Breaking News
Home / খবর / অগ্নিপথ আগুন ধরিয়েছে জমে থাকা ক্ষোভের বারুদে

অগ্নিপথ আগুন ধরিয়েছে জমে থাকা ক্ষোভের বারুদে

কলকাতা হাজরা মোড়ে বিক্ষোভ ১৮ জুন।

ঠিকায় সেনা নিয়োগের ‘অগ্নিপথ’ প্রকল্প কেন্দ্রের মোদি সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে গোটা দেশে। হাজারে হাজারে চাকরিপ্রার্থী তরুণ প্রবল বিক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। বিক্ষোভকারীদের অনেকে আহত, গ্রেপ্তার বহু, এমনকি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।

বিহার থেকে শুরু হয়ে বিক্ষোভের আগুন যে দ্রুততা ও তীব্রতার সঙ্গে একের পর এক রাজ্যে ছড়িয়েছে, যে বেপরোয়া মনোভাব নিয়ে অসংখ্য তরুণ রাস্তায় নেমে সরকারবিরোধী ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন, তা থেকে দেশের বেকার সমস্যার ভয়াবহ চেহারাটা নগ্ন হয়ে গেল। এই প্রবল ক্ষোভের যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে।

কর্মীদের গ্রেপ্তার করছে পুলিশ

 

সরকারে বসার মুখে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দেওয়া বছরে ২ কোটি বেকারের চাকরির প্রতিশ্রুতি শূন্যে মিলিয়ে গিয়ে কর্মহীনতা আজ গত ৪৫ বছরের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। এই অবস্থায় কয়েকটি রাজ্যে আসন্ন বিধানসভা ভোট ও ২০২৪-এর লোকসভা ভোটের দিকে তাকিয়ে গত ১৪ জুন প্রধানমন্ত্রী ১০ লক্ষ সরকারি চাকরির ঘোষণা করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে ৪৫ হাজার ঠিকা-সেনার এই ‘অগ্নিপথ’ প্রকল্প। এই প্রকল্পে মাত্র চার বছরের জন্য মাসিক ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা বেতনে সেনাবাহিনীতে কাজ পাবেন যুবকরা। তাঁদের গালভরা নাম ‘অগ্নিবীর’। চার বছর পরে এঁদের ৭৫ শতাংশের হাতে ১১ থেকে ১২ লক্ষ টাকা ধরিয়ে দিয়ে বাধ্যতামূলক ভাবে অবসর দেওয়ানো হবে। চাকরি শেষে পেনশন দূরের কথা, পিএফ-গ্র্যাচুইটির ব্যবস্থাও থাকবে না। অর্থাৎ ২২ থেকে ২৭ বছর বয়সের মধ্যেই এই তরুণরা আবার কর্মহীন হয়ে পড়বেন। পুঁজি বলতে ওই সামান্য টাকা, চার বছর পরে যার মূল্য কোন তলানিতে গিয়ে ঠেকবে কেউ জানে না।

চাকরি দেওয়ার নামে লক্ষ লক্ষ তরুণের সঙ্গে মোদি সরকারের এই কৌশলী প্রতারণা, এই ধূর্ত শঠতার বিরুদ্ধে সঙ্গত কারণেই দেশ জুড়ে অগ্নিস্রাবী ক্ষোভ আছড়ে পড়েছে। বিপদ বুঝে আবেদনকারীর বয়সসীমা বাড়ানো থেকে শুরু করে একের পর এক শর্ত আলগা করছে সরকার। কিন্তু কাজের আশায় হা-পিত্যেশ করে বসে থাকলেও চার বছরের চুক্তিতে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে ঠিকা-সেনার কাজ করতে রাজি নয় দেশের তরুণ-সমাজ।

কর্মীদের গ্রেপ্তার করছে পুলিশ

তীব্র বেকার সমস্যায় বিপর্যস্ত এই দেশে গত দু’বছরের অতিমারি পরিস্থিতি অসংখ্য পরিবারকে পথে বসিয়েছে। কল-কারখানা বন্ধ হয়ে কাজ চলে গেছে অসংখ্য মানুষের। ছাঁটাই হয়ে, অর্ধেক বা তারও কম বেতনে সংসারের জোয়াল টানতে টানতে অবসন্ন আরও বহু জন। স্বাভাবিক ভাবেই কর্মসংস্থানের বড় ক্ষেত্র সেনাবাহিনীর দিকে অনেক আশা নিয়ে তাকিয়ে ছিলেন দেশের তরুণ-যুবকরা। গত দু’বছর নিয়োগ বন্ধ থাকার পর এ বছর সেখানে বড় সংখ্যায় নিয়োগ হবে– এই আশায় অনেকেই ইতিমধ্যে লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে সেনা-বাছাই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য ট্রেনিং নিয়েছেন। অসংখ্য তরুণ প্রতিদিন সেনাবাহিনীতে কাজ পাওয়ার প্রস্তুতি হিসাবে সকাল-বিকেল কঠোর শারীরিক কসরত করেন। এই অবস্থায় চার বছরের জন্য ঠিকায় সেনা নিয়োগের এই ঘোষণা তাঁদের আশা-ভরসার মুখে বিরাট এক থাপ্পড়ের মতো এসে পড়েছে। অবসর নেওয়ার পর বাকি জীবনটা কী ভাবে কাটবে, সেইসময় বয়স বেশ খানিকটা বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে কোথায় কাজের সুযোগ মিলবে, কী করেই বা পরিজনদের জন্য দু-মুঠো অন্নের ব্যবস্থা করা যাবে– এইসব প্রশ্নের আঘাত তাঁদের অস্থির করে তুলেছে। দেশজোড়া এই প্রবল যুববিক্ষোভ তারই বহিঃপ্রকাশ।

