Breaking News
Home / খবর / অভিন্ন পরীক্ষার আড়ালে মেডিকেল শিক্ষায় ‘ফেলো কড়ি মাখো তেল’ নীতি

অভিন্ন পরীক্ষার আড়ালে মেডিকেল শিক্ষায় ‘ফেলো কড়ি মাখো তেল’ নীতি

দু’বছর আগে বিভিন্ন রাজ্যভিত্তিক জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষা তুলে দিয়ে মেডিকেল ও ডেন্টাল কোর্সে ভর্তির জন্য সারা দেশ জুড়ে অভিন্ন প্রবেশিকা পরীক্ষা ‘নিট’ (ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট) চালু হয়৷ তখন সরকারের একটি অন্যতম যুক্তি ছিল, এর ফলে দেশের বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলিতেও নিট উত্তীর্ণ  ছাত্ররাই ভর্তি হতে পারবে৷ ফলে মান নিয়ন্ত্রণ এবং সেই সঙ্গে বেসরকারি কলেজগুলিতে ভর্তি ফি ও ক্যাপিটেশন ফি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে৷ আওয়াজ তোলা হল, এক দেশ –এক পরীক্ষা৷ কিন্তু দ্বিতীয়বার নিট থেকে ছাত্র ভর্তি শুরু হওয়ার আগেই ঝুলির বেড়াল বেরিয়ে পড়েছে৷ ৬ জুলাই থেকে প্রথম দফার ভর্তি শুরু হচ্ছে রাজ্যের মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজগুলিতে, সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে তা ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে৷ এই অবস্থাতে দেশের নবাগত মেডিকেল পড়ুয়ারা কতটা অভিন্ন তার হালটা একটু দেখে নেওয়া যাক৷

চলতি বছরে এ রাজ্যে সতেরোটি সরকারি মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজ ছাড়াও তিনটি বেসরকারি মেডিকেল ও তিনটি বেসরকারি ডেন্টাল কলেজে ছাত্র ভর্তি হবে৷ যেটি এ রাজ্যের প্রথম বেসরকারি মেডিকেল কলেজ, একসময় সেটি আমাদের দেশের একজন অত্যন্ত স্বনামধন্য চিকিৎসক ডাঃ কুমুদশঙ্কর রায়–এর আমৃত্যু সাধনাতে গড়ে উঠেছিল৷ সিপিএম সরকার ডাঃ কে এস রায়ের নামাঙ্কিত হাসপাতালটি ন্যূনতম মূল্যে একটি বেসরকারি উদ্যোগের হাতে তুলে দিয়েছিল ‘জনসেবা’ করতে৷ ছাত্রস্বার্থে তার অবদান কেমন? নিট থেকে সরকারি কোটায় সেখানে ছাত্র ভর্তি হয় ৫০ জন, আর বাড়তি খরচ দিয়ে ‘ম্যানেজমেন্ট কোটাতে’ ভর্তি হয় ৭৭ জন৷ বাকি প্রতিটি মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজেও অনুপাতটি প্রায় অনুরূপ৷ প্রাইভেট কলেজে সরকারি কোটার ছাত্রদের মাত্র চার বছর আগে সেমেস্টার ফি ছিল ৬০,০০০ টাকা, গত বছর নিট চালু হওয়ার পর লাফিয়ে বেড়ে সেটি দাঁড়িয়েছিল ৯৫,০০০ টাকায়৷ বর্তমানে হতে চলেছে ১ লক্ষ ১০ হাজার টাকা৷ এর বাইরে আছে ম্যানেজমেন্ট কোটা৷ কোনও ছাত্রের নিট র্যাঙ্ক যদি থাকে, তা হলেই সে ওই আসনের জন্য আবেদন করতে পারে, একটি মাত্র শর্তে – ম্যানেজমেন্ট কোটার খরচ চালাতে তাকে সক্ষম হতে হবে৷

