Breaking News
Home / খবর / ঐতিহাসিক নন্দীগ্রাম আন্দোলনে কালি ছেটাতে পারবে না ভোটবাজেরা

ঐতিহাসিক নন্দীগ্রাম আন্দোলনে কালি ছেটাতে পারবে না ভোটবাজেরা

এতদিন নন্দীগ্রাম নিয়ে মুখ খোলার উপায় ছিল না সিপিএম নেতৃত্বের। কিন্তু সেই সুযোগ তাদের করে দিলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়। তিনি নন্দীগ্রামে ভোট প্রচারে গিয়ে তাঁর দলের প্রাক্তন নেতা এবং বর্তমানে প্রতিদ্বন্দ্বী শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে বলতে গিয়ে কিছু অর্থহীন কথা বলতেই তাকে লুফে নিয়েছে সিপিএম। সঙ্গে সঙ্গে আসরে নেমে পড়েছেন দীর্ঘদিন প্রচারের আলোর বাইরে থাকা নন্দীগ্রামের গণহত্যার জন্য জনতার আদালতে প্রধান অভিযুক্ত প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টচার্য। তিনি নন্দীগ্রাম আন্দোলনটাকেই একটা ‘কুটিল চিত্রনাট্য’ বলে দেগে দিয়েছেন।

