Breaking News
Home / খবর / কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষা আত্মস্থ করার দ্বারাই কমরেড দেবপ্রসাদ সরকার জনগণের শ্রদ্ধেয় নেতায় পরিণত হয়েছিলেন — স্মরণসভায় কমরেড প্রভাস ঘোষ

কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষা আত্মস্থ করার দ্বারাই কমরেড দেবপ্রসাদ সরকার জনগণের শ্রদ্ধেয় নেতায় পরিণত হয়েছিলেন — স্মরণসভায় কমরেড প্রভাস ঘোষ

এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট)-এর পলিটবুরো সদস্য, জয়নগরের সাত বারের বিধায়ক, বিশিষ্ট জননেতা কমরেড দেবপ্রসাদ সরকার গত ২৮ জুন শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ১১ জুলাই দক্ষিণ ২৪ পরগণার জয়নগরে শচীন ব্যানার্জী-সুবোধ ব্যানার্জী স্মৃতি ময়দানে তাঁর স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভাপতিত্ব করেন দলের প্রবীণ নেতা কমরেড রবীন মণ্ডল। প্রধান বক্তা ছিলেন সাধারণ সম্পাদক কমরেড প্রভাস ঘোষ। তাঁর ভাষণটি প্রকাশ করা হল।

 

জয়নগরে এইভাবে আসতে হবে, আমি ভাবিনি। গত ২৫ এপ্রিল কমরেড দেবপ্রসাদ সরকার আমার সাথে ফোনে কথা বলেছিলেন। আমাকে বললেন, ২৪ এপ্রিল আপনি এই বয়সে এত রোদে এতক্ষণ কেন বললেন। তারপর বললেন, অবশ্য বলার দরকার ছিল। আমি বললাম, আপনার সাথে তো অনেকদিন দেখা হয়নি। বললেন, একদিন আসুন। সেই আমি এলাম, আজকের এই স্মরণসভায়। এটা খুবই দুঃখ এবং বেদনার। আমাদের দলের প্রত্যেক নেতা এবং কর্মী সকলকেই আমরা দলের মূল্যবান সম্পদ হিসাবে গণ্য করি। বিশেষভাবে যখন কোনও বড় নেতাকে আমরা হারাই সেটা দলের একটা বিরাট ক্ষতি। সে যাই হোক, অনিবার্য মৃত্যু মানতেই হবে। কমরেড দেবপ্রসাদ সরকারের জীবনের সংগ্রাম এবং কীভাবে কঠিন কঠোর সংগ্রাম চালিয়ে তিনি জনপ্রিয়তার, জনগণের শ্রদ্ধার এমন শীর্ষস্থানে পৌঁছতে পেরেছিলেন, সেটা অনেকের কাছেই বিস্ময়কর লাগবে। আপনারা অনেকেই জানেন না, হয়তো এই শহরের বা আশপাশের আমার বয়সী কেউ যদি এই মিটিংয়ে থাকেন, তাঁরা স্মরণ করবেন প্রথম জীবনে তিনি একজন শান্ত, ধীরস্থির, নিরীহ, মৃদুভাষী, স্বল্পবাক মানুষ এবং আদর্শ শিক্ষক ছিলেন। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনও কথা তিনি ঘরেও বলতেন না, বাইরেও না। মেলামেশাও তেমন করতেন না।

কিন্তু এলাকার মানুষ ছাত্র, শিক্ষক, অভিভাবক তাঁকে খুবই শ্রদ্ধার চোখে দেখত। সেই মানুষটি কী সংগ্রাম করে কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষাকে জীবনে আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করে সমাজ পরিবর্তনের মহান ব্রতে আত্মনিয়োগ করে এই ধরনের ক্ষমতার অধিকারী হতে পেরেছিলেন! এটা অবশ্যই বুঝতে হবে।

 

ক্ষমতা, যোগ্যতা সঠিক সংগ্রামের ফল

অনেকে ভাবে আমার দ্বারা হবে না, আমার পক্ষে সম্ভব নয়– এরকম করে নিজেরা নিজেদের উদ্যোগকে খর্ব করে। ক্ষমতা, যোগ্যতা, প্রতিভা আপনা-আপনি হয় না। এটা অর্জন করতে হয়। এটা একটা সংগ্রামের ফল। আবার যে কোনও সংগ্রামের দ্বারাও হয় না। একটা মহৎ আদর্শ, একটা সঠিক বিপ্লবী আদর্শ, সংগ্রামী আদর্শকে জীবনে পাথেয় হিসাবে গ্রহণ করে বিরামহীন সংগ্রাম চালিয়ে সমস্ত ক্ষেত্রে আপসহীনতা বজায় রেখে ক্রমাগত এগিয়ে চললেই তা অর্জন করা সম্ভব। যদিও আমি জানি, উনি, আমি বা আমার বয়সী যাঁরা, আমাদের শৈশব, কৈশোর, যৌবনের শুরুতে ভারতবর্ষের আর একটা সময় ছিল, আর একটা যুগ আমরা দেখেছি। যে যুগ এখন বিস্মৃতির অতলে চলে গেছে। আমার বয়সী অনেকেই ঘরে ঘরে তখন সেই যুগের কিছু সম্পদ অর্জন করতে পেরেছিল। যে যুগে ঘরে ঘরে মায়েদের অশ্রুসজল কণ্ঠে ছিল ক্ষুদিরামের আত্মাহুতির গান, সেই যুগে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাড়িতে প্রাতঃস্মরণীয় হিসাবে ছিলেন রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, সুভাষচন্দ্র, দেশবন্ধু, শরৎচন্দ্র, নজরুল– এইসব মনীষীরা। স্কুলের শিক্ষকরা অনেকে স্বদেশি আন্দোলনের সৈনিক ছিলেন। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে তাঁরা ছাত্রদের সেই সংগ্রামের কথা বলতেন। সেই যুগে শহরে বা গ্রামে যে কোনও পাড়ায় বয়স্ক লোক মাত্রেই ছোটদের স্থানীয় অভিভাবক ছিলেন। ছোটরাও তাঁদের মান্য করত। সেই যুগে পরিবার ভাঙব, বৃদ্ধ বাবা-মাকে দেখব না, গরিব ভাইবোনকে দেখব না, গরিব আত্মীয়স্বজনকে দেখব না, এ কথা কেউ ভাবতেই পারত না। এই রকম একটা যুগেই আমাদের শৈশব, কৈশোর। কমরেড দেবপ্রসাদ সরকারও সেই যুগেরই ফসল।

কমরেড শিবদাস ঘোষ একটা কথা বলতেন, সর্বহারা বিপ্লবী চরিত্র অর্জন করতে হলে আগে মানবতাবাদী মূল্যবোধ অর্জন করতে হবে। বলতেন, স্বদেশি আন্দোলনের যুগের, নবজাগরণের অধ্যায়ের মহান চরিত্র, বিপ্লবী যোদ্ধা, বিপ্লবী সৈনিকদের চরিত্রের থেকে গ্রহণ করো। এঁদের থেকে শেখো। এখান থেকে যাত্রা শুরু করো। তারপর লড়াই করতে করতে মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ অধ্যয়ন ও জীবনে প্রয়োগ করতে করতে, শ্রমিক-কৃষকের সংগ্রাম গড়ে তুলতে তুলতে সর্বহারা উন্নত সংস্কৃতি ও চরিত্র অর্জন করতে হবে। কমরেড দেবপ্রসাদ সরকারের সূচনা স্বদেশি আন্দোলন যুগের শেষ অধ্যায়ে এই মানবতাবাদী মূল্যবোধকে ভিত্তি করে।

দ্বিতীয়ত আরও একটি জিনিসও আমি এখানে উল্লেখ করতে চাই। এই জয়নগর শহরেরই রূপ-অরূপ হলে এস ইউ সি আই দলের প্রথম কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয়। তখন এটা একটা ভাঙাচোরা হল ছিল, এখন উন্নত হয়েছে। আজ ভারতের ২৩টি রাজ্যে কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষার ভিত্তিতে বিপ্লবী যোদ্ধারা বিপ্লবের ঝাণ্ডা বহন করছে, সংগ্রাম করছে। সেদিন ছিল শুধু মুষ্টিমেয় কয়েক জন। এর প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন এই শহরেরই বাসিন্দা প্রথমে যুগান্তর দলের বিপ্লবী ধারার সৈনিক, পরবর্তীকালে কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ কমরেড শচীন ব্যানার্জী। কমরেড শচীন ব্যানার্জী এই শহরে নানা ক্লাব, সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছেন। বিপ্লবী মন্ত্রে অনেক যুবককে তিনি অনুপ্রাণিত করেছিলেন। কিছুদিন পরেই তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন আর একজন বিপ্লবী সংগঠক কমরেড সুবোধ ব্যানার্জী। এই শহরে বিভিন্ন পাড়ায় যুবকদের মধ্যে কমরেড শচীন ব্যানার্জী-কমরেড সুবোধ ব্যানার্জীর যে প্রভাব সৃষ্টি হয়েছিল তাতে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন বিশেষভাবে কমরেড দেবপ্রসাদ সরকারের বড় দাদা কমরেড প্রফুল্ল সরকার। তাঁকে তিনি পিতৃতুল্য সম্মান করতেন, আমরাও তাঁকে সম্মান করি। তিনি কমরেড শচীন ব্যানার্জীর প্রায় দক্ষিণ হস্তের মতো ছিলেন। আর একজন ছিলেন কমরেড সুধীর ব্যানার্জী। কমরেড প্রফুল্ল সরকারের বাড়িতে কমরেড শচীন ব্যানার্জী, কমরেড সুবোধ ব্যানার্জীর যাতায়াত, পরবর্তীকালে কমরেড শিবদাস ঘোষের যাতায়াত, অবস্থান, আলোচনা– এগুলি কমরেড দেবপ্রসাদ সরকারের চিন্তাজগতে প্রভাব ফেলছিল ধীরে ধীরে। তিনি ধীরে ধীরে দলের সাথে যুক্ত হতে থাকেন। কমরেড ইয়াকুব পৈলানেরও এখানে একটা ভূমিকা আছে। পৈলান সাহেব প্রথাগত পড়াশোনার খুব সুযোগ পাননি। তিনি দেবপ্রসাদ সরকারকে শিক্ষক হিসাবে নিলেন পার্টির ইংরেজি বই, ইংরেজি মুখপত্র বাংলায় পড়ে শোনানোর জন্য। এ ভাবেই কমরেড পৈলান সাহেবের সাথে কমরেড দেবপ্রসাদ সরকারের ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। এরপরে ধীরে ধীরে তিনি সক্রিয় কর্মী হিসাবে গড়ে উঠতে থাকেন। তারপরে শিক্ষক আন্দোলনে যুক্ত হন। আপনারা শুনেছেন তিনি শিক্ষক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন।