কেমন সেই খরচ? রাজ্যের তিনটি বেসরকারি কলেজে এই পরিমাণ বর্তমানে ৪০ থেকে ৫৮ লাখ এবং ডেন্টালে ১৫ থেকে ১৮ লাখ৷ কয়েকদিন আগেই রাজ্যের নিট উত্তীর্ণ ছাত্রদের নথিপত্র যাচাই করা হল কলকাতার কয়েকটি মেডিকেল কলেজে৷ ছাত্রদের সাহায্য করার জন্য উপস্থিত ছিলেন অল ইন্ডিয়া ডিএসও–র মেডিকেল ইউনিটের ছাত্ররা৷ মেদিনীপুরের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে এসেছিল এক গরিব পরিবারের মেধাবী ছাত্র৷ নিটে তার rank অনুসারে সে এ বছর সরকারি মেডিকেল কলেজে হয়তো সুযোগ পাবে না৷ বেসরকারি কলেজে সম্ভাব্য ফি–এর অঙ্ক শোনার পর সে দুটো চোখ ছানাবড়া করে তাকিয়ে রইল ডিএসও কর্মীর দিকে– বিস্ময়ে হতবাক তার ঠিক পরের দিন এসেছিল এক দুবাই প্রবাসী বঙ্গললনা৷ যে rank হয়েছে তাতে তার মেডিকেলে সুযোগ পাওয়ার কোনও সম্ভাবনাই নেই, তবুও কেন সে এসেছে জানতে চাওয়ায় তার ‘মম’–এর সহজ উত্তর– ‘ম্যানেজমেন্ট কোটা’তে অ্যাপ্লাই করা আছে৷ এই হল অভিন্ন দেশের অভিন্ন প্রবেশিকা৷

লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে ফি৷ গত বছর যেটা ছিল ৩৪ লাখ টাকা, সেটা এখন বেড়ে হয়েছে ৪০ লাখ টাকা, যেখানে ছিল ৩৬ লাখ টাকা এক ধাক্কাতে তা বেড়ে ৫৮ লাখ টাকা৷ সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হল, ছাত্রদের ভর্তির সময় যে ফি বলা হয়, অনেক ক্ষেত্রেই পঠনপাঠন শুরুর পর দেখা যায় তা বেড়ে গেছে৷ ফি নির্ধারণের জন্য অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের নিয়ে গড়া ‘ফি ফিক্সেশন কমিটি’ থাকলেও তার ভূমিকা কেমন সেটা বোঝা যায় কে পি সি মেডিকেল কলেজে পাঠরত ফাইনাল ইয়ারের এক ছাত্রের কথায়৷ ‘প্রথম বর্ষে যখন পড়তে আসি তখন সেমেস্টার ফি ছিল ষাট হাজার টাকা, দ্বিতীয় বর্ষে গিয়ে ম্যানেজমেন্ট ঘোষণা করল সেমেস্টার প্রতি সাতাত্তর হাজার টাকা দিতে হবে৷ আমি ব্যাঙ্ক লোন নিয়ে পড়াশোনা করি, পড়লাম অথৈ জলে৷ বাড়তি টাকা কোথা থেকে আসবে? কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে প্রিন্সিপালের সাথে দেখা করতে গেলাম৷ তিনি সাফ জানিয়ে দিলেন টাকা দিতে না পারলে পড়বে না৷ আমরা প্রতিবাদ করার কথা বলতেই আবার তলব করা হল৷ সাফ জানিয়ে দিলেন, প্রতিবাদ করতেই পারি, কিন্তু পাশটা করান তাঁরা৷ সেটা মাথায় রেখে যেন এগোই৷’ গত বছর একইভাবে উত্তরাখণ্ডের শ্রী গুরু রাম রাই ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল অ্যান্ড হেলথ সায়েন্সেস–এ প্রথম বর্ষের টিউশন ফি ৫ লাখ টাকা থেকে কোর্সের মাঝপথে বাড়িয়ে ১৯ লাখ ৭৬ হাজার করায় বিক্ষোভে  ফেটে পড়েন ছাত্র–ভিভাবকরা৷

দেশ জুড়ে প্রাইভেট মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজগুলির এই রমরমা ব্যবসার বন্দোবস্ত করার ব্যাপারে সরকারগুলি কতটা তৎপর? দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মেডিকেল শিক্ষার ও স্বাস্থ্যের উন্নয়নের ধুয়ো তুলে বেশ কিছু কলেজকে পরিকাঠামোর তোয়াক্কা না করেই ‘ডিমড্ ইউনিভার্সিটি’র মর্যাদা দেওয়া হয়েছে৷ নিট চালুর সময় তাদের ফি নিয়ন্ত্রণ ও সমতা আনার ব্যাপারেও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়৷ কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল কিছুই হল না৷ শেষপর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট ইউ জি সি–কে আদেশ দেয় ফি নির্ধারণের জন্য জাতীয় স্তরে এগারো সদস্যের একটি কমিটি তৈরি করতে৷ কিন্তু আস্ফালনই সার৷ সকলকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে  চলতি বছরে তারা তাদের নিজেদের মতো করেই ৮ লাখ ৮০ হাজার থেকে ২৫ লাখের বিনিময়ে ছাত্র ভর্তি করছে৷

