঘুরে বেড়াতে দেখিনি৷ আসলে হাতের উপরে স্থিত ছোট্ট ফোড়া চুলকে গত ৫ বছরে ক্যান্সার সৃষ্টি করে, কোনও আলোচনা ছাড়া এখন আপনারা হাতটাকেই এক ঝটকায় কেটে ফেললেন … হয়ত আপনাদের দ্বারা সম্প্রীতি রক্ষার কাজটি সম্ভব হয়নি, বা রাজনীতির স্বার্থে আপনারা চেয়েই ছিলেন কাশ্মীর উপত্যকার এমন খাস্তা হাল হোক৷…

এবার চলুন ইতিহাসে নজর রাখি

আপনি কি জানেন, ভারত স্বাধীন হওয়ার সময়ে কাশ্মীর ভারতের অঙ্গরাজ্য ছিল না? তাহলে কাশ্মীরের ভারতে অন্তর্ভুক্তি হল কী ভাবে?  কাশ্মীরের রাজা হরি সিং ১৯৪৭ সালে প্রথমে স্থির করেছিলেন তিনি স্বাধীন থাকবেন এবং সেই মোতাবেক ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে স্থিতাবস্থার চুক্তি স্বাক্ষর করবেন৷ পাকিস্তান সে চুক্তিতে স্বাক্ষরও করেছিল৷ কিন্তু জনজাতি এবং সাদা পোশাকের পাক সেনা যখন কাশ্মীরে অনুপ্রবেশ করে, তখন তিনি ভারতের সাহায্য চান, যা শেষপর্যন্ত কাশ্মীরের ভারতভুক্তি ঘটায়৷ ১৯৪৭ সালের ২৬ অক্টোবর হরি সিং ভারতভুক্তির চুক্তি স্বাক্ষর করেন৷ পরদিন, ২৭ অক্টোবর ১৯৪৭, গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যাটেন সে চুক্তি অনুমোদন করেন৷ জেনে নেওয়া যাক, ৩৭০ ধারাটি কী ছিল? আর তার তাৎপর্যই বা কী?…

৩৭০ ধারা সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল ১৯৪৯ সালের ১৭ অক্টোবর৷ এই ধারা বলে ওই রাজ্যে সংসদের ক্ষমতা ১০০ ভাগ কার্যকরী হয় না৷ ভারতভুক্তি সহ কোনও কেন্দ্রীয় আইন বলবৎ রাখার জন্য রাজ্য সরকারের অবশ্যই একমত হওয়া আবশ্যক৷ ১৯৪৭ সালে, ব্রিটিশ ভারতকে ভারত ও পাকিস্তানে বিভাজন করে ভারতীয় সাংবিধানিক আইন কার্যকর হওয়ার সময়কাল থেকেই কোনও প্রিন্সলি স্টেটের ভারতভুক্তির বিষয়টি কার্যকরী হয়৷ ওই আইনে তিনটি সম্ভাবনার কথা রয়েছে– প্রথমত, স্বাধীন দেশ হিসেবে থেকে যাওয়া, দ্বিতীয়ত, ভারতে যোগদান, অথবা পাকিস্তানে যোগদান৷

কী কী শর্তে এক রাষ্ট্রে যোগদান করা হবে, তা রাজ্যগুলি দাবি করে স্থির করতে পারত৷ যেটা জম্মু কাশ্মীরের ক্ষেত্রেও হয়েছে৷ এখানে গা জোয়ারির কোনও ব্যাপার ছিল না৷ অলিখিত চুক্তি ছিল, যোগদানের সময়কালীন প্রতিশ্রুতি রক্ষিত না হলে, দু’পক্ষই নিজেদের পূর্বতন অবস্থানে ফিরে যেতে পারবে৷ আপনারা জানেন কি, অন্যান্য বেশ কিছু রাজ্য এই বিশেষ সুবিধা ভোগ করে সংবিধানের ৩৭১, ৩৭১–এ থেকে ৩৭১–জে ধারাগুলির মাধ্যমে? তাহলে সে সব রাজ্য নিয়ে কেন কোনও উচ্চবাচ্য নেই ? কারণ, ওসব রাজ্যের সাথে ‘পাকিস্তান’ শব্দটা জড়িয়ে নেই যে৷ এদেশে আগেও পাকিস্তানের নামে তিন তিন বার ভোট হয়েছে৷ আপনারা নিজের চোখে দেখেছেন, এই বিগত লোকসভায় পুলওয়ামার দুঃখজনক উগ্রপন্থী আক্রমণ আর নিশানাভ্রষ্ট বালাকোটের উপর ভর করে একটি সরকার ড্যাং ড্যাং করে সিংহাসনে ফিরল৷ অথচ সরকারি তথ্যই বলছে দেশের চাকুরির অবস্থা গত চল্লিশ বছরের তলানিতে, শিল্পের উন্নয়ন থেমে গেছে, গ্রামীণ অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছে৷…         

