Breaking News
Home / খবর / এমএসপি-র প্রতিশ্রুতি পালন করতে হবে মোদি সরকারকে — এ আই কে কে এম এস

এমএসপি-র প্রতিশ্রুতি পালন করতে হবে মোদি সরকারকে — এ আই কে কে এম এস

ফাইল চিত্র

 

কৃষকদের দাবি উপেক্ষা বা অগ্রাহ্য করার ক্ষেত্রে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের বাহানার শেষ নেই। পুঁজিপতিদের স্বার্থরক্ষাকারী তিনটি কালা কৃষি আইন প্রত্যাহার সহ দিল্লির ঐতিহাসিক এবং বীরত্বপূর্ণ কৃষক আন্দোলনে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল– ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্যকে আইনসঙ্গত করতে হবে এবং সরকারি ব্যবস্থাপনায় কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি উৎপাদন ব্যয়ের দেড়গুণ মূল্যে সরকারকে কিনতে হবে। প্রায় এক বছর ধরে চলা বিরামহীন কৃষক আন্দোলনের চাপে মোদি সরকার বাধ্য হয়ে তিনটি কালা কৃষি আইন প্রত্যাহার করেছিল এবং কৃষকদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তারা ন্যূনতম সহায়ক মূল্য ও সরকারি ব্যবস্থাপনায় কৃষিপণ্য ক্রয়ের জন্য জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। কিন্তু আজ পর্যন্ত তারা এই বিষয়গুলি সম্পর্কে কোনও ইতিবাচক ব্যবস্থাই নেয়নি। শুধু তাই নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যে যাতে কৃষিকদের দাবিগুলি সম্পর্কে ভ্রান্ত এবং ঘোলাটে ধারণার সৃষ্টি হয় এবং তারা আন্দোলনের বিরুদ্ধাচরণ করে সেই অশুভ উদ্দেশ্যে কিছু মিথ্যা কুযুক্তি বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছে।

কেন্দ্রের বিজেপি সরকার এবং তাদের পেটোয়া অর্থনীতিবিদ ও সাংবাদিকরা মূলত দুটি যুক্তি তুলছেন। তাদের প্রথম যুক্তি হল ন্যূনতম সহায়ক মূল্য আইনসঙ্গত করতে হলে এবং সরকারি ব্যবস্থাপনায় কৃষিজাত পণ্য কিনতে হলে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। সরকার এই মুহূর্তে প্রচণ্ড আর্থিক সংকটের মধ্যে আছে। এই অবস্থায় এত বিপুল পরিমাণ অর্থের ব্যবস্থা করা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। এ ছাড়া সরকার যদি ন্যূনতম সহায়ক মূল্যে সমস্ত কৃষিজাত পণ্য কিনে নেয় তা হলে বাজারে কৃষিপণ্যের দাম চড়ে যাবে এবং সাধারণ মানুষ আরও বেশি সমস্যায় পড়বে। তাদের বক্তব্য, যারা কৃষিজাত পণ্যের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য দাবি করছে তারা শ্রমিক, দরিদ্র শহরবাসী, কৃষিশ্রমিক প্রভৃতি নিম্ন আয়ের মানুষদের স্বার্থের বিরুদ্ধাচরণ করছে।

এই বক্তব্য কি আদৌ সঠিক? নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের লাগামছাড়া যে মূল্যবৃদ্ধি প্রতিদিন ঘটে চলেছে তা কি এমএসপি-র জন্য? যদি এমএসপি-ই মূল্যবৃদ্ধির কারণ হয় তা হলে যে সব পণ্যে এমএসপি নেই তার দাম বাড়ছে কেন? শিল্পজাত পণ্যেরই বা দাম বাড়ছে কেন? পেট্রল ডিজেল এবং রান্নার গ্যাসের এই আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধি কেন? কৃষকরা আলু এবং পেঁয়াজ বিক্রি করেছেন ২ টাকা কেজি দরে। আর বাজারে সেই আলু পেঁয়াজ সাধারণ মানুষ কিনছেন ৩০ টাকায়। এর কারণ কী? তা কি কৃষককে আলু পেঁয়াজের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য দিতে হচ্ছে বলে? মোটেই তা নয়। এর কারণ, কৃষকের বিক্রি করা ফসলের পুরোটা গিয়ে জমা হচ্ছে বড় ব্যবসায়ী এবং বহুজাতিক কোম্পানিদের হাতে। তারাই পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে এবং তারই ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের গগনচুম্বী দামবৃদ্ধি ঘটছে। এর সঙ্গে ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের কোনও সম্পর্কই নেই।

