Home / খবর / আইন না থাকাই কি সমস্যা সমাধানের পথে বাধা

আইন না থাকাই কি সমস্যা সমাধানের পথে বাধা

রাজধানী দিল্লিতে বায়ুদূষণ ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করেছে। এমনিতেই দিল্লিতে দূষণের মাত্রা বেশি। শীতের আগমনে তা আরও বেড়ে গেছে। কেন্দ্রীয় সরকার তড়িঘড়ি ঘোষণা করেছে এবং সুপ্রিম কোর্টে জানিয়েছে, তারা এ সংক্রান্ত নতুন আইনের ব্যবস্থা করবে। এতে প্রশ্ন উঠেছে, তা হলে কি আইন ছিল না বলেই দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি? কিন্তু আইন তো ছিল। ১৯৮৬ সালের পরিবেশ আইনে দূষণ নিয়ন্ত্রণের ধারা রয়েছে। ১৯৮১ সালের আইন রয়েছে। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের হাতে ক্ষমতা রয়েছে এই আইনের বলে দূষণকারীদের শাস্তি দেওয়ার। তা হলে নতুন করে আইন আনতে হচ্ছে কেন?

আইন কী করতে পারে? কোনও সমস্যা ব্যাপক আকার ধারণ করলে আইন প্রয়োগ করে কিছুটা হলেও তা নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। যদিও এই শ্রেণিবিভক্ত পুঁজিবাদী সমাজে শাসকের করা আইন চালু হলে তা সবসময়ই শোষিত, নির্যাতিত শ্রেণির পক্ষে কাজ করবে এমন নয়। তবে সমাজ পরিচালনা করতে সমস্ত সমাজেই কিছু আইন-কানুন, নীতির প্রয়োজন হয়। সরকারে ক্ষমতাসীন দল আইনের যথাযথ প্রয়োগ করতে পারে, যদি দেশের মানুষের প্রতি তাদের দরদবোধ থাকে, জনস্বার্থে তারা আন্তরিক ভাবে কিছু করতে চায়। কিন্তু শাসক দলগুলি বহু সময়েই সমস্যা থেকে দায়মুক্ত হওয়ার উদ্দেশ্যে চটজলদি কিছু আইন আনে। ভাল ভাল কথায় ভরা বেশিরভাগ আইন সাধারণ মানুষের কোনও উপকারে লাগে না। দেখা গেছে, কোনও সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হলে বা সমালোচিত হলে কিংবা জনসাধারণের আন্দোলনের চাপে বাধ্য হয়ে সরকার তড়িঘড়ি একটা আইন করেই দায় ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করে।

২০১২ সালে দিল্লিতে নির্ভয়া ধর্ষণের নৃশংস ঘটনায় দেশজুড়ে যখন প্রবল আন্দোলনে ফেটে পড়েছে মানুষ। সরকার পুলিশ নামিয়ে, জলকামান চালিয়েও প্রতিহত করতে পারেনি রাজধানীর বিক্ষোভ। তা ছড়িয়ে পড়েছে দেশের সর্বত্র, দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যর্থতায় ছিছি পড়ে গেছে। সেরকম একটা সময়ে সরকার নিয়ে এল নির্ভয়া আইন। ভাবটা এমন যে, এরপর কোনও মহিলার উপর অত্যাচার হলে এই আইনের প্রয়োগ হবে তৎক্ষণাৎ! বাস্তব কী বলছে? প্রয়োগ হচ্ছে কি এই আইনের? শাস্তি হচ্ছে কি নির্যাতনকারীদের? অতি বড় বিজেপি নেতাও হ্যাঁ বলতে পারবেন না। একের পর এক নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেই চলেছে। ভারত বিশ্বের মধ্যে নারী নির্যাতন-ধর্ষণের তালিকার শীর্ষে। শিশু থেকে বৃদ্ধা– পাশবিক লালসার শিকার সকলেই। প্রতি ১৫ মিনিটে একজন করে মহিলা ধর্ষিতা হচ্ছেন। প্রতিদিন ৮৮ জন মহিলা পাশবিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। কিন্তু আইনের প্রয়োগ ঘটিয়ে দুষ্কৃতীদের শাস্তি দেওয়া দূরের কথা, বহু ক্ষেত্রেই দুষ্কৃতীদের পক্ষ নিচ্ছে সরকার, বহু জায়গায় তাদের অপরাধকে ধামাচাপা দিচ্ছে নির্লজ্জ কদর্যতায়। আর শাসক দলের নেতা-পুলিশ-দুষ্কৃতীদের ভয়ে নির্যাতিতের পরিবারকে এলাকাছাড়া হতে হচ্ছে প্রাণভয়ে।

