Breaking News
Home / খবর / আদিবাসীদের শিক্ষাগত দাবিগুলি পূরণে কেন্দ্র ও রাজ্য দুই সরকারই উদাসীন

আদিবাসীদের শিক্ষাগত দাবিগুলি পূরণে কেন্দ্র ও রাজ্য দুই সরকারই উদাসীন

২৪ সেপ্টেম্বর এ রাজ্যের আদিবাসীদের একটি সংগঠন তাদের শিক্ষাগত ও অন্যান্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ দাবি নিয়ে সড়ক ও রেল অবরোধের ডাক দিয়েছিল৷ তাদের সেই দাবিগুলির প্রতি কেন্দ্রের বিজেপি ও রাজ্যের তৃণমূল সরকারের ধারাবাহিক বঞ্চনার প্রতিবাদে গোটা আদিবাসী সমাজ এই আন্দোলনের পক্ষে দাঁড়ায়৷ যার ফলে সরকার পুলিশ দিয়ে এই অবরোধ ভাঙতে পারেনি৷

পশ্চিমবঙ্গ সহ পার্শ্ববর্তী রাজ্য ঝাড়খন্ড ওড়িশার আদিবাসীরা মাঝে মাঝেই বিক্ষোভে ফেটে পড়ছেন৷ কখনও  বিশাল বিশাল জমায়েত করে জেলা প্রশাসনের কাছে, কখনও বা রাজ্য সরকারের বিভিন্ন স্তরে দাবি সনদ পেশ করছেন৷ সড়ক পথ ও রেল অবরোধ করেও বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন৷ এমনকী এ বছরের পঞ্চায়েত নির্বাচনে আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকাতে তাঁরা তাদের নিজস্ব দাবিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করেছেন৷ কিছু প্রার্থী জয়ীও হয়েছেন৷ তিনটি পঞ্চায়েতে তাঁরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে পঞ্চায়েত গঠন করেছেন৷ এইভাবে সমস্ত দিক থেকেই তাঁরা তাদের দাবিগুলি তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন এবং এখনও করে চলেছেন৷ তবুও সরকার সেইসব গণতান্ত্রিক দাবি পূরণের কোনও চেষ্টা করেনি৷

