Breaking News
Home / খবর / আমরা বাম ঐক্য চাই ভোটের স্বার্থে নয়, জঙ্গি শ্রেণিসংগ্রাম ও গণআন্দোলন গড়ে তোলার জন্য — প্রভাস ঘোষ

আমরা বাম ঐক্য চাই ভোটের স্বার্থে নয়, জঙ্গি শ্রেণিসংগ্রাম ও গণআন্দোলন গড়ে তোলার জন্য — প্রভাস ঘোষ

২০১৫ সালে সিপিআই(এম) পার্টি কংগ্রেসে আমন্ত্রিত হয়ে কমরেড প্রভাস ঘোষ যা বলেছিলেন তা বর্তমানে নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতে সমস্ত বামপন্থী কর্মী-সমর্থকদের কাছে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপত্তনমে ১৪-১৮ এপ্রিল, ২০১৫ সি পি আই (এম)-এর ২১তম পার্টি কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে এস ইউ সি আই (সি)-র সাধারণ সম্পাদক কমরেড প্রভাস ঘোষ নিম্নের বক্তব্য রাখেন :

কমরেড সভাপতি, সিপিআই(এম) সাধারণ সম্পাদক কমরেড প্রকাশ কারাট ও সিপিএম পলিটব্যুরোর সদস্যবৃন্দ, অন্যান্য বামপন্থী দলের নেতৃবৃন্দ ও কমরেড প্রতিনিধিবৃন্দ,

আমাদের দল সোস্যালিস্ট ইউনিটি সেন্টার অফ ইন্ডিয়া (কমিউনিস্ট)-এর পক্ষ থেকে আপনাদের অভিনন্দন জানাই। আপনাদের পার্টি কংগ্রেসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমাদের দলকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য আমার ধন্যবাদ গ্রহণ করুন।

কমরেডস, দেশের এক অভূতপূর্ব সংকটকালে আপনাদের পার্টি কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দেশের বৃহত্তম বামপন্থী দল হওয়ার সুবাদে এই কংগ্রেসে আপনাদের সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তী কালে তা কার্যকর করার উপর দেশের বামপন্থী আন্দোলনের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করে।

দীর্ঘদিন আগে মহান লেনিন বলেছিলেন, পুঁজিবাদ একদা গণতন্ত্র ও ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রতি দায়বদ্ধ ছিল, কিন্তু সাম্রাজ্যবাদের স্তরে পৌঁছে সে আমলাতন্ত্র ও সমরবাদের উপরই বেশি নির্ভরশীল। মহান স্ট্যালিন তার জীবনাবসানের কিছুকাল আগে সোভিয়েট কমিউনিস্ট পার্টির ১৯তম সম্মেলনে বলেছিলেন, বুর্জোয়ারা উদার গণতন্ত্রের পতাকা ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। আমরা বর্তমানে দেখছি পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র বাস্তবে নির্লজ্জ ভণ্ডামি ছাড়া কিছু নয়। বহুঘোষিত স্বাধীন ও সুষ্ঠু নির্বাচন মস্ত বড় প্রতারণা। ভোটের রায় জনগণ নির্ধারণ করে না, করে বুর্জোয়ারাই। শাসক বুর্জোয়ারাই তাদের বিশ্বস্ত রাজনৈতিক সেবাদাসকে বেছে নেয়, নির্বাচনের নামে সরকারে বসায়, পুনর্বার বসায়, আবার প্রয়োজনে একজনকে সরিয়ে অপরকে বসায়। বুর্জোয়া গণতন্ত্রের শেষ অবশিষ্টাংশও অবলুপ্ত। বর্তমান বিশ্বে প্রায় সকল অগ্রসর ও পশ্চাদপদ দেশেই অন্ধকারময় ফ্যাসিবাদ নানা রূপে ও নানা মাত্রায় বিরাজ করছে।