এর আগেও দেশের মানুষ বহু আইন প্রচলন হতে দেখেছে, মানুষের বহু অধিকারের প্রশ্ন আলোচিত হয়েছে। কিন্তু তা কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। কংগ্রেস সরকারের আমলে বহু বিজ্ঞাপনের জৌলুসে আনা হয়েছিল খাদ্যের অধিকার আইন, শিক্ষার অধিকার আইন। তার দ্বারা সাধারণ মানুষের কাছে খাদ্যের সুযোগ পৌঁছেছে নাকি? শিক্ষার অধিকার সকলে, অন্তত বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রী পেয়েছে নাকি? টন টন খাদ্যশস্য পচে নষ্ট হচ্ছে সরকারি গুদামে। সরকার মদ কোম্পানিগুলিকে সেই চাল দিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু গরিব মানুষ অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন। দুবেলা দুমুঠো খাবারের জোগাড়ের জন্য প্রাণপাত করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। পরিবারের সকলে মিলে কাজের চেষ্টা করেও সংসার চালাতে পারছেন না অসংখ্য মানুষ। অপুষ্টি অনাহারে বহু শিশুর মৃত্যু হচ্ছে, খাদ্যের অভাবে রোগের প্রকোপে অকালে ঝরে যাচ্ছে অসংখ্য জীবন। বিশ্ব ব্যাঙ্কের রিপোর্ট বলছে, ২০২১ সালের শুরুতে অন্তত ১৫ কোটি মানুষ চরম দারিদ্রের মধ্যে পড়বেন।

শিক্ষাক্ষেত্রের অবস্থাও ভয়াবহ। শিক্ষার বেসরকারিকরণের নীতির পরিণামে ক্রমশ বেশি সংখ্যক ছাত্রছাত্রী শিক্ষাঙ্গনের বাইরে চলে যাচ্ছে প্রতি বছর। ‘অধিকার’ কথাটি আইনের বইয়েই শোভা পাচ্ছে। শিক্ষার খরচ জোগাতে না পারায় সন্তানের পড়াশোনা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন বহু অভিভাবক। প্রায় দিনই সংবাদমাধ্যমে দেখা যায়, বিপুল সংখ্যক ছাত্র ফি দিতে না পারায় পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। এনএসও রিপোর্টে জানা গেছে, স্কুল বা কলেজে ভর্তি হওয়া প্রতি আট জন ছাত্রের মধ্যে একজন মাঝপথে পড়া ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় এবং মোট ড্রপআউটের ৬২ শতাংশই হয় স্কুলশিক্ষায়।

তা হলে শুধু আইন করে দিলেই কি মানুষ সমস্যামুক্ত হয়? আইন তৈরি করে যে সরকার, তারা কি সত্যিই চায় আইনের সুযোগগুলি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে? এর জন্য সাধারণ মানুষের প্রতি যে দরদবোধ থাকা দরকার তা কি তাদের রয়েছে! তা থাকলে এই আইনের প্রয়োগ ঘটিয়ে এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থাতেও বহু সমস্যার সমাধান সম্ভব। কিন্তু ক্ষমতা দখল এবং তা ভোগ করাই যাদের একমাত্র লক্ষ্য, তাদের সে সব বালাই নেই। সে কারণে তারা মানুষকে দেখে ভোটের বোড়ে হিসাবে। তাদের কাছে সাধারণ মানুষ এক একটা সংখ্যা মাত্র। শাসক-শাসিতে বিভক্ত সমাজে শাসকের রাজনৈতিক ম্যানেজার সরকারগুলি দেশ-কাল ভেদে সর্বত্র এই ভূমিকাই পালন করে চলেছে।

ফলে গালভরা নানা নামের আড়ালে আইনগুলো হয়ে দাঁড়িয়েছে সরকারের ব্যর্থতার রক্ষাকবচ। তাই আইনের প্রয়োগ ঘটাতে প্রয়োজন জীবনের সমস্যাগুলি নিয়ে জনগণের নেতৃত্বে দুর্বার আন্দোলন। একমাত্র আন্দোলনের চাপে ফেলেই শাসক দলকে আইন প্রয়োগ করতে বাধ্য করা সম্ভব।

(ডিজিটাল গণদাবী-৭৩ বর্ষ ১১ সংখ্যা_২৭ নভেম্বর, ২০২০)