একবার পিছন ফিরে দেখা যাক, সেদিন কী হয়েছিল? ২০০৬-এর শেষ ভাগেই ১৯ হাজার একরেরও বেশি জমি ইন্দোনেশিয়ার সালেম গোষ্ঠীর প্রস্তাবিত কেমিক্যাল হাবের জন্য অধিগ্রহণের নোটিশ দিয়েছিল সিপিএম সরকার। সেই সময় থেকেই শুরু হয় স্থানীয় কৃষকদের প্রতিবাদ আন্দোলন। গ্রামে গ্রামে গড়ে ওঠে আন্দোলনের কমিটি। প্রচারের আলোর বাইরে থেকে কমিটি গঠনের কাজে এস ইউ সি আই (সি) কর্মীরা সর্বশক্তি নিয়োগ করে। আন্দোলন ধীরে ধীরে গতি পেতে থাকে। এই আন্দোলনকে হুমকি দিয়ে পুলিশ দিয়ে ভাঙার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় সিপিএম সরকার। সিপিএম দল সেই সময় কুখ্যাত সালেম গোষ্ঠীর হয়ে পুরোপুরি নির্লজ্জ দালালি শুরু করে। তারা নন্দীগ্রামের আন্দোলন ভাঙার জন্য বিপুল অস্ত্রশস্ত্র সহ দুষ্কৃতী বাহিনীকে জড়ো করতে থাকে। খেজুরি এবং নন্দীগ্রাম সংলগ্ন কিছু এলাকায় তারা সশস্ত্র ক্যাম্প তৈরি করেছিল। ২০০৭ সালের ৩ জানুয়ারি জমি অধিগ্রহণের নোটিশ পড়তেই পঞ্চায়েত অফিসে বিক্ষোভ দেখান গ্রামবাসীরা। পুলিশ লাঠি-গুলি চালায়। জনগণের প্রতিরোধে পুলিশ এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। ৭ জানুয়ারি ভোর রাতে সিপিএম দুষ্কৃতী বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারান আন্দোলনের সমর্থক সেলিম, ভরত, বিশ্বজিৎ। কিন্তু গ্রামবাসীদের তীব্র প্রতিরোধে সিপিএম এলাকার দখল নিতে পারেনি। এই ঘটনার পরে এস ইউ সি আই (সি)-র প্রস্তাব অনুযায়ী গ্রাম কমিটিগুলি সংযোজিত করে পুরো ব্লক জুড়ে গড়ে ওঠে ‘ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি’। এটা কোনও দলীয় কমিটি ছিল না। কিন্তু রাজনৈতিক দলের মধ্যে এস ইউ সি আই (সি) যেহেতু এই আন্দোলনটা শুরু করেছিল, তাই এলাকার মানুষের কাছে এই দল অত্যন্ত শ্রদ্ধার আসন পায়। আন্দোলনকে গাইড করার ক্ষেত্রে মানুষ এই দলের উপরই নির্ভর করেছে। ‘ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি’-র তিনজন আহ্বায়ক ছিলেন– এস ইউ সি আই (সি) নেতা কমরেড নন্দ পাত্র এবং কমরেড ভবানী দাস ও তৃণমূল কংগ্রেসের আবু সুফিয়ান। এই গণকমিটিতে দলমত নির্বিশেষে হাজার হাজার মানুষ সামিল হন। সিপিএম নেতারা এখন যতই এর বিরুদ্ধে বলুন না কেন, তাঁদের দলের বহু সাধারণ সমর্থকও সেদিন কমিটির সাথে যুক্ত হন। তৃণমূল কংগ্রেস আজ ভোটের বাজারে যাই বলুক, তাদের সেদিনের রাজ্য স্তরের নাম করা নেতা, সাংসদ-বিধায়ক কেউই ১৪ মার্চের গুলিচালনা ও হত্যাকাণ্ডের আগে নন্দীগ্রামের আন্দোলনের পাশে ছিলেন না। আর বিজেপি তো এসইজেডের হোতা, তাদের এই আন্দোলন সমর্থনের কোনও প্রশ্নই ছিল না। সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে বহুল প্রচারিত নেতা-নেত্রীদের ছাড়াই ৯ মাস ধরে চলেছে এসইজেড প্রতিরোধে জনগণের আন্দোলন। সেদিন জনগণ পণ করেছিল সিপিএম-দুষ্কতীদের রক্ষাকর্তা পুলিশকে গ্রামে ঢুকতে দেওয়া হবে না। কমিটি বারবার বলে, সরকার নিশ্চিত করুক যে সিপিএম তার হার্মাদ বাহিনীর ক্যাম্প তুলে নেবে, তা হলে জনগণও পুলিশকে গ্রামে ঢুকতে দেবে। এই ঐতিহাসিক প্রতিরোধ আন্দোলন ভাঙতে ১৪ মার্চ পুলিশ এবং সিপিএম হার্মাদ বাহিনী একযোগে আক্রমণ চালায় নিরস্ত্র মানুষের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের উপর। এই আক্রমণে ১৪ জন মানুষের মৃত্যু ঘটে এবং শত শত মানুষ আহত হন। শুধু তাই নয় পুলিশের পোশাক পরে সিপিএমের ভাড়া করা গুণ্ডারা নারকীয় গণধর্ষণ চালায়। যাদের অনেকের পরিচয় ‘চটি পরা পুলিশ’ হিসাবে জনগণের সামনে ফাঁস হয়ে যায়। আজ মমতা ব্যানার্জীর অবান্তর মন্তব্যকে হাতিয়ার করে এদের পরিচয় লুকানোর কোনও উপায় সিপিএমের নেই। ওই বছরই ১০ নভেম্বর নন্দীগ্রাম দখল করতে আবার হামলা চালিয়ে সারা ভারতে প্রবলভাবে ধিক্কৃত হয় সিপিএম। ‘অপারেশন সানসাইন’ নামে আশেপাশের জেলা থেকে বিপুল সংখ্যায় দুষ্কৃতিদের জড়ো করে ব্যাপক আক্রমণ এবং নারকীয় অত্যাচার চলে। ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির নেতৃত্বে নন্দীগ্রামের মানুষ খালিহাতেই সেই আক্রমণ প্রতিরোধে এক অনমনীয় দৃঢ়তা দেখান। নৃশংস ভাবে ৬ জনকে খুন করে, বহু মানুষকে আহত করেও সিপিএম এলাকার দখল নিতে পারেনি। পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর ছাড়াও বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, দক্ষিণ ২৪ পরগণার কুখ্যাত দুষ্কৃতীর দল যে এই অপারেশনে সিপিএমের হয়ে নেমেছিল তা সে সময়েই ফাঁস হয়ে যায়। মগরাহাটের এক কুখ্যাত দুষ্কৃতীর নাম তো জনগণই সংবাদমাধ্যমকে জানিয়ে দিয়েছিল। দৈনিক সংবাদপত্রগুলি পর্যন্ত তথ্য দিয়ে দিয়ে দেখায়– কী ভাবে নন্দীগ্রামের পুলিশ ক্যাম্পগুলি ১০ নভেম্বরের আগে তুলে নিয়ে সিপিএমের দুষ্কৃতী বাহিনীকে ঢোকার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল। কী ভাবে সিপিএম দুষ্কৃতীরা নন্দীগ্রামকে ঘিরে ৯ মাস ধরে সশস্ত্র ক্যাম্প করে বসেছিল। নন্দীগ্রামের মানুষকে হলদিয়া কিংবা অন্য কোনও জায়গায় তারা যেতে না দিয়ে অবরুদ্ধ করে রাখে। তাদের ভাতে মারার পরিকল্পনা ছিল সিপিএমের। চেকপোস্ট বসিয়ে প্রতিটি গাড়িতে তারা তল্লাসি করত, যাতে ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির কোনও নেতা বা সিপিএম বিরোধী কাউকে দেখলেই তাকে আক্রমণ করা যায়। এ সবই মায়া বলে উড়িয়ে দিতে চেয়েছেন বুদ্ধদেব বাবু। যদিও জননী ইটভাটার সিপিএম ক্যাম্পে কীভাবে অস্ত্র জড়ো করা হয়েছিল সে কথা বুদ্ধবাবুর ভোলার কথা নয়। সিপিএমের ‘সম্পদ’ তপন-সুকুরের গাড়ি করে কীভাবে হামলায় আহতদের নিরুদ্দেশের ঠিকানায় পাচার করা হচ্ছিল, তা ধরা পড়ার ঘটনায় সেদিনের প্রকৃত ঘটনা ফাঁস হয়েছে অনেক আগেই। এই ‘পরিকল্পনা’ কার রচনা তা তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য নিশ্চয়ই জানেন। আশা করা যেতেই পারে যে তিনি তা এর মধ্যে ভুলেও যাননি! তিনি নিশ্চয়ই ভুলে যাননি, তাঁর সেই হুমকির কথা, ‘নন্দীগ্রামে আমাদের কেউ আটকাতে পারবে না’। তাঁর সেই উক্তি– ‘দে হ্যাভ বিন পেইড ব্যাক ইন দেয়ার ওন কয়েন’, ভুলে যাওয়া অসম্ভব। তিনি ভুলে যাননি নিশ্চয়ই তাঁর দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য বিনয় কোঙারের মন্তব্যটি, ‘নন্দীগ্রামকে চারদিক থেকে ঘিরে লাইফ হেল করে দেব’! মহিলা আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে কোঙারের কদর্য মন্তব্যটি জনগণ ভোলেনি, বুদ্ধদেববাবুও কি ভুলতে পারেন?

