Home / খবর / অন্ধকার চরাচরে মহম্মদ মুসারা জ্বালিয়ে রেখেছেন প্রদীপ

অন্ধকার চরাচরে মহম্মদ মুসারা জ্বালিয়ে রেখেছেন প্রদীপ

ভাগ্যিস সেদিন চোখে পড়ে গিয়েছিল মহম্মদ মুসার না হলে আজও হয়তো দিন কাটত কাগজ কুড়িয়ে, কিংবা কোথাও কোনও ছোট কারখানায় বা ইটভাটায় দিনমজুরি করে৷ জীবনটা তো সেদিকে মুখ করেই শুরু হয়েছিল জিতেনের৷

জিতেন টুডু৷ উত্তর দিনাজপুরের এই আদিবাসী ছাত্র এবার উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেছে ৭৫ শতাংশ অর্থাৎ স্টার নম্বর নিয়ে৷ মেধা তালিকায় জায়গা পাওয়া উজ্জ্বল মুখগুলির সঙ্গে খবরের কাগজে ছবি বেরিয়েছে জিতেনেরও৷ পাশে হাসি মুখে কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়ে বাবা মহম্মদ মুসা৷

বাবা হ্যাঁ৷ জন্মদাতা না হলেই বা কী, পিতার দায়িত্ব তো পালন করেছেন তিনিই উনি না থাকলে অন্ধকার থেকে কে হাত ধরে আলোয় টেনে আনত জিতেনকে? সেই ছোট্টবেলায় দিদিমার কাছে ফেলে রেখে ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে মা৷ বাবাও নিরুদ্দেশ সেই ছোটকালেই৷ গরিব দিদিমার সঙ্গে পথে পথে কাগজ কুড়িয়ে বেড়াত পাঁচ বছরের জিতেন৷ রোজগার বলতে সেটাই৷ পাশের গ্রামের ছোট চাষি মহম্মদ মুসা৷ একদিন চোখে পড়ে, বাচ্চাটা রাস্তা থেকে কাগজ কুড়িয়েই ঝোলায় ভরে নেয় না৷ প্রথমে মন দিয়ে পড়ে সেটা৷ তারপর ঝোলায় রাখে৷ অবাক হন মুসা৷ খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, পাশের গ্রাম গোয়ালগাঁওয়ে বাড়ি এই আদিবাসী ছেলেটির৷ পড়াশোনায় আগ্রহ আছে, একসময় স্কুলে ভর্তিও হয়েছিল৷ কিন্তু অভাবের জ্বালায় সুক্লের বদলে কাগজ কুড়াতে যেতে হয়৷

কেমন মায়া হয় মহম্মদ মুসার৷ রাগও৷ কেন এমন হবে? কী অপরাধ এই ছোট্ট ছেলেটার? শুধু গরিব বলে সমস্ত স্বপ্ন, আগ্রহকে গলা টিপে মারতে হবে বর্ণমালা, জ্ঞান–বিজ্ঞানের আশ্চর্য জগৎ আকাশের চাঁদের মতো অধরা হয়ে থাকবে আর ছেলেটা ধুলোমাখা পায়ে পথে পথে ঘুরে কাগজ কুড়িয়ে বেড়াবে না, এ হতে দেওয়া যায় না৷

দু’বার ভাবেননি মুসা৷ জিতেন আর তাঁর ধর্মবিশ্বাস যে আলাদা, মনে আসেনি সে কথাও৷ জয় হয়েছে কর্তব্যবোধের, জয় হয়েছে মানবিকতার৷ দিদিমার অনুমতি নিয়ে মুসা বাড়িতে নিয়ে এসেছেন জিতেনকে৷ ভর্তি করে দিয়েছেন স্কুলে৷ বছরের পর বছর ধরে হাসিমুখে বহন করে গিয়েছেন তাকে বড় করার, পড়াশোনা করানোর সমস্ত খরচ৷ শুধু মুসাই বা কেন? স্ত্রী রহিমাও নিজের চার সন্তানের মতো করেই কোলে টেনে নিয়েছেন জিতেনকে৷ মা–বাপ হারা জিতেন টুডুর কাছে রহিমা–ই আজ মা, আর বাবা মহম্মদ মুসা৷ এ বছর উচ্চ মাধ্যমিকে জিতেনের ভাল রেজাল্টে তাই আনন্দের সীমা–পরিসীমা নেই মুসা–রহিমাদের৷

এই তো মানবধর্ম– সুস্থ স্বাভাবিক মনুষ্যত্ববোধ বিপন্ন অসহায় মানুষের দিকে চোখ পড়লে এই বোধই তো অস্থির করে তোলে মানুষকে৷ ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতির ভিন্নতা ছাপিয়ে তখন বড় হয়ে ওঠে এক মানুষের প্রতি আর এক মানুষের নিখাদ মমতা৷ এই মমতাই যেন ঘুম ভাঙিয়ে জাগিয়ে দিয়ে যায়৷ তাই থ্যালাসেমিয়ার রোগী ছোট্ট মেয়ে রেখা দাসকে রক্ত দিতে রমজান মাসে রোজা ভাঙতে পিছিয়ে যান না কালীগঞ্জের ওসমান গনি শেখ৷ তাঁর নিজস্ব ধর্মাচরণের ছোট গণ্ডি কখন যেন ভেঙেচুরে মিশে যায় মানবধর্মের অসীমতায়৷ এই মানবধর্মই বিপদের সামনে নিষ্ক্রিয় থাকতে দেয় না রউফ আহমদ দারকে৷ কাশ্মীরের উত্তাল নদীতে নৌকা উল্টে পাঁচ পর্যটক যখন মৃত্যুর দোরগোড়ায়, তখন প্রাণের পরোয়া না করে ঝাঁপিয়ে পড়েন রউফ৷ নিজের জীবনের বিনিময়ে রক্ষা করেন ওই পাঁচজন মানুষকে যাদের ধর্ম পরিচয় জানবার কোনও ইচ্ছাও তাঁর জাগেনি৷

হ্যাঁ, এই দেশেরই ঘটনা এসব৷ যে ভারতে ধর্মে ধর্মে বিভেদের শিঙা ফুঁকে ভোটে জেতে রাজনৈতিক দল, সেই ভারতেরই নাগরিক মহম্মদ মুসা, ওসমান গনি, রউফ আহমদ দারের মতো মানুষরা৷ যখন এক ধর্মের মানুষের ত্রাতা সেজে আর এক ধর্মের অনুসারীদের পায়ের তলায় দাবিয়ে রাখার ছক কষে মতলববাজরা, বানিয়ে তোলা বিষাক্ত পরিবেশে তীব্র হয়ে ওঠে মানুষের প্রতি মানুষের অবিশ্বাস আর ভরসাহীনতা, কালকের যে প্রতিবেশী ছিল পরম বন্ধু, আজ যখন তারই দৃষ্টিতে ঝিকিয়ে ওঠে গরল, তখন চরাচর জুড়ে নেমে আসা অন্ধকারে আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখেন মুসা–ওসমান–রউফর৷ ভরসা হয় তাঁদের দেখে৷ আস্থা ফেরে হাজারো ঝড়–ঝঞ্ঝা পার হয়ে আসা মানবসভ্যতার অপ্রতিরোধ্য বিজয়যাত্রার অবশ্যম্ভাবিতায়৷

(গণদাবী : ৭১ বর্ষ ৪৪ সংখ্যা)