ফ্যাসিবাদের তিনটি বৈশিষ্ট্য— পুঁজির কেন্দ্রীভবন বা ক্রমবর্ধমান একচেটিয়াকরণ, শাসন বিভাগ ও আমলাতন্ত্রের ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং দেশের মানুষের চিন্তাভাবনা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে— অধ্যাত্মবাদ ও বিজ্ঞানের প্রযুক্তিগত দিকগুলির সংমিশ্রণ ঘটিয়ে— যান্ত্রিক ও ছাঁচে ঢালা চিন্তাপদ্ধতির বিস্তার। ফ্যাসিবাদের এই সব বৈশিষ্ট্যই আমাদের দেশে বিদ্যমান। শাসক বুর্জোয়াদের প্রয়োজনের দিকে লক্ষ রেখেই গত লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসকে সরিয়ে বিজেপিকে আনা হয়েছে। একদিকে নৃশংস বুর্জোয়া আর্থিক শোষণ ও দানবীয়। রাজনৈতিক নিপীড়ন অব্যাহত রাখা ও তা আরও তীব্র করায় সাহায্য দেওয়ার জন্য এবং অন্য দিকে দেশে যে ফ্যাসিবাদের প্রক্রিয়া চলছে তাকে আরও ত্বরান্বিত করার জন্য বিজেপি দায়বদ্ধ। আপনারা সম্ভবত জানেন, বিশ্বে যে সময় রা রলাঁ, আইনস্টাইন, বার্নার্ড শ, রবীন্দ্রনাথ ও অন্য বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা হিটলারের নিন্দায় মুখর ছিলেন, তখন এই ভারতে একজন, সংঘ পরিবারের ‘গুরুজি’ বা পথপ্রদর্শক এম এস গোলওয়ালকর হিটলারের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে বলেছিলেন, ইহুদিদের বিতাড়ন করে জার্মান জাতিকে বিশুদ্ধ করে ভারতে হিন্দুদের বিশুদ্ধ করার পথ হিটলার দেখিয়েছেন। তিনি ভারতের নবজাগরণ ও স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরুদ্ধতা করেছিলেন যেহেতু তা হিন্দু জাতীয়তার ভিত্তিতে সংগ্রাম ছিল না এবং কেবলমাত্র ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়েছিল।

এই ঐতিহ্যেরই উত্তরাধিকার বহন করছে বিজেপি। আদর্শ ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বিজেপি ভয়ানক আক্রমণ চালাচ্ছে। প্রাচীন মধ্যযুগীয় ধর্মীয় ধ্যানধারণা ও সংস্কৃতিকে তারা জাগিয়ে তুলছে, উৎসাহ দিচ্ছে। তারা হাস্যকর দাবি করছে, আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কৃত সকল সত্যই নাকি প্রাচীন হিন্দু ভারতে আবিষ্কৃত হয়েছিল। তারা বিজ্ঞানের পরিবর্তে পুরাকাহিনীকে স্থান দিচ্ছে এবং ইতিহাসকে বিকৃত করছে এবং তদনুযায়ী স্কুলে পাঠ্যপুস্তক ও পাঠ্যক্রম নতুন করে লিখছে। যার উদ্দেশ্য হিন্দু উগ্র দম্ভ ও প্রাচীন ঐতিহ্যবাদকে খুঁচিয়ে তোলা, বিজ্ঞানমনস্কতা ও যুক্তিবোধকে ধ্বংস করে অন্ধবিশ্বাসকে উৎসাহিত করা। এ এক ভয়ঙ্কর আক্রমণ। একদিকে তারা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় মদত দিচ্ছে এবং নিজেরাও দাঙ্গা লাগিয়ে দিচ্ছে যাতে শোষিত জনগণকে ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তিতে বিভক্ত করে দিয়ে গণআন্দোলন গড়ে তোলায় বাধা দেওয়া যায় ও একই সাথে হিন্দু ভোটব্যাঙ্ক তৈরি করা যায়। এই হচ্ছে তাদের ঘৃণ্য পরিকল্পনা।