বুদ্ধদেব বাবু যে ‘কুটিল চিত্রনাট্যে’-র কথা বলেছেন, তা ছিল আসলে সিপিএম দল এবং তার পরিচালিত সরকারের রচিত। তারা জনগণের এই আন্দোলনকে খাটো করতে আন্দোলনে মাওবাদীরা আছে বলে ধুয়ো তোলার চেষ্টা করেন। যে মিথ্যাকেও এলাকার মানুষ ফাঁস করে দেয়। বুদ্ধদেব বাবু আজ বাংলার বেকার যুবকদের নিয়ে মহা হা হুতাশে ব্যস্ত! নন্দীগ্রাম আর সিঙ্গুরে তিনি সফল হলেই সব বেকার যুবক একেবারে লাইন দিয়ে চাকরি নিয়ে ঘরে ফিরে যেত, বলে কতই না প্রচার চলছে। তাঁর অসুস্থ শরীরে এতটা চাপ নিয়ে তিনি জনগণের কত উপকার করছেন, তা টাটা-সালেম-আম্বানি-আদানি-গোয়েঙ্কাদের মতো একচেটিয়া মালিকদের টাকায় চলা কিছু সংবাদমাধ্যম বোঝানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু একটা বিষয়ের উত্তর তাঁরা দিচ্ছেন না, সিপিএম তো পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসেছিল ১৯৭৭ সালে। ২০০৭-এর আগে কি নন্দীগ্রাম কিংবা সিঙ্গুরের মতো উচ্ছেদ প্রকল্প করতে পারেননি বলে শিল্প গড়তে পারেননি? ওই ৩০টা বছর তাঁরা কোন শিল্প নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন? নন্দীগ্রামে বুদ্ধদেব বাবুর দল পরিচালিত সরকার গড়ে তুলতে চেয়েছিল এসইজেড। চেয়েছিল কেমিক্যাল হাব। এসইজেড কর্মসংস্থানের নয়, চরম শ্রমিক শোষণ ও তাদের বধ্যভূমি হিসাবে সারা বিশ্বে আজ ধিক্কৃত। শুধু তাই নয়, শিল্পের নামে বন্ধ কারখানার জমি, অনুর্বর জমি, বসবাসের এলাকা এবং পরিবেশ ধ্বংস সবচেয়ে কম হয় এমন জমির খোঁজ করার বদলে নন্দীগ্রাম কিংবা সিঙ্গুরের মতো উর্বর কৃষি জমির এলাকাতেই বারবার হাত পড়েছে কেন? শিল্পের নামে জমি কেড়ে নিয়ে কৃষককে একচেটিয়া মালিকদের সেবাদাস করে ফেলার যে চক্রান্ত আজ বিজেপি প্রকট ভাবে করছে, সিপিএম কি সেই পরিকল্পনার পথ প্রদর্শক হয়েই কাজ করতে চেয়েছিল? ‘কুটিল চিত্রনাট্য’ তো আসলে এখানেই।