… পাকিস্তানের নামেই আমরা সবাই ভাবুক হয়ে অতি দেশপ্রেমীর মত আচরণ করি৷ অন্য দেশের বিরুদ্ধে খেলায় অতটা বিদ্বেষ থাকে না৷ কিন্তু পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ক্রিকেট ম্যাচ এদেশে এক একটি মিনি যুদ্ধের রূপ নেয়৷ অবশ্য পাকিস্তানে গিয়েও দেখেছি, ভারত বিদ্বেষ যেন ওদের মজ্জাগত রোগ৷ এই রোগাক্রান্ত অনুভবের ফায়দা লোটে দুটি দেশের রাজনৈতিক দলগুলো৷ তাই কাশ্মীর আর ৩৭০ ধারা গত সাত দশক ধরেই শিরোনামে রয়েছে৷ অথচ ৩৭১ ধারার সুবিধাভোগী রাজ্যেগুলোর নামও হয়ত আমরা সবাই ঠিক করে বলতে পারব না৷ কিছু সত্য জেনে রাখুন৷ …

১. কাশ্মীরের বাইরের লোক কাশ্মীরে জমি কিনতে পারবে না, এই আইন তৈরি হয়েছিল কাশ্মীরি পণ্ডিতদের দাবিতে৷ ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে রাজা হরি সিং এই আইন তৈরি করেন, জওহরলাল নেহেরু নন৷

২. শুধু কাশ্মীর নয় নাগাল্যান্ড মিজোরাম অরুণাচল সিকিম সহ দেশের ১১ টি রাজ্যের স্থায়ী বাসিন্দা ছাড়া বাইরের কেউ জমি কিনতে পারেন না৷

৩. পশ্চিমবঙ্গ সহ সারা দেশেই আদিবাসীদের জমি কেনা যায় না৷

৪. সিকিমের অভ্যন্তরীণ কিছু আইনেও ভারতের সুপ্রিম কোর্ট হস্তক্ষেপ করতে পারে না৷ সিকিমে ভারতীয় রাষ্ট্রপতি স্রেফ নথিভুক্ত কিছু ব্যাপারেই নাক গলাতে পারেন৷ বাকি সব ব্যাপারে ওরা সার্বভৌম রাজ্য৷ 

৫. জেনে রাখুন, বিশেষ সুবিধাভোগী রাজ্যগুলিকে সুবিধা দেওয়া হয় বিশেষ বিশেষ কারণে৷ সেটা দেশ চালাবার একটা স্ট্র্যাটেজি৷ দেশের অখণ্ডতা ধরে রাখতে এবং জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে, সেগুলো আমি এখানে লিখতে চাই না৷

৬. কর্ণাটক রাজ্যের নিজের পতাকা আছে৷ ওরা অলিখিত ভাবে স্কুল কলেজ পঞ্চায়েত অফিস সর্বত্রই ওদের লাল হলুদ পতাকা উত্তোলন করে৷ নিজেদের পতাকাকে অফিসিয়াল করবার জন্য ২০১৭ সালে সর্বসম্মতিক্রমে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে৷