পুঁজিবাদের স্বার্থে তারা সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও ভয়াবহ আক্রমণ চালিয়ে সমস্ত রকম মানবিক মূল্যবোধ ও নীতিনৈতিকতাকে ধ্বংস করছে। তারা তরুণ প্রজন্মের নৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। এই যে বর্তমানে দেশে ইভটিজিং, ধর্ষণ, গণধর্ষণ ও খুন, এমনকী শিশুকন্যাদের ও বৃদ্ধা রমণীর ধর্ষণও ভয়াবহভাবে দ্রুত বাড়ছে, তা কোনও আকস্মিক ঘটনা নয়। এই কি আমাদের সেই দেশ যেখানে একদিন রামমোহন, বিদ্যাসাগর, জ্যোতিবারাও ফুলে, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, প্রেমচন্দ, সুব্রহ্মণ্যম ভারতী জন্মগ্রহণ করেছিলেন? দেশকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হচ্ছে। আমাদের দেশের ইতিহাসে এ হচ্ছে সর্বাপেক্ষা অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়।

এ কথাও উল্লেখ্য যে, ভারত রাষ্ট্র একটি উদীয়মান সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসাবে দক্ষিণ এশিয়া, ভারত মহাসাগরীয় রাষ্ট্রগুলি, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও অন্যান্য দেশে আরও ফিনান্স পুঁজি ও পণ্য রপ্তানির উদ্দেশ্যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাথে হাত মিলিয়ে চলছে, অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-সামরিক সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করছে। আবার আমেরিকার সঙ্গে দর কষাকষির ক্ষমতা বাড়াবার জন্য ‘ব্রিকস’ জোটের সদস্য হয়ে রয়েছে। সুতরাং পরিস্থিতি দাবি করছে আজ ভারতের পুঁজিবাদী শাসক শ্রেণি ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী, জঙ্গি বাম ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তোলা এবং পাশাপাশি আরএসএস-বিজেপির ভয়াবহ আদর্শগতসাংস্কৃতিক আক্রমণের বিরুদ্ধে শক্তিশালী আদর্শগত সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া।

বামপন্থীদের ঐক্যের প্রশ্নে আমি কমরেড প্রকাশ কারাটের সঙ্গে একমত। কিন্তু এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা আমি সিপিআই-এর কংগ্রেসেও তুলেছিলাম। কারা বামপন্থী ও সেকুলার বা ধর্মনিরপেক্ষ, কারা গণতান্ত্রিক? এই বিষয়ে জনমনে ব্যাপক বিভ্রান্তি আছে। এ সম্পর্কে বোঝাবুঝির ক্ষেত্রে কোনও ভাসাভাসা ধারণা বা ধোঁয়াশা চলতে পারে না। মার্কসবাদ সম্পর্কে উপলব্ধি ও তার প্রয়োগ নিয়ে মৌলিক পার্থক্য থাকলেও যেসব দল নিজেদের মার্কসবাদী হিসাবে গণ্য করে তাদেরকেই বামপন্থী বলে ধরতে হবে। কংগ্রেস ও অন্যান্য আঞ্চলিক, প্রাদেশিকতাবাদী (parochial), বর্ণবাদী (casteist) দল ও গোষ্ঠীগুলি নির্বাচনে বিজেপির বিরুদ্ধতা করে, কিন্তু শুধুমাত্র সে কারণেই তারা সেকুলার বা ধর্মনিরপেক্ষ হয়ে যায় না। ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণা ইউরোপ থেকে বিশেষত ইউরোপীয় নবজাগরণ তথা বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব থেকে এসেছিল। দর্শনগতভাবে ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ কোনওরকম অতিপ্রাকৃত সত্তার অস্বীকৃতি, কেবলমাত্র প্রকৃতি ও বস্তুময় বিশ্বের স্বীকৃতি। রাজনৈতিক দিক থেকে ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ হচ্ছে রাষ্ট্র পরিচালনা, রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপ, সংস্কৃতি ও শিক্ষাক্ষেত্রকে সম্পূর্ণ ধর্মীয় প্রভাব মুক্ত রাখতে হবে। রাষ্ট্র কোনও ধর্মকে যেমন উৎসাহ দেবে না, ধর্ম চর্চায় হস্তক্ষেপ করবে না। ধর্ম ব্যক্তির নিজস্ব বিশ্বাস হিসাবে থাকবে। আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় বিপ্লবভীত জাতীয় বুর্জোয়ারা শুধু ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের সাথেই রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আপস করেনি, মতাদর্শগত ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে ধর্মের সাথেও আপস করেছে এবং সকল ধর্মের প্রতি উৎসাহ দানকেই ধর্মনিরপেক্ষতা বলে প্রচার করেছে, যা আসলে মেকি ধর্মনিরপেক্ষতা। গণতান্ত্রিক দল বলতে তাদেরই বোঝায় যারা ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে চলে, সাম্প্রদায়িকতা, জাত-পাত, প্রাদেশিক সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে লড়াই করে, নিরবচ্ছিন্নভাবে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধতা করে ও বামপন্থাকে সমর্থন করে এবং সরকারে থাকুক বা না থাকুক মেহনতি মানুষের গণতান্ত্রিক আন্দোলনগুলিকে উৎসাহিত করে। বাম-ধর্মনিরপেক্ষ-গণতান্ত্রিক ঐক্যের নাম করে, শুধুমাত্র নির্বাচনী স্বার্থের কথা ভেবে কোনওরকম জগাখিচুড়ি জোট চলতে পারে না।