বুদ্ধদেববাবুকে বরং একটু ‘গণশক্তি’ কাগজটা পড়তে বলা যাক। ১ জানুয়ারি ২০২১ তারিখের গণশক্তিতে তাঁর দলের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক, সীতারাম ইয়েচুরি দিল্লির কৃষক আন্দোলনের প্রসঙ্গে লিখেছেন, সরকারের উচিত কর্পোরেট মালিকদের সঙ্গে কৃষকদের বৈঠক করে একটা সমঝোতার রাস্তা বার করা। আজ দিল্লির ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলনকে শেষ করতে এমন একটা লাইন যে দল দেখাতে পারে, তারা নন্দীগ্রামে কোন চিত্রনাট্য নিয়ে সালেমদের হয়ে জমি দখলে নেমেছিল বুঝতে অসুবিধা হয় কি?

আর একটি ছবি তাঁদের দেখতে বলব, ৩ এপ্রিল ২০২১ গণশক্তি পত্রিকা একটি ছবি ছেপেছে, বিজেপি শাসিত আসামের এক দিগন্ত বিস্তৃত ঝাঁ চকচকে হাইওয়ে বেয়ে সাইকেল ঠেলছেন এক দরিদ্র মানুষ। পিছনে বসা স্ত্রীর কোলে একটি শিশু, আর একটি শিশু ঝুলছে সাইকেলের রডে বাঁধা প্লাস্টিকের থলিতে। নিঃসন্দেহে তথাকথিত কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থবাহী তথাকথিত উন্নয়নের জাঁতাকলে পিষ্ট প্রান্তিক মানুষের মর্মান্তিক ছবি। সিপিএম দল এবং তার নেতা হিসাবে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মশাই নিজেদের ‘উন্নয়নের’ ‘চিত্রনাট্য’টি চিনে উঠতে পেরেছেন নিশ্চয়ই! বিজেপির ‘উন্নয়নে’র সাথে তাঁদের সেদিনের ‘উন্নয়ন’ ভাবনার কী অদ্ভূত মিল না! বামপন্থাকে বিসর্জন দিয়ে বিজেপি-কংগ্রেসের মতোই সরকারি গদিতে টিকে থাকার জন্য কর্পোরেট পুঁজির সেবাদাসত্ব করলে আলাদা কিছু হওয়ার থাকে কি?

সিপিএম এখন বোঝানোর চেষ্টা করছে, নন্দীগ্রাম আন্দোলন ছিল কেবলমাত্র তৃণমূল কংগ্রেসের একটা দলীয় আন্দোলন। জনগণের সক্রিয় ভূমিকার কথা স্বীকার করলে তাঁদের বিপদ। তাঁদের এই ফর্মুলা অনুসারে আজ যেহেতু তৃণমূলের তৎকালীন নেতাদের একাংশ বিজেপিতে ভিড়েছেন, অতএব তাঁদের নিজেদের মধ্যে কাদা ছোঁড়াছুঁড়িটা হয়ে গেল নন্দীগ্রামের চিত্রনাট্য? অথচ নন্দীগ্রাম জানে, সঠিক সত্যটা কী? যে সত্য অনুভব করেন, পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের কোটি কোটি খেটে খাওয়া মানুষ। নন্দীগ্রাম শেখায়–উন্নয়নের নামে গায়ের জোরে দরিদ্র মানুষের জমি কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা হলে, তাদের উচ্ছেদ করার অপচেষ্টাকে রুখে দেওয়ার শক্তি ধরে গরিব মানুষ। শাসকের উন্নয়ন, কর্পোরেটের উন্নয়ন আর জনগণের প্রকৃত উন্নয়ন এক নয়– এই সত্য শেখায় নন্দীগ্রাম। আজ বিজেপি সরকারের কৃষি আইনের বিরুদ্ধে পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশের কৃষকরা যখন মাসের পর মাস রাস্তায় আন্দোলনে থাকেন, সেখানেও শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয় নন্দীগ্রামের নাম। নন্দীগ্রাম সিঙ্গুরকে অশ্রদ্ধা করে দিল্লির কৃষক আন্দোলনকে সমর্থন করা ভণ্ডামি।