আপনি কি মোদি সরকারের ৩ আগস্ট, ২০১৫–র নাগাল্যান্ড চুক্তি সম্পর্কে অবগত? না হলে প্লিজ জেনে নিন, স্বাক্ষরিত এই চুক্তিতে কী কী পয়েন্ট আছে–১. পৃথক নাগা আইন, ২. পৃথক নাগা পতাকা, ৩. নাগা মুদ্রার ব্যবহার, ৪. শুধু নাগারাই রাজ্যে সরকারি চাকুরির যোগ্য৷ অধ্যাপক শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী স্যার, নাগাল্যান্ড চুক্তির বর্ণনা শুনেও কি আপনি স্বর্গে এখনও শান্তিতেই শুয়ে আছেন? এখনও কি আপনার মনে ৩৭০–এর বিদ্বেষ আপনাকে কুরে কুরে খায়?

অধ্যাপক শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী স্যার, ৭০ বছর আগে সংসদে যখন ৩৭০ ধারার বিল সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়, আপনি তো দেশের শিল্পমন্ত্রী ছিলেন৷ তাহলে তখন কেন সেই বিলের বিরোধিতা করেননি? কারণ তখনও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আশাটা হয়ত কিছুটা হলেও বেঁচে ছিল আমি এটাও জানি, আমার এই লেখাটি প্রকাশিত হলেই আজ উইকিপিডিয়াতে আপনার প্রোফাইলে কিছু পরিবর্তন আসবে৷ কিন্তু সংসদের নথি ভুল বলে না স্যার, আপনি ৩৭০–এর বিরুদ্ধে  সংসদের বিতর্কে সে সময় একটি কথাও সেদিন বলেননি, সেটাই কিন্তু লেখা আছে!

নাহ, আপনার মত বিদ্বান মানুষ নিশ্চয় ভালই জানতেন যে ছোট ছোট প্রিন্সলি স্টেটগুলোকে ভারতে অন্তর্ভুক্তির প্রচেষ্টায়, ৩৭০–এর মতো এই দেশের কয়েকটি রাজ্যে ৩৭১ ধারাও আসতে শুরু করেছে৷ আসলে ৩৭০ ধারা–বিদ্বেষ কেবলমাত্র হিন্দুদের একত্রিত করবার একটি প্ল্যাটফর্ম মাত্র, যা ৩৭১ দিয়ে সম্ভব নয়!

অধ্যাপক শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী স্যার শুনে রাখুন, … প্রচারপ্রেমী আপনিও কিন্তু আপনার আজকের শিষ্যদের থেকে ব্যতিক্রম ছিলেন না৷ সারা দেশকে কাশ্মীর আর বিশেষ করে কাশ্মীরি মুসলমান বিদ্বেষী করে তোলার সুনিপুণ কর্মের সূত্রপাত আপনারই হাত দিয়ে৷ সেটাই খুব দুঃখের ব্যাপার৷

…মনে রাখা খুব দরকার,  আরএসএস কিন্তু এদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের অংশীদার হয়নি৷ ওরা বসে বসে মজা নিয়েছে৷ আমার জ্ঞান বর্ধনের জন্য, পারলে একজন শহিদের নাম বলবেন তো, যিনি আরএসএসের ছত্রছায়ায় স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রাণ দিয়েছেন…             