যুগ যুগ ধরে আদিবাসীরা নির্মম শোষণ, জুলুম, বঞ্চনার শিকার৷ শুধু অর্থনৈতিক দিক থেকেই নয়, সামাজিক ও শিক্ষাগত দিক থেকেও এই সম্প্রদায়ের মানুষ যে অবমাননা কুড়িয়েছেন, জীবনে চলার পথে যে নির্দয় উপেক্ষা পেয়েছেন তা অবর্ণনীয়৷ সামন্ততন্ত্র ও পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের শাসনে এই সম্প্রদায়ের মানুষ সবচেয়ে বঞ্চিত, শোষিত ও নির্যাতিত হয়েছেন৷ মুক্তির আকাঙক্ষা নিয়ে এ দেশের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে প্রথম দিকে আদিবাসী জনগণই এগিয়ে এসেছিলেন৷ প্রথম ও দ্বিতীয় চুয়াড় বিদ্রোহ, তিলকা মাঝির আন্দোলন, গঙ্গানারায়ণ হাঙ্গামা ও কোল বিদ্রোহ, সিদো–কানহুর নেতৃত্বে সাঁওতাল বিদ্রোহ ও বিরসা মুণ্ডার নেতৃত্বে উলগুলান এই সকল আদিবাসী বিদ্রোহের ইতিহাস স্বর্ণাক্ষরে লিখিত আছে৷ স্বাধীনতার পর দীর্ঘ কংগ্রেসী শাসনে, পরবর্তীকালে এ রাজ্যে সিপিএম শাসন ও বর্তমানে তৃণমূল শাসনে আদিবাসীরা শোষণ, জুলুম, অত্যাচার, বঞ্চনা, অবমাননার নির্মম শিকার হয়ে চলেছেন৷ যত দিন যাচ্ছে নির্মম পুঁজিবাদী শোষণে নিষ্পেষিত সর্বস্তরের মানুষের জীবনের অবস্থার আরও অবনতি হচ্ছে৷ সামগ্রিকভাবে সমাজের সকল অংশের শোষিত মানুষের সমস্যাগুলি ছাড়াও আদিবাসীদের আরও কিছু বিশেষ সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়৷ তাই তাদের অবস্থা আরও সঙ্গীন৷ এ কথা অনস্বীকার্য যে, আদিবাসীদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিকাশ সাধন করতে হলে সর্বপ্রথম প্রয়োজন তাঁদের মধ্যে শিক্ষার ব্যাপক প্রসার৷ কিন্তু কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলির জনবিরোধী শিক্ষানীতি এবং তীব্র অভাবের কারণে দেশের মধ্যে আদিবাসীদের শিক্ষার হার অত্যন্ত কম৷ তাই তাঁরা দাবি তুলেছেন, ১) সাঁওতালি মাধ্যম বিদ্যালয়গুলিতে সাঁওতালি ভাষা জানা অলচিকি (সাঁওতালি বর্ণমালা) জানা বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে, ২) সাঁওতালি ভাষাভাষী সকল ইচ্ছুক শিক্ষককে সাঁওতালি মাধ্যম স্কুলে বদলি করে আনতে হবে, ৩) সাঁওতালি মাধ্যম সমস্ত বই সরকারিভাবে সরবরাহ করতে হবে ও বিদ্যালয়গুলির পরিকাঠামো গড়ে তুলতে হবে, ৪) অবিলম্বে সাঁওতালি মাধ্যম সকল বিদ্যালয়ে (প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত) হোস্টেল নির্মাণ করতে হবে, ৫) যে সকল আদিবাসী হোস্টেল বন্ধ হয়ে গেছে সেগুলি পুনরায় চালু করতে হবে, ৬) সমস্ত হোস্টেলে প্রতি মাসে হোস্টেল গ্রান্ট দেওয়া সুনিশ্চিত করতে হবে, ৭) নারী নির্যাতন ও আদিবাসীদের ওপর অত্যাচার বন্ধ করতে হবে, ৮) আদিবাসী আবাসিক স্কুলের উপযুক্ত (পণ্ডিত রঘুনাথ মুর্মু আদর্শ আবাসিক বিদ্যালয়, একলব্য বিদ্যালয় এবং কস্তুরবা গান্ধী ছাত্রীনিবাস) পরিকাঠামো গড়ে তুলতে হবে এবং পঠন–পাঠন ও পুষ্টিকর খাওয়া–দাওয়ার উপর গুরুত্ব দিতে হবে, ৯) আবাসিক বিদ্যালয়গুলিতে আদিবাসী ছাত্রীদের যৌন নির্যাতন অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে, ১০) অবিলম্বে সংবিধান স্বীকৃত সাঁওতালি ভাষাকে সাঁওতালি ছাত্রদের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় সরকারি ভাষা হিসাবে চালু করতে হবে, ১১) প্রত্যেক আদিবাসী গ্রামে গ্রামীণ সড়ক যোজনায় পাকা রাস্তা নির্মাণ ও বৈদ্যুতিকরণ সহ দ্রুততার সাথে শৌচাগার নির্মাণ করতে হবে, ১২) পশ্চিমবঙ্গের সর্বত্র ভূমিহীন আদিবাসীদের অবিলম্বে জমির পাট্টা দিতে হবে ও আদিবাসীদের জমি কেড়ে নেওয়ার চক্রান্ত বন্ধ করতে হবে, ১৩) সংবিধানে উল্লিখিত পঞ্চম তফসিলি আইন চালু করতে হবে, ১৪) উন্নয়নের দোহাই দিয়ে আর পেশীশক্তির প্রয়োগে আদিবাসী মানুষকে উচ্ছেদ করা চলবে না৷