তৃণমূল নেত্রী তো বটেই তাঁর একদা বিশ্বস্ত, বর্তমানে ভোটযুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বীর কোনও সাধ্য নেই নন্দীগ্রামের সেই আত্মত্যাগকে আত্মসাৎ করার। তৃণমূল কংগ্রেস সেদিন কার্যত বাধ্য হয়েছিল সিঙ্গুর নন্দীগ্রামের আন্দোলনের হয়ে কথা বলতে। বাধ্য করেছিল রাজ্যের জনগণ। কিন্তু সাধারণ মানুষের একচেটিয়া পুঁজি বিরোধী প্রকৃত সংগ্রামের প্রতি তাদেরও ভয় ছিল। তাদের কাছে আন্দোলন মানে কিছু মানুষকে উত্তেজিত করে ভোটে সমর্থন লাভ। তাই এস ইউ সি আই (সি)-র বিরোধিতা সত্ত্বেও তৃণমূল নেত্রী সিঙ্গুরের চাষের মাঠ থেকে আন্দোলনকে ধর্মতলার অনশন মঞ্চে নিয়ে গিয়েছিলেন। তাতে লাভ হয়েছিল সরকারের এবং টাটার। তারা জমি দখল করে নিতে পেরেছিল। নন্দীগ্রামেও এমন সস্তা চমকের বহু রাস্তা নেওয়ার চেষ্টা তাঁরা করলেও সেখানে ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির মাধ্যমে জনগণ এতটাই ঐক্যবদ্ধ ছিল যে এ প্রচেষ্টা সফল হয়নি।

পরবর্তীকালে সংবাদমাধ্যম তৃণমূল কংগ্রেসকেই নন্দীগ্রামের একমাত্র শক্তি হিসাবে তুলে ধরেছে। কারণ জনগণ গণকমিটির মাধ্যমে লড়ে দাবি আদায় করছে, এই বার্তা পুঁজিবাদী শোষণ-শাসনের ধ্বজাধারীদের কাছে বড় বিপদের ইঙ্গিত বহন করে। তারা আন্দোলনকে ভোটের বাক্সে পুরে তার আগুন নিভিয়ে ফেলতে চায়। প্রচারের জোরে তৃণমূলই নন্দীগ্রামের ত্রাতা সাজে। ফলে তৃণমূল কংগ্রেসের রাজত্বেও আগের শাসকদের যে অন্যায়গুলির বিরুদ্ধে মানুষ মাথা তুলেছিল, সেই স্বজন পোষণ দুর্নীতি, দলবাজি, সমাজবিরোধীদের প্রশ্রয় দান চলতেই থাকে। ফলে জনমানসে ক্ষোভ বাড়ছে। এর সুযোগ নিয়ে বিজেপিতে ভিড়ে তৃণমূলের তৎকালীন নেতা এখন ভোটে মহা সংগ্রামী সাজছেন। তার বিরুদ্ধে বলতে গিয়ে তৃণমূল নেত্রী অবান্তর কিছু কথা বলছেন। এতে নন্দীগ্রাম আন্দোলনের মহত্ত্ব এতটুকু খাটো হয় না। নন্দীগ্রামের নাম করে তৃণমূল, বিজেপি, সিপিএম যত কাদা পরস্পরের দিকে ছুঁড়ছে সে কাদা তাদের গায়েই পড়ছে। নন্দীগ্রাম আন্দোলনকে কালিমালিপ্ত করব অথচ নিজের বসনটি শুভ্র থাকবে– কারও পক্ষেই এ আশা করা বৃথা।