দ্বিতীয়ত, এর জন্য অনেক টাকা লাগবে বলে যে কথা বলা হচ্ছে সেই প্রশ্নে আসা যাক। ন্যূনতম সহায়ক মূল্যে সমস্ত কৃষিপণ্য কিনতে সরকারের কত টাকা লাগবে? বর্তমানে এমএসপি-র অধীনে আছে মাত্র ২৩টি কৃষিজ পণ্য। এর মধ্যে রয়েছে ধান, গম, বাজরা, ভুট্টা, জোয়ার, রাগি এবং যব সহ সাতটি দানাশস্য ছোলা, অড়হর, মুগ, মসুর, উরত, প্রভৃতি পাঁচটি ডাল; বাদাম, সয়াবিন, রেপসিড, সরষে, সূর্যমুখী প্রভৃতি সাতটি তৈলবীজ এবং আখ, তুলো, কাঁচা পাট প্রভৃতি চারটি বাণিজ্যিক ফসল। এই ২৩টি ফসলের মোট ন্যূনতম সহায়ক মূল্য হল ১০.৭৮ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু বাস্তব ঘটনা হল এই সব পণ্যের পুরোটা বাজারজাত হয় না। কারণ, খাদ্যশস্যের একটা অংশ কৃষকরা নিজেরা খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করে, বিক্রি করে না। কিছু শস্য বীজ হিসেবে পরবর্তী মরসুমের জন্য সংরক্ষণ করা হয়। বেশ কিছুটা পরিমাণ পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

দেখা গেছে উৎপাদিত কৃষিজাত পণ্যের যে অংশ বাজারজাত হয় তার পরিমাণ এইরকম ক) রাগি-৫০ শতাংশেরও কম (খ) গম-৭৫ শতাংশ (গ) ধান-৮০ শতাংশ (ঘ) আখ-৮৫ শতাংশ (ঙ) অধিকাংশ ডাল-৯০ শতাংশ (চ) তুলো, পাট প্রভৃতি-৯৫ শতাংশ। উৎপাদিত কৃষিপণ্যের গড় বাজারজাত পরিমাণ ৭৫ শতাংশ ধরলে ন্যূনতম সহায়ক মূল্যে কিনতে সরকারের মাত্র ৮ লক্ষ কোটি টাকা ব্যয় হবে অঙ্কের হিসাবে, বাস্তবে ব্যয় হবে আরও কম।

প্রথমত, আখ এর থেকে বাদ হয়েই যায়। কারণ, আখের দাম চোকায় চিনিকল মালিকেরা। চিনিকল মালিকেরা কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি আখ কেনে। কাজেই দাম দেয় তারাই, সরকার নয়।

দ্বিতীয়ত, তুলো বা পাটের মতো কৃষিপণ্যের সবটা সরকারের কিনে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। সরকারের উচিত এইসব ফসলের বেশ কিছুটা অংশ কিনে নেওয়া যাতে বাজারে একটা প্রভাব তৈরি করা সম্ভব হয়। দেখা গেছে, ২০১৯-২০২০ আর্থিক বর্ষে দেশে মোট উৎপাদিত ৩৫০.৫০ লক্ষ বেল তুলোর মধ্যে সরকার ৮৭.৮৫ লক্ষ বেল তুলো কিনেছিল। এর ফলে বাজারে একটা প্রভাব তৈরি হয়েছিল এবং কৃষকরাও খোলাবাজারে তুলো মোটামুটি ভালো দামে বিক্রি করতে পেরেছিল। সুতরাং সরকার যদি ঘোষণা করে যে মোট উৎপাদিত তুলো এবং পাটের ৪০ শতাংশ সে কিনে নেবে তা হলে কৃষকরা বাকি তুলো এবং পাট খোলা বাজারেও যথেষ্ট লাভজনক দামেই বিক্রি করতে পারবে। সরকারেরও আর্থিক বোঝা অনেকটা কমবে।