…আমি মনে করি– জম্মু কাশ্মীরকে ভারতবর্ষে সংযুক্তিকরণের যে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট রয়েছে, এবং বর্তমানে কাশ্মীরকে ঘিরে যে পরিস্থিতি, তার নিরিখে বলা যেতে পারে কাশ্মীরকে টুকরো করে কেন্দ্রীয় শাসিত অঞ্চল তৈরির সিদ্ধান্ত দেশ এবং দশের স্বার্থে নয়৷ সংবিধানের ৩৭০ ধারার উপরে খাঁড়ার ঘা হেনে বহুলাংশে বিলুপ্তি ঘটানোর মধ্যে দিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার কোনও তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দেয়নি৷ এটা একটা আধমরা বাঘকে মেরে তার সাথে সেলফি নেওয়ার মতো তুচ্ছ ব্যাপার ছাড়া কিছুই নয়৷ এর আগেই ৩৭০ ধারার নানাবিধ ব্যবস্থাদি আইন সম্মতভাবে দীর্ঘ সময় ধরে লঘু করা হয়েছে৷ কিন্তু সার্বিক ভাবে জম্মু–কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসনের প্রেক্ষাপটে তাদের যে বিশেষ মর্যাদা ছিল সেটাকে খর্ব করে বা সেটাকে নিশ্চিহ্ণ করে বর্তমান ঘোষণা শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক পদক্ষেপ৷ সরকারের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বিজেপির রাজনৈতিক লাভ হয়ত হতে পারে, কিন্তু ভারতবর্ষের আন্তর্জাতিক অবস্থানকে এটা মজবুত করবে না৷ জম্মু–কাশ্মীরের স্পেশাল স্ট্যাটাসকে শেষ করার মধ্যে দিয়ে ভোট বৃদ্ধির লক্ষ্য পূরণ হতে পারে৷ কিন্তু কোনওভাবেই ভারতবর্ষের জাতীয় সংহতিকে মজবুত করার কোনও প্রচেষ্টা কিন্তু দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না৷ সরকারের ভুলে এবার বেড়াল ঝুলি থেকে বেরিয়েই এলো৷ এখন ৩৭১ এর সুবিধে গুলো সবাই জানবে, এবং ধীরে ধীরে দেশে ৩৭১–এর সুবিধাভোগী রাজ্যগুলির বিরুদ্ধেও ক্রোধানল বাড়বে৷ উত্তরপূর্ব ভারতীয় রাজ্যগুলি থেকে আসা লোকেদের উপরে আঘাত বাড়বার যথেষ্টই সম্ভাবনা আছে৷ সার্বিক ভাবে বলতে গেলে কেন্দ্রীয় সরকারের ঘোষণা বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেলিত করবে এবং যে অগণতান্ত্রিক অসংসদীয় পদ্ধতিতে এই গোটা প্রক্রিয়াটি কার্যত বলপূর্বক চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা হল সেটার ফল হিতে বিপরীত হতেই পারে৷

…অবশ্য সাময়িক ভোটের রাজনীতির কথা ভাবলে, এই মাথামোটা পদক্ষেপের চেয়ে ভাল আর কিছু হতেই পারে না৷ বিশ্বের নজরে আজ ভারতের অঙ্গরাজ্য কাশ্মীরকে অনর্থক একটি মিলিটারি অকুপায়েড টেরিটোরিতে পরিণত করা হল৷ যেটার আপাতত কোনওই দরকার ছিল না৷… ভারত গণরাজ্য থেকে কাশ্মীরকে বের করে আনতে দীর্ঘদিন ধরে যে চেষ্টা হিজবুল, লস্কর বিচ্ছিন্নতাবাদীরা করে আসছিলেন, সংবিধানগত ভাবে দেশ থেকে কাশ্মীরকে এক ঝটকায় কোণঠাসা করে তাদেরই সাহায্য করল এই সরকার৷ কাশ্মীরের জনগণকে মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনা মনে হয় না আর সম্ভব৷ … যে এলাকা এতটা সেনসিটিভ, তার দায়িত্ব নাকি থাকবে ঠুনকো, পঙ্গু, ক্ষমতাহীন বিধানসভা আর এক লেফটেন্যান্ট গভর্নরের হাতে৷ মানে, রাজ্যপালের পদটাও উবে গেছে …চোখের সামনে আজ আরো একটি প্যালেস্টাইন সৃষ্টি হল বলেই মনে হয়৷ যার সুদূর প্রসারী কুফল এদেশের বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম না ভুগলেই ভাল৷