আমার মনে পড়ে বামপন্থী আন্দোলনের সেই গৌরবময় অধ্যায়ের কথা, স্বাধীনতার পরপরই যেটা আমাদের দেশে দেখা গিয়েছিল। সেই সময় বামপন্থী আন্দোলনে অনেকেরই রক্ত ঝরেছিল, অনেকেই প্রাণ দিয়েছিলেন। সে সময় কংগ্রেসের একমাত্র বিকল্প হিসাবে বামপন্থীদেরই ভাবা হত। স্বাধীনতা আন্দোলনের ভিতরকার বামপন্থী ধারার পথ বেয়েই এবং মহান স্ট্যালিন ও মহান মাও সে-তুঙ-এর নেতৃত্বে শক্তিশালী বিশ্বসাম্যবাদী আন্দোলনের অগ্রযাত্রায় জোর পেয়ে এদেশে বামপন্থী আন্দোলন বিকাশলাভ করেছিল। কিন্তু একদিকে আমাদের দেশে বামপন্থীরা একের পর এক গুরুতর বিচ্যুতি ও মারাত্মক ভুল করেছে যা জনগণের মধ্যে বামপন্থীদের সম্পর্কে অবিশ্বাস ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বুর্জোয়াদের এজেন্ট হিসাবে সংশোধনবাদীরা স্ট্যালিনকে আক্রমণ করে শুধু স্ট্যালিনের অথরিটিই নয়, লেনিনের অথরিটিকেও খাটো (undermine) করার দ্বারা পুঁজিবাদের পুনরুত্থানের জমি তৈরি করে সমাজতন্ত্র ধ্বংস করেছে।

কিন্তু আনন্দের কথা, পূর্বর্তন সোভিয়েট ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলিতে হাজার হাজার মানুষ আবার লেনিন-স্ট্যালিনের ছবি হাতে রাস্তায় নামছে, সমাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনার দাবি তুলছে। পাশাপাশি লক্ষণীয় যে, পুঁজিবাদের সংকট কাটাবার উদ্দেশ্য নিয়ে যে বিশ্বায়নের স্কিম আনা হয়েছিল, তা সংকট দূর করার পরিবর্তে বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদী সংকটকে আরও তীব্র করেছে।

বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদ প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় যাবৎ মন্দায় নিমজ্জিত রয়েছে, মৃতপ্রায় পুঁজিবাদকে এখন ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছে বলা যায়। এমন কোনও ডাক্তার নেই যে পুঁজিবাদকে রক্ষা করতে পারে। বাজার অর্থনীতি আজ উত্তরোত্তর বাজার সংকোচনের সম্মুখীন। জনগণের ক্ষোভও ফেটে পড়ছে নজিরহীনভাবে। আমেরিকা ইউরোপ সহ সব দেশেই গণআন্দোলনের ঢেউ আছড়ে পড়ছে। জনগণ নেতৃত্ব খুঁজছে। বিপ্লবের বাস্তব জমি বা অবজেকটিভ কন্ডিশন প্রস্তুত। সাবজেকটিভ কন্ডিশন অর্থাৎ মার্কস-এঙ্গেলসলেনিন-স্ট্যালিন-মাও সে-তুঙের বৈপ্লবিক শিক্ষায় বলীয়ান সর্বহারা শ্রেণির দল দেশে দেশে এখনও অনুপস্থিত। শীঘ্রই হোক বা কিছু বিলম্বে, ইতিহাসের নিয়মেই এরকম দলের শক্তিশালী আগমন ঘটবেই।