তৃতীয়ত, সরকারের উচিত খাদ্যশস্য এবং অন্যান্য কৃষিজাত পণ্য ন্যায্যমূল্যে কিনে জনসাধারণের কাছে সস্তা দরে বিক্রি করা। কারণ মানুষকে খাওয়ানো সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এর ফলে একটা বিপুল পরিমাণ অর্থ সরকারের কোষাগারে ফিরে আসবে এবং একই সঙ্গে জনসাধারণও ন্যায্যমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসিপত্র কিনতে পারবে।

এই সমস্ত দিক বিবেচনা করলে সরকারকে ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের জন্য বর্তমান বার্ষিক ৩.২ লক্ষ কোটি টাকা ব্যয়ের ওপর আরও অতিরিক্ত এক থেকে দেড় লক্ষ কোটি টাকা ব্যয় করতে হবে, যেটা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে কিছুই নয়। কারণ, বহুজাতিক পুঁজির সেবা করার জন্য সরকার প্রতি বছর বহু লক্ষ কোটি টাকা খরচ করছে। তা হলে কৃষকসমাজ সহ ১৩০ কোটি সাধারণ মানুষের দুর্দশা খানিকটা লাঘব করার জন্য এই সামান্য পরিমাণ টাকা তারা খরচ করবে না কেন? এ আই কে কে এম এস মাত্র দুটো প্রস্তাব রেখেছে। এক, সরকারকে লাভজনক মূল্য, অর্থাৎ উৎপাদন ব্যয়ের দেড়গুণ দামে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি কৃষিজাত পণ্য কিনতে হবে। দুই, সরকারকে খাদ্যশস্য ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিজাত পণ্য জনসাধারণের কাছে সস্তা দরে বিক্রি করতে হবে যাতে সাধারণ মানুষ তা সহজে কিনতে পারে। একই সাথে সার বীজ কীটনাশক সহ কৃষি উপকরণে সরকারকে পর্যাপ্ত পরিমাণ ভরতুকি দিতে হবে। জনসাধারণের প্রতি ন্যূনতম দায়িত্ববোধ থাকলে এই পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যেও এ কাজ করা সম্ভব।

এই জনমুখী পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করতে হলে সরকারকে খাদ্যশস্য এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের পাইকারি ও খুচরো ব্যবসায় ক্ষুদ্র বা বৃহৎ সবরকম পুঁজিপতি বা বহুজাতিক সংস্থার প্রবেশ নিষিদ্ধ করতে হবে। এ ছাড়া, কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি কৃষিজাত পণ্য কেনার জন্য সরকারকে কৃষকদের পক্ষে সুবিধাজনক জায়গায় সরকারি কৃষি মাণ্ডি তৈরি করতে হবে এবং জনসাধারণের কাছে ন্যায্যমূল্যে খাদ্যশস্য ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য বিক্রির জন্য গণবণ্টন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। একেই বলা হয়, ‘খাদ্যশস্য সহ সমস্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় বাণিজ্য’।

কৃষক আন্দোলনের এই মুহূর্তের কর্তব্য হল ‘পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় বাণিজ্য চালু কর’– এই দাবির পক্ষে প্রচার জোরদার করা এবং তা চালু করতে সরকারকে বাধ্য করা। কৃষকদের ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নিশ্চিত করা এবং সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের জন্য খাদ্যশস্য সহ সমস্ত কৃষিজাত পণ্য ন্যায্যমূল্যে সরবরাহ করার এ ছাড়া অন্য কোনও পথ নেই।

গণদাবী ৭৪ বর্ষ ৪৪ সংখ্যা ২৪ জুন ২০২২