তা হলে নিট চালু হয়ে পরিবর্তন কী হল? পরিবর্তন যেটুকু হল, তা হল র্যাঙ্ক পাওয়ার জন্য এখন আর নির্দিষ্ট কোনও ন্যূনতম নম্বরের ব্যাপার রইল না৷ তার বদলে এল ‘পার্সেন্টাইল’ পদ্ধতি৷ সর্বোচ্চ আর সর্বনিম্ন নম্বর প্রাপ্তদের ৫০ পার্সেন্টাইল পর্যন্ত ছাত্রদের র্যাঙ্ক প্রদান করার ফলে অত্যন্ত নিম্ন নম্বর প্রাপকেরাও র্যাঙ্কের মধ্যে এসে ট্যাঁকের জোরে মেডিকেলের আসন কেনার বৈধতা পেল৷ চলতি বছরে ৭২০ নম্বরের যে নিট পরীক্ষা হয়েছিল, তাতে দেখা যাচ্ছে জেনারেল ক্যাটিগরিতে মাত্র ১৬.৫২ শতাংশ নম্বর প্রাপকও র্যাঙ্ক পেয়েছে৷ অর্থাৎ মেডিকেলের আসন কেনার ছাড়পত্র তাকেও দেওয়া হয়েছে৷ দ্বিতীয়ত, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠতে থাকা মেডিকেল কলেজগুলিতে ছাত্র পেতে যাতে কোনও অসুবিধা না হয়, তাই সারা দেশের পয়সাওয়ালা ছাত্রছাত্রীদের কাছে দেশের সব প্রান্তের মেডিকেল আসন ‘ব্যবসার’ দ্বার খুলে দেওয়া হল৷ এখন এই নিট পরীক্ষা নেওয়ার দায়িত্ব ‘ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি’ কে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে৷ তারা ২০১৯ সাল থেকে বছরে ২ বার পরীক্ষা নেওয়ার পরিকল্পনা ইতিমধ্যেই প্রস্তুত করে রেখেছে৷ এর অর্থ হল, একই পরিকাঠামোতে বছরে দু’বার ছাত্র ভর্তি হবে, তাতে ছাত্রদের সমস্যা যাই হোক, প্রাইভেট মালিকদের ব্যবসা ফুলে ফেঁপে উঠবে সন্দেহ নেই৷

কর্পোরেট ব্যবসায়ীদের মুনাফার পথ আরও সুগম করতেই, কেন্দ্রীয় সরকার এখন আনতে চলেছে ‘ন্যাশনাল মেডিকেল কমিশন বিল’৷ যা সমর্থন করেছে পশ্চিমবঙ্গ সহ প্রতিটি রাজ্য সরকার এবং দেশের সমস্ত রাজনৈতিক দল ও তাদের ছাত্র সংগঠনগুলি৷ একমাত্র ছাত্র সংগঠন অল ইন্ডিয়া ডিএস ও এই বেসরকারিকরণ, লাগামহীন ফি–বৃদ্ধি, সর্বনাশা এনএমসি বিল এবং সরকারগুলির মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে লাগাতার আন্দোলন করে যাচ্ছে৷

ছাত্রছাত্রীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ যেটুকু আছে, তার জন্য যে খরচ বহন করতে হয়, তার পরেও ভবিষ্যতের কোনও নিশ্চয়তা নেই, চাকরি নেই, গবেষণার সুযোগ নেই৷ এই বাতাবরণের মধ্যে পড়ে অসহায় মানুষ তাঁর মেধাবী সন্তানের জন্য মেডিকেল শিক্ষাকে পাখির চোখ দেখছেন৷ পাশ করে ডাক্তার হলে সমস্ত খরচ পুষিয়ে নিতে পারবে– আত্মকেন্দ্রিক সমাজের এই মনন চিকিৎসাবিজ্ঞানের নৈতিকতার মারাত্মক ক্ষতি করলেও সে ব্যাপারে সরকারগুলির কোনও হেলদোল নেই৷ বরং মানুষের অসহায়তার সুযোগ কাজে লাগিয়ে তাদের প্রিয় কর্পোরেট ব্যবসায়ীরা যাতে আরও বেশি বেশি মুনাফা করতে পারে, তার জন্য সব রকমের বন্দোবস্ত তারা করে দিচ্ছে৷

ছাত্রছাত্রীদের স্বার্থ, মেডিকেল শিক্ষার পরিকাঠামো, চিকিৎসকের মান ইত্যাদি প্রশ্নগুলি সরকারের কাছে নেহাত গৌণ হয়ে গেছে৷ পণ্যায়নের এই লাগামহীন বাড়বাড়ন্তকে সরকারগুলি প্রশ্রয় দেওয়ার ফলে তলানিতে ঠেকছে চিকিৎসকের মান, নীতি–নৈতিকতা৷ তীব্র আন্দোলন ছাড়া এই সমস্যা সমাধানের দ্বিতীয় কোনও পথ নেই৷

(৭০ বর্ষ ৪৬ সংখ্যা ৬ জুলাই, ২০১৮)