কমরেডস, আমাদের দেশেও রাজনৈতিক সংকট যাই থাক, মানুষের বিক্ষোভের স্ফুলিঙ্গ আমাদের চারদিকেই দেখা যাচ্ছে, এখানে সেখানে স্বতঃস্ফুর্ত গণবিক্ষোভ ফেটেও পড়ছে। আজ প্রয়োজন হল নেতৃত্বের, যা এগুলিকে পরিচালনা করে যুক্তিসঙ্গত পরিণতিতে পৌছে দিতে পারে। কারা সেই নেতৃত্ব দিতে পারে? যৌথভাবে বামপন্থীরাই কেবল সেটা পারে। সংগ্রামী আদর্শ ও উন্নত নৈতিকতার দ্বারাই আন্দোলনগুলিকে পরিচালনা করতে হবে।

আমাদের দল ঐক্যবদ্ধ বামপন্থী আন্দোলনের পক্ষে বরাবরই ছিল, আজও তা আছে। অতীতে আপনারা ও আমরা ঐক্যবদ্ধ বাম আন্দোলনে একত্রে ছিলাম। কিন্তু ১৯৭৪ সাল থেকে আপনাদের দলের সাথে আমাদের ঐক্য নেই। আপনাদের দল যখন পশ্চিমবঙ্গ ও কেরালায় সরকারে ছিল, তখন আমাদের সাথে মতপার্থক্য ছিল এবং জনগণের জ্বলন্ত ইস্যুগুলি নিয়ে আমরা আন্দোলনও সংগঠিত করেছি। আমাদের সম্পর্ক তিক্ত হয়েছিল, | বহু দুঃখজনক ঘটনাও ঘটেছিল। তবু সেই সময়ও আমরা সর্বভারতীয় স্তরে ও অন্যান্য রাজ্যে বাম ঐক্য গড়ার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু সফল হইনি। এখন সেই অধ্যায় অতিক্রান্ত। যুক্ত বামপন্থী আন্দোলনের আবেদন নিয়ে কমরেড প্রকাশ কারাট যেভাবে আমাদের সাথে কথা বলার জন্য কলকাতা যাওয়ার কষ্ট স্বীকার করেছিলেন, সেজন্য আমি তাকে ধন্যবাদ জানাই। আমরাও ইস্যুভিত্তিক যুক্ত আন্দোলনের প্রস্তাবে আন্তরিক সাড়া দিয়েছি। আমরা ঐক্য চাই ভোটে সুবিধা পাওয়ার জন্য নয়, জঙ্গি শ্রেণিসংগ্রাম ও গণসংগ্রাম গড়ে তোলার জন্য। ঐক্যের মধ্যেও অবশ্যই আদর্শগত পার্থক্য থাকবে, এবং তাকে কেন্দ্র করে আদর্শগত সংগ্রামও হবে, তবে তা ঐক্য ও আন্দোলনকে শক্তিশালী করার জন্য, দুর্বল করার জন্য নয়। উন্নত আদর্শ ও সংস্কৃতির আধারে শ্রমজীবী মানুষের জঙ্গি শ্রেণি সংগ্রাম ও গণ সংগ্রামই আজকের চাহিদা।

শেষ করার আগে আমি মহান লেনিনের শিক্ষা স্মরণ করিয়ে বলতে চাই, একটি সর্বহারা দলের শক্তি লোকসভায় সদস্য সংখ্যার মধ্যে নিহিত থাকে না, তা একমাত্র নিহিত থাকে শ্রেণিসংগ্রামের ও গণসংগ্রামের আগুনের মধ্যেই। আপনাদের সবাইকে লাল সেলাম।

মার্কসবাদ-লেনিনবাদ জিন্দাবাদ

সর্বহারা আন্তর্জাতিকতাবাদ জিন্দাবাদ

গণদাবী ৭৩ বর্ষ ৩২ সংখ্যা