 

আমরা নির্বাচনে অংশ নিই কেন

আপনারা জানেন আমাদের দল বিপ্লবী দল। আমরা বিশ্বাস করি এবং জনগণকেও বলিষ্ঠ কণ্ঠে বলি, ভোটের দ্বারা, নির্বাচনের দ্বারা যারাই ক্ষমতায় আসুক, এমনকি আমরাও যদি ক্ষমতায় যাই, শোষণ-অত্যাচার-নির্যাতন বন্ধ করা যাবে না– যতক্ষণ শোষণমূলক পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে এবং পুঁজিবাদী রাষ্ট্রকে বিপ্লবের দ্বারা উৎখাত করা সম্ভব না হচ্ছে। এই কথা সবসময়ই আমরা বলি। তা সত্ত্বেও আমরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করি। এটা মার্কসবাদের শিক্ষা, মহান লেনিনের শিক্ষা। তার উদ্দেশ্য হচ্ছে, যতক্ষণ বিধানসভা, লোকসভা সম্পর্কে, নির্বাচন সম্পর্কে মানুষের মোহ থাকে, যতক্ষণ মানুষ ইচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায় হোক নির্বাচনের জালে জড়িয়ে যায়, সেই মানুষগুলির সাথে থাকা, সেই মানুষগুলির কাছে এই বক্তব্য পৌঁছে দেওয়া। আমরা নির্বাচনে অংশ নিই এটা বোঝাতে যে ভোটের দ্বারা হবে না, বিপ্লবই একমাত্র পথ। আর নির্বাচনে যদি জয়যুক্ত হই, আমাদের প্রতিনিধি বিধানসভায় হোক, লোকসভায় হোক, সেখানে দাঁড়িয়ে শ্রমিক-কৃষক-অত্যাচারিত মানুষের প্রতিনিধি হিসাবে বলিষ্ঠ ভূমিকা নেয়। সরকার বুর্জোয়া শ্রেণির স্বার্থে মালিকশ্রেণির স্বার্থে একটার পর একটা আইন প্রণয়ন করলে তার বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ প্রতিবাদ জ্ঞাপন করে এবং তার মুখোশ খুলে দেয়। দেখিয়ে দেয় এই বিধানসভার দ্বারা, এই লোকসভার দ্বারা, এই সরকারের দ্বারা জনজীবনের সমস্যার সমাধান হবে না। এটা চোখে আঙূল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার জন্যই আমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি, লোকসভায়, বিধানসভায় যদি জয়যুক্ত হতে পারে, এই ভূমিকা পালন করে। আবার বাইরে আমরা একটার পর একটা শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্তের আন্দোলন গড়ে তুলি। এটা চলবে ততদিন, যতদিন না মানুষ নির্বাচনকে বর্জন করে বিপ্লবী অভ্যুত্থানের জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন।

বিধানসভায় আমাদের দলের প্রথম প্রতিনিধি ছিলেন কমরেড সুবোধ ব্যানার্জী। আপনারা অনেকেই তাঁকে দেখেননি, নাম শুনেছেন, কেউ কেউ হয়তো দেখেছেন। কমরেড সুবোধ ব্যানার্জীই ভারতবর্ষের রাজনীতিতে একমাত্র শ্রমিক আন্দোলনের বিপ্লবী প্রতিনিধি যিনি কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষার ভিত্তিতে বলিষ্ঠভাবে বিধানসভায় লড়াই করে গেছেন সম্পূর্ণ একক ভাবে ১৯৫২ সাল থেকে প্রায় ‘৬৬ সাল পর্যন্ত। তার প্রভাব শুধু পশ্চিমবাংলায় নয়, পশ্চিমবাংলার বাইরেও পড়েছিল। এ-ও অনেকের স্মরণে আছে ‘৬৭ সালে ‘৬৯ সালে দু’বার যুক্তফ্রন্ট সরকার হয়। আমরা সেই সরকারের অংশীদার ছিলাম। সেখানে এক দিকে সিপিএম, সিপিআই, আরএসপি, ফরওয়ার্ড ব্লক, বাংলা কংগ্রেস– তারা বুর্জোয়া শ্রেণির স্বার্থে সরকার পরিচালিত করছিল, আর আমরা অন্য দিকে শ্রমিক-কৃষকের স্বার্থে সরকার পরিচালনার জন্য সংগ্রাম করছিলাম। এই নিয়ে বিরাট মতপার্থক্য হয়, বিতর্ক হয়। আমাদের প্রতিনিধি হিসাবে কমরেড সুবোধ ব্যানার্জী কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষার ভিত্তিতে বলিষ্ঠ কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, যুক্তফ্রন্ট সরকার শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনের উপরে পুলিশি হামলা করতে দেবে না। এতে ভারতবর্ষের পুঁজিপতি শ্রেণি আতঙ্কিত হয়, চাপ দেয় এস ইউ সি আই-কে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দিতে হবে, কমরেড সুবোধ ব্যানার্জীকে বাদ দিতে হবে। বুর্জোয়া শ্রেণির চাপে সিপিএম, সিপিআই, বাংলা কংগ্রেস ‘৬৯ সালে সুবোধ ব্যানার্জীকে শ্রমদপ্তর থেকে সরিয়ে দেয়। কিন্তু আমাদের লড়াই অব্যাহত থাকে। তার পরে বুর্জোয়া শ্রেণির চাপেই সিপিএম আমাদের সাথে ঐক্য ভেঙে দেয়। ‘৭৭ সাল থেকে তাদের একটানা শাসন চলে। তাদের বিরুদ্ধে আমাদের একটানা আন্দোলনও চলে। আমাদের আন্দোলনের বিরুদ্ধে সিপিএম-এর পুলিশ বাহিনী ও গুণ্ডাবাহিনী যৌথভাবে একটানা নৃশংস আক্রমণ, নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। আমাদের কয়েক শত নেতাকর্মীকে খুন করেছে সিপিএম সরকার। এর আগে কংগ্রেসও করেছিল, সিপিএমও করেছে। এই কিছুদিন আগে তৃণমূলও আমাদের এক নেতাকে মৈপীঠে হত্যা করেছে। এর একমাত্র কারণ এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট) এদের সকলের কাছেই বিপজ্জনক। এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট) হচ্ছে শ্রমিক শ্রেণির প্রতিনিধি, শোষিত জনগণের প্রতিনিধি, লড়াইয়ের দল। তাই এর দ্বারা তারা আমাদের দলের অগ্রগতি রুখতে পারেনি।