ঠিকায় সেনা নিয়োগের এই ঘোষণা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এনে দিল। স্পষ্ট করে দিয়ে গেল, অচিরেই ভারতকে ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি বানিয়ে ফেলার ঢাক পেটানো বিজেপি সরকারের রাজকোষের হাঁড়ির হালটিকে। স্বাধীনতার পর গত ৭৫ বছরে কেন্দ্রে একের পর এক যে সরকারগুলি শাসন চালিয়েছে, তারা প্রত্যেকেই পুঁজিবাদী ভারত রাষ্ট্রের মালিক পুঁজিপতি শ্রেণির রাজনৈতিক ম্যানেজার হিসাবে মালিকের মুনাফার স্বার্থে দেশের খেটে-খাওয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে শোষণের কাজটি করে গেছে। সেই পথ ধরে কেন্দ্রের বর্তমান বিজেপি সরকার দেশের বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে শুরু করে জনসাধারণের হাড়ভাঙা শ্রমে গড়ে ওঠা সমস্ত রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ও সম্পত্তিগুলিকে একচেটিয়া পুঁজিমালিকদের মুনাফা-লুটের অবাধ ক্ষেত্রে পরিণত করেছে। পুঁজিপতিদের অগুণতি ছাড় ও অন্যায় সুযোগ-সুবিধা দিতে গিয়ে রাজকোষ শূন্য করে ফেলেছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সরকারি দলের নেতা-মন্ত্রী-আমলা ও পারিষদদের ব্যাপক দুর্নীতি ও অবাধ লুঠতরাজ, জনগণের ঘাম-ঝরানো শ্রমের টাকায় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের বড়কর্তাদের দেদার বিলাস-ব্যসন ও আড়ম্বর। এই করতে করতে রাজকোষের পরিস্থিতি আজ এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, সেনাবাহিনীর মতো পুঁজিবাদী রাষ্টে্রর অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি স্তম্ভের কর্মীদের পর্যন্ত উপযুক্ত বেতন দিতে, অবসরের পর তাঁদের পেনশনের বন্দোবস্তটুকু করতেও এই সরকার আজ হিমসিম খাচ্ছে। এই অবস্থায় শিল্পপতি-ধনকুবেরদের বিপুল মুনাফায় হাত না দিয়ে, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-পরিবহণ সহ জনসাধারণের জন্য পরিষেবামূলক প্রকল্পগুলিতে বরাদ্দ ছাঁটাই করে তারা সমস্যা সামাল দিতে চাইছে। চাকরির স্থায়ী পদগুলিকে অস্থায়ী করে দিচ্ছে। পিএফ, পেনশনের দায়িত্ব কাঁধ থেকে ঝেড়ে ফেলতে চাইছে। পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থরক্ষাকারী সরকারের এ হল ঘোষিত নীতি। এবার ‘অগ্নিপথ’ প্রকল্পের মাধ্যমে সেনাবাহিনীকেও এর আওতায় আনার অপচেষ্টা শুরু হল। এভাবেই অবিরাম লুঠতরাজে শূন্য হয়ে যাওয়া রাজকোষের বোঝা সরকার চাপিয়ে দিতে চাইছে বেকার সমস্যায় জর্জরিত খেটে খেতে চাওয়া দেশের তরুণ সমাজের কাঁধে। এই পথেই সাধারণ সৈনিকদের ভাতে মেরে উন্নত প্রযুক্তিসমৃদ্ধ আধুনিক অস্তে্রর সম্ভার বাড়ানোর টাকা জোগাড়ের মতলব করছে সরকার।