প্রত্যেকটিই গণতান্ত্রিক দাবি৷ এগুলি পূরণ করা কি কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের পক্ষে অসম্ভব ছিল? অষ্টম তফসিল অন্তর্ভুক্ত একমাত্র আদিবাসী ভাষা ‘সাঁওতালি’–র বর্ণমালা ‘অলচিকি’ স্বাধীনতার পূর্বে তিরিশের দশকে উদ্ভাবিত হয়েছিল এবং ১৯৩৬ সাল থেকেই এই লিপি ব্যবহারের জন্য দাবি উঠে এসেছে৷ কিন্তু সরকারি বঞ্চনার কারণে স্বাধীনতার পর বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশক থেকেই পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, ও তদানীন্তন বিহার রাজ্য জুড়ে আন্দোলনের নিজস্ব কমিটি প্রতিষ্ঠা করে আদিবাসীরা দীর্ঘস্থায়ী তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে৷ বিশেষত সাঁওতাল সমাজের সামাজিক সংগঠন মাঝি–পারগাণা–র সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে এই আন্দোলন গতি পেয়েছে এবং দীর্ঘ চল্লিশ বছরের তীব্র আন্দোলনের ফলে সাঁওতালি ভাষা ২০০৩ সালে অষ্টম তফসিলের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে৷ কিন্তু তার পরেও পনেরো বছর অতিক্রান্ত হতে চলল তবুও রাজ্য বা কেন্দ্র কোনও সরকারই গুরুত্ব দিয়ে আদিবাসীদের মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদানের বিষয়ে নজর দেয়নি, দিচ্ছে না৷ রাজ্য সরকার পরিচালিত পণ্ডিত রঘুনাথ মুর্মু আবাসিক বিদ্যালয়গুলিতে দু’টি সেকশনের একটিতে সহজেই সাঁওতালি মাধ্যমে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করা যেত৷ একলব্য বিদ্যালয়গুলি ইংরেজি মাধ্যম হলেও তৃতীয় ভাষার জায়গায় সাঁওতালি রাখা যেত৷ কিন্তু এর কোনওটিই সিপিএম বা তৃণমূল সরকার করেনি৷ যে কয়টি বিদ্যালয়ে সাঁওতালি মাধ্যমে পড়ানো হয় তার অধিকাংশ বিদ্যালয়েরই নিজস্ব পরিকাঠামো নেই৷ অন্য বিদ্যালয়ের পরিকাঠামোতে এই বিদ্যালয়গুলি চলে৷ শিক্ষা যে কোনও মানবগোষ্ঠীর উন্নতি সাধনের প্রধান শর্ত৷ আদিবাসীরা নিজেরা চর্চার মধ্য দিয়ে ভাষার বিকাশ এবং লিপি উদ্ভাবন করেছেন৷ সেই লিপি ব্যবহারে সরকারের এই উদাসীনতা কি মেনে নেওয়া যায়? প্রাক স্বাধীনতা যুগ থেকে দীর্ঘ সংগ্রামে যে ভাষা এই জায়গায় এসে পৌঁছেছে, দেশে–বিদেশে যে ভাষার উপর গবেষণা ও চর্চা হচ্ছে, সেই ভাষাগোষ্ঠীর মানুষ তাঁদের মাতৃভাষার উপর এই ধরনের অবহেলা মেনে নিতে পারেন না৷ তাই বারে যখনই সাঁওতালি ভাষার বিষয়ে আন্দোলনের আহ্বান এসেছে তখনই তাঁরা হূদয়ের আবেগে নারী পুরুষ নির্বিশেষে সেই আন্দোলনে সামিল হয়েছেন৷ সাঁওতালি হচ্ছে মুণ্ডারী ভাষাগোষ্ঠীর সর্বাধিক মানুষের মাতৃভাষা৷ তাই সাঁওতাল ছাড়াও অন্যান্য মুণ্ডারী জনগোষ্ঠী তো বটেই ভারতবর্ষে মাতৃভাষা স্বীকৃতির আন্দোলনের পথিকৃৎ সাঁওতালি ভাষার আন্দোলনকে সকল আদিবাসী জনগোষ্ঠীই আবেগের সাথে সমর্থন করেন৷ এবং যে জনগোষ্ঠী নিজস্ব ভাষার স্বীকৃতির দাবিতে অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় ধরে আন্দোলন পরিচালনা করতে পারে তাদের মধ্যে এখনও সেই আন্দোলনকে চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো, নেতৃত্ব দেওয়ার মতো যোগ্য ব্যক্তিত্ব আছেন৷ তাই এই আন্দোলনকে বিপথে পরিচালিত করা বা বিশেষ তকমা দিয়ে পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সাহায্যে দমন করা যাবে না৷

অবিলম্বে সরকারকে আদিবাসীদের ন্যায়সঙ্গত গণতান্ত্রিক দাবিগুলি পূরণে সক্রিয় হতে হবে৷ অন্যথায় বিক্ষোভে বারবার ফেটে পড়বে আদিবাসী সমাজ৷

(৭১ বর্ষ ১২ সংখ্যা ২ – ৮ নভেম্বর, ২০১৮)