বিধানসভায় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল

১৯৭৪ সালে কমরেড সুবোধ ব্যানার্জীর মৃত্যুতে আমাদের সামনে সমস্যা হাজির হয়– জয়নগর কেন্দ্রে কাকে ভোটে প্রার্থী করা হবে। কিছু নাম আসে। আমরা অফিসে আলোচনা করি। এমন সময় কমরেড শিবদাস ঘোষ বৈঠকে ঢোকেন। তিনিই কমরেড দেবপ্রসাদ সরকারের নাম প্রার্থী হিসাবে প্রস্তাব করেন। সবাই চমকে ওঠে। তিনি বললেন, হ্যাঁ, দেবপ্রসাদ সরকারই যোগ্যতম প্রার্থী হবেন এখানে। মহান মার্ক্সবাদী চিন্তানায়ক কমরেড শিবদাস ঘোষ মানুষ চেনার অদ্বিতীয় জহুরি ছিলেন। তখন পার্টি এই সিদ্ধান্ত নেয়। নির্বাচনের আগে কমরেড শচীন ব্যানার্জী কমরেড দেবপ্রসাদ সরকারকে ডেকে পাঠান। প্রস্তাব করেন, তুমি নির্বাচনে দাঁড়াবে। কমরেড দেবপ্রসাদ সরকার চমকে ওঠেন, বলেন, আপনি কোন যুক্তিতে আমার নাম করছেন। আমি কি এই পদের যোগ্য? আমি কি পারব? কমরেড শচীন ব্যানার্জী বলেন, তোমার নাম কে প্রস্তাব করেছেন জানো? কমরেড শিবদাস ঘোষ। কমরেড দেবপ্রসাদ সরকার আর কোনও উত্তর দিলেন না। তিনি জানলেন যে, এটা কমরেড শিবদাস ঘোষের সিদ্ধান্ত। এরপরে শুরু হল তাঁর এক কঠিন কঠোর সংগ্রাম। বিধানসভায় তাঁকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার মতো কেউ ছিল না সেই সময়। আইনকানুন, নিয়ম জানার সুযোগও তাঁর ছিল না। তিনি নির্বাচিত হওয়ার পরে দিনের পর দিন বিভিন্ন বই সংগ্রহ করে পড়তে শুরু করলেন। জনগণও তাঁকে নির্বাচিত করেছিল এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট) পার্টির প্রতি আস্থা রেখেই। তখনও জয়নগর কেন্দ্রের গ্রামে গ্রামে কমরেড দেবপ্রসাদ সরকার ব্যাপকভাবে পরিচিত ছিলেন না। পার্টির প্রতি মানুষের আস্থা আর যেখানেই গেছেন, তাঁকে দেখে সকলেই মুগ্ধ হয়েছেন– অত্যন্ত সরল, স্বচ্ছ, সর্বপ্রকার কলুষতামুক্ত, সততার জীবন্ত প্রতীক একটা শুভ্র মূর্তি যেন দাঁড়িয়ে আছেন। যাকে দেখলেই মানুষের মনে ভক্তি জাগে, শ্রদ্ধা জাগে, বিশ্বাস আসে। উনি যে খুব জ্বালাময়ী ভাষণ দিতেন তা নয়। অল্প কথায় বত্তৃতা দিতেন, কিন্তু সেই কথার মধ্যে যুক্তি ও আবেদনের শক্তি এমন থাকত যার প্রভাব মানুষের অন্তরকে স্পর্শ করত। বিধানসভায় তিনি আর কমরেড প্রবোধ পুরকাইত ছিলেন। তিনি দলের নেতা হিসাবে কাজ করতেন। কিছুদিন বাদে কমরেড প্রবোধ পুরকাইতকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে কারারুদ্ধ করানো হল। এগুলি আপনারা জানেন। আমাদের দলের প্রথমে দু’জন পরে একজন প্রতিনিধি হয়ে যায়। বিধানসভায় দলীয় প্রতিনিধির সংখ্যার হিসাবে বলার সময় নির্দিষ্ট থাকে। ফলে আমাদের বিধায়ক এক মিনিট, দেড় মিনিট, দু’মিনিট সময় পেতেন। তাও অনেক কষ্ট করে আদায় করতে হত। সরকার পক্ষে তখন সিপিএম, বিরোধী পক্ষে কংগ্রেস, তৃণমূল। সবাই আমাদের বিরোধী। তার মধ্যে একক কণ্ঠে এক দেড় মিনিটের মধ্যে মার্ক্সবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচারবিশ্লেষণ করে সরকারের পুঁজিপতি শ্রেণিস্বার্থবাহী যে বিল, আইন, তার মুখোশ খুলে দেওয়া– এই কঠিন কাজটা তিনি করতেন। অন্যরা হই-হট্টগোল করত, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করত। কিন্তু এ সবে কোনও ভ্রূক্ষেপ না করে পাল্টা কোনও কটূক্তি না করে অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে নিজের বক্তব্য রাখতেন। এখন বিধানসভার চেহারা কী আপনারা মাঝেমাঝে খবরের কাগজে পড়েন। বিধানসভার এই চেহারা কমরেড সুবোধ ব্যানার্জী দেখে যাননি। পরবর্তীকালে বিধানসভার অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে– কুৎসিত গালাগালি, নোংরা উক্তি, হাতাহাতি, মারামারি, কদর্যতা, কলুষতায় অন্ধকারাচ্ছন্ন অবস্থা। এই অন্ধকারাচ্ছন্ন বিধানসভার মধ্যে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-শিবদাস ঘোষের চিন্তাধারার ভিত্তিতে অনুপ্রাণিত সর্বহারা সংস্কৃতির প্রজ্জ্বলিত শিখায় আলোকিত কমরেড দেবপ্রসাদ সরকার ছিলেন এক উজ্জ্বল তারকা।

 

সাংবাদিকদের চোখে

আপনারা কেউ কেউ জানেন, তাঁর মৃত্যুর পরে বেশ কয়েকজন সাংবাদিক সোসাল মিডিয়াতে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ অবসরপ্রাপ্ত, কেউ এখনও কর্মরত। এঁদের আমরা কেউ লিখতে বলিনি। আমরা জানতামও না তাঁদের বক্তব্য সোসাল মিডিয়াতে প্রকাশিত হয়েছে। জানার পর সেগুলো সংগ্রহ করে আমাদের সাপ্তাহিক মুখপত্র ‘গণদাবী’তে কয়েকটা প্রকাশিত হয়েছে। কী গভীর শ্রদ্ধা! বোঝা যায় এই সাংবাদিকদের বিবেকের দংশন ছিল। কারণ তাঁরা বিধানসভার ভেতরে-বাইরে কমরেড দেবপ্রসাদ সরকারকে দেখেছেন, চিনেছেন, লড়তে দেখেছেন। কিন্তু তাঁরা যা রিপোর্ট করতেন, মালিকরা তা ছাপতে দিত না। আপনারা তো জানেন, আমরা লক্ষ লক্ষ লোকের মিটিং মিছিল করলেও সংবাদপত্রে তার কোনও খবর বা ছবি থাকে না। কারণ এই দল মালিকদের শত্রু। এই সংবাদপত্রগুলি টাটা-বিড়লা-আম্বানি-আদানিদের প্রতিনিধি। যে সব দল মালিক শ্রেণির সেবাদাসত্ব করে, মালিকদের পরিচালিত সংবাদমাধ্যম সেই সব দলের নেতার নামেই প্রচার করে, সেই সব দলের কথাই প্রচার করে। তারা একশো লোকের মিটিং করলেও হাজার লোকের মিটিং বলে দেখায়। আর আমরা দশ হাজার লোকের মিটিং করলেও টিভি-খবরের কাগজে স্থান পাই না। এই সাংবাদিকদের মধ্যেও এ নিয়ে মানসিক কষ্ট, যন্ত্রণা আছে। তাই তাঁরা স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে এগুলি লিখেছেন। কেউ কেউ লিখেছেন দেবপ্রসাদ সরকার একা, কিন্তু তিনি একা ছিলেন না। তিনি একশো লোকের সমান ছিলেন। একশো লোকের বলিষ্ঠ শক্তি নিয়ে দাঁড়াতেন। কেউ কেউ লিখেছেন, আদর্শনিষ্ঠার জীবন্ত প্রতীক হিসাবে তিনি বিরামহীন সংগ্রাম করে গেছেন। কোনও ব্যঙ্গবিদ্রুপে তিনি ভ্রূক্ষেপ করেননি। খবরের কাগজে খবর বেরিয়েছে কি না, টিভিতে খবর বেরিয়েছে কি না, এগুলি তিনি কোনও দিন লক্ষ করতেন না। নিজের নাম প্রচারের তাঁর কোনও মোহ ছিল না। কেউ কেউ লিখেছেন, তাঁকে দেখলে বোঝা যায় একটা আদর্শের প্রতি, একটা নীতির প্রতি নিষ্ঠাবান থাকলে কীভাবে বলিষ্ঠতা অর্জন করা যায়। কেউ লিখেছেন, তিনি শুধু বিরল ছিলেন না, ছিলেন বিরলতম। কেউ লিখেছেন, তাঁর এই সংগ্রাম, এই আদর্শনিষ্ঠা, এই দায়িত্ববোধ, এগুলি স্মরণ করলে আমাদের স্বার্থপরতা, আমাদের ক্লেদাক্ত জীবনকে স্মরণ করে আত্মধিক্কার জাগে। এই হচ্ছে সাংবাদিকদের শ্রদ্ধাঞ্জলি। বিবেকের জ্বালা থেকে স্বেচ্ছায় তাঁরা লিখেছেন। যা কোনও দিন তাঁরা তাঁদের সংবাদপত্রে বলতে পারেননি, কমরেড দেবপ্রসাদ সরকারের মৃত্যুর পরে তাঁরা সেটাই করেছেন।

কমরেড দেবপ্রসাদ সরকার দীর্ঘদিন বিধানসভায় দাঁড়িয়ে বলিষ্ঠ কণ্ঠে যতটুকু সময় যে দিন মিলেছে কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষায় বলিয়ান হয়ে শোষিত মানুষের কথা তুলে ধরেছেন। সেই সময়ে তাঁর চেহারাই সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে যেত। সাধারণত তাঁর যে চেহারা আপনারা দেখতেন সেই শান্ত-শিষ্ট মানুষটি নন, বিধানসভায় তাঁর কণ্ঠস্বর দৃপ্ত, বলিষ্ঠ। বিপ্লবী বলিষ্ঠতা বলতে যা বোঝায়। যারা ব্যঙ্গবিদ্রুপ করত, তারাও লজ্জায় অধোবদন হত তাঁর চাহনি দেখে। অন্যরা তাদের ধিক্কার দিত।

এই প্রসঙ্গে একটা ঘটনা উল্লেখ করতে চাই। একদিন অসতর্কতার জন্য কমরেড দেবপ্রসাদ সরকার বিধানসভায় একটি ভুল সংশোধনী প্রস্তাব এনেছিলেন। পরে অনুতপ্ত হয়ে তিনি পার্টি অফিসে বললেন, আমি এই ভুল স্বীকার করব বিধানসভায়। আমরাও সম্মত হই। পরদিন বিধানসভার শুরুতেই স্পিকারকে জানাতে তিনি বিস্ময়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে বললেন, এ কী বলছেন আপনি! এই সভায় সকলের সামনে দাঁড়িয়ে আপনি ভুল স্বীকার করবেন! এর দরকার নেই। আপনি ছেড়ে দিন। কমরেড দেবপ্রসাদ সরকার দৃঢ়কণ্ঠে উত্তর দিলেন, তা হয় না। এটা আমাদের দলের শিক্ষা, ভুল করলে স্বীকার করতে হয়। সমগ্র বিধানসভাকে অবাক করে সেদিন তিনি ভুল স্বীকার করলেন।

আমাদের দলের প্রতিনিধি হিসাবে সংসদীয় জীবনে প্রথমে কমরেড সুবোধ ব্যানার্জী, পরবর্তীকালে দীর্ঘদিন কমরেড দেবপ্রসাদ সরকার বিধানসভায় এই ভূমিকা পালন করেছিলেন। তারপরে কমরেড তরুণ নস্করও একই ভূমিকা পালন করার জন্য সংগ্রাম করেছেন। লোকসভায় কমরেড তরুণ মণ্ডলও বিপ্লবী দলের প্রতিনিধি হিসাবে কমরেড শিবদাস ঘোষের ছাত্র হিসাবে একই ভূমিকা পালন করে গেছেন। এটা সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনীতি, ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন তার সুর–যেটা সকলকে চমকে দিয়েছে। লোকসভাতেও কমরেড তরুণ মণ্ডল একা ছিলেন। কিন্তু এই একক কণ্ঠস্বরও লোকসভাতে সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রায় প্রতিধ্বনিত হত। সকলে চমকে উঠত। কারণ এই শিক্ষা মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-কমরেড শিবদাস ঘোষের মহান বিপ্লবী শিক্ষা।