এ প্রসঙ্গে আরও একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক, যে কোনও সঙ্কট থেকে জনগণের দৃষ্টি ঘোরাতে বারবারই দেশপ্রেম ও উগ্র জাতীয়তাবোধ প্রচারের আশ্রয় নিতে দেখা গেছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকে। প্রতিবারই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তাঁর ঘনিষ্ঠ মন্ত্রী-নেতারা এ কাজে হাতিয়ার করেছেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর সৈনিকদের। চাকরি করতে গিয়ে প্রতিকূল পরিবেশে তাঁদের কষ্টকর দিনযাপন, সর্বোপরি প্রাণের ঝুঁকি নিয়েও কর্তব্য পালন– ইত্যাদি বিষয়কে ‘দেশপ্রেম’-এর গরিমা-রসে ডুবিয়ে দেশের মানুষের কাছে পরিবেশন করেছেন এবং ভোটে তার ফয়দা লুটেছেন মোদিজি ও তাঁর সহযোগীরা। দেশবাসীর মনে দেশপ্রেমের সেন্টিমেন্ট জাগাতে সৈনিকদের তাঁরা বিজ্ঞাপনের মুখ করেছেন বারবার। কিন্তু এসবই যে মোদিজিদের নেহাত স্বার্থসিদ্ধির দাবার চাল, তা প্রমাণ করে দিল এই ‘অগ্নিপথ’ প্রকল্প। দেখিয়ে দিল, মুখে যাই বলুক, এই সৈনিকরা বাস্তবে এক প্রখ্যাত গায়ক-কবি কথিত ‘দেশপ্রেমের দিনমজুর’ ছাড়া আর কিছুই নয়। সেই কারণেই আজ সেই ‘মহান’ সৈনিকদের স্রেফ ঠিকা-শ্রমিকে পরিণত করতে মোদি সরকারের এক মুহূর্তেরও দ্বিধা হয়নি। ঠিক সেই কারণেই বিজেপি নেতা কৈলাস বিজয়বর্গীয়র বলতে বাধেনি যে, চার বছর পর অবসরপ্রাপ্ত ‘অগ্নিবীর’দের জন্য তাঁদের দলীয় দপ্তরের দারোয়ানের পদগুলি খালি রাখা হবে।

এতদিন ধরে চলে আসা পদ্ধতি পাল্টে সেনাবাহিনীতে নিয়োগের সম্পূর্ণ নতুন একটি পদ্ধতি চালু করার আগে ক্ষমতাগর্বী মোদি সরকার কিন্তু দেশের মানুষের সঙ্গে বিষয়টির ভালোমন্দ নিয়ে একবার আলোচনার প্রয়োজনটুকুও বোধ করেনি। মোদিজিরা ভেবেছিলেন, গোটা শাসনকাল ধরে নোট-বাতিল থেকে একের পর এক যে হঠকারী ও জনস্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্তগুলি জনগণের ওপর চাপিয়ে দিয়ে তাঁরা পার পেয়ে এসেছেন, এবারেও সেভাবেই নিস্তার পেয়ে যাবেন। বুঝতে পারেননি, এভাবে জনরোষ ফুঁসে উঠবে তাঁদের বিরুদ্ধে। আসলে এই জনরোষ বিজেপি সরকারের অপশাসন, ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধি, জনগণের প্রতি তাচ্ছিল্যের মনোভাব, সর্বোপরি ভয়াবহ বেকারত্বের কারণে জনমনে জমে থাকা ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ। অগ্নিপথ সেই বারুদে আগুন দিয়েছে মাত্র।

এই বিক্ষোভ দেখিয়ে দিয়ে গেল, বিজেপি সরকারের অপশাসনে গরিবি-বেকারিতে চূড়ান্ত জর্জরিত দেশের তরুণসমাজের বুকের মধ্যে কী অসহনীয় ক্ষোভের বারুদ জমা হয়ে রয়েছে। যুববিক্ষোভের এই তীব্র আগুনে অবশ্যই এই সরকার ভয় পেয়েছে। তাই একের পর এক আপসের কথা উঠে আসছে মন্ত্রী-নেতাদের কথার সুরে। কিন্তু বিক্ষোভকারী তরুণদের বুঝতে হবে, বিজেপি সরকারের মতো একটা চূড়ান্ত ধুরন্ধর ও নীতিহীন সরকারকে নতি স্বীকার করাতে হলে এই স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভকে দীর্ঘস্থায়ী ও সুসংগঠিত রূপ দিতে হবে। আন্দোলনকারী তরুণদের খুঁটিয়ে বুঝতে হবে, কার স্বার্থে এই পুঁজিবাদী সরকার স্থায়ী চাকরি, অবসরকালীন অধিকারগুলিকে অতীত ইতিহাস বানিয়ে দিচ্ছে। জানতে হবে এর পিছনে থাকা রাজনীতিকে।

শ্রমিক-কর্মচারী থেকে শুরু করে সেনাবাহিনীতে চাকরিপ্রার্থী তরুণদের প্রতারিত করার এই ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্র দু-চারদিনের স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভে রোখা যাবে না। তার জন্য চাই সঠিক নেতৃত্বে সংগঠিত গণআন্দোলনের লাগাতার চাপ। দিল্লি সীমান্তে দীর্ঘ এক বছর ধরে দেশের কৃষক সমাজ সংগঠিত ও লাগাতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দাবি আদায়ের যে নজির তৈরি করেছে, বিক্ষোভকারীদের সেই আন্দোলন থেকে শিক্ষা নিতে হবে। খুঁজে নিতে হবে আন্দোলনের সঠিক দিকনির্দেশকারী শক্তিকে।

গণদাবী ৭৪ বর্ষ ৪৪ সংখ্যা ২৪ জুন ২০২২