মনে রাখতে হবে সরকারের এই আকস্মিক পদক্ষেপ জম্মু–কাশ্মীর সংযুক্তিকরণের ঘোষণাপত্র ‘ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাকসেশন’–এর সম্পূর্ণভাবে পরিপন্থী৷ সরকারের পদক্ষেপ শুধুমাত্র ঐতিহাসিক দিক দিয়ে ভুল তাই নয়, রাজনৈতিক দিক দিয়েও বিভ্রান্তিমূলক৷ জম্মু–কাশ্মীর ভারতবর্ষের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ৷ গা জোয়ারি না করে, অন্যান্য বিভিন্ন রাজ্যের জন্য সংবিধানের ৩৭১ ধারায় যে সমস্ত ব্যবস্থাদি রয়েছে সেই ব্যবস্থাদির নিরিখেই ৩৭০ ধারার প্রয়োজনীয়তার জায়গাটি দেখা যেতে পারত বা এখনও দেখতে পারা যায়৷ কাল সকালে উঠে এটা শুনলেও আশ্চর্য হবেন না, যদি রাতারাতি জম্মুর নাম যমুনা নগর, কাশ্মীরের নাম কাশিপুরম, আর লাদাখের নাম লক্ষণপুর করে দেওয়া হয়৷ কিন্তু আমার মূল শঙ্কাটা অন্যখানে–

১. যে ভাবে সংসদে আলোচনা ছাড়াই সকাল ১১ টায় সীমিত শব্দে সরকারের পদক্ষেপের তথ্য দিয়েই দায় সারা হয়, সংবিধান বা সংসদের আর কিছু গরিমা রইল কি?

২. সংসদে ঘোষণার ১ ঘন্টার মধ্যেই মহামহিম রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর সহ নোটিশ লোকের হাতে পৌঁছায়৷ ভয় হয়, রাষ্ট্রপতি কার্যালয় আর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কিছু আর তফাৎ বাকি আছে কি না৷

৩. ভয় হয়, আরএসএসের অতীতেও তিরঙ্গা জাতীয় পতাকা অবমাননার ইতিহাস আছে৷ কে জানে, সংবিধানের গরিমা নষ্ট করাও একটা স্ট্র্যাটেজি কি না হয়ত আজ থেকেই তার সূত্রপাত হল৷

৪. কাল এভাবেই কি অন্য রাজ্যের উপরে খাঁডার ঘা নেমে আসতে পারে? খুব আশ্চর্য হব না, যদি একদিন সকালে উঠে শুনতে পাই, বাংলা ভেঙে দু’ভাগ হয়েছে, আজ থেকে দার্জিলিং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল বলে পরিগণিত হল, এমন একটা খবর মিডিয়াতে উঠে আসে এ দেশ সেকুলারিজম বিসর্জন দিয়ে যে ধীরে ধীরে হিন্দুরাষ্ট্র  হতে যাচ্ছে, সেটা মূর্খেও বোঝে৷ সুপ্রিম কোর্টকে কাঁচকলা দেখিয়ে যে এ বছরের মধ্যেই রাম মন্দিরের নামে অধ্যাদেশ আসবে, সেটাও সবার জানা৷ আন্তর্জাতিক স্তরে ধর্মীয় রাষ্ট্রগুলো বিকাশের যুগে অনেক পিছিয়ে পড়ছে জেনেও আমরা আমাদের সুপ্ত হিন্দুত্বের অ্যাজেন্ডা থেকে এক চুলও সরব না৷ গোল্লায় যাক দেশটা, যাক না৷

পরিশেষে, মনে রাখবেন ১৯৮৪ এর নির্বাচনে কংগ্রেস ৪০৭ টি সিট পেয়েও ১৯৮৯ তে ধসে গেছিল অরুণ নেহেরুর মতো ক্ষমতালোভীর বাডবাড়ন্তের কারণে৷ খুব কাছ থেকে জানার সুবাদে, আমি অরুণ নেহেরুর চেহারা, ক্রুরতা, অহংকার আর ক্ষমতালিপ্সার সাথে আজকের দিনে কার যেন ভীষণ মিল খুঁজে পাই! গণতন্ত্রের মার থেকে আজ পর্যন্ত কেউ পার পায়নি! বাকিটা ভবিষ্যৎ বলবে৷

(গণদাবী : ৭২ বর্ষ ৩ সংখ্যা)