 

গণআন্দোলনে সামনের সারিতে

কমরেড দেবপ্রসাদ সরকার বিধানসভার ভিতরে যেমন লড়াই করেছেন, আবার বিধানসভার বাইরেও আপনারা শুনেছেন সমস্ত আন্দোলনে ছিলেন। ভাষাশিক্ষা আন্দোলন–আপনারা জানেন দীর্ঘদিন লড়াই করে আমরা সিপিএম সরকারকে প্রাথমিক স্তরে ইংরেজি শিক্ষা চালু করতে বাধ্য করেছি। এই আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিলেন কমরেড দেবপ্রসাদ সরকার। পরবর্তীকালে আমাদের দল বহু আন্দোলন করেছে, পুলিশি আক্রমণে আমাদের কর্মীরা বারবার গুরুতর আহত হয়েছে। যে আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে কমরেড মাধাই হালদার শহিদ হন, সেই আন্দোলনেও কমরেড দেবপ্রসাদ সরকার প্রথম সারিতে ছিলেন। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনেও কমরেড দেবপ্রসাদ সরকার পার্টির নেতা হিসাবে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছিলেন। এখানে আমি উল্লেখ করতে চাই, নন্দীগ্রামে যখন সিপিএম সরকারের নিযুক্ত গুণ্ডাবাহিনীর দ্বারা গণধর্ষিত হয়ে মহিলারা এবং আহতরা চিকিৎসা পাচ্ছিলেন না, তখন প্রথম মেডিকেল টিম যায় আমাদের পার্টির তরফ থেকে। যে টিমে কমরেড অশোক সামন্ত, কমরেড তরুণ মণ্ডল আরও অনেকে ছিলেন। কমরেড দেবপ্রসাদ সরকারও সেই টিমে পার্টির নেতা হিসাবে ছিলেন। তখন পথে দুইধারে সশস্ত্র গুণ্ডাবাহিনী, পুলিশ বাহিনী, তার মধ্যেই কিন্তু কমরেড দেবপ্রসাদ সরকার ছুটে গিয়েছিলেন।

সিঙ্গুর আন্দোলনও বারবার বিপথগামী হচ্ছিল তৃণমূল নেতৃত্বের দ্বারা, আমি সেই আলোচনায় যাব না। আমাদের পার্টির কী ভূমিকা ছিল তা জানে নন্দীগ্রামের জনগণ, জানে সিঙ্গুরের জনগণ, জানেন সাংবাদিকরা, জানে সিপিএম সহ সব দলের নেতারা, জানে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। সিঙ্গুর কিংবা নন্দীগ্রাম, কোনও আন্দোলনই হত না আমাদের দলের উদ্যোগ ছাড়া। এই কথা আমি পরিষ্কার করে বলতে পারি। এই আন্দোলনের ক্ষেত্রেও কমরেড দেবপ্রসাদ সরকারের বলিষ্ঠ ভূমিকা ছিল। কমরেড দেবপ্রসাদ সরকার এই যে এত শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন, আস্থা অর্জন করেছেন, এমনকি প্রশাসনিক মহলেও যারা সৎ প্রশাসক, পুলিশ অফিসার, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কমরেড দেবপ্রসাদ সরকারকে খুবই শ্রদ্ধা করতেন তাঁর সৎ চরিত্র ও নিঃস্বার্থ জনদরদি ভূমিকার দ্বারা আকৃষ্ট হয়ে। পশ্চিমবাংলার সর্বত্র এই সব মহলে এই নামটা উচ্চারিত হত। আমাদের কর্মীরা কোথাও কোনও দপ্তরে গেলে এঁরা জিজ্ঞাসা করতেন, আপনারা দেবপ্রসাদ সরকারের পার্টি! এইরকম একটা শ্রদ্ধা ছিল। যে মানুষের সম্পর্কে এত শ্রদ্ধা, চতুর্দিকে যাঁর এত প্রশংসা, সেই কমরেড দেবপ্রসাদ সরকারের মধ্যে কিন্তু বিন্দুমাত্র অহঙ্কার ছিল না, আত্মম্ভরিতা ছিল না। জনপ্রিয়তার এত শীর্ষস্থানে অধিষ্ঠিত হয়েও নাম করার ঝোঁক নেই, আত্মপ্রচারের ঝোঁক নেই, বিন্দুমাত্র অহঙ্কার নেই, এতটুকুও দম্ভ নেই। এখানেও তিনি কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষার ভিত্তিতে একটা বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। কারও বত্তৃতায়, লেখায় তাঁর কালচার বোঝা যায় না, বোঝা যায় ঘরে-বাইরে, প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে আচার-আচরণে, চলনে-বলনে, প্রবল উত্তেজনার মুহূর্তেও উন্নত রুচিসম্মত আচরণে। দলের শিক্ষা অনুযায়ী তাঁর মধ্যে এটা প্রতিফলিত হত, যা মানুষকে আকৃষ্ট করত।

ব্যক্তিগত বলতে তাঁর কিছুই ছিল না

তাঁর বিধানসভার বেতন-ভাতা, শিক্ষকতাকালীন যা কিছু উপার্জন সবটাই তিনি আন্দোলনের তহবিলে, পার্টির তহবিলে দিয়ে গেছেন। খুঁজলে দু একটা ধুতি, পাঞ্জাবি, গামছা, জুতো, চাদর খুঁজে পাওয়া যাবে তাঁর নিজস্ব সম্পত্তি হিসাবে। পৈতৃক একটা ভিটে আছে, তাঁর বাড়ির সকলেই পার্টির লোক। ফলে সেটাকে তাঁর নিজস্ব সম্পত্তি বলা চলে না। কমরেড সুবোধ ব্যানার্জীর ক্ষেত্রেও এই কথা সত্য। তাঁরও ব্যক্তিগত বলতে কিছুই ছিল না। এখন তো এমএলএ, এমপি হওয়া মানেই অগাধ টাকা রোজগার। একজন এমএলএ বা এমপি যখন ভোটের সময় তার অ্যাকাউন্ট সাবমিট করে, দেখা যায়, কয়েক কোটি টাকা তার সম্পত্তি, পরের বার দেখা যায় আরও কয়েক কোটি বেড়ে গিয়েছে। মন্ত্রী হলে তো আর কথাই নেই। আমরা ছাড়া অন্য সব দলেরই এই অবস্থা। এরাই নাকি জনগণের সেবক!

আমাদের দলে কোনও দিন এ সব জিনিস নেই। ১৯৭২ সাল পর্যন্ত কমরেড শিবদাস ঘোষ বাস-ট্রামে চলাফেরা করতেন। কোনও কোনও দিন হয়তো ট্যাক্সিতে যেতেন। ১৯৭২ সালে তাঁর কঠিন অসুখের পর আমরা চাঁদা তুলে একটা গাড়ির ব্যবস্থা করেছিলাম। কমরেড সুবোধ ব্যানার্জীও ট্রেনে ভিড়ের মধ্যে কলকাতা যেতেন, বিধানসভা যেতেন, ফিরে আসতেন, সহযাত্রীরা শ্রদ্ধায় জায়গা করে দিত। কমরেড দেবপ্রসাদ সরকারও তাই করেছেন। তাঁকেও যাত্রীরা শ্রদ্ধায় জায়গা করে দিত। আমাদের সেন্টারে যখন থাকতেন, তখনও বাসে করেই যেতেন। শুধু বিধানসভায় যখন ভোরে সবচেয়ে আগে প্রশ্ন জমা দিতে হত, কারণ আগে প্রশ্ন জমা না দিলে বলার সুযোগ পাওয়া যেত না, তখন বাধ্য হয়ে ট্যাক্সি নিতেন। এখন পার্টির দু-একটা গাড়ি আছে। কমরেডরা চাকরি করে তাঁদের রোজগার থেকে দলকে দিয়েছেন। এই সুযোগটাও কমরেড দেবপ্রসাদ সরকার বেশিদিন পাননি। এই ছিল তাঁর জীবনযাত্রা। আমি যে সেন্টারে থাকি, সেখানে তিনি দীর্ঘদিন ছিলেন। আমি দেখেছি, তাঁর মধ্যে কোনও দিন কোনও চাহিদা বলে কিছু ছিল না। যা খাবার জুটত, ভাল হোক, মন্দ হোক, অন্যরা যেমন তৃপ্তি সহকারে খেতেন, তিনিও খেতেন। সমস্ত দিক থেকেই, অত্যন্ত সাদাসিধে সাধারণ জীবন ছিল তাঁর। প্রথম দিকে যখন বাড়িতে থাকতেন, ওখানে একটা পুকুরের ঘাট আছে, বলে গঙ্গার ঘাট, সেখানে তিনি নিজের জামাকাপড় কাচতেন, এমএলএ থাকা অবস্থাতেও। ওই পুকুর ঘাটেও যে কোনও গরিব মানুষ, সাধারণ মানুষ যখন তাঁর কাছে সইয়ের প্রয়োজনে গেলে, তিনি জামাকাপড় রেখে, হাত মুছে সাথে সাথে সই করে দিতেন। কাউকে বলতেন না যে, তাকে অপেক্ষা করতে হবে। যেখানেই গেছেন এইভাবে দলের বাছবিচার না করে জনগণের জন্য কাজ করেছেন। এই অর্থে তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিরল দৃষ্টান্ত।

এই দলে একটা সাধনা চলে। কমরেড শিবদাস ঘোষ এই শিক্ষাই দিয়ে গেছেন, মানুষকে জয় করবে ভালবাসা দিয়ে, যুক্তি দিয়ে, ভদ্র সুশোভন উন্নত রুচির আচরণ দিয়ে। মিথ্যা দিয়ে নয়, ধাপ্পাবাজি দিয়ে নয়। বহু দিন আগেই শরৎচন্দ্র বলেছিলেন, মিথ্যা দিয়ে ভুলিয়ে সত্যের প্রচার হয় না। সত্যকে সত্যের মতো করেই বলতে হয়। তা হলে মানুষ যে যার বুদ্ধির দ্বারা বুঝতে পারে। আজ না পারলে কাল পারবে। একজন না পারলে আর একজন পারবে। কেউ যদি নাও পারে, তা হলেও মিথ্যার ভণ্ডামির দ্বারা মুখরোচক করে মানুষকে বিভ্রান্ত করা অন্যায়। কমরেড শিবদাস ঘোষও আমাদের এই শিক্ষা দিয়ে গেছেন।

 

আমাদের দল বিপ্লবী নীতি-আদর্শের ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে আছে

নির্বাচনে অন্য দল টাকা দিয়ে ভোট কেনে। তারা মানুষকে ভিখারি বানিয়ে দিয়েছে। ভিখারি বানিয়ে ভোটের আগে ভিক্ষা দেয়। গরিব মানুষ বিভ্রান্ত, পথভ্রষ্ট, অসচেতন, অসংগঠিত – ভাবে যা পাই, যে ক’টা টাকা পাই নিয়ে নিই, আর তো কিছু পাব না। তারা নিজেকে বিক্রি করে। একবার ভাবে না, এ টাকাটা কেন দিচ্ছে? সারা বছর যখন গরিব মানুষ না খেয়ে থাকে, এই নেতারা খোঁজ নেয়? এই মন্ত্রীরা কাছে আসে? আর ভোটের আগে টাকা নিয়ে হাজির! এ তো ইনভেস্টমেন্ট! তারা ইনভেস্ট করে যাতে পাঁচ বছর সুদে-আসলে বহু গুণ কামিয়ে নিতে পারে। কী ভাবে কামাবে? এই যে পুঁজিপতিরা এত জিনিসপত্রের দাম বাড়াচ্ছে, মালিকরা বাড়াচ্ছে, যার জ্বালা-যন্ত্রণায় আপনারা অস্থির– সেই পুঁজিপতিরাই তো এই দলগুলিকে টাকা দেয়। বলে–তোমরা জেতো, সরকার গড়ো, আবার আমরা দু’হাতে জিনিসপত্রের দাম বাড়াতেই থাকব। মানুষকে লুটতে থাকব। আবার লুটের ভাগ তোমাদেরও দেব, এমএলএ-এমপি হিসাবে, মন্ত্রী হিসাবে। এই তো চলছে। এই মিথ্যার রাজনীতি আমরা কখনও করি না। আমরা ভোটে হারতে প্রস্তুত, হারছিও। কিন্তু এই একমাত্র দল যে ভোটের আগে মানুষের কাছে চাঁদা চায়। লোকে বিস্মিত হয়। আমরা লোকসভায় দাঁড়াবো, বিধানসভায় দাঁড়াবো– তার জামানতের টাকাটাও আমরা পাবলিকের থেকে চাঁদা তুলি। ঘরে ঘরে চাঁদা চাই। প্রচারের জন্য– এই মাইক খরচা, পোস্টার খরচা, সব কিছু পাবলিকের চাঁদা থেকে হয়। আজকের এই মিটিংও আপনাদের, এখানকার জনগণের চাঁদাতেই হচ্ছে। আমরা কখনও পুঁজিপতিদের কাছে নিজেদের বিক্রি করিনি। তাদের সাধ্য নেই আমাদের কিনে নেওয়ার। এ দল বিপ্লবী দল। সেই ক্ষুদিরাম থেকে যে বিপ্লবী সংগ্রামের জয়যাত্রা শুরু, সেই বিপ্লবী সংগ্রামের জয়যাত্রা মহান মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদকে হাতিয়ার করে কমরেড শিবদাস ঘোষ আরও বলিষ্ঠ ভাবে শক্তিশালী করে গিয়েছেন। আমরা আজও সেই বিপ্লবী রাজনীতি নিয়েই লড়ি। আমাদের তো এমএলএ-এমপি নেই, আমাদের দলকে কেউ ভাঙতে পারল? এই দক্ষিণ ২৪ পরগণায় আমাদের কত নেতা-কর্মীকে খুন করেছে, কংগ্রেসের সময়ে। সিপিএমের সময়ে তো রক্তস্রোত বয়ে গেছে। তৃণমূলও খুন করল। মিথ্যা মামলায় ফাঁসাল। কিন্তু আমাদের দলকে ধ্বংস করতে পেরেছে? আমাদের দল এমএলএ-এমপি-র ভিত্তিতে নয়, বিপ্লবী আদর্শ নীতি সংস্কৃতির ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে আছে। সততার ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে আছে। তাই ভারতের দিকে দিকে আমাদের দলের বিস্তার ঘটছে। খবরের কাগজে আমাদের খবর থাকুক আর না-থাকুক দলের অগ্রগতি হচ্ছেই। আরএসপি-ফরওয়ার্ড ব্লকের তো আজ ঝান্ডা তোলার কেউ নেই, সিপিআই কয়েকজন বৃদ্ধের পার্টি হয়ে দাঁড়িয়েছে, ৩৪ বছর রাজত্ব করার পর ভোটে হেরে সিপিএম এক ধাক্কায় প্রায় এখনও শয্যাশায়ী। এখনও ভাল করে মাথা তুলতে পারেনি। কিন্তু ওদের চাঙ্গা করার জন্য সংবাদপত্রে রোজ ওদের খবর ছাপা হয় বড় বড় করে। আর আমাদের দল? লোকসংখ্যায় সিপিএম বৃহত্তর হলেও পশ্চিমবাংলায় এখন সংগ্রামী দল হিসাবে বৃহত্তর শক্তি নিয়ে আমাদের দল আত্মপ্রকাশ করছে। কর্ণাটকে তো আমাদের পার্টি সবচেয়ে বৃহৎ বামপন্থী দল। ওড়িশাতেও আমাদের দল সবচেয়ে বৃহৎ বামপন্থী পার্টি। এভাবে কাজ চললে পশ্চিমবঙ্গতেও আমরা সেখানে পৌঁছাব। হাজার হাজার ছাত্র যুবক শ্রমিক কৃষক মহিলা শিক্ষক অধ্যাপক আইনজীবী চিকিৎসক কমরেড ঘোষের বিপ্লবী আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে আমাদের দলে সামিল হয়েছেন। ফলে আমরা এই মহান বিপ্লবী আদর্শে বিশ্বাস নিয়ে লড়াই করে যাব। আমৃত্যু কমরেড দেবপ্রসাদ সরকার এই বিশ্বাস নিয়েই দৃঢ়তার সাথে সংগ্রাম করে গিয়েছেন।

 

সাংগঠনিক দায়িত্ব নিয়ে অসাধারণ সংগ্রাম করেছেন তিনি

কমরেড দেবপ্রসাদ সরকারের আরেকটা গৌরবোজ্জ্বল সংগ্রামের দৃষ্টান্তও আছে। বিধানসভায় থাকাকালীন পার্টির সংগঠনে কোনও কার্যকরী ভূমিকা তিনি নেননি, নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি। তখনও কমরেড ইয়াকুব পৈলান, কমরেড আমির আলি হালদার জীবিত ছিলেন। আরও অনেক নেতা-কর্মী জেলায় জীবিত ছিলেন। তাঁরাই কাজ দেখতেন। এরপর প্রয়োজন দেখা দিল। এই যে আজকের সভায় সভাপতি কমরেড রবীন মণ্ডলকে দেখছেন, ইনি স্বাধীনতার পর প্রথম যুগে ভারতবর্ষে সর্বহারা বিপ্লবী ঝান্ডা নিয়ে গরিব কৃষক খেতমজুর ভাগচাষি আন্দোলন যে গড়ে উঠেছিল তার একজন বলিষ্ঠ সংগ্রামী নেতা। কুলতলির নদীর দুই ধারে, রায়দিঘি– এই সব অঞ্চলে বীরত্বপূর্ণ যে সংগ্রাম গড়ে উঠেছিল, হাজার হাজার কৃষক লড়েছেন, প্রাণ দিয়েছেন, যার ভিত্তিতে এখানে সংগঠন গড়ে উঠেছে, উনি ছিলেন সেই সংগ্রামের অন্যতম নায়ক। আজ অথর্ব, অসুস্থ। উনিই একমাত্র জীবিত যাঁরা সেদিন লড়াই করে গেছেন। ইতিমধ্যে অনেকে খুন হয়ে গেছেন, আর কেউ কেউ রোগে, বার্ধক্যে মৃত।

কমরেড পৈলান সাহেব শেষ পর্যন্ত সমস্ত শক্তি দিয়ে পার্টিকে রক্ষা করে যাচ্ছিলেন। তিনিও যখন প্রয়াত হলেন, তখন পার্টির দায়িত্ব কে নেবে? আমি বললাম কমরেড দেবপ্রসাদ সরকারকে, আপনি নিন। তিনি প্রশ্ন করলেন, আমি কি পারব? আমি তো কোনও দিন এসব কাজ করিনি। আমি বললাম, আপনি নিশ্চয়ই পারবেন, আপনি দায়িত্ব নিন। তিনি দায়িত্ব নিলেন এবং তিনি প্রমাণ করেছেন, তিনি পারেন। তিনি গ্রামে গ্রামে ঘুরেছেন, কর্মী সমর্থকদের অনুপ্রাণিত করেছেন, দলের রাজনীতি বুঝিয়েছেন, সাংগঠনিক সমস্যার সমাধান করেছেন। আগে অনেকটা কমরেড ইয়াকুব পৈলান নির্ভর কাজ হত। তাঁর যে ক্ষমতা, ব্যক্তিত্ব, যোগ্যতা তার উপর ভিত্তি করে সাংগঠনিক কাজ চলত। কমরেড দেবপ্রসাদ সরকারের নেতৃত্বে গড়ে উঠল পার্টির একটা যৌথ টিম। সকলে মিলে তাঁর নেতৃত্বে কাজ করত। মিটিংয়ে সকলের মতামত তিনি গুরুত্ব সহকারে শুনতেন, তারপর সিদ্ধান্ত নিতেন, কখনও নিজের মতামত চাপিয়ে দিতেন না। কেউ, এমনকি জুনিয়রও তাঁর চিন্তার কোনও ভুল ধরিয়ে দিলে তিনি স্বচ্ছন্দে গ্রহণ করতেন। কারও সম্পর্কে কোনও বিরূপতা, অসন্তোষ, বিদ্বেষ তিনি মনে পোষণ করতেন না। কোনও অপ্রয়োজনীয় কৌতূহল, অপ্রয়োজনীয় চর্চা– এ সব একদম তাঁর চরিত্রে ছিল না। গরিব মানুষের প্রতি তাঁর খুবই দরদবোধ ও সম্মানজনক আচরণ ছিল। তিনি দলের সিদ্ধান্তকে কার্যকরী করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতেন। ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের প্রতি, দলের প্রতি দ্বিধাহীন আনুগত্য ছিল। অত্যন্ত ডিসিপ্লিনড লাইফ লিড করতেন। আমাদের দলের সিদ্ধান্ত আছে, নেতা-কর্মীরা নিয়মিত শরীর চর্চা করবে। আপনারা শুনলে অবাক হয়ে যাবেন, হাসপাতালে যাওয়ার আগের দিন পর্যন্ত তিনি দুই বেলা ১৫ মিনিট হাঁটতেন। বাইরে দেখতে নরম প্রকৃতির মনে হলেও ভেতরে বলিষ্ঠ প্রকৃতির ছিলেন। একের পর এক প্রিয়জনের শহিদ হওয়া, রোগে মৃত্যু এই সব গভীর বেদনাও তিনি নীরবে সহ্য করে গেছেন।

জয়নগর, কুলতলির এমন কোনও গ্রাম নেই যেখানে আমি যাইনি, মিটিং করিনি। হয়ত সেই সময়কার অনেকে বেঁচে নেই। এখন যারা জীবিত তারা হয়ত তখন কিশোর ছিল, শিশু ছিল। মথুরাপুর, মন্দিরবাজারে কম গেছি। কমরেড দেবপ্রসাদ সরকার এই সমস্ত জায়গাগুলো ঘুরেছেন। এক সময়ে আমি একটা প্রোগ্রাম নিয়েছিলাম– আমি এবং উনি এইসব অঞ্চলে থাকব। এক একটা অঞ্চলে তিন-চারটি অঞ্চলের কর্মী-সমর্থকদের ডাকব। তিন দিন ধরে মিটিং হবে। বয়স্কদের, ছাত্র যুবকদের, মহিলাদের। এই ধরনের মিটিং আমরা করেছি। তিনি আমার সঙ্গে ছিলেন। কীভাবে তিনি আবেগময়, মর্মস্পর্শী আলোচনা করতেন, আমি দেখেছি। সংগঠক হিসাবেও তিনি পারদর্শিতার ছাপ রেখে গেছেন। এটা হচ্ছে তাঁর সংগঠক হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, যেটা আমি এখানে উল্লেখ করতে চাই। জয়নগরে আমাদের ভাঙাচোরা অফিস ছিল। কমরেড ইয়াকুব পৈলান শেষজীবনে গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে চাঁদা তুলে এই অফিস তৈরি করেছেন। আবার দেখা গেল, একটা মিটিং করার জায়গার দরকার। আমি কমরেড দেবপ্রসাদ সরকারকে বললাম, তিনি উদ্যোগ নিলেন। আজ যে মিটিংটা দেখছেন, এই জায়গাটা কেনবার টাকাও তিনি সংগ্রহ করেছেন গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে, কর্মী-সমর্থকদের থেকে চাঁদা তুলে– এখানে যাতে ভবিষ্যতে একটা হল করা যায়। তারপর তো অসুস্থ হয়ে পড়লেন। অসুস্থ অবস্থাতেও তিনি চিন্তাতে সক্রিয় ছিলেন। মিটিং শুনতেন, আলোচনা শুনতেন। ভালো করে কথা বলতে পারতেন না– পার্কিনসন্স ডিজিজ, কিন্তু তার মধ্যেও অংশ নিতেন। যেমন আমাদের গত কেন্দ্রীয় কমিটির মিটিংয়ে আমরা আলোচনা করেছিলাম, আগামী ৫ আগস্ট থেকে পরবর্তী ৫ আগস্ট আমাদের মহান শিক্ষক কমরেড শিবদাস ঘোষের জন্মশতবার্ষিকী এক বছর ধরে উদযাপন করব, তার কী কর্মপন্থা হবে। এটাই কমরেড দেবপ্রসাদ সরকারের শেষ মিটিং। তিনি ছিলেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের কথা, আগামী ৫ আগস্ট দিল্লিতে আমরা যখন এই কর্মসূচির উদ্বোধন অনুষ্ঠান করব, তিনি থাকবেন না।

 

উন্নয়ন হচ্ছে শুধু এক শতাংশের

আমি এখন আপনাদের বলতে চাই, ভারতবর্ষে এক অত্যন্ত দুঃসময়ের মধ্যে দিয়ে আমরা যাচ্ছি। এমন দুঃসময় অতীতে রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, নজরুল, চিত্তরঞ্জন দাশ, বিপিন পাল, সুভাষ চন্দ্র, ভগৎ সিং, সূর্য সেন, ক্ষুদিরাম– এঁরা কেউই দেখে যাননি। আজ ভারতবর্ষে একদিকে ১ শতাংশ ধনী লোক দেশের ৭৩ শতাংশ সম্পদের মালিক। বাকি ৯৯ ভাগ লোকের হাতে আছে মাত্র ২৭ শতাংশ। তার মধ্যে উচ্চমধ্যবিত্ত আছে, মাঝারি মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত আছে, গরিব আছে, নিঃস্ব আছে। নেতারা একদিকে উন্নয়নের বত্তৃতা দিচ্ছে– কেন্দ্রের নেতা, রাজ্যের নেতা, সবারই মুখে একই বুলি। কী সেই উন্নয়ন? কার উন্নয়ন? উন্নয়ন হচ্ছে ১ শতাংশের। তার মধ্যে দুই শিরোমণি– এক আম্বানি, আর এক আদানি– বিজেপির দুই খুঁটি। আপনারা অবাক হয়ে যাবেন– আদানি প্রতি ঘন্টায় আয় করে ৯০ কোটি টাকা। আম্বানি প্রতি ঘন্টায় আয় করে ৭৩ কোটি টাকা। আম্বানির সম্পদ এখন ১০ হাজার ৫২০ কোটি ডলার। চিন্তা করুন। আদানির হচ্ছে, ১১ হাজার ৬০০ কোটি ডলার। আর সরকারি হিসাব– ৪০ কোটি মানুষের দৈনিক রোজগার ২০ টাকা। গত দু’বছরে ১২ কোটি শ্রমিক ছাঁটাই হয়ে গেছে। ঘরে ঘরে কোটি কোটি বেকার।

১৯৫১, ‘৫২, ‘৫৩ সালে আমরা যখন এই জেলায় আসতাম, গ্রামের মাঝারি, গরিব কৃষক সবাই মূলত গ্রামেই থাকত। শহরে খুব কম যেত। এখন গ্রামে কোনও লোক পাওয়া যায় না। কর্মক্ষম যুবক, শুধু ছেলেরা না, মেয়েরা পর্যন্ত ছুটছে বাইরে। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস বাইরে ঘুরছে। এখানে সেখানে কাজ করছে। যেখানে পাচ্ছে দু’টাকা রোজগার করছে। কাজ না থাকলে উপোস করছে। এত খেটেও তারা ভাবে, ঈদের সময় কী নিয়ে ঘরে যাব? দুর্গাপুজোর সময় ভাবে, কী নিয়ে যাব? ছেলেমেয়ের হাতে কী দেব? এই অবস্থা। শহরে যান, ফুটপাতে পলিথিনে ঢাকা একেকটা পরিবার। এদেরও একদিন গ্রাম ছিল, জমি ছিল। এদেরও একদিন অন্তত একটা কুঁড়েঘর ছিল। সব হারিয়ে গেছে। কোটি কোটি লোক ফুটপাতে থাকে। প্ল্যাটফর্মে থাকতে দেয় না, তাড়িয়ে দেয়, তারা আবার ঢুকবার চেষ্টা করে। ঝুপড়িতে থাকে। কত শিশুর জন্ম ফুটপাতে। মৃত্যুও ফুটপাতে। কত শিশু জানেও না, তাদের বাবা কে, মা কে! এখনও যার কথা ফোটেনি তেমন শিশু এসে আপনাদের কাছে ভিক্ষা চায়। এরা তো মানবসন্তান। দেশের এই হাল হবে তা কি স্বাধীনতা আন্দোলনের শহিদরা ভেবেছিলেন? এই জন্য কি ক্ষুদিরাম প্রাণ দিয়েছিলেন, সূর্য সেন প্রাণ দিয়েছিলেন, আসফাকউল্লা খান প্রাণ দিয়েছিলেন, ভগৎ সিং প্রাণ দিয়েছিলেন? নেতাজির আজাদ হিন্দ বাহিনী লড়াই করেছিল?

প্রতিদিন ৭ হাজার লোক অনাহারে মারা যায়। ১০ হাজার লোক বিনা চিকিৎসায় মারা যায়। এই হচ্ছে দেশের অবস্থা। পেটের দায়ে গরিব বাবা-মা মেয়েকে বিক্রি করে দেয়। কেনে ব্যবসায়ীরা। নারীদেহ নিয়ে ব্যবসা চলছে দেশে। এ জিনিস রবীন্দ্রনাথ দেখে যাননি, নজরুল-শরৎচন্দ্র দেখে যাননি। তা হলে তাঁরা চোখের জল ফেলতেন। বিয়ের নামে প্রতারণা করে নিয়ে যায়। ৫-১০ হাজার টাকা হাতে তুলে দিয়ে ৫-১০ দিন রেখে বিক্রি করে দেয়। নারী পাচার বিরাট ব্যবসা। শিশু পাচার হচ্ছে। সংবাদপত্রের খবর, এক কোটি শিশু শ্রমিক। সরকার যদি ১ কোটি বলে, ধরে নিন ১০ কোটি শিশু শ্রমিক। ৫-৭-১০ বছরের বাচ্চাগুলিকে তুলে নিয়ে যায়, একটু ভাত-রুটি দেয় আর খাটায়। এদের কাজের ঘণ্টা বলে কিছু থাকে না। এই হচ্ছে দেশের হাল।

এই যে অগ্নিবীর নিয়ে যুবকরা আগুনের মতো জ্বলে উঠল। কেন? কোটি কোটি বেকার। একটা চাপরাসির পোস্ট, একটা পিওনের পোস্ট, তার জন্য ইঞ্জিনিয়ার দরখাস্ত করছে, এমএ-এমএসসি পাশ করা লোক দরখাস্ত করছে। এই হচ্ছে বাস্তব অবস্থা। ফলে প্রবল অর্থনৈতিক সঙ্কট। এই সঙ্কট আরও বাড়বে। যাঁরা এখনও কিছুটা রোজগার করছেন তাঁরা আগামী দিন ভাবুন। ভারতে মধ্যবিত্ত তিন বছর আগে ছিল ৯ কোটি ৬০ লক্ষ, তিন বছর বাদে গিয়ে দাঁড়াল ৬ কোটি ৩০ লক্ষ। বাকি ৩ কোটি ৩০ লক্ষ মধ্যবিত্ত কোথায় গেল? তারা নিম্নবিত্ত, অর্ধ-সর্বহারা, সর্বহারায় পরিণত হয়েছে। এই যে আপনারা বাজার থেকে আনাজপাতি, জিনিসপত্র কেনেন, এই সব বাজার থাকবে নাকি? তার চেয়েও আরও বড় বিগ বাজার, অ্যামাজন, ফ্লিপকার্ট, রিলায়েন্স– এরা সবজিও বিক্রি করে, চাল-ডাল-তেল-নুন-জামাকাপড় সব বিক্রি করে। এরা এমন ব্যবসা করছে ঘরে পর্যন্ত পৌঁছে দেয় মাল। আপনাকে দোকানে যেতে হবে না। এদের সাথে কমপিটিশনে পারবে ছোট ছোট দোকানদার? ছোট ছোট দোকান কোথায় যাবে, চায়ের দোকান, বাজার কোথায় যাবে? এই হচ্ছে একচেটিয়া পুঁজিবাদের আক্রমণ, বহুজাতিক পুঁজির আক্রমণ, ভয়ঙ্কর অর্থনৈতিক সঙ্কট।

 

বিবেকানন্দকে মানলে বিজেপিকে মানা যায় না

 আর এক দিকে শিক্ষাকে ধ্বংস করছে। কথায় কথায় স্কুল-কলেজ বন্ধ। পড়াশোনা বন্ধ, অনলাইনে পড়া, অনলাইনে পরীক্ষা। শিক্ষক ছাত্রকে দেখে না, ছাত্র শিক্ষককে চেনে না। কেন্দ্র করছে, রাজ্য করছে। সিলেবাস পাল্টে দিচ্ছে, চিন্তাকে-মননকে ধ্বংস করছে। যুক্তিবাদী মন, তর্ক করার মন, বিচার করার মন, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি এগুলি যাতে না আসে তার জন্য নিয়ে আসছে আর একটা আক্রমণ– অন্ধ, ধর্মীয় গোঁড়ামি এইসব ঢোকাচ্ছে শিক্ষায়। রামমোহন বেদান্তে বিশ্বাসী ছিলেন। আবার সেই রামমোহন বলতেন, বেদান্তের দ্বারা আধুনিক ছাত্রদের গড়ে তোলা যাবে না। আধুনিক বিজ্ঞান চাই, জ্ঞানের চর্চা চাই। আপনারা জানেন, বিদ্যাসাগর মহান ব্যক্তিত্ব। তিনি ঈশ্বরবিশ্বাসী ছিলেন না। নিরীশ্বরবাদী ছিলেন। সেই বিদ্যাসাগরকে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়েছিলেন স্বয়ং রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দের যিনি গুরু। এতবড় মানুষ বিদ্যাসাগর। বিদ্যাসাগর বললেন, বেদান্ত, সাংখ্য–ধর্মীয় শাস্ত্রে আজ আর সত্য নেই। এখন বিজ্ঞানের চর্চা করতে হবে, বস্তুবাদী দর্শনের চর্চা করতে হবে। যদিও স্বদেশি আন্দোলনে গান্ধীজির নেতৃত্ব তাঁকে গ্রহণ করেনি। ফলে আমাদের দেশে ধর্মীয় প্রভাবমুক্ত জাতীয়তাবাদী চিন্তা, মানবতাবাদী চিন্তা যেটা চেয়েছিলেন বিদ্যাসাগর, যেটা চেয়েছিলেন শরৎচন্দ্র-রবীন্দ্রনাথ-সুভাষ চন্দ্র-ভগৎ সিং এঁরা– গুরুত্ব লাভ করতে পারেনি। তার সুযোগ নিয়ে আজ হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়িয়ে মানুষে মানুষে বিভেদ বাড়াচ্ছে। শোষিত মানুষের ঐক্যকে ভাঙছে। ওরা এগুলো করে হিন্দু ধর্মবিশ্বাস থেকে নয়। এই বিজেপির রাজত্বে এত মানুষ খুন হচ্ছে, এত শিশুর অনাহারে মৃত্যু হচ্ছে, এসব দেখলে হিন্দু ধর্মের বড় মানুষ বিবেকানন্দ কি সহ্য করতেন? এসব দেখেও কি বিবেকানন্দ মন্দির-মসজিদ নিয়ে বিজেপির এই হানাহানি চলতে দিতেন? বিবেকানন্দ সেই সময় বলেছিলেন, মন্দিরে মন্দিরে পুজা করছ, কোটি কোটি টাকা খরচ করছ, আর আসল ঠাকুর অন্নহীন, বস্ত্রহীন রাস্তায় ঘুরছে। এই ছিলেন বিবেকানন্দ। আজ বিজেপি নেতারা এই বিবেকানন্দের কথা মানেন? ওরা আদানি-আম্বানির সম্পদ বাড়াচ্ছে। কোটি কোটি মানুষকে ভিক্ষুকে পরিণত করছে। অনাহারে-বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর দিকে ঠেলছে। আবার ধর্মের কথা বলছে! এগুলি ধর্ম নয়, অধর্ম। ওরা ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করে। ওরা যার কথা বলে, কিন্তু মানে না সেই বিবেকানন্দ বলছেন, ধর্ম নিয়ে যুদ্ধবিগ্রহ-সংঘাত-মারামারি তারাই করে, যারা ধর্মে বিশ্বাস করে না। তারা রাজনীতির স্বার্থের থেকে করে। এই হচ্ছে বিবেকানন্দের বক্তব্য। আমি বই খুলে দেখাতে পারি। আজ বিজেপি এই কাজই করছে। বিজেপি হিন্দু ভারত, মুসলিম ভারত করছে। কী উদ্দেশ্য? একটা উদ্দেশ্য হচ্ছে, বেকার যুবক, ক্ষুধার্ত মানুষ ভাবুক কেন আমি বেকার, কেন আমার ছেলে বিনা চিকিৎসায় মরছে, তার জন্য দায়ী– কপাল দোষ, ভগবানের মার, পূর্বজন্মের পাপের ফল, খোদা কা মর্জি নসিব কা খেল। তা হলে কেউ প্রতিবাদ করবে না, কেউ আন্দোলন করবে না, লড়াই করবে না! এটা ওদের প্রয়োজন।

আর একটা হচ্ছে, হিন্দু ভোটব্যাঙ্ক তৈরি, যার জোরে ভোটে জেতা যায়। তার জন্য হিন্দু-মুসলিম বিদ্বেষ জাগাও। তাহলে মানুষ চাকরি নেই কেন, জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে কেন, ছাঁটাই হচ্ছে কেন, রেলভাড়া বাড়ছে কেন, এ সব নিয়ে কথা বলবে না। হিন্দু মুসলিমকে শত্রু মনে করবে, মুসলিম হিন্দুকে শত্রু মনে করবে। ইংরেজরা যেমন দাঙ্গা বাধিয়ে দেশ ভাগ করেছিল। এদেরও লক্ষ্য তাই।

আবার মুসলিমদের মধ্যে এক দল এই সুযোগ নিয়ে নিজেদের কর্তৃত্ব স্থাপন করার জন্য মুসলিমদের ঐক্য চাই এসব বলছে। এর বিরুদ্ধেও আপনাদের লড়তে হবে। আমরা চাই গরিব মানুষের ঐক্য। গরিব মানুষ অত্যাচারিত, নিপীড়িত। এখানে হিন্দু গরিব ও মুসলিম গরিবে ভাগাভাগি নেই। জিনিসপত্রের দামে হিন্দু-মুসলিম নেই। চাকরির প্রশ্নে হিন্দু-মুসলিম নেই, ছাঁটাইয়ের প্রশ্নে হিন্দু-মুসলিম নেই। চিকিৎসার প্রশ্নে হিন্দু-মুসলিম নেই, রেল ভাড়ার ক্ষেত্রে হিন্দু-মুসলিম নেই। জীবনের কোনও প্রশ্নে হিন্দু-মুসলিম নেই। সকলের সমস্যা এক, সঙ্কট এক। একত্রে লড়তে হবে।

 

যৌবনকে ধ্বংস করছে পুঁজিবাদ

আর একটা ভয়ঙ্কর আক্রমণ করছে। সে আক্রমণ হল, যুবকদের নষ্ট করো। যৌবনকে ধ্বংস করো। যুবকদের অধঃপতিত করো। তারা সুভাষ চন্দ্রকে ভুলে যাক, তারা রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্র-নজরুলকে ভুলে যাক। তার বদলে হাজির করো কোনও ফিল্মস্টারের কেচ্ছা-কাহিনি, কার সাথে কার প্রেম, কার সাথে কার বিচ্ছেদ, কাল কার ছেলে হয়েছে তার বিরাট ছবি, আর ক্রিকেটারদের কাহিনি। এগুলি এখন খবরের কাগজে ভরে আছে। এ এক মাদকতা। আমি খেলাধূলা-সিনেমার বিরুদ্ধে নই। এগুলি তো আগেও ছিল। কিন্তু এখন একটা মাদকতা সৃষ্টি করছে। আর একটা হচ্ছে মদ খাও, গাঁজা খাও, নেশা করো, ড্রাগ ইনজেকশন নাও। আগে সিপিএম সরকার অঢেল মদের দোকান করেছে, আমরা প্রতিবাদ করেছি। তৃণমূল সরকারও করছে। ঘরে ঘরে মদ পৌঁছে দিচ্ছে, দুয়ারে মদ একটা স্কিম আনছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যারা বয়স্ক মানুষ তারা চমকে যাবেন, ক্লাস ফোর-ফাইভের ছেলেরা জলের মতো মদ খাচ্ছে। আরও মারাত্মক সিনেমার নোংরা ছবি, নগ্ন দেহ। মোবাইলের মধ্যে, সিনেমার মধ্যে, বইপত্রের মধ্যে নোংরা ছবি দেখছে। আপনারা ভাবুন, প্রতিদিন কয়েকশো মেয়ে আর্তনাদ করছে ভারতবর্ষের গ্রামে গ্রামে, শহরে শহরে। ধর্ষণকারী যুবকরা গলা টিপে খুন করছে। এই যুবকরা কি জন্মের থেকেই ধর্ষক ছিল? এরা তো মানবশিশু। কোথা থেকে শিখেছে? কেন্দ্রীয় সরকার, রাজ্য সরকার যত বলছে আইনশৃঙ্খলার উন্নতি, মেয়েদের উন্নতি, বেটি বাঁচাও, তত ধর্ষণ বাড়ছে। কেন বাড়ছে? এই পুঁজিবাদ মানুষকে অমানুষ করছে। একটা পশুও ধর্ষণ করে না। আমাদের সমাজ যখন বর্বর যুগে ছিল, তখনও ধর্ষণ বলে কিছু ছিল না। এখন এটা জলভাত হয়ে গেছে। যুবশক্তিকে ঠেলছে– মদ খাও, নোংরামি করো, মেয়েদের নিয়ে ব্যবসা করো, মেয়েদের উপরে নির্মম অত্যাচার চালাও। একটুও দ্বিধা নেই। এরা মানুষ নয়, মনুষ্যদেহধারী কিন্তু বিবেকবর্জিত, মনুষ্যত্ববর্জিত নতুন জীব। এরা পুঁজিবাদের সৃষ্টি। এই পুঁজিবাদ মানবসমাজের ভয়ঙ্কর শত্রু, বিশ্বের এবং আমাদের দেশের।

 

মানবজাতির শত্রু পুঁজিবাদ

বিজ্ঞানীরা বলছে, সমুদ্র এগিয়ে আসছে, সমুদ্রের জল বাড়ছে। কারণ কী? মেরু অঞ্চলের বরফ গলে জল হচ্ছে। এমনকি হিমালয়ের হিমবাহ, বরফের চাঙড় সেগুলি আস্তে আস্তে ভেঙে যাচ্ছে। একদিন হয়ত গঙ্গাও মরে যাবে। কারণ পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়ছে। কেন উষ্ণতা বাড়ছে? কয়লা, নানা গ্যাস, খনিজ তেল তার থেকে কার্বন বেরোচ্ছে, গ্রিন হাউস গ্যাস তৈরি হচ্ছে। এর ফলে বায়ুমণ্ডল দূষিত হচ্ছে। তার ফলে তাপ বাড়ছে, সমুদ্রের জল বাড়ছে। সমুদ্রের উত্তাপ বাড়ছে। তার প্রভাবে আমফানের মতো ঝড় আচমকা আসছে। কোথাও অতিবৃষ্টি, কোথাও অনাবৃষ্টি। কোথাও বন্যা, কোথাও খরা– এগুলি ঘটছে। তার পরে যেটাকে বায়ুমণ্ডলের ওজোন স্তর বলে, ওজোন স্তর না থাকলে সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি সরাসরি আমাদের ক্ষতি করবে। এটা অনেকটা ছাতার মতো আছে। সেখানে ফুটো হয়ে যাচ্ছে। বৈজ্ঞানিকরা বারবার বলছেন, ক্ষতিকর গ্যাসের নিঃসরণ বন্ধ কর। পুঁজিবাদ বন্ধ করবে না। সস্তায় মাল উৎপাদন করতে পারলে সে বেশি লাভ করতে পারবে। মানবজাতি ধ্বংস হোক, ভবিষ্যত ধ্বংস হোক তাতে পুঁজিবাদের কিছু যায় আসে না। বিজ্ঞানীরা বলছেন, সমুদ্র যেভাবে এগোচ্ছে, ৬০-৭০ বছর বাদে কলকাতা শহর, মুম্বাই শহর থাকবে না। এই হচ্ছে পুঁজিবাদ। এই পুঁজিবাদ আপনার ঘরেও ঢুকছে অন্য রূপে। এই যে ঘরে ঘরে অশান্তি, বৃদ্ধ বাবা-মাকে ছেলে দেখে না। বড়লোক ঘরের একদল আছে বৃদ্ধ বাবা-মাকে টাকা দিয়ে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠায়। শেষ জীবনে যে একটু ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি তার কাছে থাকবে সেই আশা-আকাঙক্ষা ধূলিসাৎ। কেউ কেউ তো বাবা-মাকে ঘর থেকে বের করে দিচ্ছে, গলা টিপে হত্যা করছে সম্পত্তি লিখে না দেওয়ায়। গরিব আত্মীয়কে দেখে না, এই নিষ্ঠুরতা, স্বার্থপরতা, এই ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা– এটাও পুঁজিবাদের সৃষ্টি। এই পুঁজিবাদের বিরুদ্ধেই মহান মার্ক্সবাদী চিন্তানায়ক সর্বহারা মুক্তি আন্দোলনের পথপ্রদর্শক কমরেড শিবদাস ঘোষ তাঁর ছাত্র কমরেড শচীন ব্যানার্জী, কমরেড নীহার মুখার্জী, কমরেড সুবোধ ব্যানার্জী, কমরেড ইয়াকুব পৈলান, কমরেড দেবপ্রসাদ সরকার সহ আমাদের সকলকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। আজও আমরা এই শিক্ষা বহন করে চলি এবং আমরা লড়াই চালিয়ে যাব।

কমরেড দেবপ্রসাদ সরকার যে ভাবে একটা সাধারণ স্তর থেকে কঠিন-কঠোর সংগ্রাম চালিয়ে শিবদাস ঘোষের উপযুক্ত ছাত্র হিসাবে গড়ে ওঠার জন্য বিরামহীন ভাবে লড়াই করে এই ধরনের একটা শ্রদ্ধার উঁচু আসনে নিজেকে অধিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন, তা থেকে শিক্ষা নেওয়াই এই স্মরণসভার একমাত্র তাৎপর্য। তাঁর সেই সংগ্রামের শিক্ষাকে পাথেয় করে, সেই ভাবে সংগ্রাম চালিয়ে যদি আমরা, আপনারা আরও এগোতে পারি, তাহলেই এই শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের সার্থকতা। না হলে নিছক মাল্যদান, প্রস্তাব গ্রহণ এগুলির কোনও মানে থাকে না।

পরিশেষে আমার আবেদন, এই জেলার মাটিতেই এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট) পার্টির প্রতিষ্ঠা। এই জেলাতেই প্রথম শিবদাস ঘোষের নেতৃত্বে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামী আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। এই জেলাই প্রথম বিধানসভায় বিপ্লবী প্রতিনিধি পাঠিয়েছিল কমরেড শিবদাস ঘোষের ছাত্র হিসেবে। ফলে এই জেলার যারা আপনারা আছেন, আমি চাই আপনাদের ঘরের সন্তানদের এক জনকে হোক, দু’জনকে হোক, দলের হাতে তুলে দিন। যেমন করে কমরেড দেবপ্রসাদ সরকারের দাদা কমরেড প্রফুল্ল সরকার আমাকে বলেছিলেন– আমি ভেবেছিলাম, আমি পারিনি। আমার বাবা মারা গেল, ভাইবোন ছোট, চাকরি নিতে হল, কিন্তু আমার ভাই-বোন পরিবারকে আমি পার্টির হাতে তুলে দিয়েছি। আমি আপনাদের বলতে চাই, আপনাদের ঘর থেকে সন্তানদের দিন, ছেলেমেয়েদের দিন। তারা টাকা রোজগার করতে না পারুক, কিন্তু মানুষ হিসাবে তারা বড় হবে। তাদের মধ্য থেকে আগামী দিনে আরও দেবপ্রসাদ সরকার জন্ম নেবে, আরও ইয়াকুব পৈলান জন্ম নেবে, আরও রবীন মণ্ডল জন্ম নেবে, আরও আমির আলি হালদার জন্ম নেবে, হাকিম শেখ জন্ম নেবে, ধীরেন ভাণ্ডারি জন্ম নেবে, এরকম আরও বীর যোদ্ধা জন্ম নেবে। আপনারা সেইভাবে এগিয়ে আসুন, পার্টিকে রক্ষা করুন, সংগঠন গড়ে তুলুন, আরও মজবুত করুন।